২০০৬ সালে চীনের জিলিন প্রদেশের রাজধানী চাংচুন এর শ্রমিকরা নতুন একটি সেচ-প্রকল্পের জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে বীভৎস এক ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি হল। উর্বর কালো মাটির ভাঁজে জড়িয়ে ছিল অসংখ্য মানবদেহের বিচ্ছিন্ন সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। মাটির এক মিটার গভীরে পাওয়া গেল স্তূপাকারে সজ্জিত হাজারো মানব কঙ্কাল। আরও গভীরে খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেল রান্নার জ্বালানী কাঠের মতো সজ্জিত হাড়গোড়ের স্তূপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকার কৌতূহলী লোকজনের ভিড় জমে গেল। গণকবরের ব্যাপ্তি দেখে সবাই তখন ভীতসন্ত্রস্ত। অনেকেই ভেবেছিল,এগুলো হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়কার জাপানী আগ্রাসনে নিহত চীনাদের মৃতদেহ। কেবল সেখানে উপস্থিত এক বৃদ্ধ স্মৃতিশক্তি হাতড়ে আসল সত্যটি অনুধাবন করলেন। গণকবরটি আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মাও সেতুংয়ের কমিউনিস্ট পার্টি ও চিয়াং কাইশেকের নেতৃত্বাধীন জাতীয়বাদীদের মধ্যকার পুনরায় শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন।

১৯৪৮ সাল। কমিউনিস্টরা তখন চাংচুন শহরে অবস্থানকারী জাতীয়তাবাদীদের একটি সৈন্যদলকে পাঁচ মাস ধরে প্রায় অনাহারে,অভুক্ত অবস্থায় অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। বিজয় এল এক বিশাল মূল্য চুকানোর পর। অন্তত এক লক্ষ ষাট হাজার মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারায়। বিজয় অর্জনের পর কমিউনিস্টরা অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ কোনও ধরণের নূন্যতম ফলক-চিহ্ন ছাড়াই মাটিচাপা দেয়। দশকের পর দশক ধরে চলা জাতীয়তাবাদীদের শোষণ থেকে তথাকথিত শান্তিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের প্রোপাগান্ডার ফসল হল,আজকের দিনে এসে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনক্ষমতা দখলের বলি অগণিত নিরপরাধ মানুষের স্মৃতি চীনের জনমানস থেকে হারিয়ে গিয়েছে।(১)

চীনের মহা-প্রাচীরের উত্তরে মাঞ্চুরিয়ার বিস্তীর্ণ সমতলভূমির মধ্যখানে অবস্থিত চাংচুন নেহাতই ছোট একটি ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। তবে ১৮৯৮ সালে রেললাইন চালু হবার পরেই দ্রুত পরিস্থিতি পালটে যায়। চাংচুন হয়ে ওঠে জাপানীদের পরিচালিত দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়ান রেলওয়ে এবং রাশিয়ানদের মালিকানাধীন চায়নিজ ইস্টার্ন রেলওয়ের জংশন। মাঞ্চুকুও নামে জাপানীদের একটি পুতুল রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে চাংচুন দ্রুতই সমৃদ্ধ এক শহরে পরিণত হয়।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে এসে শহরটি সোভিয়েতদের দখলে আসে। সোভিয়েত বাহিনীর ব্যাপক লুঠতরাজে শহরের কলকারখানা থেকে শুরু করে এর প্রাসাদ-সম বাড়িগুলো শীঘ্রই শ্রীহীন হয়ে পড়ে। জাতীয়তাবাদীরা নিয়ন্ত্রণ নেবার আগে এপ্রিল,১৯৪৬ সাল অবধি চাংচুন রেড আর্মির নিয়ন্ত্রণে ছিল। দুই মাস পরেই গৃহযুদ্ধের সূচনা,মাঞ্চুরিয়া আবারও রক্তাক্ত ভূমিতে পরিণত হল। উত্তর থেকে নেমে আসা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কমিউনিস্ট বাহিনী চাংচুনের সাথে দক্ষিণের জাতীয়বাদীদের শাসনাধীন শহরগুলোর সংযোগ রক্ষাকারী রেলপথ অকেজো করে দেয়।

১৯৪৮ সালে এসে লিন বিয়াও এর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টরা চাংচুনের দিকে অগ্রসর হল। ঝানু যুদ্ধবিশারদ হিসেবে পরিচিত লিন বিয়াও নির্মম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে ঝেং ডনগুও এর নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদীরা আত্মসমর্পণ করবে না,তখন তিনি পুরো শহরকে অভুক্ত রাখার পরিকল্পনা নিলেন। ৩০ মে,১৯৪৮ তারিখে লিন বিয়াও এর পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা এলঃ “চাংচুনকে একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হোক”।(২)

চাংচুনের অভ্যন্তরে প্রায় পাঁচ লক্ষ সাধারণ মানুষ আটকা পড়ে ছিল। এদের অনেকেই ছিল অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা শরণার্থী যারা অগ্রসরমান কমিউনিস্টদের হাত থেকে পালাতে দক্ষিণে বেইজিং অভিমুখে যাত্রা করছিল,কিন্তু রেল-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চাংচুনে আটকা পড়ে যায়। শীঘ্রই শহরে কারফিউ জারি হল,রাত আটটা থেকে সকল পাঁচটা অবধি চলাচলের অনুমতি ছিল না। কর্মক্ষম প্রতিটি পুরুষকে পরিখা খনন করতে বাধ্য করা হল। কারোরই শহর ত্যাগের অনুমতি ছিল না। দেহ-তল্লাশিতে বাধা দিলে তৎক্ষণাৎ গুলি করার ডিক্রি জারি হল। এতো কিছুর পরেও অবরোধের প্রথম সপ্তাহগুলোতে বন্ধুত্বপূর্ণ এক পরিবেশ বজায় ছিল,যেহেতু আকাশ থেকে রসদ-সরবরাহ অব্যাহত ছিল। অপেক্ষাকৃত অবস্থা-সম্পন্নরা মিষ্টি ও তামাক বিতরণ করত এবং আহতদের জন্য চায়ের দোকানে অবকাশ যাপনের ব্যবস্থা ছিল।(৩)

কিন্তু খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নিলো। পুরো শহরটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত হল। দুই লক্ষ কমিউনিস্ট যোদ্ধা প্রতিরক্ষা পরিখা খনন করল এবং শহরের পানি-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হল। দুই ডজন বিমান-বিধ্বংসী কামান এবং ভারী কামান সারাদিন ধরে শহরে বোমাবর্ষণ করতো। জাতীয়তাবাদীরা শহরকে ঘিরে তিনটি স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গঠন করল। দুই শিবিরের মাঝখানের বিস্তীর্ণ এলাকা শীঘ্রই দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল। (৪)

১২ জুন, ১৯৪৮ তারিখে চিয়াং কাইশেকের পাঠানো এক বার্তায় শহরত্যাগের অনুমতি মিলল। শত্রুর গোলার আঘাতের ভয় যদি নাও থাকতো,তবু আকাশপথে পুরো একটি শহরের রসদ সরবরাহের সক্ষমতা তার বিমানগুলোর ছিল না। অন্যদিকে কমিউনিস্টদের বিমান-বিধ্বংসী কামানের গোলা এড়াতে বিমানগুলোকে তিন হাজার মিটার উচ্চতায় উড়তে হতো। আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত অনেক রসদই জাতীয়তাবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরে পড়তো। দুর্ভিক্ষ এড়াতে জাতীয়তাবাদীরা শহরবাসীকে গ্রামের দিকে চলে যেতে উৎসাহিত করে। শহরের খাবারের বন্দোবস্ত অপ্রতুল হওয়ায় শহর ত্যাগকারীদের আবার ফিরে আসার অধিকার ছিল না। শহর ত্যাগের পূর্বে প্রত্যেককে কঠোর তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হতো। পরিমাণে অপ্রতুল হওয়ায় ধাতব আসবাবপত্র যেমন হাঁড়িপাতিল,সোনা,রুপা এমনকি লবণ বহনেরও অধিকার ছিল না।

শরণার্থীদের এরপর সেনাবাহিনী থেকে পলাতক সৈনিকদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন দস্যুদলের নিয়ন্ত্রিত এলাকা অতিক্রম করতে হতো। অসহায় শরণার্থীরা দস্যুদের নিপীড়নের স্বীকার হতো। দস্যুরা অনেকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতো,অনেকের ঘোড়া ছিল,গোপন সংকেত ব্যবহার করে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতো। শরণার্থীদের অনেকেই তাদের মূল্যবান গয়না কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখত। তবে ধরা পড়ে গেলে তৎক্ষণাৎ দস্যুরা গুলি চালাত। কখনো তাদের সকল কাপড়-চোপড় কেড়ে নেওয়া হতো। অনেকে নিজের মূল্যবান সামগ্রী শিশুদের প্রস্রাবমাখা ময়লা কাপড়চোপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখত এই আশায় যে,দস্যুরা হয়তো দুর্গন্ধের কারণে সেগুলো তল্লাশি করবে না।(৫)

খুব কম শরণার্থীই কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রণ-রেখা পার হতে পারতো। লিন বিয়াও কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা এবং চার মিটার গভীর পরিখার নিয়ন্ত্রণ-রেখা বরাবর প্রতি ৫০ মিটার অন্তর একজন করে প্রহরী নিযুক্ত করেছিলেন। বহির্গমনের প্রতিটি রাস্তা বন্ধ ছিল। মাওয়ের কাছে পাঠানো এক বার্তায় লিন বিয়াও জানান:“আমরা শরণার্থীদের বাধা দিচ্ছি এবং ফিরে যেতে বাধ্য করছি। প্রথমদিকে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে,কিন্তু পরবর্তীতে যখন দুর্ভিক্ষ চরম পর্যায়ে পৌঁছল তখন শরণার্থীরা দলে দলে সারাদিন ধরে ভিড় জমাতে লাগল। যখন আমরা তাদের ফিরিয়ে দিলাম,শরণার্থীরা তখন শত্রু ও আমাদের অবস্থানের মধ্যবর্তী এলাকায় জড়ো হতে লাগল”।

লিন এর বয়ানে কমিউনিস্ট রেখা অতিক্রমে শরণার্থীদের কতটুকু মরিয়া ছিল সে চিত্র ফুটে ওঠে:

শরণার্থীরা আমাদের সৈন্যদের সামনে নতজানু হয়ে তাদের রাস্তা দেবার জন্য প্রার্থনা করতো। অনেকে নিজেদের সন্তানদের আমাদের কাছে রেখে ফিরে যেত,অন্যরা খুঁটিতে ঝুলে আত্মহত্যা করতো। অনেক সৈন্যরা এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে নিজেদের আর সামলে রাখতে পারে নি। বুভুক্ষু মানুষের সামনে নতজানু হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতো এই বলে যে,‘আমরা শুধু আমাদের দায়িত্ব পালন করছি’। অন্যরা গোপনে কিছু শরণার্থীদের পালাবার রাস্তা করে দেয়। আমরা সৈন্যদের এই গোপন তৎপরতা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এরমধ্যে সৈন্যদের অন্য একটি আচরণও আবিষ্কৃত হয়েছে। সৈন্যরা অনেক শরণার্থীকে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন ও গুলি করছে,এদের অনেকে এর মধ্যে মারা গেছে।(এই ঘটনায় আহত ও নিহতের পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই)

অর্ধ-শতাব্দী পরে,সেখানে দায়িত্ব-পালনকারী এক সৈন্য ওয়াং জুনু এর ভাষ্যে সেখানকার পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায়:

“আমাদেরকে বলা হয়েছিল ওরা আমাদের শত্রু এবং মৃত্যুই ওদের প্রাপ্য’।

মাত্র পনের বছর বয়সে ওয়াংকে কমিউনিস্টরা সেনাবাহিনী যোগদান করতে বাধ্য করে। অবরোধের সময় ওয়াং জুনু অন্য সৈন্যদের সাথে মিলে শরণার্থীদের পিছু হটে যেতে বাধ্য করতেন।(৬)

জুনের শেষে এসে প্রায় তিরিশ হাজার মানুষ দুই শিবিরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে আটকা পড়ল। কমিউনিস্টরা একদিকে শরণার্থীদের রাস্তা ছাড়তে রাজি না,অন্যদিকে জাতীয়তাবাদীরা তাদের শহরে ফিরতে বাধা দিচ্ছিল। প্রতিদিন শতশত মানুষ মারা যাচ্ছিল। দুই মাস পরে প্রায় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষ এই মৃত্যু উপত্যকায় আটকে পড়ল। অনাহার থেকে বাঁচতে তারা ঘাস এবং গাছের লতাপাতা খেতে শুরু করছিল। চারদিকে অসংখ্য লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। প্রখর সূর্যালোকে লাশগুলোর পেট ফুলে-ফেঁপে ওঠে। বেঁচে যাওয়া এক শরণার্থীর ভাষ্যে:

“চারদিকে শুধু পচা লাশের তীব্র গন্ধ”

।(৭)

শহরের ভেতরকার পরিস্থিতি কিছুটা ভাল ছিল। শহররক্ষী সেনার রসদ ছাড়াও শহরবাসীর জন্য প্রতিদিন ৩৩০ টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন ছিল। যদিও আকাশপথে পাঁচ-ছয়টি উড়োজাহাজের সহায়তায় সর্বোচ্চ ৮৪ টন খাদ্যশস্য সরবরাহ করা সম্ভব ছিল,কখনোবা এর থেকেও অনেক কম। শহর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতেই মনোযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। আগস্ট মাসে চিয়াং কাইশেক শহরের ব্যবসায়ীদের সব ধরণের ব্যক্তিগত বাণিজ্য বন্ধ করার আদেশ দিলেন,এই আদেশ অমান্যের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। কিছুদিন পরেই জাতীয়তাবাদী সৈন্যরা শহরবাসীদের উপর চড়াও হল,গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাদের খাবার জোর করে কেড়ে নেওয়া হতো। এরপর খাবার হবার পালা সেনাবাহিনীর ঘোড়াদের,তারপর কুকুর, বিড়াল এবং পাখিদের। সাধারণ মানুষ পচা সরগুম এবং ভুট্টা খেতে শুরু করল। সেগুলোও শেষ হয়ে যাবার পরে গাছের বাকল। অন্যরা পোকামাকড় এবং লেদার বেল্ট খেত। মানুষের মাংস ভক্ষণেও অনেকের অরুচি ছিল না,চোরাই বাজারে প্রতি পাউন্ড মানুষের মাংস এক ডলার বিশ সেন্ট হিসেবে বিক্রি হতো। (৮)

গণ-আত্মহত্যার ঘটনা অহরহই ঘটছিল। দুর্দশা থেকে বাঁচতে পুরো পরিবার একসাথে আত্মহত্যা করতো। প্রতিদিন রাস্তার ধারে ডজনের উপর মানুষ মারা যেতো। বেঁচে যাওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শী জাং ইংগুয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,“আমরা শুধু মরে যাবার অপেক্ষায় ছিলাম”। জাং এর ভাইবোন এবং প্রায় সকল প্রতিবেশী সেই দুর্ভিক্ষে মারা যায়। আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ঝালিন বলেন,

আমাদের হামাগুড়ি দেওয়ার শক্তি ছিল না। এক ছোট কুঁড়েঘরের দরজা খোলা দেখে ভেতরে প্রবেশ করে দেখি ডজনের উপর লাশ বিছানা ও মাটিতে ছড়িয়ে আছে। বিছানাতে একজন বালিশে মাথা দিয়ে বিশ্রামের ভঙ্গিতে শুয়ে আছে। একটি মেয়ে তার শিশুকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল,মনে হচ্ছিল ওরা যেন ঘুমাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা তখনও সময় জানিয়ে যাচ্ছিল।”(৯)

”।

হেমন্ত আসতেই তাপমাত্রা কমে গেল,শহরের অধিবাসীরা এবার উষ্ণ থাকতে হিমশিম খাচ্ছিল। জ্বালানীর চাহিদা মেটাতে মেঝে,ছাদ এবং কখনো পুরো দালানই ভেঙ্গে ফেলা হতো। গাছ কাটা শুরু হল, এমনকি সাইনবোর্ডও জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রাস্তার পিচ খুড়ে ফেলা হল। ধ্বংসযজ্ঞ এক ক্ষয়রোগের মতো শহরতলী থেকে মূল শহরের প্রাণকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ল। শেষ অবধি চল্লিশ শতাংশ আবাসিক ভবনই জ্বালানির ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেল। এর সাথে যোগ হল ভারী গোলাবর্ষণের উপদ্রব। গোলাবর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষ কুঁড়েঘরগুলোতে আশ্রয় নিলো যেগুলো ইতিমধ্যে আবর্জনা আর গলিত মৃতদেহে ভরে গিয়েছিল। জাতীয়তাবাদীরা অন্যদিকে শহরের ব্যাংক অফ চায়নার বিশাল শক্ত কংক্রিট দেওয়ালের পিছনে আশ্রয় নিলো।(১০)

অনেক সৈন্যই রণেভঙ্গ দিয়ে পালাল। শরণার্থীদের গ্রহণ না করলেও কমিউনিস্টরা এই পলায়নকারী সৈন্যদের সাদরে নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করে নিলো। তাদেরকে ভালো খাবার এবং আরাম-আয়েশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল। প্রতিদিন উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে শহরের সৈন্যদের বিদ্রোহ কিংবা পালিয়ে আসার জন্য উৎসাহ দেওয়া হতো। গ্রীষ্মের শেষে সৈন্যদের পালিয়ে যাবার হার বৃদ্ধি পেল। এর কারণ হল সৈন্যদের রেশনে টান পড়েছিল। প্রত্যেক সৈন্য প্রতিদিন মাত্র তিনশ গ্রাম চাল ও ময়দা পেতো।(১১)

অবরোধ ১৫০ দিন ধরে বজায় ছিল। অবশেষে ১৬ অক্টোবর,১৯৪৮ তারিখে চিয়াং কাইশেক জেনারেল ঝেং ডংগুওকে শহর খালি করে দক্ষিণে বেইজিং অভিমুখী রেললাইন বরাবর প্রথম শহর সেনইয়াং এর দিকে অগ্রসর হবার নির্দেশ দিলেন। ঝেংকে প্রশ্ন করা হয়,“যদি চাংচুয়ানের পতন ঘটে,তবে আপনি কি মনে করেন পিকিং( ১৯৪৯ সালের আগে বেইজিংয়ের পূর্বনাম) নিরাপদ থাকবে”? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝেং প্রত্যুত্তর দেন,“চীনের কোনও এলাকাই আর নিরাপদ থাকবে না”।(১২)

মাঞ্চুরিয়ার যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে চাংচুয়ানের পতনকে চীনের ইতিহাসের বইগুলোতে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও এর জন্য ব্যাপক মূল্য চুকাতে হয়েছে। প্রায় এক লক্ষ ষাট হাজার বেসামরিক মানুষ কমিউনিস্টদের দ্বারা অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রাণ হারায়। এই ঘটনার তথ্য সংগ্রাহক পিপলস লিবারেশন আর্মির একজন লেফটেন্যান্ট ঝাং ঝেংলং এর মতে,

“চাংচুন এর পরিণতি অনেকটা হিরোশিমার মতো। প্রায় একই সংখ্যক মানুষ মারা যায়। পার্থক্য শুধু সময়েই। হিরোশিমাতে যেখানে লেগেছিল মাত্র নয় সেকেন্ড, চাংচুনে সেখানে দীর্ঘ পাঁচ মাস”।(১৩)


***প্রবন্ধটি ফ্রাংক ডিকোটার রচিত বই “দ্য ট্রাজেডি অফ লিবারেশন, এ হিস্টরি অফ দ্য চায়নিজ রেভোলিউশন ১৯৪৫-৫৭” অবলম্বনে রচিত।

উৎসনির্দেশঃ
(১) Jiang Yanyan, ‘Changchun yixia shuiguandao gongdi wachu shuqian ju shigu’ (Thousands of skeletons excavated at a construction site), Xin wenhua bao, 4 June 2006.
(২) Zhang Zhenglong, Xuebai xuehong (Snow is white but blood is red), Hong Kong: Dadi chubanshe, 1991, p. 441.
(৩) ‘Northern Theater’, Time, 2 June 1947.
(৪) Cable by Li Keting to Chiang Kai-shek, 11 June 1948, Guoshiguan, file 002080200330042.
(৫) Order from Chiang Kai-shek, 12 June 1948, Guoshiguan, file 00206010000240012; Fred Gruin, ‘30,000,000 Uprooted Ones’, Time, 26 July 1948.
(৬) Zhang, Xuebai xuehong, p. 469; Wang Junru interviewed by Andrew Jacobs, ‘China is Wordless on Traumas of Communists’ Rise’, New York Times, 1 Oct. 2009.
(৭) Cable from Li Keting, 24 June 1948, Guoshiguan, file 002080200331025; cable from Li Keting, 14 Aug. 1948, Guoshiguan, file 002090300188346; Duan Kewen, Zhanfan zishu (Autobiography of a war criminal), Taipei: Shijie ribaoshe, 1976, p. 3.
(৮) Cable to Chiang Kai-shek, 26 Aug. 1948, Guoshiguan, file 002020400016104; order from Chiang Kai-shek to Zheng Guodong, 17 Aug. 1948, Guoshiguan, file 002080200426044; ‘Time for a Visit?’, Time, 1 Nov. 1948; Henry R. Lieberman, ‘Changchun Left to Reds by Chinese’, New York Times, 7 Oct. 1949.
(৯) Cable from Li Keting, 13 July 1948, Guoshiguan, file 002090300187017; Zhang Yinghua interviewed by Andrew Jacobs, ‘China is Wordless’; Song Zhanlin interviewed by Zhang Zhenglong, Xuebai xuehong, p. 474.

(১০) Zheng Dongguo, Wo de rongma shengya: Zheng Dongguo huiyi lu, Beijing: Tuanjie chubanshe, 1992, ch. 7; Duan, Zhanfan zishu, p. 5; Wang Daheng, Wo de bange shiji (The first half-century of my life), online publication, Qing pingguo dianzi tushu xilie, pp. 7–8; see also Zhang Zhiqiang and Wang Fang (eds), 1948, Changchun: Wei neng jichu de jiaxin yu zhaopian (1948, Changchun: The family letters and photos that were never sent), Jinan: Shandong huabao chubanshe, 2003.
(১১) ‘Time for a Visit?’, Time, 1 Nov. 1948; Zhang, Xuebai xuehong, p. 446; cable by Li Keting to Chiang Kai-shek, 2 Sept. 1948, Guoshiguan, file 002090300191009.

(১২) ‘Time for a Visit?’, Time, 1 Nov. 1948.

(১৩) Zhang, Xuebai xuehong, p. 467.

[654 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0