“মুক্তি আসুক যুক্তির আলোয়”

– ড. অভিজিৎ রায়।

অভিজিৎ তাঁদেরই একজন যারা এই পৃথিবীকে বদলাতে চেয়ে জীবন দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু পৃথিবী এগিয়ে গেছে এঁদের কারণেই, এঁদের জন্যই পৃথিবীটা আগের চাইতে আরো বেশি বাসযোগ্য, আরো বেশি মানবিক।

এঁরাই পৃথিবীটাকে একটু একটু করে বদলে দিয়েছেন। এঁরাই জনে জনে ভিন্ন চিন্তার কথা ছড়িয়েছেন। এঁদের কারণেই মানুষ একজন একজন করে বদলে গেছেন। এঁরা মুক্তচিন্তা করেছেন, মুক্তচিন্তার কথা বলেছেন। সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন।

এঁরা জানতেন, মিথ আর মিথ্যা দিয়ে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা যায় না, মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করা যায় না। কল্প-গল্প-কাহিনী-নির্ভর ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ আর দর্শনের ভিত্তিমূলে তাই চরম আঘাত হানতে এঁরা কুণ্ঠাবোধ করেন নি। কারণ, জানতেন ধর্মীয় কুসংস্কারের অর্গল ভাঙ্গতে না পারলে সুন্দর মানবিক ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তাই অভিজিতের কাছে মুক্তমনা মানে শুধু নাস্তিক হওয়া ছিল না। মুক্তমনা মানে সামাজিক বৈষম্য, অমানবিক আচার-আচরণ, আর সব ধরনের নিপীড়ণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়া।

অভিজিৎ মুক্তমনা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই অঙ্গীকারে। একটা সুন্দর, নৈতিক, মানবিক, সচেতন সমাজ গড়ার অভিপ্রায়ে।
কোন কিছুরই পূজারী ছিলেন না অভিজিৎ। কোন দর্শন-মতবাদ বা তত্ত্বকথা কিছুই মেনে নিতেন না যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই-বাছাই না করে। তথ্যনির্ভর যুক্তি আর যুক্তিনির্ভর সত্য ছাড়া আর কোন মতবাদেরই মূল্য ছিল না তাঁর কাছে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছেন। গুরুদেব নামে পরিচিত এই বিশ্বকবিকে পাঠকের কাছে অভিজিৎ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন একজন মানুষ হিসেবে – দেবতা হিসেবে নয়। বিবেকানন্দকে নিয়ে লিখেছেন, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন তাঁর স্ববিরোধিতা। মূর্তি আর ভাবমূর্তি ভেঙ্গে খান খান করেছেন মুক্তমনার পাতায় আর তাঁর পাঠকের চেতনায়। পৃথিবীকে বদলাতে হলে তো কিছু সংস্কার, কিছু ঘুণে ধরা রীতি-নীতি, কিছু পুরোনো ধ্যান-ধারণায় আঘাত করতেই হবে, ভাঙ্গতেতো হবেই কিছু আজন্ম-লালিত নিয়ম-কানুনের শৃংখল। অভিজিৎ তা করেছেন দ্বিধাহীন চিত্তে, নিঃশঙ্ক হৃদয়ে।

কি হতো এই পৃথিবী না বদলালে? কি হতো যেমন আছে তেমন থাকলে? কি হয় যতকিছু অসত্য, যা কিছু মিথ্যা, যত অনাচার-অবিচার-অত্যাচার মেনে নিলে? অনেকেরই, বেশির ভাগ মানুষেরই কিছু হয় না। অভিজিতের মতো মানুষদের হয়। জ্ঞানের আলো জ্বালাতে না পারলে এই জীবনটা তাঁদের কাছে অর্থহীন। তাঁরা যে আলো হাতে আঁধারের যাত্রী!

অভিজিতের প্রথম বইটার নাম ছিল “আলো হাতে আঁধারের যাত্রী”। গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, নিউটন, ব্রুনোদের নিয়ে লিখেছিলেন। সীমাহীন শ্রদ্ধা ছিল অভিজিতের এই মনিষীদের জন্য। অজ্ঞানতার অন্ধকারে আলো হাতে এসেছিলেন যাঁরা তাঁদের জীবন অভিজিৎকে আকর্ষণ করতো গভীরভাবে। হয়তো নিজের অজান্তেই তাঁদের জীবনের মতোই হয়ে গিয়েছিল অভিজিতের জীবন। জানার অদম্য ইচ্ছায়, জানানোর দূর্নিবার আকাঙ্খায় অভিজিতের নিজের জীবনটাও পালটে গিয়েছিল। এই নতুন জীবনে মৃত্যুকে নিয়ে দূর্ভাবনার কোন সময় ছিল না।

ফিরে যাই, পৃথিবী বদলানোর প্রসঙ্গে আবার। অভিজিতরা যে জীবন দিলেন পৃথিবীটাকে বদলানোর জন্য। তাঁরা কি পেরেছেন পৃথিবীটাকে বদলাতে? না কি শুধু শুধুই জীবনটা দিলেন! এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা নয়। আবার খুবই সোজা। গ্যালিলিও কি বদলে দেন নি পৃথিবীটাকে? কোপার্নিকাস? ব্রুনো? হাইপেশিয়া?

পৃথিবী বদলেছে কি না বোঝা মুশকিল, চর্মচক্ষে দেখাও যাবে না। কিন্তু অনেকের পৃথিবী কি অভিজিতরা বদলে দেন নি মুক্তমনার মাধ্যমে, তাঁদের লেখার মাধ্যমে? বদলে যে দিয়েছেন তার প্রমাণ পাবেন মুক্তমনার পাতায় পাতায়।

আজ অভিজিতের জন্মদিনে (আর ছয় মাস পরে তাঁর মৃত্যুদিনও আমাদের স্মরণ করতে হবে) খুব মনে পড়ছে মুক্তমনার পাঠক ও লেখক রানা ফারুকের কথা।

পাঠকের চিঠি’ দিয়ে লেখা শুরু করেছিল রানা মুক্তমনায়। প্রথম চিঠিটায় লিখেছিলেন,

“প্রথমে আমার পরিচয় দেই। আমার নাম ফারুক। বাসা পাবনা। আমি একজন ছাত্র। আমার বয়স -২২। আমার পরিবারের সবাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী। সবাই নামাজ পরে। মুক্তমনার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে ও আমি নামাজ পরতাম এবং প্রচলিত ধর্ম বলতে সাহস করতাম না। হঠাৎ একদিন মেইল চেক করতে আমার মেইল এ আমার এক দাদা মুক্তমনার ওয়েব সাইটের ঠিকানা পাঠান তারপর কয়েকদিন ধরে যুক্তি, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, ধর্ম-বিজ্ঞান নাকি সংঘাত, ১-২৩ পাতায় যেসব লেখা পেয়েছি তা পড়েছি। আমার এতদিনের চিন্তা চেতনায় কি তাহলে সব মিথ্যা। আপনারা ধর্ম বিষয়ে যেসব তথ্য দিয়েছেন তা নিয়ে সত্যতা যাচাই করে দেখলাম আপনাদের কথাই সত্য। এই সব কথা আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করেছে। আমি আরো জানতে চাই। ধর্মের প্রতি আর আস্থা রাখতে পারছিনা। আপনার সাহায্য কামনা করি। আমার মেইলে যদি পিডিএফ ফাইলে কিছু এই বিষয়ে বই পাঠান এবং এই ধরনের ওয়েব ঠিকানা দেন তাহলে আমি খুবই উপকৃত হব। যাতে কেন নাস্তিক হলাম তা সবাইকে বুঝাতে পারি”।

উত্তরে অভিজিৎ বলেছিলেন,

“আপনি সাহস করে এতদিনকার বিশ্বাসের অচলায়তন ভেঙ্গে বেরুতে শুরু করেছেন, সেজন্য আপনাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কিন্তু আপনার চিঠি পড়ে মনে হল আপনার শঙ্কা এখনো কাটেনি। দেখে মনে হচ্ছে – সত্য উদঘাটন করে আপনার মন বিক্ষিপ্ত হয়েছে। একটি কথাই কেবল বলব – ভয় পাবেন না। মনে সাহস রাখুন। একদিন হাটি হাটি পা পা করে আমরাও বিশ্বাসের দেওয়াল ভেঙ্গেছিলাম। প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলাম সমাজের জমে থাকা জীর্ণ সংস্কারগুলোকে। তবেই না আজকের জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। কবি নজরুলের কবিতার লাইনটি নিশ্চয়ই মনে আছে – আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?”

পরের চিঠিতেই রানা ফারুক লিখেছিলেন,

“…এখন আমি মুক্তমনায় যে লেখা পাই তা প্রিন্ট করে আমার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করি তারাও মুক্তমনার লেখা পড়ে আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে। আমার বন্ধুরা সবাই এখন সাইবার ক্যাফে গিয়ে প্রথমে মুক্তমনায় কি আছে তা পড়ে এবং তা ডাউনলোড করে আনে। আমরা প্রায় ৪ জন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান বর্জন করেছি। আগে মনে হতো এগুলো ছাড়া চলতে পারব না। আমাদের মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে যা মুক্তমনার জন্য সম্ভব হয়েছে”।

মুক্তমনা আর অভিজিৎ শত শত রানা ফারুকদের পৃথিবী বদলে দিয়েছে, পালটে দিয়েছে আরো অনেকের জীবন। ভিন্ন এক মননের অধিকারী হয়েছে তারা। মুক্তমনার সংস্পর্শে এসে তারা নিজেদের মনকে মুক্ত করে নিতে পেরেছে। অভিজিৎ আর মুক্তমনার পাঠকপ্রিয়তায়, জনপ্রিয়তায়, আর সীমাহীন প্রভাবে ভীত হয়েছে ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। তাদের ক্ষমতা ছিল না মুক্তমনার প্রভাব ঠেকানোর। ভীরু কাপুরুষেরা হাতে তুলে নিয়েছে চাপাতি।

সেই চাপাতি কেড়ে নিয়েছে অভিজিৎ কে, ওয়াশিকুর বাবুকে, অনন্ত বিজয়কে, নীলাদ্রি নিলয়কে – মুক্তমনাদের কাছ থেকে। মুক্তমনারা তাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারিয়েছে। কিন্তু মুক্তমনারা হারে নি। অভিজিত, বাবু, অনন্ত, নিলয় হারে নি। তাঁদের জীবন দেয়ার মধ্যেই তাঁদের বিজয়ের বার্তা নিহিত। জিতেছে বলেই তাঁদেরকে জীবন দিতে হয়েছে।

অভিজিতের জন্মদিনে মুক্তমনাদের শুভেচ্ছা জানাই।

তুমিতো নও কেবলই ছবি – তুমি যে আলো হাতে আঁধারের যাত্রী! তোমার সহযাত্রীদের হাতে আজ সেই আলো – আরো দেদীপ্যমান, আরো উজ্জ্বল। অন্ধকার দূর হবেই। মুক্তি আসবেই যুক্তির আলোয়।

সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৫।

[140 বার পঠিত]