“অভিজিৎ রায়’’ ও “মুক্তমানা ব্লগ’’ নামগুলোর সাথে পরিচয় ২০১০ সালের মাঝামাঝিতে যখন বাংলা ব্লগে পদচারণা শুরু করি। আমি যে ব্লগের সদস্য ছিলাম সেই ব্লগে যখন ধর্মের কোন বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক হত তখন সেখানে “অভিজিৎ রায়’’ ও মুক্তমন ব্লগের নাম আপনা আপনি চলে আসত।তখন শুধু জানতাম অভিজিৎ রায় একজন নাস্তিক আর মুক্তমনা নাস্তিকদের ব্লগ!নিজে ধর্মীয় বইগুলো না পড়ে শুধু শুনে শুনে ধার্মিক ছিলাম বলে ধর্ম বিষয়ে মাথা ঘামাতাম না ফলে সে সময় মুক্তমনাতে ঢোকা হয় নি। প্রতিদিনই দেখতাম বোমা হামলায় মানুষ মরে, একে অপরের মন্দির মসজিদ ভাঙ্গে তখন মনে মনে ভাবতাম এরা আসলে ধর্ম সম্পর্কে জানেনা বলেই এমন করছে! সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি প্রতিটি ধর্ম শান্তির কথা বলে, ন্যায়ের কথা বলে, ধর্মগুলোতে শুধু শান্তি আর শান্তি! যারা খুন, ধর্ষণ, লুন্ঠন করছে তারা না বুঝে এসব কাজ করছে এতে ধর্মের কোন দোষ নেই! এভাবে ভাবতে ভাবতে আর সব ধার্মিকদের মত আমি ব্লগে ফুল, পাখি, প্রকৃতি, কবিতা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ফলে ধর্ম নিয়ে ভাবার সময় মোটেও ছিল না। জানতাম আমার ধর্ম সঠিক ধর্ম।

আমার মুক্তচিন্তার যাত্রাটা শুরু হয় মূলত রাজিব হায়দারের মৃত্যুর পর থেকেই। তখন শাহবাগ শ্লোগানে শ্লোগানে উত্তাল, গণজাগরণ মঞ্চ লোকে লোকারণ্য।এর মধ্যে ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ রাতে জঙ্গিদের হাতে খুন হয়ে যান রাজিব হায়দার। রাজিব হায়দারের মুত্যুর খবর শুনার পরই প্রথম মনে প্রশ্ন জাগে ধর্ম যদি শান্তির কথা বলে তবে মানুষ ধর্মের নামে খুন করে কেন? জন্মের পর থেকেই শুনে আসছি ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইসলাম মানবতার ধর্ম, ইসলামে খুন খারাপির কোন স্থান নেই। টিভি, মসজিদের মাইক, ওয়াজ মাহফিল, পত্রিকা, ইন্টারনেট মিলিয়ে কত হাজার বার যে শুনে আসছি ‘ ইসলাম শান্তির ধর্ম’ তা লিখে রাখলে বোধহয় এই তিন শব্দ দিয়ে একটি বড় আকারের বই ছাপানো যেত! যাইহোক, মনের কৌতুহল মিটানোর জন্য রাজিব হায়দারের মৃত্যুর পরদিন থেকে শুরু করলাম মুক্তমনায় অনুসন্ধান।জানার মূল আগ্রহ ছিল কেন নাস্তিকরা ধর্মের সমালোচনা করে? কেন ধার্মিকরা ধর্মের নামে খুন করে?

শুরু করলাম মুক্তমনা ব্লগ থেকে পিডিএফ ফাইল ডাউনলোড করা। প্রথমেই অভিজিৎ দার লেখাগুলো ডাউনলোড করা শুরু করলাম কারণ তখন শুধু্ ঐ একটি নামের সাথে পরিচিত ছিলাম! মনোযোগ দিয়ে শুরু করলাম নাস্তিকের লেখা পড়া। কে জানত তখন এই লেখাগুলো আমার চিন্তাধারা পুরোপুরি পাল্টে দিবে। তখন থেকেই একে একে পড়লাম অভিজিৎ দার লেখা ‘ব্যাড ডিজাইন’ ’বিজ্ঞানময় কিতাব’ ‘নৈতিকতা কি শুধুই বেহেস্তে যাবার পাসপোর্ট’ ‘ঈশ্বরই কি সৃষ্টির আদি বা প্রথম কারণ’ ‘মহাবিশ্ব এবং ঈশ্বর- একটি দার্শনিক আলোচনা’ ‘সমকামিতা (সমপ্রেম)কি প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ ’আস্তিকতা বনাম নাস্তিকতার’ প্রত্যুত্তরে ইত্যাদি। আরো পড়লাম বিশ্বাসের ভাইরাস, অবিশ্বাসের দর্শন। তারপর একে একে অন্তদার ‘সনাতন ধর্মের দৃষ্টিতে নারী’ পার্থিব জগতের অপার্থিবতা বিশ্লেষণ’ ‘মহাপ্লাবনের বাস্তবত: পৌরাণিক অতিকথন বনাম বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান’ ‘ভগবদগীতায় বিজ্ঞান অন্বেষণ ও অন্যান্য ’। মিজান রহমানের ‘আমার স্বর্গ এখানে’ ‘হতবুদ্ধি, হতবাক’। রণদীপম বসুর ‘সর্বগ্রাসী অপ-’বাদ’ বনাম একজন আরজ আলী মাতুব্বর’ অস্পৃশ্য ও ব্রাক্ষণবাদ এবং একজন বাবাসাহেব’। অপার্থিব জামানের ‘বিবর্তনের দৃষ্টিতে জীবন’ ’ বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব’ ’ বিজ্ঞান ধর্ম ও বিশ্বাস’ ‘মানব প্রকৃতি কি জন্মগত, না পরিবেশগত?’ ।এভাবে একে একে পড়লাম বিপ্লব পাল, প্রদীপ দেব , বন্যা আহমেদ, আকাশ মালিক, ফরিদ আহমেদ, নাস্তিকের ধর্মকথা সহ আরো অনেকের লেখা।

মুক্তমনায় এসে জানতে পারলাম ‘আরজ আলী মাতুব্বর’ নামে একজন দার্শনিকের কথা। তার ’সত্যের সন্ধান’ পড়ার পর আমি পুরোপুরি নিধার্মিক হয়ে গেলাম! উনার লেখা পড়ে মাথায় শুধু প্রশ্ন ঘুরত! ’সত্যের সন্ধান’ পড়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম আশপাশের ধার্মিকদের! কেউ দেখি আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে না।ব্যক্তিগত ভাবে আমার কাছে মনে হয় শুধু আরজ আলী মাতুব্বরের ’সত্যের সন্ধান’ বইটি যে কেউ অনুসন্ধিৎসু মন দিয়ে পড়লেই নাস্তিক হতে বাধ্য। এরপর আস্তে আস্তে ইউটিউব থেকে বিবর্তনবাদ, পৃথিবী কিভাবে সৃষ্টি হল, মানুষ কোথা থেকে এল, ধর্মগুলো কিভাবে এল, এইসব বিষয়ের উপর তৈরি ডকোমেন্টরিগুলো দেখতে লাগলাম। এভাবে আস্তে আস্তে সব ধারণা পরিস্কার হয়ে গেল ধর্মীয় কুসংস্কার ও ভন্ডামি সম্পর্কে।

আজ থেকে শ পাঁচেক বছর আগে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও যে সময় অতিক্রান্ত করেছিলেন আজ আমরা সেই সময় অতিক্রান্ত করছি।কোপার্নিকাসকে হত্যার পর থেকে, পৃথিবী কি সূর্যের চারদিকে ঘুরা বন্ধ করে দিয়েছে? ঠিক তেমনি মুক্তমনাদের হত্যা করলেই কি মিথ্যার উপর প্রতিষ্টিত গাঁজাখুরি গল্পের কাল্পনিক ধর্মগুলো সত্য হয়ে যাবে? শুধু এক বই পড়ুয়াদের বুঝা উচিৎ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয় নীলদের হত্যা করলেই তোমাদের মিথ্যা ধর্ম সত্য হয়ে যাবে না। চার্চের যেসব পাদ্রীরা ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছিল তাদের আজ আর কেউ চিনে না কিন্তু ব্রুনো, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওদের শত শত বছর পরেও মানুষ জানে তেমনি যারা এদেশের মুক্তচিন্তকদের হত্যা করেছে তাদের কেউ চিনবেও না কিন্তু রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয়, নিলয় নীলদের নাম শত বছর পরেও স্বমহিমায় থাকবে।

একজন অভিজিৎ রায় ও মুক্তমনা ব্লগ আমাকে মুক্তচিন্তা করতে শিখিয়েছিল। একজন গোঁড়া ধার্মিক থেকে মুক্তমনা হিসেবে তৈরি করতে মুক্তমনা ব্লগের অবদান কতটুকু তা শুধু আমি জানি।২৬ ফেব্রুয়ারী রাতে যখন টিভিতে দেখলাম অভিজিৎ দা জঙ্গিদের হামলায় মারা গেছেন মনে হচ্ছিল নিজের শরীর থেকে যেন কিছু একটা খসে পড়েছে। আফসোস করছিলাম কেন দেশে আসলেন? নিজের বিপদ জেনেও কোন মানুষ কি এভাবে একটি জঙ্গির আস্তানায় পা দেয়? এখন বুঝি ভয় দেখিয়ে মুক্তমনাদের আটকিয়ে রাখা যায় না। এক রাজিব হায়দারের মৃত্যু আমার মত হাজারও রাজিব হায়দারদের জন্ম হয়েছে। এক অভিজিৎয়ের মৃত্যু কত লক্ষ অভিজিৎয়ের জন্ম দিচ্ছে, দিবে তা সময়েই তা বলে দিবে। অভিজিৎ দার শারীরিক উপস্থিতি নেই কিন্তু তিনি এদেশের মুক্তচিন্তা আন্দোলনের অগ্রপথিক হয়ে থাকবেন সবসময় সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।

কলম চলছে, কলম চলবে। আলো আসবেই।

[528 বার পঠিত]