আল্লাহ হাফিজের দেশে (৪র্থ পর্ব)
আকাশ মালিক

দুই সপ্তাহ পরে বদরুল ফোন করলো, ল্যাগেজ সিলেট এসেছে। বড়ভাইকে নিয়ে এয়ারপোর্ট পৌছিলাম, সাথে বদরুলও। বদরুল কানেকানে বললো,‘হাজার দশেক টাকা না হলে বোধ হ্য় ল্যাগেজ ছুটানো যাবেনা’। আমি বললাম, একটা টাকাও দিবিনা। ল্যাগেজ কাষ্টমসের হাতে, আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। কানাকানি কিছু হল, এক পর্যায়ে কাষ্টমস অফিসার বললেন-

– তাইলে চাবি দেন, ল্যাগেজ খুলতে হবে।
– কেন? (আমি একটু উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলাম)
– এদের কোন একটিতে অবৈধ মাল আছে।
– কোন অবৈধ মাল নেই। আছে শিশুদের কিছু খাবার ও কাপড়।
– চাবি দেন, সবগুলো ল্যাগেজ খুলে দেখতে হবে।
– চাবি সঙ্গে আনি নাই।
– তাইলে তালা ভাঙ্গতে হবে।
– খবরদার, তালায় হাত দিবেন না।

একসাথে বদরুল আর বড়ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরে রুম থেকে বাহিরে নিয়ে এলেন। ভাই বললেন ‘বিমানবন্দরের ভেতরে বিমানের কর্মচারীরাও আজকাল মানুষ খুন করে তা তুমি জানোনা? ল্যাগেজ খুললে এদের ভেতরের অবস্থা কেমন করবে তা বুঝনা? যাও তুমি গাড়িতে গিয়ে বস, আমরা শীঘ্রই ল্যাগেজ নিয়ে আসছি’। আধ ঘণ্টা পর তারা ল্যাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠলেন। ল্যাগেজ খুলে দেখার আর মুড নেই। আমি জানি ভাই কী করেছেন। দশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন আর তারা বলেছে ‘আল্লাহ হাফিজ’।

গাড়ির জানালার বাহিরে চোখ মেলে গোমড়া মুখে বিষণ্ণ মনে নিঃশব্দ বসে আছি। ভাই বারবার কথা বলানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু মন কিছুতেই সায় দিলনা। সারাটা পথ ভেবেছি, তা হয় কী করে? এ কি সম্ভব? ইমিগ্রেশন কাউন্টারে,কাষ্টমস অফিসে, টিকেট কাউন্টারে সব জায়গায়ই কর্মচারীদের কিছু মানুষ দেখলাম যাদের গায়ে শার্ট আর পরণে ট্রাউজার থাকলেও মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি আছে। কথায় কথায় আল্লাহর দয়া,আল্লাহর মেহেরবানী বলে, সালাম করে আলেক দেয়, আল্লাহ হাফিজ বলে, আজান পড়লে মসজিদে দৌড়ায়, এরা ঘুষ খায় কেমনে? এই ঘুষের অবৈধ টাকা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে ভাত খাওয়ায়, স্কুলে মাদ্রাসায় লেখা পড়া করায়, এদের কোন ডর ভয় নাই? এদের সন্তানেরা নৈতিকতার কী জানবে কী শিখবে?

বাড়ি পৌছার কিছুক্ষণ পরেই বড় ভাই আমাদের রুমে এলেন। চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম তিনি মনে মনে লজ্জিত ও অপমান বোধ করছেন। সান্তনার স্বরে বললেন-
– তুমি বোধ হয় খুব দুঃখ পেয়েছ, কিন্তু কোন উপায় ছিলনা।
– কাষ্টমসকে কত টাকা ঘুষ দিলেন?
– টাকাটা বড় কথা নয়। একবার তোমার বউয়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখেছ সে কত খুশী হয়েছে? ভাতিজা ভাতিজিদের চোখে মুখে কি আনন্দ তাদের কাপড়-চোপড়গুলো পেয়ে। ছোট ছেলে সুমনের দিকে তাকালে তো আমার ভয়। সে হাঙ্গার ষ্ট্রাইক করে বসেছে, পণ করেছে কিছুই মুখে তুলবেনা। আজ ল্যাগেজ থেকে বের করা কর্ণফ্লেইক্সের বক্সটা দেখেই সে হাত বাড়িয়ে দিল। বক্সটা উলটে পালটে দেখে আর হাসে, তা দেখে তার মা কত খুশি হয়েছে তুমি দেখ নাই।
– শিশুরা নতুন অপরিচিত জায়গায় আসলে এ রকমই করে, তাদের অপরিচিত খাদ্য খেতে চায় না। কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
– আল্লাহর শুকরিয়া, ল্যাগেজগুলো যে ভালয় ভালয় পেয়েছি। দুই হাজার টাকা কম নিয়েছে, আট হাজার টাকা দিয়েছি।
– বিষয়টা শুধু টাকা না, নৈতিকতা সততার ব্যাপার আছে। হিথরো এয়ারপোর্টে যথাযথ কাষ্টমস হয়েছে, পাঁচটা টিকেটে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত মাল ল্যাগেজে ছিলনা বলে বাড়তি ফি বা চার্জ দিতে হয় নি। অবৈধ কোন জিনিস থাকলে বর্তমান হাই টেক স্কানার ফাঁকি দিয়ে হিথরো এয়ারপোর্ট পার পাওয়া যেতনা। অবৈধ মালই যদি ছিল,তাহলে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিল কেন? দেশ ও সরকারের সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতা, এই বেইমানী কেন? প্রথম দিন পাসপোর্টে সীল লাগাতে কতটাকা ঘুষ দিয়েছিলেন?
– শুনো, দেশটা আর আগের মত নেই। সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে গেছে কিছু অসৎ রাজনীতিবিদ আর অসৎ আমলাদের হাতে। ১৪কোটি মানুষের জীবন তাদের দয়া করুণার ওপর নির্ভরর্শীল। কাষ্টমস অফিসে তুমি যখন তর্ক জুড়ে দিয়েছিলে আমার মনে পড়লো সেই দুই প্রবাসীর কথা যারা ঢাকা বিমানবন্দরে বিমান কর্মচারীদের হাতে খুন হয়েছিল। খুনীরা কেউ ধরা পড়েছে? পড়ে নাই? এমনও ঘটনা আমদের গ্রামের মানুষের বেলাই ঘটেছে যে, এয়ারপোর্ট থেকে সম্পূর্ণ ল্যাগেজ লাপাত্তা হয়ে গেছে। মানুষটা খালি হাতে বাড়ি এসেছিল, খালি হাতে আবার ফিরে গেছে। ঘুষ না দিলে তারা কী করতো জানো? আমাদেরকে শুন্য ল্যাগেজ ফেরত দিত।

আমাকে নিরুত্তর দেখে ভাই আর কোন কথা বাড়ালেন না। পরের দিন ডাইনিং টেবিলে মেঝো ভাই,ভাবী,বড় ভাবী,ভাতিজা ভাতিজি সহ সবাই জড়ো হলেন। পরিবারের সবাই মিলে একসাথে খাওয়া হবে। বড় ভাই নাতিদীর্ঘ একটা ভাষণ দিলেন-
‘বাড়ির যাবতীয় খরচ, বাজার হাট সহ টাকা কোথায় কত লাগে এসব তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমরা যতদিন বাড়ি আছো,আমি চাইনা এ সব নিয়ে তুমি চিন্তা করো। আমি চাইনা তোমার স্ত্রী আমার ভাতিজা ভাতিজিদের উপর কোন প্রকার কষ্টের ছায়া পড়ুক। আরেকটা কথা তোমাকে আগেই বলে রাখি,কাউকে টাকা দিয়ে সাহায্য করবেনা। সাহায্যের জন্যে কেউ আসলে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। গ্রামে একদল মানুষ আছে এরা বাতাস খেয়ে বাঁচে। তাদের কাছে সকল লন্ডনীদের নামের তালিকা আছে,তারা বাতাসের গন্ধ শুঁকে বলতে পারে কোন লন্ডনী কোনদিন বাড়ি আসছেন। আজকালের মধ্যেই তারা তোমার দর্শণার্থী হবে সন্দেহ নেই। আরও একটা কথা, গ্রামের কোন সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়াবেনা আর জাতীয় কোন সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠান সমাবেশে যাবেনা’।

ভাইয়ের কথায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমি এসেছিলাম স্ত্রী সন্তান নিয়ে আমার জন্মভুমির প্রতিটি ইঞ্ছি জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখব। প্রাণ জুড়াবো চোখ জুড়াবো, বাংলা মায়ের অপরুপ সুন্দর দিয়ে, তৃষ্ণার্ত অন্তরাত্মা্ তৃপ্ত করবো বাংলার মুক্ত-সতেজ হাওয়ার সুগন্ধ দিয়ে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে হাওয়ায় হাওয়ায় দোলন জাগানো বনের পাতা দেখব, জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে মাতন জাগানো পাখির গান শুনবো। বড় সাধ ছিল এবার সিলেট থেকে শুরু করে রাঙ্গামাটি হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম,বরিশাল-পাটুয়াখালি,বাগেরহাট-কুষ্টিয়া,পাবনা-নওগাঁও, দিনাজপুর-ঠাকুর গাঁও,মোহনগঞ্জ-ময়মনসিং হয়ে ঢাকার ভেতর দিয়ে ঘুরে সিলেট ফিরে আসবো। ভিডিও ক্যামেরার প্রচুর মেমরি কার্ড সঙ্গে নিয়েছিলাম। বন্ধু সাথীদের কাছে বুক ফুলিয়ে বলেছিলাম,আসাদুজ্জামান আসাদের ‘ছোটদের বাংলাদেশ’ ফলো করে করে সারা বাংলাদেশ ঘুরে দেখবো, বাংলাদেশের সকল আঞ্ছলিক ভাষার মানুষের সাথে কথা বলবো,সে সব ভিডিওতে ধারন করে নিয়ে আসব, তারপর সৈয়দ শামসুল হকের মত আমিও একটি বই লিখবো, নাম দিব-‘একজন বিদেশীর চোখে বাংলার মুখ’। আমার সকল সাধ সকল স্বপ্ন বড় ভাইয়ের বিপদ সংকেতবাণীতে চূর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেল। নিরুপায়ের শেষ মিনতির সুরে বললাম-

– আমাকে একবার গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ দেখতেই হবে, পার্বত্যচট্টগ্রামের পাহাড়িদের সাথে দেখা করতেই হবে। আমি চাকমা অবাঙ্গালীদের সাথে তাদের অথিতি হয়ে তাদের সাথে এক সপ্তাহ কাটাতে চাই।
– তুমি পাগল হয়েছো? রিক্সা থেকে নামিয়ে মহিলাদের গলা ছিড়তে না পারলেও গলার হার ছিড়ে নিয়ে গেছে এমন খবরও পত্রিকায় আসে। তুমি বউ বাচ্চা নিয়ে ঘুরবে বাংলাদেশ?
– আমাকে পাহাড়ে একবার যেতেই হবে একজনকে আমি কথা দিয়েছি।
– কে তিনি?
– একজন বন্ধু সাংবাদিক, অনলাইনে তার সাথে পরিচিয়। পাহাড়িদের ওপর বাঙ্গালীদের অত্যাচার, জোট সরকারের নির্যাতন, জিয়ার আমলের অমানুষিক অত্যাচার নিয়ে তিনি প্রচুর প্রবন্ধ গবেষণা-পত্র লিখেছেন, এখনও লিখেন।
– তুমি যেতে চাও একা যাও, কিন্তু তোমার বউ আর আমার ভাতিজা ভাতিজিদের সঙ্গে নিতে পারবেনা, এ আমার নির্দেশ।

আগামী সপ্তাহ একুশে ফেব্রুয়ারি। তারপর ছাব্বিশে মার্চ স্বাধীনতা দিবস, এর পরেই আসছে বৈশাখ,বাংলা নববর্ষ। এই দিনগুলোর কথা মনে রেখেই দেশে আসার তারিখ নির্ধারণ করেছিলাম। ঘরে টেলিভিশন একটা আছে কিন্তু বি টি ভি ছাড়া আর কোন চ্যানেল আসেনা। বাংলাদেশ টেলিভিশন যেন খালেদা বেগম, মওদুদ আহমেদ, সাইফুর রহমান,নাজমুল হুদাদের পৈতৃক সম্পত্তি। এরা ধরেই নিয়েছেন, আওয়ামী লীগকে ইসলামী গুন্ডাবাহিনী দিয়ে নিঃশেষ করে দিয়ে আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। পুরো দুই মাস দেশে ছিলাম, রেডিও, টেলিভিশনে ২১শে ফেব্রুয়ারি, ৭ মার্চ, ২৬ শে মার্চ, শহিদ দিবস, পতাকা দিবস, স্বাধীনতা দিবসের কোথাও আওয়ামী লীগের নাম তো দূরের কথা বঙ্গবন্ধুর নাম গন্ধই নাই। যে দেশে শেখ মুজিবের নাম নাই সে দেশ আর যা’ই হউক বাংলাদেশ হয় কী করে? এক অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও শহিদ জিয়া’। সরকারের একান্ত বাধ্য পোষ্য চাটুকাররা মনে করেন, টিভির সামনে বসে যারা প্রোগ্রাম দেখেন তারা সকল ছাগল ভেঁড়া। ঐ অনুষ্ঠানের সম্পাদনা ও উপস্থাপনায় যে ব্যক্তি ছিলেন, তাকে প্রকৃতি চতুষ্পায়ী জন্তু করে সৃষ্টি করলে তিনি প্রভুভক্তির কাজটা বেশ ভালই করতে পারতেন। ভন্ড জিয়ার নষ্ট ভঙ্গীতে প্রথমে বেসমিল্লাহ বলে তিনি অনুষ্ঠান শুরু করলেন। তারপর বললেন ‘ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা,স্বাধীনতার ঘোষক ও বাংলাদেশের স্থপতি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান————–’। এক মহিলার রাত দশটার ইংরেজি সংবাদের প্রথমে ভাঙ্গাভাঙ্গা, টানাটানা স্বরের বেসমিল্লাহ, আর শেষে আল্লাহ হাফিজ বলার কী যে নাটকীয় ভঙ্গি। ভাতিজাকে ডেকে বললাম,‘আমার রুম থেকে টেলিভিশনটা সরায়ে নাও’। ভাতিজা বললো ‘কেন চাচা’? আমি বললাম ‘আর যেদিন টেলিভিশনে শুনবো-‘স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীনতার ঘোষক ও বাংলাদেশের স্থপতি শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান’ সে দিন তোমার সম্পূর্ণ টেলিভিশন বাহিরে ছুঁড়ে ফেলে দিব’।

আজকাল মোল্লারাও গলার সুর বদলায়ে কথা বলে। আধুনিক গান আর সিনেমার গানের সুরের ছন্দে, তালেতালে, লম্বালম্বা টানে ওয়াজ করে। বিজ্ঞান হাই পাওয়ার মাইক্রোফোন তুলে দিয়েছে তাদের মুখের সামনে,এখন তারা বুঝে তাদের কথায় বাতাসে ঢেউ ওঠে, কথা শেষ করে মাইক্রোফোনের মুখে মুখ লাগিয়ে। আমাদের গ্রামের সেদিনের মুরছালিন মোল্লা, বয়সে আমার অনেক ছোট, আজ সে বড় মসজিদের ইমাম। মাইকের সামনে গলা চাপা দিয়ে এমন ভঙ্গিতে শব্দ উচ্চারণ করে যেন এই মাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আমরা তাকে খিচুড়ি মোল্লা ডাকতাম, মাদ্রাসায় খিছুড়ি একটু বেশী খাইত তাই। এক সপ্তাহ যাবত শুনছি খিছুড়ি মোল্লা বৃষ্টির জন্যে দোয়া করছে, এক ফোটা পানি আকাশ থেকে বাংলাদেশে পড়তে দেখলামনা। মানতে হবে এ দেশের মানুষের পেটে ভাত থাক আর না থাক, মসজিদ আর মাদ্রাসাগুলোর কল্পনাতীত উন্নয়ণ হয়েছে। খড়ের বেড়া আর শনের ছাউনির মাদ্রাসাগুলো আজ এক একটা রাজপ্রাসাদ। মসজিদ নয় যেন শাহজাহানের তাজমহল। আর স্কুলগুলো হয়েছে নুহের প্লাবনের ধ্বংশাবশেষ। কিছু কিছু পাঠশালার দেখলাম দরজার এক পাট আছে এক পাট নাই, জানালা লটকে আছে কোন নারীর উনুনের জ্বালানি হতে বাতাসের অপেক্ষায়। এক একটা চেয়ার কারো হাত ভাঙ্গা কারো পা ভাঙ্গা পঙ্গু অবস্থায় কোন রকম দাঁড়িয়ে আছে। তিরিশ বছর আগে আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে একটা সায়েন্স ল্যাবরেটরি ছিল, ছাত্র লাইব্রেরিও ছিল, এখন এর কোনটাই নাই। একদিন সকালে আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে উঠলাম। ময়লা শার্ট আর হাটুর সামান্য নিচে ময়লা লুঙ্গিপড়া মানুষটার হাতে পিতলের ঘণ্টা দেখে অনুমান করলাম উনি স্কুলের দারোয়ান হবেন। আমাদের ঘুরাঘুরি দেখে জিজ্ঞেস করলেন,‘কারো সাথে দেখা করতে চান’? আমি বললাম,‘জ্বি না, এমনিই আসলাম স্কুলটা দেখতে’। ঠিক তখনই শোনা গেল স্কুলের কোন এক রুমে কে যেন উচ্চস্বরে গান গাইছে। ধীরে ধীরে রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। দুই তিনটা ক্লাসের পার্টিশন সরায়ে হল বানানো হয়েছে। পাঁচজন শিক্ষক খাতা কাগজ নিয়ে এক টেবিলে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কী? তিনি বললেন,‘আগামীকাল স্কুলের বার্ষিক সভা, ছাত্র-ছাত্রীরা কেরাত, কবিতা, গানের রিহার্সেল দিচ্ছে’। ১৩/১৪ বছরের একটি ছেলে গান গাইছে- ‘ফাইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়—–’। থো হয়ে বাকরুদ্ধ আমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শিক্ষকরা সম্ভবত আমাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন নি। এর পরই একটি ১৫/১৬ বছরের মেয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে গান ধরলো- ‘কেন, পিরিতি বাড়াইলেরে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি—–’। ততক্ষণে আমার মাথায় আগুন চড়ার উপক্রম। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম প্রধান শিক্ষক কে,উনি কোথায়? দারোয়ান বললেন, প্রধান শিক্ষক জরুরী এক কাজে বাড়ি গেছেন, সহকারি প্রধান শিক্ষক অফিসরুমে আছেন, দেখা করবেন’? অফিসরুমে আসলাম, সহকারি প্রধান শিক্ষক দাঁড়িয়ে সালাম জানালেন। বললেন-

– আমি শুভ্রত। শুভ্রত হালদার, সহকারি প্রধান শিক্ষক। বসুন, এরা আপনার?
– জ্বি।
– বাংলা জানে?
– একদম রাবীন্দ্রিক বাংলা।
– তাই নাকি? আর কোনদিন বাংলাদেশে এসেছিল?
– না,এই প্রথম। এরা বৃটিশ বাঙ্গালী। ইংল্যান্ডে আমাদের শহরে একটা বাংলাস্কুল আমরা করেছি সেখানে প্রায় সত্তরটা শিশু কিশোর উইকএন্ডে বাংলা শিখে। ওদের মাতৃভাষা যদিও বাংলা তবু বাংলা তাদের সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। আচ্ছা শুভ্রত বাবু, এই যে আপনার পেছনের দেয়ালে টাঙ্গানো ডানে খালেদা আর বামে জিয়ার ছবি,ব ঙ্গবন্ধু কোথায়?
– জ্বি? (শুভ্রত বাবু পেছনে তাকান, ভাবখানা যেন বঙ্গবন্ধু একটু আগেই এখানে ছিলেন)
– বলুন তো শুভ্রত বাবু, যে দেশে শেখ মুজিব নাই সে দেশের নাম বাংলাদেশ হয় কেমনে? আর ছেলে মেয়েরা এ সব কী গাইছে? বেশিরভাগ ছাত্রীরাই দেখলাম কেউ হিজাব পরে কেউ কালো বোরকা পরে এসেছে, কিছু ছেলেকেও দেখলাম মাথায় টুপি পরে এসেছে, আপনারা কিছু বলেন না? স্কুলের নির্দিষ্ট কোন ইউনিফর্ম নাই?

শুভ্রত বাবু আমার কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিলেন না, জিজ্ঞেস করলেন-‘আপনার পরিচয়টা দেবেন না’? আমি পরিচয় দিয়ে আমার ছাত্র জীবনের কিছু ঘটনাবলি তাকে শুনালাম। শুভ্রত বাবু অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

১ম পর্ব-

২য় পর্ব-

৩য় পর্ব-

[912 বার পঠিত]