অভিজিৎ নেই গত একবছর ধরে। অভিজিৎ নেই মুক্তমনায়, অভিজিৎ নেই ফেসবুকে, অভিজিৎ নেই একুশে বইমেলায়।

হয়তো এই বইমেলায় অভিজিৎ থাকতো। হয়তো কেন, আমার মনে হয় থাকতোই, অভিজিতের উৎফুল্ল উপস্থিতি – সদ্য প্রকাশিত কয়েকটা বইয়ের লেখক হিসেবে। কথা ছিল থাকার উচ্চকিত – মুক্তমনায়ও, সোচ্চার – ফেসবুকে। কতকিছুই ঘটে গেছে এর মধ্যে। বিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্তরা অনেক ঘটনাই ঘটিয়েছে এই এক বছরে, বিশ্বজুড়ে। বইমেলায়, ঢাকায়, সিলেটে, প্যারিসে, সানবার্নারডিনো, আজিজ মার্কেটে। যথারীতি একদিকে ‘ইহা সহিহ ইসলাম নহে’ রব উঠেছে, আর অন্যদিকে অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্তরা ভাইরাসের জয়গান গেয়েছে। আর ইসলামী বিশ্বাসের দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তদের নৃশংসতা আরো বেড়েছে।

গতবারের বইমেলায় অভিজিৎ আর বন্যাকে দেখেছিলাম – উচ্ছল, উজ্জ্বল। প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্টল থেকে স্টলে। গন্ধ শুঁকছে এই বইয়ের, সেই বইয়ের। বিহবল, আত্মহারা মনে হচ্ছিল ওদের দুজনকে – বিশেষ করে অভিজিৎকে।

ওঁর নতুন দুটো বই বেরিয়েছে দু’হাজার পনেরোর বইমেলায়। একটায় আমি অটোগ্রাফ নিয়েছিলাম। দিনটা ছিল ঊনিশে ফেব্রুয়ারি। অভিজিৎ লিখেছিল – মুক্তি আসুক যুক্তির আলোয়।

অনেকেই ঘিরে ধরেছিলো ওদেরকে – অভিজিৎ আর বন্যাকে। তরুণ-তরুণীরাই বিশেষ করে। অভিজিত-বন্যাকে অনেকেই চেনে – শুধু তাদের বই পড়েই। কোনদিন ওদের এরা দেখে নি, কথা বলার সুযোগ হবে কোনদিন ভাবে নি। আজ হঠাৎ করেই প্রিয় লেখকেরা তাদেরই চোখের সামনে – ওরা যেমন বিস্ময়ে, তেমনি আনন্দে অভিভূত।

ভিড় বাড়তে থাকলো। মনে ভয় ধরলো আমার। ওদেরকে সাবধানে চলাফেরা করতে বলে চলে এলাম। ছবি তুলেছিলাম কয়েকটা। পরদিন আমাকে ফিরতে হবে। অভিজিৎ ফেসবুকে অনুরোধ করলো ছবিগুলো যেন ওকে ইনবক্স করে দেই।

তার এক সপ্তাহ পরেই অভিজিৎ আর নেই। আমি তখন অনেক দূরে চলে এসেছি। খবর পেয়ে সম্বিত হারালাম আমি। ‘না’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। সহজে আবেগাপ্লুত হই না আমি। না আনন্দে, না বেদনায়। সেদিন আমি সশব্দে কেঁদেছিলাম।

একবছর হয়ে গেলেও আমার কাছে এখনো অবিশ্বাস্য মনে হয় ঢাকার একুশে বইমেলায় প্রকাশ্যে শত শত মানুষের মাঝখানে আলো ঝলমল টিএসসি প্রাঙ্গনে অভিজিৎকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে ধর্মান্ধ কিছু মানুষরূপী জানোয়ারেরা। বন্যাকে করেছে গুরুতর জখম, কোন রকমে মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে এসেছে বন্যা।

আজ লিখতে বসে আমি আবারো বেসামাল হলাম। বার বার চোখ ভিজে আসছে।

একবছর ধরে এনিয়ে অনেক ভেবেছি। আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি তার হিসেব-নিকেশ করতে গিয়ে আশা-নিরাশার দোলায় দুলেছি। বুঝেছি, বাস্তবতাকে আরো কঠিনভাবে দেখতে আর মেনে নিতে হবে। কিন্তু তবুও দিনশেষে আমি আশান্বিত হয়েছি। আরো দৃঢ় প্রতীতি জন্মেছে মনে, অন্ধকার দূর হবেই। আলো জ্বলবেই।

আমার আশান্বিত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে অভিজিৎ – অভিজিতের জীবন। অভিজিৎ বেশিদিন বাঁচতে পারলো না। ধর্মান্ধরা ওর জীবনটাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলো। কিন্তু ওর যা অর্জন সেই স্বল্পায়ু জীবনে, ওর যা অবদান বাংলার মুক্তমনা আন্দোলনে, তা সত্যিকার অর্থেই বিশাল, বিরাট, অপরিমেয়।

মুক্তমনা শব্দটাই এখন অভিজিতের সমার্থক হয়ে গেছে। মুক্তমনা এখন একটা শুধু ব্লগের নাম নয়। মুক্তমনা এখন একটা আন্দোলন, একটা জীবনদর্শন।

অভিজিতের কাছে মুক্তমনা মানে শুধু নাস্তিক হওয়া ছিল না। মুক্তমনা মানে সামাজিক বৈষম্য, অমানবিক আচার-আচরণ, আর সব ধরনের নিপীড়ণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়া। মুক্তমনা হওয়া মানে বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া, বিজ্ঞানমনস্কতা্র চেতনায় মননকে পরিশীলিত করা। অভিজিৎ মুক্তমনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই অঙ্গীকারে। একটা সুন্দর, নৈতিক, মানবিক, সচেতন সমাজ গড়ার অভিপ্রায়ে। কোন কিছুরই পূজারী ছিলেন না অভিজিৎ। কোন দর্শন-মতবাদ বা তত্ত্বকথা কিছুই মেনে নিতেন না যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই-বাছাই না করে। তথ্যনির্ভর যুক্তি আর যুক্তিনির্ভর জ্ঞান ছাড়া আর কোন মতবাদেরই মূল্য ছিল না তাঁর কাছে।

তথ্যনির্ভর যুক্তি আর যুক্তিনির্ভর জ্ঞান – যদি হয় জীবনের চালিকাশক্তি, সেই জীবন আলোয় আলোময় হতে বাধ্য।

অভিজিৎ ছিলো সেই আলোর পথযাত্রী। আলোর পথযাত্রীরা মরতে পারে, কিন্তু তারা হারে না। মুক্তমনারা হারে নি। অভিজিৎ, বাবু, অনন্ত, নিলয়, দীপন হারে নি। তাঁদের জীবন দেয়ার মধ্যেই তাঁদের বিজয়ের বার্তা নিহিত। জিতেছে বলেই তাঁদের জীবন দিতে হয়েছে।

অভিজিৎ এবারের বইমেলায় না থাকলেও, অভিজিতের প্রকাশক দীপন, অভিজিতের সুহৃদ অনন্ত, পাঠক ওয়াশিকুর, নিলয়রা না থাকলেও অভিজিতের বইগুলো আছে। অভিজিতের লেখাগুলো আছে। আছে অভিজিতের আন্দোলন, অভিজিতের দর্শন। আছে অভিজিতের অগণিত পাঠক। আছে হাজার হাজার মুক্তমনা, যাদের সংখ্যা বাড়ছেই, বাড়তে থাকবেই।

যে আলো জ্বালিয়ে গেছে অভিজিৎ সে আলো নেভানোর সাধ্য কোন চাপাতির নেই। চাপাতি দিয়ে জ্ঞানের আলো নেভানো যায় না।

[94 বার পঠিত]