grass_hut_on_the_river_rtp_0
ক.
নিশ্চিন্তপুর। মেহেরপুরের মৃতপ্রায় ভৈরব নদীর ওপর পিঠ ঠেকিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। বছর বছর নদীর খামখেয়ালি চলনের সাথে সাথে পাল্টে যায় গ্রামটির ভূগোল। ওপর থেকে দেখলে মনে হবে, কচি হাতে আঁকা একটি নদী-গ্রাম। সাপের মতো লিকলিকে দেহ নিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে, গ্রামটিও অতি উৎসাহের সাথে বাকে বাক মিলিয়ে খানিকটা পথ হেঁটে পিছুটান মেরেছে। অন্যদিকে নিরন্তর মাঠ। যতদূর চোখ যায় ধানী জমি, যেখানে আকাশ-মাটি এক হয়েছে বলে গ্রামের মানুষ মনে করে, সেখান থেকে ভারত দেশের শুরু। ওদিকটাতে গ্রামটা আরেকটু হাতপা ছড়াতে পারত, কিন্তু কেন জানি তার যত চাপ এই নদীটার দিকেই। ফলে ওদিকে আয়তনে না বেড়ে নদী যেখানে যেখানে কোমর বাঁকিয়েছে সেখানে সেখানেই নতুন করে বসতি হয়েছে। নদী একটু আড়মুড়া কেটেছে তো বেদখল হয়েছে তার শরীরের খানিকটা। এই অতি নদীপ্রেমই যে নদীধংসের কারণ হচ্ছে, সে কথা ওদের কে বোঝাবে!
নদীর সঙ্গে উঠোন মিশিয়ে ভ্যাদা কবির ভিটে বাড়ি। কয়েকপুরুষ থেকে তাদের বাস এখানে। কাগজে কলমে সে একদাগে দু’বিঘা জমির মালিক। কিন্তু কাঠা সাতেক নদীর চর দেখিয়ে দখল করে রেখেছে বিল্লাহ চেয়ারম্যান। বিল্লাহ চেয়ারম্যান নির্বাচিত চেয়ারম্যান না, তার সাতপুরুষে কেউ চেয়ারম্যান ছিল কিনা সন্দেহ। বছর বিশেক আগে একবার চেয়ারম্যানের ইলেকশন করেছিল বিল্লাহ, ভোট যা পেয়েছিল তা মুখে বলবার না। সেই থেকে তার নামের শেষে চেয়ারম্যান শব্দটা কে বা কারা যেন লেপে দিয়েছে, সঙ্গে একটা বায়বীয় ক্ষমতাও। ভ্যাদা কবির অবশ্য জমি হারানো নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আশেপাশের তিনগাঁয়ে একজনই কবি, সে হল ভ্যাদা, তাকে জমিজমা নিয়ে ভাবলে চলবে কেন! তাছাড়া ছেলেপুলেও হয়নি যে উত্তরসূরি নিয়ে ভাবতে হবে। আছে একখান বৌ- মিছরি সুন্দরী। দেখতে উঠের মতোন, গা-গতরে শ্রী-এর ছিটেফোঁটাও নেই, নামের শেষে তবুও বাপ-মা জোর করে বিশেষণটা জুড়ে দিয়েছে। ভ্যাদা সেটি ছেঁটে ফেলার চেষ্টাটুকুও করেনি। বরং ‘মিছরি’ শব্দটা বাদ দিয়ে সে ‘সুন্দরী’ নামটিই ব্যবহৃত নাম হিসেবে গ্রহণ করেছে। আশেপাশের বাড়িগুলোতে এ নিয়ে হাসিঠাট্টাও কম হয় নি। ভ্যাদার ওসব নিয়ে ভাবলে চলে না। কবি সে, তার ভাবনা অন্যখানে। তাকে কাব্য নিয়ে থাকতে হয়, কাব্য নিয়ে ভাবতে হয়। নিশ্চিন্তপুরসহ সামনে পিছনের আরো দু’গাঁ দিয়ে ভ্যাদার আগে-পিছে কোনো কবি নেই। ছবির মতো গ্রাম এই নিশ্চিন্তপুর। নয়নমেলে তাকালে পাগলেরও কাব্য করার কথা। তবুও কেন যে কোনো কবির জন্ম হল না এখানে, সেটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা চলে বটে। এজন্যেই এই অঞ্চলের জন্যে নিজের কবিজন্মকে ঐশ্বরিক দায়িত্ব বলে জ্ঞান করে ভ্যাদা। সে সংসারের সাতপাঁচে জড়িয়ে তার এই কবিজন্মকে অবহেলা করতে পারে না। নিয়ম করে সে কাব্যচর্চা করে। এটিকে সে তার ইহধর্ম বলেই মনে করে।
ভ্যাদার কাব্যচর্চা আর পাঁচটা কবির মতো না। সে কবিতা কাগজে-কলমে লেখে না। মনে মনে কবিতা বোনে, মনে মনে চাষ, ফসল মনে মনেই উজাড়। কদাচিৎ দু’একটি শব্দ সে বাইরে ফেলে। সেটি শোনার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়। তার কবিতা কোনোদিন কারো শোনার বা পড়ার সুযোগ না হলেও, এই এলাকা ছাড়িয়ে মেহেরপুর শহরের সাহিত্যপ্রেমীরাও তার নাম জানে। মানেও। মাঝে মাঝে শহর থেকে সাহিত্যানুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্যে তার নামে ডাকও আসে। কিন্তু কাব্যচর্চাকে একান্ত ব্যক্তিগত জ্ঞান করে সবধরনের সামাজিকতাকে এড়িয়ে চলে কবি ভ্যাদা। সে নিয়ম করে মাসে দু-তিনটা দিন কাব্য নিয়ে বসে। একটা তেল চিটচিটে কেলে পাটি নিয়ে চলে যায় নদীর ধারে, কোনো কোনো দিন ধান ক্ষেতের মধ্যখানে, আসন পেতে বসে। কবিতা নিয়ে ধ্যান করে। বাড়ি ফিরলে বৌ বা ফেরার পথে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, ‘আজ কি কাব্য বানালি শুনাও দেখি নি?’ ভ্যাদা সরলভাবে উত্তর করে, ‘সেকি, শুনাবু কেমুন করি, আজ তো আমি শব্দ দি’ কবিতা লিখি নি। আজ লিখিচি গন্ধ দি।’ কোনো কোনোদিন বলে, ‘আজ কাব্য করিচি ফড়িং আর দুধধানের নেঙর দি। যা রঙ হলু না, সে মুখে বুলি বুঝানু যাবে না! সূর্য্যির আলো ফুটার সাথে সাথে সব উবে গিছে। থাকলি না দেখাব!’ যেদিন নদীর ধারে বসে, সেদিন কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর করে, ‘আজ কাব্যটা খুব জমিছিল বটে। কেন্ত সব তো জল দি নির্মাণ করিলাম, তাই ভেসি গিছে দখিনের হাওয়াই গা এলি দি। কিছু তো ধরি রাখতি পারিনি!’
শব্দ দিয়ে যে ভ্যাদা মোটেও কোনো কাব্য করে না, তাই নয়। যেদিন তার কাব্যে শব্দ থাকে, সেদিন সে নিজেই রাস্তার লোকজন জড় করে বলে, ‘আসু, তুমাদের শুনায়।’ লোকজন যে কাব্য বোঝে বা কবিতায় আগ্রহ আছে তা নয়, তবুও দেখা গেল বেশ কিছু লোকের জমায়েত ঘটে গেল। তাদের মধ্যে শিক্ষিতরাও যেমন থাকতো, তেমন রাখাল কৃষাণরাও থাকতো। ভ্যাদা হয়ত খানিক চুপ থেকে বলল, ‘ডুবসাগর, জগতজুড়ি কেবলই যে অচিন ডুবসাগর!…’ এরপর খানিক চুপ থেকে চলা শুরু করলো। লোকজন পথ আটকে বলল, ‘সারা বিকাল দি এই টুকুন?’ কেউ হয়ত একটু রাগিসরে বলে উঠল, ‘সবটা না শুনি যাবি নি ভ্যাদা!’ ভ্যাদা সরলভাবে বলে, ‘সবটা তো আমি শব্দ দি লিকিনি। এর সঙ্গে কিছু কিছু বাতাস ছেল, আর ছেল পশ্চিমের আকাশে হটাত করি ফুটি উঠা রঙধনুটা। কি করি ওসব শুনায় বলতো?’
যেদিন জনতা জেদ করে বসে সেদিন ভ্যাদা আরেকটু বাড়িয়ে বলে, ‘কবিতা হলু রান্না করার মতোন। শুধু তরকারি সেদ্ধ করলি কি স্বাদ জমে? মসল্লা দিতি হয় না? কাব্যেরও তেমন মসলা লাগে। তরকারি যেমন দেখলি হয় না, চেকি বুঝতে হয়, তেমুন কাব্যও খালি শুনলি বা পড়লি হয় না, বোধ দি অনুভব করতি হয়। সেই বোধ আমি তুমাদের মাঝে কেমনে বিলাই, কও তো?’ এর বেশি কথা বলে না ভ্যাদা। সারাদিনই সে হাতে গুণে গুণে কয়েকটা কথা বলে সুন্দরী মিছরির সঙ্গে। খুবই দরকারি সেসব কথা।
যেসব দিনে সে কাব্য করতে যায় না, সেসব দিনে সারাদিন সারারাত ঝিম মেরে বসে থাকে। আবার কখনো কখনো টানা দু’তিনদিন ঘুমিয়ে কাটায়। দেখা গেল তিনদিন ঘুমিয়ে আর তিনদিন জেগে-বসে কাটিয়ে হঠাৎ একদিন কেলে পাটিটা কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা দিল। সেদিন বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত কারো সাথে কোনো কথা নেই। বাড়িতে বৌ কিংবা পথে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে ইশারায় উত্তর করে অথবা না শোনার ভান করে আপন গতিতে হেঁটে চলে। বাড়ি ফেরার পথেও তার ভেতর থমথমে রেশটা রয়ে যায়। প্রসব করার পর যে সাময়িক যন্ত্রণা ও প্রশান্তির মিশেল অভিব্যক্তি তৈরি হয়, অনেকটা সেই রকম।
ভ্যাদা কবির গ্রামে একটা অন্যরকম সম্মান ছিল। লোকজনের বিশ্বাস প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবার অলৌকিক শক্তি ছিল তার। যেদিন কাব্য করতে বসতো, সেদিন তার চারপাশের প্রকৃতি একেবারে বদলে যেত। দেখা যেত গ্রামজুড়ে কটকটে চাঁদি ফাটা রোদ, অথচ ভ্যাদা বসে স্নিগ্ধ ছায়াময় প্রকৃতির মাঝে। তাকে ঘিরে প্রকৃতির একটা আলাদা আয়োজন থাকতই। গায়ের কৃষাণ বালকেরা নিজ চোখে দেখেছে বলে গায়ে এসে গল্প করেছে, ভ্যাদা চোখ বন্ধ করে বৃষ্টি ডেকে এনেছে। সে বৃষ্টির মাঝে বসে আছে অথচ তার শরীরে একফোঁটাও বৃষ্টি পড়েনি। কিংবা ভ্যাদার একেবারে মাথার ওপর নেমে এসেছে একখণ্ড মেঘ। কখনও কখনো কিছু অচেনা পাখি এসে ভ্যাদার পাশে বসে আছে, যেন আলাপ করছে। এমন অনেক রটনা আছে ভ্যাদার কাব্যকরা নিয়ে। এসব সত্যি কি মিথ্যা যাচাই করতে যায়নি কেউই।
ভ্যাদার বৌ জানে, ভ্যাদাকে দিয়ে সংসারের একটি কাজও হবে না, কোনোদিন হয়ও নি। তবুও সে এটা সেটার কথা তুলে সারাদিন ঘ্যান ঘ্যান করে। এটা তার রোজকার কাজ, এখন অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। ভ্যাদা দুতিনদিন ঝিম মেরে পড়ে থেকে যেদিন কাব্য করে ফেরে কেবল সেদিনই কি মনে করে কে জানে, মিছরি সুন্দরী বেশি কথা পাড়ে না। অথচ ভ্যাদার সেদিন মনটা ভীষণ ফুরফুরে থাকে, ইচ্ছে করে মিছরির হাতে হাত লাগিয়ে সংসারের কোনো কাজে আসার। মিছরির চুপ মেরে যাওয়া দেখে ভ্যাদা আর সাহস করে আগ বাড়িয়ে কিছু বলে না। বাড়ির পিছনে পাশাপাশি দুটো বাবলা গাছ আছে। একটার ছায়া তলে আর একটা চারাগাছ। ভ্যাদা সেদিকটায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেখেয়ালি হয়ে ওঠে। নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে, অনাগত সন্তানের কথা ভাবে, যে হয়ত কোনোদিন জন্মাবে না। চারাগাছটা দুদিন করে কেটে ফেলতে গিয়েছিল পূবপাড়ার মকসেদ। মিছরি হাতে পায়ে ধরে ঠেকিয়েছে। কারণ সে ভ্যাদার অসুখটা বোঝে। এর আগে এমন মা-মেয়ে বয়সী দুটো পাশাপাশি পেঁপে গাছের দিকে তাকিয়ে কয়েকবছর কাটিয়ে দিয়েছিল সে। ঝড়ে পেঁপে গাছদুটির একটি ভেঙে গেলে ভ্যাদার মুখের দিকে তাকাতে পারেনি মিছরি। ভ্যাদা প্রায় প্রতিদিনই কাব্য করতে গিয়ে অস্থির হয়ে ফিরে এসেছে। এমন আরো কয়েকবার হয়েছে। এবারও হবে, অন্যের জমির গাছ হাতে পায়ে ধরে আর ক’দিনইবা আটকে রাখবে মিছরি! নিজের পেটের দিকে তাকায় সে, ‘ছিনাল!’ এটুকু বলেই থেমে যায়।

old-man-winter-george-ameal-wilson
খ.
ভ্যাদা-মিছরির জীবন এভাবেই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলছিল। সংসারে দুটো মানুষ কখনো তিনটে হয়নি। ভ্যাদা হাজার হাজার কবিতা উড়িয়ে দিয়েছে বাতাসে, ভাসিয়ে দিয়েছে জলে। একই গায়ের ছেলে আমি, ভ্যাদার কথা শুনেছি কিংবা শুনিনি। আমি গায়ে থাকতে খেলাধুলা আর পাঠ্যবই নিয়েই থাকতাম। আমাদের বাড়ি ছিল ও পাড়ায়, নদী থেকে বেশটুকু দূরে। একবার নদীর ধারে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে সুতা কেটে গেলে আমাদের কে যেন বলেছিল, ‘ঐ দেখ ভ্যাদা কবির চালে গি পড়লু! আমি ঐ প্রথম বোধহয় ভ্যাদার কথা শুনি।
‘কবির বাড়ি?’ আমি ছোট্ট করে প্রশ্ন করেছিলাম। কেউ খেয়াল করেনি, আমিও না। কিভাবে যেন মুখ ফসকে বের হয়ে গিয়েছিল। আর একবার ভ্যাদার কথা শুনেছি, মা’র মুখে। ‘তোর মিনসে আর মানুষ হলু না! ভ্যাদাকে বুলিস ওসব কাব্যকরা ছেড়ি সংসারে মন দিতি। আমি তোর ভাইকে বুলি একটা জমির ব্যবস্থা করি দেবো।’- বুঝেছিলাম, মহিলা ভ্যাদার বৌ। তখনও আমি ভ্যাদাকে দেখিনি। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষা দেবো, সবে টেস্ট দিয়েছি।
একই গায়ে বাস অথচ ভ্যাদার সঙ্গে জীবনে ঐ প্রথম সাক্ষাৎ। আমি খেলতে যাবো পশ্চিম পাড়ার মাঠে। উত্তর পাড়ায় আমাদের বাড়ি। শর্টকাটে যাওয়ার জন্যে মাঠের মধ্যিখানের আইল ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ কার যেন নিঃশ্বাসের শব্দ পেলাম। একটু গা ছমছম করে উঠলো। আশেপাশে ঘুরে তাকানোর সাহস পাচ্ছিলাম না।
‘ভয় পেয়ু না। আমি!’ ঘাড় ঘুরে তাকালাম, কয়েক হাত দূরে ধানী জমির এককোণে খানিকটা জায়গা করে বসেছিল সে। হাতে-পাছে কিছু ছিল না। একা একটা মানুষ। ছেড়া সাদা পাঞ্জাবি।
‘আপনি কি নতুন এ গায়ে?’ কিংবা ‘এখানে কি করছেন?’ এ জাতীয় কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলাম না। ভয়টা তখনও কাটেনি। জোরপায়ে হাঁটা দিলাম। পরে কাউকে কিছু বলিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হয়ে আমিও কবিতায় মন বসালাম। ততদিনে আমি এক অর্থে গাঁছাড়া। ঈদ-কুরবানি আর গরমের ছুটিতে বাড়িতে আসা। কবিতা তখন বিভিন্ন লিটলম্যাগাজিনে প্রকাশিত হচ্ছিলো। বন্ধুদের মিলে নিজেরাও একটা ম্যাগ প্রকাশ করবো উদ্যোগ নিলাম। লেখা সংগ্রহ করতে করতে আমার হঠাৎতই একদিন ভ্যাদা কবির কথা মনে হল। কয়েকদিনের ছুটি পেয়ে বাড়ি গিয়ে এক বিকেলে ভ্যাদা কবির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভ্যাদার বউ আমাকে বসার জন্য একটা ভাঙা চেয়ার পেতে দিলো। বলল সাবধানে বসতে, পিছনের পায়াটা নড়া। ভ্যাদার বউ বেশ শুকিয়ে গেছে। বয়সের ভারে চুলে পাক ধরেছে। আমার সেই আগের দেখা মানুষটির সঙ্গে এই মানুষটির কোনো মিলই নেই। কেবল চোখজোড়া বদলায়নি। ভ্যাদা ঘর থেকে বের হয়ে এলো। একটা ফুটো ফুটো স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে থাকা ভ্যাদা আমার সামনের চটটা মেলে নিয়ে বসলো। ওর বসার ভঙ্গিমা দেখে মনে পড়ে গেল, সেদিন বিকেলে ধান ক্ষেতের কোণায় যাকে বসে থাকতে দেখেছিলাম, সে ভ্যাদায় ছিল। ভূত ছিল না জেনে এতদিন পরও যেন আশ্বস্ত হলাম! মনে হল ভয়টা এতদিন ভেতরে কোথাও ছিল, আজ ছাড়া পেয়ে আনন্দে ভেসে ফুর্তি করতে করতে ভেসে গেল। আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না।
‘তুমার মা ভালো আছে?’ ভ্যাদার বৌ উঠোনের চুলাটা গোবর দিয়ে লেপতে লেপতে জিজ্ঞেস করলো।
‘কে ওর মা?’ ভ্যাদা আস্তে করে বলল।
‘নছিরন বুবু।’
‘ও মিয়া বাড়ির ছেলি তুমি!’ ভ্যাদা বলল।
আপনি আমার মাকে চেনেন?
‘তুমার আব্বাকে চিনি।’
‘তুমার আব্বা ওর বন্ধু ছেল।’ ভ্যাদার বৌ যোগ করে।
‘বন্ধু না। ওই একসাথে কদিন স্কুলে গিলাম।’ ভ্যাদা কথাটা ঘুরিয়ে নেয়।
‘বাবা কোনোদিন বলেনি তো আপনার কথা!’ আমি একবার বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। আপনি একটা কবিতা শোনাবেন? শুনেছি আপনি ভালো কবিতা লেখেন। আমার কথা শুনে ভ্যাদা কবির মুখে একটা হাসি ঝিলিক দিয়ে আবার নিভে গেল।
‘ও তো আর কাব্য করে না, বাবু। কাব্যকরা ছেড়ি দিচে।’ ভ্যাদার বৌ উত্তর করলো। কেন? কবিতা লেখা ছেড়ে দিলো কেন?
ভ্যাদার বৌ কোনো উত্তর করলো না। ভ্যাদাও চুপচাপ। ঠিক আছে আমাকে একটা পুরানো কবিতা দিলেও চলবে। আমি একটা ম্যাগাজিন করছি, ভ্যাদা চাচার কবিতা প্রকাশ করতে চাই। আমি আর একসময় এসে নিয়ে যাবোÑ বলেই উঠে পড়লাম। ওরা কেউ কোনো কথা বললো না। ভাবলাম গায়ের মানুষ হয়ত জানবে। এতদিন ধরে কবিতা নিয়ে পড়ে থাকা মানুষটা কেন কাব্যকরা বন্ধ করে দিলো, তার একটা যুতসই উত্তর সবার জানা উচিত। নিশ্চয় কারণটা হালকা কিছু না। সাহিত্যের ছাত্র আমি। জানি, ঘোষণা দিয়ে কবিত্ব ছেড়ে দেয়া যায় না। দিন কতক গ্রামের পাড়ায় পাড়ায়, আড্ডায় আড্ডায় ঘুরে ভ্যাদা কবির কথা জানতে চাইলাম। আশ্চর্য হলাম, ভ্যাদা সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না দেখে। একদল তো বলেই ফেললো, ‘ও একুনু বেঁচি আছে নাকি! আবার কেউ কেউ পাল্টা প্রশ্ন করলো- ‘কুন ভ্যাদা?’ যেন ভ্যাদা কোনোদিনই এই গায়ে ছিল না।
ও কবি। ওকে আমাদের চিনতেই হবে। আমরা সুদূর ইংল্যান্ডের কবিদের কত সমাদর করছি, তারা বেঁচে নেই কেউ কেউ কয়েক শতাব্দী ধরে। তবুও অশ্রুসিক্ত হয় তাদের জীবনসংগ্রামের গল্প শুনে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি তাদের কবিতা, তাদের বেঁচে থাকার বেদনা। আর আশেপাশের দশ গায়ের এক কবি ভ্যাদা-কবি বেঁচে থেকেও এমন অদৃশ্য হয় কি করে? মাকে বলেছিলামÑ মা তুমি কিছু জানো? ভ্যাদার বউ না তোমার কাছে আসতো? মা আমার মুখে ভ্যাদার নাম শুনে আশ্চর্য হলেন। এতে তাকে দোষ দেয়া চলে না। বাড়িতে জীবনে এই প্রথম আমি ভ্যাদার নাম নিয়েছিলাম।
‘ভ্যাদা চলি যাওয়ার পর ওর বৌ একদিন এসিলো। সেও বছর পাঁচেক আগে। হাউমাউ করি কান্নাকাটি করি চলি গিচে। মাঝে মদ্যি মনে হলি আমি একে উকে দি চালডাল পাঠাই। আমি দেখতি যাবো, আমার কি আর সেই জো আছে!’ মা বললেন।
ভ্যাদা চলে গেলে, মানে? কোথায় গিয়েছিল সে?
‘তা আর কেউ জানতি পারলু কই? সেই যে দিন দপরে নদীর ধারে কাব্য করতি করতি নিরুদ্দেশ হলু, আর তো ফিরলু না। মাঠে ঘাটে একুনু দেখা যায় বুলি রব ওঠে। কেন্তু বাড়ি তো ফেরে না!’
ভ্যাদা যে বাড়ি ফিরে এসেছে। আমি যে ওকে বাড়িতে দেখে এসেছি। সেকথা আর পাড়লাম না।
রাতে রান্নাঘরে বসে মায়ের সঙ্গে কথাগুলো হচ্ছিলো। পরদিন ভোরে উঠেই ভ্যাদার উঠোনে গিয়ে আমি হাজির। ভ্যাদার বৌ সবে উঠে উঠোনের কোণে কটা শুকনো কুলের ডালের ওপর পুঁইশাকের ডগা উঠেছে, সেগুলো ঠিক করে দিচ্ছিলো।
বলল, ‘বসো’। একবার বলল, ‘বসেন’। চেয়ারটা সেভাবে সেখানেই আছে। আমি সাবধানে বসলাম।
ভ্যাদা চাচার কাছে এসেছিলাম- আমি বললাম। ভ্যাদার বৌ কোনো কথা বলল না।
‘কটা মুড়ি তুলা আছে। দেবো?’ খানিক বাদে বলল সে।
আমি এত ভোরে কিছু খাই না। কাল রাজশাহী চলে যাবো, তাই কবিতাটা নিতে আসলাম। আমি জবাব দিলাম।
‘বুন ভালো আছে?’ জানতে চাইলো সে।
হুম। আছে। কাল আপনার কথা বলছিল। আপনি আর যান না, আপনি গেলে মা ভীষণ খুশি হবে।
‘তুমার চাচা থাকতি মেলা গিচি। একুন আর সুময় পাইনি। একা একাই সব করতি হয়।’
ভ্যাদা চাচা নেই মানে? আমি না কয়দিন আগেই আপনার সামনে বসে থাকতে দেখে গেলাম। আমরা দুজনে কথাও বললাম।
‘আমি তো সবসুময় দেখি তাকে। দুজনে সারাদিন মেলা কথা বুলি। মাঝমদ্যি আমার সাথে খাইও।’
কিন্তু নেই বললেন যে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘একদিন তো চলি গেল। না বুলি চলি গেল। ঘুমের ঘোরে বুলতুক, যাবে। কুতায় যেনে কি আছে, বুঝা যাতুক না। শুধু যাবে, এটা বুঝা যাতুক।’
সেদিন আমি স্পষ্ট করে দেখলাম। আমার পায়ের কাছে ছেঁড়া চটে বসেছিল। পরনে ছেড়া স্যান্ডো আর লুঙ্গি। তার গায়ের গন্ধও আমি পেয়েছি। এটা মিথ্যে হতে পারে না। ভ্যাদা যদি গিয়েও থাকে, নিশ্চয় ফিরে এসেছে।
ভ্যাদার বৌ আর কথা না বলে পাঁতি-হাঁসদুটোকে মাটি দিয়ে বানানো খাঁচা থেকে বের করে নদীর দিকে ছেড়ে দিয়ে বললেন- ‘যা, দপরের আগ দি চলি আসিস। বিহানে আবার একবার যাস। আমি নিজেই দি আসবু তোদের।’
ভ্যাদার বউকে আমার স্বাভাবিক বলে মনে হল না। আমি যখন আসলাম তখন বিড়বিড় করে পুঁইগাছের সঙ্গে কথা বলছিল। ‘ঠিক মতো আঁকড়ি ধরি থাকিস। বড় হচ্ছিস, আর কত জ্বালাবি!’ তখন আমলে তুলিনি। আমার গা ছমছম করে উঠলো। মনে হল যেন ভ্যাদা আমার পাশেই বসে আছেন। মনে হল যেন, ভ্যাদা কেবলই একটা ক্ষয়ে যাওয়া নাম। নামটি থেকে আমি কেমন মৃত মৃত গন্ধ পাচ্ছিলাম। উঠে আসার আগে একবার চেয়ারটা ভালো করে ঝাঁকি দিলাম। একটি পায়া টুপ করে খুলে পড়ে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পথে ট্রেনে বসে আমার টুকে রাখা নোট:
মিছরি সুন্দরী ভ্যাদার কাব্যকরা নিয়ে একসময় কত কথা শুনিয়েছে! আজ সে নিজেই ভ্যাদার কবিতা হয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে।
ভ্যাদা কবি খুব সম্ভবত নিজের প্রস্থান নিয়ে রচনা করে গেছেন তার সবচেয়ে মহান কবিতাটি।

[296 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0