অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশদের স্থাপিত বন্দীশিবিরের শৈশবের দিনলিপি অনুবাদ করছি, ওয়াটকিন টেঞ্চের মূল বই, 1789 সালে প্রকাশিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay এবং 1793 সালে প্রকাশিত A Complete Account of the Settlement at Port Jackson থেকে। অনুবাদের প্রথম কিস্তিতে বইটির পরিচিতি, লেখকের ভূমিকা এবং প্রথম চার অধ্যায় অনুবাদ করেছিলাম – যেখানে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ বন্দর থেকে জাহাজবহর ছাড়ার পরে ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ, কেপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে পৌঁছানো পর্যন্ত ঘটনাবলী এসেছে। এই কিস্তিতে আছে দুটো অধ্যায় – রিও ডি জেনিরোতে তাদের অবস্থানকাল, সেখান থেকে দক্ষিন আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের দিকে যাত্রা, কেপ অফ গুড হোপে তাদের কর্মকাণ্ড, এবং সেখান থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বোটানী বে এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা। প্রথম কিস্তি পাবেন এখানে প্রথম কিস্তি । ১৭৮৮ সালের ইংরেজী বেশ খটমটে, আধুনিক ইংরেজীর সাথে তার বেশ তফাত। ফলে আমার অনুবাদও কিছুটা খটমটে রয়ে গেল। মতামত / পরামর্শ চাই।

কয়েদী বহনকারী প্রথম জাহাজবহরের যাত্রাপথ

কয়েদী বহনকারী প্রথম জাহাজবহরের যাত্রাপথ


জাহাজ বহর রিও ডি জেনিরোতে পৌঁছানো থেকে শুরু করে কেপ অফ গুড হোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু পর্যন্ত, ব্রাজিলের উপরে কিছু সাধারণ মন্তব্যসহ

ব্রাজিল দেশটার সম্পর্কে ইউরোপের মানুষের ধারণা খুবই ভাসাভাসা। পর্তুগীজরা রাজনৈতিক কারণেই সম্ভবতঃ সবকিছু খোলাসা করে বলে না। ইংল্যান্ডে ব্রাজিল সম্পর্কে যে সব ভৌগলিক প্রকাশনা বেরোয়, তারা কোত্থেকে থেকে এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করে, তা আমার অজানা। তবে তারা যে ভয়ানক রকমের ভুল এবং অসম্পূর্ণ, তাতে সন্দেহ নেই একেবারেই।

সেন্ট সেবাস্টিয়ান শহরটি পোতাশ্রয়ের পশ্চিমাংশে, খানিকটা নীচু ও অস্বাস্থ্যকর জায়গায় অবস্থিত, এবং চারপাশ উঁচু পাহাড়ে ঘেরা থাকায় মুক্ত বাতাসের চলাচল নেই বললেই চলে। এর ফলে সেখানকার অধিবাসীদের মাঝে মাঝেই সংক্রামক ও দুর্গন্ধময় রোগে ভুগতে হয়। শহরটা বেশ বড়সড়। ক্যাপ্টেন জেমস কুক এই শহরকে লিভারপুলের সমান বলে মন্তব্য করেছিলেন; কিন্তু আমার ধারণা হলো, ক্যাপ্টেন কুক যখন লিখেছিলেন, সেই ১৭৬৭ সালের লিভারপুল আজকের লিভারপুলের আয়তনের দুই তৃতীয়াংশও ছিল না। আয়তনে সেন্ট সেবাস্টিয়ান হয়তো চেস্টার কিম্বা এক্সটারের সমান হবে, এবং লোকসংখ্যায় এই দুই শহরের চেয়ে অবশ্যই অনেক বড়। সুনির্মিত ঋজু সড়কগুলো সমকোনে পরস্পরকে ছেদ করেছে; রাস্তার পাশে চওড়া ও সুনির্মিত ফুটপাত রয়েছে, এবং রাস্তার দু’পাশ নানা রকম দ্রব্যসামগ্রীর অসংখ্য দোকানপাটে ভরা – যেখানে পকেটে পয়সা থাকলে একজন ভ্রমণকারীর কোন ইচ্ছাই সম্ভবতঃ অপূর্ণ থাকার কথা নয়। ভাইসরয়ের প্রাসাদটি শহরের কেন্দ্রে সমুদ্র সৈকত থেকে খানিকটা দূরে অবস্থিত। প্রাসাদটি একটি দীর্ঘ অনুচ্চ ভবন, যার বাহ্যিক চেহারায় খুব একটা দৃশ্যমান আড়ম্বর নেই, যদিও ভেতরে বেশ কিছু প্রশস্ত ও নয়নাভিরাম মহল আছে। গীর্জা এবং মঠগুলো সাজ-সজ্জায় জাঁকজমকপূর্ণ এবং সংখ্যায় অগণ্য। প্রায় প্রতিরাতেই কোন না কোন গীর্জা বা মঠে আলোকসজ্জা করা হয় তাদের পৃষ্ঠপোষক সাধুসন্তদের সন্মানে, এবং পানি থেকে দেখলে সেই আলোকসজ্জাকে অপরুপ মনে হয়। আমরা তো প্রথম দিকে এই সব উতসবকে কোন বড় আকারের সার্বজনীন অনুষ্ঠান ভেবে ভুল করেছিলাম। প্রায় প্রতি রাস্তার মোড়েই কুমারী মেরীর ছোট মুর্তি বসানো আছে, যা সন্ধ্যায় বৃত্তাকারে সাজানো আলোকমালায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে। পথচারীরা মাঝেমাঝে সেসব মূর্তিতে থামে, প্রার্থনা করে এবং উচ্চস্বরে গান গায়। বস্তুতঃ এই দেশে যতটা উদ্দীপনাসহকারে ধর্মকর্ম পালন করা হয়, সেটা আমাদের মতন আগন্তুকদের বিস্ময় উদ্রেক না করে পারে না। জনসাধারণের একটা বড় অংশেরই সম্ভবতঃ গীর্জায় আসা এবং প্রার্থনা করা ছাড়া অন্য কোন কাজ-কর্ম নেই। এই সব প্রার্থনানুষ্ঠানে তারা বেশ সাজগোজ করে আসে – হাতে সুদৃশ্য টুপি, চুলের পরিচর্যার জন্য আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্রে ভরা কাঁধে ঝোলানো একটি ব্যাগ, এবং একটি ছোট তরবারী নিয়ে। এমনকি ছ’বছর বয়সী ছেলেদেরকেও দেখা গেল এই সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে সজ্জিত হয়ে ঠাঁটেবাটে ঘুরে ফিরে বেড়াতে। শুধুমাত্র প্রার্থনার সময় ছাড়া মহিলাদের দেখা পাওয়া ভার, এবং যখন সে দেখা মিলেই যায়, ইংল্যান্ড থেকে সদ্য আগত যাত্রীদের কাছে থেকে সেই পর্তুগীজ সুন্দরীরা তাদের সৌন্দর্য্যের বেশুমার প্রশংসা পেয়ে থাকে। সত্য কথা বলতে গেলে, সেন্ট সেবাস্টিয়ানের লোকেরা অপরিচিতদের সাথে আলাপ শুরু করার সময় কিম্বা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের সময় ফুলের তোড়া নিয়ে আসবার যে প্রথার কথা শুনেছি, এমনকি ডাক্তার শোলেন্ডার এবং ক্যাপ্টেন কুকের জাহাজের আরো একজন ভদ্রলোক যে প্রথা এখানে দেখেছেন বলে লিখে গেছেন, সে প্রথার অস্ত্বিত্ব দেখতে পেলাম না কোথাও, একটিবারের জন্যও। আমরা এতটাই হতভাগা ছিলাম যে, প্রতি সন্ধ্যায় পথে ঘাটে, লোকের জানালা-ব্যালকনীর আশ-পাশ দিয়ে আতিপাতি করে হেঁটে বেড়িয়েও কোন ফুলের তোড়া পেলাম না, যদিও ফুল এবং সুন্দরী কোনটারই কমতি ছিল না কোথাও!

প্রায় প্রতি রাস্তার মোড়েই কুমারী মেরীর ছোট মুর্তি বসানো আছে, যা সন্ধ্যায় বৃত্তাকারে সাজানো আলোকমালায় উজ্জ্বল হয়ে উঠে। পথচারীরা মাঝেমাঝে সেসব মূর্তিতে থামে, প্রার্থনা করে এবং উচ্চস্বরে গান গায়। বস্তুতঃ এই দেশে যতটা উদ্দীপনাসহকারে ধর্মকর্ম পালন করা হয়, সেটা আমাদের মতন আগন্তুকদের বিস্ময় উদ্রেক না করে পারে না। জনসাধারণের একটা বড় অংশেরই সম্ভবতঃ গীর্জায় আসা এবং প্রার্থনা করা ছাড়া অন্য কোন কাজ-কর্ম নেই।

সরকারী ভবনের মধ্যে শহরের প্রায় কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এক মাণমন্দিরের কথা বিশেষ করে উল্লেখ করতেই হয়। জায়গাটা জোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত নানা যন্ত্রপাতিতে মোটামুটি সুসজ্জিত বলা যায়। আমরা যখন সেখানে ছিলাম, দেখলাম কিছু স্প্যানীয় ও পর্তুগীজ গণিতবিদ তাদের নিজ নিজ সম্রাটের সম্রাজ্যের অধীন অঞ্চলগুলোর মধ্যকার সীমান্ত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে নানা হিসেবপত্তরের মাধ্যমে। দুঃখের বিষয়, এই ভদ্রলোকেরা অন্ততঃ গণিতের মাঠে খুব বেশি বিষয়ে একমত হতে পারেন নি, অর্থাৎ, তারা তখন অবধি এমন কিছু খুঁজে পান নি যা দিয়ে তাদের সীমান্তবিরোধ মেটানো যায়। উল্লেখ্য যে, পর্তুগীজরা ফরাসী পরিব্রাজক ও জোতির্বিদ আবে ডে লা ক্যাইল’কে দোষারোপ করেন এই বলে যে, তিনি ফ্রান্সের রাজার নির্দেশে এই এলাকার দ্রাঘিমাংশ পূর্বদিকে ৪৫ মাইল বেশি সরিয়ে নির্ণয় করেছিলেন। এই দোষারোপের পেছনে কতটা রাজনৈতিক শত্রুতা আছে আর কতটা সত্য আছে, তা বলতে আমি অপারগ।

১৭৭০ সাল পর্যন্ত এই উপনিবেশের প্রয়োজনীয় আটার প্রায় পুরোটাই ইউরোপ থেকে আনতে হতো। সে বছর থেকেই এখানকার অধিবাসীরা গম ও ভুট্টা উতপাদনে এতটা সফলতা দেখিয়েছে যে, এখন তারা নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত আটা উৎপাদন করতে পারে। শস্য উতপাদনের প্রধান এলাকাটি রিও ডি জেনিরোর চারপাশে ৩২ ডিগ্রী দক্ষিন অক্ষাংশে অবস্থিত। সেখানে গমের ফলন এতটাই ভাল হয় যে, প্রতি বুশেল বীজ থেকে ৭০-৮০ বুশেল গম পাওয়া যায়। কফিও আগে পর্তুগাল থেকে এখানে আনতে হতো। এখন এত পরিমাণে উৎপাদন হয় যে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অনেকখানি কফি রপ্তানীও করা হয়। তবে এই দেশের প্রধানতম শস্য হলো আখ। এখানকার লোকেরা যে এখনো আখ থেকে ভাল মানের রাম বানানোর কৌশল আয়ত্ব করতে পারে নি, তার প্রমাণ পাওয়া গেল নিউ সাউথ ওয়েলসে ব্রিটিশ সৈন্যদলের জন্য রাম কিনতে গিয়ে। পোর্ট জ্যাকসনের সেনানিবাসে ব্যবহারের জন্য আমরা বেশ ভাল পরিমাণে রাম কিনলাম, যদিও সেগুলোর গন্ধ ততটা সুবিধার ছিল না।

প্রায় শতাধিক বছর ধরে ব্রাজিলের রাজধানী ছিল সেন্ট সালভাডোর, ১৭৭১ সাল থেকে সেটা বদলে যায়; রাজধানী চলে আসে সেন্ট সেবাস্টিয়ানে। সে সময় মাদ্রিদ ও লিসবনের কোর্টের মধ্যে যে উপনিবেশিক যুদ্ধ চলছিল, তার সূত্র ধরেই এই রাজধানী-পরিবর্তন ঘটে। আর যদি রাজধানীর অবস্থান বিবেচনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটা বড় নিয়ামক হয়, তবে এই সেন্ট সেবাস্টিয়ানের চেয়ে ভাল জায়গা খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে। এখানকার প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবুহ্যকে ভেদ করে আক্রমণ করাটা ভয়ানক রকমের কঠিন; বাকী সব মিলিয়ে এই জায়গাটা প্রায় দুর্ভেদ্য।

দিবারাত্রি এখানে অগন্তুকদের কানে বাজে গীর্জা ও মঠের ঘণ্টার টুং-টাং ধবনি, এবং তার চোখ ধার্মিকদের সারিবদ্ধ আনাগোনা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়। এই সব ভক্তদের ভক্তি এবং চপলতা দুটোই সমান তালে দৃশ্যমান; কখনো কখনো একটা আরেকটাকে ছাড়িয়ে যায়। বলা হয় যে, যদি তুমি তোমার ছেলেকে সৈনিকবৃত্তিতে বিতৃষ্ণ বা আগ্রহহীন করে তুলতে চাও, তাহলে তাকে লন্ডনে বার্ষিক কুচকাওয়াজের দিনে দিনভর বেসামরিক সৈন্যদলের কুচকাওয়াজ দেখাও। আর যদি তুমি তোমার ছেলেকে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অসারতা দেখাতে চাও, তাহলে তাকে এই দেশের (ব্রাজিল) আলস্য, অজ্ঞতা আর ধর্মান্ধতা দেখাও।

এখানে অবস্থানরত পর্তুগীজ সৈন্যদলের বেহাল অবস্থা এবং সেনানিবাসে তাদের প্রতি কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুর অবহেলা দেখে দুটো কথা মনে হলো আমার। এক, ধারণা করা যায় যে পর্তুগীজ সরকার এই অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত, আর দুই, তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশটি হারানোর কোন ঝুঁকি আছে বলে তারা মনে করে না। অন্যথায় তাদের সেনাদের প্রতি সরকারের এহেন মন্দ আচরণের আর কি ব্যাখ্যা থাকা সম্ভব? এই সৈন্যদলকে তিন বছরের চাকুরীর কথা বলে এখানে আনা হয়েছিল এবং তিন বছর পরে তাদের ইউরোপে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। সেভাবেই তারা তাদের পারিবারিক ও গৃহস্থালী নানা বিষয়ের নিস্পত্তি করে তারপর এখানে এসেছিল। অথচ আজ বিশ বছর হয়ে গেল তারা এখনো এখানে, হতভাগার মত নতমস্তকে ও নীরবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। সরকারের সাথে তাদের সে চুক্তি ছিল, সেটা সরকার ভেঙে ফেলেছে। আমি একদিন সন্ধ্যায় এক পর্তুগীজ অফিসারের সাথে হাঁটছিলাম। যখন এই প্রসঙ্গে কথা উঠল, আমি বললাম যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে এ ধরণের প্রতারণামূলক আচরণ করা হলে সংসদ সেটার তদন্ত করতো। সে আমার হাত ধরে পরম আকুলতায় বলে উঠল, “হ্যাঁ, কিন্তু তোমাদের দেশ তো স্বাধীন দেশ! আর আমাদের দেশ……।” তার মুখে যে কথা সরে নি, তার আবেগ সে কথাটি ঠিকই আমাকে বলে দিল।

সেনাবাহিনীর কথা যখন উঠল, আরেকটা কথা না বলে পারছি না। ক্যাপ্টেন কুক বলেছিলেন যে, তিনি দেখেছেন এই দেশের সাধারণ অধিবাসীরা সৈন্যদলের কোন পদস্থ কারো সামনে আসামাত্রই তার সামনে মাথা অবনত করে সন্মান প্রদর্শন করে তোষামোদের ভঙ্গীতে, যার অন্যথা হলে সেই অফিসার তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন তৎক্ষণাৎ। আমি এই মন্তব্যের কোন সত্যতা পেলাম না এখানে। সামরিক-বেসামরিক লোকেদের মধ্যে কুশল বিনিময় বা ভদ্রতার ব্যাপারগুলো স্বাভাবিকই দেখলাম, কোন বাড়াবাড়ি চোখে পড়ল না। যদি ক্যাপ্টেন কুকের মন্তব্য সত্য হতো, তাহলে আমি বলব, যে জাতি এমন অপমানকর দম্ভভরা কর্তৃত্বকে বিনাপ্রশ্নে মেনে নেয়, তারা আসলে দাস হবারই যোগ্য।

শহরের পুলিশ ব্যবস্থা বেশ ভাল বলে মনে হল। সৈন্যরা মাঝেমাঝেই রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে, এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথা খুব একটা শোনাই যায় না। গীর্জা আগে খুনীকে নিরাপদ আশ্রয় দিত; এখন সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ব্যক্তিগত আক্রোশে কাউকে ছুরি মারার মত ঘৃণ্য অপরাধ প্রায় ঘটে না বললেই চলে। অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে অবশ্য উন্নতির ধারা ক্ষীণ; কোথাও কোথাও তা পর্বতপ্রমাণ বাধার সম্মুখীন, এবং সামগ্রিকভাবে জ্ঞানদীপ্ত ও মানবিক নীতি অবলম্বন না করা হলে সে সব সমস্যার আশু সমাধান হবে না। দিবারাত্রি এখানে অগন্তুকদের কানে বাজে গীর্জা ও মঠের ঘণ্টার টুং-টাং ধবনি, এবং তার চোখ ধার্মিকদের সারিবদ্ধ আনাগোনা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়। এই সব ভক্তদের ভক্তি এবং চপলতা দুটোই সমান তালে দৃশ্যমান; কখনো কখনো একটা আরেকটাকে ছাড়িয়ে যায়। বলা হয় যে, যদি তুমি তোমার ছেলেকে সৈনিকবৃত্তিতে বিতৃষ্ণ বা আগ্রহহীন করে তুলতে চাও, তাহলে তাকে লন্ডনে বার্ষিক কুচকাওয়াজের দিনে দিনভর বেসামরিক সৈন্যদলের কুচকাওয়াজ দেখাও। আর যদি তুমি তোমার ছেলেকে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অসারতা দেখাতে চাও, তাহলে তাকে এই দেশের (ব্রাজিল) আলস্য, অজ্ঞতা আর ধর্মান্ধতা দেখাও।

আমরা এখানে থাকাকালীন যে খাতির-যত্ন পেয়েছি তার একটা অংশের কারণ অবশ্যই এখানকার কর্তৃপক্ষের কাছে গভর্নর ফিলিপের মর্যাদা ও সন্মান। গভর্নর ফিলিপ অনেক বছর ধরে পর্তুগীজ নৌবাহিনীতে জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেছেন, এবং এই শহরেই তিনি একটা যুদ্ধজাহাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সেই আগের জানাশোনার ফলেই এই শহরে আমাদের এত জামাই-আদর, যা সাধারণতঃ অচেনা আগন্তুকের কপালে জোটার কথা নয়।

পয়লা সেপ্টেম্বরের মধ্যেই আমরা এখান থেকে যাত্রার জন্য প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেলাম। সেই দিন আমাদের মধ্যে থেকে যতবেশী সংখ্যক সৈন্য সম্ভব, ততজন একসাথে ব্রাজিলের মহামান্য ভাইসরয়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেল। তার সাথে আমাদের আগেই পরিচয় হয়েছিল। বিদায়ের দিন এবং এর আগে যতদিন তার কাছে আমরা দেখা করতে গেছি, ততদিনই তিনি আমাদেরকে যথোপযুক্ত অভিনিবেশ ও বিবেচনা সহকারে সন্মান দেখিয়েছেন। আমরা এখানে থাকাকালীন যে খাতির-যত্ন পেয়েছি তার একটা অংশের কারণ অবশ্যই এখানকার কর্তৃপক্ষের কাছে গভর্নর ফিলিপের মর্যাদা ও সন্মান। গভর্নর ফিলিপ অনেক বছর ধরে পর্তুগীজ নৌবাহিনীতে জাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেছেন, এবং এই শহরেই তিনি একটা যুদ্ধজাহাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সেই আগের জানাশোনার ফলেই এই শহরে আমাদের এত জামাই-আদর, যা সাধারণতঃ অচেনা আগন্তুকের কপালে জোটার কথা নয়। আমরা এই দেশের অভ্যন্তরভাগে যখন তখন সংক্ষিপ্ত সফর করার অনুমতি পেয়েছিলাম, এবং যখন আমরা এ ধরণের সফরে যেতাম অথবা শহরে হেঁটে বেড়াতাম, প্রতিবারেই তাদের সৈন্যদলের একজন পদস্থ কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গী হতেন। শুধু তাই নয়, আরেকটা বিরক্তিকর চল ছিল এই যে, আমারা যখন যেখানে যাচ্ছি, সেখানকার উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারের সহকারীদের কাছে আমাদের নিজেদের নাম, পদবী, পৌঁছানোর সময়, এসব লিখে দিতে হতো। সাথে একজন স্থানীয় সামরিক অফিসার থাকাটা অবশ্য মাঝে মাঝে কাজে আসতো, বিশেষ করে দোকানপাটে কেনাকাটার সময়ে বিক্রেতাদের দু’নম্বরি ঠেকাতে। দোকানদারেরা সাধারণতঃ বিদেশী ক্রেতা দেখলে জিনিসপত্রের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে হাঁকে, আর সেক্ষেত্রে একজন স্থানীয় সামরিক অফিসার থাকলে আসল দামটা জানতে সুবিধা হয়। তারা আমাদেরকে এভাবে সঠিক দামে কেনাকাটায় সাহায্য করত।

ব্রাজিলের উর্বর মাটি এবং মনোরম আবহাওয়ায় যা যা ভাল জিনিস পাওয়া যায়, তার মওজুদ ভালমত আমাদের জাহাজে ভরে নিয়ে চৌঠা সেপ্টেম্বর সকালে আমরা রিও ডি জেনিরো ত্যাগ করলাম। ভবিষ্যতের অভিযাত্রীরা নিশ্চিতভাবেই তাদের মওজুদ পুনরায় ভরে নেওয়ার জন্য এই শহরের উপরে নির্ভর করতে পারেন। উল্লেখ করে বলতে গেলে চিনি, কফি, রাম, পোর্ট ওয়াইন, চাল, সাগু, তামাক, গৃহস্থালি আসবাবপত্রের জন্য ভাল মানের কাঠ, ইত্যাদি। মুরগীর দাম এখানে খুব একটা শস্তা নয়, তবে সরবরাহ প্রচুর। বড় আকারের শুকর দামে শস্তা এবং পাওয়া যায় যথেষ্ট পরিমাণে। বাজারে কসাইয়ের দোকানের মাংস পাওয়া যায় অঢেল পরিমাণে, এবং নানা প্রকারের শাক-সবজী পাওয়া যায় বলতে গেলে পানির দামে। এখানে যে ইয়াম (এক ধরণের আলুজাতীয় খাদ্যশস্য। বাংলাদেশের অনেক স্থানে মেটে আলু বা রাঙা আলু নামে পরিচিত। মিষ্টি আলুর কিছু কিছু জাতকেও ইয়াম বলা হয়ে থাকে) পাওয়া যায়, তা খুবই ভাল মানের। কমলা এত শস্তা যে ছয় পয়সায় একশ’টা পাওয়া যায়; লেবুও একই রকম শস্তা। বাজারে কলা, নারিকেল ও পেয়ারা পাওয়া যায় যথেষ্ট, তবে আনারস যে ক’টা চোখে পড়ল, তা না স্বাদে-গন্ধে ভাল, না দামে সুলভ। পয়সা খরচ করার মত যে সব রাস্তা বাতলে দিয়েছি উপরে, তা ছাড়াও প্রকৃতিবিদেরা তার সাথে যোগ করে নিতে পারেন দোকানে সাজিয়ে রাখা অসংখ্য প্রজাতির সুন্দর পাখি এবং নানা বিচিত্র পোকামাকড় ও পশু, যেগুলো দামে খুবই সুলভ, এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী।

ভবিষ্যতে যারা এই শহরে আসবেন, তাদের জন্য একটা জরুরী কথা বলে এই শহরের বিবরণ শেষ করতে চাই। পর্তুগীজরা তাদের অর্থব্যবস্থায় একটা কাল্পনিক মুদ্রা, ‘রিস’ প্রবর্তন করেছে। বিশ রিস মিলে হয় একটা ছোট তামার মুদ্রা, যার নাম ‘ভিন্টিন’, আর ষোল ভিন্টিনে এক পেটাক। যাতে ভুল না হয়, সে জন্য প্রতিটা মুদ্রার গায়ে তার ‘রিস’ সমমান লেখা আছে। ব্রিটিশ রুপার মুদ্রার সুনাম এখানে পড়ন্ত, এবং অন্য সকল মুদ্রার চেয়ে ডলার এখানে সবচেয়ে বাঞ্ছনীয় মুদ্রা।


ব্রাজিল থেকে কেপ অফ গুড হোপ পর্যন্ত যাত্রা এবং কেপ অফ গুড হোপে জাহাজ বহরের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিবরণ

রিও ডি জেনিরো থেকে কেপ অফ গুড হোপ পর্যন্ত সমুদ্রযাত্রা আমাদের যাত্রার ঠিক আগের অংশের মতই প্রশান্ত ও আনন্দময় ছিল। আমরা দক্ষিণ-পূর্বে যাত্রা করে এক দিন পরেই আমেরিকার উপকুলকে দৃষ্টিসীমার বাইরে ফেলে আসি। এই সময় থেকে ১৩ই অক্টোবরে কেপ অফ গুড হোপে পৌঁছানো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটে নি, শুধুমাত্র আমি যে জাহাজে আরোহী ছিলাম, সেই জাহাজের এক কয়েদীর আচমকা মৃত্যু ছাড়া। বেচারা দুর্ভাগ্যক্রমে হঠাতই সাগরে পড়ে গিয়েছিল। তার দিকে একটি লাইফ বেল্ট ছুঁড়ে দিয়ে এবং একটি নৌকা তার দিকে ঠেলে দিয়েও তাকে বাঁচানো সম্ভবপর হয়ে উঠে নি। এবারের যাত্রায় কিছু কিছু জাহাজে ডায়রিয়ার সামান্য প্রাদূর্ভাব দেখা দিয়েছিল, তবে সে আক্রমণ খুব একটা ভয়ংকর বা প্রাণাঘাতী হয়ে উঠে নি। প্রথমে আমরা ব্রাজিল থেকে নেওয়া পানিকে এর জন্য দায়ী ভেবেছিলাম। তবে যেহেতু সংক্রমণের মাত্রাটা বেশ কম ছিল, কাজেই সম্ভবতঃ অন্য কোন নিয়ামক এই রোগের কারণ হয়ে থাকবে।

১৩ই অক্টোবর সন্ধ্যা সাতটায় আমরা টেবিল উপসাগরে নোঙর করলাম,এবং সেই উপসাগরে নানা দেশের নানা জাহাজ দেখতে পেলাম।

কেপ অফ গুড হোপ সম্পর্কে এর আগে এত লেখা বেরিয়েছে যে, তাতে নতুন করে কিছু সংযোজন করার আর নেই। তারপরেও দু’একটা মন্তব্য যদি করতেই হয় তাহলে আমি বলব যে, সে সব বর্ণনার বেশিরভাগই অতি খোশামুদে ধরণের এবং অতিরঞ্জনের দোষে আক্রান্ত। রিও ডি জেনিরো’র সাথে তুলনায় কেপ অফ গুড হোপ অবশ্যই কিছুটা বর্ণহীন। তাছাড়া আমরা এমন এক সময়ে সেখানে পৌঁছেছিলাম, যে মৌসুমটা ওখানকার ফসলাদি এবং সাধারণ মানুষদের, বিশেষ করে কৃষকদের মেজাজ-মর্জি বুঝার পক্ষে অনুকুল ছিল না। আমরা শুনতে পেলাম যে এর ঠিক আগের মৌসুমেই ওখানে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, ফলে এখনও চারিদিকে সেই অভাবের সুর বাজছে। সেই দুর্ভিক্ষের প্রভাবে দেশের নানা প্রান্ত নানা আন্দোলনে-বিক্ষোভে ফুঁসে উঠছিল, সে সব খবর এমনকি ডাচদের স্বভাবসুলভ ঔদাসীন্যকেও নাড়া দিয়েছিল (কেপ অফ গুড হোপ বা কেপটাউন তখন ডাচদের উপনিবেশ ছিল)।

কেপ অফ গুড হোপ সম্পর্কে এর আগে এত লেখা বেরিয়েছে যে, তাতে নতুন করে কিছু সংযোজন করার আর নেই। তারপরেও দু’একটা মন্তব্য যদি করতেই হয় তাহলে আমি বলব যে, সে সব বর্ণনার বেশিরভাগই অতি খোশামুদে ধরণের এবং অতিরঞ্জনের দোষে আক্রান্ত। রিও ডি জেনিরো’র সাথে তুলনায় কেপ অফ গুড হোপ অবশ্যই কিছুটা বর্ণহীন।

এই বন্দর থেকেই আমাদের প্রস্তাবিত উপনিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় গৃহপালিত পশুর বেশীর ভাগ এবং একটা বড় পরিমাণের আটা কেনার কথা ছিল। সুতরাং এখানে নোঙর ফেলার পরে কোন সময় নষ্ট না করে গভর্নর ফিলিপ আমাদের সকল প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সম্পন্ন করার জন্য এখানকার প্রথানুযায়ী ডাচ গভর্নর মিনহির ভ্যান গ্রাফে’র অনুমতি নিতে ছুটলেন । আমাদের তরফে কেনাকাটার চাহিদা-তালিকায় কি কি ছিল তা আমি জানি না, এবং এটাও জানি না যে ডাচ গভর্নর মিনহির ভ্যান গ্রাফে কেন আমাদেরকে আংশিক অনুমতি দিয়েছিলেন। এই ভদ্রলোকের রাজনৈতিক বিশ্বাস বা ভাবনার ব্যাপারে আমি একেবারেই অজ্ঞ। তবে আমি তার ভদ্রতা এবং উদারতার যে নমুনা দেখেছি তার নিজের কার্যালয়ে, তা যদি এইখানে প্রকাশ্যে স্বীকার না করি তাহলে সেটা তার প্রতি অন্যায় হবে। মিনহির ভ্যান গ্রাফে’র মানবিকতা নিয়ে আমি যে গল্পটি শুনেছি, তাও পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করার লোভ সামলাতে পারছি না। ক্যাফ্রারিয়ার উপকুলে (ক্যাফ্রারিয়া হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বান্টু-ভাষী জনগণের আবাসস্থল। কাফ্রারিয়ার আক্ষরিক অর্থ অবিশ্বাসী বা কাফিরদের এলাকা। আধূনা বিলুপ্ত।) পাঁচ বছর আগে ডুবে যাওয়া জাহাজ ‘গ্রসভেনর ইন্ডিয়াম্যান’ এর দুর্ভাগ্যকবলিত নাবিকদলকে উদ্ধারের জন্য তিনি উত্তরোত্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আমাকে এই তথ্য দিয়েছেন কেপ অফ গুড হোপে ডাচ সেনাবাহিনীর প্রধান কর্নেল গর্ডন, এই দেশের অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে যার জানাশোনা অন্য প্রায় সকলের চেয়েই এক কাঠি উপরে। দুঃখের কথা এই যে, কর্নেলের মুখে জানতে পারলাম, দুর্ঘটনাকবলিত ওই নাবিকেরা বর্তমান দুনিয়ার সবচেয়ে জংলি জাতি কাফ্রিদের হাতে বন্দী হয়ে তাদের চেনা জগত ও বন্ধু-স্বজন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

মহামান্য গভর্নর ভ্যান গ্রাফে বসবাস করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী’র বাগানে অবস্থিত গভর্নমেন্ট হাউসে। এই বাগানটি বৃহদাকার এবং মূলতঃ এই পথে ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে যাতায়াতকারী ডাচ নাবিক-পরিব্রাজকদের কথা মাথায় রেখেই নানা প্রকার শাক-সবজী ও ফলমুলের গাছ দিয়ে পরিপূর্ণ। পুরো বাগানটি খুবই নিখুঁতভাবে সাজানো, এবং এতে যে হাঁটার পথগুলো রয়েছে তাতে সারি সারি ছায়াতরু থাকায় এখানে হাঁটার অভিজ্ঞতা খুবই আনন্দময়।

একেকটা বৃক্ষের সারি আরেকটা সারিকে সমকোনে ছেদ করেছে – এভাবেই পুরো বাগানটি সাজানো। ইংরেজদের জন্য ব্যাপারটা খুব একটা দৃষ্টিসুখকর নয়, কারণ প্রমোদ উদ্যানের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ইংরেজরা প্রাকৃতিক শৈলী কিম্বা অকৃত্রিম সারিবিন্যাসের পক্ষপাতি। বাগানের মাঝখানে যে হাঁটার পথ, তার শেষ মাথায় পশু ও পাখীর একটি সংগ্রহশালা আছে। সেই সংগ্রহশালায় এবং বাগানের স্থানে স্থানে কিছু শব্দাড়ম্বরপূর্ণ তথ্যফলক লাগানো হয়েছে। আমার নিজের মতে, কোম্পানি যেহেতু স্থানীয় নানা সুবিধাদি পেয়েছে, সেই বিবেচনায় তাদের এই সংগ্রহশালা খুব একটা সমৃদ্ধ নয় – না পশুতে, না পাখীতে। একটা বাঘ, একটা জেব্রা, কয়েকটা সুন্দর অস্ট্রিচ, একটা ক্যাসোয়ারি (ইমু সদৃশ্য বড় পাখিবিশেষ। দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় নয়, সম্ভবতঃ অন্য কোন দেশ, যেমন নিউ গিনি থেকে আনা হয়ে থাকবে) এবং একটা মনোহর ক্রাউন-ফাউল (পাখিবিশেষ) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

শহরের পেছনে পটভূমির মতন দাঁড়িয়ে আছে টেবিল মাউন্টেন, যা ১১০০ গজের বেশি উচ্চতার একটা কালো, ভয়ালদর্শন পাহাড়, এবং এটার উপরিভাগটা আপাতঃদৃষ্টিতে সমতল। এই পাহাড় থেকে বাতাসের যে প্রচণ্ড ঝাপটা আসে, তা সত্যিই ভয়ংকর রকমের তীব্র। এই তীব্র বাতাসে আশেপাশে ধুলোর মেঘ জমে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরী হয়, এবং ঘর থেকে দরজা খুলে বাইরে বেরুনো প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। দরজার ভেতরে কি বাইরে, এখানকার অধিবাসীরা এই পাহাড়ের দ্বারা সর্বদাই এরকম অস্বস্তিকর অবস্থার মুখোমুখি হয়।

অবশেষে এল সেই কাঙ্খিত দিন, যেদিন আমাদের চুড়ান্ত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা হবে। ১২ই নভেম্বরের সকালটা বেশ শান্ত ছিল, কিন্তু দুপুরের দিকে স্থলভাগের বাতাস তীব্রতর হতে থাকলে আমরা নোঙর তুললাম, এবং দ্রুতই সভ্যতার সীমানা অতিক্রম করে মনুষ্যবাসের শেষ চিহ্নকেও দৃষ্টিসীমার অগোচরে রেখে এক সুদূর ও বর্বর দেশে অভিযানে অগ্রসর হলাম। সেখানে আমরা সেই সব বীজ বপন করতে চাই, যা সব দেশের কাছেই শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক এবং মর্যাদার বাহক।

আমাদের প্রস্তাবিত উপনিবেশের জন্য কেপ অফ গুড হোপ থেকে আমরা সরকারী তহবিল দিয়ে যে পশুগুলো কিনলাম, সেগুলো হলঃ দুটো ষাঁড়, তিনটি গাভী, তিনটি ঘোড়া, চুয়াল্লিশটি ভেড়া ও বত্রিশটি বড় শুকর; এর বাইরে ছিল বেশ কিছু ছাগল, এবং প্রায় সব রকমের হাঁস-মুরগী মিলিয়ে গৃহপালিত পাখির এক বিরাট বহর। এর সাথে যুক্ত হলো কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের নিজস্ব পশু-পাখির একটা উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ, যদিও তাদের অনেকেই অধিক দামের কারণে এই খাতে বেশি কেনাকাটা করতে পারে নি। এটা বললে সবাই নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবেন যে, খুব বেশি সামরিক অফিসার ভেড়া কেনাটাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন নি, কেননা তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য যে শুকনো ঘাস-বিচালি, সেটারই দাম ছিল প্রতি হন্দর ষোল শিলিং (হন্দর = এক টনের বিশ ভাগের এক ভাগ। বিশ হন্দর = এক টন)।

সমুদ্রতীরে যে সব আবাসিক হোটেল আছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের আশ্রয়গ্রহণের জন্য, সেগুলো ছিল আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও শস্তা। দৈনিক দেড় ডলার ভাড়ায় আমরা সেখানে বেশ ভাল থেকেছি এবং ফরাসী কায়দায় পরিবেশনকৃত খাবারেও অংশগ্রহণ করেছি। যদি কোন ভ্রমণকারীর চা শেষ হয়ে যায়, তাহলে সে এই শহরেই ইংল্যান্ডের চেয়ে শস্তায় তার মওজুদ আবার ভরে নিতে পারবে। এখানেই কিনতে পাওয়া যাবে প্রচুর সাদা ওয়াইন ও স্থানীয় চোলাইকৃত মদ, কিসমিস এবং বিভিন্ন প্রকারের শুকনো ফল। যদি কেউ আবাসিক হোটেলে বসবাস করতে না চায়, তার জন্য আছে বাজার ভরা খাবারদাবার; তাছাড়া এখানকার কসাইয়ের দোকানের মাংস কিম্বা বাজারের শাক-সবজী কোনটাই দুর্মূল্য নয়।

আমেরিকান জাহাজের ক্যাপ্টেনকে বেশ জানাশোনাওয়ালা লোক মনে হল। সে আমাদের যাত্রার উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের কথা শুনে মন্তব্য করল যে, যদি আমরা বেশি বেশি অভিবাসীকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে তৈরী থাকি, তাহলে নিউ সাউথ ওয়েলসে মানুষ শুধু পুরাতন মহাদেশ থেকেই আসবে না, নতুন মহাদেশ থেকেও দলে দলে আসবে

আমাদের জাহাজ বহর নোঙর তোলার ঠিক আগে আমাদের সামনে পড়ল বোস্টন থেকে আসা একটা আমেরিকান পতাকাবাহী জাহাজ – যেটি ১৪০ দিন আগে বোস্টন থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, এবং তার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে বাণিজ্য করা। এই যাত্রায় তারা কপালগুণে ‘হারকোর্ট ইস্ট ইন্ডিয়াম্যান’ নামের এক জাহাজের কিছু নিম্ন-পদস্থ নাবিককে উদ্ধার করতে পেরেছিল, যে জাহাজটি কেপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জের কোন একটি দ্বীপে ডুবে গিয়েছিল। আমেরিকান জাহাজের ক্যাপ্টেনকে বেশ জানাশোনাওয়ালা লোক মনে হল। সে আমাদের যাত্রার উদ্দেশ্য ও গন্তব্যের কথা শুনে মন্তব্য করল যে, যদি আমরা বেশি বেশি অভিবাসীকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে তৈরী থাকি, তাহলে নিউ সাউথ ওয়েলসে মানুষ শুধু পুরাতন মহাদেশ থেকেই আসবে না, নতুন মহাদেশ থেকেও দলে দলে আসবে, কারণ নতুন মহাদেশ আমেরিকার মানুষের মধ্যে দুঃসাহসিক অভিযান কিম্বা নতুন কিছু আবিস্কারের নেশা এখনও প্রবল (পুরাতন মহাদেশ – ইউরোপ, নতুন মহাদেশ – আমেরিকা)।

[339 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0