1788 cover

অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশদের স্থাপিত বন্দীশিবিরের শৈশবের দিনলিপি অনুবাদ করছি, ওয়াটকিন টেঞ্চের মূল বই, 1789 সালে প্রকাশিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay এবং 1793 সালে প্রকাশিত A Complete Account of the Settlement at Port Jackson থেকে। অনুবাদের প্রথম কিস্তিতে বইটির পরিচিতি, লেখকের ভূমিকা এবং প্রথম চার অধ্যায় অনুবাদ করেছিলাম – যেখানে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ বন্দর থেকে জাহাজবহর ছাড়ার পরে ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ, কেপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে পৌঁছানো পর্যন্ত ঘটনাবলী এসেছে। দ্বিতীয় কিস্তিতে আছে দুটো অধ্যায় – রিও ডি জেনিরোতে তাদের অবস্থানকাল, সেখান থেকে দক্ষিন আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের দিকে যাত্রা, কেপ অফ গুড হোপে তাদের কর্মকাণ্ড, এবং সেখান থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বোটানী বে এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু পর্যন্ত।

মূল বই দুটোকে একত্র করে টেক্সট পাবলিশিং কোম্পানি “১৭৮৮” নামে প্রকাশ করেছে ২০১২ সালে, এবং সেই সংস্করনের ভূমিকা লিখেছেন টিম ফ্ল্যানারি, “অনন্য ওয়াটকিন টেঞ্চ” শিরোনামে।

টিম ফ্ল্যানারী অস্ট্রেলিয়ার একজন বহুল পরিচিত ও বহুল বিক্রীত লেখক, বিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী। তার প্রায় এক ডজন বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিকতম সংযোজন হল Among the Islands: Adventures in the Pacific। ২০১১ সাল থেকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু কমিশনের প্রধান কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তৃতীয় কিস্তিতে টিম ফ্ল্যানারীর সেই ভূমিকাটি অনুবাদ করছি, যা পাঠককে বইটির একটি সামগ্রিক আলোচনা ছাড়াও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী এবং ততকালীন প্রেক্ষাপটের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।

প্রথম কিস্তি পাবেন এখানে
দ্বিতীয় কিস্তি পাবেন এখানে

————————–

অস্ট্রেলিয়ায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপন এত দ্রুত হয়েছিল, এবং সেটা এখানকার মাটি ও আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, প্রথম সাদা বিদেশী যখন এই দেশে পা ফেলেছিল তখন কেমন ছিল এই দেশ, তা আজকে এইখানে বসে কল্পনা করতেও কষ্ট হবে আমাদের। সেই আগের দেশটি কেমন ছিল, কিভাবে তা বদলে গেল – তা যদি আমাদের জিজ্ঞাস্য হয়, তবে ওয়াটকিন টেঞ্চের লিখিত অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ইউরোপীয় বসতি গড়ার যে অনন্যসাধারণ বর্ণনাগুলো আছে, তা আমাদের অবশ্যপাঠ্য। এই বইগুলো সে আমলে সর্বোচ্চ বিক্রীত বইয়ের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। বিদেশীদের সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় এই দেশ এবং এখানকার হাজার হাজার বছরের পুরনো আদিবাসীরা কেমন ছিল তা যেমন সেখানে চিত্ররুপময়ভাবে বর্ণিত হয়েছে, তেমনি বর্ণিত হয়েছে নবাগত এই বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা তাদের বদলে যাওয়ার গল্পটি। যদিও টেঞ্চের বইগুলো প্রকাশের পরে জনপ্রিয়তার শিখরেই ছিল, কি করে যেন তারা অস্ট্রেলিয়ার মানুষের কাছে অজানা থেকে গেছে গত ২০০ বছর ধরে, এবং অতি সম্প্রতি এই বইগুলো আমাদের সাহিত্যের ক্ল্যাসিকের ভাণ্ডারে যথাযোগ্য জায়গা ফিরে পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই বইগুলো জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সৃষ্টিশীল কাজের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, যেমন ইঙ্গা ক্লেনডিনেন এর ‘ড্যান্সিং উইথ স্ট্রেইঞ্জারস’ এবং কেইট গ্রেনভিল এর ‘দ্য লেফট্যানান্ট’।

ওয়াটকিন টেঞ্চ ছিলেন মেরিন সেনাবাহিনীর একজন লেফট্যানান্ট, যিনি ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়াগামী প্রথম জাহাজ-বহরে এসেছিলেন। ১১টি জাহাজে করে এসেছিল প্রায় এক হাজার মানুষ, যার মধ্যে ৭০০ জন দাগী আসামী। ব্রিটেনের জেলখানাগুলোতে সে সময় আসামীদের জন্য স্থান সংকুলান হচ্ছিল না, এবং আমেরিকান উপনিবেশগুলো স্বাধীন হয়ে যাওয়ার ফলে তারাও আর কয়েদী শ্রমিক নিতে আগ্রহী ছিল না। ফলে একটা নতুন সমাধান কিম্বা নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করতেই হতো। পশ্চিম আফ্রিকায় একটা কয়েদী উপনিবেশ স্থাপনের কথা সাময়িকভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল। ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকুলের ম্যাপ আঁকার সময় তার সঙ্গী ছিলেন যিনি, সেই জোসেফ ব্যাংকস ভবিষ্যত কয়েদী কলোনীর অবস্থান হিসেবে বোটানী বে এর পক্ষে জোরেসোরে ব্যাট করেন সে সময়। যেহেতু সেই সময়ের ব্রিটেনে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, তার কথাতেই কাজ হয়ে যায়। অবশ্য বোটানী বে তার সুনামের উপরে সুবিচার করতে পারে নি – গভর্নর ফিলিপ যখন সেখানে গেলেন, তিনি বেশি সময় নষ্ট না করে বসতি গড়ার জায়গা হিসেবে বোটানী বে এর পরিবর্তে পোর্ট জ্যাকসনকে বেছে নিয়েছিলেন।

————————–

ওয়াটকিন টেঞ্চের জন্ম হয় ৬ই নভেম্বর ১৭৫৮ সালে, চেষ্টারে। তার শৈশবকাল সম্পর্কে খুব একটা জানা যায় না। তার বাবা ফিশার টেঞ্চ ছিলেন নাচের শিক্ষক, এবং তিনি তার স্ত্রী মার্গারিটার সাথে মিলে চেষ্টারে একটা নাচের একাডেমী এবং একটা আবাসিক স্কুল চালাতেন (Fitzhardinge, L. F. (ed.), Sydney’s First Four Years, by Captain Watkin Tench, Library of Australian History, Sydney, 1979.)। যে ভবনে এই স্কুলটা চলত, সেটা আজও অক্ষত আছে, এবং সম্ভবতঃ ওয়াটকিন টেঞ্চের জন্ম সেখানেই। এই ভবনের রাস্তার সামনের দিকটায় একটা পিজার দোকান বসেছে আজকাল, এবং সেখানে এমন কোন চিহ্নই নেই, যা থেকে বোঝা যেতে পারে যে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে দক্ষ চিত্রকরদের একজনের জন্ম হয়েছিল সেখানে। বোধ করি তাদের পরিবার ছিল একটা সুখী পরিবার, যেখানে তরুন ওয়াটকিন টেঞ্চ ভাল শিক্ষালাভ করেছিলেন, যা তার নানা লেখায় মিলটন এবং সেকশপীয়রকে উদ্ধৃত করার ঝোঁক থেকেই কিছুটা আঁচ করা যায়। আসলে তার শিক্ষাগত অর্জন এতটাই উঁচু ছিল যে, তাকেই সম্ভবত পোর্ট জ্যাকসনের উপনিবেশে সবচেয়ে সুশিক্ষিত ও সাংস্কৃতিক মনের অধিকারী হিসেবে সবাই বিবেচনা করতে রাজী হবে।

১৬ বছর বয়সে ওয়াটকিন টেঞ্চ মেরিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সে সময় আর্মী ও নেভীর তুলনার মেরিন বা সাগর সেনারা ছিল নিম্নপদস্থ, অথবা আভিজাত্যে ও বেতন-ভাতার দিক থেকে কম আকর্ষনীয়। ওয়াটকিন টেঞ্চ যে মেরিন সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন, তার কারণ সম্ভবতঃ এই যে, সে আমলে সামরিক বাহিনীতে যে কোন পদে যোগ দিতেই টাকাপয়সা খরচ করার ব্যাপার ছিল, এবং মেরিন সেনাবাহিনীতে একটা পদ জোগাড় করা ওয়াটকিনের পরিবারর সামর্থের মধ্যেই ছিল। কারণটা যাই হয়ে থাকুক না কেন, যোগদানের অব্যবহিত পরেই তিনি পুরাদস্তুর কর্মরত হয়ে যান, কারণ তখন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল পুরাদমে। এর ঠিক দুই বছর পরে আমেরিকান বাহিনী তাকে বন্দী করে, এবং মাস তিনেক বন্দী থাকার পরে তিনি আবার তার বাহিনীতে যোগ দেন। ১৭৮৩ সালে যখন সে যুদ্ধ শেষ হলো, তা এই তরুন মেরিন সেনার কাছে নিশ্চয়ই এক মিশ্র অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। উত্তেজনাপূর্ণ অভিযানের অংশীদার হওয়া এবং নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবার মত সময় তখন আর ছিল না; বাস্তবতা ছিল এই যে, তিনি তখন খণ্ডকালীন কর্মরত ছিলেন এবং তার ফলে এক ধরণের বিরক্তি ও হতাশা তাকে পেয়ে বসত। সেকালে সামরিক বাহিনীতে যারা যোগ দিত, তারা বছরের বেশ খানিকটা সময় অর্ধ-বেতনে বা বিনা বেতনে বেকার থাকত, যদি সামরিক বাহিনীর কাজ-কর্ম কমে যেত অথবা কোন যুদ্ধবিগ্রহ বা বানিজ্যিক/অনুসন্ধানী অভিযানের প্রয়োজন না থাকত। ১৮৭৬ সাল থেকে তাকে অর্ধ-বেতনে খন্ডকালীন কাজ করতে হয়েছিল, এবং ধারণা করা যায় যে, তার মতন একজন তরুন মেধাবী মানুষের পক্ষে আগের চেয়ে অনেকখানি কম বেতনের এই অলস জীবন খুব একটা সহনীয় ছিল না।

এর মাত্র কয়েকমাস পরেই যখন বোটানী বে’তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথম জাহাজ বহরে তিন বছরের মেয়াদে (শেষে গিয়ে এই মেয়াদ পাঁচ বছরে দাঁড়িয়েছিল) যাওয়ার সুযোগ এল, তখন ওয়াটকিনের অনুভূতি কেমন ছিল সেটা আজকে বসে বুঝতে গেলে আন্দাজ করা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। এই সফরের ধরণটা ছিল অন্যান্য সফরের চেয়ে অনেকখানি ব্যতিক্রমী, এবং তাতে কারারক্ষীর ভূমিকাতেও কাজ করতে হতে পারে – এইসব ব্যাপার নিশ্চয়ই অনেক সামরিক কর্মকর্তাকে এই প্রস্তাবিত সফরে যাওয়ার জন্য আবেদন করা থেকে বিরত রেখেছিল, কারন এটা তাদেরকে হয়তো এরকম একটা ধারণা দিয়েছিল যে, এই সফরটা ঠিক তাদের মর্যাদার সাথে যায় না। কিন্তু ওয়াটকিন টেঞ্চ সম্ভবত এই সফরকেই তার দ্বিতীয় আরেকটা পেশা – লেখক হিসেবে নিজেকে তৈরী করার একটা সুযোগ হিসেবে ভেবেছিলেন।

১৭৮৭ সালের শুরুতে যখন পিকাডেলীর প্রকাশক জন ডেবরেটের প্রকাশনা সংস্থা তাকে নিউ হল্যান্ডের উদ্দেশ্যে এই যাত্রা (অস্ট্রেলিয়াকে তখন নিউ হল্যান্ড নামেও ডাকা হতো) এবং সেখানে স্থাপিতব্য জনবসতির উপরে একটা বই লিখতে ফরমায়েশ করলেন, তখন সাহিত্যিক বা লেখক হিসেবে ওয়াটকিনের কোন অভিজ্ঞতা বা পরিচিতি ছিল না। কিন্তু এই সফরে প্রায় হাজারখানেক ব্রিটিশ একটা অচেনা জায়গার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছে – ব্যাপারটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক ছিল বলেই দেশের সাধারণ জনগণ তা সম্পর্কে জানতে প্রচণ্ড রকমের আগ্রহী ছিল। ফলে এই সফরের হর্তাকর্তাদের প্রায় সবাইই তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিবরণ লেখার ফরমায়েশ পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিলেন স্বয়ং গভর্নর, লেফট্যানান্ট গভর্নর, জাজ-এডভোকেট এবং সার্জন। এই প্রকাশক ডেবরেটই সার্জন জন হোয়াইটকে ফরমায়েশ করেছিলেন একটা বই লেখার জন্য, হয়তোবা এই আশাতে যে, হোয়াইটের ডাক্তারী লেখাপড়ার গুণে তিনি এই নতুন দেশের প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে লিখতে প্রবৃত্ত হবেন। জন হোয়াইট তার প্রকাশককে নিরাশ করেন নি – তিনি সিডনীর আশেপাশের এলাকার বৃক্ষলতাদি ও প্রাণীজগতের উপরে একটা চমতকার লেখা উপহার দিয়েছিলেন।

প্রকাশক টেঞ্চের কাছে ঠিক কি আশা করেছিলেন, তা আমাদের অজানা। তবে অনুমান করি, যদি তিনি অল্পকিছু পাউন্ড অগ্রীম খরচ করে সেই সফরের একজন তরুন লেফট্যানান্টের কাছে থেকে কিছু একটা লেখা পাওয়ার আশা করে থাকেন – যিনি ছিলেন লেখার ফরমায়েশ পাওয়া পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে জুনিয়র, তবে তিনি যুক্তিযুক্ত ঝুঁকিই নিয়েছিলেন। শুরুতে প্রকাশক যেটাই ভেবে থাকুন না কেন, যখন ইংল্যান্ড থেকে নিউ সাউথ ওয়েলসের উদ্দেশ্যে সেই দীর্ঘ যাত্রা এবং সেখানে স্থাপিত বসতির প্রথম কয়েক মাসের বিবরণের পাণ্ডুলিপি জাহাজে করে এসে পৌঁছায়, প্রকাশকের বিনিয়োগ বেশ ভালভাবেই উঠে এসেছিল তাতে।

প্রকাশক টেঞ্চের কাছে ঠিক কি আশা করেছিলেন, তা আমাদের অজানা। তবে অনুমান করি, যদি তিনি অল্পকিছু পাউন্ড অগ্রীম খরচ করে সেই সফরের একজন তরুন লেফট্যানান্টের কাছে থেকে কিছু একটা লেখা পাওয়ার আশা করে থাকেন – যিনি ছিলেন লেখার ফরমায়েশ পাওয়া পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে জুনিয়র, তবে তিনি যুক্তিযুক্ত ঝুঁকিই নিয়েছিলেন। শুরুতে প্রকাশক যেটাই ভেবে থাকুন না কেন, যখন ইংল্যান্ড থেকে নিউ সাউথ ওয়েলসের উদ্দেশ্যে সেই দীর্ঘ যাত্রা এবং সেখানে স্থাপিত বসতির প্রথম কয়েক মাসের বিবরণের পাণ্ডুলিপি জাহাজে করে এসে পৌঁছায়, প্রকাশকের বিনিয়োগ বেশ ভালভাবেই উঠে এসেছিল তাতে। টেঞ্চের ‘বোটানী বে অভিযানের বিবরণ’ নিয়ে তড়িঘড়ি করে প্রেসে যাওয়া হল, এবং ১৭৮৯ সালের ২৪শে এপ্রিলে সেটি বোটানি বে জনবসতির প্রথম প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হিসেবে প্রকাশিত হলো। পকেট-সাইজের পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত এই বইটি অস্ট্রেলিয়ার উপনিবেশিক ইতিহাসের আদি ইতিহাসের উপরে লিখিত পাঁচটি বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, তবে এটিই সবচেয়ে সুলিখিত, আকর্ষণীয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং চিন্তা উদ্রেককারী।

————————–

অস্ট্রেলিয়ার আদি ইতিহাসের উপরে লেখা পাঁচটি বইকে ‘ফাউন্ডেশান বই’ বলা হয়, যেগুলো এই নব্য কলোনীর শৈশবের দিনলিপি। তার একটি হলো ওয়াটকিন টেঞ্চ এর লিখিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay, 1789 সালে প্রকাশিত। বাকীগুলো হলোঃ

An Account of the English Colony in New South Wales, from its first Settlement in January 1788 to August 1801 (Published in 1804)by David Collins

An Historical Journal of the Transactions at Port Jackson and Norfolk Island (Published in 1793)by John Hunter

The Voyage of Governor Philip to Botany Bay with an Account of the Establishment of the Colonies of Port Jackson and Norfolk Islands (Published in 1789)by Governor Arthur Phillip

Journal of a voyage to New South Wales, with sixty-five plates of nondescript animals, birds, lizards, serpents, curious cones of trees and other natural productions (Published in 1790) by John White

————————–

ওয়াটকিন টেঞ্চ যখন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রথম দিনগুলোর ধারাবর্ণনা দিচ্ছেন, আমরা যেন এই দুই’শ বছর পরেও তার ব্যক্তিত্ব ও বর্ণনাভঙ্গীতে মুগ্ধ না হয়ে পারি না। তিনি পোর্ট জ্যাকসনের এই নতুন উপনিবেশে মাত্র চার বছর ছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর তার দ্বিতীয় বই, “পোর্ট জ্যাকসনে স্থাপিত জনবসতির সামগ্রিক বর্ণনা” বের হয় পল মলের প্রকাশক জে নিকোলের মাধ্যমে ১৭৯৩ সালে। এই বইটি আগের বইটির চেয়ে অধিকতর সমৃদ্ধ, এবং তা টেঞ্চের লেখক হিসেবে সক্ষমতার বা সাফল্যের প্রমাণ ছাড়াও সে সময় পোর্ট জ্যাকসনের উপনিবেশ নিয়ে জনমানুষের ব্যাপক আগ্রহেরও এক জ্বলন্ত সাক্ষী।

লেখালেখি থেকে টেঞ্চের ব্যক্তিত্বের এক সমৃদ্ধ বয়ান মেলে। ‘শার্লেট’ জাহাজে পা রাখার মুহূর্ত থেকে শুরু করেই তিনি প্রখর দেখনেওয়ালা চোখের অধিকারী, সবকিছু নিয়ে প্রচণ্ড কৌতুহলী, শশব্যস্ত এবং তারুন্যের স্বভাবজাত অদম্য শক্তির অধিকারী। এই জাহাজ বহর তার যাত্রাপথে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পথের নানা মুহূর্তে ওয়াটকিন টেঞ্চ আমাদেরকে সেই সফরের বিচিত্র মানুষ এবং বিভিন্ন যাত্রাবিরতির স্থানের খবর দিতে থাকেন, যা এই প্রবাদপ্রতিম দক্ষিনের দেশের উদ্দেশ্যে সেই দীর্ঘ যাত্রার স্মারক হয়ে থাকবে অনেক বছর ধরে। আমরা তার দেওয়া বর্ণনা পড়তে পড়তে চলে যাই কেপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জের পথে-প্রান্তরে, রিও ডি জেনিরোর উঁচুনীচু সড়কে, কিম্বা কেপ টাউনের অলি-গলিতে। তবে এই কাফেলা তার গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেই ওয়াটকিন টেঞ্চের বহুমূখী জ্ঞান, আগ্রহ ও কৌতুহল সত্যিকারের কর্মক্ষেত্র খুঁজে পায়। এইখানে এই নতুন দেশে সবকিছুই বিচিত্র মনে হয়, সবকিছু নিয়েই পাতার পর পাতা লেখা যায় বলে বোধ হয়। সে মুহূর্তে ওয়াটকিন টেঞ্চ আমাদেরকে তার দক্ষ লেখার হাতে শখের লেখকদের চেয়ে অনেক বেশী পেশাদারভাবে একজন প্রকৃতিবিদ, জনমিতিবিদ, আইনজ্ঞ, সেনাসদস্য, কৃষিবিদ ও সমাজ সংক্রান্ত ভাষ্যকার হিসেবে নানা খবর দিতে থাকেন সেই অজানা দেশের।

যখন প্রথম জাহাজ বহর ইংল্যান্ড ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, সেই মুহূর্তে ওয়াটকিন টেঞ্চ জাহাজে আরোহীত কয়েদীদের দেশ ছেড়ে (সম্ভবত আজীবনের জন্য) ভিনদেশে চলে যাওয়ার অনুভূতি বর্ণনা করছেন এভাবেঃ

“আমি বন্দীদের মাঝখান দিয়ে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করলাম এই বিশেষ মুহূর্তে তাদের মনের অবস্থা জানার জন্য। অল্প কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাইকেই বেশ আনন্দিত মনে হলো, যদিও কাউকে কাউকে দেখা গেল নিজের দেশ ও আত্নীয় স্বজন থেকে সম্ভবত চিরতরে আলাদা হয়ে যাওয়ার বেদনায় কাতর। সাধারণভাবে বলতে গেলে, বেদনার চিহ্ন নারীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছিল, কারণ আমি স্রেফ একজনের বেশী নারীকে সে সময় কোন কান্নাকাটি করতে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।”

টেঞ্চের গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী আরো বেশী করে চোখে পড়ে কয়েদীদের সাথে তার আচার-ব্যবহারে। যখন তাকে বলা হলো যে তিনি নিজের বিবেচনামত জাহাজে অবস্থানরত বন্দীদেরকে শেকলের বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে পারবেন, তিনি লিখছেন যে তার ‘প্রচণ্ড আনন্দ হয়েছিল’ এই মানবিক আইনের আওতায় তার অধীনে থাকা সকলকে মুক্ত করে দিতে, কাউকে বাদ না দিয়ে। যারা তাদের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত ছিল, সে সব বন্দীদের শাস্তির ব্যাপারগুলোকে টেঞ্চ যে হতাশা ও আতঙ্কের চোখে দেখতেন, তা সত্যিই মর্মভেদী। তিনি সে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অধীন থেকে কাজ করতেন, সেই সিস্টেমের অমানবিকতা সুচারূরুপে ফুটে ওঠে এক ভাগ্যহত তরুনের তার মায়ের কাছে লেখা শেষ চিঠিতে, যেটি টেঞ্চ নিজের হাতেই প্রতিলিপি করে এই বইতে উপস্থাপন করেছেন। তাছাড়া দৃশ্যতঃ শিশুদের প্রতিও তার একটা সদয় দৃষ্টিভঙ্গী ছিল। তিনি আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, তিনি একদিন একটি সাত বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে বোটানী বে সাগর সৈকতে হাঁটতে যান, যখন কিনা তার দলের প্রায় সবাই তখনো জাহাজে আটক ছিল। এই বালকটি কে, সেটা আমরা জানি না- সে কোন কয়েদীর বা কোন মেরিন সেনার সন্তান হয়ে থাকবে। যেটাই হোক না কেন, এই বালকটি নিশ্চয়ই সুদীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তিতে অবসন্ন ছিল, এবং এই নতুন দেশে অন্য অনেকের আগে এই হাঁটার অভিযানে যাওয়াটা সে উপভোগ করে থাকবে।

————————–

যদিও প্রাকৃতিক ইতিহাসের উপরে টেঞ্চের লেখাগুলো একই বিষয়ে সার্জন জন হোয়াইটের লেখাগুলোর তুলনায় পরিমাণে অত বেশী নয়, তবে তিনি যেটুকুই লিখেছেন তা বিশদ ও প্রাসঙ্গিক। ইমু পাখীর দৈহিক গঠনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি পাখীটির অস্বাভাবিক ধরনের দুই-ভাঁজওয়ালা পালকের কথা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন, যা পেশাদার প্রকৃতিবিদ যেমন চার্লস ডারউইন প্রমুখের কাজের সমকক্ষ। ক্যাঙ্গারুর বর্ণনা দিতে গিয়ে টেঞ্চ সত্যিকারের ক্যাঙ্গারুর সাথে ১৭৭০ সালে ক্যাপ্টেন কুকের অস্ট্রেলিয়া অভিযানের সময়ে আঁকা একটি ছবির তুলনা করেছেন এবং সেই ছবিটির নানা ভুলভ্রান্তি তুলে ধরেছেন। ক্যাঙ্গারুর সম্পর্কে তার মন্তব্য – “পুরুষ প্রাণীটির অণ্ডকোষ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত ক্রমে অবস্থিত” এটি নিঃসন্দেহে এই ব্যাপারটির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে যে, যে সব প্রাণী থলিতে বাচ্চাকে বহন করে (ইংরেজীতে বলে মারসুপিয়াল। নোট), তাদের অণ্ডকোষ সাধারনতঃ পুরুষাঙ্গের সামনে থাকে, পেছনের দিকে নয়। ব্যাপারটা সেই সময় একটা নতুন আবিস্কার ছিল নিশ্চয়ই, তবে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আগের পর্যবেক্ষকদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, যাদের মধ্যে জোসেফ ব্যাংকসও ছিলেন।

পোর্ট জ্যাকসনের উপনিবেশে টেঞ্চ একটা ডায়েরী বা জার্নাল লিখতেন নিয়মিত, যা তিনি প্রায়শঃই তার প্রকাশিত লেখায় উদ্ধৃত করেছেন। ফলে তার লিখিত শব্দে বা বাক্যে একটা টাটকা সতেজতার হাওয়া আছে, যেন তিনি সেখানে পৌঁছামাত্রই লেখার টেবিলে গুছিয়ে বসার আয়োজন করেছিলেন তার দেখা অসাধারণ কিছু ঘটনাবলী ও দৃশ্যাবলী বর্ণনা করার জন্য। দুর্ভাগ্যক্রমে, এই মহামূল্যবান দিনলিপিটি সম্ভবতঃ হারিয়ে গেছে, যার ফলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, কারণ আমরা দেখতে পাই যে, টেঞ্চ তার প্রকাশিত লেখায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইচ্ছা করেই বাদ দিয়ে গেছেন। উদাহরণস্বরুপ, ১৭৮৮ সালের মার্চে তার উর্ধতন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রস টেঞ্চকে গ্রেফতার করেছিলেন সামরিক আদালতে একটি মামলার রায়কে প্রতিপালন করতে ব্যার্থতার জন্য, যে মামলার বিচারের সময় ক্যাপ্টেন রস ছিলেন বিচারকদের সভাপতি। এই ঘটনাটি তিনি বেমালুম এড়িয়ে গেছেন তার প্রকাশিত বইতে। এমনকি এই গ্রেপ্তারের আদেশ টেঞ্চের নিউ সাউথ ওয়েলসে থাকার পুরোটা সময় ধরেই বহাল ছিল, এবং অন্যান্য সূত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে ক্যাপ্টেন রসের এই অন্যায্য আদেশের ফলে টেঞ্চ তার উপরে যথেষ্ঠ রাগান্বিতও ছিলেন (Fitzhardinge, L. F. (ed.), Sydney’s First Four Years, by Captain Watkin Tench, Library of Australian History, Sydney, 1979.) টেঞ্চ এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটিকে তার প্রকাশিত লেখায় বাদ দিয়ে গেছেন, নইলে এই উপনিবেশে বিচার ব্যবস্থার ধরণের উপরে তার বিশদ আলোচনা সেখানে পাওয়া যেতে পারত।

বোধ করি টেঞ্চের লেখার সবচেয়ে অনন্যসাধারণ দিক হলো, বিশেষ করে এই একুশ শতকের পাঠকদের কাছে, এবোরিজিন বা আদিবাসীদের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গী, যাদেরকে আমরা ‘ইন্ডিয়ান’ নামেও জানি। পুরো উপনিবেশে শুধুমাত্র তার কাছের বন্ধু লেফট্যানান্ট ডজ ছাড়া ওয়াটকিন টেঞ্চই ইউরোপীয়ান জনবসতিতে থাকা এবোরিজিনদের সাথে এবং যে সব এবোরিজিনরা সেখানে নিয়মিত আসত, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি তাদের ভাষা শিখেছিলেন, এবং আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হোত যে এবোরিজিনরা তাকে বিশ্বাস করত এবং পছন্দও করত। টেঞ্চের হাত ধরেই সিডনী এলাকার আদিবাসীদের ভাষার বেশ কিছু শব্দ আমাদের অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজী ভাষাতে ঢুকেছে, যেমন স্থানীয় প্রজাতির কুকুর অর্থে ডিঙ্গো (dingo), মহিলা অর্থে জিন (gin), এবং বনে জঙ্গলে কাউকে হারিয়ে ফেললে তাকে খুঁজে পাবার জন্য বা ডাকার জন্য ব্যবহৃত শব্দ, কুউইই…(cooee)।

অনেক অর্জন সত্বেও মানতেই হবে যে, টেঞ্চের প্রধান কর্তব্য ছিল একজন সৈনিক হিসেবে। তিনি পুরাদস্তুর একজন সৈনিকই ছিলেন, এবং পোর্ট জ্যাকসনের এবোরিজিনাল পুরুষদের তিনি প্রশংসা করতেন সম্ভবতঃ এই কারণে যে, তিনি নিজেও বীরত্ব বা পুরুষত্ব পছন্দ করতেন। নিজেদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি শক্তিধর শত্রুকে মোকাবেলা করার সময় এবোরিজিনদের সাহসিকতা দেখে টেঞ্চ বিস্মিত হয়েছেন, এবং তাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে কিম্বা বন্দুকওয়ালা ইউরোপীয়ানদের সাথে লড়াই করার সময় মৃত্যুভয়ে ভীত না হওয়ার ব্যাপারটাও তাকে অবাক করেছে। এই বীরত্ব শুধু যে পোর্ট জ্যাকসনের এবোরিজিনদেরই ছিল, তা নয়; অস্ট্রেলিয়ায় আসা অনেক পরিব্রাজকই এই বিষয়ে লিখে গেছেন। তবে তাদের মধ্যে অতি অল্প সংখ্যক লেখকই এই গুণটি তাদের নিজেদের কারো মধ্যে থাকাটাকে যতটা প্রশংসার চোখে দেখেছে, একজন উলঙ্গ কালো মানুষের মধ্যে সেই একই গুণকে ততটাই সমীহের চোখে দেখেছে।

নব্য স্থাপিত উপনিবেশকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে রত একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে টেঞ্চের পক্ষে এবোরিজিনদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাটা সুবিধাজনক ছিল না, কেননা এবোরিজিনরা ছিল এই উপনিবেশের সম্ভাব্য বিরোধিতাকারী পক্ষ। বস্তুতঃ টেঞ্চই প্রথম ইউরোপীয়ান, যাকে অফিসিয়ালি এবোরিজিনদের উপরে একটা বড় হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্ভাগ্যজনক বিরল রেকর্ডের মালিক ওয়াটকিন টেঞ্চ। এইসব ঘটনা লেখার সময় তার কলম এক বিষাদময় সুরে কথা বলত; তিনি নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পেশাগত কর্তব্যের দ্বন্দ্বকে গভীর অনুভূতি সহকারে পাঠকের সামনে পেশ করেন, এবং তিনি যে নিরুপায় হয়ে স্বাধীনতার অভাবে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলেন, তা প্রত্যক্ষ করাটা পাঠকের জন্যও এক বেদনাময় উপাখ্যান হয়ে দাঁড়ায়। এবোরিজিনদের উপরে হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ পাওয়ার পরে তার হতাশা ও আতঙ্ক এই বইতে সরাসরি উপস্থাপিত নেই, কারণ একজন সৈনিক হিসেবে তিনি হয়তো চান নি যে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে তাকে কেউ দোষী সাব্যস্ত করুক; তবে আমরা তার হতাশা ও আতঙ্ক পরিস্কারভাবেই দেখতে পাই। আমরা দেখি যে টেঞ্চকে গভর্নর ফিলিপ নিজের বাসভবনে ডেকে পাঠিয়ে বুঝিয়ে দেন, কোন ছুরি এবং বস্তা ব্যবহার করে দশজন এবোরিজিন পুরুষের মাথা কেটে আনতে হবে। এই ভয়ংকর আদেশ আমরা গভর্নর ফিলিপকে নিজের মুখেই দিতে শুনি।

বস্তুতঃ টেঞ্চই প্রথম ইউরোপীয়ান, যাকে অফিসিয়ালি এবোরিজিনদের উপরে একটা বড় হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এই দুর্ভাগ্যজনক বিরল রেকর্ডের মালিক ওয়াটকিন টেঞ্চ। এইসব ঘটনা লেখার সময় তার কলম এক বিষাদময় সুরে কথা বলত; তিনি নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পেশাগত কর্তব্যের দ্বন্দ্বকে গভীর অনুভূতি সহকারে পাঠকের সামনে পেশ করেন, এবং তিনি যে নিরুপায় হয়ে স্বাধীনতার অভাবে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলেন, তা প্রত্যক্ষ করাটা পাঠকের জন্যও এক বেদনাময় উপাখ্যান হয়ে দাঁড়ায়।

গভর্নর ফিলিপ টেঞ্চকে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি এই আদেশের কোন পরিবর্তন চান কি-না। গভর্নর ফিলিপ কি তার তরুন লেফট্যানান্টের অভিব্যক্তিতে এমন কিছু দেখেছিলেন, যে তাকে এই ‘আদেশ পরিবর্তনের’ প্রস্তাব দিলেন তিনি? টেঞ্চ প্রস্তাব করলেন, দশজনের মাথা কাটার পরিবর্তে ছয়জন এবোরিজিনকে বন্দী করে ধরে আনা হোক, যাদের কাউকে কাউকে হত্যা করা হতে পারে অথবা কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে, গভর্নরের বিবেচনার উপরে নির্ভর করে। সেই মুহূর্তে টেঞ্চ সম্ভবতঃ এর চেয়ে ভালো কোন প্রস্তাব আর খুঁজে পান নি। তবে তার প্রস্তাব সুবিবেচনাপ্রসূত ছিল বলেই বোধ হয়, কেননা গভর্নর ফিলিপ সেটা গ্রহণ করেন। মূল আদেশের চেয়ে অনেকখানি সহজ এই পরিবর্তিত আদেশও যখন টেঞ্চ সঠিকভাবে পালন করতে পারেন না, তখন তিনি লজ্জিত হন নি, বরং এই মর্মান্তিক ঘটনা ওখানেই শেষ হয়ে যাওয়াতে তিনি যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারলেন, সেই সুরেই ঘটনাটি লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি, যেখান থেকে তার অসহায়ত্বের প্রমাণ মেলে।

এবোরিজিনদের ব্যাপারে টেঞ্চের ধারণা ক্রমশঃ পরিবর্তিত হয়েছে, এবং তা খুবই চিত্তাকর্ষক ও টেকসই এক ক্রমবিবর্তন। শুরুতে তার প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন সমাজ-সংস্কৃতির মানুষকে দেখলে সবাই সাধারণতঃ যেমন ধারণা পোষণ করে, ঠিক তেমনি। প্রথমে খানিকটা ভয়, অথবা এইসব অস্থিরমতি, হিংসাত্নক ও যাযাবর শ্রেণীর লোকেদের ব্যাপারে খানিকটা অবজ্ঞাসূচক ধারণা থেকে শুরু করে টেঞ্চ আস্তে আস্তে উঠে এলেন সেই পর্যায়ে, যেখানে তিনি তাদের অনেককে ব্যক্তিগতভাবে জানলেন এবং সন্মান করলেন। ১৭৯১ সালে তিনি যখন সিডনী ছাড়েন, ততদিনে বেশ কয়েকজন এবোরিজিনের সাথে তার বেশ শক্ত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।

এবোরিজিনদের ব্যাপারে ওয়াটকিন টেঞ্চের প্রাথমিক যে ধারণা ও পর্যবেক্ষণ, তা সম্ভবতঃ খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ, মনে রাখা দরকার যে, উপনিবেশ স্থাপনের প্রথম ছয় মাসে তাদের সাথে ইউরোপীয়ানদের যোগাযোগ-লেনদেন হয়েছে মাত্রই অল্প কয়েকবার। এই সময়ের মধ্যে যে কয়বার তাদের সাথে সাক্ষাত বা যোগাযোগ হয়েছে, তার বেশ অনেকগুলোই সমাপ্ত হয়েছিল সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। বস্তুতঃ এই ছয় মাসে সব মিলিয়ে এবোরিজিনালরা ১৭ জন ইউরোপীয়ানকে হত্যা অথবা গুরুতর আহত করেছিল, যাদের মধ্যে গভর্নর ফিলিপও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যদিও ইউরোপীয়ানদের তরফে প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানোর আগ পর্যন্ত এবোরিজিনদের কেউই মারা যায় নি বা গুরুতরভাবে আহতও হয় নি।

আরাবানু’কে অপহরণপূর্ব্বক তুলে আনার পর থেকেই ইউরোপীয়ানদের সাথে এবোরিজিনদের যোগাযোগের ধরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। গভর্নর ফিলিপ একজন স্থানীয় আদিবাসীকে বন্দী করতে চেয়েছিলেন, কারণ আদিবাসীদের সাথে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনের অন্য সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তাছাড়া তিনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই নতুন জনবসতি টেকসই হবে কি না, তা অনেকখানি নির্ভর করছে আদিবাসীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের উপরে। টেঞ্চ জানতেন যে অনেকটা মরিয়া হয়ে নেওয়া এই তরীকায় দুটো সংস্কৃতির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সম্ভাবনার এস্পার -ওস্পার কিছু একটা হয়ে যাবে – এটা হয় কাজ করবে, নয়তো এতে উলটা ফল হবে। আরাবানুর মাধ্যমেই টেঞ্চ প্রথমবারের মত একজন এবোরিজিনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলেন, এবং তাদের প্রতি তার মনোভাবে গভীর পরিবর্তন আসল। ঠিক এই সময় থেকেই টেঞ্চের লেখনীতে আমরা দেখি যে আরাবানু, কোলবি, বেনেলঙ এরা সবাই উলঙ্গ, কালো অসভ্য থেকে ধীরে ধীরে জটিল চিন্তাভাবনার অধিকারী মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে। পোর্ট জ্যাকসনে তার অবস্থানের শেষ পর্যায়ে অবশেষে টেঞ্চ তাই লিখলেন, “শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ দুনিয়ার সবখানেই এক – তা হোক লন্ডনের পল মলে, অথবা নিউ সাউথ ওয়েলসের জঙ্গলে।”

আরাবানু ছিল রাশভারী প্রকৃতির, এবং খানিকটা শক্ত মনের মানুষ; স্বভাবে ভদ্র এবং বাচ্চাদের প্রতি খুবই দয়ালু, যা তাকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিল। অন্যদিকে বেনেলঙ, যাকে ওয়াটকিন টেঞ্চ লিখেছেন বেনেলন নামে, ছিলেন তেজস্বী স্বভাবের। আবেগী, নির্ভীক এবং সুযোগসন্ধানী – সে ছিল তার সমাজের মানুষ এবং বহিরাগত উপনিবেশিকদের মধ্যে একটা স্বাভাবিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় জুতসই একটা চরিত্র। সে ইউরোপীয়ানদেরকে বেশ ভালমতই বাজিয়ে দেখে, এবং টেঞ্চ স্পষ্টতঃই তাকে দেখে বেশ মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি লিখেছেনঃ

“আমাদের ধারণানুযায়ী বেনেলনের বয়স হবে আনুমানিক ২৬ বছর, বেশ লম্বা, শরীরের গঠন শক্তপোক্ত এবং মুখচ্ছবি ভাবলেশহীন, যা দেখলে তাকে বেপরোয়া কিম্বা প্রতিহিংসাপরায়ণ বলে মনে হয়। বেশ দ্রুতই সে সব জড়তা ত্যাগ করে এমন ভাণ করা শুরু করল, যেন সে তার এই নতুন অবস্থায় বেশ খুশী। তার মনের জোর ছিল নিশ্চিতভাবেই সাধারণের চেয়ে অনেকখানি বেশি। সে আমাদের আচার-ব্যবহার এবং ভাষা এই দুইয়ের সম্পর্কেই জ্ঞানার্জন করেছিল তার পূর্বসুরীদের থেকে অনেক দ্রুত। সে স্বেচ্ছায় নানা তথ্য সরবরাহ করত, গাইত, নাচত এবং লম্ফ-ঝম্প করত, তাদের সমাজের বিভিন্ন সংস্কার ও আচার-ব্যবহার সম্পর্কে বলত, এবং তার পরিবারের অর্থনীতির বিষয়েও আমাদেরকে বিশদভাবে বলত। ভালবাসা এবং যুদ্ধই সম্ভবতঃ তার সবচেয়ে পছন্দের দুটো বিষয়, এবং এই দুই লাইনেই সে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার জীবনে।”

যে সকল ঘটনা ইউরোপীয়ানদেরকে খারাপভাবে উপস্থাপন করে, তেমন ঘটনার বর্ণনা দিতেও টেঞ্চ দ্বিধা বোধ করেন নি। তিনি লিখছেন যে, হকসবুরী নদীতে এক অভিযানের সময় ইউরোপীয়ানরা যখন গুলি করে একটা হাঁস মেরেছিল, বোলাডেরি সাঁতরে গিয়ে সেই হাঁস তুলে আনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বেশ কয়েকদিন ধরেই এই অভিযাত্রীর দল হাঁস ও পাখি শিকার করছিল, এবং নিজেদের জন্য সুস্বাদু হাঁসগুলো রেখে এবোরিজিনদের জন্য কেবল কাক ও চিলগুলো বরাদ্দ করা হচ্ছিল। এখান থেকেই প্রতীয়মান হয় যে আদিবাসীরা ইংরেজদের জাতিভেদ প্রথাকে কতটা অপছন্দ করত, যে প্রথায় এমনকি সবচেয়ে যোগ্য এবোরিজিনালকেও অনিবার্যভাবে সমাজের সবচেয়ে নীচের স্তরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তারা অবশ্য অন্যের হাতে এভাবে হেনস্থা হতে রাজী হয় নি। উলটো তারা সুযোগ পেলেই অস্ট্রেলিয়ার জলা-জঙ্গলে ইউরোপীয়ানদেরকে নাকাল হতে দেখে হেসেছে ও ভেংচি কেটেছে। যখন পরিশ্রান্ত ইউরোপীয়ানরা (যাদেরকে এবোরিজিনদের মালামালও বহন করতে হয়েছিল) সেই সব কৌতুকে ক্ষিপ্ত হতো, এবোরিজিনরা তাদেরকে ব্যঙ্গ করে ডাকত ‘গোনিন পাত্তা’ নামে, যার অর্থ মল-ভক্ষক।

অন্যদিকে, টেঞ্চের লেখনীতে গভর্নর ফিলিপের সাথে আরাবানুর খাবারের দৃশ্য হকসবুরী নদীতে অভিযানের ঠিক বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। যদিও তখনো ইউরোপিয়ান অপহরণকারীদের সাথে তার পরিচয় মাত্রই কয়েক ঘণ্টার, আরাবানু সেই নৈশভোজে নিজেকে বেশ ভালভাবেই মানিয়ে নিয়েছিল – অন্যদেরকে মনোযোগ সহকারে দেখে সে খাবার ও ন্যাপকিন সামলানো শিখে নিয়েছিল। তার একটা মাত্র ভুল হয়েছিল, এবং সে ভুলও সে একাধিকবার করে নি, আর তা হলোঃ একবার চেয়ারে হাত মুছা। তবে দ্বিতীয় খাবারের পরে তার আচরণ বেশ অবাক করেছিল সবাইকে, কারণ সে বার আরাবানু খাবারের শেষে জানালা দিয়ে তার প্লেট ফেলে দিতে উদ্যত হয়েছিল, যেভাবে লোকে গাছের পাতা বা বাকল জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। উপনিবেশে প্লেটের সংখ্যা ছিল হাতেগোণা কয়েকটি মাত্র। এই দুই সংস্কৃতির মাঝে যে ফারাক, তা এর আগে এত প্রকটভাবে আর কিছু দিয়েই প্রতিভাত হয় নি।

এটা একটা অবাক করার মতন ব্যাপার যে, তাদের নিজ নিজ অবস্থানের স্বভাবজাত সংকট থাকা সত্বেও ফিলিপ ও আরাবানু অথবা টেঞ্চ ও বেনেলঙের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল। নিঃসন্দেহে এই সমীকরনের একটা নিয়ামক ছিল এই যে, তখনো ইউরোপীয়ানরা ও এবোরিজিনরা সীমীত সম্পদের জন্য তীব্রভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করে নি। ইউরোপীয়ানরা তখনও তাদের জাহাজে করে আনা মালামাল থেকেই খাওয়াদাওয়া করছিল, অন্যদিকে এবোরিজিনালদের জমি তখনো বেদখল হয় নি। এই কারণে এই দুই গোষ্ঠী একে অন্যের উপরে নির্ভরশীল ছিল না, এবং তাদের প্রত্যেকের মর্যাদাই বহাল ছিল। এর পরে যখন থেকে চাষাবাদকারী ও পশুপালনকারীরা এবোরিজিনদের জমির উপরে ব্যাপকভাবে ভাগ বসাতে শুরু করল, তখন থেকেই উচ্ছেদ ও নির্ভরশীলতার মত অবক্ষয়ের সূচনা হল।

এটা একটা অবাক করার মতন ব্যাপার যে, তাদের নিজ নিজ অবস্থানের স্বভাবজাত সংকট থাকা সত্বেও ফিলিপ ও আরাবানু অথবা টেঞ্চ ও বেনেলঙের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পেরেছিল। নিঃসন্দেহে এই সমীকরনের একটা নিয়ামক ছিল এই যে, তখনো ইউরোপীয়ানরা ও এবোরিজিনরা সীমীত সম্পদের জন্য তীব্রভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করে নি।

নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে ব্রিটেনে ফেরার অব্যবহিত পরেই টেঞ্চ বিয়ে করেন আনা মারিয়া সার্জেন্টকে, ১৭৯২ সালের অক্টোবর মাসে। সম্ভবতঃ নিজেদের সন্তানসন্ততি না হওয়ায় তারা আনা’র বোনের চার অনাথ সন্তানকে দত্তক নেন এবং তাদেরকে নিজের সন্তান হিসেবেই লালন পালন করেন। অল্পদিন পরেই টেঞ্চ ফরাসীদের সাথে নেপোলনীয় যুদ্ধে কর্মরত হন, এবং আলেক্সান্ডার নামক জাহাজে ক্যাপ্টেন রিচার্ড রডনি বাই’এর অধীনে যুদ্ধ করার সময় এক রক্তাক্ত সংঘর্ষে তিনি বন্দী হন ১৭৯৩ সালের ৬ই নভেম্বর তারিখে। বন্দী বিনিময় প্রকল্পের আওতায় তিনি মুক্তি পান ১৭৯৫ সালের মে মাসে।

১৮০২ সালে টেঞ্চ সাগরে চাকুরী শেষ করেন এবং তখন থেকে তিনি শুধুমাত্র স্থলে পোস্টিং নেন। ১৮২৭ সালে তিনি লেফট্যানান্ট জেনারেল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ৭ই মে ১৮৩৩ সালে ডেভেলপোর্টে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, ততদিনে তার নামের পাশে অলিখিতভাবে ‘ভদ্রলোক’ খেতাব জুড়ে গেছে।

————————–

ওয়াটকিন টেঞ্চের ব্যক্তিত্বের অনেক দিক অষ্টাদশ শতকের চেয়ে বরং বর্তমান শতাব্দীর সাথেই বেশি মানানসই। তারপরেও, তাকে আমাদের কালের নৈতিকতা ও সংবেদনশীলতা দিয়ে বিচার করাটা ঠিক হবে না। এবোরিজিনদের প্রতি তার যে মনোভঙ্গী, কিম্বা নিউ সাউথ ওয়েলসের উপনিবেশে অষ্টাদশ শতাব্দীর নিষ্ঠুর শাস্তিদান পদ্ধতির সংস্কারে তার যে উচ্চকণ্ঠ, তা আজকের দিনের মানুষের মতামতের সাথে মিলে যায়, আর এ কারণে তিনি প্রশংসার্হ, সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকের দিনের মাপকাঠিতে আরো অনেক ব্যাপারে সেদিন তিনি কেন উপযুক্ত আচরণ করেন নি, সেই বিবেচনায় তার সমালোচনা করা খুবই সহজ, এবং অবশ্যই সেটা ভুল হবে।

আমরা প্রায়শঃই আমাদের নিজের সুবিধামত করে ইতিহাস নতুন ভাবে লিখি বা লিখাই। যে সকল জাতির শুরু সময়ের সুদূর অতীত গহবরে রহস্যের জালে ঘেরা, তাদের ক্ষেত্রে না হয় সেটা মানা যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হাতে আছে গভর্নর ফিলিপ, জন হোয়াইট, ওয়াটকিন টেঞ্চ এবং অন্য আরো অনেকের লেখা গ্রন্থাদি। সেগুলো না পড়ার কোন কারণই আমাদের নেই। “অস্ট্রেলিয়ার কোন ইতিহাস নেই” এই হাস্যকর ও অবাস্তব জনশ্রুতির স্রেফ একটাই কারণঃ আমরা আমাদের ইতিহাস জানতে তেমন আগ্রহী নই। সত্য কথাটা এই যে, অস্ট্রেলিয়ার মত এত সুলিখিত ও সুসংরক্ষিত দালিলিক প্রামাণ্য ইতিহাস অন্য কোন জাতির নেই। আমি আশা করি যে ওয়াটকিন টেঞ্চের এই অসাধারণ মাইলফলক লেখা অনেক বেশি বেশি মানুষ পড়বেন, যাতে আমাদের দেশের শৈশবের দিনগুলিতে আসলে কি ঘটেছিল তা আমরা আরো ভালভাবে অনুধাবন করতে পারি।

————————–

এই বইতে ১৭৮৯ সালে প্রকাশিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay বইটির তৃতীয় সংস্করন এবং ১৭৯৩ সালে প্রকাশিত A Complete Account of the Settlement at Port Jackson বইটির প্রথম সংস্করন ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়াটকিন টেঞ্চের বেশ কিছু বানান আধুনিক কালের সাথে মিল রেখে বদলিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিছু সাধারণ ভুলভ্রান্তি শুধরে নেওয়া হয়েছে (যেমন, টেঞ্চ লিখেছেন ডে পেরুজ, যা আসলে হবে লা পেরুজ), এবং কখনো সখনো দু’একটা নোট জুড়ে দেওয়া হয়েছে পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে। টেঞ্চের নিজের দেওয়া নোটগুলোকে তারকা (এস্টারিক বা *) দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। টেক্সট পাবলিশিং কোম্পানী এর সংস্করনের সম্পাদক টিম ফ্ল্যানারির নোটগুলোকে ^ চিহ্ন দ্বারা বুঝানো হয়েছে। অনুবাদকের নোটগুলোকে স্রেফ ‘অনুবাদকের নোট’ লিখেই বুঝানো হয়েছে। এর বাইরে, বলতে গেলে, টেঞ্চের লেখনী অবিকল রয়ে গেছে এই অনুবাদে।

[310 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0