প্রচারক। শাস্ত্র বলে গরু আমাদের মাতা।
বিবেকানন্দ। হ্যাঁ, গরু যে আমাদের মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি—তা না হলে এমন সব কৃতি সন্তান আর কে প্রসব করবেন?
[“স্বামী-শিষ্য-সংবাদ”; স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৯ম খণ্ড]

ভারতেও “নাসা”!
সকলেই জানেন, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে নাসা (NASA) নামক সংস্থাটি মহাকাশ বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সাথে সংযুক্ত। আমাদের দেশে, ভারতে, এই কাজের জন্য দায়িত্ব বর্তেছে ইসরো (ISRO)-র উপরে। কিন্তু অনেকেরই যেটা সম্ভবত জানা নেই, ভারতেও “নাসা” খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে। তবে এক্ষেত্রে এ হচ্ছে কিছু মানুষের নাসা, অর্থাৎ, নাসিকা; বিশুদ্ধ বাংলায় যাকে সবাই বলে থাকেন নাক।
হে পাঠক, নিশ্চয়ই এই দামি খবরটা জানতেন না। অথচ, এই ক’দিন আগেই দেখুন না কেন, রাজস্থানের যোধপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হোস্টেলে কাশ্মীরি ছাত্রদের ঘরে গোমাংস রান্না হচ্ছে বলে কিছু দেশভক্ত ছাত্রের নাসা ঠিক গন্ধ পেয়ে গেল এবং তারা পুলিশকে খবরও দিয়ে দিল। পুলিশও তাদের নাসা ব্যবহার করেই সেই সব বেয়াদপ ছাত্রদের ঘরে পৌঁছে গেল এবং তাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। গোটা রাজস্থানের কোথাওই কিন্তু গরুর মাংস পাওয়া যায় না। বহুকাল ধরেই নিষিদ্ধ বলে। কিন্তু তবুও স্রেফ “নাসা”-র জোরেই এই সন্ধান কার্যটি সুসম্পন্ন হল!
কিছুদিন আগে আলিগড় শহরের এক বিজেপি পুরসভা সদস্যা হঠাৎ স্থানীয় থানায় অভিযোগ করে বসেন, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে নাকি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে অবশ্য শুধু নাসা নয়, সেই সঙ্গে ক্যান্টিনের মেনু কার্ড দেখার জন্য খুব শক্তিশালী “লেজার” চক্ষুও নাকি ব্যবহৃত হয়েছিল বলে খাস খবরে প্রকাশ। থানা অনেক গয়ংগচ্ছ করে তদন্ত-ফদন্ত করে শেষ পর্যন্ত জানতে পারে, গরু নয়, মোষের মাংসই বিক্রি হচ্ছিল। সেই হিন্দুত্ববাদী পুরমাতা মহাশয়ার নাসারন্ধ্রদ্বয় গন্ধ চিনতে বোধ হয় সামান্য ভুল করে ফেলেছিল।
তবে সব সময় তো আর ভুল হয় না। এই যেমন, গত বছরের শেষের দিকে এরকমই একটি ঘটনা সারা ভারতেই তুমুল হইচই ফেলে দিয়েছিল। উত্তর প্রদেশের দাদরি জেলার বিস্রা গ্রামে সেদিন সন্ধেবেলায় কোনো এক মন্দির থেকে দুই যুবক জোর গলায় মাইকে ঘোষণা করতে থাকে যে সেই গ্রামের মহম্মদ আখলাক সাইফির বাড়ির ফ্রিজে গোমাংস রান্না করে রাখা আছে। কী করে জেনেছিল? কেন, সেই “নাসা”? নাসার ক্ষমতা তো সকলেই জানেন। সেই পরিবার রাতে যখন খেতে বসবে, এক বিশাল উত্তেজিত গোমাভক্ত বাহিনী সেই বাড়িতে ঢুকে অত্যন্ত সহিষ্ণু বৈদিক মনু-শংসিত হামলা চালিয়ে লাঠি রডের নৃসংস আঘাতে বৃদ্ধ আখলাক সাইফিকে হত্যা করে। বাধা দিতে গিয়ে নারী শিশু সহ পরিবারের অনেকেই আহত হয়। অখিলেশ যাদবের “সমাজবাদী” সরকার সুযোগ বুঝে ঘটনাটিকে ঘটতেও দেয় এবং তার জেরও চলতে দেয় যাতে বিজেপি ভোটের রাজ্য-রাজনীতিতে সমালোচনার মুখে পড়ে। অন্যদিকে দেশের গেরুয়া সঙ্ঘ ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘটনাটির পক্ষে সাফাই গাইতে এবং অভিযুক্ত হত্যাকারীদের যে কোনো মূল্যে আইনের বিচার থেকে বাঁচাতে।
ঝাড়খণ্ড রাজ্যের এরকম কিছু হিন্দুত্ববাদী গোরক্ষক “নাসা”-ই গত ১৮ মার্চ ২০১৬ দুই মোষ-চারক মুসলমানকে গরু-পাচারি হিসাবে “সনাক্ত” করে ফেলে এবং তদন্ত বিচার ইত্যাদি আধুনিক বিরক্তিকর দীর্ঘসূত্রী প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার বদলে সন্দেহ থেকে শাস্তির সিদ্ধান্ত ও তাকে সক্রিয় রূপদানের পথে দ্রুত ধাবমান করে তোলে। দুজনকে হাত বেঁধে গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে দেয়। যাঁদের ধারণা, ভারতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হিংস্রতা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে আছে, তাঁদের ভ্রম নিরসনের উদ্দেশ্যেই সঙ্ঘ“নাসা”-র এই সব সর্বনাশা পর্যায়ক্রমিক অভিযান!!
সব কিছু দেখে শুনে দেশের বুদ্ধিজীবীদের এক বিরাট অংশ বহুকাল ধরেই তীব্র ভর্ৎসনায় মুখর হয়ে আছেন, সঙ্ঘ পরিবার সর্বত্র যেভাবে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার এক সহিংস পরিবেশ গড়ে তোলার নিরন্তর অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। এই সমস্ত ঘটনা, দেশে গৈরিক অসহিষ্ণুতার এই ক্রমবর্ধমান প্রদর্শন, বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে, গোটা দেশের বিবেকের সামনে একটা বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছিল। আমরা কি আবার এক সাংস্কৃতিক দেশ বিভাগের দিকে এগোচ্ছি? তাঁরা সবাই তো আর পালটা-হিংসা ঘটাতে পারেন না। যারা এই ভাবে দেশের মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন বাড়িয়ে তুলে সহিংস আগ্রাসনের পথে এগিয়ে চলেছে তাদের এঁরাও পিটিয়ে দিতে পারেন না। তাঁদের হাতে যে সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের উপায় আছে তাঁরা তারই ব্যবহার করে চলেছেন। অগণিত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী বিজ্ঞানী অভিনেতা চলচ্চিত্র পরিচালক তাঁদের পুরস্কার ফেরত দিয়ে চলেছেন। যে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেবার বদলে অসহিষ্ণুতা সহিংসতাকেই বাক্য ও আচরণে প্রশ্রয় দিয়ে চলে তার সঙ্গে সংস্রব রাখতেও তাঁরা ঘৃণা বোধ করছেন।
বিজেপি অবশ্য এতে একেবারেই ভেঙে পড়েনি। ভুল-টুল স্বীকার করার রাস্তাতেও যায়নি। কোথাও কোনো ভুল বা অঘটন হচ্ছে বলেই তারা মনে করছে না। একটি হিন্দুরাষ্ট্রের রাম রাজত্বে যেরকম হওয়ার কথা, এ তারই আভাস মাত্র। অতএব, বর্তমান সঙ্ঘ পরিবার প্রেরিত কাণ্ডকারখানাকেই তারা সকলকে বলছে মেনে এবং মানিয়ে নিতে; যাদের তাতে অসুবিধা হবে তারা যেন পাকিস্তানে চলে যায়।

ভারতীয় ঐতিহ্য
আমি এখানে এই গোমাংস-কেন্দ্রিক বিতর্কের সামাজিক-রাজনৈতিক পৃষ্ঠভূমি সম্পর্কে দু-চারটে ভিন্ন কথা বলতে চাই। যা নিয়ে সচরাচর আলোচনা হয় না—এরকম কিছু অভিপাদ্য।
গোমাংস ভোজন নিয়ে বর্তমানে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সহ-সংগঠনগুলি যতই হইচই চালিয়ে যাক, তার পেছনে যে খুব একটা তথ্য বা যুক্তির সমর্থন নেই—এটা কোনো বড় কথা নয়। ওদের কোন কথাটাতেই বা থাকে? তার চাইতেও বড় কথা হল, একটা সম্পূর্ণ ঐতিহ্য বিহীন দাবিও যে সাধারণ হিন্দু জনমানসকে ঐতিহ্যের নামেই কিছুটা হলেও প্রভাবিত করতে পারছে সেই সমস্যা নিয়ে আমাদের অনেক বেশি করে মাথা ঘামাতে হবে। আমরা যদি সেই দিকে নজর না দিই, তাহলে একটা বেশ বড় আকারের ভুল হয়ে যাবে।
এই কথা আজ সকলেই নানা সূত্রে কম বেশি জেনে গেছেন যে হিন্দুদের ধর্মীয় বা পবিত্র কোনো প্রামাণ্য শাস্ত্রগ্রন্থেই গোমাংস ভোজনের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা তো নেইই, উপরন্তু বহু জায়গাতেই গোমাংস ভক্ষণের স্পষ্ট নির্দেশ এবং কোথাও কোথাও বেশ ফলাও বর্ণনা আছে তার (পরবর্তী অনুভাগ দ্রষ্টব্য)। একটা সময় ছিল, যখন গৃহস্থের বাড়িতে ব্রাহ্মণ অতিথিকে বলাই হত গোঘ্ন, কেন না, তাঁরা কারোর বাড়িতে পদার্পণ করলে গৃহস্বামী তাঁদের নরম কচি বাছুরের মাংস রান্না করে খাওয়াতেন, না হলে তাঁদের নাকি বেজায় গোঁসা হয়ে যেত। ব্রহ্মতেজে শাপ-টাপ দিয়ে যাকে হাতের কাছে পেতেন কোপাগ্নিতে ভস্ম করে দিতেন! কোনো সংস্কৃত নাটকে দেখানো আছে, গুরুগৃহে বসবাসকারী শিষ্যরা একদিন খুব উৎফুল্ল যে ঘরে একজন সুব্রাহ্মণ অতিথি আসবেন বলে ভালো খাওয়াদাওয়া হবে, নধর বৎসটিকে কেটে রান্না করা হবে। আবার অন্য কোনো নাটকে বলা আছে, কেউ আসছে খবর পেয়ে গৃহস্থ আগে-ভাগেই তার বাড়ির ভালো হৃষ্টপুষ্ট গাভীগুলিকে দূরের মাঠে চরতে পাঠিয়ে দিচ্ছে, যাতে অতিথি এলে তাদের কোনোটিকেই কেটে রান্না করতে না হয়।
এই বিষয়ে ঊনবিংশ শতাব্দে বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র খুব গভীর গবেষণা করেছিলেন। তাঁর লেখা দু-খণ্ড The Indo-Aryans বইয়ের প্রথম খণ্ডে একটা (ষষ্ঠ) অধ্যায়ই ছিল Beef in Ancient India এই নামে, যেটা তিনি আলাদা পুস্তিকাকারেও প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীকালে প্রথম এন ডি এ সরকারের (১৯৯৯-২০০৪) আগমনের আগে পর্যন্ত সেই বই বা প্রবন্ধের আলোচিত বক্তব্য নিয়ে কোথাও কেউ আপত্তি করেনি। কেন না, তাতে বেদ, ব্রাহ্মণ, মনুস্মৃতি, ও অসংখ্য সংস্কৃত সাহিত্য থেকে প্রচুর সূত্রোল্লেখ সহ উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন: প্রাচীন ভারতে দীর্ঘকাল ধরে গোমাংস ভক্ষণ একটা সাধারণ খাদ্য রীতি হিসাবে চালু ছিল। [Mitra 1967] জ্ঞানী ব্যক্তিদের বিশ্বাসে মিলুক আর নাই মিলুক, তাঁরা বুঝতেন যে এর বিরুদ্ধে বলার কিছু নেই। বাবা সাহেব আম্বেদকরও তাঁর একটি প্রবন্ধে এক সময় এই বিষয়ে খুব তথ্যপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। [Ambedkar 1990, 323-28.] তারপর আরও অনেকেই। [Lal 1954-55. Sankalia 1967. Chakravarti 1979. Ilaiha 1996. Jha 2002.]
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ঝা ২০০০-০১ সালে তাঁর Holy Cow: Beef in Indian Dietary Traditions গ্রন্থটি বের করার পর বিগত বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে সঙ্ঘ পরিবারের ভক্তরা তাঁর বইয়ের কপি নানা জায়গায় জড়ো করে পুড়িয়ে সঙ্কেত দিতে শুরু করে, ঐতিহাসিক তথ্যকে তারা কী চোখে দেখে। চার দিক থেকে মামলা মোকদ্দমা করে বইটাকে আইনের বেড়াজালে আটকে দেবার ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। শুধু তাই নয়, টেলিফোনে প্রাণ নাশের নানা রকম হুমকির কারণে অবস্থা এমন হয়ে ওঠে যে তিনি শেষ অবধি পুলিশ পাহারায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ক্লাশ নিতে যেতেন। [Puniyani 2001; Reddy 2001.] গোহত্যা নিবারণে নরহত্যাও সই কিনা!!
ঊনবিংশ শতাব্দ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালে উত্তর ভারতের একদল হিন্দু কট্টরপন্থী নেতা গোহত্যা নিবারণ ও গোরক্ষা সমিতির নাম দিয়ে একটা আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষ করে, স্বামী দয়ানন্দ এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় চেতনা উদ্বোধনের এক ভ্রান্ত পথ বেছে নেন। একটা সময় থেকে তাঁদের পেছনে আরএসএস-পন্থীরাও দাঁড়িয়ে পড়ে। তাঁরা পৌরাণিক কিছু ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সূত্র উল্লেখ করে বলতে চাইতেন, গরু নাকি শাস্ত্রে আমাদের মাতা হিসাবে ঘোষিত। মৃত্যুর পর গরুর লেজ ধরেই নাকি স্বর্গ যাওয়ার পথে বৈতরণী নদী পার হতে হবে। অতএব হিন্দুদের গরুর মাংস খাওয়া চলবে না শুধু নয়, অন্যদেরও এই সুপবিত্র গোচারণভূমিতে গোমাংস ভোজন করতে দেওয়া হবে না।
আমরা এখানে পুরনো শাস্ত্র ধরে ধরে বিস্তারিত অনুসন্ধান চালাব না। সেই সব এখন যথেষ্ট সুপরিজ্ঞাত তথ্য। তবে সংশয়বাদীদের জন্য এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমরা প্রথমে সংক্ষেপে কিছু কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থিত করব। সত্য জানার আগ্রহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে।

শাস্ত্রের নজির
উপরে উল্লেখিত উৎস গ্রন্থসমূহে আলোচনার ভিত্তিতে এখানে আমি ধর্মবিশ্বাসী হিন্দুদের কাছে গ্রাহ্য কয়েকটি পরিচিত শাস্ত্রগ্রন্থ ও সাহিত্য থেকে প্রাচীন কালে ভারতে গোমাংস ভক্ষণের কিছু কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চাই। আরও অনেক তথ্যই হয়ত দেওয়া যেত। তবে মনে হয়, আন্তরিকভাবে বুঝবার ইচ্ছে থাকলে আপাতত এতেই কাজ হবে।
ঋগবেদ ১০/৮৭/১৬-১৯: গোমাংস ভোজীদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত মন্ত্র থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এরকম ভোজন প্রচলিত ছিল। য়াতুধান গোষ্ঠীর লোকেরা গরুর মাংস খেত বলে অন্যদের তাদের উপর রাগ ছিল। এই রাগের কারণ গরু পবিত্র এবং অভক্ষ্য বলে নয়, এর কারণ, সেই সময়ে বিভিন্ন জনজাতির লোকেদের মধ্যে সীমিত খাদ্যের যোগান নিয়ে পরস্পর ঝগড়াঝাঁটি।
ঋগবেদ ১০/৮৫/১৩-১৪: মাঘ মাসে বিবাহ অনুষ্ঠানে ষাঁড় কেটে রান্না করা হত। দেবরাজ ইন্দ্র গরুর মাংস ভোজনে খুবই পটু ছিলেন। তিনি বলছেন, একজনের জন্য পনের থেকে একুশটা অবধি ষাড় বধ করে রান্না করা হত (ঋগবেদ ১০/৮৬/১৪)।
ঋগবেদ ৮/৪৩/১১: বেদের আর এক গুরুত্বপূর্ণ দেবতা অগ্নিও নাকি ষণ্ড ও বন্ধ্যা গোমাতার মাংস ভোজনে আগ্রহী ছিলেন বলে তাঁকে যথাক্রমে উক্ষান্ন ও বসান্ন বলা হয়েছিল।
ঋগবেদ ১০/৭৯/৬: এতে বলা হয়েছিল গরুকে তলোয়ার অথবা কুড়াল দিয়ে কাটতে হবে।
ঋগবেদ ১০/৮৯/১৪: যজ্ঞে বলির জন্য তো বটেই, ভোজনের উদ্দেশ্যেও গবাদি পশুর মাংস কাটার জন্য কসাইখানার উল্লেখ আছে।
ঋগবেদ ১০/১৬/৭: শ্রাদ্ধে শুধু আমিষ নয়, যে কোনো মাংস নয়, বিশেষ করে গরুর মাংস খাওয়ানোর নিয়ম ছিল।
মজার কথা হল, ঋগবেদে ষোল জায়গায় গরুকে অঘ্ন্যা (অর্থাৎ, অবধ্যা) এবং তিন জায়গায় ষণ্ডকে অঘ্ন্য (অবধ্য) বলা হয়েছে। মহাদেব চক্রবর্তী এর মধ্যে বৈদিক যুগের আর্য-অনার্য সমস্যার ছায়াপাত দেখেছিলেন। আমার ধারণা, এর মধ্যেও ছিল সেকালের মানুষদের মধ্যে জনজাতিগত সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার ছাপ।
তৈত্তিরীয় ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তালিকা করে দেখানো হয়েছে কোন দেবতাকে কেমন গরু বলিদান দেওয়া হবে: বিষ্ণুর জন্য বামন ষাঁড়, ইন্দ্রকে বাঁকা শিংওয়ালা ষাঁড়, রুদ্রের জন্য লাল বন্ধ্যা গরু, সূর্যের জন্য শ্বেত বন্ধ্যা গরু, ইত্যাদি। বলি দেওয়া পশুর মাংস নিশ্চয়ই ফেলে দেওয়া হত না। এখন ছাগ বলি দিয়ে লোকে যা করে, তখনও গোবলিদানের পরে বৈদিক জনজাতির লোকেরা একই কাজ করত।
শতপথ ব্রাহ্মণে প্রখ্যাত ব্রহ্মজ্ঞ যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি খুব গর্ব করেই জানাচ্ছেন, তিনি গোমাংস ভক্ষণ করতে ভীষণ ভালোবাসেন, যদি তা কচি বাছুরের মাংস হয় (৩/১/২/২১); লক্ষণীয় হল, একই ব্রাহ্মণের অন্যত্র এর আবার বিরোধিতা করা হয়েছে (১/২৩/৬-৯)। এর ব্যাখ্যাও মনে হয় সেই সময়কার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনজাতীয় সাংস্কৃতিক পার্থক্যের আলোকেই বুঝতে হবে।
সাংখ্যায়ন-সূত্র (১/১২/১০) মতে, বিবাহের রাতে কনের বাড়িতে কন্যার পিতা এবং বর-কনের আগমনের দিনে পাত্রের পিতাকে একটি করে বন্ধ্যা গরু কেটে মহাভোজনের ব্যবস্থা করতে হত।
বৌধায়নের ধর্মসূত্রে মাংসাশী প্রাণী, পোষা পাখির মাংস খেতে নিষেধ করা আছে। আর কিছুই নিষিদ্ধ নয়। অর্থাৎ, গরুও নয়।
আপস্তম্ব ধর্মসূত্র (১/৩/১০) নির্দেশ দিয়েছিল, অতিথি আপ্যায়নে, পিতৃশ্রাদ্ধে এবং বিবাহের অনুষ্ঠান উপলক্ষে গরু কেটে মাংস রান্না করে খাওয়াতে হবে; (১৫/১৪/২৯) বলেছিল, “গরু এবং ষাঁড় পবিত্র বলেই এদের খাওয়া যায়।” আপস্তম্ব (২/৭/১৬-২৬) এবং পরাশর গৃহ্যসূত্র (৩/১০/৪১-৪৯) মতে শ্রাদ্ধে অতিথিদের গরু বা ষাঁড় কেটে মাংস রান্না করে খাওয়াতে হবে। বশিষ্ঠ-সূত্রে (১১/৩৪) আবার বলা হয়েছে, এরকম অনুষ্ঠানে কোনো সদ ব্রাহ্মণ অতিথি মাংস খেতে অস্বীকার করলে অনন্তকাল ধরে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। খাদির (৪/২/১৭) ও গোভিল সূত্র (৪/৭/২৭/৫৪) অনুযায়ী নতুন গৃহ নির্মাণ করার সময় গৃহস্বামীকে বাস্তুদেবতার কাছে একটি কালো গাভী বলি দিতে হবে।
পাণিনি (৩/৪/৭৩) গোঘ্ন শব্দটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, বাড়িতে রাজা, ব্রাহ্মণ, গুরুদেব, পুরোহিত, অথবা গুরুগৃহ থেকে পুত্র সন্তান ফিরে এলে আনন্দের প্রকাশ হিসাবে ষণ্ড অথবা বন্ধ্যা গরু কেটে মাংস রান্না করা হত। শতপথ (৩/৪/১২) এবং ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও (১/৩/৪) একই কথা ব্যক্ত হয়ে আছে।
মনুসংহিতায় (৫/১৮) আচার্য মনু দুই সাড়ি দাঁতওয়ালা সমস্ত প্রাণীর মাংস খেতেই অনুমোদন দিয়েছেন। আমরা যতদূর দেখেছি, গরুর মুখেও দুই সাড়ি দাঁতই আছে। অতএব অন্তত মনুস্মৃতি অনুযায়ী গোমাংস ভোজন অসিদ্ধ নয়। তিনি সমস্ত প্রকারের মাংস খেতে পরামর্শ দিয়েছেন (৫/৩০), কেন না, একই ব্রহ্মা খাদ্য ও খাদক, সবই সৃষ্টি করেছেন। ভয় দেখিয়েছেন, যজ্ঞ করার সময় ব্রাহ্মণরা ভালো ভালো মাংস না খেলে পরবর্তী একুশ জন্মে যজ্ঞে বলির পশু হয়ে জন্মাতে হবে (৫/৩৫)। মনুর টিকাকার মেধাতিথি এবং রাঘবানন্দ এই ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতাই রাখেননি। [Bhandarkar 1940, 77.] মধুপর্ক প্রস্তুতিতে অন্যতম উপাদান হিসাবে গোমাংস ব্যবহার করার ব্যাপারে মনু (৩/১১৯-২০) পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশই দিয়ে গেছেন। যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতিরও একই বিধান (১/১০৯-১০)। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রও এই ব্যাপারে খুব নিষ্ঠার সাথে শাস্ত্রপন্থী (২/২৬/২৯)।
মহাভারতের বনপর্বে (২০৮/১১-১২) রাজা রন্তিদেবের গল্প বলা হয়েছে, যিনি প্রতিদিন নাকি দু হাজার প্রাণী বলি দিতেন এবং তার মধ্যে অবশ্যই গাভীও থাকত। উদ্যোগপর্বে একটি কাহিনিতে আছে এরকম একটি সাংঘাতিক ঘটনা: অগস্ত্য মুনি রাজা নাহুশাকে অভিশাপ দিয়ে স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, কারণ সেই রাজা বৈদিক বিধান অমান্য করে গরু বলি দিতে অস্বীকার করেছিল এবং সেই কাজ করার সময় একজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণকে অপমান করেছিল।
ভবভূতি তাঁর “উত্তররামচরিত” নাটকে দেখিয়েছিলেন, গৃহে বশিষ্ঠ মুনি আসবেন বলে বাল্মীকি একটি নধর গরু বলি দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর “মহাবীরচরিত” নাটকে কবি এও দেখিয়েছেন, বশিষ্ঠ মুনিও তাঁর গৃহে বিশ্বামিত্র, জনক, জামদগ্ন্য, প্রমুখ ঋষিকে আপ্যায়ন করার তাগিদে একটি হৃষ্টপুষ্ট বাছুর কেটেছেন এবং অতিথিদের বলছেন, রান্না হচ্ছে গাওয়া ঘি দিয়ে, একটু পরেই ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে তাঁদেরকে খেতে বসিয়ে দেওয়া হবে।
সেকালে মানুষের বিচারবুদ্ধি যে কিঞ্চিত ঠিকঠাক ছিল, তার প্রমাণ হচ্ছে, চরক সংহিতায় চিকিৎসাবিদ গর্ভবতী মহিলাদের এবং সন্ন্যাস রোগগ্রস্তদের গরুর মাংস খেতে বিশেষভাবে উপদেশ দিয়ে গিয়েছেন।
আশা করা যায়, উপরের পর্যালোচনা থেকে প্রাচীন ভারতের ভোজন ঐতিহ্য সম্পর্কে খানিকটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে। এটা সকলেই বুঝতে পারবেন যে ভারতের অধিবাসীদের ভোজনের তালিকা বিশ্বের অপরাপর দেশের মানুষদের তুলনায় বিরাট কিছু আলাদা ছিল না। ভাত ডাল শাক সবজির পাশাপাশি যেখানে যেমন তারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, সেই অনুযায়ী আমিষ ভোজনও করেছেন। স্বাভাবিক জীবন যাপনের নিয়ম মেনেই।

সংবিধান, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও খাদ্য নির্বাচনের অধিকার
সেকালের এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে এসে এবার আমরা এখানে আধুনিক কালের প্রেক্ষিতে কিছু নতুন যুক্তি তর্ক হাজির করব শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষদের ভেবে দেখবার জন্য। আমাদের প্রথম প্রশ্ন ধর্মনিরপেক্ষতা (secularism)-এর মাপকাঠিতে একজন সাধারণ নাগরিকের খাদ্য বিষয়ে সাংবিধানিক অধিকার কতখানি সুরক্ষিত সেই সম্পর্কে। ভারতের সংবিধান নাকি ভারত রাষ্ট্রকে একটা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলবার নির্দেশ দেয়। এই ব্যাপারে শুধু কংগ্রেস বা গান্ধীবাদীরা নন, বেশিরভাগ বামপন্থী দল এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবীদেরও বৃহৎ অংশ মনে করেন, এই “নাকি”-বাচক সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র হলেও ভারত সত্যি সত্যিই একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। বিশেষত, ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সংবিধানের ৪২-তম সংশোধনের মাধ্যমে এর মুখবন্ধে “ধর্মনিরপেক্ষ” ও “সমাজতান্ত্রিক” শব্দজোড়া যুক্ত করার দ্বারা এই কাজটি সুসম্পন্ন করে গেছেন!
বেশ। ধর্মনিরপেক্ষতা কথাটার মানে কী? এর সরল মানে হল, রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দেবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বী মানুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাবে না। অথবা কাউকে আলাদা করে বিরোধিতা করবে না। নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ ধর্মাচরণের অধিকার থাকবে, কিন্তু তা কখনই অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না। ভারতীয় রাষ্ট্র কি এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ?
না। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার মানে দাঁড় করানো হয়েছে সমস্ত ধর্মে সমান উৎসাহ প্রদান। যা আসলে এক অর্থে বহুধার্মিক চরিত্র নির্দেশ করে। এতে একে তো নাস্তিক দূরের কথা, এমনকি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসীদেরও কোনো জায়গা থাকে না; অপর দিকে, নামে বহুধার্মিক হলেও বাস্তবে, প্রশাসনিক যন্ত্রে হিন্দু আধিকারিকের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাবে, সরকারি কাজকর্ম ও রীতিনিয়ম শেষ পর্যন্ত হিন্দু ধর্মভিত্তিক হয়ে ওঠে। যে কোনো সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনে গেলে দেখা যায়, সেখানে হিন্দু ধর্মীয় প্রাচীন রীতিনীতি মেনেই কাজ হয়, রাষ্ট্রপতি হিন্দু শিখ বা মুসলমান বলে এর কোনো ব্যত্যয় হয় না। পাকিস্তানের সাথে ভারতের পার্থক্যটা তখন দাঁড়ায় এই রকম: ওরা যা বেশ জোরশোর সহ করতে পারে বা করেও থাকে, আমাদের দেশে সেই কাজগুলোই একটু আড়াল আবডাল রেখে করা হয়।
আপাতত এই গোমাংস প্রসঙ্গ ধরে একটা মাত্র উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে।
বিজেপি তো অনেক পরের কথা, জনসঙ্ঘও তখন ভারতের সংসদীয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক—এই রকম অবস্থাতে অধিকাংশ রাজ্যে পঞ্চাশের দশক থেকে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কাদের উদ্যোগে? কাদের শাসনকালে? সঙ্ঘ পরিবারের তখন এই দাপট ছিল না। কেন্দ্র ও সমস্ত রাজ্যে তখন কংগ্রেসেরই সরকার। তাদের তরফেই এই সব কার্যক্রম গৃহীত ও পালিত হয়েছে। তাদের দলের ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চবর্ণের নেতাকর্মীদের উদ্যোগেই। এবং সেটা জওহরলাল নেহরু, গোবিন্দবল্লভ পন্থ, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, প্রমুখ জবরদস্ত নেতাদের জীবদ্দশাতেই। যাঁরা সংবিধানকে নাকি ধর্মনিরপেক্ষ বানিয়েছেন, তাঁদের আমলে এটা সম্ভব হল কীভাবে? শ্রীমতী গান্ধী যখন শব্দটিকে দিয়ে সংবিধান অলঙ্কৃত করলেন, তখন তিনিই বা এই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলেন না কেন? তুলে দেওয়া তো দূরের কথা, তিনি বরং পরের খেপে ভোটে জিতে এসে ১৯৮২ সালে অতি-উদ্যোগী হয়ে নিষিদ্ধকারী রাজ্যগুলিকে গোহত্যা বন্ধে আরও তৎপর হতে (এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে গোমাংস গোপনে আমদানির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে) অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। প্রবীন পাঠকদের হয়ত মনে পড়ে যাবে, সেই সময় শ্রীমতী গান্ধী পাঞ্জাবের ভিন্দ্রানওয়ালাকে ব্যবহার করে পাঞ্জাবে উগ্র খালিস্তানি জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে অকালী দলের ভোট ব্যাঙ্কের দখল নিতে এবং তাকে হাতিয়ার করেই সারা দেশে প্রচ্ছন্ন হিন্দু কার্ড খেলে সদ্য গঠিত বিজেপি-র ভোট ব্যাঙ্কে কামড় বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন কীভাবে বারবার আশু সংকীর্ণ রাজনীতির কাছে পরাস্ত হয়েছে, সেই সব প্রসঙ্গ কখনও কংগ্রেসের অন্দর মহলে উঠেছে বলে আমরা শুনিনি।
আরও আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, নিজে একজন জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত কঠোর নিরামিষভোজী হওয়া সত্ত্বেও এবং দীর্ঘ দিন গোরক্ষা আন্দোলনের সমর্থক হয়েও স্বাধীনতার প্রাক্কালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কিন্তু সংবিধানে গোহত্যা নিবারণ আইন ঢোকানোর প্রস্তাবের খুব তীব্র ভাষায় বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে অহিন্দু জনসাধারণের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপ করার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল: “ভারতে তো শুধু হিন্দুরাই বাস করে না। এখানে মুসলমান, পার্শি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আছে। এই যে একদল হিন্দুর মনে হচ্ছে যে ভারতবর্ষ এখন থেকে শুধু হিন্দুদেরই দেশ এটা ভ্রান্ত ধারণা। . . . সুতরাং আমি বলব, সংবিধান রচনা পরিষদে যেন এটা নিয়ে কেউ চাপাচাপি না করেন।” [গান্ধী ১৯৬৯, ২৭৭-৮০] তিনি সেই ভাষণে কিছু চিত্তাকর্ষক বিষয়ের উত্থাপন করেছিলেন। ভারতের যে ব্যবসায়ীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গরু রপ্তানি করে জুতোর কারখানায় চামড়ার যোগান দেবার উদ্দেশ্যে, তাদের অধিকাংশই তো হিন্দু এবং ধর্ম বিশ্বাসী। তারা নিশ্চয়ই জানে, সেই সব গরু এবং সেই সব জুতোর মাঝখানে একটি ক্রিয়া আছে যার নাম (সমাসবদ্ধ পদ হিসাবে) সংক্ষেপে গোহত্যা! তা, সেটি বন্ধ করা হবে তো? ভারতের গ্রামাঞ্চলে যে বলদের কাঁধে লাঙল এবং গাড়ির জোয়াল তুলে দিয়ে বছরের পর বছর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়, তার নামও তিলে তিলে গোহত্যা নয় কি? এগুলো যদি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে রাজেন্দ্রবাবু যেন আর গোহত্যা নিবারণের প্রস্তাব নিয়ে না এগোন! [ঐ]
এখানে উল্লেখযোগ্য, সেই সময় রাজেন্দ্রপ্রসাদ ও অন্যান্য কিছু কংগ্রেসি মাতব্বরের উদ্যোগে বেশ কিছু কংগ্রেস কর্মী সংবিধান রচনা পরিষদে এরকম একটি প্রস্তাব উত্থাপন ও খসড়া সংবিধানে সংযোজনের ব্যাপক গণপ্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার চিঠিপত্র লিখিয়ে পরিষদের দপ্তরে পাঠাতে থাকেন দাবিটিকে একটি জনচরিত্র দানের লক্ষ্য নিয়ে। গান্ধীর প্রবল বিরোধিতার জন্যই তাঁর জীবদ্দশায় তাঁরা শেষ অবধি আর কুলিয়ে উঠতে পারেননি। (সঙ্ঘ পরিবারের নাথুরাম গড্‌সে কি আর সাধে গুলি চালিয়ে গান্ধীর মুখ চিরতরে বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল!! মৌলবাদ বিরোধী মুখ বন্ধের নৃশংস প্রয়াসের প্রথম সফল পরীক্ষাটির সম্পাদন কর্তা কিন্তু পাকিস্তানও নয়, বাংলাদেশ নয়—সেও এই “মেরা মহান” ভারতেরই অবদান!!) কিন্তু প্রচেষ্টা চালু ছিল। আম্বেদকরের সঙ্গে এই প্রশ্নে তাঁদের ব্যাপক বিতর্ক হয়। সংখ্যাধিক্যের নামে গা-জোয়ারি ব্যাপার একটা ছিলই। তাই ১৯৫০ সালে প্রকাশিত সংবিধানের চূড়ান্ত খসড়ায় দেখা গেল, নীতি নির্দেশক ধারাগুলিতে এরকম একটি (৪৮ নং) নির্দেশ তাঁরা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। হয়ত মাননীয়(!) গড্‌সের সম্মান(!!) রক্ষার খাতিরেই!!! আর তার জোরেই তাঁরা পরবর্তীকালে দেশের অধিকাংশ রাজ্যে এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফেলেছিলেন। গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি কংগ্রেসীদের আস্থার সত্যিই জবাব নেই!
এ তো গেল কংগ্রেসিদের কথা। বিরোধীদের অবস্থান কী ছিল এই প্রশ্নে? বামপন্থীদের তরফেও সংসদে বা কোনো বিধান সভায় সেই ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি করা হয়েছে বলে এই লেখকের জানা নেই। এমনকি, কোনো দলের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক ক্লাশেও কোনো মার্ক্সবাদী নেতা এই সব অপ্রিয় ও অনাকর্ষণীয় অভিপাদ্য উত্থাপন ও আলোচনা করেছেন বলে মনে হয় না। সজ্ঞানে বা না বুঝে বিষয়টিকে কার্যত আগাগোড়া অগ্রাহ্য করেই যাওয়া হয়েছে। এখন যদি বিজেপি সেই কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারিত করতে চায় এবং আরও কিছু রাজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে চায় (করে ফেলছেও), তার বিরুদ্ধে এদের কী-ই বা বলার আছে? ওরা অন্তত নতুন কিছু করছে না; তোমাদের দেখানো এবং মেনে নেওয়া রাস্তায় আরও দু-চার কদম বেশি এগোতে চাইছে। দুই বিজেপি শাসিত রাজ্য মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানায় সম্প্রতি গোহত্যা এবং গোমাংস ভোজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের নানা মুখিয়াদের তরফে শ্লোগান উঠেছে, “গরুকে জাতীয় পশু বলে ঘোষণা করা হোক।”
এবার প্রায়োগিক দিক থেকে বিষয়টা বিচার করে দেখা যাক।
সংবিধানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যেই আবেগের অন্ত নেই। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবার শুধু বিরোধী অবস্থানে নয়, সরকারি ক্ষমতায় আসীন হয়েও সংবিধান মেনে চলতে চায় না—এরকম অভিযোগ আমরা হামেশাই শুনে থাকি। কথাটা ভুল বা মিথ্যা নয়। সত্যিই ওদের মধ্যে বর্তমান সংবিধান মেনে চলার আগ্রহ বা প্রবণতা যথেষ্ট কম—এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ওরা নিজেরাও এই ব্যাপারে খুব একটা ধোঁয়াশা রাখেনি। সংবিধানের অনেক কিছুই যে ওরা মানতে পারে না বা মানতে চায় না—এই সত্য ওরা কখনই খুব একটা গোপন করে চলে না। কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা তো সংবিধান বলতে প্রায় অজ্ঞান। বামপন্থীরাও অনেকটা সেই রকমই করে থাকেন। খুব গদগদ ভাব দেখান।
সেই সংবিধানে সংখ্যালঘুদের নানা রকম অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটা বিশেষ ধারা আছে। ৩০গ ধারা। যাতে সংখ্যাগুরুর গরিষ্ঠতার ভারে বা চাপে তাদের ধর্ম বা ধর্মীয় সংস্কৃতি বা সামাজিক জীবনের সামনে অস্তিত্বের কোনো সঙ্কট আসতে না পারে। তারই সুযোগে মুসলিম পারিবারিক আইন সাংবিধানিকভাবে গ্রাহ্য হয়ে আছে। ধর্ম ও জীবন ধারণের অধিকারের মধ্যে ভোজন ও ভোজ্য নির্ধারণের অধিকারও নিশ্চয়ই নিহিত থাকে। আবার তাতে ৪৮ নং ধারাও সংযোজিত হয়ে রয়েছে। তাহলে কোনো রাজ্য সরকার যখন গোহত্যা ও গোমাংস ভোজনের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, সে তখন সংবিধানের এই ধারার জোরেই ৩০গ ধারাটিকেও অগ্রাহ্য করেই এটা করতে পারছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ভক্তিবাদীরা এই ব্যাপারে কী বলছেন? এই যে এত বছর ধরে কয়েকটি রাজ্যের সাংবিধানিক কর্তৃত্বকারী প্রতিষ্ঠান সুবিধামতো সংবিধানেরই একটি ধারা দেখিয়ে অন্য একটা বিশেষ ধারাকে অনায়াসে লঙ্ঘন করে চলেছে—তা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো রকম উত্তাপ সঞ্চারিত হয়নি বা হয় না কেন? কংগ্রেসের নেতারা কী বলেন? বামপন্থী দলগুলোই বা কী বলছেন এই সম্পর্কে? তাঁরা কি জানেন না, না বোঝেননি, নাকি, বুঝেও ভোটের খেলায় দুদিকেই একটু করে টিক দিয়ে রেখেছেন?
সঙ্ঘ পরিবার বরং এই জায়গায় খুব সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করছে। তারা সংবিধান থেকে সেই বিশেষ ধারাটিই তুলে দিতে চাইছে। যেমন তারা সংবিধানের কাশ্মীর সংক্রান্ত ৩৭০ নং ধারা তুলে দিতে চায়। (যদিও তারা আবার ঠিক তার পরের ৩৭১ নং ধারা কেন তুলে দেওয়ার কথা বলে না—সেই আলোচনায় এখন ঢুকব না।) সত্যিই তো। ৩০গ ধারা না থাকলে ওই রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে এখানে আমাদের উত্থাপিত এই অভিযোগটি আর তোলা যেত না।
বিচার বিভাগ এই ব্যাপারে কী করছে তাও আমাদের কাছে দেখবার বিষয়। আজকাল অনেক ব্যাপারে আদালত আগ বাড়িয়ে আইন বে-আইনের নানা সমস্যা সম্পর্কে মতামত এবং/অথবা পরামর্শ, এমনকি নির্দেশও দিয়ে দিচ্ছে। অথচ, এই যে এতগুলি রাজ্য সরকার সংবিধানের একটা মৌলিক অসঙ্গতি নিশ্চিন্তে ব্যবহার করে চলেছে, এর বিরুদ্ধে তাঁদের কোনো বক্তব্য নেই কেন—সেই প্রশ্নও আমরা তুলতে বাধ্য হচ্ছি।
আরও আশ্চর্যজনক হচ্ছে এই ঘটনা যে ৩০গ ধারা বলে মুসলিম পারিবারিক আইনের জোরে একজন মুসলমান পুরুষের একসঙ্গে চার জন স্ত্রীকে ঘরে রাখার অধিকার সম্পর্কে তাঁদের কারোর খুব একটা কোনো আপত্তি নেই (যেটি আধুনিক জীবনধারা ও সভ্যতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী), কিন্তু দুনিয়াভর নব্বই শতাংশ মানুষের আধুনিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে তাদের গোমাংস ভক্ষণের অনুমোদন দিলেই নাকি দেশ রসাতলে যাবে!
বেঁচে থাকলে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় আজ আবারও হয়ত নতুন কোনো নাটকে সেই গ্রিক সম্রাট সিকন্দরের মুখে তাঁর সেনাপতির উদ্দেশে কিছু সংলাপ বলাতে চাইতেন!

গরু: দেবতা ও কৃষিবন্ধু
একথা সকলেই জানেন, গোমাংস ভোজনের বিরুদ্ধে সঙ্ঘ পরিবারের প্রধান আপত্তি দুটি: প্রথমত, গরু হচ্ছে হিন্দুদের দেবতা স্বরূপ; মাতা ভগবতী; মাতৃরূপিনী। দ্বিতীয়ত, গরু ভারতবর্ষে কৃষি কাজের সহায়ক বলেই গোহত্যা সমাজ অর্থনীতির পক্ষে হানিকারক। সেই কারণেই শাস্ত্রকাররা(?) নাকি গরুকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করতে নির্দেশ দিয়ে কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতিকে রক্ষা করার সুন্দর বন্দোবস্ত করেছিলেন। এই সব যুক্তি এ দেশের হিন্দু ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ মানুষকে বেশ খানিকটা আকৃষ্ট করে থাকে।
এই দুটি যুক্তি শুধু যে বিজেপি বা আরএসএস দিয়ে থাকে এমন নয়। বহু শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, যাঁরা হয়ত হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থক নন, বরং বামপন্থী ও প্রগতিশীল, তাঁরাও দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে, যাঁরা এই দুই যুক্তিতে আস্থা প্রদর্শন করেন তাঁরা সকলেই যে ওদের মতো তীব্র মুস্লিম বিদ্বেষী বা সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে এরকম ভেবে থাকেন, তা নয়। আসলে যে জিনিসটা এঁদের সকলের মধ্যেই সমান ভাবে কাজ করে যায় তা হচ্ছে দুই ব্যাপারেই সঠিক জ্ঞানের স্পষ্ট অভাব।
প্রথম বিষয়টা নিয়ে আগে বলি। ধর্মীয় বিশ্বাস হিসাবে এর জোর অনেক বেশি। অথচ হিন্দু ধর্মের সাথে (অন্তত আজ যে আকারে হিন্দু ধর্মকে আমরা দেখতে পাই তার সাথে) গরুর সম্পর্ক খুব কম। এই সম্পর্কে আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের কাজ অনেকটাই সহজ করে দিয়ে গেছেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি দেখিয়েছেন: “There was a time in this very India when, without eating beef, no Brahmin could remain a Brahmin; you read in the Vedas how, when a Sannyasin, a king, or a great man came into a house, the best bullock was killed; how in time it was found that as we were an agricultural race, killing the best bulls meant annihilation of the race. Therefore the practice was stopped, and a voice was raised against the killing of cows.” যার অনুদিত ভাষ্য হল: “এই ভারতেই একটা সময় ছিল, যখন গোমাংস ভোজন না করলে কোনো ব্রাহ্মণের ব্রাহ্মণত্ব থাকত না। বেদপাঠ করলে দেখতে পাবে, কোনো বড় সন্ন্যাসী বা রাজা বা অন্য কোনো বড়লোক এলে ছাগল ও গোহত্যা করে তাঁদেরকে ভোজন করানোর প্রথা ছিল। ক্রমশ সকলে বুঝল—আমাদের জাতি প্রধানত কৃষিজীবী, সুতরাং ভালো ভালো ষাঁড়্গুলি হত্যা করলে সমগ্র জাতি বিনষ্ট হবে। এই কারণেই গোহত্যা-প্রথা রহিত করা হল—গোহত্যা মহাপাপ বলে পরিগণিত হল।” [স্বামী বিবেকানন্দ ১৯৮৯ক, ৪৮; সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরিত ও আধুনিক বানান রীতি প্রযুক্ত। শেষ বাক্যটির শেষাংশ লক্ষ করুন; স্বামীজীর মূল ভাষণে না থাকলেও অনুবাদে কীভাবে “পাপ” কথাটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।]
বিবেকানন্দ অন্যত্র এও বলেছেন, “You will be astonished if I tell you that, according to the old ceremonials, he is not a good Hindu who does not eat beef. On certain occasions he must sacrifice a bull and eat it. That is disgusting now. However they may differ from each other in India, in that they are all one—they never eat beef. The ancient sacrifices and the ancient gods, they are all gone; modern India belongs to the spiritual part of the Vedas.” অনুবাদে যা দাঁড়িয়েছে এই রকম: “আপনারা শুনলে বিস্মিত হবেন যে, প্রাচীন প্রথানুসারে—যে-হিন্দু গোমাংস ভক্ষণ করে না, সে খাঁটি হিন্দুই নয়। কোনো কোনো উৎসবে তাকে গোবধ করতেই হত, গোমাংস ভক্ষণ করতেই হত। আর আজ সেই প্রথা একেবারে বীভৎস বলে গণ্য হয়ে থাকে। অন্য সব বিষয়ে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে মত পার্থক্য থাকলেও এ-বিষয়ে আজ সবাই একমতাবলম্বী। কেউ আর এখন গোমাংস ভক্ষণ করে না। প্রাচীন যুগের দেবদেবী, প্রাচীন যুগের পশুবলি সবই লুপ্ত হয়েছে, চিরদিনের মতো লুপ্ত হয়েছে। আর বর্তমান ভারতবর্ষ বেদের আধ্যাত্মিক অংশটুকু গ্রহণ করেছে।” [স্বামী বিবেকানন্দ ১৯৮৯খ, ২৯৭; আধুনিক বানান রীতি প্রযুক্ত। মাঝখানে “disgusting” শব্দটির অনুবাদ লক্ষ করুন; স্বামীজীর মূল ভাষণ থেকে অনুবাদে কীভাবে গোমাংস ভোজনকে নিন্দনীয় করে তোলার উপযোগী একটা শব্দ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।]
সাধারণত, ধর্মবিশ্বাসীরা ধরে নেন, প্রাচীন শাস্ত্রে যা যা নির্দেশ লেখা ছিল, মানুষের ধর্মীয় রীতিনীতি সেকালে সেইভাবেই পরিচালিত হত। বর্তমানে ধর্মের অনেক বিকৃতি সাধন ঘটেছে, কিন্তু তখনকার মানুষ ধর্মের নিয়ম কানুন ঠিকঠাক মেনে চলত। তাই যদি হয়, আর বিবেকানন্দের কথায় যদি বিশ্বাস স্থাপন করা যায়, তাহলে এটা মেনে নিতেই হবে যে সনাতন হিন্দু ধর্মে গরুর মাংস খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা তো নেইই, বরং এই গোমাংস খাওয়ার মধ্যেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্ম পালনের রীতি নিহিত। বিভিন্ন ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রে যে মধুপর্ক ব্যবহারের পৌনঃপুনিক উল্লেখ পাওয়া যায়, তাতে বিবিধ প্রকারের মাংস থাকে, গোমাংসও তার এক অন্যতম উপকরণ। তাই কোনো প্রাচীন শাস্ত্রেই এর উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাহলে পরবর্তীকালে সেই একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে তাদেরই শাস্ত্র-বিরোধী এরকম একটা উলটো রীতি প্রচলিত হয়ে এল কোত্থেকে?
এইখানে এসে বিবেকানন্দই আবার যে উত্তর দিয়েছেন সেটাই অনেকের কাছে খুব সন্তোষজনক মনে হয়েছে। কৃষির স্বার্থে গরুকে বাঁচানোর জন্যই নাকি এই নিয়ম এসেছিল। আর সেই সঙ্গে এও অনেকে যোগ করে দেন, বিবেকানন্দও দিয়েছিলেন, বুদ্ধ-মহাবীর প্রমুখ সেকালের নব ধর্ম প্রবর্তকরা বৈদিক পশুবলির বিরুদ্ধে প্রাণীহত্যার বিরুদ্ধে অহিংসার যে নৈতিক আবেদন প্রচার করেছিলেন, তাতে সাড়া দিয়েই নাকি ধীরে ধীরে হিন্দুসমাজে গোমাংস ভক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। আরও পরে এটাই শেষ পর্যন্ত তাদের ধর্মীয় রীতি হয়ে দাঁড়ায়।
আপাত দৃষ্টিতে এরকম একটা নিবিড় ধর্মনিস্পৃহ আর্থসামাজিক থিসিস খুব সহজেই আমাদের সংস্কারমুক্ত উদার মনকে আকৃষ্ট করে। যুক্তির ফাঁক-ফোকরগুলি দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। তাই আমি মনে করি: এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আপত্তির কথাটাও জেনে নেওয়া খুব জরুরি। “ঘরে-বাইরে” উপন্যাসের শেষ ভাগে নিখিলেশ-এর মুখ দিয়ে তিনি এই সম্পর্কে যে বয়ানটি তুলে ধরেছিলেন, সেটি শুধু যে যুক্তি হিসাবে অকাট্য তাই নয়, এই ধরনের সামাজিক ইতিহাসের প্রসঙ্গে আমাদের কীভাবে যুক্তি তর্ক বিচার বিবেচনা করতে হবে সেই দিকে একটি অমূল্য দিক-নির্দেশও বটে। বুদ্ধ বা মহাবীর শুধু তো গরু নয়, সমস্ত পশু বলির বিরুদ্ধেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। হিন্দুরা বেছে বেছে তার থেকে শুধু গরুকে রক্ষা করার দায়িত্ব মেনে নিল, আর বাকিদের আগের মতনই মারতে এবং খেতে লাগল—এটাকে কীভাবে এবং কতটা বুদ্ধের শিক্ষা বলে চালানো যায়? বা, আদৌ যায় কি? কৃষির ক্ষেত্রেও তাঁর একই রকম প্রশ্ন: কৃষিতে শুধু গরু নয়, মোষও কাজে আসে। সেই আদ্যি কাল থেকেই। এবং সারা ভারত জুড়েই। দুধ ঘি পেতে এবং খেতেও উভয়কেই লাগে। অথচ, কৃষির নামে গোহত্যা বন্ধ হল, মোষ বলি বন্ধ হল না—এ কেমন কথা? [ঠাকুর ১৯৯৫, ৫৬৮-৬৯]
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ধর্মাশ্রিত ও ধর্মাতীত—কোনো দিক থেকেই গোহত্যা নিবারণ ও গোমাংস ভোজন নিষেধের পক্ষে সামাজিক-ঐতিহাসিক সূত্র ধরে আলাদা করে কোনো যুক্তি তর্ক সাজানো যাচ্ছে না। আমরা এর সাথে আমাদের কালের আধুনিক জ্ঞান ও যুক্তি পরম্পরার ভিত্তিতে আরও কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই।
এক, সমগ্র বৈদিক যুগের বৈশিষ্ট্য ছিল পশু পালন ও পশু শিকার। উন্নত কৃষি ভিত্তিক হরপ্পা নগর সভ্যতার ধ্বংসের পর উত্তর ভারতে নবাগত বৈদিক জনজাতির লোকদের মধ্যে কৃষি সেকালে প্রচলিত হয়নি, কৃষি ভিত্তিক সমাজের কোনো সমস্যাই তাদের সামনে উপস্থিত হয়নি। যজ্ঞ এবং পশুবলি ছিল শিকার ও ভোজনের সপক্ষে ম্যাজিক সংস্কৃতির কিছু প্রথা-প্রকরণ। সংগঠিত সমাজে দৈনন্দিন ভোজনে ছোট ছোট পশুপাখি ব্যবহার করা হত। বিশেষ বিশেষ দিনে, উৎসব আনন্দের দিনে, অতিথি আপ্যায়নে, বৃহৎ পশু বলি দিয়ে ভোজনের মেনু সমৃদ্ধ করা হত। গরু মোষ ঘোড়া—হাতের কাছে যা পাওয়া যেত তাকেই খরচ করা হত। ভোজনের বাইরে ঘোড়ার ব্যবহার ছিল ব্যক্তি পরিবহনে এবং যুদ্ধসংঘর্ষে, গরু মোষের ব্যবহার ছিল দুধ ঘি সংগ্রহে এবং মাল পরিবহনে। আর এই কারণেই বহুকাল পর্যন্ত গরু ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ দানসামগ্রী।
দুই, এরই ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধযুগের আশপাশে যখন ভারতে আবার কৃষির প্রচলন হল, তখন থেকে গরু-মোষের লাঙল বহনের কাজ বাড়ল। কিন্তু ভারতে যে সংখ্যায় গরু এবং মোষ পাওয়া যায়, তাদের যা প্রজনন হার, এবং অতীতে দেশে যতটা মুক্ত ও সামূহিক চারণ ভূমি ছিল, তাতে গোহত্যা ও ভোজনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে গভীর সঙ্কট ঘটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হত না। কিংবা, মুসলমান রাজত্বের সাতশ বছরের কোনো সময়েই শোনা যায়নি যে তাদের গোমাংস ভোজনের ফলে চাষবাসে গরুর অভাব ঘটে গিয়ে দারুণ অসুবিধা হয়েছে। এমনকি অবিভক্ত যে বাংলার সংখ্যাগুরুই ছিল মুসলমান, সেখানেও কখনও গরুর অভাবে চাষ বন্ধ হয়ে গেছে বলে কেউ অভিযোগ করেনি। এর সাথে (গোমাংস-ভোজী) ইউরোপীয় আমলকে যোগ করলে এরকম অসুবিধা তো আরও বেশি করে হওয়ার কথা ছিল। তাও হয়েছে বলে আমরা আজ অবধি শুনিনি। অন্তত ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে এরকম কথা কেউ লেখেনি। ইংরেজ আমলে ১৮৭০ এবং ১৯৪৩ সালের দুটো ভয়াবহ মন্বন্তর হয়েছিল। সেই দুর্ভিক্ষেরও কোনোটাই গরু বা মোষের অভাবে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে হয়নি। ইংরেজ শাসকদের এবং দেশি লুটেরাদের অতিলোভের ফাঁদে পড়েই সেই দুই দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল। সুতরাং ভারতীয় প্রেক্ষাপটে গরু-কৃষি সমীকরণের বাস্তব অস্তিত্ব আমাদের সাদা চোখে কোনো দিক থেকেই ধরা পড়ছে না।
তিন, এই গরু-কৃষি সমীকরণের যুক্তিটিকে মেনে নেবার আর একটা বড় সমস্যা আছে। সেটার কথাও বিজেপি-পন্থী বা বামপন্থী—কাউকেই ভাবতে বা বলতে দেখছি না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, এই ব্যাখ্যাটা সত্য। তাহলে, এখন যখন সমগ্র দেশেই চাষের প্রক্রিয়ায় যন্ত্র ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে, গরুর সংখ্যা তখন তো বিপুল পরিমাণে উদ্বৃত্ত হয়ে পড়ার কথা। কৃষি এবং পরিবহন—কোনো জায়গাতেই এখন আর গরুবলদের ব্যবহার নেই। (প্যাঁচালো লোকেরা বলে, সেই জন্যই নাকি কংগ্রেস নেতৃত্ব তাঁদের চুনাবি প্রতীক জোড়া বলদ এবং গাইবাছুর ইত্যাদি পরিত্যাগ করে সামান্য অগ্রসর হয়ে মানুষের হাত ব্যবহার করতে শুরু করেছে।) এত উদ্বৃত্ত গরু নিয়ে এখন করবেনই বা কী, রাখবেনই বা কোথায়? তাদের খাওয়াবেন কী? সেই আয়তনের চারণ ভূমিই বা কোথায় পাবেন? ধর্মে বা শাস্ত্রে যখন নিষিদ্ধ নয়, চাষেও আর একেবারেই কাজে লাগছে না, তখন আর আপনারা গোমাংস নিয়ে শুধু শুধু এত হইচই করছেন কেন? আপনাদের প্রদত্ত যুক্তি মেনেই তো গোমাংস ভোজন এখন সচ্ছন্দে চলতে পারে! দীর্ঘদিনের অভ্যাস বদলের জন্য নিজেরা যদি খেতে না-ও চান, যারা চায় তাদের একটা সস্তার স্বাস্থ্যকর আমিষ ভোজনে বাধা দেবেন কেন?
চার, আর একটি ঘটনা এই ডামাডোলের মধ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। সম্প্রতি ২০১৫ সালের এক সংবাদে প্রকাশ, গবাদি (গো + মোষ) মাংস রপ্তানিতে সারা বিশ্বে ব্রাজিল যেখানে ২০ লক্ষ টন সরবরাহ করে দ্বিতীয় স্থানে ছিল, সেখানে প্রথম স্থানটি কে অধিকার করেছে জানেন কী? বিজেপি-আরএসএস ঘোষিত পবিত্র গোভূমি ভারতবর্ষ। তার রপ্তানির পরিমাণ ২৪ লক্ষ টন। [Source: The Hindu, 10 August 2015.] পাছে কেউ সন্দেহ করেন, মোষ রপ্তানিকেই সেকু-মাকুরা গরু রপ্তানি বলে চালিয়ে দিচ্ছে, সেই পত্রিকাটির দিল্লি সংস্করণ রপ্তানিতব্য পশুভর্তি কয়েকটি ট্রাকের রঙিন ছবিও ছাপিয়ে দিয়েছে। তাতে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে, কালো রঙের পশুগুলো গরু বা মোষ দুই-ই হতে পারে, কিন্তু সাদাগুলো যে গরু তাতে কোনো ধন্দ জাগবে না। এই রপ্তানি প্রক্রিয়ায় জ্যান্ত গরুগুলিকে কোথায় কাটা হয়েছে, ভারতে না বিদেশে, সেটা—এমনকি গান্ধীর মতেও—আদৌ বড় কথা নয়। ভারতীয় হিন্দুরাই যে কাটা হবে জেনেই এই রপ্তানি করে চলেছে সেটাই সবচাইতে বড় কথা! ফলে বর্তমানে এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, রপ্তানি করার ক্ষেত্রে এই হিন্দু ধার্মিক ব্যবসায়ীদের ডলার আমদানিতে যাতে ঘাটতি না পড়ে, সেই জন্যই হয়ত সঙ্ঘ পরিবারের গোরক্ষার স্বার্থে এত উল্লম্ফন-উলঝম্পন!

গরুমোষ আর দেবাসুর!
এই সব প্রশ্ন ধরে আর সামান্য কিছুটা এগোলেই আমরা আলোচ্য সমস্যার একেবারে মূলে পৌঁছে যেতে পারব এবং সমাধানেরও কিঞ্চিত হদিশ হয়ত পেয়ে যাব।
এবার সেই কথা।
সকলেই জানেন, হিন্দু ধর্মের ক্ষেত্রে বৌদ্ধ খ্রিস্টান বা ইসলাম ধর্মগুলির মতো কেন্দ্রীয় শাস্ত্র গ্রন্থ, অনুশাসন, আচারবিধি, (এক বা বহু বচনে) নির্দিষ্ট দেবতা বা দেবমণ্ডলি, সামাজিক রীতি—কোনো কিছুই নেই। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যাকে জনজাতীয় ধর্ম (tribal religion) বলা হয়, তার মতোই এর সমস্ত প্রকরণই প্রকটভাবে আঞ্চলিক, সর্বাত্মবাদী (animistic) এবং খণ্ডিত। খাদ্যাখাদ্য বিচারে চূড়ান্ত বিভিন্নতা। নাম বাদ দিলে এর মধ্যে প্রতি এক দেড়শ কিলোমিটারে সমস্ত আচার আচরণ দেবদেবী পালটে যায়। যে দুর্গা দেবী সম্পর্কে স্মৃতি ইরানী লোকসভায় প্রায় নাটুকে একখানা বক্তৃতা দিয়ে ফেললেন, পশ্চিম বঙ্গের বাইরে অবাঙালি হিন্দুদের মধ্যে তার কোনো চর্চাই নেই। ছট পুজো নিয়ে হিন্দি ভাষী হিন্দুর এত তীব্র আবেগ, বাংলা বা অন্ধ্রে তার কোনো গ্রাহ্যতাই দেখা যায় না। এমনকি, বিয়ের কায়দাকানুন মন্ত্রটন্ত্র আচার বিচার পোশাক—সবই অন্য রকম হয়ে যায়। এটা হিন্দু ধর্মের কোনো উদারতা বা প্রসারতা থেকে আসেনি। মার্ক্সীয় সমাজতাত্ত্বিক বিচারধারা প্রয়োগ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে আমার ধারণা, এর পেছনে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক কারণে প্রাচীন ভারতীয়দের সমাজ বিকাশের ইতিহাসে বিক্ষিপ্ত অশ্রেণিক জনজাতি জীবন (pre-class consensual tribal culture) থেকে শ্রেণিবিভক্ত রাজনৈতিক কেন্দ্রীয় সমাজকাঠামো (class-divided political society)-তে উত্তরণের পথে অগ্রগতির অসম্পূর্ণতা। অর্থাৎ, আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক এবং/অথবা কেন্দ্রীয়ভাবে শ্রেণি সমাজের আবির্ভাব ঘটলেও সর্বত্রই মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মনন জগতে বিভিন্ন জনজাতির বিচিত্র আঞ্চলিক ও স্বতন্ত্র অভ্যাস আচার ও প্রথাসমূহ অনুভূমিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে প্রায় অপরিবর্তনীয়ভাবে টিঁকে গেছে। তার ফলে সনাতন হিন্দু ধর্ম বলে যাই বলা হোক না কেন, তা শেষ বিচারে কোনো না কোনো আঞ্চলিক উপাসনা পদ্ধতির প্রতিরূপ ছাড়া আর কিছু নয় [এই বিষয়টি আমি আমার “প্রসঙ্গ ধর্ম: উদ্ভব ও বিবর্তন” (১৯৯২) বইতে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছি]। উনিশ শতকের মধ্য ভাগে হোরেস উইলিয়াম সাহেব গবেষণা করে সারা (অবিভক্ত) ভারতে ৪৫টি উপাসক সম্প্রদায়ের দেখা পেয়েছিলেন। শেষ ভাগে অনুসন্ধান করে অক্ষয় কুমার দত্ত পেয়েছিলেন ১৮০টি সম্প্রদায়। এই কারণেই শুধু হিন্দু বললে একজন গড় হিন্দু ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে কিছুই বোঝা বা বোঝানো যায় না। তিনি শাক্ত না শৈব, বৈষ্ণব হলে তিনি রামাচারী না কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণব, তিনি নিরামিষভোজী ব্রাহ্মণ না সুস্বাদু মাংসপ্রিয় ব্রাহ্মণ—এই রকম অসংখ্য পরিচয় লিপিবদ্ধ করতে হয়। আর প্রত্যেকেই ভাবেন, তাঁরটাই আসল হিন্দুত্ব, খাঁটি হিন্দু ধর্ম।
সৌভাগ্যের কথা হল, এই ব্যাপারেও স্বামী বিবেকানন্দের খুব সুনির্দিষ্ট কিছু কথা আছে। “We must also remember that in every little village-god and every little superstition custom is that which we are accustomed to call our religious faith. But local customs are infinite and contradictory. Which are we to obey, and which not to obey? The Brâhmin of Southern India, for instance, would shrink in horror at the sight of another Brahmin eating meat; a Brahmin in the North thinks it a most glorious and holy thing to do—he kills goats by the hundred in sacrifice. If you put forward your custom, they are equally ready with theirs. Various are the customs all over India, but they are local. The greatest mistake made is that ignorant people always think that this local custom is the essence of our religion.” এর অনুবাদ: “. . . আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, আমরা সচরাচর যেগুলিকে আমাদের ধর্মবিশ্বাস বলি, সেগুলি আমাদের নিজ নিজ ক্ষুদ্র গ্রাম্যদেবতা-সম্বন্ধীয় এবং কতগুলো ক্ষুদ্র কুসংস্কারপূর্ণ দেশাচার মাত্র। এরকম দেশাচার অসংখ্য এবং পরস্পর-বিরোধী। এদের মধ্যে কোনটি মানব, আর কোনটি মানব না? উদাহরণ-স্বরূপ দেখ, দাক্ষিণাত্যের একজন ব্রাহ্মণ অপর ব্রাহ্মণকে এক টুকরো মাংস খেতে দেখলে ভয়ে দুশ হাত পিছিয়ে যাবে; আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ কিন্তু মহাপ্রসাদের অতিশয় ভক্ত, পুজোর জন্য তিনি শত শত ছাগল বলি দিচ্ছেন। তুমি তোমার দেশাচারের দোহাই দেবে, তিনি তাঁর দেশাচারের দোহাই দেবেন। ভারতের বিভিন্ন [প্র]দেশে নানাবিধ দেশাচার আছে, কিন্তু প্রত্যেক দেশাচারই স্থান বিশেষে আবদ্ধ; কেবল অজ্ঞ ব্যক্তিরাই নিজ নিজ পল্লীতে প্রচলিত আচারকে ধর্মের সার বলে মনে করে, এটা তাদের মহাভুল।” [স্বামী বিবেকানন্দ ১৯৮৯ক, ৪৭; সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরিত ও আধুনিক বানান রীতি প্রযুক্ত।]
এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, দেশে এবং বিদেশে নানা বক্তৃতায় অদ্বৈত বেদান্তের “একমেবাদ্বিতীয়ম” ব্রহ্মের সপক্ষে অনেক ভালো ভালো গুরুগম্ভীর আলোচনা করলেও, এবং যথেষ্ট সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও, ব্যবহারিক জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ নিজেও ছিলেন তাঁর গুরুর মতোই একজন মনেপ্রাণে শাক্ত (মাংসভোজী) ভোজন রসিক বাঙালি ধর্মতাত্ত্বিক।
স্বভাবতই তিনি উত্তর ভারতীয় রামাচারী বৈষ্ণবদের এবং বিশুদ্ধ-বেদপন্থী আর্যসমাজীদের নিরামিষ আহারকেন্দ্রিক ধর্মাচরণ একেবারেই পছন্দ করতেন না। সম্ভবত, তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, গোহত্যা বিরোধী আন্দোলনের উৎসও সেই উত্তর আঞ্চলিক বৈষ্ণব পন্থাই। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল স্বামী দয়ানন্দের আর্যসমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আর, সুলতান ও মোগল রাজত্বের পত্তন ও বিস্তার শুরুও হয়েছিল এই উত্তর ভারত থেকেই। হিন্দুসমাজের উপরতলার লোকেরা মুসলমান রাজাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ রক্ষা করে গেছে। ফলে তখন থেকে নিজেদের আচার আচরণে একটা স্পষ্ট পার্থক্য চিহ্নিত করতে চেয়ে গোমাংসের প্রতি প্রথমে নির্লোভ হয়ে উঠেছে এবং পরে সেটাই তাদের এক সাধারণ ধর্মীয় অনুশাসনে পরিণত হয়েছে। আর তখন থেকে বুদ্ধ, কৃষি ইত্যাদির সন্ধানও শুরু করতে হয়েছে। কেন না, ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রে এরকম নির্দেশ পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
স্বামী বিবেকানন্দ নিজে যেহেতু উত্তর ভারতের রাজপুত রাজাদের মধ্যে একটা ভালো সময় খুব অন্তরঙ্গভাবে কাটিয়েছিলেন, তাঁর এই সব তথ্য নিশ্চয়ই অজানা ছিল না। পছন্দও করেননি। হয়ত এই কারণেই ১৮৯৭ সালে এক দিন বাগবাজারের বাড়িতে এরকম গোভক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্বামীজির সাক্ষাতকারের যে বিবরণ পাই, তাতে তাঁর ক্ষোভ যেন প্রায় বিস্ফোরণের আকারে ফেটে পড়েছিল। সেই সাক্ষাতকারের একটু বিস্তৃত উদ্ধৃতি বোধ হয় এই প্রবন্ধের অলঙ্করণে সহায়ক হতে পারে।
“গোরক্ষিণী সভার জনৈক উদ্যোগী প্রচারক স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে এলেন . . . [এবং] স্বামীজিকে অভিবাদন করে গোমাতার একটা ছবি তাঁকে উপহার দিলেন। . . .
স্বামীজি। আপনাদের সভার উদ্দেশ্য কী?
প্রচারক। আমরা দেশের গোমাতাগণকে কসাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করে থাকি। জায়গায় জায়গায় পিঁজরাপোল স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে রুগ্ন, অকর্মণ্য এবং কসাইয়ের হাত থেকে কেনা গোমাতাগণ প্রতিপালিত হন।
স্বামীজি। এ অতি উত্তম কথা। আপনাদের আয়ের পন্থা কী?
প্রচারক। দয়াপরবশ হয়ে আপনাদের মতো মহাপুরুষ যা দেন তার দ্বারাই সভার ওই কাজ নির্বাহ হয়।
স্বামীজি। আপনাদের গচ্ছিত কত টাকা আছে?
প্রচারক। মারোয়াড়ি বণিকসম্প্রদায় এই কাজের বিশেষ পৃষ্ঠপোষক। তাঁরা এই সৎ কার্যে বহু অর্থ দিয়েছেন।
স্বামীজি। মধ্য-ভারতে এবার ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ভারত গভর্নমেন্ট নয় লক্ষ লোকের অনাহারে মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করেছেন। আপনাদের সভা এই দুর্ভিক্ষের সময়ে কোনো সাহায্যদানের আয়োজন করেছে কি?
প্রচারক। আমরা দুর্ভিক্ষাদিতে সাহায্য করি না। কেবলমাত্র গোমাতাদের রক্ষা কল্পেই এই সভা স্থাপিত।
স্বামীজি। যে দুর্ভিক্ষে আপনাদের জাতভাই লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হল, সামর্থ্য সত্ত্বেও আপনারা এই ভীষণ দুর্দিনে তাদের অন্ন দিয়ে সাহায্য করা উচিৎ মনে করেননি?
প্রচারক। না। লোকের কর্মফলে—পাপে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল; যেমন কর্ম তেমনি ফল হয়েছে। . . .
স্বামীজি। যে সভা-সমিতি মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে না, নিজের ভাই অনশনে মরছে দেখেও তার প্রাণ রক্ষার জন্য একমুঠো অন্ন না দিয়ে পশুপাখি রক্ষার জন্য রাশি রাশি অন্ন বিতরণ করে, তার সঙ্গে আমার কিছুমাত্র সহানুভূতি নেই; . . . কর্মফলে মানুষ মরছে—এরকম কর্মের দোহাই দিলে জগতে কোনো বিষয়ে চেষ্টাচরিত্র করাই একেবারে বিফল বলে সাব্যস্ত হয়। আপনাদের পশুরক্ষার কাজটাও বাদ যায় না। ওই কাজ সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে—গোমাতারা নিজ নিজ কর্মফলেই কসাইদের হাতে যাচ্ছেন ও মরছেন, আমাদের ওতে কিছু করবার প্রয়োজন নেই।
প্রচারক (থতমত খেয়ে)। হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন তা সত্য; কিন্তু শাস্ত্র বলে গরু আমাদের মাতা।
স্বামীজি (হাসতে হাসতে)। হ্যাঁ, গরু যে আমাদের মা, তা আমি বিলক্ষণ বুঝেছি—তা না হলে এমন সব কৃতি সন্তান আর কে প্রসব করবেন?” [স্বামী বিবেকানন্দ ১৯৮৯গ, ৩-৪; সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় এবং আধুনিক বানান রীতিতে রূপান্তরিত।]
লক্ষণীয়, এই কারণেই সঙ্ঘ পরিবার তাদের প্রচার যন্ত্রে বিবেকানন্দের অন্যান্য অনেক ধর্মীয় বক্তব্য ব্যবহার করলেও, গরু সম্পর্কে তাঁর মতামত নিজেদের সদস্যদের কাছেও লুকিয়ে রাখারই চেষ্টা করে থাকে। এই সাংস্কৃতিক আঞ্চলিকতার দ্বন্দ্বের খবর তারাও রাখে এবং বোঝে বলেই মনে হয়।
তবে, এখানে আমাদের আগের কথার সূত্র ধরে প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধু গরুই বা কেন? মোষও নয় কেন? মোষও কেন মা না হোক, নিদেন পক্ষে হিন্দুদের মাসীও হতে পারল না?
হ্যাঁ, খুবই যথার্থ প্রশ্ন। ন্যায্য প্রশ্ন।
এর উত্তর আসলে গরু আর মোষের জৈব বা প্রজাতিগত আচরণের মধ্যে নিহিত বলেই মনে হয়। যাঁরা গ্রামাঞ্চলে গরু এবং মোষের আচরণ খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছেন, তাঁরা হয়ত জানেন যে গৃহপালিত পশু হিসাবে গরু বা ঘোড়া যতটা মানুষের পোষ মেনে যায়, মোষের ক্ষেত্রে তা হয় না। ফলে গরু সম্পর্কে কৃষি-সংশ্লিষ্ট মানুষের মনে যে নৈকট্যবোধ জন্মায়, তাকে নিয়ে নানা ধরনের মানবিক আচার আচরণ উপরস্থাপন (superimpose) বা প্রক্ষেপন (project) করার যে অবকাশ থাকে, মোষেরা সেই সুযোগ মানুষকে দেয় না। এমতাবস্থায়, হিন্দুধর্মের প্রায়-জনজাতি সাংস্কৃতিক স্তরে অবিবর্তিত থাকার কারণে সম্ভবত খুব সহজেই উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ্য চিন্তায় গরু দৈবী গুরুত্ব লাভে সক্ষম হয়েছে, আর পাশাপাশি মোষের উপর আরোপিত হয়েছে তথাকথিত নিম্নবর্ণ তথা অসুরের জন্মদাতৃত্ব। আর এই সমস্ত উপস্থাপনাই যেহেতু উত্তর ভারতের লোকসংস্কৃতির বিকাশের সাথে সম্পর্কিত আঞ্চলিক ঘটনা, সেখানে চেতনে-অচেতনে গরু আর মোষের মধ্যে দেবাসুরের দ্বন্দ্ব ঢুকে বসে আছে। এই দ্বন্দ্বের আবেদন মাঝে মাঝে প্রভাব ফেললেও, শাক্ত সংস্কৃতির দাপটের ফলে পূর্ব ভারতে তা কখনই খুব বড় হয়ে দেখা দেয়নি। দিতে পারেনি। গোবলয় আর হিন্দিভাষী বলয় যে ভূগোলের মানচিত্রে প্রায় মিলে গেছে—সেটা নিতান্তই কাকতালীয় নয় বা তাচ্ছিল্যবাচক শব্দভূষণ নয় বলেই এই পাপিষ্ঠ নরাধমের দৃঢ় বিশ্বাস। লোকসংস্কৃতির আঞ্চলিকতার ইতিহাসই ভূগোলের এই খণ্ডচিত্রের পেছনে সক্রিয়।

নীরবতার সময় নয়!
কিন্তু দিন বদলাচ্ছে। বর্তমান সঙ্ঘ পরিবারের অবস্থা হল অযোগ্যের হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। হঠাৎ করে হাতে অনেকটা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা এসে পড়েছে। যা তারা কখনও আশা করতেও পারেনি। ভারতীয় বুর্জোয়ারা বিশ্ব পুঁজিবাদের সুরে সুর মিলিয়ে অর্থনীতিতে যে পুঁজিমুখী উদারিকরণের দিকে দেশকে ঠেলে নিয়ে যেতে চাইছে, প্রবৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের রাজত্বে দুর্নীতিতে ঠাসা এবং ক্রমক্ষীয়মান ভোটের দিকে নজর রেখে চলা কংগ্রেস নেতৃত্বের পক্ষে সেটা সবটা করা হয়ে উঠছিল না। বুর্জোয়ারা তাই তাদের হাতের আপাতত একমাত্র বিকল্প বিজেপি এবং গুজরাত থেকে বেপরোয়া ব্যক্তিত্ব হিসাবে নরেন্দ্র মোদীকে পছন্দ করে তুলে এনে লোকসভায় বিপুল ভোটে জিতিয়ে এনেছিল সেই সব অপূরিত কাজ ঝটাঝট সেরে ফেলার জন্য।
এই মুহূর্তে সেই আর্থ-রাজনীতির নানা দুর্বিপাকে স্বামীজি কথিত উত্তর ভারতের সেই “গোমাতার কৃতি সন্তান”রাই এখন সারা ভারতের বুকে হিন্দু ধর্ম রক্ষা ও প্রচারের ঠেকা নিয়ে বসেছে। তারা তাদের ধর্মচিন্তা বিশ্বাস আচরণ ইত্যাদি অক্লেশে সারা ভারতের উপর আজ চাপিয়ে দিতে চায়। সাধারণভাবে আমাদের দেশে এমনিতেই সুদীর্ঘকাল ধরে বিশেষ রাজনৈতিক কারণে উত্তর ভারতের ভাষা সংস্কৃতি সমগ্র দেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে পুরোপুরি এক-বর্ণ বা আদতে বর্ণহীন এক সংস্কৃতি চালু করার হীন অপপ্রচেষ্টা চলছে। তার সাথে বিজেপি-র সংসদীয় নির্বাচনী বাড়বাড়ন্তের ফলে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় একরৈখিকতা। আমরা কে কী খাব, কী পোশাক পরব, কোন ভাষায় কথা বলব, আমাদের দেশপ্রেম বোঝাতে হলে কী কী করতে হবে, আমাদের জলসায় কাকে আমন্ত্রণ জানানো যাবে, কাকে ডাকা যাবে না—সব নাকি ওরাই বলে দেবে! এই ধরনের অপচেষ্টাগুলি যে কোনো দেশের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক, এবং শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সহায়ক। গরুই হয়ত এখন তার এক অন্যতম বাহক হয়ে উঠতে চলেছে।
সময় বেশি নেই। আসুন, খুব বেশি দেরি করে ফেলার আগেই আমরা সেই পরিস্থিতি মোকাবিলার উপযুক্ত মতাদর্শিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ◙

গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৯৫), ঘরে-বাইরে; রবীন্দ্র রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলকাতা।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯ক), “মাদুরা অভিনন্দনের উত্তর”; অনুবাদ দ্রষ্টব্য—স্বামীজীর বাণী ও রচনা; ৫ম খণ্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯খ), “বৌদ্ধ ভারত”, ক্যালিফর্নিয়ার প্যাসাডেনায় প্রদত্ত ভাষণ, ২ ফেব্রুয়ারি ১৯০০; অনুবাদ দ্রষ্টব্য—স্বামীজীর বাণী ও রচনা; ১০ম খণ্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯গ), “স্বামী-শিষ্য-সংবাদ”; স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৯ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
অশোক মুখোপাধ্যায় (১৯৯২), প্রসঙ্গ ধর্ম: উদ্ভব ও বিবর্তন; কলকাতা।
B. R. Ambedkar (1990), “Did the Hindus never eat beef?”, The Untouchables: Who Were They and Why They Became Untouchables? in Dr. Babasaheb Ambedkar, Writings and Speeches, vol. 7, Government of Maharashtra, Bombay (first edition 1948).
D. R. Bhandarkar (1940), Some Aspects of Ancient Indian Culture, University of Madras.
Mahadev Chakravarti (1979), “Beef Eating in Ancient India”; Social Scientist, Vol. 7 No. 11, June 1979.
Mohandas Karamchand Gandhi (1969), “Speech at Prayer Meeting”, 25 July 1947. Collected Works of M. K. Gandhi, Vol. 96; Publication Division, Government of India.
The Hindu, 10 August 2015.
Kancha Ilaiah (1996), “Beef, BJP and Food Rights of People”, Economic and Political Weekly, Vol. 31 No. 24, 15 June 1996.
D. N. Jha (2002), The Myth of Holy Cow; Verso, London [originally published from Delhi as Holy Cow: Beef in Indian Dietary Traditions].
D. N. Jha (2002), “Paradox of the Indian Cow: Attitudes to Beef Eating in Early India”, visit: http://www.indowindow.com/sad/article.php?child=17&article=11
B. B. Lal (1954-55), “Report on the excavation at Hastinapur”; Ancient India, Nos. 10-11, 1954-55.
Rajendra Lal Mitra (1967), Beef in Ancient India; edited and annotated by Swami Bhumananda, 1926; Manisha Granthalay, Kolkata [originally published in 1872].
Ram Puniyani (2001), “Beef eating: strangulating history”, The Hindu, 14 August 2001;
Sheela Reddy (2001), “A Brahmin’s Cow Tales”, Outlook, 17 September 2001.
H. D. Sankalia, “The Cow in History”; Seminar, No. 93, May 1967.

[1802 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0