হাতছানি দেওয়া স্মৃতিরা

আজকের এই মুহূর্ত একটু পরেই জীবনের স্মৃতি হয়ে যাবে, হয়ে যাবে জীবনের ইতিহাসের একটি অংশ। হোক না তা অতি তুচ্ছ কিংবা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একদিন অবসরে কিংবা ব্যস্ততায়ও এই স্মৃতি, এই ইতিহাস উঁকি দেবে মনের আয়নায়। আজ আই মুহূর্তে মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছে শৈশবের কয়েকটি ঘটনা।

১, আমাদের ইউনিয়নে লেদু নামের এক লোক ছিল। সে ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ছিল। তার একটি ব্রিকফিল্ড ছিল। সেখানে তৈরি ইটের গায়ে লেখা থাকতো, SML. সম্ভবত তখন ওটাই অঞ্চলের একমাত্র ব্রিকফিল্ড। তাই সবাই ওখান থেকেই ইট কিনতো। ঘরের সামনে কয়েকটা ইট বিছিয়ে দেওয়াই ছিল তখন নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য এক বিরাট বড়লোকের লক্ষণ। কারু এরকম বড়লোকের লক্ষণমূলক কাজ হলে দশ গ্রামের লোক পিঁপড়ার মতো গন্ধের মাধ্যমে খবর পেয়ে জমায়েত হতো সেই বিরল দৃশ্য নিজের চক্ষে অবলোকন করার জন্য। দুনিয়াবি কাজকর্ম ফেলে, রোদে শুকিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে, দিনরাত ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে পরম আগ্রহে সেই বিরল কর্মযজ্ঞ দেখতে থাকতো। একবার আমারও এসে গেলো এই সুযোগ।আমাদের এক প্রতিবেশীর ঘরের সামনে সামান্য ইট, বালি, সিমেন্টের কাজ হচ্ছিল। আমরা সবাই সেখানে গিয়ে চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকি। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা প্রশ্ন মনে এলো – সবগুলি ইটের গায়ে SML লেখা কেন? এটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্যটা কী? সমবয়সী বন্ধুদের সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম। সবাই বিষম ভাবনায় পড়ে গেল। উত্তর কারুর জানা নেই। এক বন্ধু দুইদিন গবেষণায় নিমগ্ন থেকে আশ্চর্য ফলাফল দিয়ে দিলো – SML মানে হলো – চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লেদু। S-এ চেয়ারম্যান, M-এ মোহাম্মদ, L-এ লেদু। আমরা সবাই গবেষক বন্ধুর জ্ঞান-গরিমায় হতবাক হয়ে বললাম, আরে তাই তো! এই সাধারণ ব্যাপারটা কেন আমাদের মাথায় এলো না? লেদু চেয়ারম্যানের ইটখোলায় তৈরি ইটের গায়ে SML লেখা থাকবে না, তো থাকবেটা কি? ইটের গায়ে তো সে নিজের নামটাই লিখে রেখেছে। সেই বন্ধুর জ্ঞানে বিস্মিত হয়ে আমরা সকলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে গুরু মেনে নিয়েছিলাম।

কিন্তু হায়, অতি অকৃতজ্ঞের মতো আজ বলতে হচ্ছে, সেই জ্ঞানী বন্ধুটির নাম আমি কিছুতেই মনে করতে পারছি না। যে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি রহস্য উদ্ঘাটন করে দিয়েছিল আমাদের কাছে আজ তার নামই দিব্যি ভুলে বসে আছি। এভাবেই আমরা জ্ঞানীগুণীদের ভুলে যাই।

২, ছোটবেলায় আমার বয়েসী সব ছেলেমেয়েদের দেখতাম, ওরা বাড়ির কাছের মুদির দোকান থেকে ডজনে ডজনে বেলুনের প্যাকেট কিনে নিয়ে এসে মুখের বাতাস দিয়ে ফুলিয়ে সগর্বে আকাশে ওড়াতো। বেলুন সবগুলি ফেটে গেলে বাবা-মা’র কাছ থেকে আবার টাকা নিয়ে আবারও কয়েক ডজন কিনে নিয়ে আসতো। আমি টাকার অভাবে কিনতে পারতাম না। ওদের বিলাসী জীবন দেখে মনের গহীনে গভীর হিংসা ও বেদনা অনুভব করতাম। প্রার্থনা করতাম, হে আল্লা, তুমি ওদের ফুলন্ত ও উড়ন্ত বেলুনগুলি এক নিমেষে ফাটিয়ে দাও। যে-ই প্রার্থনা অমনি আকাশের বেলুন ফেটে ফেটে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে থাকে। আমি হুড়মুড় করে দৌড়ে গিয়ে ছেঁড়া-ফাটা টুকরোগুলি পরম যত্নে কুড়িয়ে নিয়ে মুখের ভেতর নিয়ে নিয়ে ছোট ছোট বেলুনছানা বানাই। একটা বাটিতে পানি নিয়ে মুখে বেলুন ছেঁড়া পুরে পানিতে টান দিতাম। তারপর তাতে গিটঠু দিয়ে পানি-বেলুন বানাতাম।

একদিন আমার কুড়িয়ে পাওয়া কয়েক টুকরো বেলুন দিয়ে পানি-বেলুন বানাচ্ছিলাম। প্রতিবেশী রোকেয়া এসে হুকুমের স্বরে বললো, এই, আমাকে কয়েকটা দে। আমি বললাম, এতো কষ্ট করে এগুলি কুড়ায়ে নিয়েছি। তোকে দেবো কিয়েল্লাই? ‘আইচ্চা তাইলে দেখবি মজা সময় অইলে’ বলে হুমকি দিয়ে সে ঘরে চলে গেলো। আমিও বাটিতে পানি ভরে আনতে গেলাম। ফিরে এসে দেখি, বেলুনের টুকরা একটাও নাই। আমি তো এক্কেবারে ফতুর। ‘ ওরে আমার এত্তবড় সর্বনাশ কে করলো রে’ বলে গগনবিদারী কান্না জুড়ে দিলাম। রোকেয়া ওদের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভিলেনী হাসি হাসতে হাসতে বললো, অঁঙ্কা কঁন লাগে? আগে যে ভালোই ভালোই দিলি না! এবার বুঝ মজা। আমি গলা ফাটায়ে বললাম, ওই হারামি মাইয়া, তুই আমারে সর্বস্বান্ত করছস। আমার সব সহায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করছস রে রাক্ষসী। আমার সব ফাটা বেলুন তুই এই মুহূর্তে ফেরত দে কইলাম। সে অবিচলিতভাবে বললো, খাড়া তুই, আনতাসি তোর সম্পত্তি। এই বলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। আমি ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললাম, না দিয়ে যাবি কই। আমার কষ্টার্জিত জিনিস। ফিরায়ে তোকে দিতেই হবে। আমি আমার ফ্রক পেতে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর রোকেয়া ফিরে এলো সাক্ষাৎ ডাকিনী-যোগিনী হয়ে। হাতে রাম-দা উঁচানো। আমাকে বলছে অগ্নিঝরা কণ্ঠে, আয় মাগী, সাহস থাকলে আয়। তোর বেলুন ফাটা নিয়ে যেতে আয়। আয় কড়ায় গণ্ডায় নিয়ে যা। আমি তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও তার অগ্নিমূর্তি দেখে ‘ ওরে আল্লারে, আমি শ্যাষ’ বলে চিৎকার দিয়ে তীরবেগে দৌড়ে এসে ঘরের মেঝেয় আছাড় খেয়ে পড়লাম।

তারপরে মনের দুঃখে বনে বনে ঘুরতে লাগলাম আমি। পুকুরপাড়ে বসে পুকুরের মিঠা জলে আমার চোখের লোনা জল ফেলতে লাগলাম। একদিন পুকুরপাড়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর দেখি, অনেকগুলি ভালো ভালো বেলুন পড়ে আছে! এ যে দেখি নতুন নতুন বেলুনের আড়ত! আল্লা কত মেহেরবান! আমার করুণাবস্থা দেখে তিনি আমার জন্য এগুলি এখানে নেয়ামত স্বরূপ পাঠায়েছেন। ফ্রক ভর্তি করে নিয়ে এলাম অনেকগুলি। এবার বেহিসাবে বেলুন মুখ দিয়ে ফুলিয়ে আকাশে উড়াতে লাগলাম, পানি-বেলুন বানাতে লাগলাম। সবাইকে অকাতরে বিলাতেও শুরু করলাম। আমার ভাণ্ডার তো আর ফুরোয় না। কয়েকদিন চললো এভাবে। সবাই তো অবাক। জিজ্ঞেস করে, এত বেলুন তুই পাস কই। অতি ঘনিষ্ঠ ক’জনকে বেলুনের উৎস দেখাতে নিয়ে গেলাম। বেলুনের কছম খাওয়ালাম ওদের এই গুপ্তধনের কথা আর কাউকে না বলার জন্য। পরের দিন দেখি, শত শত ছেলেমেয়ের দল এসে আমার সব বেলুন লুট করে নিয়ে যেতে শুরু করলো। সবার বাবা-মায়েরা জিজ্ঞেস করতে লাগলো, তোরা এত বেলুন কোথায় পাস। আমরা বললাম, পুকুরপাড়ে ঝোপের ভেতর। এক জেঠিমা বললো, তাই বল। কয়েকদিন আগে তোর কাকার বিয়ে হয়েছে কিনা!

বড়দের খেলার সরঞ্জাম দিয়ে আমরা ছোটরা খেলতাম, এমন কি তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম দিয়েও। এজন্য কখনো বড়দের কাউকে কখনো বিচলিত হতে দেখিনি।

৩, গাছের শুকনো পাতা তলায় ঝরে পড়লে তা কুড়িয়ে নিয়ে চুলায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে গ্রামের গৃহিনীরা। পাশে বাড়ির হাফেজ জেঠারা অতি দরিদ্র ছিল। মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। জেঠি আসতো প্রায়ই পাতা কুড়াতে। পাতা কুড়ানোর হিসাব ছিল ফিফটি ফিফটি। যে কুড়াবে সে পাবে অর্ধেক আর গাছের মালিক পাবে অর্ধেক। জেঠি অর্ধেক ভাগের পাতা দিয়ে যেতে আসতো হেঁসেলের সামনে। আমি মাটির চুলায় পাতার জ্বালে রান্না করতাম। জেঠি হেঁসেলের চৌকাঠে বসে আমার সঙ্গে গল্প করতো। মুখে থাকতো তার পান। পান চিবিয়ে চিবিয়ে জেঠি রসিয়ে রসিয়ে কথা বলতো। তা শুনতে ও দেখতে আমার মনে হতো, আহা, জেঠির মুখের পানটা খেতে কী যে মজা কে জানে! জেঠি তার ঠোঁটের দুইপাশ দিয়ে নদীর মতো ছলছল করে গড়িয়ে পড়া পিকের প্রবাহ মুছতে মুছতে বলতো, হ্যাঁ রে মা, আজ কি রান্না করছিস? দে তো একটু লবণ চেখে দিই। আমি তাকে লবণ চাখতে দিতাম। বলতাম, একটু চা করে দিই, জেঠি? জেঠি বলতো, তা দে। কখনো কখনো বলতাম, আজ একটু ভাও খাও, জেঠি। বলতো, তা দে না! কেমন রাঁধলি তুই খেয়ে দেখি।
জেঠি বলতো, কি রে বেটি, তোর চুলগুলি এমন রুক্ষ হয়ে আছে কেন? তেলটেল দিস না? তেলের বোতল আর চিরুনি নিয়ে আয়। আমি আঁচড়ে দিই। একটা বিনুনি গেঁথে দিই। আমি তেলের বোতল আর চিরুনি এনে দিতাম। জেঠি আমার মাথায় বিলি কেটে কেটে তেল লাগিয়ে দিতো। আমি জেঠির কোলের মধ্যে মাথা ঠেকিয়ে রাখতাম। জেঠি বলতো, দেখো মেয়ের কান্ড। চুলগুলিকে মরুভূমি বানায়ে রেখেছে। এত তেল দিচ্ছি সব শুকায়ে যাচ্ছে। জেঠি পরম আদরে আমার চুল আঁচড়ে বেণী গেঁথে দিতো। আমার কপাল বেয়ে, কপোল বেয়ে তেল-জবজবে চুল থেকে তেল পড়ত। আমার কপোল ভেসে যেতো তেলে। আরামে আমার ঘুম চলে আসতো। তারপর জেঠি তার নিজের মাথায় তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে নিতো। তার কপাল বেয়েও তেল পড়তে থাকতো।

এমন আদর করে বিলি কেটে কেটে আর কেউ কি আমার চুলে তেল দিয়ে দিয়েছিল, বিনুনি গেঁথে দিয়েছিল?

আজও আমার কপোল ভিজে গেলো। জেঠির দিয়ে দেওয়া তেলে নয়, নয়নের জলে। স্মৃতি এত নিষ্ঠুর কেন? কেন শুধু কপোল ভিজায়ে দেয়?

[373 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0

Leave a Reply

9 Comments on "হাতছানি দেওয়া স্মৃতিরা"

avatar
Sort by:   newest | oldest
আন্দোলন
Member

S-এ চেয়ারম্যান হয় কীভাবে !

বিক্রম কিশোর মজুমদার
Member
বিক্রম কিশোর মজুমদার

ছোটবেলার স্মৃতি বিশেষতঃ গ্রাম বাংলার কথা কখনো ভুলা যায়না। না ভুলাই ঠিক, এখন আর সেই গ্রাম নেই, গ্রামের সেই মানুষ ও নেই। এখন শহর কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। মিলিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ছবি।

Nitendu
Member

🙂

wpDiscuz

মুক্তমনার সাথে থাকুন