একজন স্পষ্টভাষী, সোচ্চার যুবকের কথা – অনুজিৎ রায়

মুক্তমনা প্রকাশনার বলিষ্ঠ ও সাহসী লেখক অভিজিৎ রায় একজন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী নাগরিক। তিনি তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা এবং কন্যা তিশার সাথে দীর্ঘ ৭ বছর বা তার অধিক সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু মনেপ্রাণে তিনি নিজেকে বাঙ্গালী বলে গর্ববোধ করতেন। তিনি পারিবারিক পরিচয়সূত্রে আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। বিদেশে থাকলেও তাঁর মন পড়ে থাকতো এদেশের জন্য। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যতই সুপ্রতিষ্ঠিত হোক, যতই তাঁর লেখালেখির জন্য খ্যাতি থাকুক, বাংলাদেশের প্রতি তিনি সবসময়ই মনের টান অনুভব করতেন। তিনি শুধু পরিবারের সদস্যদেরকেই নন, বাংলাদেশের অভাব মনেপ্রাণে বোধ করতেন। প্রথমে তাঁর সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরছি।

ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন খুবই চঞ্চল, আবেগী ও অস্থির প্রকৃতির। তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও হাসিখুশি প্রকৃতির। খুব হাসি-ঠাট্টা প্রিয় ও খোলামেলা স্বভাবের। তবে মাঝে মাঝে সামান্য বিষয়েও রেগে যেতেন, কিন্তু তা মিলিয়ে যেতে কয়েক মুহুর্তও লাগত না। আমি আবার তার বিপরীত। ছোটবেলা থেকেই আমি আত্মকেন্দ্রিক, একাকীত্বপ্রিয় এবং কিছুটা চাপা প্রকৃতির। ফলে মাঝে মাঝেই আমার এই বৈশিষ্ট্য তিনি সহজভাবে নিতেন না। এ নিয়ে প্রায়ই আমার সাথে ঝগড়াঝাটি লাগত। ফলে আমার মন প্রায়ই খারাপ থাকত। সত্যি কথা বলতে কি, ছোটবেলায় আমাদের মধ্যে খুব একটা ঁহফবৎংঃধহফরহম ছিল না, কিছুটা মানসিক দূরত্বও ছিল। তবে তিনি যতই আমার সমালোচনা করুক, আমার ভাল দিকগুলো তুলে ধরতে কার্পণ্য করতেন না। আমার মধ্যে যদি সামান্য গুণও দেখতেন, তা যতই তুচ্ছ হোক, অবলীলায় তার প্রশংসা করতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি অগোছালো প্রকৃতির, বহির্মুখী, বেপরোয়া, আড্ডাবাজ প্রকৃতির। আমি অবশ্য তাঁকে খাটো করার জন্য এসব বলছি না। কারণ, দোষে-গুণেই মানুষ। কিন্তু মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার একটা অসাধারণ গুণ তাঁর মধ্যে সন্দেহাতীতভাবেই ছিল। সোজাসাপটা কথার জন্য তিনি যেমন নিন্দিত, তেমনি নন্দিত। দেশে থাকতে তাঁর ভালবাসা তেমনভাবে বুঝতাম না। বরং তখন তাঁকে অহংকারী, জেদী ও আধিপত্যপ্রিয় বলেই আমার মনে হতো। মনে হতো, তিনি আমাকে বুঝতেন না। এটা নিয়ে আমার তীব্র অভিমান ছিল। তবে তা ছিল আমার বোঝার ভুল।

অভিজিৎ রায় শুধু যে খোলা মনের মানুষ তা নয়, তিনি ছিলেন পড়াশোনায় অসম্ভব মেধাবী। শুধু পড়াশোনাই কেন, তার গল্পের বই পড়ারও ছিল অদম্য নেশা। বন্ধু-বান্ধব, লাইব্রেরী থেকে কত ধরণের গল্প বই তিনি সংগ্রহ করতেন, তার হিসাব নেই। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর কাছ থেকেই আমি গল্পের বই পড়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। কিশোর থ্রিলার, কিশোর ক্লাসিক, ভৌতিক গল্প, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস, বিংশ শতাব্দীর লেখকদের মধ্য হতে ভারতীয় লেখকদের মধ্যে সত্যজিৎ রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, প্রবীর ঘোষ কত যে নামকরা লেখকের বই তার সংগ্রহের তালিকায় ভরপুর ছিল, তার হিসাব নেই। গল্পের বই পড়ার গুণটি আমি তাঁর কাছ থেকেই অর্জন করেছি। বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যে তিনি হুমায়ুন আহমেদ, তসলিমা নাসরিন, ইমদাদুল হক মিলন এসবের বই পড়তে তিনি খুব পছন্দ করতেন। তাছাড়া বিখ্যাত শিকারী জিম করবেট, কেনেথ এ-ারসনের বই পড়তেও তিনি আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছেন। হয়তো অদম্য বই পড়ার নেশা থেকেই অবচেতনভাবেই তাঁর লেখক হওয়ার বাসনা গড়ে উঠেছিল, যা তাকে আজকের পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

আমার পড়ার দিকে ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত সচেতন। আমার মনে আছে, নবম শ্রেণি হতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত তিনি উৎসাহভরেই আমাকে পড়া দেখিয়ে দিতেন এবং মাঝে মাঝে নোটও দিতেন। আমি ভালো ফলাফল করলে খুশিতে গদগদ থাকতেন। আবার পরীক্ষা খারাপ হলে তিনি খুবই কষ্ট পেতেন। তিনি যেমন আড্ডাবাজ ছিলেন, তেমনি ছিলেন নিশাচর। তিনি যখন বুয়েটের মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ছিলেন, তিনি রাত চারটা পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা করতেন। পরের দিন অনেক সময় সকাল ৯টায় ঘুম থেকে উঠতেন। ক্রিকেট ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। আজও তার কেনা শচীন তেল্ডুলকারের পোস্টার আমাদের দেওয়ালে টাঙ্গানো। শুধু শচীন তেল্ডুলকার কেন, ইমরান খান, ভিভিয়ান রিচার্ডস, আজহার উদ্দিন, সুনীল গাভাস্কার সহ কত খেলোয়ারের ছবি যে তিনি সংগ্রহ করতেন, তার হিসাব নেই, যদিও ছবিগুলোর অনেকগুলো হারিয়ে গিয়েছে। রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখাও ছিল তাঁর আরেকটি নেশা। এ নিয়ে মা-বাবার সাথে কম ঝগড়া হয়নি। বিভিন্ন রকমের কাজে ছিল তার যথেষ্ট আগ্রহ। এছাড়া রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, ভূপেন হাজারিকা, অনুপ জালোটা, ব্যা- সঙ্গীতের প্রচুর ক্যাসেট তিনি কিনতেন ও প্রতিদিনই গান শুনতেন।

তাঁর একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি খুব ভোজনরসিক ছিলেন। প্রায়ই মার কাছে এটা-ওটা খাওয়ার বায়না ধরতেন। বিদেশে থাকলেও তিনি বাংলাদেশের খাবারগুলো খুব মিস করতেন এবং দেশে যখনই আসতেন, প্রিয় প্রিয় খাবারগুলো বাসায় রান্না হতো, তার মন খুশীতে ভরে যেত।

দেশে থাকতেই তিনি অন্যায়, অবিচারের প্রতি প্রতিবাদমুখর ছিলেন। হুমায়ূন আজাদ, প্রবীর ঘোষ, তসলিমা নাসরিন, আরজ আলী মাতুব্বরের বইয়ের তিনি খুব একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তখন থেকেই তিনি নাস্তিক্যের ধ্যানধারণা গ্রহণ করতে লাগলেন এবং নাস্তিক্যবাদের যৌক্তিকতা অনুধাবন করলেন। তিনি ধর্মীয় উপাধিসূত্রে হিন্দু হলেও তিনি কখনো নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দিতে চাইতেন না। তিনি পূজা করা, পা ছুয়ে প্রণাম করা, শ্রাদ্ধ করা এসব লোকদেখানো আচার অনুষ্ঠান অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। খাওয়ার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ তিনি মানতেন না। অত্যন্ত অবাধ্য ও বিদ্রোহী মনোভাবের ছিলেন। তাই বলে তিনি অসামাজিক ছিলেন, তা নয়। তিনি দেশে থাকতেই বলতেন, তিনি বাবা বা মা মারা গেলে শ্রাদ্ধ করবেন না, তাতে যে পরিণতিই ঘটুক। ছাত্র জীবনেই তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিশ^াস শুরু হয়। শুধু ধর্মীয় ব্যাপারেই নয়, নারী-পুরুষকে কৃত্রিমভাবে বিভাজন করার সামাজিক রীতির ব্যাপারেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। আমার এখনো মনে আছে, বুয়েটে অনার্সে তিনি ফার্স্ট ক্লাস সেভেনথ হয়েছিলেন। শিক্ষকতা পেশার প্রতি তত আগ্রহী না হলেও তিনি বুয়েটের লেকচারার পদে নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ভাইভায় তার ফলাফল সবচেয়ে ভালো হয়েছে। তাঁর নিয়োগ প্রায় নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে লেকচারার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বুয়েটের একজন শিক্ষকের সাথে পূর্বের কোন একদিনের মতবিরোধের জের ধরে তাকে সে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি পরে বিষয়টা জানতে পারি। একবার বুয়েটের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক শিক্ষা সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু ছেলেদের জন্য কোন শিক্ষকের যাওয়ার প্রয়োজন না পড়লেও মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য একজন শিক্ষক পাঠানোর প্রসঙ্গ উঠেছিল। এই লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের দ্বিমুখী নীতি সবাই মেনে নিলেও তিনি তা মেনে নেননি এবং প্রতিবাদ করতেও কুণ্ঠিত হন নি। কিন্তু এটিই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের Prestige Issue হয়ে দাঁড়ালো। সম্ভবত সে কারণে ভাইভা বোর্ডে ঐ শিক্ষক উপস্থিত থাকাতে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মা তাঁকে ঐ শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও তিনি তার কর্ণপাত করেন নি। তিনি বলতেন, অন্যায় মেনে নিয়ে তিনি এ চাকরি করতে পারবেন না। যাই হোক, তিনি শিল্পপতি সালমান এফ রহমান কর্তৃক পরিচালিত বেক্সিমকো কোম্পানীতে NIT এর উপর ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি করেছিলেন এবং যথারীতি প্রথম স্থান অধিকার করে আসছিলেন। অবশ্য ইতিপূর্বে অটোবী কোম্পানীতে তিনি আর্কিটেকচার পদে কয়েকমাস চাকরিও করেছিলেন। বুয়েটে স্কলার শিপ পাওয়ার পর তিনি সিঙ্গাপুরে এম.এস.সি. করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৯৮ সাল হতে তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। যাওয়ার আগে মা খুব কান্নাকাটি করছিল। তিনি তখন বললেন, “মা, তুমি এরকম কান্নাকাটি করলে কিন্তু আমি সিঙ্গাপুরে গিয়ে আবার ফিরে আসবো।” এবং এয়ারপোর্টে যখন আমরা তাকে বিদায় দিতে গিয়েছিলাম, তখন তিনি বাবাকে বলেছেন, “অনুর দিকে খেয়াল রেখো।” (এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখি, আমার ডাক নাম অনু)।

তারপর থেকে তিনি মা অথবা বাবাকে প্রতি সপ্তাহেই একটা করে চিঠি লিখতেন এবং মাসে অন্তত দুবার ফোন করতেন। বাবার সাথেই তাঁর বেশি কথা হতো। তবে তিনি আমার ব্যাপারেই বেশি খোঁজ-খবর নিতেন। আমার সাথে ফোনে কথা হলেই তিনি আমার শরীর-স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আমার পড়াশোনা কেমন চলছে তা জিজ্ঞেস করতেন। বাসায় কি রান্না হয়েছে, কার কি খবর, কে কি করছে, সে সব খবর তো আছেই। সিঙ্গাপুরের জীবনের ব্যাপারেও ফোনের পাশাপাশি ই-মেইলে ভাববিনিময় হতো। তবে সিঙ্গাপুরে পড়াশোনার উদ্দেশ্য যাওয়ার পর তাঁর জীবনযাত্রা অনেকটাই পাল্টে গেল। তিনি ছোটবেলা থেকেই অনেক উচ্চাভিলাষী ছিলেন ও অর্থনৈতিক জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল। এবার তার পরিবর্তনটা বলি। দেশে তিনি পড়াশোনা, আড্ডাবাজি ও বন্ধুবান্ধব নিয়েই মেতে থাকতে ভালবাসতেন। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাড়িতে তার কোন না কোন বন্ধুর আগমন ঘটত। তার বন্ধুবান্ধবের অভাব ছিল না। আমার বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। তখন আমরা ফুলার রোডে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে থাকতাম। সব ধরণের ছেলেদের সাথে তাঁর ছিল মেলামেশা। ঘর গোছানো, বাজার করা, রান্না করা সব কাজই মা করে যেতেন। এমনকি তিনি নিজের পড়ার টেবিল, নিজের জামাকাপড়ও ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতেন না। সেই তিনিই সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পর পড়াশোনার পাশাপাশি সবধরণের ঘরোয়া কাজে সুনিপুন হয়ে উঠলেন। অবশ্য তার প্রবাসী বন্ধুরা তাকে যথেষ্ট সাহায্যও করেছিল। যেখানে দেশে থাকতে এককাপ চাও নিজে বানাতে জানতেন না বা জানলেও করতে চাইতেন না, তিনি প্রায় সবরকম রান্নায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন। অবশ্য এ নিয়ে তাঁকে কম বেগ পোহাতে হয় নি। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার এক বছর পর তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। তখন তিনি যেন অন্য মানুষ। ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করার বিষয়ে তার মধ্যে ভীষণ আগ্রহ দেখা গেল। আমার মনে আছে, যতবারই দেশে এসেছিলেন, তার মধ্যে এক বা একাধিক বার তিনি মুরগির মাংস রান্না করে খাইয়েছিলেন। এ ব্যাপারে সিঙ্গাপুরে থাকতে তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা জানিয়ে রাখি। দেশে থাকার সময় তার হাতে সাদা দাগ দেখা গিয়েছিল। তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে তিনি প্রথমে প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। পরে মার কাছ জানতে পারি, তিনি অনভিজ্ঞতা থেকেই প্রথমবারের মতো মাংস রান্না করতে গিয়েছিলেন। কড়াইয়ে তেল গরম করতে দিয়ে তিনি পেঁয়াজ কাটতে বসেছিলেন। খুব মারাত্মক ভুল। পেঁয়াজ কাটার পর তেলে দিতে যেয়ে ফুটন্ত কড়াইয়ের গরম তেল তাঁর হাতে লেগেছিল। আরেকজন এসে তাড়াতাড়ি করে চুলা নিভিয়ে দিল। এটি হলো রান্নায় অজ্ঞতাজনিত প্রথম দুর্ঘটনা। তা থেকে শিক্ষা লাভ করে প্রবাসী বন্ধুদের সাথে থাকতে থাকতে সঠিকভাবে রান্না করতে শিখেছিলেন। কোন কাজকেই তারপর থেকে ছোট মনে করতেন না। তাঁর মানসিকতার বড় পরিবর্তন সিঙ্গাপুরে থাকতেই হয়েছিল।

২০০০ সালে বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদ হতে অবসরগ্রহণের পর ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারীতে আমরা ফুলার রোড ত্যাগ করে নিজেদের সিদ্ধেশ^রীর বাসায় শিফট করি এবং তাঁকে ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে এম.এস.সি. করার পরপরই সেখানেই তাঁর চাকুরী হয়। তারপর থেকেই তিনি সেখানে সেটেল হবার সিদ্ধান্ত নেন। সম্ভবত এক বছরের উপর চাকুরী করার পর তিনি পি.এইচ.ডি. করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ঐ সময় তিনি চাকুরী ছেড়ে দেন। ২০০১ সালের সম্ভবত অক্টোবরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে রাফিদা আহমেদ বন্যার সাথে তার পরিচয় হয় এবং তিনি রাফিদা আহম্মেদ বন্যার পারিবারিক ও পেশাগত পরিচয় জানতে পারেন এবং এও জানতে পারেন, রাফিদা আহমেদ বন্যা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নাগরিক। এরপর মাঝে মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁদের মধ্যে সাক্ষাত ঘটে এবং তাঁদের সম্পর্ক গভীর হতে গভীরতর হয়। পি.এইচ.ডি. কমপ্লিট করার পর তিনি সিঙ্গাপুরে কোন সফটওয়্যার কোম্পানীতে তাঁর চাকরী হয়। যাই হোক, সম্ভবত ২০০৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে অভিজিৎ রায় ও রাফিদা আহমেদ বন্যা সামাজিক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাফিদা আহমেদ বন্যার পারিবারিক ও পেশাগত জীবন নিয়ে কিছু কথা বলি। তিনি পেশাগত জীবনে সিস্টেম এনালিস্ট। জন্মসূত্রে তিনিও বাংলাদেশের নাগরিক। ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল এ- কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. পাশ করার পর তিনি স্ব-পরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে সেটেলড হন। তাঁর পিতা একজন ব্যবসায়ী, মা অ্যাডভোকেট। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স। তাঁর সম্পর্কে আরও কথা না লিখলেই নয়। বন্যাদিও অভিজিৎ রায়ের মত নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। মতাদর্শগত ঐক্য থেকেই তাদের সম্পর্ক প্রগাঢ় হয়ে উঠে। সম্ভবত (নিশ্চিত নই), ২০০৩ সালে অভিজিৎ রায় মুক্তমনার সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠেন। তখন থেকেই তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখির নেশা। তাঁর বিভিন্ন লেখায় বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে ফুটে উঠে। বন্যাদিও প্রায় যুগপৎ সময়ে মুক্তমনার সদস্য হন এবং তিনিও অভিজিতের পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থ লিখতে শুরু করেন। অভিজিৎ রায়ের প্রথম বহুল আলোচিত গ্রন্থটি হলো, “আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী।” এ গ্রন্থটি বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তারপর থেকে তিনি মুক্তমনায় লেখিলেখিতে আরও সক্রিয় হতে সক্রিয়তর হয়ে উঠেন। লেখা শুধু তাঁর নেশাই নয়, পেশাও বটে। ২০০৫ সালে তিনি আমার বিয়ের সময় দেশে আসেন। তিনিও আমাকে মুক্তমনায় বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে অনুপ্রেরণা দেন। আমারও অবশ্য লেখালেখির সামান্য অভ্যাস আছে। তবে কোন বই আমি লিখিনি। আমি সাধারণতঃ পত্রিকার চিঠিপত্রের কলামে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করি- এই পর্যন্তই। শিক্ষাজীবন শেষে আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপার্জনমূলক কাজ করি। আমি ২/১টা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীও করেছি। কিন্তু তা ছিল অস্থায়ী। আমার আবার প্রাইভেট টিউশনি করার অভ্যাসও আছে, এ অভ্যাস আমি এখনো চালু রেখেছি। আবার বিয়ের পরও আমার ২/৩ বছর বেকারত্বে কেটেছে। জীবনের প্রতি হতাশাও আমাকে গ্রাস করেছিল। কিন্তু তিনি আমাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ফোন করে আমার খোঁজখবর নেন এবং আমাকে হাল না ছেড়ে ধৈর্যশীল হবার পরামর্শ দিতেন। একসময় আমার একটি সরকারি প্রকল্পে চাকুরী হয়। আমি শিল্প মন্ত্রণালয়ে কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগদান করি। কিন্তু সরকারি চাকুরী হলেও তা ছিল অস্থায়ী। পরবর্তীতে আমি রাজস্বভূক্ত খাতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দিই। বর্তমানে আমি বড় মগবাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি শিক্ষকতা পদে যোগদান করেছি শুনে তিনি খুবই খুশী হয়েছিলেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে জানতে তিনি খুবই উৎসুক ছিলেন। তিনি আমাকে যথারীতি সকল বিষয়েই উৎসাহ যোগাতেন। আমার চাকুরী না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আমার ব্যাপারে কত যে উদগ্রীব থাকতেন, তা বলে বোঝানো যাবে না। তবে তিনি বাবা-মাকে আমার উপর মানসিক চাপ যেন না দেওয়া হয়, তা তাঁদেরকে বোঝাতেন। আমি যেন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তিনি তা মনেপ্রাণে চাইতেন। তাঁর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

“আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী” ছাড়াও তিনি আরও বই লিখেছেন। তাঁর আরও প্রকাশিত বই, “শূন্য হতে মহাবিশ্ব”,“অবিশ্বাসের দর্শন”, “বিশ্বাসের ভাইরাস”। তার লেখা “ভালবাসা কাকে কয়” বইটি যে কত আগ্রহ নিয়ে কতবার পড়েছি, তা বলাই বাহুল্য। একজন মানুষ শুধু চিন্তাধারায় নয়, লেখনীতে কতটা বিশ্লেষণধর্মী ও সূক্ষ বিচারক হতে পারে, তা আমি সত্যি বলতে কি, এই বইটি পড়েই জানতে পেরেছি। একসময় আমার বই পড়ার দারুন নেশা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমার এই সুন্দর অভ্যাসটি হারিয়ে গিয়েছে। তারপরও “ভালবাসা কা্রে কয়” বইটি আমি খুব উৎসাহ নিয়ে পড়েছি ও সামাজিক দিকগুলো ও এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমি জানতে পেরেছি। ২০১২ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর বইমেলায় এসেছিলেন। তাঁর পরিকল্পনাই ছিল, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারীর বইমেলা উপলক্ষে তিনি ঢাকা আসবেন। যদিও ২০১৩ ও ২০১৪ সালে তাঁর যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততার জন্য ঢাকা আসা হয়ে উঠেনি। তাই এবছর ২০১৫ সালে তিনি বইমেলার কারণে ঢাকা আসতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠলেন। একুশের বইমেলা যেন তাঁর প্রাণ। বইমেলায় না গিয়ে একদিনও তিনি থাকতে পারতেন না।

১৯৭১ সালের নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। অথচ, যেখানে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবার কথা, বিগত ৪০ বছরের অধিক সময় শাসকশ্রেণীর সুবিধাবাদিতা, অশিক্ষা, ধর্মান্ধতা যেন বাংলাদেশকে গ্রাস করে আছে। যতই সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলুক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা যে ঠিক বিপরীত, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ২০১৩ সালে পত্রপত্রিকায় ব্লগার হত্যার বিষয়টি আমার নজরে পড়ে। আশেপাশের মানুষজন কত ধর্মান্ধতায় নিমজ্জিত, তা আমি টের পেতে থাকি। তখন থেকেই বাবা অভিজিৎ রায়কে দেশে আসার ব্যাপারে সাবধান করে দেয়। তাঁর সাথে মুক্তমনার বিষয়ে আমার ফোনে তেমন কথা হয়না। ফোনে তিনি শুধু আমার শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য, চাকুরী কেমন চলছে, কার কি খবর তাই জানতে চাইতেন। বাবার কাছ থেকেই জানতে পারি, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে ইমেইলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তা জানার পর আমরা ভীত হয়ে পড়ি। বাবা তাঁর নিরাপত্তার জন্য ঢাকা আসতে বারণ করে। তিনি নাছোড়বান্দা, তিনি ঠিকই করেছে, দেশে আসবেনই। বাবা তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, দেশে আসলেও অভিজিৎ যেন কাউকে না জানায়। কিন্তু বইমেলার আকর্ষণ কি তিনি ছাড়বেন? তখন বাবা তাঁকে বলেছিলেন, বইমেলা গেলেও সন্ধ্যার আগেই যেন ফিরে আসে ও প্রতিদিন যেন না যায়। দেশের বাস্তবতার কথা ভেবেই বাবা এরূপ পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একরোখা ও অপরিণামদর্শী। তাঁর এই দুঃসাহসিকতা যেমন তাঁর একটি গুণ, তেমনি এটিই একদিক থেকে তাঁর দোষ। মাঝে মাঝে যে অন্যের কথাও বিবেচনা করতে হয়, তাঁর অতি অবুঝ মন সেটা মানতে চায় না। এই অপরিণামদর্শীতাই যেন তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।

২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী ভোরে তিনি স্ব-স্ত্রীক ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তিনি ফার্মগেইটে তাঁর মামাশ^শুরের বাসায় উঠেছিলেন।
সন্ধ্যায় বন্যাদিকে নিয়ে আমাদের বাসায় আমাদের সাথে দেখা করতে আসেন। রাতে তাঁরা আমাদের বাসায়ই ছিলেন। পরদিন সকালে তাঁরা ফার্মগেইটে ফিরে যান। ঐ সপ্তাহের শুক্রবার আমরা বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করি। এসময় আমরা বাসায় ঢাকার কিছু আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রণ করি। যাই হোক, রাতের খাওয়াদাওয়ার পর সবাই যার যার বাসায় ফিরে যায়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২৪ ফেব্রুয়ারী তিনি ও বন্যাদি আমাদের সাথে দেখা করতে আসেন। তাঁদের নাকি কোলকাতায় বেড়ানোরও পরিকল্পনা ছিল। আমাদের সবার ইচ্ছা ছিল, কোলকাতা থেকে ঢাকা ফেরার পর একদিন শুধু তাদের নিয়ে দুপুরে বা রাতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হবে। কিন্তু, বইমেলার অদম্য দুর্নিবার আকর্ষণে অভিজিৎ রায়ের চাপে বন্যাদিকে কোলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছিল। যাই হোক, পরদিন বিকেলে বাবা ও আমি তাঁদের ফার্মগেটের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। বন্যাদি ঢাকায় আসার পর বায়ুদূষণের কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। সেসময় অভিজিৎ রায় বই মেলায় ছিলেন। আমি তাঁর মোবাইলে ফোন করে জানতে পারি, তিনি বইমেলায় আছেন ও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই ফিরবেন। আমার স্ত্রীও আমাদের সাথে আসতে চেয়েছিলো। কিন্তু ধুলাবালিজনিত সর্দি ও জ¦রে সে আসতে পারেনি। যাই হোক, রাত ৮ টার মধ্যে আমরা বাসায় ফিরে আসি। দিনটি ছিল ২৫ ফেব্রুয়ারী। তখন তাঁর ও বন্যাদির সাথে ঠিক হয়, ২৭ ফেব্রুয়ারী সবাই মিলে বই মেলা ঘুরব। ২৬ ফেব্রুয়ারী আসল সেই ভয়াবহ দিন। ঐ দিন তিনি স্ব-স্ত্রীক যথারীতি বইমেলায় ছিলেন। ঐ দিন শুদ্ধস্বর প্রকাশনার তরফ থেকে মোড়ক উন্মোচন করা হবে। রাত পৌনে দশটায় বাসার টেলিফোনে রিং বেজেছিল। বাবা ফোন ধরে। আমি ঘর থেকে শুনতে পাই, বাবার আওয়াজ, “কি হয়েছে? অভিজিৎ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে! কখন ঘটেছে?” আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, সম্ভবত তাঁদের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। কালবিলম্ব না করে, রাত দশটার মধ্যে বাবা ও আমি সিএনজিতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাবার মুখে শুনলাম, অভিজিৎ ও বন্যাদিকে কারা যেন রাত সাড়ে আটটায় টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করেছে। মেডিকেলে পৌছে দেখলাম, ভয়াবহ রক্তাক্ত দৃশ্য। পুলিশ, র‌্যাব, সাংবাদিকসহ অগণিত লোকের ভীড়। একটি ওয়ার্ডে দেখলাম, বন্যাদির সারা মাথা, হাত ব্যান্ডেজে বাঁধা। তাঁর পুরো শরীর রক্তে রক্তাক্ত। কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবাকে একটি বেডে বসিয়ে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যান। বলে, “অভিজিৎকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার না বাঁচার সম্ভাবনা ৯৯%।” আমি করজোরে বললাম, “ডাক্তার সাহেব, আপনি যে করেই হোক, সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও অভিজিৎকে বাঁচান।” আমার স্ত্রী আমাকে ফোন করে বলে, “দাদা কোথায়?” আমি তাঁকে ১০০ নম্বর ওয়ার্ডে আসতে বলি। সে তাঁর ১০-১৫ মিনিট পরেই সেখানে চলে আসে। ডাক্তার আমাকে বন্যাদির সিটি স্ক্যান সংক্রান্ত একটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। আমার তখন উদভ্রান্ত অবস্থা। সেখানে একজন ভদ্রলোক (পরে তাঁর সাথে পরিচয় হয়, তিনি শুদ্ধস্বর প্রকাশনার সম্পাদক) আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “Avijit is expired” আমি হতভম্ব। আমি কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার মনে হলো, “না না, এ হতে পারে না। হয়তো তিনি ভুল বলছেন বা ভাবছেন।” তখন আমার শ্যালক কাছেই ছিলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে বলে উঠল, “না, না, দাদা। অভিজিৎদা বেঁচে আছেন। তুমি টেনশন করো না। আমি খবর নিচ্ছি।” তখন আমার পরিচিত অনেক কলিগই ফোন দিচ্ছিল। কিন্তু ফোনে কথার বলার মানসিক অবস্থা ছিল না। আমার আরো আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে এলো। সবাই কাঁদছিল। কয়েকজন সাংবাদিক এ অবস্থায় সাক্ষাৎকার নিতে চাইছিলেন। কিন্তু আমরা তাদের এখন সাক্ষাৎকার না নেওয়ার অনুরোধ করলাম। সবাই কান্নাকাটি করছিল। বাবাকে গণজাগরণ মঞ্চ, সমাজতান্ত্রিক ফ্রণ্ট সহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা একটি ঘরে নিয়ে গেল। বন্যাদিকে যখন সিটি স্ক্যানের জন্য একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, বন্যাদি আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “অভি কোথায়? সে বেঁচে আছে তো?” আমি বললাম, “তাঁর অবস্থা নাকি সিরিয়াস। সে এখনো অপারেশন থিয়েটারে।” আমার শ্যালক কৌশিকও বন্যাদিকে সান্ত¡না দিচ্ছিল। আমার স্ত্রী আমাকে বারবার অভিজিতের অবস্থা জিজ্ঞেস করছিল। কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারলাম না। আমি যা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না, কিভাবে তাকে বলব? হাসপাতালে থাকতে থাকতে কখন যে মধ্যরাত পার হয়ে গেল, তা টেরই পেলাম না। যে রুমে বাবাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আমিও সে রুমে গেলাম। বাবার মনকে শক্ত রাখার জন্য নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিল। এরপর মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল আমাকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে গেলেন। আশেপাশে স্ত্রীসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন ছিল। তিনি আমাকে বললেন, “Avijit is not alive.” আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমি বললাম, “এ কি বলছেন আপনি?” আমার শ্যালক যাতে আমার কিছু না হয়, সাথে সাথে আমাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল। আমি যেন বাকরুদ্ধ। বাবাকে কি বলব? মাকে কি বলব? এরপর গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান সরকার সাহেব বাবাকে খুব ঠাণ্ডাভাবে অভিজিতের মৃত্যু সংবাদ জানালেন। আমি ভাবলাম, বাবার যে কি হবে? কিন্তু বাবা শক্ত রইলেন ও মনের জোরে নিজেকে সামলে নিলেন। এই হলো সেই বিভীষিকাময় রাতের দুঃস্বপ্ন।

তারপর আমি, আমার স্ত্রী ও অন্যান্য আত্মীয়রা ডাক্তারের পরামর্শে বাবাকে বাসায় নিয়ে গেলাম। আমার শ্যালক ও দুই মামাতো ভাই হাসপাতালে থেকে যায়। রাত প্রায় একটা নাগাদ বাসায় ফিরি। বাবা মাকে অনেক কষ্টে অভিজিতের মৃত্যু সংবাদ জানালো। সারা বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। মা ভীষণভাবে কাঁদতে লাগলেন। সারা বাড়ি যেন স্তব্ধ। টিভিতে এই খবরটি প্রচার হচ্ছিল। টিভিতে আমাদের সবার শোকাবহ অবস্থার ছবি দেখানো হচ্ছিল। এর মধ্যে টুকরো খবরে দেখলাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছাকাছি ককটেল ফাটিয়ে উল্লাস প্রকাশের ঘটনা। খুনীরা যে কত বেপরোয়া তা বুঝতে বাকি রইলো না। ঐ রাতেই বাবার মোবাইলে কে যেন হুমকি দেয়, আল্লাহর পথে না চললে অভিজিতের মতো পরিণতি বরণ করতে হবে। বাবা বলে, “আপনাদের এত সাহস? আমার ছেলেকে খুন করেও আপনাদের সাধ মিটল না!” বাবা ফোন কেটে দেয়। বাবার মোবাইলে আবার কল আসে। আমার মামা ফোনটি ধরলে হুমকিদাতা আরও জঘন্য আশীলন ভাষায় হুমকি দেয়। পরদিন সকালে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয় ও কোন নম্বর থেকে হুমকি আসে তাও জানানো হয়। শনিবার ২৮ তারিখ আমাদের স্কুলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়েছিল। কিন্তু আমি মানসিক অবস্থার কারণে স্কুলে শুধু স্বাক্ষর করে বাসায় চলে আসি। আমাদের বাসায় দিনের পর দিন ধরে অসংখ্য সাংবাদিক, পুলিশ, মন্ত্রী ও আমাদের শুভ্যানুধারীদের আনাগোনা। বাবা প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আমার ভাইয়ের লাশ শ্মশানে দেওয়া হবে। কিন্তু আমি তাতে বাদ সাধলাম। কারণ আমি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেখছি, তিনি স্বঘোষিত নাস্তিক। সমস্ত ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠানের তিনি বিপক্ষে। আমি বাবাকে বোঝালাম, “বাবা, যেহেতু ও সমস্ত ধর্মীয় লোকাচারের বিরুদ্ধে, তাঁর আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর মরদেহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই দেওয়া উচিত।” বাবা একমত হলো। পারিবারিক সম্মতিক্রমেই তাঁর দেহ ঢাকা মেডিকেলে দানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। ১ মার্চ তাঁর দেহ হিমাগার থেকে বের করে সুরক্ষিত অবস্থায় প্রথমে তাঁর অধীত প্রতিষ্ঠান বুয়েটে প্রায় ১ ঘন্টা ও পরে কলাভবনের অপরাজেয় বাংলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় থাকার পর ও শ্রদ্ধাঞ্জলীর পর এ্যাম্বুলেন্স বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বাসার সকলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিচে ১ মিনিটের জন্য কফিন খুলে উপস্থিত জনতাকে দেহ দেখানো হয়। তারপর কফিন নিয়ে আমরা সবাই মেডিকেলে যাই এবং তাঁর দেহ সেখানে দান করা হয়। ইতিমধ্যে বন্যাদিকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ও তাঁকে সব জানানো হয়। ২ মার্চ বাবা, আমি ও আমার স্ত্রী বন্যাদির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বন্যাদিকে সান্তনা ভাষা আমাদের নেই। বন্যাদি বলেছিলেন, “আমি এরজন্য প্রস্তুত ছিলাম। আমি এও বলেছিলাম, যদি অভি বেঁচে থাকে, সে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি ঢাকা মেডিকেলা হাসপাতালেই থাকবো। কিন্তু সে মারা গেলে আমাকে যেন অন্যত্র নেওয়া হয়। যখন আমাকে এখানে আনা হলো, তখনই আমি বুঝলাম, সে নেই।” তিনি আরও জানালেন যে, অভিজিৎ উইল করে রেখেছিল, “তার মরদেহ যেন মেডিকেলে দান করা হয়।” ঐ দিন রাতেই তাকে বিশেষভাবে নিরাপত্তা দিয়ে প্লেনে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৬ মাসের অধিক সময় পার হয়ে গিয়েছে। তাঁর হত্যাকারীদের বিচার তো দূরের কথা, অভিজিৎ হত্যার পর পরবর্তী ৩ মাসে আশিকুর রহমান ও অনন্ত বিজয় দাশকেও একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর শেষ শিকার হয় নিলয় নামের মুক্তচিন্তার লেখক। সত্যিই কি বিচিত্র দেশে আমরা থাকি ! ধর্মের সমালোচনা করে লিখলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসে, তা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ। অথচ প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার লেখকদের হত্যা করলে সে হত্যার দায় রাষ্ট্র নেয় না, অপরাধ কি? অপরাধ হলো নাস্তিকতা! খুনীরা বহাল তবিয়তে থাকে! ধার্মিকরা নাস্তিকদের সমালোচনা, গালাগালি, এমনকি খুনোখুনি করতে পারবে, কিন্তু নাস্তিক ধর্মের ব্যাপারে ব্যক্তিগত মতামত দিতে পারবে না। এই হলো ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ!

সবাই বলছে, অভিজিতের বিচার না কি হবে না! এই দেশে কিছুই হবে না। আমার প্রবাসীরা বন্ধুরাও একই কথা বলে। কিন্তু কেন? কারণ, সরকার ও জনগণ ধর্মান্ধ। আমারও দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তাই মনে হয়। আবার মনে হয়, “না, ৬ মাস হোক, ১ বছর হোক, নিশ্চয়ই আমার ভাইয়ের খুনীরা ধরা পড়বে ও তাদের ফাঁসি হবে। আর অভিজিতের মতো কোন বলিষ্ঠ, সাহসী, স্পষ্টভাষী লেখক খুন হবে না। প্রকৃতির নিয়মে সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই।” অভিজিত কি নেই? না, তিনি আছেন। তাঁর চিন্তা, কর্ম ও লেখার মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন। আসছে ১২ই সেপ্টেম্বর তাঁর শুভ জন্মদিন। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিন্তু তাঁর খুব সকালের সুমিষ্ট কন্ঠ কি আর শুনতে পাবো? তাঁকে কি শুভ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে পারবো? ১২ই সেপ্টেম্বর সকালে কি বাসার ফোন বেজে উঠবে? শোনা কি যাবে, “অনু, কেমন আছিস? কি খবর তোর? সবকিছু কেমন চলছে?” তাঁর জন্মদিন আসছে, অথচ তিনি নেই, তা কি হয়?

অনেক কথার মাঝে আমি একটি কথা এখনো বলিনি। অভিজিৎ রায় আমার চেয়ে ৫ বছরের বড়। কিন্তু তাঁকে কখনো আপনি বা তুমি বলিনি, এমনকি দাদাও সম্বোধন করিনি। আমার কাছে এসব ফর্মালিটি। তাঁর ডাক নাম গুল্লু। আমরা পরস্পরকে তুই বলেই সম্বোধন করতাম। সে যেমন আমাকে অনু বলে ডাকে, আমিও তেমনি গুল্লু বলেই ডাকি। সবার কাছে অভিজিৎ হলেও আমার কাছে সে এখনো গুল্লু।

যাই হোক, প্রকৃতির নিয়মে একসময় সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমরাও শোক কাটিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ফিরে এসেছি। কিন্তু আমরা কি একটি দিনের জন্য এই সোচ্চার, সাহসী, বলিষ্ঠ যুবককে ভুলতে পারবো? পারবো না, কারণ তিনি তো ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ নন। তাঁর কর্মই তাঁকে চিরজাগ্রত করে রাখবে ও মানুষকে সোচ্চার, নির্ভীক, বলিষ্ঠ, স্পষ্টভাষী, মুক্তচিন্তাসম্পন্ন ও সত্যের পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাবে। আমরা যদি তাঁর কীর্তিকে মনেপ্রাণে তাঁর মতো সাহসিকতার সাথে দৃঢ়চিত্তে ধরে রাখতে পারি, তাহলেই তিনি বেঁচে থাকবেন।

অনুজিৎ রায়
সহকারী শিক্ষক
বড় মগবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,
২/এফ, ইস্টার্ণ হাউজিং এপার্টমেন্ট,
সিদ্ধেশ^রী, রমনা, ঢাকা-১২১৭

About the Author:

মুক্তমনার অতিথি লেখকদের লেখা এই একাউন্ট থেকে পোস্ট করা হবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. Bishnu Biswas আগস্ট 12, 2018 at 2:38 অপরাহ্ন - Reply

    দাদা কি লিখবো ভাষা খুজে পাচ্ছিনা,তবে অভিদা ছিল আছে থাকবে।

  2. Zeet Biswas জুলাই 10, 2018 at 12:29 পূর্বাহ্ন - Reply

    অমর অভিজিৎ-কে নিয়ে এগিয়ে চলুক মুক্তমনা।

  3. nil ফেব্রুয়ারী 18, 2016 at 11:11 অপরাহ্ন - Reply

    অভিজিৎ রায়েরা মরে না,

  4. Jamil Roshid Badhon ফেব্রুয়ারী 18, 2016 at 7:36 অপরাহ্ন - Reply

    মন্তব্য…
    অভিজিৎ রায়েরা মরে না,বেচে থাকে হাজার বছর হাজার ভক্ত ও তার কর্মের মাধ্যমে।

  5. tanmoy সেপ্টেম্বর 30, 2015 at 3:12 অপরাহ্ন - Reply

    চোখে পানি চলে আসলো ………এক সাথে বেড়ে উঠা ভাই হারানোর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিবা আছে!

  6. তানবীরা সেপ্টেম্বর 16, 2015 at 3:07 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনাদের পরিবার এই ভার বইবার শক্তি অর্জন করুক

  7. অসীম সেপ্টেম্বর 13, 2015 at 8:11 পূর্বাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ অনুজিৎ রায়। ভালো থাকবেন।

  8. রুশো আলম সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 9:42 অপরাহ্ন - Reply

    হৃদয় ছুঁয়ে গেল লেখাটি। আশা করি নিয়মিত মুক্তমনায় লিখবেন।

  9. রাহি মন্ডল সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 9:41 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটি উপহার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং ভালো থাকবেন সবাই ।

  10. নীলাঞ্জনা সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 9:35 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটির জন্য ধন্যবাদ, অনুজিৎ রায়। মুক্তমনায় নিয়মিত হোন প্লিজ। এটা অভিদার অনেক স্বপ্ন দিয়ে, যত্ন দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে তৈরি জায়গা। আমরা যেকোনো অবস্থায় এখানে এসে কথা বলবো, লিখবো; প্রাণবন্ত রাখবো মুক্তমনাকে।

  11. সজীব মোহন্ত সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 6:12 অপরাহ্ন - Reply

    অনেক কিছু জানলাম। ভাল থাকবেন।

  12. সৈকত চৌধুরী সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 4:01 অপরাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ অনুজিৎ রায়।

  13. একুশ তাপাদার সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 2:12 অপরাহ্ন - Reply

    আপনাকে ধন্যবাদ অভিজিৎ দার মরদেহ মেডিকেলে দান করার ব্যাপারটা তোলার জন্য।
    খুব ট্যাচি লেখা দাদা। ভালো থাকবেন আপনি, সাবধানে থাকবেন।

  14. জাহিদ রাসেল সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 12:54 অপরাহ্ন - Reply

    শোক হোক শক্তি, আলো হাতে এগিয়ে যা আধারের যাত্রী||

  15. জাহিদ আহমেদ সেপ্টেম্বর 12, 2015 at 11:47 পূর্বাহ্ন - Reply

    অসাধারণ লেখা!

মন্তব্য করুন