পৌরাণিক সৌন্দর্যের জগৎ

By |2016-06-24T18:29:14+00:00জুন 24, 2016|Categories: ব্লগাড্ডা|1 Comment

একেকটা বই যেন ভিন্ন জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। বাতাস ও নদীর মতোই আমরা প্রবাহিত হচ্ছিলাম পৃথিবীর পথে পথে। নিজেদের মনে হচ্ছিল দেশের নয়, পৃথিবীর নাগরিক। এটাও একটা চিঠি। হয়তো কাউকে লেখা অথবা নিজের কাছে নিজেকে লেখা চিঠি

মানবী
কখনও কখনও মানুষ না অদ্ভুত সব ভাবনার ঘোরে পড়ে যায়! কেমনভাবে যেন তা জীবনের গভীর অনুভবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তখন অতীত, ভবিষ্যৎ আর বর্তমানটা সেলুলয়েডের ফিতার মতো আগুপিছু হতে থাকে। ভাসতে থাকে সময়-নদীর ভেতর দিয়ে।

সেই কিশোরবেলায় একাকী দাঁড়িয়ে বহমান নদীকে দেখতাম আর দিগন্তের পাড় থেকে শীতলক্ষ্যা ছাড়িয়ে মেঘনার উচ্ছ্বাস ভেসে আসত- পৌরাণিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকা এক জগৎ। কখনও কখনও দাঁড়িয়ে এত ঘোরের মধ্যে ডুবে যেতাম, মনে হতো এই নদী দিয়ে কিছু দূর গেলেই ধলেশ্বরী আর বুড়িগঙ্গার মিলনস্থল। আরও গেলে মেঘনা; মাঝেমধ্যেই প্যারাবন। রোদে ঝিকিমিক এক পৃথিবী। এর পরই বঙ্গোপসাগর। আর সাগর থেকে সাগরে বাধাহীন এক জগৎ।

মানবী, এই বাধাহীন জগতে কেটেছে জীবনের অনেকটা সময়। সে রকম সময়ের এক বিকেল। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে কয়েক কিশোর। প্রথমে স্কুলের গেট, তারপর সেবা প্রকাশনীর বই দিয়ে সাজানো দোকানের সামনে থামা। তারপর শত বছরের প্রাচীন রেল স্টেশন, ততোধিক পুরনো চায়ের বিজ্ঞাপনের চত্বর পার হয়ে লঞ্চঘাট- বন্দর ও ৫ নম্বর ঘাটের মাঝামাঝি। শীতলক্ষ্যা নদীর জল তখনও স্বচ্ছ। জল ঠেলে একটা ছোট লঞ্চ এসে ভিড়ত। লঞ্চটি আসত প্রতিদিন। লোকে বলত মেরিনের লঞ্চ। যে জায়গা থেকে আসত, তার নাম মেরিন ডিজেল।

পরবর্তী সময়ে তা হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি বা বিআইএমটি। সেটা ছিল সবুজে ঘেরা এক মায়াবী পৃথিবী। এই লঞ্চে শুধু আমরা কয়েকজন বাড়ি ফিরতাম। বিকেল ৫টার মধ্যেই ফিরতে হতো। লঞ্চের কেবিন ছিল। তারপরও ছাদে উঠে বসতাম। মৃদু বাতাসে সময়টা অদ্ভুুত লাগত। দুপুর শেষ হয়ে আসা এক বিকেল। হালকা রোদের পৃথিবী। সঙ্গে থাকত সবাই মিলে কেনা গরম শিঙ্গাড়া।

এখানেই আমরা বই সংগ্রহের ক্লাব গড়ে তুলি। যারা বই পড়তে উৎসাহী, কিছুটা আগ্রহবোধ করি, তারাই এতে যুক্ত হয়েছিলাম। সময়টা ছিল ১৯৭৭-৭৮। স্কুলে পড়তাম সবাই। নাম দিয়েছিলাম বিআইএমটি সাহিত্য ক্লাব। সবাই মিলে চাঁদা দিলাম। যারা একটু বড় তারা বই কিনতে গেল। মেরিনের সেই লঞ্চে। কিছুক্ষণ পরপর একেকটা ট্রিপ। সকাল ১০টার ট্রিপে বড়রা গেল। আমরা ১২টার সময় অধীর অপেক্ষায় বসে আছি। ওরা ফিরে এলো ২০-২৫ টাকার চাঁদায় অদ্ভুত সব বই কিনে। সবই পুরনো বই কিন্তু অসাধারণ! আলেক্সান্দর দুমার থ্রি মাসকেটিয়ার্স, টোয়েন্টি ইয়ার্স আফটার, রবার্ট লুই স্টিভেনশনের ট্রেজার আইল্যান্ড ও ড. জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড, ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবলের সংক্ষেপিত সংস্করণ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড়, কুয়াশা ও মাসুদ রানা সিরিজসহ অনেক বই। তার মধ্যে ‘ভিজে বেড়াল’ নামে একটি বই ছিল। ওই বইটাকে কেন্দ্র করে লাইন দিলাম। একজন পড়ছে, অন্যেরা ঘিরে ধরেছে! সে কী গভীর উৎসাহ! দুপুরের রোদে নদীর পাড়ের কাশফুলের দোলায়মান ছন্দ।

পাশেই বয়ে যেত আঁকাবাঁকা ত্রিবেণী খাল; আমরা বলতাম তিরিবিনি খাল। শীতলক্ষ্যা থেকে আঁকাবাঁকা ধারায় মিশে যেত পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সাথে। আর খালের দুটো ধারাই যেন ইতিহাসের স্রোত হয়ে মেঘনার দিকে ভেসে যেত।

একেকটা বই যেন ভিন্ন জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের ইচ্ছা হচ্ছিল দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়তে, নাবিক হতে, গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কে জানতে। কোথা থেকে এসেছি, কোথায়-বা যাব ইত্যাদি। বাতাস ও নদীর মতোই আমরা প্রবাহিত হচ্ছিলাম পৃথিবীর পথে পথে। নিজেদের মনে হচ্ছিল দেশের নয়, পৃথিবীর নাগরিক।

নদীর দু’পাশে মায়া দিয়ে ঘেরা জুট মিল, বাংলো ধরনের বাড়ি। আর কখনও জেলে ও বেদে নৌকার সারি। বাঁশের ভেলায় চড়ে আগন্তুকদের কোথায় যেন মিলিয়ে যেতে দেখতাম! মনের মধ্যে থাকত দুরন্ত কৈশোরের কোথাও হারিয়ে যাওয়ার ঘোর। প্রবল বিতৃষ্ণা নিয়ে স্কুলে গেলেও আসাটা ছিল স্বপ্নের। মেঘনা হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোনো দ্বীপে। অথবা নক্ষত্রে যাওয়ার হাতছানি।

মানবী, নক্ষত্রে যাওয়ার স্বপ্ন আমাকে সব সময় হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতা শব্দটি প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল কৈশোরে। গ্রহান্তরের আগন্তুকের মতো কল্পবিজ্ঞানের দুই একটি বই ছাড়া এ শব্দগুলো বাংলায় কোথাও আমি দেখতে পাইনি তখন। পরবর্তীকালে কার্ল সাগান, ফ্রাঙ্ক ড্রেক, নিকলাই কার্ডাশেভ, ইভান ইয়েফ্রেমভের কাজগুলো জানার পর এ শব্দের অর্থ আরও স্পষ্ট হয়েছিল। জানতে পেরেছিলাম মানবিক সমাজের গড়ে ওঠা, তার সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা, তার শক্তি খরচের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে একটা সভ্যতার গতি-প্রকৃতি নির্ধারিত হওয়ার কথা।

ছেলেবেলায় স্কুল থেকে আসার পথে নারায়ণগঞ্জ পৌর পাঠাগারে যেতাম। বর্তমানে তার নাম চুনকার পাঠাগার হয়েছে। সেখানে শিশু বিভাগে দুটো বিশাল কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো দেখতাম অনেক ইংরেজি বই। সেগুলোতে ছিল গ্রহ-নক্ষত্রের ঝকঝকে সুন্দর সব ছবি। কৈশোরের চোখ দিয়ে মুগ্ধ হতাম আর সময়ের স্রোতে ভাসতাম। পরবর্তীকালে ইউএস সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও রুশ গ্রন্থাগারে এনসাইক্লোপেডিক গ্রন্থগুলো অসাধারণ এক জগতে এনে ফেলল। আবার উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীটা অনেক বড়। অনুভব করলাম সাগরের বেলাভূমিতে দাঁড়ানো নিজেকে। এখনও সেই ঘোর কাটেনি। কখনও মেঘনার বিশালতা, কখনও যমুনার স্রোতে মিশে গিয়ে খুঁজে চলেছি ৪০ হাজার প্রজন্মের অবিরাম সংগ্রামরত এক মানব-প্রবাহ; পৃথিবীর সেই মানবিক পথ। তাই না

One Comment

  1. কাজী রহমান জুন 26, 2016 at 2:48 পূর্বাহ্ন - Reply

    বরাবরের মতই অপূর্ব উপস্থাপনা। পড়তে পড়তে ছবি দেখার মত এমন চমৎকার লেখা আসিফ লিখবেন না তা’ই কি হয় 🙂

    কখনও কখনও দাঁড়িয়ে এত ঘোরের মধ্যে ডুবে যেতাম, মনে হতো এই নদী দিয়ে কিছু দূর গেলেই ধলেশ্বরী আর বুড়িগঙ্গার মিলনস্থল। আরও গেলে মেঘনা; মাঝেমধ্যেই প্যারাবন। রোদে ঝিকিমিক এক পৃথিবী। এর পরই বঙ্গোপসাগর। আর সাগর থেকে সাগরে বাধাহীন এক জগৎ।

    বইগুলোই শুধু পারতো অদ্ভুত সুন্দর সব স্বপ্ন দেখাতে। ভাবতে শেখাতো। আরো আরো জানতে শেখাতো।

    সত্যিই ঐ সময় পর্যন্তও বই খুঁজে যথেষ্ট কাড়াকাড়ি করে পড়তে হতো। কাছে গ্রন্থাগার না থাকা এলাকার ছেলে মেয়েদের জন্য বেশ দুঃখই লাগতো।

    বেশ ক’দিন পর এখানে আবার দেখতে পেয়ে ভালো লাগলো।

    শুভেচ্ছা।

Leave A Comment