[দ্বিতীয় খন্ডের পর]

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: নিউট্রিনোর স্পন্দন

১৯৩৬ সালে কার্ল ডেভিড এন্ডারসন পার্বত্যএলাকায় মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নতুন একটি কণিকা পেলেন। মেঘ প্রকোষ্ঠে (cloud chamber) নতুন একধরনের গতিপথ দেখে বোঝা গেলো এই কণিকাটির উপস্থিতি এবং এই গতিপথ আগের কোনো কণিকার গতিপথের সাথে মেলানো যায় না। এর গতিপথ ইলেক্ট্রনের মতো একই দিকে বেঁকে যায় কিন্তু বক্রতার পরিমান বেশ খানিকটা কম যা দেখে বোঝা যায় এর চার্জ ইলেক্ট্রনের মতোই ঋনাত্মক তবে ইলেক্ট্রনের তুলনায় এটি বেশ ভারী। শুরুতে এন্ডারসন এই কণিকার নাম দিয়েছিলেন মেসট্রন (meostron) এবং সেখান থেকে কিছুটা সংক্ষেপিত হয়ে এর নাম হলো মেসন (meson)। পরবর্তীতে মেসন আর নির্দিষ্ট কোনো কণিকার নাম রইল না বরং নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের একশ্রেনীর কণিকার নাম দেওয়া হলো মেসন এবং এন্ডারসনের কণিকাটিকে সুনির্দিষ্ট করার জন্য মিউ মেসন (µ meson) বলে ডাকা হলো। আরো পরে জানা গেলো যেই শ্রেনীটিকে মেসন নাম দেওয়া হয়েছে এন্ডারসনের কণিকাটি সেই শ্রেনীর বৈশিষ্ট্যই ধারন করে না তাই একে মেসন গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং শুধু মিউয়ন (muon) বলে ডাকা হতে লাগল [১]।

ক্লাউড চেম্বারে বিভিন্ন কণিকা প্রোটন, ইলেক্ট্রন, আলফা ও মিউয়ন (যথাসম্ভব) কণিকার গতিপথ পর্যবেক্ষণ।

ইতিপূর্বে আবিষ্কৃত অন্য কণিকাগুলোর মতো মিউয়ন পরমাণু ব্যাখ্যার জন্য অপরিহার্য ছিলো না বা কোনো সংরক্ষণশীলতা অটুট রাখার জন্যও এধরনের কোনো কণিকার গুরুত্ব নেই। তাই হঠাৎ এধরনের একটি উটকো কণিকার সন্ধান পেয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ বিরক্তই হলেন! তবে এটিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনের বিকল্প হিসেবে আবির্ভুত হতে দেখা গেলো। যেমন: ইলেক্ট্রনের এবং মিউয়ন উভয়েরই চার্জ -১ তাই দেখা গেলো এটি একটি হাইড্রোজেন বা অন্যান্য ক্ষুদ্রাকৃতির পরমাণুতে ইলেক্ট্রনের বদলে বসে একটি মিউয়নীয় পরমাণু সৃষ্টি করতে পারে [২]। সেই ক্ষেত্রে এর কৌণিক ভরবেগ অবশ্যই ইলেক্ট্রনের সমান হতে হবে (কৌনিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতা রক্ষার জন্য) এবং এর ভর বেশী হওয়ায় (মিউয়নের ভর ইলেক্ট্রনের ভরের ২০৭ গুণ বেশী) বেগ কম হতে হবে এবং নিউক্লিয়াসের আরো কাছাকাছি থাকতে হবে তথা পরমাণুর ব্যাসার্ধ অনেক কম হবে। ব্যাসার্ধ কম হওয়ায় দুটি মিউয়নীয় পরমাণুকে একীভুত করা আরো সহজ এবং তাই ফিউশন বিক্রিয়া ঘটনার জন্য মিউয়নীয় পরমাণু অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যবস্থা। ইলেক্ট্রনের যেমন বিপরীত কণিকা পজিট্রন রয়েছে এরও বিপরীত কণিকা প্রতি-মিউয়ন রয়েছে। ১৯৭৫ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ মার্টিন লুই পার্ল কণিকা ত্বরণ যন্ত্রে (particle accelerator) আরেকটি কণিকা আবিষ্কার করলেন, এটিরও ধর্ম ইলেক্ট্রন এবং মিউয়নের মতোই তবে এর ভর আরো বেশী। এর নাম দেওয়া হলো টাউ লেপটন (τ lepton) কিংবা সংক্ষেপে টাউয়ন। একটি ইলেক্ট্রনের তুলনায় এর ভর ৩৫০০ গুণ বেশী। যেহেতু এটি ইলেক্ট্রন এবং মিউয়নের মতোই একই রকম ধর্ম ধারণ করে এবং একই সিরিয়ালে আসে তাই বিজ্ঞানীরা কৌতুহলী হলেন বাকী দু’টির মতো এটিও একটি টাউয়নীয় পরমাণু গঠন করতে পারে কিনা? কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো এটি খুবই অস্থিতিশীল যা পরমাণু তৈরি হওয়ার মতো যথেষ্ট সময়ের জন্য বিরাজমান হয় না। ইলেক্ট্রন একটি স্থিতিশীল কণিকা, একাকী রেখে দিলে এটি ইলেক্ট্রন হিসেবেই থেকে যায়। তবে টাউয়নের মতো মিউয়নও খুবই অস্থিতিশীল কেননা এটি গড়ে এক সেকেন্ডের পাঁচলক্ষভাগের একভাগের মধ্যে ভেঙ্গে যায় আর টাউয়ন গড়ে একসেকেন্ডের পাঁচ ট্রিলিয়নভাগের একভাগ সময়ের মধ্যে ভেঙ্গে যায়।

ইলেক্ট্রন এবং মিউয়নীয় পরমাণু। মিউয়নীয় পরমাণুটির ব্যাসার্ধ ইলেক্ট্রনীয় পরমাণুর চেয়ে ছোট।

একই রকম ধর্ম এবং বিভিন্ন ভর বিশিষ্ট পর্যায়ক্রমে তিনটি কণিকা পাওয়ার পর বিজ্ঞানীরা কৌতুহলী হয়ে উঠলেন যে এই ধারায় আরো বেশী ভরের কোনো কণিকা পাওয়া যাবে কিনা? তবে শেষ পর্যন্ত নানা গবেষনা ও হিসেব নিকেশের পরে দেখা গেলো তিনটিই হচ্ছে এই শ্রেনীর কনিকাসংখ্যার সর্বোচ্চ সীমা।

আগেই বলেছি মিউয়ন এবং টাউয়ন (কিংবা আরো সংক্ষেপে টাউ) অস্থিতিশীল এবং উচ্চ ভর ব্যাতীত অনেক ক্ষেত্রেই ইলেক্ট্রনের সমতুল্য। তাহলে প্রশ্ন হলো এগুলোর অস্থিত্ব তৈরি হয় কেন আর কেনই বা এগুলো অস্থিতিশীল? আমরা একটি তুলনামূলক চিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারি। ধরি আমরা একটি পর্বতের পাদদেশে গলফ খেলছি। এই সময় আমি গলফ বলটিকে একেবারে তলায় সমতলে রাখলাম। তাহলে এই অবস্থায় আমি গলফ বলটিকে ইলেক্ট্রন হিসেবে ধরে নিতে পারি যার শক্তি সর্বনিন্ম এবং এর চেয়ে নিচে আর এটিকে আমি নামাতে পারব না, তাই এটি এখানে স্থিতিশীল। এখন আমি ক্লাব দিয়ে আঘাত করে গলফ বলটিকে পর্বতগাত্র বরাবর নিক্ষেপ করলাম এবং এটি পর্বতের উপরে বেশ খানিকটা উঠে একটা খাঁজে আটকে গেল। এই অবস্থায় আমি এটিকে বলতে পারি মিউয়ন। এর বৈশিষ্ট্য পাদদেশ স্থাপিত অবস্থায় যেমন ছিলো তেমনই তবে এখানে তার শক্তি আরো অনেক বেশী এবং এই অবস্থানে এটি খুবই অস্থিতিশীল এবং সুযোগ পেলেই এটি শক্তি হারিয়ে আগের অবস্থান অর্থাৎ পর্বতের পাদদেশে নেমে যাবে এবং ইলেক্ট্রনের পরিণত হবে। মিউয়ন অবস্থায় আমরা যদি গলফ বলটিকে আবারো ক্লাব দিয়ে আঘাত করি তাহলে এটি একেবারে পর্বতের চূড়ায় উঠে যায় এবং সবচেয়ে বেশী শক্তি প্রাপ্ত হয় এবং টাউ রূপ ধারন করে। যেহেতু এটি পর্বতের চূড়া তাই এর বেশী উপরে একে তোলা যায় না বরং এটি গড়িয়ে নিচে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং মিউয়ন বা ইলেক্ট্রনে পরিণত হয়।

এই তুলনামূলক আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম মিউয়ন বা টাউ স্থিতিশীল নয় তাই এরা শক্তি হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ইলেক্ট্রনে পরিণত হবে। এখন ধরি একটি মিউয়ন ভেঙ্গে একটি ইলেক্ট্রনে পরিণত হয়। তাহলে বিভিন্ন রকম সংরক্ষণশীলতাসূত্র অটুট রাখতে হলে এই ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত কণিকা কল্পনা করে নিতে হয়। এবং দেখা যায় যে তা করতে হলে একটি মিউয়ন ভেঙ্গে একটি ইলেক্ট্রন, একটি নিউট্রিনো এবং একটি প্রতিনিউট্রিনো উৎপন্ন হতে হয়!
এখন প্রশ্ন হলো উৎপন্ন নিউট্রিনো এবং প্রতিনিউট্রিনো একই রকম কিনা। যদি একই রকম হয় তাহলে এরা পরস্পরের বিপরীত কণিকা হবে এবং তাই পস্পরের সান্নিধ্যে এসে পারস্পরিক নিশ্চিন্হিকরণের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। তবে যেহেতু নিউট্রিনো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং দুটি বিপরীত নিউট্রিনো পরস্পরের সান্নিধ্যে না আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে এবং আসলেও এরা পারস্পরিক নিশ্চিন্হিকরণের মাধ্যমে যে শক্তি উৎপন্ন হবে তা এতোই দুর্বল হবে যে সনাক্তযোগ্য নাও হতে পারে।

আবার এর মধ্যে ভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনাও হতে লাগল। অনেকে ভাবলেন নিউট্রিনো দুই ধরনের। একধরনের নিউট্রিনো ইলেক্ট্রনের সাথে সম্পর্কিত (এদের বলা হলো ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো) আর অপর ধরনেরটি মিউয়নের সাথে সম্পর্কিত (এদের বলা হলো মিউয়ন নিউট্রিনো)। এমনও হতে পারে যখন মিউয়ন বিভাজিত হয় তখন মিউয়ন এবং ইলেক্ট্রন উভয়েই ভিন্ন ধরনের নিউট্রিনো উৎপন্ন করে যার কারনে মিউয়নের বিভাজনে দুটি নিউট্রিনো পাওয়া যায়। এই সমস্যাটিকে দ্বৈত নিউট্রিনো সমস্যা বলা হলো। এই সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীরা দুটি নিউট্রিনো একই রকম কিনা তা একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে চাইলেন। ১৯৬২ সালে আমেরিকান পদার্থবিদ লিয়ন ম্যাক্স লেডারম্যানের নের্তৃত্বে এই ধরনের একটি পরীক্ষা চালানো হলো। এই পরীক্ষা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, মিউয়ন নিউট্রিনো, ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো হতে সবদিক থেকেই আলাদা (যদিও আমরা হয়তো জানিনা তা কীভাবে হয়) [৩]। এই আবিষ্কারের জন্য লেডারম্যান ১৯৮৮ সালে নেবেল পুরষ্কার পেলেন।

বাকী থাকে টাউয়ন বা টাউ নিউট্রিনো। ২০০০ সালে ফার্মিল্যাবে DONUT (Direct Observation of the Nu Tau) experiment নামে চালানো একটি পরীক্ষা থেকে টাউ নিউট্রিনোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয় [৪]। তাহলে শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো তিন ধরনের স্বাভাবিক লেপটন ইলেক্ট্রন, মিউয়ন এবং টাউ এর জন্য তিনটি পৃথক “ফ্লেভারের” নিউট্রিনো পাওয়া যাচ্ছে। ফ্লেভার শব্দটি তিনধরনের নিউট্রিনো বোঝাতে টার্ম হিসেবে সত্যিই ব্যবহৃত হয়! (হয়তোবা বিজ্ঞানীরা এটি শুরুতে মজা করেই উচ্চারণ করেছিলেন কিন্তু পরে এটি এমন ভাবে প্রচলিত হয়ে গেলো যে একে আর পরিবর্তন করা যায় নি।)

দ্বিতীয় খন্ডে যেমন বলেছিলাম রেমন্ড ডেভিস এবং জন ব্যাকল সূর্য থেকে উৎপন্ন নিউট্রিনো সনাক্ত করতে গিয়ে হিসেব করা পরিমানের মাত্র এক তৃতীয়াংশ নিউট্রিনো সনাক্ত করেছিলেন। এই পরীক্ষার তাত্ত্বিক গননা করেছিলেন ব্যাকল এবং পরীক্ষাটি ডিজাইন করেছিলেন ডেভিস। ডেভিস তাঁর পরীক্ষাটি বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শন করে দেখিয়েছেন যে তাঁর উৎপন্ন আর্গন সনাক্তকরণে কোনো ভুল নেই তাই সন্দেহ ব্যাকলের উপরে গিয়েই পড়ল। অনেকেই তাঁর সৌর ফিউশন থেকে উৎপন্ন নিউট্রিনো গণনা ভুল বলে ধরনা করতে লাগলেন। অনেকেই আবার মনে করলেন সুর্যের কেন্দ্র বিষয়ে যে মডেল এতদিন দাঁড় করানো হয়েছে তাতেই ভুল। তবে পন্টেকোর্ভো (যিনি নিউট্রিনো সনাক্তকরার জন্য ক্লোরিন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন) অন্য রকম ধারনা করতেন। তিনি মনে করতেন সৌর নিউট্রিনো যে পরিমান উৎপন্ন হওয়ার কথা তা না পাওয়ার কারণ সম্ভবত নিউট্রিনোগুলো এক ফ্লোভার থেকে আরেক ফ্লেভারে স্পন্দিত হতে পারে। অর্থাৎ এক নিউট্রিনো আরেক নিউট্রিনোতে পরিণত হয় আবার ক্রমান্বয়ে আগের নিউট্রিনোতে ফিরে আসে এবং এভাবেই চলতে থাকে। তিনি ১৯৫৭ সালে প্রথম প্রস্তাব করেন যে, নিউট্রিনো এবং এন্টিনিউট্রিনো হয়তোবা পরস্পরের মধ্যে স্পন্দিত হতে পারে [৫]। তবে এধরনের পদার্থ-প্রতিপদার্থের মধ্যে স্পন্দন কখনো সনাক্ত করা যদিও যায় নি এবং তাই এই ধারনাটি পরে নিউট্রিনোর বিভিন্ন ফ্লেভারের মধ্যে আরোপিত হয় যা প্রতিষ্ঠিত করেন জিরো মাকি, মাসামি নাকাগাওয়া এবং শইচি সাকাতা ১৯৬২ সালে। ১৯৬৭ সালে পন্টেকোর্ভো এই তত্ত্বটিকে আরো বিস্তৃত করেন। তাই এই তত্ত্বানুযায়ী এর পারস্পরিক রূপান্তরযোগ্য অবস্থাটিকে পন্টেকোর্ভো-মাকি-নাকাগাওয়া-সাকাতা ম্যাট্রিক্স বলা হয় বলা হয় [৬]।

সূর্যের কেন্দ্রে সংঘটিত ফিউশন বিক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ। প্রথম ধাপ শেষে দেখা যাচ্ছে নিউট্রিনো উৎপন্ন হচ্ছে যা ν চিন্হ দ্বারা দেখানো হয়েছে। ν হচ্ছে গ্রীক nu যা নিউট্রিনো বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

সবরকম গাণিতিক বিষয়াদি বাদ দিয়ে খুব সহজ ভাষায় যদি নিউট্রিনো স্পন্দনের বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে হয় তাহলে এভাবে চেষ্টা করা যেতে পারে। সাবএটমিক লেভেলের একটি কণাকে খুব সহজেই একটি তরঙ্গ হিসেবে কল্পনা করা যায়। দুটি তরঙ্গ যদি পরস্পরের সাথে মিলিত হয় তখন যদি তারা একই দশায় থাকে তাহলে দুইয়ে মিলে তরঙ্গের প্রাবল্য বৃদ্ধি পায় কিন্তু যদি বিপরীত দশায় থাকে তাহলে একে অপরকে নাকচ করে দেয়। যখন দুটি তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে খুব সামান্য পরিমান পার্থক্য থাকে তখন তারা যদি উপরিপাতন ঘটায় তাহলে কিছুক্ষণ পরপর তারা একবার একই দশায় মিলিত হয় আবার বিপরীত দশায় মিলিত হয়। ফলে একটি স্পন্দন তৈরি হয়। আমি যদি শব্দ তরঙ্গের ক্ষেত্রে চিন্তা করি তাহলে এধরনের কাছাকাছি কম্পাঙ্কের দুটি শব্দ তরঙ্গ একীভুত হলে উপরিপাতনের ফলে কখনো শব্দ জোরালো শোনা যাবে (যখন একই দশায় মিলিত হবে) আবার কখনো শব্দ বিপরীত দশায় মিলিত হবে। যারা গিটার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজান তাঁরা টিউনিং করার সময় যখন দুটি তারের কম্পাঙ্ক খুব কাছাকাছি থাকে তখন এধরনের ইফেক্ট শুনতে পান। অর্থাৎ শব্দ জোরালো হয় আবার শব্দ কমে যায় এবং এভাবে স্পন্দন চলতে থাকে।

নিউট্রিনোর বিভিন্ন ফ্লেভারের মধ্যে যদি এভাবে স্পন্দন চলতে থাকে তাহলে বলা যায় যে একই সময়ে একঝাঁক নিউট্রিনোর মধ্যে সবধরনের ফ্লেভারেরই উপস্থিতি থাকবে। ধরি সূর্যের কেন্দ্রের ফিউশন বিক্রিয়ায় শুধু ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো উৎপন্ন হয় এবং সেগুলো সরল পথে রওনা দেয়। মাঝপথে যদি সেগুলো স্পন্দিত হয়ে ভিন্ন ফ্লেভারে পরিণত হয় এবং এই ফ্লেভার পরিবর্তন চলতে থাকে তাহলে একপর্যায়ে সেখানে বিভিন্ন ফ্লেভারের নিউট্রিনোই পাওয়া যাবে। সূর্য থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে নিউট্রিনো উৎপন্ন হয়ে চলেছে। তাই আমি যদি একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে নিউট্রিনো সংগ্রহ করি তাহলে সেখানে সমপরিমান তিনটি ফ্লেভারের নিউট্রিনোই থাকবে। কিন্তু আমার যন্ত্রপাতি যেহেতু শুধুমাত্র ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারবে তাই আমি কেবল একতৃতীয়াংশ নিউট্রিনো শনাক্ত করব এবং বাকী দুই তৃতীয়াংশ নিউট্রিনো থাকবে মিউয়ন নিউট্রিনো এবং টাউ নিউট্রিনো হিসেবে। তাই, যদি একটি ইলেক্ট্রন নিউট্রিনোর কথা চিন্তা করি এটিকে মনে হবে এই মূহুর্তে আছে, পরক্ষণে আবার নাই, আবার কিছুক্ষন পরে আছে এভাবে একটি স্পন্দনরত অবস্থা তৈরি হবে। যেই সময় আছে মনে হবে সেই সময় আসলে আমরা সেটিকে সনাক্ত করছি আর যেই সময় নাই মনে হবে তখন সেটি আসলে অন্য ফ্লেভারে রূপান্তরিত অবস্থায় আছে।

বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন আলোর গতিতে চলা একটি কণিকা এই ধরনের স্পন্দন দিতে পারে না। কারণ আলোর গতিতে সময় ডাইলেটেড হয়ে একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায় যেখানে স্পন্দনের বিষয়টি সময়ের সাথে জড়িত। তাই তাঁরা বুঝতে পারলেন যদি এধরণের স্পন্দন পেতে হয় তাহলে নিউট্রিনো আলোর গতিতে চলতে পারে না বরং তার গতি হবে আলোর চেয়ে কম। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোর চেয়ে কম গতিসম্পন্ন কোনো কণিকার ভর থাকতে হবে, তা যতো কমই হোক না কেন! ভরবিহীন একটি কণিকা আলোর গতিতেই চলবে। আমাদের পরিচিত ভরহীন সবকিছু যেমন ফোটন, কিংবা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ (গ্র্যাভিটন কণিকা) আলোর গতিতেই চলে। যদি সত্যিই নিউট্রিনো বিভিন্ন ফ্লেভারের মধ্যে স্পন্দিত হয় অর্থাৎ তাদের ভর থাকে তাহলে পরমাণুর মডেলের স্ট্যান্ডার্ড তত্ত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং একে আবার নতুনভাবে সাজাতে হবে, যেখানে নিউট্রিনোগুলোকে ভরহীন হিসেবেই যুক্ত করা হয়েছে। যার ফলে সামগ্রিকভাবে নিউট্রিনোর স্পন্দনের বিষয়টির প্রভাব হবে ব্যাপক। এই কারণে যখন নিউট্রিনোর স্পন্দনের বিষয়টি প্রমাণিত হলো সেটি সমগ্র বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে এবং ফলস্বরূপ এই বিষয়টিকে প্রমাণ করার জন্যই ২০১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল দেওয়া হয়েছে [৭]।

যা হোক, আবার ইতিহাসের ধারায় ফিরে আসি। ব্যাকলের তত্ত্ব নিয়ে সংশয় এমনকি ঠাট্টা-বিদ্রুপের মধ্যেই আশির দশকের মাঝামাঝি বিজ্ঞানীরা দুনিয়ার সম্পূর্ন বিপরীত দিকে নিউট্রিনো বিষয়ক নতুন গবেষনা শুরু করলেন। সৌর নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের জন্য টোকিও থেকে দেড়শ’মাইল দূরে কামিওকা খনির নীচে নতুন করে সনাক্তকরণ যন্ত্রপাতি বসানো হলো। প্রাথমিক ভাবে এর উদ্দেশ্য ছিলো প্রোটনের ভাঙ্গন গবেষণা তাই এর নামকরণ করা হয় Kamioka nucleon decay experiment বা সংক্ষেপে Kamiokande. তবে অল্প সময়ের মধ্যে গবেষকরা উপলব্ধি করলেন এই যন্ত্রপাতিগুলো নিউট্রিনো সনাক্তকরণের জন্য ব্যবহার করা যায়। তাই তাঁরা এগুলোকে কিছুটা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে নিলেন এবং হোমস্টেক মাইনের পালক্লোরোইথেনের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার করা হলো পানি। হঠাৎ হঠাৎ একটি সৌর নিউট্রিনো একটি ইলেক্ট্রনকে ধাক্কা দিয়ে তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং একটি তড়িৎচৌম্বকীয় ‘জাগরণ’ তৈরি হতে পারে। পানির ট্যাঙ্কের ভিতরের দেয়ালে স্থাপিত ঝাঁকে ঝাঁকে আলোক সনাক্তকরণ টিউব উৎপন্ন মলিন কোণাকৃতির নীল আলো সনাক্ত করে ইলেক্ট্রনের সাথে নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার জানান দেবে। তবে কামিওকান্দে আরো দুটি তথ্য সরবরাহ করার উপযোগী ছিলো। এটি কোণাকৃতির আলোর কোণার দিকটি সনাক্ত করে আলোর উৎস তথা সেটি সূর্য হতে আসছে কিনা তা বলে দিতে পারে এবং উৎপন্ন আলোর তীব্রতা থেকে এটি নিউট্রিনোর শক্তি সম্বন্ধেও ধারনা দিতে পারে। এসব যোগ্যতার বিপরীতে এর নেতিবাচক দিক হিসেবে ছিলো: এটি কেবল উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো সনাক্ত করতে পারে এবং এটি নিউট্রিনোর পাশাপাশি অন্যান্য সংকেতও সনাক্ত করে। তবে গবেষকরা নিউট্রিনোর ঘটনাগুলোকে অন্যান্য নয়েজ হতে পৃথক করতে পারতেন এর আলোর প্যাটার্ন দেখে [৮]।

ক্যামিওকান্দে ডিটেক্টরের অভ্যন্তরে ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন নীল ডি গ্র্যাসে টাইসন। সন্দেহ হওয়ায় খোঁজ নিয়ে দেখলাম তিনি ভেলায় চড়ে ঘোরেন নি তবে এর অভন্তরে তদারকির জন্য ভেলায় চড়ে সত্যিই ঘোরা যায়। বিশাল ট্যাংকের নিচে নিউট্রিনো সনাক্তকরার জন্য পানি আর ট্যাংকের গা বরাবার সংযুক্ত হয়েছে ঝাঁকে ঝাঁকে আলোকসনাক্তকরণ যন্ত্র।

১৯৮৯ এর গ্রীষ্মকালে কামিওকান্দে প্রথম নিউট্রিনো সনাক্তকরণের ঘটনা পেশ করে যা রেমন্ড ডেভিসের পরীক্ষাটির যথার্থতা প্রমাণ করে [৯]। একই সাথে পরবর্তী কয়েক বছরে সুর্যের বিকিরণ বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করে ব্যাকলের গণনাকৃত নিউট্রিনোর পরিমানও যথাযথ হিসেবে ঘোষনা দেয়। ব্যাকাল হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। রেমন্ড ডেভিস ২০০২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। যেহেতু নিউট্রিনো কম পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলো তাই সবাই পদার্থ বিজ্ঞানের যুগান্তকারী পরিবর্তন গ্রহণের প্রস্তুতি নিলেন এবং পন্টেকোর্ভোর প্রতি মনোযোগ নিবিষ্ট করলেন। পন্টেকোর্ভোই নিউট্রিনোর স্পন্দনের মাধ্যমে ফ্লেভার পরিবর্তনের মূল প্রবক্তা এবং তিনি তা করেছিলেন কয়েক দশক আগে।

(আগামী খন্ডে সমাপ্য। এই সিরিজটি তিন পর্বে শেষ করার পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু তৃতীয় পর্বে লিখতে গিয়ে বুঝলাম বোধগম্য করে লিখতে গেলে আরেকটি পর্বের অবতারনা করতে হবে। ইতিমধ্যে এই পর্বে ২১০০ শব্দের বেশি হয়ে গেছে। তবে যাঁরা তিনটি পর্ব পড়বেন তাঁরা নিউট্রিনোর পরিচয় হতে শুরু করে ২০১৫ সালের পদার্থবিজ্ঞান বিজ্ঞানের নোবেল দেওয়ার প্রেক্ষাপটটুকু জেনে যাবেন। তাই চতুর্থ পর্ব পড়া অনেকটাই ঐচ্ছিক।)

রেফারেন্স:
[১]. New Evidence for the Existence of a Particle Intermediate Between the Proton and Electron”, Phys. Rev. 52, 1003 (1937)
[২]. Fleming, D. G.; Arseneau, D. J.; Sukhorukov, O.; Brewer, J. H.; Mielke, S. L.; Schatz, G. C.; Garrett, B. C.; Peterson, K. A.; Truhlar, D. G. (28 Jan 2011). “Kinetic Isotope Effects for the Reactions of Muonic Helium and Muonium with H2”. Science 331 (6016): 448–450.
[৩]. G. Danby, J.-M. Gaillard, K. Goulianos, L. M. Lederman, N. B. Mistry, M. Schwartz, J. Steinberger (1962). “Observation of high-energy neutrino reactions and the existence of two kinds of neutrinos”. Physical Review Letters 9: 36.
[৪]. K. Kodama et al. (DONUT Collaboration; Kodama; Ushida; Andreopoulos; Saoulidou; Tzanakos; Yager; Baller; Boehnlein; Freeman; Lundberg; Morfin; Rameika; Yun; Song; Yoon; Chung; Berghaus; Kubantsev; Reay; Sidwell; Stanton; Yoshida; Aoki; Hara; Rhee; Ciampa; Erickson; Graham; et al. (2001). “Observation of tau neutrino interactions”. Physics Letters B 504 (3): 218
[৫]. Pontecorvo, B. (1957). “Inverse beta processes and nonconservation of lepton charge”. Zhurnal Éksperimental’noĭ i Teoreticheskoĭ Fiziki 34: 247. reproduced and translated in Soviet Physics JETP 7: 172. 1958.
[৬]. Maki, Z; Nakagawa, M.; Sakata, S. (1962). “Remarks on the Unified Model of Elementary Particles”. Progress of Theoretical Physics 28: 870.
[৭]. http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/2015/
[৮]. Nakahata, Masayuki. “Kamiokande and Super-Kamiokande” (PDF). Association of Asia Pacific Physical Societies. Retrieved 2014-04-08.
[৯]. K. S. Hirata et al. “Observation of B8 solar neutrinos in the Kamiokande-II detector” Phys. Rev. Lett. 63, 16 (1989).

[210 বার পঠিত]