পৃথিবীর এক কোনায় একটি গ্রাম ছিলো, সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা। সেই গ্রামের লোকেরা মাছ দিয়া ভাত খাইয়া, জারি-সারি গান গাহিয়া মনের সুখেই দিনাতিপাত করিত। কিছু কিছু মানুষ অবশ্য ভাতের বদলে তখন রুটি কিংবা নুডলস এই জাতীয় দ্রব্যাটি খাইত। যাহারা ভাতে অভ্যস্ত তাহারা তাহাতে আঁৎকাইয়া উঠিতো। রুটি না হয় সহ্য করা গেলো, ভাতের পাশাপাশি তাও চলিয়া যায়, তাহাদের মতই দেখিতে অন্য গোত্রের মানুষরা সেইটা খায়। তাই বলিয়া নুডলস! সেতো পুরোই অশাস্ত্রীয় অনাচার!

জন্মের পর হইতে তাহারা তাহাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা-খালা-ফুপু, ওমুক তমুক চৌদ্দগোষ্ঠীকে নানা রকমে ভাত খাইতে দেখিয়াছে। পার্বণবিশেষে ভাতকে খিচুড়ি কিংবা পোলাও-বিরিয়ানিতে রূপান্তরিত হইতে দেখিয়াছে, তাহারা তাতেই অভ্যস্ত। বরং মাছের বদলে তাহারা মাংসের দিকে দিনে দিনে আগাইয়া গেলো। বিভিন্ন আবরণে, পর্দায় ঢাকিয়া তাহারা মাংস সহকারে ভাতই খাইবে। যাই হউক, যাহারা নিয়মিত ভাত খাইত তাহারা নুডলস খাওয়া ঠিক সুনজরে না-দেখিলেও ব্যাপারটি সহ্য করিয়া কিংবা মানিয়া লইতো।

কিন্তু হাল্কাপুল্কা নুডলসখানেওয়ালাদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়িয়া যাইতে লাগলো। তিন বেলা ভাত খাওয়ার অপকারিতা সম্বন্ধে এক বেলা নুডলসখানেওয়ালারা লেখালেখি করিতে লাগিল। ভাতে ডায়াবেটিসের আশঙ্কা থাকে, ডায়বেটিস শরীর নরম করিয়া দিলে অন্য রোগ ব্যাধি জাঁকাইয়া বসিয়া শরীর কাবু করিয়া ফেলিতে পারে, তাহাতে মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা বাড়িয়া যায়। ভাত উৎপাদন ও রন্ধনের প্রক্রিয়া মোটেও বৈজ্ঞানিক নহে, অর্থনৈতিকও নহে। ভাত শরীরকে অলস করিয়া দেয়, তাহাতে কর্মক্ষমতা এবং স্পৃহা কমিয়া যায় ইত্যাদি যখন তাহারা যুক্তি সহকারে লিখিতে লাগিল, তখন জনম জনম ধরিয়া যাহারা ভাতের ব্যবসা করিত আর যাহারা ভাত খাইত, তাহারা খুবই ভয় পাইয়া গেলো। তাহারা নুডলসকে বিগ্রামীয় সংস্কৃতি আর খাবার আখ্যা দিয়া উঠিয়া পড়িয়া তাহার বিরুদ্ধে লাগিল।

নুডলসটা দেখিতে কেমন যেনো লম্বা লম্বা কৃমির মতন, কিংবা বাঁকা বাঁকা প্যাঁচানো। মাছ দিয়া সেই ভাবে এইটা ঠিক করিয়া জুইত মত মাখা যায় না। কাঁটাচামচ দিয়া খাইতে হয়, হাতে ঠিক সুবিধা হয় না। আর এইসব এই গ্রামের সংস্কৃতির সাথে ঠিক মানানসই নয় বলিয়া প্রথমে ফতোয়া জারি করিল। প্রাণ যায় যাক, কিন্তু গ্রামের সংস্কৃতি নষ্ট হইতে দেয়া যাইবে না। হাত দিয়া মাখিয়া মাখিয়া ভাত খাইয়াই আমরা জীবনপাত করিব ইহাই আমাদের অঙ্গীকার, কহিল তারা। আর যাহারা এই কথা না মানিবে দরকার হইলে তাহাদের হত্যা করিয়া আমরা আমাদের অঙ্গীকার রক্ষা করিব। গ্রামের এই উত্তেজনা নিয়া গ্রামের জমিদার পক্ষ তখনও উদাসীন।

নুডলসখানেওয়ালারা কিংবা বিক্রেতারা ভাত ব্যবসায়ীদের এই হুমকি ঠিক ততোখানি গুরুত্বের সহিত দেখিলেন না, তাঁহারা তাঁহাদের নিজের চরকায় তৈল দিতে থাকিলেন যেমন পূর্বেও থাকিতেন। ইটালীয় নুডলসের পাশাপাশি বরং চৈনিক বিভিন্ন প্রজাতির নুডলস মিশিয়া তাহাদের মালামালের সম্ভার আরো বাড়িয়া গেলো।

উপায় না-দেখিয়া একদিন সত্যি সত্যিই এক নুডলস বিক্রেতাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় চাপাতি দিয়া কোপাইয়া খুন করিয়া ফেলিলো ভাত ব্যবসায়ী এন্ড করপোরেশন। খুন করিয়া দম্ভভরে ঘোষণা করিয়া জানাইল, ইহা তাহাদেরই কাজ। কথা না শুনিলে এখন থেকে কোপাইয়া মুখ বন্ধ করিয়া দিবে সকলের। নুডলস পক্ষ হতবাক হইয়া গেলো। কিন্তু তাহারা দমিয়া গেলো না, তাহারা তাহাদের মতই নিজের কাজ করিয়া যাইতে লাগিল।

গ্রামের জমিদার তখনও উদাসীন। গ্রামের জমিদার কর্তৃপক্ষ তখন গ্রামের আপামর জনগণের মনোভাব বুঝিতে ব্যস্ত। কে মরিল কিংবা কে থাকিল তাহা দিয়া আসলে তাহাদের কিছু যায় আসে না। যাহারা খাজনা দিবে তাহাদের মধ্যে কাহাদের শক্তি আর সামর্থ্য বেশি, নুডলস না ভাত, ইহাই তাহাদের মুখ্য বিচার্য বিষয়। ভাতখোরেরা ইহা বুঝিয়া সানন্দে একের পর এক নুডলসবিক্রেতা ও ভোক্তা খুন করিয়া যাইতে লাগল।

আগে রাস্তা-ঘাটে, মেলায় তাহারা নুডলসপক্ষের অপেক্ষা করিত। এখন আর তাহার প্রয়োজন নাই বুঝিয়া, নুডলসপক্ষীয়দের বাসা বাড়ি, অফিসে ঢুকিয়া কোপাইতে লাগিল। ভাতের আধিপত্য কমিয়া গেলে তাহাদের ব্যবসায় অসুবিধা হইতে পারে ভাবিয়া, কোপানোর ভয় দেখাইয়া মানুষকে ভাতের দিকে টানিয়া রাখিতে সক্রিয় হইলো ভাত ব্যবসায়ী এন্ড কোং।

এক গ্রামের শান্তি বিনষ্ট হইলে অন্য গ্রামেও তাহার প্রভাব পড়ে। এক গ্রামবাসীর আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব অন্য গ্রামেও আছে। দূরে খুব উন্নত একখানি গ্রাম ছিলো, যেখানে সকলেই যাহা ইচ্ছা খাইতে পারে, নুডলস, ভাত, রুটি, স্যুপ। ইহা লইয়া সেই গ্রামে বসবাসকারীদের মধ্যে তেমন মাথা ব্যথা ছিলো না। সকলেই মিলিয়া মিশিয়া থাকিত। সেই গ্রামে এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের জমিদারের নাতি থাকিত। কারণ, সেইখানে প্রাণ ভয় ছিলো না। তাই সেই গ্রামের সুন্দরী এক নুডলস তরুণীকে বিবাহ করিয়া জমিদার নাতি সেখানেই স্থায়ী হইয়া গেলো।

সেইখানে একদিন তাহাকে কেউ জিজ্ঞাসা করিল, ওহে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের জমিদার নাতি, তুমিতো এইখানে রয়েছে মহাসুখে অট্টালিকা পরে, ঐখানে তোমার নানার গ্রামে যে লোকে কাঁদিয়া ভাঙিয়া পরে/ খুন হইয়া মরে।

মুখ আমসি করিয়া নাতি চিবাইয়া চাবাইয়া কহিল, আসলে আমার মাতা যাঁহারা নুডলস খাইয়া খুন হইতেছেন তাঁহাদিগের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল, কিন্তু ভাত হইলো আমার মায়ের ভোটের আধার, তাই তাঁহার নির্দেশে এই সকল মৃত্যু নিয়া সকলেই মুখে কুলুপ আঁটিবো বলিয়া ঠিক করিয়াছি। তাহারা মৃত্যুবরণ করুক ইহা আসলে আমরা চাই না, কিন্তু আমরা কী করিব বলুন? আমরাতো তাহাদিগকে নুডলস খাইতে বলি নাই। নুডলস লইয়া কথা কহিয়া আমরা ভেতো গ্রামবাসীর বিরাগভাজন হইতে চাই না। সেই গ্রামে ভাত আছে, ভাত থাকিবে, ভাতই তাহাদের নিয়তি। আমরাতো বাহিরের উন্নত গ্রামে ভিনগ্রামের স্ত্রীর সহিত স্যুপ, পাস্তা, পিজা খাইতে পাইতেছি, আমাদের সমস্যা কোথায়? সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদিগের গ্রামে নুডলসপক্ষীয়দের নিজেদেরও সমঝিয়া চলিবার প্রয়োজন আছে বৈকি। গ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন এমনই সংকটাপন্ন যে এইসব লইয়া কথা কহিলে সমস্যা বৃদ্ধি পাইতে পারে। মানি যে ভাতখোরদিগের নুডলসপক্ষীয়দের কোপাইয়া কেষ্টপ্রাপ্তি করানো উচিত হয় নাই, কিন্তু নুডলসপক্ষীয়দিগেরও বুঝিতে হইবে ভাতখোরদিগের অনুভূতি, তাহাদের ভাতানুভূতিতে আঘাত দেওয়াটা তো মোটেও উচিত কর্ম নহে।

যখন প্রশ্ন করা হইলো, কিন্তু নুডলসপক্ষীয়েরা তো তাহাদের মত প্রকাশ করিতেছে মাত্র, এই অপরাধে কাহাকেও হত্যা করা যায় কিনা! ইহার উত্তরে শ্রীমান নাতি অতি উচ্চাঙ্গের হাসি (যারে কয়, হাই ক্লাস) দিয়া কহিলেন যে, এই অপরাধের ব্যাপারে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠিত হইয়াছে, অপরাধী ধরা পড়িল বলিয়া, দোষ করিলে কাহাকেও রেহাই দেওয়া হইবে না। তবে নুডলসপক্ষীয়দের অনুরোধ রহিল যেন তাঁহারা ভাতখোরদিগের ভাতানুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, এবং ভাতখোরেরাও যেন নুডলসপক্ষীয়দের প্রতি সহানুভূতিশীল হন। এইভাবে, ভাতের ভিতর নুডলস মাখিয়া ও মিশাইয়া হাজার বছরের সংস্কৃতি রক্ষা পাইবে। এই মহাবাক্য শুনিয়া রাজভাতখোর সর্বসেঁচি (ব্যাদড়া বালকগণের মুখে, সর্বখেঁচি) কবি কাব্যকম্বুকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন, গ্রামে শান্তির সুবাতাস বহিতেছে। জয় শান্তি, জয় উন্নয়ন, জয় মানবপ্রেম!

প্রথমে গেল নুডলসখানেওলা, তাহার পর নুডলস বিক্রেতা, নুডুলসের সহিত যে টমেটো সস খাওয়া হইতো সেই সস বিক্রেতা, এরপর নুডলস রান্না করার জন্যে কড়াই যাহারা বানাইয়াছিলো, একে একে সবাইকে কোপাইতে লাগিল ভাতখোরগণ, যাহাকে বলে প্রায় বিনা বাধায়। ক্রমাগত কোপাকুপিতে আশেপাশের গ্রামের লোক চিন্তিত হইয়া পড়িল। দশ গ্রামের মুরুব্বিদের তরফ হইতে ঠিক করা হইলো জমিদারতনয়ার সহিত এই ব্যাপারে বাতচিতের দরকার। কিন্তু জমিদার তনয়া নানা সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক ব্যাপারে ব্যস্ত থাকায়, এই ব্যাপারে সরাসরি কথা কহিতে অস্বীকার করিলে মুরুব্বীরা তনয়ার একান্ত মোসাহেবের সাথে যোগাযোগ করিতে বাধ্য হইলেন।

সে অতি ফাজিল আর স্মার্ট ছোকরা নাম যাহার জালালুল হক কফিল। সে কহিলো, ব্যক্তিগত জীবনে জমিদারতনয়া খুবই সাদামাটা নির্বিরোধী মানুষ। তিনি তিন বেলা নিয়ম করিয়া ভাত খান। মাঝে মাঝে মাঝরাতে উঠিয়াও পানি দিয়া ভিজাইয়া রাখা ভাত নিজের হাতে পেঁয়াজ মরিচ ডলিয়া খাইয়া নেন। শান্তির জন্যে ভাত সম্বন্ধে লেখা যেকোন বই তিনি পড়েন, সুর করিয়া ভাত লইয়া লেখা বই পড়া দিয়া তাহার সকাল শুরু হয়। ভাতকে তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুস্বাদু খাদ্য বলিয়া মনে করেন। কিছু কিছু চাল যখন ভাত হইয়া ফুটিয়া উঠে তখন চারিপাশে মৌ মৌ সুগন্ধে ভরিয়া যায় আর পেটের মধ্যে খিদা কেমন চনমন চনমন করিয়া উঠে। আছে নুডলসে সেই সুগন্ধ? তাহলে কি করিয়া যুগ যুগ ধরিয়া সগৌরবে আর সদম্ভে ভাত টিকিয়া রহিলো পৃথিবীতে?

নুডলসখানেওয়ালাদের ওপর তিনি যথেষ্ট বিরক্ত। নুডলস লইয়া বাড়াবাড়ি না করিতে তিনি কয়েকবার হুশিয়ারি উচ্চারন করিয়াছেন। লম্বা লম্বা কিংবা বেঁকা বেঁকা নুডলস যাহারা খাইবে তাহারা তাহাদের ঘরে বসিয়া চুপচাপ খাইবে, দানা দানা ভাতের লোকমা যাহারা মাংস সহকারে ভক্ষণ করিবে তাহাদের ‘ভাতানুভূতিতে’ আঘাত করা চলিবে না। তাহার ওপর নুডলস একখানি বিদেশি খাবার, ইহা দিয়া এই দেশীয়দের শান্তিভঙ্গ করা চলিবে না।

দশ গ্রামের মানুষজন অবাক হইয়া কহিলো, কিন্তু নুডলসের দেশে যে তাঁহার আত্মীয় পরিজন আছে, তাঁহার ছেলে মেয়ে সেখানে সুখে ঘর করিয়া দিনাতিপাত করিতেছে, তাহার বেলা?

জালালুল হক কফিল রাগিয়া কহিলো, ওতো পাকনা কথায় আপনাদের কাম কী মশাই! ঐগুলো সব রাজরাজরাদের ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আর, তিনি নিজের যোগ্যতাতেই সেখানে থাকিবার ক্ষমতার্জন করিয়াছেন। পারিলে আপনারাও সেখানে হিজরত করুন, কে মানা করিতেছে? কিন্তু এই গ্রামে থাকিতে হইলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদের ভাতানুভূতিতে কোনোক্রমেই কোমল পুষ্পকোরকের টোকাটিও দেওয়া চলিবে না, হুম! যত্তসব! গ্রাম উন্নতির দিকে আগাইয়া যাইতেছে মহাসমারোহে, সেইখানে এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা বলিয়া আপনারা কিন্তু গ্রামের শান্তি, উন্নয়ন ও অপরাধীদিগের বিচারকার্য নিয়া বাধা সৃষ্টি করিতেছেন বলিয়া রাখিলাম! ইতিহাস আপনাদিগকে ক্ষমা করিবে না, গ্রামের জনসাধারণও করিবে না।

এইমতে ভিনদেশি বর্গি তাড়াইয়া গর্বে ও বিরক্তিতে নুডলস কোম্পানির বানানো খোমাখাতায় কফিল লিখিল, আর শুনিয়া রাখ ফোপর দালালরা, ভাত হইলো ভাত। নিজের স্বার্থ ও সুবিধানুযায়ী ইহাকে গরম খাওয়া যায়, ঠান্ডা খাওয়া যায়, তেলে ভাজিয়া ফ্রায়েড রাইস করা যায়, ঘিয়ে ভাজিয়া পোলাও রাইস করা যায়, চিনি দিয়া জর্দা, গুড় দিয়া পায়েস কি না করা যায়? ভর্তায় খাওয়া যায়, ভাজায় খাওয়া যায়, তরকারিতে যায়, চাটনিতে যায়, ডালে যায়, অম্বলে যায়, শত শত বছর ধরিয়া কি এমনি এমনি ভাতের গুণগান হয়? ভাতের ওপর খাদ্য নাই। এতসব জানিয়া শুনিয়া বেয়াড়া লোকটি ভাত না-বেচিয়া কেন নুডলস বেচিতে গেলো? শত শত বছরের ভাতৈতিহ্য ভাঙ্গে কোন সাহসে? কেন এই অপরাধে তাহাকে তাহা হইলে কোপানো হইবে না?

ভাতগুরুদিগের সমাবেশে নুডলসপক্ষীয়দের বিপক্ষে বিষোদ্গার পূর্ব হইতেই ছিল, কোপানোর পরও তাহারা থামে নাই, বরং তাহাদিগের কর্মের প্রতিফলস্বরূপই যে তাহার খুন হইতেছে, এই সারসত্য সবাইকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুঝাইয়া দেওয়া হইল। বেশিরভাগ ভাতখোরেরাই ইহা মানিয়া ভাতের নিচে রক্ত চাপা দিয়া ভাত খাইয়া ও ইহার শ্রেষ্ঠত্ব অবিসংবাদী জানিয়া হৃষ্টমুখে দিবাভাগে কর্ম ও রাত্রিভাগে নিদ্রাযাপন করিতে লাগিল। উগ্র নুডলসপক্ষীয় বা ভাতখোরদিগের কেহ কেহ বিবেকদংশনে দুচারিটি কথা বলিলেও বাকি প্রায় সবাই “চুপ, চুপ” বলিয়া তাহাদিগের গলা চাপিয়া ধরিয়া, হাজতে পাঠাইয়া, দণ্ডপ্রদান করিয়া গ্রামে কবরের শান্তি আনিয়া উল্লসিত হইল।

বাইরের মুরুব্বিরা ব্যাজার মুখে চলিয়া গেলো। সারা পৃথিবী যখন দ্রুত বেগে নুডলস সঙ্গী করিয়া সামনের দিকে ধাবিত হইতেছে, তখন তাহারা ভাত বুকে করিয়া এক জায়গায় স্থির থাকিতে বদ্ধপরিকর। সামনে যাওয়ার কোন আগ্রহ তাহাদের নাই। কিন্তু তাহাতেই কি রক্ষা পাইলো সকল? সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাতখোরদিগের হাতে একের পর এক নুডলসপক্ষীয় খুন হইবার পর, আর কোন নুডলসপক্ষীয় বাকি রইলো না। কেহ ভিনদেশে পলাইয়াছে, কেহ পাশের দেশ গা ঢাকা দিয়াছে, দেশের ভিতর যাহারা ছিল, তাহারা চুপ থাকিয়া, এমনকি মাফ চাহিয়া ভাতের গুণগান করিয়াও রেহাই পায় নাই। কিন্তু ভাতখোরদিগেরতো ফিনকি দিয়া বাহির হওয়া তাজা রক্তের নেশা চাপিয়া গেছে। ফি সহিহ ভাতমোবারকবারে তাজা রক্ত না দেখিলে নিজেকে পরিপূর্ণ মুজাহিদীন, মুমিন, জিহাদী বলিয়া মনে “জিহাদানুভূতি” আসে না।

তাহার পর শুরু হইলো লাল চাল, মোটা চাল, আতপ চাল, চিকন চালের মধ্যে লড়াই। একের পর এক এই লড়াইতে গ্রামটি একদিন ধ্বংসের শেষ মাথায় অন্ধকারে তলাইয়া গেলো। আলো জ্বালিবার জন্যে কেউ আর রহিল না।

শুধু গ্রামের প্রান্তসীমায়, বনের কাছে একঘর ‍বৃদ্ধবৃদ্ধা তাহাদিগের অন্ধের নড়ি, একমাত্র যুবক সন্তান, সেই নুডলসবিক্রেতার বিয়োগব্যথায় কাঁদিয়া কাঁদিয়া অন্ধ হইয়া গেল।

তানবীরা
০৯/১১/২০১৫

[1408 বার পঠিত]