দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-লিঙ্গ-ইত্যাদি যেকোন পরিচয় নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য যে মানুষটির ছিল অফুরন্ত ভালবাসা, সকল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে “মানবতন্ত্র”-কে যিনি জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেই মানুষটিই যদি মানুষ নামধারী কিছু অমানুষের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয় তখন সামান্য মনুষ্যত্বও যাদের মধ্যে অবশিষ্ট আছে এমন মানবহৃদয়ও আহত না হয়ে পারে না !

গত ২৬ ফেব্রুয়ারী মানবতাবাদী লেখক আমেরিকা প্রবাসী অভিজিৎ রায় তাঁর স্বদেশভূমিতে ঘাতকদের চাপাতির আঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন এবং তাঁর স্ত্রী, আরেকজন মানবতাবাদী লেখিকা, রাফিদা বন্যা আহমেদ মারাত্বক ভাবে আহত হন । এই ভয়ঙ্কর ঘটনার দায় স্বীকার করেছে একটি ধর্মান্ধ ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী । এমনি একটি গোষ্ঠী ১৯৭১ সালে ধর্মের নামে তাদের নিজের দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে, লক্ষ লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করতে পাক-জল্লাদদের সহযোগী হিসাবে কাজ করেছে । সেই ধর্মান্ধ শ্রেণী স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে বেছে বেছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছে । এই চক্র স্বাধীনতার ৪৪ বছর ধরে বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছে । আজ তারা ইসলাম রক্ষার নামে হিন্দু-বৌদ্ধদের উপর আক্রমন করছে, তাদের মন্দির, প্যাগোডায় আগুন দিচ্ছে – তারা হুমায়ুন আজাদকে মারাত্বক ভাবে আহত করে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছে, তারা রাজীব হায়দারকে পৈশাচিক ভাবে খুন করেছে । এই ধর্মান্ধ নর-পশুদের আক্রমনের সাম্প্রতিকতম শিকার অভিজিৎ আর বন্যা ।

অভিজিৎ কোন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি কোন উস্কানিমূলক বক্তৃতা করেও বেড়াতেন না । মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে সকল মানুষেরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে মানুষকে তাদের ধর্মান্ধতা সহ যে কোন অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করে গেছেন অভিজিৎ ছিলেন তাঁদের দলে । অভিজিৎ লিখেছেন সকল ধর্মের অন্ধকার দিকগুলি নিয়ে – ধর্মের যে উপাদানগুলি কোন মানুষকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পরিবর্তে কেবল একজন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান ইত্যাদিতে পরিণত করে তার বিরুদ্ধে, ধর্মের যে দিকগুলি মানুষের সৃষ্টিশীল মননের চারিদিকে অন্ধকারের প্রাচীর তৈরী করে তার বিরুদ্ধে, ধর্মের যে দিকগুলি মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে তার বিরুদ্ধে, ধর্মের যে দিকগুলি নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করে,তার বিরুদ্ধে, ধর্মের যে দিকগুলি এই জগৎ ও জীবন সন্বন্ধে জানার জন্য মানুষকে অনুসন্ধিৎসু করার পরিবর্তে মিথ্যা কল্প-কাহিনী তৈরী করে মানুষের মনকে বদ্ধ করে মানুষের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করে তার বিরুদ্ধে। অভিজিৎ শুধু ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লিখেই থেমে থাকেন নি -তিনি লিখেছেন বিজ্ঞানের সব জটিল বিষয়াদি নিয়ে – বিজ্ঞানের সব সাম্প্রতিক উদ্ভাবন নিয়ে সহজ সরল ভাষায় তিনি লিখেছেন অসাধারণ সব প্রবন্ধ, আর বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানের জটিল বিষয়াদি প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপনে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ কারিগর ! শুধু কি তাই, বিজ্ঞানের সাথে সাথে সাহিত্যর প্রতিও ছিল তাঁর অশেষ আগ্রহ।

বাংলাদেশের মত দেশে যেখানে মানুষের প্রগতির পক্ষে বাক স্বাধীনতার দ্বার প্রায় রুদ্ধ – ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কথা বললে যেখানে মানুষকে ধর্মবাদীদের কোপানলে পড়তে হয় সেখানে অভিজিতের এক অনবদ্য অবদান “মুক্তমনা” নামের ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠা, যেখানে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞান আর যুক্তির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার । সঙ্গত কারণেই সেখানে অনেক মননশীল মানুষই বিভিন্ন ধর্মের অমানবিক দিকগুলি তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন – ধর্মের নামে মানুষকে হেয় করা, ধর্মের নামে নারী নির্যাতন, ধর্মের নামে যুগের পর যুগ চলে আসা অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলার । এর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বলা চলে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে – অনেক তরুণ-তরুণী ধর্মান্ধতা ও আজন্ম কুসংস্কারের অভিশাপ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করে আলোর পথে আসতে পেরেছে – সেই ক্ষেত্রে অভিজিতের অবদান অনস্বীকার্য।

এবারের একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, একটি এই মহাবিশ্বের জন্ম সংক্রান্ত সাম্প্রতিকতম ধারণার উপর ভিত্তি করে পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা আর গণিতশাস্ত্রের সব জটিল বিষয়াদি নিয়ে (প্রখ্যাত গনিতবিৎ ড: মীজান রহমানের সাথে যৌথভাবে লিখিত) বাংলায় একটি অসাধারণ বই “শূন্য থেকে মহাবিশ্ব”, আর অন্যটি আজেন্টিনার বিদূষী বিদেশিনী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গভীর প্রীতির সম্পর্কের বিষয়ে একটি গ্রন্থ ” ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো: এক রবি বিদেশিনীর খোঁজে” । গভীর আত্মপ্রত্যয় আর আকাশচুম্বী উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে অভিজিৎ আর বন্যা গিয়েছেলেন জন্মভূমিতে বাঙালির প্রাণের উৎসব একুশের বইমেলায় তাঁর এই দুটি গ্রন্থের উদ্বোধন করতে । সেদিন সন্ধ্যায় তাঁরা বইমেলা থেকে বের হয়ে প্রাণের অনন্ত উচ্ছ্বাসে অগনিত মানুষের ভীড়ে বাংলা একাডেমির ফুটপাথ ধরে বাসার দিকে ফিরছিলেন ! আশে পাশে ছিল অনেক পুলিশ ! অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি এর মধ্যেই ঘাতকরা অভিজিৎআর বন্যাকে পিছন দিক থেকে এসে চাপাতি দিয়ে কোপাতে শুরু করলো ! রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত অভিজিৎ ধরাশায়ী হলেন – তাঁর মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্তের ধারা বহমান ! তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মারাত্বক ভাবে আহত রক্তাক্ত স্ত্রী আর্ত চিৎকার করছেন সাহায্যের জন্য ! কেউ এগিয়ে এল না ! অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাসা দেখছে ! এ যেন কোন এক ভয়ঙ্কর চলচ্চিত্রের এক বীভৎস দৃশ্য !! যে ঘাতকরা অভিজিৎকে খুন করলো, যে ঘাতকরা বন্যাকে রক্তাক্ত করলো – তাদের হাত কি একটুও কাঁপলো না, তাদের মস্তিষ্কে কি একটিবারের জন্য একটু দ্বিধার দ্বন্ধ তরঙ্গায়িত হলো না, তাদের হৃদয়ে কি মমতার লেশ মাত্র অবশিষ্ট ছিল না ?? কি করে পারল তারা মানুষের জন্য ভালবাসায় ভরা অভিজিৎ আর বন্যার মত এমন দুটি নিষ্পাপ মানব-মানবীকে আঘাত করতে !! ঘাতকের এমন নির্দয়তায় পশু-হৃদয়ও বুঝি করুনায় বিগলিত হবে – বৃক্ষদের প্রাণেও বুঝি বোবা কান্না উথলিয়া উঠবে – কিছু মানুষরুপি পশুদের এমন নির্মমতায় পশুরাও বুঝি লজ্জায় কুন্ঠিত হবে ! এই মানুষরুপি পশুরা নাকি ঈশ্বরে বিশ্বাসী, এই মানুষরুপি পশুরা নাকি ধর্মে বিশ্বাসী – জানি না কি তাদের ধর্ম – জানি না কেমন তাদের ঈশ্বর ! যে ঈশ্বর, যে ধর্ম কাউকে অভিজিৎ আর বন্যার মত মানুষকে হত্যা করার প্রেরণা যোগায় – এমন ঈশ্বর আর এমন ধর্মের প্রতি সমস্ত মানবজাতির ঘৃনা বর্ষিত হোক – পৃথিবী থেকে এমন ধর্মের শীঘ্রই বিলুপ্তি ঘটুক – মানবজাতি সত্যিকার মানুষ হবার সুযোগ পাক !

ধর্ম-ভিত্তিক কোন রাষ্ট্র যে জনগনের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বহে আনে – রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত তা আর নতুন করে বলার অবকাশ নেই । পৃথিবীর সকল উন্নত দেশ সমূহ এই শর্তগুলি রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে পালন করেই সেই সব দেশ আজ সভ্য দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেই সকল উন্নত দেশ সমূহে ধর্ম আজ কোনভাবে টিকে থাকলেও সেখানে তা আজ একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় । সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাস বা অবিশ্বাসের ব্যাপারে রাষ্ট্রের নাক গলানো আজ সেখানে কল্পনার বিষয় – উপরন্তু সাধারণ মানুষও তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে সযতনে অন্যের কাছে গোপন রাখাই একজন সভ্য মানুষের কর্তব্য ও দায়িত্ব বলে বিবেচনা করে । কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের মত দেশগুলিতে এখনো ধর্ম নিয়ে একেবারে বলিহারী অবস্থা ! প্রায় দুইশত বৎসর ব্রিটিশ শাসনের পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত প্রায় ২৪ বৎসর এই দেশটি ছিল পাকিস্তান নামক একটি ধর্মভিত্তিক অপশাসিত রাষ্ট্রের অংশ। তারপর ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরী করলাম । সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের প্রগতিকামী মানুষ সেদিন আশা করেছিল এই নতুন রাষ্ট্রে এই ঘাতক মৌলবাদী সম্প্রদায় যারা ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে দেশটাতে গণহত্যা চালিয়ে ছিল তারা কঠিন দন্ড পাবে এবং সেই সাথে ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে বহু ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ হবে একটি আধুনিক গনতান্ত্রিক ও ইহজাগতিক (Secular) রাষ্ট্র ! চিন্তাশীল মানুষরা আশা করেছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই দেশটি হবে সকল স্তরের মানুষের জন্য একটি স্বাধীন দেশ, যেখানে সকল মানুষের থাকবে সম-অধিকার, সকলের থাকবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা । কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এর শুরুটা ভাল হলেও ধীরে ধীরে রাষ্ট্রটি সেই গনতন্ত্র আর ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শ থেকে সরে আসতে শুরু করলো – তারপর ১৯৭৫ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর দেশটিতে চালু হলো সেনাতন্ত্র – একটি গণতান্ত্রিক আর ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে আস্তে আস্তে এটি পাকিস্তানি ভাবধারায় একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হবার পথে চলতে শুরু করলো । এক সময় ইসলাম রাষ্ট্র ধর্মে পরিণত হলো । যেখানে পাকিস্তানিদের দোসর রাজাকার, আল-বদর আর আল-শামসদের গণহত্যার মত মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য কঠিন বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল তার পরিবর্তে সেই জঘন্য অপরাধীরা রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয় -প্রশ্রয় পেতে শুরু করলো – এক সময় বাঙালির গৌরব গাথা মুক্তিসংগ্রামের মুখে কালিমা লেপন করে পাকিস্তানিদের দোসর শাহ আজিজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হল আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্রুপ করে কুখ্যাত রাজাকার মৌলানা মান্নান হলো বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রী । এই ভাবে দীর্ঘ ২১ বৎসর দেশটি প্রগতি-বিরোধী পথে চলার পর ১৯৯৬ সালে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী দলটি ক্ষমতায় এলো তখন সঙ্গত কারণেই মানুষ আশা করেছিল দেশটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে । কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় এই দলটিও দেশকে গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা আর মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে না অগ্রসর হয়ে ধর্মবাদিতাকে প্রশ্রয় দিতে শুরু করলো – এই সুযোগে একাত্তরের পরাজিত শত্রু ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠী আরো প্রবল প্রতাপে প্রগতির পথকে রুদ্ধ করার লক্ষে অগ্রসর হতে থাকে । বহু বছর পরে হলেও যদিও সাম্প্রতিক কালে বর্তমান সরকার একাত্তরের যুদ্ধপরাধী রাজাকারদের বিচার শুরু করেছে – (এর জন্য তাদের সাধুবাদ জানাই)- কিন্তু সাথে সাথে এই সরকার আবার ধর্মবাদীদের (ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করে ) নানা ভাবে আস্কারাও দিয়ে যাচ্ছে । সরকারের এই দ্বিমুখী আচরণে দেশ আজ এক বেহাল অবস্থার সন্মুখীন । বর্তমানে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মান্ধরা উচ্চকন্ঠে ধর্মের বিষ বাষ্প চারিদিকে ছড়িয়ে বেড়ায় – তাদের প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা রাষ্ট্র তাদের নানা ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে চলছে ! স্বাধীনতার পর থেকে তারা বেড়ে বেড়ে আজ তারা দেশের জন্য বিরাট হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে । দেশে বহুদিন ধরে মুক্ত চিন্তার প্রসার বাধাগ্রস্থ ! দেশে আজ মুক্তচিন্তার মানুষদের জীবনের নিরাপত্তা চরম ভাবে বিঘ্নিত ।

হুমায়ুন আজাদকে যে ধর্মীয় উন্মাদরা কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছিল, রাজীব হায়দারকে যে মৌলবাদী গোষ্ঠী নৃশংস ভাবে খুন করলো সেই ঘাতদের আজও বিচার হয়নি । আজ এক মাসের অধিক সময় পার হয়েছে, অভিজিৎকে যারা প্রকাশ্যে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করলো, বন্যাকে যারা ভয়ঙ্কর ভাবে আহত করলো সেই খুনিদের ধরার ব্যাপারে আজ পর্যন্ত তেমন কোন অগ্রগতি নেই । শুধু নাই নয় , আশ্চর্যের বিষয় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও অভিজিৎ হত্যার পর তাঁর পরিবারের প্রতি শোক জ্ঞাপন করতে হয়েছে গোপনে, আজ ধর্মীয় মৌলবাদীদের ভয়ে তিনি প্রকাশ্যে একটি বিবৃতি দিতে ভয় পান !! এমন ভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ যে একদিন ধর্মীয় মৌলবাদীদের স্বর্গ রাজ্যে পরিণত হবে, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের চেয়েও একটি বেশি পশ্চাৎপদ দেশে পরিণত হবে কেউ এমন ধারণা পোষণ করলে তা কি নিতান্তই অমূলক বলে মনে হবে ??

২৩ মার্চ, ২০১৫ সাল,
ক্যানাডা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: অভিজিতের এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড নিয়ে এই লেখাটি যখন লিখি তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে অচিরেই এমন বীভৎস ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ! এই বেদনা, এই ক্ষোভ ভাষায় প্রকাশ করা খুবই দুরূহ যে অভিজিৎকে হত্যা করার মাত্র ৩২ দিনের মাথায় (৩০ মার্চ) সেই দুর্বৃত্তরা খুন করলো ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে, ৭৫ দিনের মধ্যে (১২ মে ) অনন্ত বিজয় দাশকে এবং ১৬২ দিনের মাথায় (৭ আগস্ট) নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়কে । এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতগুলো আলোকজ্জ্বল মুক্তচিন্তক মানবতাবাদী লেখকের এমন পৈশাচিক ভাবে হত্যাকান্ডের প্রতিবাদের ভাষা বা নিন্দা জানানোর ভাষা কেমন হওয়া উচিত আমার জানা নেই, তবে এইটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, যে সমাজ, যে দেশ রাজীব, অভিজিৎ, ওয়াশিকুর, অনন্ত আর নীলাদ্রির মত মানুষদের রক্ষা করতে অক্ষম – সেই সমাজ, সেই দেশ সভ্যতার মাপকাঠিতে অত্যন্ত পিছনের সারির দেশগুলির অন্তর্ভুক্ত এবং এমন দেশ এই একবিংশ শতাব্দীতে একটি অন্ধকারাচ্ছন মধ্যযুগীয় দেশ হিসাবে সারা বিশ্বের কাছ পরিগণিত হওয়ার যোগ্য !
স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার মানুষের জন্মগত নাগরিক অধিকার ! প্রতিটি নাগরিকের এই অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ! সেই সাথে যে কোন নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব ! এই দায়িত্বটি যে রাষ্ট্র ব্যবস্থা পালন করতে ব্যর্থ হয় সেই রাষ্ট্রযন্ত্র একটি বিকলাঙ্গ ও ব্যর্থ রাষ্ট্র ! মানব ইতিহাসের অনেক কালো অধ্যায় পার হয়ে এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর অনেক দেশেই আজ মানুষের মানুষের বাক স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ! রাষ্ট্র সেখানে প্রত্যেকটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ ! কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ আজ সেই বিচারে অতিশয় পশ্চাৎপদ একটি দেশ! বাংলাদেশ সরকার মুক্তবুদ্ধির প্রগতশীল মানুষদের নিরাপত্তার ব্যাপারে চরমভাবে উদাসীন ! তাই ধর্মান্ধ বর্বর মানুষ নামধারী কিছু হায়েনাদের হাতে রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ এবং অতি সম্প্রতি নীলাদ্রি চ্যাটার্জিকে জীবন দিতে হলো ! বর্তমানে বাংলাদেশে যে কোন প্রগতিশীল মানুষের জীবন অনিরাপদ ! বাংলাদেশে এই বর্তমান পচনশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশে একের পর এক এমন আলোকোজ্জ্বল মানুষের হত্যাকান্ড যে চলতেই থাকবে সেটিই মনে হয় ভবিতব্য ! এমতাবস্থায় আমরা যারা সভ্য মানুষ হিসাবে সমাজের কাছে পরিচিত তাদেরকি কোনই দায় নেই ?? এত গুলো আলোকোজ্জ্বল নবীন প্রাণের এমন খুনের ঘটনায় সারা বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষেরা সমস্বরে প্রতিবাদে ফেটে পড়ুক – বর্তমান সরকারকে বাধ্য করুক এই ধর্মান্ধ খুনীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারকরে বিচারের সন্মুখীন করতে, নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষের কাছে আমরা একটি দুর্বল, ভীরু, অমানবিক এবং অপরাধী জাতি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকব ! আর একটি কথা – আর একটিও এমন প্রাণ যেন ধর্মান্ধ বর্বরদের হাতে বলিদান না হয় – এর জন্য কিভাবে পরিরোধ গড়ে তোলা যায় এই ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাশীল হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি বিবেকবান মুক্তবুদ্ধির মানুষের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি ! সবশেষে বলি- রাজীব, অভিজিৎ, ওয়াশিকুর , অনন্ত আর নিলয়ের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না – তাদের রক্তধারা বেয়ে জন্ম নিবে আরো লক্ষ কোটি নীলাদ্রি, ওয়াশিকুর, রাজীব অনন্ত আর অভিজিৎ – এবং তারাই একদিন বাংলাদেশকে অন্ধকারের গহবর থেকে মুক্ত করে আলোর পথে নিয়ে আসবে- বাংলাদেশ তার বর্তমানের দূর্নাম ঘুচিয়ে সারা বিশ্বের কাছে ধর্মান্ধতার অভিশাপ মুক্ত একটি মানবিক ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে ! সেই আলোর পথে, সেই শুভ দিনের নিশানায় বাংলাদেশ অনতিবিলম্বে যাত্রা শুরু করুক এই আমার শুভ কামনা !

[40 বার পঠিত]