1788 cover

১৭৮৮ঃ বন্দীশিবির থেকে / অস্ট্রেলিয়ার আদি ইতিহাস

কৈফিয়ত

ব্যক্তিগতভাবে আমি অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বলেই কিনা জানিনা, এদেশের ইতিহাস নিয়ে খানিকটা আগ্রহ আছে আমার। তো এই ইতিহাস নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে কথাটা শুনতে হয়, তা হলোঃ অস্ট্রেলিয়ার আবার ইতিহাস আছে নাকি? এ দেশের বয়স তো সবে দু’শ বছর। ইতিহাস আছে ভারতবর্ষের, চীনদেশের কিম্বা ইউরোপের।

কথাটা অনেকাংশে সত্য। অস্ট্রেলিয়া একটি নতুন দেশ, অন্ততঃ পুরাতন দুনিয়ার চোখে। এই তো সবে সেদিন ইউরোপীয়ান পরিব্রাজকেরা প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়ার উপকুলে তরী ভেড়ালেন। সেইসব পরিব্রাজকদের একজন, ক্যাপ্টেন কুক, নিউ সাউথ ওয়েলসের বোটানী বে নামক স্থানে এসে ১৭৭০ সালে এই মহাদেশকে ব্রিটেনের রাণীর নামে দখল করলেন, পরে ১৭৮৮ সালে গভর্নর ফিলিপের নেতৃত্বে সেখানে বন্দীশিবির বানালো ব্রিটেন। সেই থেকে উপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ার যাত্রা শুরু। তবে এ কথা সত্য যে, ইউরোপীয়ান উপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের আগেও রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস – অস্ট্রেলিয়ায় জনবসতি শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর আগে। আদিবাসীদের নানা স্থাপনার ধবংসাবশেষ, কিছু ফসিলাদি কিম্বা তাদের আঁকা গুহাচিত্র ছাড়া সে ইতিহাসের সাক্ষ্য কোথাও নেই। এবোরিজিনদের ভাষাগুলোর লিখিত রুপ না থাকায়, কিম্বা উপনিবেশিক যুগের আগের অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাকী দুনিয়ার যোগাযোগের (যদি হয়ে থাকে) কোন লিখিত ইতিহাস না থাকায়, সে ইতিহাস খুঁজতে যাওয়াটা অন্ধকারে পথ হাতড়ে বেড়ানোরই সমান। ফলে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস বলতে আজ লোকে সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে আজতক অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসই বোঝেন।

মজার ব্যাপার, অস্ট্রেলিয়ার এই সাম্প্রতিক ইতিহাস, অর্থাৎ ইউরোপীয় উপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস বেশ শক্তপোক্ত ইতিহাস – তার প্রতিটি লাইনের প্রামাণ্য দলিল রয়েছে। ১৬২৩ সালে প্রথম যে ডাচ নাবিক অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের উপকূলে পা রাখলেন, সেই যাত্রার কথা তিনি লিখে গেছেন তার ডায়েরীতে। এর পরে যারাই এসেছেন এখানে, তাদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বিবরণ তারা লিখে গেছেন। সেকালে নাবিকদের ব্যক্তিগত ডায়েরী কিম্বা অফিসিয়াল রোজনামচা লেখার বেশ চল ছিল। টিম ফ্ল্যানারীর সম্পাদনায় প্রকাশিত এক বিশালায়তন এথনোলোগে এমন সব পরিব্রাজকের দিনলিপি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। ব্রিটেনের উদ্যোগে গভর্নর ফিলিপের নেতৃত্বে যে কয়েদী-উপনিবেশ গড়া হলো, তার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপের প্রামাণ্য দলিলাদি সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ রাজের নানা অফিসে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের কয়েদীদের সাথে আসা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ডায়েরীতে, কয়েদী ও কর্মকর্তাদেরকে বহনকারী সেই ১১টি জাহাজের রেকর্ডে এবং গভর্নর ফিলিপের সাথে ব্রিটেনের সরকারের নানা মন্ত্রনালয়ের যোগাযোগের কাগজপত্রে। অনেক বই বেরিয়েছিল নতুন স্থাপিত এই কলোনির প্রথম দিনগুলোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে। সুতরাং, এ কথা বোধ করি বলা যায় যে, ইউরোপীয়ান-অধ্যুষিত অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস খুবই সুসংরক্ষিত দালিলিক ইতিহাস।

ইতিহাস অনেকটা পুরাতন ছবির এলবামের মতন – এখন আমি যেখানে থাকি, সেই জায়গাটা একশ বছর আগে কেমন ছিল, দুশো বছর আগে সেখানে কারা বাস করত, ইউরোপীয়ানদের সাথে এখানে আদিবাসীদের প্রথম সাক্ষাতের মূহুর্তটা ঠিক কেমন ছিল, এসব কৌতুহলের জবাব মিলতে পারে এই লিখিত ইতিহাস থেকে। অনেকটা সেই কৌতুহল থেকেই আমি বেশ কিছু পরিব্রাজকের দিনলিপি পড়ি, এবং এক সময় খোঁজ পাই প্রথম নৌবহরে আসা কয়েকজন কর্মকর্তার স্মৃতিচারণমূলক বই, যা এই নবীন উপনিবেশের প্রথম কয়েক বছরের অনেকটা সচিত্র বর্ণনা। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তরুন ব্রিটিশ নৌসেনা ক্যাপ্টেন লেফটেন্যান্ট ওয়াটকিন টেঞ্চ এর লিখা দুটো বই, A Narrative of the Expedition to Botany Bay, 1789 সালে প্রকাশিত, এবং A Complete Account of the Settlement at Port Jackson, 1793 সালে প্রকাশিত। ১৭৮৬ সালে যখন এই বন্দিশিবির কিম্বা কলোনীর নানা পরিকল্পনা হচ্ছিল লন্ডনে, তখন ২৮ বছর বয়সী ওয়াটকিন টেঞ্চ দীর্ঘ এই সফরে আসার জন্য আগ্রহীদের খাতায় নাম লেখান। প্রথম নৌবহরে শুধু দাগী আসামীরাই আসেন নি, তাদের সাথে এসেছিলেন বেশ কিছু নৌসেনা, স্থলসেনা ও নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা-প্রশাসকবৃন্দ। ব্রিটিশ সরকারের বেতনভুক্ত এইসব সৈন্য ও অফিসারদের কেউ কেউ ইংল্যান্ডে পোর্টসমাউথ বন্দরে জাহাজে উঠার আগেই আগ্রহী প্রকাশকদের কাছে এই সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখার ফরমায়েশ পেয়েছিলেন। ওয়াটকিন টেঞ্চ ছিলেন আরো এক ধাপ এগিয়ে – তিনি পিকাডেলীর প্রকাশক জন ডেবরেটের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছিলেন এই এডভেঞ্চারের উপরে বই লেখার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। পরে তিনি সিডনীতে বসে বই লিখে জাহাজে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেন প্রকাশের জন্য। দুটো বইই দারুন সফল হয়েছিল, নানা ভাষাতে অনূদিতও হয়েছিল। এই দুটো বইকে একত্রে ‘১৭৮৮’ শিরোনামে প্রকাশ করেছে মেলবোর্নের টেক্সট পাবলিশিং কোম্পানি। তারা বলছে, এই বইটি অস্ট্রেলিয়ান সাহিত্যের প্রথম ক্ল্যাসিক।

‘১৭৮৮’ হাতে নিয়ে অনেকটা টাইম মেশিনে করে ১৭৮৮ সালে চলে যাওয়া যায়। কিভাবে এই একমেবাদ্বিতীয়ম প্রকল্পের গোড়াপত্তন হলো, কেমন ছিল শুরুর দিনগুলো, ব্রিটিশ সম্রাজ্যের হর্তাকর্তারা ঠিক কোন ভাবনায় এই প্রকল্পের অর্থ যোগান দিয়েছিলেন, আদিবাসীদের সাথে ইউরোপীয়ানদের যোগাযোগ এবং সম্পর্ক কেমন ছিল, তা জানার জন্য এর চেয়ে ভাল উতস আর হয় না। মনে রাখা দরকার, এই বইটি একজন আদিবাসী কিম্বা একজন কয়েদীর লেখা নয়; এতে একজন তরুন ব্রিটিশ সেনার মনোভঙ্গীই প্রতিফলিত হয়ে থাকবার কথা, যিনি সেই আদি উপনিবেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। একইসাথে, এটি কোন অফিসিয়াল রিপোর্ট কিম্বা সরকারী ফরমায়েশী প্রতিবেদনও নয় – এটি লিখছেন একজন তরুন অফিসার তার নিজের ডায়েরীতে, যিনি লন্ডনে প্রকাশকদের কাছে ফরমায়েশ পেয়েছেন তার লেখার গুণে, এবং এই নতুন দেশ ও দীর্ঘ সফরের ব্যাপারে ইংল্যান্ডের সাধারণ মানুষের আগ্রহের কারণে। ফলে তিনি যাত্রার প্রথম দিন থেকেই নিজের আগ্রহে যাবতীয় তথ্য ও পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন একজন লেখকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে। সেদিক থেকে দেখা গেলে, এই বইটি আদি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের এক নির্মোহ চিত্রায়ণ হওয়াটা খুবই সম্ভব।

উপনিবেশিক অস্ট্রেলিয়ার প্রথম লিখিত ইতিহাসের সাথে বাংলাভাষীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই অনুবাদের উদ্দেশ্য। বইটি নাতিদীর্ঘ, সেরেফ দুইশো পাতার। কেউ আগ্রহ নিয়ে পড়লে এই প্রচেষ্টা সার্থক হবে। বাংলা বানান ভুলের জন্য অগ্রিম ক্ষমাপ্রার্থী।

——————————
অস্ট্রেলিয়ার আদি ইতিহাসের উপরে লেখা পাঁচটি বইকে ‘ফাউন্ডেশান বই’ বলা হয়, যেগুলো এই নব্য কলোনীর শৈশবের দিনলিপি। তার একটি হলো ওয়াটকিন টেঞ্চ এর লিখিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay, 1789 সালে প্রকাশিত। বাকীগুলো হলোঃ

An Account of the English Colony in New South Wales, from its first Settlement in January 1788 to August 1801 (Published in 1804)
by David Collins

An Historical Journal of the Transactions at Port Jackson and Norfolk Island (Published in 1793)
by John Hunter

The Voyage of Governor Philip to Botany Bay with an Account of the Establishment of the Colonies of Port Jackson and Norfolk Islands (Published in 1789)
by Governor Arthur Phillip

Journal of a voyage to New South Wales, with sixty-five plates of nondescript animals, birds, lizards, serpents, curious cones of trees and other natural productions (Published in 1790)
by John White

——————————
ওয়াটকিন টেঞ্চ জন্মগ্রহণ করেন ১৭৫৮ সালে ইংল্যান্ডের চেস্টারে। তার বাবা ছিলেন একজন নাচের শিক্ষক এবং একটি আবাসিক স্কুলের প্রধান তত্বাবধায়ক। ১৭৭৬ সালে তিনি ব্রিটেনের মেরিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কর্মরত ছিলেন, এবং সে সময়ে তাকে বিদ্রোহী পক্ষ জিম্মি হিসেবে আটক করে রেখেছিল প্রায় মাস তিনেক। তিনি বেশ দ্রুতই ক্যাপ্টেন লেফট্যানান্ট পদে উন্নীত হোন। ১৭৮৬ সালে টেঞ্চ বোটানী বে’তে নির্মিতব্য কয়েদী কলোনীতে তিন বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করার জন্য নিজের নাম তালিকাভুক্ত করান।

ইংল্যান্ড থেকে নিউ সাউথ ওয়েলসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর আগে পিকাডেলি’র প্রকাশক জন ডেবরেট তাকে এই অভিযান নিয়ে একটা বই লিখার জন্য ফরমায়েশ করেন। বস্তুতঃ তিনি দুটো বই লিখেছিলেন – A Narrative of the Expedition to Botany Bay, 1789 সালে প্রকাশিত, এবং A Complete Account of the Settlement at Port Jackson, 1793 সালে প্রকাশিত। বইদুটো বেশ সাড়া ফেলেছিল এবং নানা ভাষাতে অনূদিতও হয়েছিল। রবার্ট হিউজ তাই বলেছেন, ‘ওয়াটকিন টেঞ্চের বই না পড়লে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম দিনগুলি সম্পর্কে জানা যাবে না।’

টেঞ্চ ১৭৯২ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে যান। ঐ বছরের অক্টোবরে তিনি বিয়ে করেন আনা মারিয়া সার্জেন্টকে। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং বন্দী হন। ছয়মাস কারাগারে অন্তরীণ থাকার সময় তিনি ফরাসী রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে একটি বই লিখেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি ১৮১৬ সাল পর্যন্ত সামরিক বাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন। ১৮১৬ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে যান টেঞ্চ।

ওয়াটকিন ও আনা দম্পতির কোন সন্তান ছিল না, তবে তারা আনা’র বোনের চার সন্তানকে দত্তক নিয়েছিলেন, যারা সে সময় অনাথ হয়েছিল। ১৮৩৩ সালে ইংল্যান্ডে টেঞ্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
——————————
প্রারম্ভঃ

প্রথম কিস্তিঃ বোটানী বে অভিযানের বিবরণ (Book One: A Narrative of the Expedition to Botany Bay)

এই ক্ষুদ্রায়তন বইটি রচনাকালে আমার ভাবনায় দুটো ব্যাপার ছিল, এবং তারা সমগুরুত্বপূর্ণ ছিল আমার হিসেবে – এক, পাঠককে আনন্দ দেওয়া, আর দুই, পাঠককে তথ্য সরবরাহ করা।

যে অভিযানের আমি যাত্রী, তা সংগত কারণেই নানা কৌতুহল ও জল্পনা-কল্পনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে এই অভিযানের ফলাফল কেমন হতে পারে, সে ব্যাপারে। যেহেতু একেকজন একেকভাবে নিজেদের মতন করে ভাবে, তাদের বিচার কিম্বা সিদ্ধান্তও তাই আলাদা আলাদা হয়। যে উপনিবেশ আমরা গড়তে যাচ্ছি, ইংল্যান্ডের উপরে তার উপকারী প্রভাবের ব্যাপারে কেউ কেউ যথেষ্ট আশাবাদী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন ইতিমধ্যেই। অন্যদিকে, কেউ কেউ এই প্রকল্পের নামই নিতে চাইছেন না, কেননা তাদের মতে এটি এক বিরাট অবিবেচনাপ্রসূত, মূর্খতায় ভরা এবং ধ্বংসের আলামতবাহী প্রকল্প। এই দুটো বিরুদ্ধ মতবাদের কোনটি যে ফলবে, সেটা বিচারের ভার আমি জনগণের উপরেই ছেড়ে দিলাম। এটি এমন এক নীরিক্ষামূলক প্রকল্প, যেটির পরিকল্পনা করা কিম্বা বাস্তবায়ন করা, দুটোই অভিনব এবং কঠিন। সে কারণে আমি আশা করি যে, উভয় পক্ষই তাদের সুচিন্তিত ও আন্তরিক মতামত দেওয়ার পরেও, সত্যিকারের ঘটনাপ্রবাহকে তারা আগ্রহভরে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রাপ্ত ফলাফলকে সঠিকভাবে বিবেচনা করে ন্যায্য উপসংহারে পৌঁছুবেন।

যখন এই বইটি তার লেখকের নামসমেত প্রকাশিত হয়ে পাঠকের হাতে হাতে যাবে, আমি আশা করি তারা আমার অকপট বর্ণনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসবেন যে, লেখক তাদেরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্ত করছেন না। আমি যা দেখেছি, সেটাই লিখেছি। যখন আমি আমার মতামত দিয়েছি বা দিতে বাধ্য হয়েছি, আশা করি পাঠকেরা বুঝবেন যে আমি ধৈর্য্যভরে অনুসন্ধান করে এবং সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবেই মতামত দিয়েছি। বইটির বেশিরভাগ অংশেই আছে সরাসরি তথা প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ; যেখানে অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য/বর্ণনার উপরে নির্ভর করতেই হয়েছে, সেখানে আমি খুব সাবধানতার সাথে সত্যের সন্ধানে ব্যপ্ত হয়েছি। বাগাড়ম্বর, যা প্রায়শঃই অজ্ঞতা কিম্বা অভিনবত্বের কারণে ঘটে থাকে, তা থেকেও মুক্ত থাকার জন্য সর্বোতভাবে সচেষ্ট ছিলাম।

সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা লেখার সময় আমি সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করেছি; যত অল্প পাতায় সম্ভব, তত পাতাতেই শেষ করেছি। আমার পাঠকবর্গের মধ্যে যারা পেশাগতভাবে আমার সমগোত্রীয়, আশা করি তারা আমার এই সিদ্ধান্তে সুবিবেচনা খুঁজে পাবেন। আমার ধারণা, বাকি পাঠকরাও এই সংক্ষিপ্ত সমুদ্রযাত্রার বিবরণে খুব একটা নাখোশ হবেন না। জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত যে হিসাবগুলো এই বইয়ে পেশ করেছি, সেগুলোর উপরে সর্বোচ্চ আস্থা রাখা যেতে পারে, কারণ, যে কর্মকর্তা আমাকে এই তথ্যগুলো দিয়ে সাহায্য করেছেন, তিনি ‘দ্রাঘিমাংশ বোর্ড’ কর্তৃক সরবরাহকৃত উপযুক্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে এই অভিযানে, বিশেষ করে দক্ষিন গোলার্ধে জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত নানা পর্যবেক্ষণ ও হিসাবনিকাশের কাজ করার জন্য নিযুক্ত হয়েছিলেন।

একজন নবীন লেখক সাধারনতঃ পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় থাকে, এবং সাধারণ জনগণের কাছে সুপরিচিত হওয়ার ইচ্ছাপোষণ করে। সামরিক বাহিনীর লোকেরা সাধারনতঃ পেশাগত বিষয়াদি ছাড়া অন্যান্য ব্যাপারে সমালোচনার ভয়ে আতংকিত থাকে। বক্ষ্যমান বর্ণনামূলক রচনাটির যাবতীয় ভুলভ্রান্তির দায়িত্ব বর্তায় লেখকের সদিচ্ছার উপরে, অন্য কোন কিছুর উপরে নয়। এখানে লেখক বর্তমানের সীমাহীন কৌতুহল নিবৃত করা ছাড়াও ভবিষ্যতের অভিযাত্রীদের জন্য এই নতুন উপনিবেশ স্থাপনাকালীন নানা সুবিধা-অসুবিধার কথাও তুলে ধরতে চেয়েছেন। আমার আশা, স্বচ্ছতা আর অকপটতা এই অসম্পূর্ণ কথাচিত্রের প্রমাদগুলোকে লঘু করবে, বিশেষ করে যদি এটি বিবেচনায় নেওয়া হয় যে, এটি লিখিত হয়েছিল এক জটিল পরিবেশে নানামূখী কর্মততপরতার মধ্যে কর্মরত অবস্থায়, যেখানে এর চেয়ে অধিকতর পূর্নাঙ্গভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের আর কোন উপায় সম্ভবত ছিল না।

ওয়াটকিন টেঞ্চ, মেরিন বাহিনীর ক্যাপ্টেন
সিডনী কোভ, পোর্ট জ্যাকসন, নিউ সাউথ ওয়েলস
১০ই জুলাই, ১৭৮৮
——————————


জাহাজে কয়েদীদের উঠা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড থেকে জাহাজ ছাড়ার সময় পর্যন্ত

পোর্টসমাউথ এবং প্লাইমাউথ বন্দরে নদীতে মেরিন সেনা ও কয়েদীদেরকে জাহাজে উঠানোর পরে, অভিযানে অংশ নেওয়া সকল জাহাজ ১৭৮৭ সালের ১৬ই মার্চ ‘মাদার ব্যাংক’ নামক স্থানে একত্রিত হয়, এবং পরবর্তী ১৩ই মে পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করে। এই সময়ে একটা যাত্রীবাহী জাহাজে সামান্য রোগের প্রাদূর্ভাব ছাড়া সকল জাহাজের যাত্রীবৃন্দ কুশলেই ছিল এবং বন্দীদের মধ্যে বেশ উতসাহ-উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল। তাদের মধ্যে খুব একটা অভিযোগ বা বিলাপের সুর শোনা যায় নি, এবং চারিদিকে সবাই যেন জাহাজ বহর যাত্রা শুরু করার শুভক্ষণের অপেক্ষায় ছিল বলে মনে হল।

জাহাজে কয়েদীদেরকে উঠানোর পরপরই তাদেরকে সম্ভাব্য সবচেয়ে কঠোর ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, তাদের দিক থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ অমান্য করা অথবা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার অবধারিত শাস্তি হবে ততক্ষনাত মৃত্যুদণ্ড। এটি করা হয়েছিল এই কারণে যে, কয়েদীদের পাহারা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত কর্মকর্তা ও সৈন্যদের নিজেদের নিরাপত্তা এবং সুনাম অনেকাংশে জাহাজে কর্তৃত্বের শৃঙ্খলা রক্ষার উপরেই নির্ভরশীল ছিল। এই মর্মে প্রহরীদেরকে কয়েদীদের উপস্থিতিতে আদেশনামা প্রদান করা হলো। সকল পক্ষের জন্যই সুখের বিষয় এই যে, এত কঠিন শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তেমন কোন বড় ধরণের ঘটনাই আদতে ঘটে নি, কেননা সাধারনভাবে বলতে গেলে কয়েদীদের আচরণ ছিল বিনয়াবনত, নম্র ও নিয়মনিষ্ঠ। প্রকৃতপক্ষে আমি এইসব ভাগ্যহত বন্দীদের শালীন ও সুস্থ আচরণের ব্যাপারে এই লিখিত সাক্ষ্য দিয়ে যেতে না পারলে তাদের প্রতি আমার তরফ থেকে অবিচার করা হবে বলেই মনে করছি।

যদিও টানা বেশ কয়েক সপ্তাহের অলস সময় ও বিলম্ব আমাদের কাছে খানিকটা অপ্রীতিকর মনে হচ্ছিল, তবে এর একটা সুবিধাও ছিলঃ এই সময়ের মধ্যে আমরা বন্দীদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নানা নিয়ম কানুন বেঁধে দিলাম, এবং সার্বিক প্রতিরক্ষার এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করলাম যে, বন্দীরা যদি কালক্রমে কখনো উন্মত্ত হয়ে আমাদেরকে বা জাহাজকে ধ্বংস করতে প্রবৃত্ত হয়, সেটা সামলাতেও আমাদেরকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।

জাহাজের দায়িত্বপালনরত অবস্থায় আমাদের যে কর্মপরিধি, তাতে অনেক ধরণের জটিল ও সমস্যাপূর্ণ কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল – এর মধ্যে একটি কাজ ছিল জাহাজ থেকে বাইরে যাওয়া এবং জাহাজে আসা সকল চিঠি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা পরিদর্শন করা। যে জাহাজে আমি ছিলাম, সেই জাহাজের চিঠির সংখ্যা এবং চিঠির নানামূখী বিষয়বস্তু প্রায়শঃই আমাকে বিস্মিত করত। চিঠিগুলো পত্রলেখকের মেজাজ-মর্জি অনুসারে আলাদা আলাদা রকমের হতো, তবে সেগুলোর প্রধান সুর ছিল দেশে আর কখনো হয়তো ফেরা নাও হতে পারে, সেই সম্ভাবনাজনিত হতাশা; তার সাথে আরও ছিল এক দীর্ঘ ও বিপদসংকুল সমুদ্রযাত্রা এবং জংলী-অধ্যুষিত এক দুরদেশে বাকী জীবন কাটানোর ভয়। তবে এই আপাতঃ নৈরাশ্য অনেক ক্ষেত্রেই ভাবালুতা তথা আবেগবিহ্বলতা থেকে উদ্ভূত। অনেকের জন্যই এই মুহূর্তটা ছিল বরং স্বজনদের কাছ থেকে সাহায্য-সহানুভূতি পাবার, এবং অনেক চিঠিতেই দেখেছি টাকা-পয়সা ও তামাকজাত দ্রব্য চেয়ে পাঠিয়েছে কয়েদীরা। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের কাছে এক চুড়ান্ত বিলাসিতার অপর নাম বলেই জানি। কয়েদীরা এই বস্তুটির অভাব অনেক তীব্রভাবে বোধ করছিল, যেহেতু একমাত্র অসুখ-বিসুখ ছাড়া তাদের পক্ষে এলকোহল জাতীয় পানীয় নিষিদ্ধ ছিল সর্বোতভাবে।

এইখানে বলে রাখা দরকার মনে করছি যে, মাদার ব্যাংকে অবস্থানের সময় সৈন্য-কয়েদী নির্বিশেষে সবার খাদ্যতালিকায় টাটকা গরুর মাংস রাখা হয়েছিল। সৈন্যরা অবশ্য এর বাইরে অতিরিক্ত হিসেবে নৌবাহিনীতে মাথাপিছু যে পরিমাণে বিয়ার সরবরাহ করা হয়, সেই পরিমাণ বিয়ার পেয়েছিল। তারা অন্যান্য সব প্রকারের মালামালও পূর্ণমাত্রায় পেয়েছিল, যেখানে কয়েদীরা পেয়েছিল দুই তৃতীয়াংশ পরিমাণ।


যাত্রা শুরুর পর থেকে জাহাজ বহর টেনেরিফ পৌঁছানো পর্যন্ত

গভর্নর ফিলিপ অবশেষে যখন পোর্টসমাউথ বন্দরে পৌঁছলেন, এবং অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই জাহাজবহরে নেওয়া হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করা হলো, তার পরে ১৩ই মে সকালে দিনের আলো ফুটবার সাথে সাথেই অভিযানের নেতৃত্বদানকারী জাহাজ ‘সিরিয়াস’ থেকে নোঙর তুলবার জন্য সংকেত দেওয়া হলো। ভোর ছ’টার মধ্যেই পুরো বহর পাল তুলে চলতে শুরু করল। আবহাওয়া ছিল চমৎকার, পুব দিক থেকে বাতাস বইছিল, পুরো জাহাজ বহর সোলেন্ট প্রণালী’র নিডলস এর মধ্য দিয়ে তরতাজা পুবালী বাতাসে এগিয়ে চলল। [বর্তমানে মাদার ব্যাংক কিম্বা নিডলস, এই দুই স্থান মানচিত্রে আর নেই। পোর্টসমাউথে ইংল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড এবং উইট দ্বীপের মাঝখানে যে প্রণালী আছে, তার নাম সোলেন্ট। এই সোলেন্টের পশ্চিম মাথায় ছিল ‘নিডলস’ এর অবস্থান, যেটি আজকের দিনের মানচিত্রে ‘মিলফোর্ড অন সী’ নামে চিহ্নিত। এখন সেখানে ‘নিডলস পয়েন্ট’ নামে একটি রাস্তা এবং ‘নিডলস আই ক্যাফে’ নামে একটা ক্যাফে ছাড়া সেই অস্টাদশ শতাব্দীর নিডলসের কোন চিহ্নই অবশিষ্ট নেই – অনুবাদক] আমাদের নিজস্ব সামান্য অস্ত্রসজ্জা ছাড়াও ‘হায়েনা’ নামক ফ্রিগেটকে পশ্চিম দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো, ফলে সে পর্যন্ত আমাদের বহরে জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ালো বারোতে – রাজকীয় তিন জাহাজ ‘সিরিয়াস’, ‘হায়েনা’ ও ‘সাপ্লাই’; খাবারের জোগানদার তিন জাহাজ, যাতে উপনিবেশের আগামী দুই বছরের খাদ্যদ্রব্যাদি ও অন্যান্য সকল প্রয়োজনীয় মালামাল নেওয়া হয়েছিল; এবং ছয়টি সাধারণ পরিবহণ জাহাজ, যেগুলো সৈন্য ও কয়েদীরা উঠেছিল।

প্রতিটি সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজে ছিল চারজন ক্যাপ্টেন, ১২ জন সাব-অল্টার্ন (ক্যাপটেনের অপেক্ষা নিম্নপদস্থ সেনাপতিবিশেষ), ২৪ জন সার্জেন্ট ও কর্পোরাল, ৮ জন ড্রামবাদক এবং ১৬০ জন মেরিন সিপাহী বা প্রাইভেট [ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর সর্বনিম্ন পদ হলো সিপাহী, অন্যদিকে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ায় সেটা ‘প্রাইভেট’। স্টিভেন স্পিলবার্গের বানানো ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ সিনেমার কথা স্মর্তব্য, যেখানে জেমস ফ্রান্সিস রায়ান ছিলেন একজন প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস, যা আমেরিকান সেনাবাহিনীতে প্রাইভেটের চেয়ে সামান্য উপরের পদবী) – অনুবাদক] ‘সিরিয়াস’ জাহাজে অবস্থানরত মেজর কমান্ডান্ট ও তার সহযোগী সামরিক কর্মীবাহিনী সহ পুরো জাহাজ বহরে সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ২১২ জন, যার মধ্যে ২১০ জনই স্বেচ্ছায় এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। কয়েদী ছিল ৫৬৫ জন পুরুষ, ১৯২ জন মহিলা এবং ১৮টি শিশু। কয়েদীদের অধিকাংশই ছিল মিস্ত্রী, কারিগর ও কৃষক শ্রেণীর, যাদেরকে বিশেষ উদ্দেশ্যে সরকারের নির্দেশমত বাছাই করা হয়েছে।

সকাল দশটার মধ্যেই আমরা উইট দ্বীপ ছেড়ে খোলা সাগরে পড়লাম, এবং এতক্ষণ নিজে নিজে নানা সাতপাঁচ ভাবনা ভাবতে ভাবতে বিরক্ত হয়ে অবশেষে আমি কয়েদীদের মধ্যে একটু পায়চারি করার সিদ্ধান্ত নিলাম, যাতে এই মুহূর্তে তাদের মনের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারি। মাত্র অল্প কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগের মুখেই ছিল এক ধরণের সন্তুষ্টির ছাপ, যদিও কারো কারো পক্ষে নিজের দেশ থেকে (সম্ভবতঃ আজীবনের জন্য) বিচ্ছিন্ন হওয়ার জ্বালা চেপে রাখাটা কষ্টকর ছিল। সাধারণভাবে বলতে গেলে, পুরুষদের মধ্যেই এই ব্যাপারটা বেশি কাজ করেছিল, কারণ আমি মাত্র একজন ছাড়া অন্য কোন নারীকে দেশ ছাড়ার দুঃখে দুঃখী হতে দেখেছিলাম বলে মনে পড়ে না। ‘কিছু স্বাভাবিক অশ্রুপাত করল তারা, এবং শিঘ্রই তা আবার মুছেও নিল – জন মিলটন, প্যারাডাইজ লস্ট। এর পরে দুঃখের প্রাদূর্ভাব আর খুব একটা দেখা যায় নি; নির্মল আকাশ এবং চারপাশের বদলে যাওয়া মনোরম দৃশ্যাবলি সম্ভবতঃ সকল অস্থিরতা ও অতৃপ্তিকে খেদিয়ে বিদায় করেছিল, এবং তার বদলে আমদানী করেছিল নিজেদের ভাগ্যের প্রতি এক ধরণের উৎফুল্লতা ও মৌন সম্মতির মনোভাব, যেহেতু এই ভাগ্যলিপিকে বদলানো তাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না।

জাহাজ বহরে বন্দীদের মধ্যে যে ভাল মনোভাব বিরাজমান ছিল, ২০শে মে তারিখে আরো একটা বড়সড় ঘটনা সেটাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিলঃ যে সকল কর্মকর্তারা কয়েদীদেরকে জাহাজে দেখাশোনা করছিল, তাদের কারো কারো অনুকুল সুপারিশের প্রেক্ষিতে ‘সিরিয়াস’ জাহাজ থেকে বলা হলো যে, যদি জাহাজের পদস্থ কর্মকর্তারা উপযুক্ত মনে করেন, তবে তারা শেকলে আটকে থাকা অবস্থা থেকে যে কোন বন্দীকে নিজেদের বিবেচনা অনুযায়ী মুক্ত করে দিতে পারবেন। এই মানবিক নির্দেশনা পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে আমার অধীনে থাকা সকল বন্দীকে মুক্ত করে দিলাম, কাউকে বাদ না রেখে। এ কথা বলা বাহূল্য যে, নিরাপত্তার কারণে কয়েদীদেরকে শেকলে আটকে রাখার ব্যাপারটা কেবলমাত্র পুরুষ বন্দীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হতো।

ঐ দিন সন্ধায় ফ্রিগেট ‘হায়েনা’ আমাদেরকে ছেড়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ফিরতি যাত্রা শুরু করল। এর ফলে আমরা আমাদের বন্ধু-স্বজনদের কাছে চিঠি লিখে, যাত্রার নানা ভাল সংবাদাদি জানিয়ে তাদের আশঙ্কা দূর করার একটা আশু মওকা পেলাম। এই দিন থেকে পরবর্তী স্থলভাগে পৌঁছানো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটে নি। এই সমুদ্রযাত্রায় অন্যান্য বাহিনীর সেনা নিয়োগ না করে বেশি সংখ্যক মেরিন সেনা নিয়োগের যথোপযুক্ততা নিয়ে একটি মন্তব্য না করে পারছি না – এই সফর ছিল মূলতঃ সমুদ্রের উপরে সফর। যদি এইখানে স্থলবাহিনীর একটা দলকে নিযুক্ত করা হোত, তবে এই পর্যন্ত আসতে আসতেই তাদের অর্ধেকই সাগরপীড়ায় আক্রান্ত হয়ে অকেজো হয়ে পড়ত, অথচ সেখানে এই মেরিন বাহিনীর সদস্যরা জাহাজে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে এই অভিযানের সকল সাধারণ প্রয়োজনে, সকল জরুরী অবস্থায় ও সংকটে নিজেদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও দক্ষতা দিয়ে সেবা করে যাচ্ছিল।

৩০শে মে প্রত্যুষে আমরা ‘ডেজার্টার্স’ নামক পাহাড়ের দেখা পেলাম, যা মাডেরিয়া দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এই দ্বীপপুঞ্জের সর্বদক্ষিণ প্রান্ত গ্রিনীচ থেকে ৩২ ডিগ্রী ২৮ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ও ১৬ ডিগ্রী ১৭ ১/২ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। পরের দিন আমরা ‘স্যালভেজ’ নামক এক পাহাড়শ্রেণীর দেখা পেলা, যা মাডেরিয়া ও ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জের মাঝামাঝি অবস্থিত। স্যালভেজ পাহাড়শ্রেণীর মধ্যবিন্দুর অবস্থান ছিল ৩০ ডিগ্রী ১২ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ, এবং এর পূর্ব প্রান্তের দ্রাঘিমাংশ ছিল ১৫ ডিগ্রী ৩৯ মিনিট পশ্চিম। এটা যতটা না বিস্ময়কর, তার চেয়ে বরং ক্ষমার অযোগ্য যে, লন্ডন থেকে প্রকাশিত আটলান্টিকের আধুনিক মাণচিত্রেও স্যালভেজ পাহাড়শ্রেণী একেবারেই দেখানো হয় নি।

জুন মাসের তিন তারিখে আমরা টেনেরিফ দ্বীপে পৌঁছালাম, এবং সান্তা ক্রুজ শহরের এক সড়কের পাশে নোঙর ফেলা হলো। এই নিয়ে ইংল্যান্ড ছাড়ার পরে আমাদের যাত্রার তৃতীয় সপ্তাহ পার হলো।


টেনেরিফ পৌঁছানো থেকে শুরু করে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো’র উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু পর্যন্ত

একজন ভ্রমণকারীকে তুষ্ট করবার মত তেমন কিছুই নেই এই টেনেরিফ দ্বীপে। তার নানা সুপ্রসিদ্ধ পর্বতশৃঙ্গের কথা আমরা শুনেছিলাম, যদিও সান্তা ক্রুজ শহরে সপ্তাহাধিককাল পার করেও আমরা তার দেখা পেলাম না। যখন মেঘে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গের সামান্য ঝলক চোখে পড়ল, তখনো আমরা আশাহতই হলাম, কারণ যে জায়গা থেকে আমরা সেটা দেখছিলাম, সেখান থেকে ভাল মত দেখাই যাচ্ছিল না আশেপাশের অন্যান্য ছোট ছোট পাহাড়ের দ্বারা ঢাকা পড়ে যাওয়ার ফলে। পর্বতচুড়া ছাড়া এই রুক্ষ অনুর্বর অনাকর্ষণীয় দেশে দেখার মতন আর কিছুই নেই। শহরটাকে অবশ্য এই মৃতপ্রায় বাদামী পটভূমির উপরে একটা আনন্দময় সাদা ছবি বলে মনে হলো, যা প্রথম দেখায় বেশ ভালোই লাগল। এই শহরের চেহারাসুরত খুব অগোছালো নয়, এর ঘরবাড়িগুলো খুব একটা বিশ্রীও নয়, এবং শহরটা অসংখ্য গীর্জা ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে পূর্ণ। এই সব উপাসনালয়গুলো বেশ অলংকারাদিতে ভরপুর এবং অতীব জাঁকজমকময়।

যে সকালে আমরা পৌঁছালাম, সেদিনই জাহাজগুলো থেকে যত বেশী সংখ্যক সৈন্যকে সাধারণ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া সম্ভবপর ছিল, ততজনকে নিয়ে যেয়ে ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জের গভর্নর মার্কিজ দ্যা ব্রাঞ্চিফোর্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। গভর্নর আমাদের জন্য বেশ সন্মানের সাথে জাঁকজমকপূর্ণ একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। তিনি জন্মসূত্রে সিসিলীয়ান, এবং সংগত কারণেই তার দেশের সরকারের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিলেন ( সেকালে ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ স্পেনের আওতাধীন ছিল, এবং এখনও তাইই আছে – অনুবাদক)। এই দ্বীপপুঞ্জের প্রকৃত রাজধানী ছিল গ্রান্ড ক্যানারী দ্বীপ, যদিও গভর্ণর নিজে সেখানে থাকার চেয়ে টেনেরিফ দ্বীপে থাকাটাই পছন্দ করতেন ইউরোপের সাথে যোগাযোগের সুবিধার জন্য। যদিও খুব বেশিদিন আগে তিনি এখানে আসেন নি, ইতিমধ্যেই তিনি কটন, রেশম ও অন্যান্য সুতা উতপাদনের কারখানা বসিয়েছেন যেখানে ষাটের অধিক সংখ্যক লোক কাজ করে। কারখানাগুলো খুবই সুব্যবস্থায় চলছে এবং স্থানীয় জনগণের খুবই কাজে আসছে। সেখানে আমাদের নাতিদীর্ঘ অবস্থানকালে আমরা মহামান্য গভর্নরের মর্যাদা ও সুবিবেচনার কিছু সাক্ষাত প্রমাণ পেলাম, এবং একদিন তার সাথে অভিজাত ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে নৈশভোজনে অংশ নেওয়ারও সৌভাগ্য হলো আমাদের। সেই ভোজনে বরফের নানাবিধ ব্যবহার দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম, যেহেতু এই দেশটা ছিল শুষ্ক মরুময়, এবং সূর্য সবসময় থাকত মাথার ঠিক উপরে উলম্বভাবে। সম্ভবতঃ পাহাড়ের পাদদেশের কিছু খাদ, যা অনেক উপরের শৃঙ্গ থেকে নেমে আসা বরফকে ধরে রাখে, সেখান থেকেই সারাবছর পর্যাপ্ত বরফ মিলত।

ভিক্ষুকদের নাছোড়বান্দা ও অস্থিরমতি স্বভাব এবং নীচু শ্রেণীর মহিলাদের অভদ্রতা ছিল খুবই বিরক্তিকর। সংখ্যার কথা বিবেচনা করলে একজন ইংরেজ সেখানে তার দেশের অনেক মানুষই খুঁজে পাবেন। বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সব ইংরেজদের কাছ থেকেই যা কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল, কেননা অল্প পরিচয়ে স্পেনীয়রা সহজে মুখ খুলতে চাইত না, বিশেষ করে ইংরেজদের সাথে, যারা সাধারণতঃ স্পেনীয়দের মত অতটা লাজুক বা মুখচোরা ছিল না। আমরা শুনলাম যে, এই দেশের অভ্যন্তরভাগ বেশ উর্বর ও মনোরম, এবং লাগুজা নামে একটা শহরের পরিবেশ নাকি খুবই চমৎকার। আমাদের সাথের বেশ কিছু অফিসার সেখানে যেয়ে চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনে ব্রতী হলো।

ক্যাথোলিক জাতিগুলোর স্থাপিত নানা উপনিবেশে অবশেষে গীর্জার ক্ষমতা কমতে শুরু করেছে বলে আমাদের কাছে মনে হলো, যদিও ইউরোপে গীর্জার ক্ষমতা দীর্ঘকাল আগে থেকেই কমতির দিকে। প্রমাণস্বরুপ টেনেরিফে ঘটা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উপস্থাপন করছি। এই দেশে নবাগত কাউকে অবশ্য যদি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে সে কদাচিত এ ব্যাপারে নিজের পর্যবেক্ষণের উপরে ভর করে কোন উপসংহারে পৌঁছাবে। এই দ্বীপপুঞ্জের বিশপ তথা প্রধান ধর্মযাজক বাস করেন গ্রান্ড ক্যানারী দ্বীপে, যার কাজ পুরো দেশে ধর্মের তত্বাবধান করা। তিনি বয়সে এবং চরিত্রে এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, অমায়িক ও মর্যাদাবান, এবং নিজ গীর্জার অধীন কিম্বা বিদেশী সকলের কাছেই খুবই জনপ্রিয়। তার কোষাগারে বছরে প্রায় দশ হাজার পাউন্ড লেনদেন হয়, অথচ সরকারের বার্ষিক বাজেট মাত্র দুই হাজার পাউন্ডেরও কম।

সকল সাবধানতা অবলম্বন করা সত্বেও সান্তা ক্রুজ শহরে নোঙর ফেলা অবস্থায় এক রাতে একজন কয়েদী পালিয়ে গেল অভিনব উপায়ে। সে প্রথমে জাহাজের পাটাতনের নীচে লুকিয়েছিল যখন অন্য কেউ আশেপাশে ছিল না। বেশ কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকার পর সে তক্তার ফাঁক গলে জাহাজের গলুইয়ে নেমে পড়ে, এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে জাহাজের পেছনে থাকা একটা নৌকাকে ধরে ফেলে তাতে উঠে পড়ে। সেই নৌকাটির দড়ি কেটে দিলে স্রোতের টানে নৌকা যখন ধীরে ধীরে জাহাজের দৃষ্টিসীমা পেরিয়ে যায়, তখন সে নিজে দাঁড় বেয়ে দ্রুত সরে পড়তে থাকে। তার এই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটা আবিস্কৃত হয় বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে, এবং তখন তাকে খোঁজার জন্য লোকজন নিয়োগ করা হয় ও দ্বীপের নানা অংশে নৌকা পাঠানো হয়। তাকে খুঁজে পাওয়া যায় একটা ছোট্ট উপসাগরের কাছে, যেখানে সে আশ্রয়ের সন্ধানে ফিরছিল। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, প্রথমে সে ডাচ পূর্ব ভারতীয়দের এক জাহাজে উঠতে চেয়েছিল। সেখানে নিরাশ হলে সে সাগর পাড়ি দিয়ে গ্র্যান্ড ক্যানারী দ্বীপে যেতে মনঃস্থির করে, টেনেরিফ থেকে যার দুরত্ব দশ লীগ (এক লীগ = তিন মাইল)। যখন তাকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন সে এই যাত্রার জন্যই শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করছিল। যখন তাকে খোঁজার জন্য জাহাজ বহর থেকে নানা দিকে নৌকা পাঠানো হয়েছিল, একই সময়ে স্প্যানীয় গভর্নরকেও ঘটনাটা জানানো হয়েছিল, ফলে তিনিও তৎক্ষণাৎ চারিদিকে লোক পাঠয়েছিলেন পলাতক কয়েদীকে ধরার জন্য।

টেনেরিফে আমাদের এক সপ্তাহ অবস্থানকালে জাহাজে পানি, ওয়াইন ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর মওজুদ পুনরায় ভরে নেওয়া হলো। ১০ই জুন খুব সকালে আমরা নোঙর তুললাম এবং হালকা পুবালী বাতাসে সাগরের অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। টেনেরিফে যাত্রাবিরতির স্বল্পস্থায়িত্ব এবং তার ফলে যে তাড়াহুড়া, সে কারণে আমরা এই জায়গা সম্পর্কে আগে যা জানতাম তার চেয়ে বেশি কিছু জানার সুযোগ পেলাম না। যারা এই যাত্রাপথে আমাদের সাথেই আছেন, তাদেরকে বলাটা বোধহয় ভুল হবে না যে, এসব তথ্য আমাদের খুব একটা কাজেও লাগতো না আসলে।

এখানকার বাজারে টাটকা মাংস ছিল, তবে তা পরিমাণে প্রচুর নয় এবং মাণেও খুব একটা ভাল নয়। মাছ দুষ্প্রাপ্য, তবে মুরগীর মাংস বেশ সস্তা, বলতে গেলে যে কোন ব্রিটিশ সমুদ্রবন্দরের মুরগীর দামের মতই শস্তা, এবং যত খুশী তত পরিমাণে কেনা সম্ভব। বাজারে সবজির সরবরাহও কম – ব্যতিক্রম কেবল পেঁয়াজ ও মিষ্টি কুমড়া। আমি সব জাহাজকে বেশি পরিমাণে এই দুই সবজী কিনে রাখার পরামর্শ দিলাম। দুগ্ধবতী ছাগলের দাম খুবই কম, এবং সহজেই পাওয়া যায়। মৌসুমে আঙ্গুর পাওয়া যায় যথেষ্ট, তবে যখন আমরা সেখানে ছিলাম তখন শুধু ডুমুর এবং এক ধরণের জাম ছাড়া অন্য কোন ফলই মেলে নি। ব্যবসায়ীদের কাছে শুষ্ক ওয়াইন নামে পরিচিত এক ধরণের ওয়াইন বিক্রী হচ্ছিল প্রতি পাইপ ১০ থেকে ১৫ পাউন্ডে (এক পাইপ = প্রায় ৫০০ লিটার)। ১৫ পাউন্ড দাম দিলে শুষ্ক ওয়াইনের সবচেয়ে ভালো যে ভ্যারাইটি, লন্ডন পার্টিকুলার ভ্যারাইটি, সেটা কেনা সম্ভব। মিষ্টি ওয়াইনের দাম বেশ চড়া। ব্র্যান্ডিও এখানে বেশ শস্তা। বড় আকারের শূকর কিম্বা ভেড়া কেনার জন্য টেনেরিফের উপরে ভরসা করতে কোন অভিযাত্রীকে আমি পরামর্শ দেব না। ইংল্যান্ড ছাড়ার আগেই যদি প্রয়োজনমত ডলার হাতে করে আনা যায়, তাহলে আসার পথে নানা বন্দরে খরচ করতে সুবিধা হবে। যদি কেউ সেটা করতে ভুলে যান, তাহলে মনে রাখবেন যে, এখানে ব্রিটিশ টাকা ভাঙানোর সময় কিম্বা বিল ডিসকাউন্ট করার সময় খুচরা ডলারে বদলি টাকা না নিয়ে শুধু পুরো ডলারে নিলে রিও ডি জেনিরো এবং কেইপ অফ গুড হোপ এই দুই জায়গাতেই ভাল দর পাবেন।

সান্তা ক্রুজের অবস্থান গ্রিনীচ থেকে ২৮ ডিগ্রী ২৭ ১/২ উত্তর অক্ষাংশ এবং ১৬ ডিগ্রী ১৭ ১/২ পশ্চিম দ্রাঘিমাংশে।


টেনেরিফ থেকে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো পর্যন্ত যাত্রা

টেনেরিফ থেকে দক্ষিন পূর্বে যাত্রা করার সময় ছবির মত যে পর্বতশৃঙ্গগুলো দেখা যায়, তার সৌন্দর্য্য বর্ণনাতীত। বিস্ময়কর উচ্চতার এই পর্বতশ্রেণী আমাদেরকে বিমোহিত করে ফেলে, অথচ এগুলো আমরা আগে খুঁজেই পাই নি। আমাদের জাহাজ থেকে পুরো দ্বীপটাকে একটা বিশালাকার পাহাড়ের মত মনে হচ্ছিল, যার চুড়াটা ছিল পিরামিডের মত। আমরা হালকা বাতাসে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলাম, আর আমাদের যাত্রা শুরুর পরে তিন দিন পর্যন্ত এই পর্বতমালাকে পরিস্কারভাবে দেখতে পেয়েছিলাম। হয়তো আরো কয়েকদিন আমরা সেটা দেখতে পেতাম, যদি না কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া আমাদের দৃষ্টিকে বিঘ্নিত করত। এই পাহাড়ের উপর থেকে আশেপাশের কতদূর পর্যন্ত দেখাআ যায়, তা নিয়ে সান্তা ক্রুজের সরল মানুষগুলো আমাদেরকে নানা গালগল্প শুনাল। সে সব গল্প এতইটাই অতিরঞ্জিত মনে হলো যে, গালগল্পের সম্রাট ব্যারন মুনশাউজেনও মনে হয় খানিকটা লজ্জা পেয়ে যাবেন সে সব শুনলে (ব্যারন মুনশাউজেন হলেন অস্টাদশ শতকের এক কাল্পনিক চরিত্র, যাকে অতিরঞ্জিত গালগল্পের জন্য প্রবাদপ্রতিম ভাবা হয়)।

১৮ই জুনে আমরা কেইপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জের উত্তর প্রান্ত দেখতে পেলাম, এবং তখনি আমাদের একজন উচ্চপদস্থ নৌসেনাপতি সংকেতের মাধ্যমে জাহাজ বহরকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি এই দ্বীপপুঞ্জের কোন একটা দ্বীপে যাত্রাবিরতি করতে চান। পরের দিন আমরা সাও তিয়াগো দ্বীপে পৌঁছালাম পোর্ট প্রাইয়া উপসাগরে নোঙর ফেলার জন্য দাঁড়ালাম। কিন্তু তীব্র বাতাস এবং চোরা সমুদ্রস্রোতের কারণে আমরা সেখানে নোঙর করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সংশয়ে পড়ে গেলাম। অবশেষে নোঙর না করার সংকেত দেওয়া হল, এবং পুরো জাহাজ বহর বাতাসের মুখে কোনররকমে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। এই দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা বেশ কিছু দ্বীপের অবস্থান নির্ণয় করতে সমর্থ হয়েছিলামঃ স্যাল দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত ১৬ ডিগ্রী ৪০ মিনিট উত্তর অক্ষাংশ ও ২৩ ডিগ্রী ৫ মিনিট পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ; বোয়া ভিস্তা দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত ১৫ ডিগ্রী ৫৭ মিনিট উত্তর, ২৩ ডিগ্রী ৮ মিনিট পশ্চিম; ম্যায়ো দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত ১৫ ডিগ্রী ১১ মিনিট উত্তর, ২৩ ডিগ্রী ২৬ মিনিট পশ্চিম; পোর্ট প্রাইয়া শহরের দুর্গের অবস্থান গ্রীনিচের ২৩ ডিগ্রী ৩৬ ১/২ মিনিট পশ্চিমে।

এদিকে উত্তর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সূর্যের সরাসরি উত্তাপে আবহাওয়া প্রচণ্ড উষ্ণ হয়ে উঠছিল। এর পরপর মুষলধারে বৃষ্টি এসে আমাদেরকে জাহাজ বহরের যাত্রীদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে দূর্ভাবনায় ফেলে দিল। যাই হোক, আমার জাহাজে অসুস্থ লোকের সংখ্যা ছিল আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে বিস্ময়করভাবে কম, এবং অন্য সব জাহাজের যাত্রীদের স্বাস্থ্যের অবস্থাও প্রায় এ রকমই ছিল। দূষিত বাতাসের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা মাঝে মাঝেই বারুদের বিস্ফোরণ ঘটাতাম, জাহাজের পাটাতনে আগুন জ্বালাতাম এবং জীবাণুনাশক হিসেবে আলকাতরার তেল ব্যবহার করতাম হরদম। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা চেষ্টা করতাম আমাদের পরনের পোষাক এবং বিছানাদি সর্বদা শুকনো রাখার জন্য। আমরা যতই বিষুবরেখার দিকে এগুচ্ছিলাম, আবহাওয়া ততই আস্তে আস্তে ভাল হতে থাকল। ১৪ই জুলাই আমরা বিষুবরেখা অতিক্রম করলাম, এবং সে সময় আবহাওয়া ছিল শান্ত, বাতাসের তাপমাত্রা ছিল ঠিক ইংল্যান্ডের উজ্জ্বল গ্রীস্মের দিনের মতই উষ্ণ। এই সময় থেকে শুরু করে আমেরিকার উপকুলে পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা যে মনোরম এবং শান্ত আবহাওয়া পেলাম, তা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বাড়াবাড়ি রকমের ভালো, এবং এর আগে যে তীব্র উষ্ণতা, বৃষ্টি ও বাতাস আমাদেরকে কাবু করছিল, তার সাথে এই প্রশান্ত আবহাওয়ার কোন তুলনাই হয় না। আগস্টের ২ তারিখ বিকেলে ‘সাপ্লাই’ জাহাজ থেকে স্থলভাগ দেখতে পাওয়ার সংকেত দেওয়া হলো। ‘সাপ্লাই’কে আগেভাগেই এই উদ্দেশ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। সুর্যাস্তের আগে আগে পুরো জাহাজ বহর থেকেই আমরা স্থলভাগ দেখতে পেলাম, এবং পরে জানা গেল যে সেই জায়গাটি ছিল কেইপ ফ্রিও, যার অবস্থান ২৩ ডিগ্রী ৫ মিনিট দক্ষিণ অক্ষাংশ, ৪১ ডিগ্রী ৪০ ১/৪ মিনিট পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ।

বাতাস খুব হালকা থাকায় আমরা মাসের ৭ তারিখের আগে রিও ডি জেনিরোর পোতাশ্রয়ে সেন্ট সেবাস্টিয়ান শহরে পৌঁছাতে পারলাম না। সেখানে পৌঁছে আমরা উপকুল থেকে এক মাইলের চার ভাগের তিন ভাগ দূরে নোঙর ফেললাম।

[723 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0