আমার মা সিরাজী বিটি~

meছুটির দিনে সকালে আমার ৭৪ বছর বয়সী মা’র ঘরটা গুছিয়ে দিচ্ছিলাম। বাসার সকলে যে যার কাজে ব্যস্ত। বিছানার চাদর-বালিশের কাভার বদলে দেয়া, ঘরের মেঝে পরিস্কার ইত্যাদি। মা তখন বাথরুমে। দরজা ভেড়ানো। আটকা পড়তে পারেন, এমন আশঙ্কায় তার দরজায় ছিটকিনি তোলা নিষেধ।
সেখান থেকেই কথা হলো দু-একটি। জানালেন স্নান করবেন না। আজ নাকি শরীরটা তেমন ভালো নেই। ইত্যাদি।

এরপর ঘন্টা দুয়েক পর আমি চা করে নিয়ে ডাকতে গিয়ে দেখি তখনো তিনি বাথরুমে। স্নান করারও কোনো শব্দ নেই। আমি যতোবারই ডাকি ওনাকে, উনি সাড়া দেন, এই এখনই বেরুচ্ছি। বেরুচ্ছি তো। এমনি করে আরো ১০-১২ মিনিট কাটলো। শেষে আমি থাকতে না পেরে লজ্জা-শরম বাদ দিয়েই বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।

দেখি হাই কমোড থেকে ওঠার চেষ্টা করেও বুড়ি আর উঠতে পারছেন না। খানিকটা ভর দিয়ে উঁচু করে উঠে আবার বসে পড়ছেন। শরীরে হাল্কা জ্বর। আমি তাকে ধরে ধরে বিছানায় এনে শুইয়ে দেই। ডাক্তারের পরামর্শে তাকে জ্বরের অষুধ দেই। মাথাটা পানি দিয়ে মুছে দেই। রান্নার খালাও ওনার পরিচর্যা করেন।

ডাক্তারের পরামর্শে তার জন্য পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে হাল্কা পাইপের একটি লাঠি কিনে আনি। সেই থেকে আমার মা’র লাঠি এখন সার্বক্ষণিক সঙ্গী। আর প্রায়ই সময়ই জ্বর থাকে তার। সব সময় ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকেন। গৃহকর্মে আর আগের মতো মন নেই।

অথচ এই কিছুদিন আগেও এই বয়সে সব কাজ এক হাতে সামলেছেন। কাজ না করলে নাকি তার ‘ভাল লাগে না’ এমন কথা সব সময় বলতেন। ছিলেন হিন্দি-বাংলা টিভি সিরিয়াল দেখার পোকা। এখন সব পাট বুঝি চুকেছে। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছেন।

অনেক তল্লাসী করেও ডাক্তার তার তেমন অসুখও খুঁজে পান না। অরুচিটুকু ছাড়া।

সেই থেকে বুকের ভেতর কাঁটা বিঁধে আছে। অষ্টপ্রহর চিনচিনে এক ব্যাথা। দুঃস্বপ্ন দেখে বার বার জেগে ওঠা। কোনো বছরই মা দিবস আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। এবারও তাই। তবু এবার ফেসবুকে বন্ধুজনের মা’কে নিয়ে করা নানান পোষ্ট আমাকে বিষন্ন করে।

অথচ সেই ছোটবেলায় দেখছি, আমার রেডিও অফিসের কেরানী মা সৈয়দা আসগারী সিরাজী খুব ভোরে উঠে পাঁচটি ছেলেমেয়ের নাশতা, দুপুরের খাবার– সব তৈরি করে ছুট লাগাতেন কর্মস্থলে। এরপর বিকেলে এসে আবার সবার জন্য দুই চুলায় বড় বড় হাঁড়িতে রান্নাবান্না। বালতি ভর্তি কাপড় ধোয়া। ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা ইত্যাদি।

জ্ঞান হওয়া পরে বুঝেছি, আমার মা বাস ভাড়ার সামান্য পয়সা বাঁচানোর জন্য খর রোদের ভেতর হেঁটেই অফিস যাতায়ত করতেন। বাসায় ফেরার সময় বাজার করেও ফিরতেন। সে এক কঠিন লড়াই হে।
আমার মা’র পরিবারটি শিক্ষা-দীক্ষা, গান-বাজনায় খুব অগ্রসর। নানু সৈয়দ ইসাহাক সিরাজী ছিলেন সিরাজগঞ্জের নামকরা স্কুল মাস্টার। তার বড়ভাই– কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। তিনি ছিলেন কাজী নজরুলের বন্ধু। আর আমার নানু বাড়ির নাম ‘বাণীকুঞ্জ’ নামটিও নজরুলের দেয়া। দুজনেই তুরস্ক যুদ্ধে একসাথে লড়েছিলেন। আর ইসমাইল সিরাজীর ছেলে, মা’র চাচাতো ভাই আসাদুল্লাহ সিরাজীও ছিলেন কবি, গীতিকার। অনেক সুন্দর গজল লিখেছেন তিনি।

একসময় আমার মা ছিলেন ডাক সাইটের সুন্দরী। তখনকার সিনেমা নায়িকা মধুমালা’র সঙ্গে মিলিয়ে মা’র নাম রাখা হয় ‘মধু’। আমার নানি আদর করে মা’কে ‘সিরাজী বিটি’ (সিরাজীর মেয়ে) বলে ডাকতেন। নানু’র উৎসাহে আমার মা স্কুল-কলেজে পড়ার সময় গান-বাজনা করতেন। পাকিস্তান আমলে মঞ্চ নাটকও করেছেন। এই করতে গিয়েই আমার বাবার সঙ্গে তার পরিচয়। আমার বাবা বিয়ের পর কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে মা’কে মডেল করে অনেক সাদাকালো ছবি তুলেছিলেন।

আমার বাবা আজিজ মেহের (৮৪) সব সময় কৃষক রাজনীতি নিয়ে কাটিয়েছেন ব্যস্ত সময়। বহু বছর জেল খেটেছেন। এক সময় বিখ্যাত নকশাল নেতা ছিলেন। সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। সংসারে কখনো মন দেননি। আর পুরো সংসারের ঘানি টেনেছেন মা একাই।

বাবা এখন সারাক্ষণ বই পড়ে অবসর জীবন কাটে তার। এই বয়সেও তার মাথাটি খুব পরিস্কার।

ছোটবেলায় দুষ্টুমীর জন্য, পড়ায় ফাঁকি দেয়ার জন্য, এমনই সব বিবিধ কারণে মা’র কাছে অনেক বেতের বাড়ি খেয়েছি। কখনো হাত পাখার বাড়ি। আবার কখনো ভাত রান্নার কাঠের হাতা’র বাড়িও (স্থানীয় ভাষায় – নাকড়)।

সেই সব কথা মনে করলে এখনো চোখ ভিজে যায়। আমার মা তার জীবন উৎসর্গ করেছেন ছেলেমেয়েদের জন্য। বিনিময়ে পাননি কিছুই। আমরা সকলেই কেমন নিখুঁত স্বার্থপর, যন্ত্র মানুষ। আসলে মায়েরা বোধহয় এমনই হন। আর যুগ যুগ ধরে তার ছেলেমেয়েরাও।…

5 Comments

  1. নশ্বর জুন 11, 2016 at 6:41 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটি অসাধারণ ভালো লাগলো।

  2. গীতা দাস জুন 6, 2016 at 9:10 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটি পড়ে আমার মাকে মনে পড়লো যিনি গত ২০ ফেব্রুয়ারী আমাদের রেখে অজানায় চলে গেছেন।

  3. বিপ্লব কর্মকার জুন 5, 2016 at 8:59 অপরাহ্ন - Reply

    গভীরে ঢুকতেই শেষ, আরেক টু বড় হলে কী হতো!

  4. tuli chowdhury জুন 5, 2016 at 6:20 অপরাহ্ন - Reply

    মায়েরা এমনই হয়।তাদের ভালবাসা নিঃস্বার্থ।

  5. মনজুর মুরশেদ জুন 2, 2016 at 10:00 অপরাহ্ন - Reply

    ভাল লাগল! আপনার মা, প্রায় একই বয়সের আমার মার মতই এখনও সুন্দরী! ওনার জন্য শুভ কামনা!

Leave A Comment