প্রাককথন

গদ্যকবিতার আড়ালে এবং ধর্মগ্রন্থের আবহ সৃষ্টি করে নিজের জীবনদর্শন প্রচার অনেক পুরাতন একটা সাহিত্যরীতি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লেবানিজ বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক কাহলিল জিবরানের “দি প্রফেট” এর কথা, যেটি ১৯২২ সালে প্রকাশিত হবার পর প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলো। বইটাতে এক কাল্পনিক প্রফেটের জবানিতে লেখক ভালবাসা, বিবাহ, সন্তান, পোশাক, খাদ্য, আইন, বিচার, ন্যায়, প্রার্থনা ইত্যাদি বিষয়ে নিজের দার্শনিক চিন্তাভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। “প্রকৃত্যুক্তি” কে তার একটা ধারাবাহিকতা বলা যায়। তবে এটা বলাই যথেষ্ট নয়। কারণ এখানে ঈশ্বর, অবতার বা পয়গম্বরের আশ্রয় নেয়া হয়নি, বরং কথা বলা হয়েছে প্রকৃতির জবানিতে।

সন্ধির নিয়মে প্রকৃতি ও উক্তি শব্দজোড় যুক্ত হয়ে যে শব্দটি তৈরি করবার কথা, সেটি “প্রকৃত্যুক্তি”। প্রকৃতি – যে কিনা শাশ্বতকাল থেকে প্রত্যেকটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনাও অবলোকন করেছে এবং এখন হোমো সেপিয়েন্স বা জ্ঞানী মানুষ নামের একটি প্রজাতি তার বারটা বাজিয়ে ছাড়ছে, এই প্রজাতির প্রতি প্রকৃতি কোন স্বরে কথা বলবে? মূলত এটাই ধরার চেষ্টা করেছি। অবধারিতভাবেই প্রকৃতির ভাষা বিজ্ঞান এবং সে ভাষাকেই সাহিত্যের আদলে ফুটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আমাদের দেশে বিজ্ঞানের মৌলিক গ্রন্থ লেখা হয় না। জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিয়ে ইদানিং ভালো কাজ হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানসাহিত্য বলতে আমরা এখনো কেবল সায়েন্স ফিকশান বুঝি। আমার যেহেতু মৌলিক বিজ্ঞান লেখার সাধ্যি নাই, সেহেতু বিজ্ঞানসাহিত্য নিয়ে নীরিক্ষা করার প্রয়াস হাতে নিয়েছি। তবে শেষপর্যন্ত সিরিজটা সাহিত্যই এবং বিজ্ঞানকে ঠিক রেখে শিল্প সৃষ্টি করাটাই আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কের লক্ষ্য থাকবে।


তোমাদের সভ্যতা অসভ্যতা বৈ কিছুই নয় …

এই রোদন জল স্থল অন্তরীক্ষের পক্ষ হতে পৃথিবীর বুকে শ্বাসরত একমাত্র মানব প্রজাতিটির প্রতি, যারা দম্ভভরে নিজেদের নাম দিয়েছে ‘জ্ঞানী মানুষ’। শোনো জ্ঞানীরা, তোমরা মূর্খতায় সীমাতিক্রমণ কোরো না। তোমরা যা দেখো নি, মহান প্রকৃতি তা দেখেছেন। তোমাদের গভীরতম নৃতাত্ত্বিকও অতলান্তিকের তুলনায় একটি বিন্দুমাত্র। অতএব, অভিজ্ঞতার দাম দিতে শেখো। নইলে পতন কেবল তোমাদেরই। প্রকৃতির জন্য তোমরা অপরিহার্য নও, বরং সত্যটা হলো এর ঠিক বিপরীত। মহান প্রকৃতি বারেবারে পথ খুঁজে নিয়ে স্ফীত হয়ে ওঠেন এবং নবঢঙে নিজের জানান দেন – তাতেই মহান প্রকৃতির আনন্দ। অথচ সহজ সরল পথ গ্রহণ না করলে তোমাদের ভাগ্যে কী আছে – ধ্বংস ছাড়া?

মানবের অবশিষ্ট প্রজাতি, স্মরণ করো সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের পূর্বপুরুষ ছিল নিতান্তই ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী। স্মরণ করো। বারংবার স্মরণ করো সেসব পূর্বপুরুষের কথা যারা এতই ক্ষুদ্র ছিলো যে, সামনে তাকিয়ে ডায়নোসরের চারটি পা দেখে ভাবতো চারটি ভিন্ন বৃক্ষের কাণ্ড। স্মরণ করো – যখন তারা ডায়নোসরের গোবর ঘেঁটে পতঙ্গ অন্বেষণ করতো। এইবার ভাবো, তোমরা কি পৃথক তাদের চেয়ে? বস্তুত তোমরাও অনেককিছু আংশিক দেখেই ধারণা নাও এবং তোমরা তোমাদের মধ্যে মলকাদা সদৃশ ব্যক্তিদেরকেই অত্যধিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করো জীবিকার স্বার্থে।

আত্মদম্ভ তোমাদের জন্যে নয় – ওটা নিক্ষেপ করো মহান প্রকৃতির প্রতি যিনি অন্ধ, অথচ নিজেকে বদলে চলেছেন ও সামলে নিচ্ছেন প্রতিদিন। এইবার ভাবো, তোমরা কি পৃথক তোমাদের জ্ঞাতিভাই শিম্পাঞ্জির চেয়ে? শিম্পাঞ্জিরা দলে দলে বিভক্ত, তারা যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং অতি অবশ্যই যুদ্ধশেষে বিজিত দলের নারীদের কেউ ধর্ষণ হতে বাঁচতে পারবে না। বলো, তোমরা কি পৃথক তাদের চেয়ে? আদতে তোমরাও একই কাজ করেছো এবং করো।

সভ্যতা নামে এক বস্তু আছে, যাকে তোমরা স্বীয় অনন্যতা ভেবে স্বমেহনের সুখ তোলো। এবং আছে আরেক বস্তু – শিল্প। আর, আছেন তোমাদের ঈশ্বর – অর্থ। অথচ যদি নিরপেক্ষভাবে গভীরে তাকাও, দেখবে – সবকিছুর পেছনেই আছে আমার বেধে দেয়া নিগড়, আর তা হচ্ছে বংশবৃদ্ধির আদি তাড়না। এই নিগড় আমি পরিকল্পনা করে দেই নি; পরিকল্পনা তোমাদের কাজ, আমার নয়। আমার যা কিছু দান, সবই দুর্ঘটনা। তবে এই নিগড় যাদের বাঁধতে পেরেছিল তারাই টিকে গিয়েছো। এই নিগড় তোমাদের গবেষকদের জন্য এমন এক সূত্র, যা আদিম ডায়নোসর আর তার গোবর ঘাঁটা তোমাদের নানি, তোমরা এবং তোমাদের মৃত ভাইবোন, তোমাদের জ্ঞাতিভাইরা কিংবা আরো দুরের জীবিত বা বিলুপ্ত, ক্ষুদ্র বা বিকট আত্মীয়দের আসলে অভিন্ন করে রেখেছে।

অতএব, তোমরা তোমাদের সৃষ্টি নিয়ে গৌরব করো না। তোমরা পোশাকের আড়ালে আদিমতা ঢেকে রাখতে চাও। যদিও নিজের সামনে নিরাবরণ হতে পারো এবং যদিও তোমার প্রতিবেশী জানে তোমার পোশাকের আড়ালে কী, তথাপি তোমরা বস্ত্রহীন অবস্থায় যাও না প্রতিবেশীর কাছে। এবং কাউকে জোরপূর্বক বস্ত্রহীন করে তোমরা তাদের অপমানিত করতে পারো। পোশাকের সংস্কার তোমাদের অসভ্যতা বৈ কী? তোমরা কুকুরের সঙ্গম দেখে কাজ ফেলে চেয়ে থাকো, অথচ নিজেকে ভাবো সেই কুকুরের চেয়ে উৎকৃষ্ট। কখনো কি দেখেছে গরু তার ঘাস খাওয়া ফেলে কুকুরের সঙ্গম দেখছে? তাহলে বলো এই তিন প্রানির মধ্যে কে নিকৃষ্ট? এবং তোমরাও একইভাবে সঙ্গম করো অথচ তা করো দেয়ালের ওপাশে এবং তাই অন্য লোকের সঙ্গম দেখতে পাওয়া তোমাদের জন্য বিনোদন এবং সেই লোকের জন্য লজ্জাজনক। এ তোমাদের অসভ্যতা বৈ কী? তোমাদের সম্পূর্ণ সভ্যতাই হলো অনুরূপ দেয়ালের আড়ালে আদিমতা উদযাপনের অজুহাত মাত্র। তোমাদের সভ্যতা অসভ্যতা বৈ কী?


সম্পূর্ণ সত্য মহান প্রকৃতির দর্পণ …

হে আমার ধর্ষকের প্রজাতি, তোমাদের মধ্যে স্পষ্টত দুটি ভাগ আছে – একটি চিন্তাশীল এবং অপরটি তা নয়। যারা চিন্তাশীল তারা চিরকাল সত্যান্বেষণ করতে চেয়েছে। সত্যান্বেষণের ধারাবাহিকতাকে তারা প্রজন্মান্তরে বয়ে নিয়ে গেছে। স্মরণ করো, এমনি একজন চিন্তাশীল ব্যক্তি যে সত্যকে অনুভব করতে পেরেছিলো এক বিস্তীর্ণ মরুভূমির মতো যার পথে পথে দুর্বার ধূলিঝড়, তাই সে বলতে পেরেছিলো – যে জানে যে সে কিছুই জানে না, সেই সবচে’ জ্ঞানী। লোকটার প্রতি তোমরা কী আচরণ করেছিলে? অথবা তার কথা ভাবো, যে ব্যক্তি অরুণকে বলেছিল কেন্দ্র আর পৃথিবীকে বলেছিল পরিধি বরাবর ধাবমান, সে-ই সত্যের নিকটতম ছিল তোমাদের মধ্যে। তার প্রতি তোমরা কি আচরণ করেছিলে? কিংবা সেই নারী, যাকে অগ্রগামী হওয়ার অপরাধে এবং তোমাদের পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে কথা বলার পাপের জন্য তোমরা নগ্ন করে মাংস কেটে কেটে তার চোখের সামনেই আগুনে নিক্ষেপ করেছিলে। স্মরণ করো মিসরের কথা, যেখানে তোমরাই ছ’মাস ধরে পাঠাগারের গ্রন্থ পুড়িয়েছিলে। এভাবেই তোমরা নিজেদের উল্টোপথে নিতে চাও।

অথচ চিন্তাশীল অংশটি চিরকাল সত্যের পথে একাগ্রচিত্ত থেকেছে। বাকিরা, অর্থাৎ অথর্বরা, যারা চিরকাল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা চিরকাল বাঁধা দিয়েছে। বিষপান করিয়েছে, শুলে চড়িয়েছে, আগুনে পুড়িয়েছে, কুপিয়ে মেরেছে; কিন্তু সত্যকে ঢেকে দিতে পারে নি। তোমাদের মধ্যে যারা নিজ প্রজাতির উৎপত্তির বিষয়ে দাম্ভিক ও অমূলক ধারণা পোষণ করে এবং জীবজগতে নিজেদের এতিম প্রমাণ করতে চায় এবং সেই জন্যে নিজের হাত রক্তে ভেজাতেও কুণ্ঠাবোধ করে না, এদের ব্যাপারে লক্ষ্য রেখো – এরাই নিকট ভবিষ্যতে নিজেদের জীর্ণ পুঁথিমালায় ঐ সত্যকে খুঁজে পাবার দাবি করবে। শুধু তাই নয়, নতুন পাওয়া কোনো সত্যের প্রতি তারা অধম আচরণের পুনরাবৃত্তি করবে। এদের দেখেছি আমি নানাযুগে নানারূপে, তাই তোমাদের বলছি, এদের আশকারা দিও না।

বস্তুত, সত্যটি কী? তোমরা যদি সম্পূর্ণ সত্যকে উদ্ধার করতে পারতে তবে দেখতে পেতে তা আমারই দর্পণ। হয়তো তোমরা এর আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যারা চিন্তাশীল, যারা গ্রহটাকে প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তাদের মৃত্যুও তাদের সর্বগ্রাসী নিয়ন্ত্রণকে ব্যর্থ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা একেকজন সত্যের একেকটা পৃষ্ঠ ছুঁয়েছিলেন। বাকিরা, অর্থাৎ অথর্বরা, যারা চিরকাল সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা প্রথমে সর্বস্ব দিয়ে বাঁধা দেয়, তারপর সত্যকে গ্রহণ করে বটে কিন্তু সম্পূর্ণটুকু জানা হয়নি বিধায় মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে অবশিষ্ট শূন্যস্থান পূর্ণ করে। তাছাড়া, যারা চিন্তাশীল, তারাও ভুল করতে পারেন কিন্তু সত্যান্বেষণের সংগ্রামকে তারা প্রত্যেকেই গতিবান করে যান এবং তাদের কেউ কয়েক শতাব্দী পর পুনরাবির্ভূত হলে নিজের আবিষ্কারকে মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যেতে দেখলেও দুঃখ পেতেন না। কিন্তু, তাদের দুর্ভাগ্য যে তোমরা তাদের কথাকে কিছু মিথ্যার পুঁথিশাস্ত্রে সুবিধামতো চালান করে দাও এবং তাকে অপরিবর্তনীয় বলে দাবি করো এবং সেই খাতিরে অশান্তি সৃষ্টি করো।

সাবধান, সত্য জানার পথে অগ্রসর হও কিন্তু মনে রাখবে সত্য তোমার প্রেমিকের শরীর নয় যে তার রোমে রোমে তোমার অভিগমন হবে। তাই দম্ভ কোরো না। কোনো এক চিন্তায় অটল থেকে যাওয়া গৌরব নয় বরং পরিবর্তিত হবার সাহসেই গৌরব। বিবর্তনের ঘটনাক্রমে ধীরে ধীরে তোমাদের যে বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটেছে, তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। এবং স্মরণ করো তোমাদেরই মধ্যেকার এক অগ্রগামীর উক্তি – “জ্ঞান সমুদ্রের তীরে আমি স্রেফ এক নুড়ি কুড়ানো বালক।”

অন্যথায় তোমরা চিরদিন সমাজ বিধায়কদের ক্রীড়নক হয়ে থাকবে। শোষণের ভূষণ বদলাবে, রূপ বদলাবে না।

(চলবে)

[770 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0