ইসলামি রাষ্ট্রের চোখে মানবাধিকার(পর্ব-১)

১১ই মার্চ, ২০০২। ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। মক্কার ৩১নং ইন্টারমিডিয়েট গার্লস স্কুলের ছাত্রীরা দিনের প্রথম ক্লাস শুরুর অপেক্ষায় আছে। হঠাৎ স্কুলের টিয়াররুমের একটি কু্কারে শর্ট-সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।(১) আগুনের বিস্তৃতি বেশি না হলেও, কালো ঝাঁঝালো ধোঁয়া ততক্ষণে জনাকীর্ণ শ্রেণীকক্ষগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রী এবং শিক্ষিকারা একযোগে জ্বলন্ত স্কুলভবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন। আধঘণ্টার মধ্যেই আতঙ্কগ্রস্ত এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে চৌদ্দ জন ছাত্রীর মৃত্যু হল। ঘটনার সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল্লাহ বাহাদিক জানালেন, ছাত্রীদের মরদেহগুলো স্কুলের প্রধান সিঁড়ির নিচে একের পর এক স্তূপাকারে পড়ে ছিল।

অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুনে পুড়ে কিংবা আতংকগ্রস্থ হয়ে পুড়ে মরা বিরল কোনো ঘটনা নয়। এই বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য হল, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের সর্বাত্মক চেষ্টা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের সময় হাজারো পলায়ন রত মানুষের ভিড়ে দমকলকর্মী মাইক কিহোহি’র সিঁড়ি বেয়ে ভবনে প্রবেশ করার আলোকচিত্রটি ভুবনবিখ্যাত হয়ে আছে। কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে রানা প্লাজা ধ্বসের পর বিপদগ্রস্তদেরকে বাঁচাতে উদ্ধার কর্মী এজাজউদ্দিন চৌধুরী কায়কোবাদের প্রাণবিসর্জনের কীর্তিও অবিস্মরণীয়।

কিন্তু মক্কার ৩১নং ইন্টারমিডিয়েট গার্লস স্কুলে সেদিন এক ভিন্ন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। ঘটনার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় যেখানে বিপদগ্রস্ত মেয়েদের সাহাযার্থে প্রত্যক্ষদর্শীদের এগিয়ে যাবার কথা ছিল, সেখানে যাবতীয় মানবিক মূল্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আগুন ও ধোঁয়ার কবল থেকে ইতিমধ্যে বের হয়ে আসা ছাত্রীদের সেই জ্বলন্ত ভবনে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া হল। মূল কারণ হল, ভবনের বাইরে উপস্থিত হওয়া সৌদি ধর্মীয় পুলিশ সদস্যদের মতে ছাত্রীরা ভবন থেকে উন্মুক্ত স্থানে বের হবার মতো শালীন পোশাক পরিধান করেনি। তাড়াহুড়ো করে বেরুতে গিয়ে ছাত্রীরা তাদের আপাদমস্তক ঢেকে রাখা তথাকথিত শালীন পোশাকগুলো পরার প্রয়োজন বোধ করেনি।

বিস্ময়কর ভাবে উপরোল্লিখিত বিবরণগুলোও ঐদিন সকালে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট নয়।(২) ইংরেজি সংবাদপত্র আরব নিউজের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের Commission for Promoting Virtue and Preventing Vice (ধর্মীয় পুলিশ নামে অধিক পরিচিত) এর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের উদ্ধারকার্যে বাধা দিচ্ছিল। পুলিশ লোকজনকে ভবনে প্রবেশ করে আক্রান্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধা দেয়, এমনকি পানির বালতি সরবরাহেও বাধা দেওয়া হয়। উদ্ধারকারীরা পুলিশের মারধরেরও শিকার হন, যাদের মধ্যে ১৩ বছর বয়সী শিশুরাও রয়েছে যারা পোশাকের মানদণ্ড না মেনে জ্বলন্ত বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

জুলাই, ২০০৮। স্পেনের মাদ্রিদে সৌদি আরবের বাদশাহ্ আবদুল্লাহ একটি “আন্তঃধর্মীয় সম্মেলন” এর উদ্বোধন করলেন। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল সৌদি অর্থে পরিচালিত ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ’ নামক একটি ওয়াহাবি এনজিও। সম্মেলন অনুষ্ঠানের লক্ষ হিসেবে ‘ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে একটি গঠনমূলক সংলাপ” আয়োজনের উদ্যোগ নেবার কথা উল্লেখ করা হয়। সূচনা বক্তব্যে বাদশাহ্ আবদুল্লাহ বলেন,

“আজকের দিনে মানবজাতির মূল্যবোধ এবং চিন্তার জগতে নৈরাজ্য বিরাজ করছে। একই সাথে আমরা এমন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি যেখানে বিজ্ঞানের জগতে বিপুল অগ্রগতি সত্ত্বেও অপরাধ-সংগঠনের মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে, সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে, পরিবার-কাঠামো ভেঙে পড়েছে, মাদক সেবনের দরুণ যুবসমাজের নৈতিক স্খলন ঘটছে, দরিদ্ররা ধনীদের দ্বারা নিপীড়ণের স্বীকার হচ্ছে এবং সমাজে ঘৃণ্য বর্ণবাদী আচরণের ব্যাপ্তি ঘটেছে। আর এসব কিছু তখনই ঘটে, যখন ঈশ্বরকে ভুলে যাওয়া মানুষ অ্যাধাত্মিক জগতে দেউলিয়া হয়ে পড়ে… ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহ এবং সভ্যতাগুলোর নিজেদের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে একটি সম্মিলিত প্রয়াসে রাজী হওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর বিকল্প কোনো সমাধান নেই”।(৩)

সৌদি বাদশাহ্ বক্তব্য অনুযায়ী মানুষ আধ্যাত্মিক দেউলিয়াপনায় ভুগছে কারণ তারা ঈশ্বরকে ভুলে গিয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে (ক) অপরাধ বেড়েছে, (খ) সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটেছে (গ) পরিবার-কাঠামোয় ভাঙন ধরেছে (ঘ) মাদক-সেবনের দরুণ তরুণদের মনোবৈকল্য ঘটছে (ঙ) দরিদ্ররা নিপীড়ণের স্বীকার হচ্ছেন (চ) বর্ণবাদী আচরণ বেড়েছে।
প্রথমত, বিগত চার দশকে বিশ্বের অনেক এলাকায় অপরাধ-সংগঠনের হার বাড়েনি বৈ কমেছে। দ্বিতীয়ত, বলাই বাহুল্য যে, বর্তমান যুগে অধিকাংশ সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড ঈশ্বরের নামেই সংগঠিত হয়ে থাকে। তৃতীয়ত, পরিবার-কাঠামোয় ভাঙন বলতে সৌদি বাদশা আসলে কি বোঝাতে চাইলেন? সৌদি বাদশাহ্ এবং এবং অন্যান্য ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের মতে, পরিবারের সংজ্ঞা এবং সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরণে পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষত, পরিবারে নারীর অধিকার এবং দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে যেসব মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে তা নিয়ে ধর্মপ্রাণরা যারপরনাই বিচলিত। চতুর্থত, ইসলামী শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র ইরানে মাদক-সেবনের হার ঐ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।(৪) জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ২০০৭ সালে তালেবানরা আফিম ব্যবসা থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে। ২০০৮ সালে দামের নিম্নগতি ঠেকানোর জন্য তারা পপিচাষ কমিয়ে দেয়।(৫) পঞ্চম এবং শেষ পয়েন্টে বলা যায়, দরিদ্ররা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং বর্ণবাদী আচরণের বিস্তার ঘটলেও ঈশ্বরবিশ্বাসীরা এই দুই ক্ষেত্রে নিরীশ্বরবাদীদের থেকে ভালো ফল করছেন বলে কোনো নিরেট প্রমাণ নেই। বরং, বাদশার নিজের দেশ ঈশ্বর-নিবেদিতপ্রাণ সৌদি-আরব ভিনদেশী গৃহকর্মী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কুখ্যাত। এই গৃহকর্মীরা ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে আগত নারীশ্রমিক। বাদশার ভাষণের এক সপ্তাহ আগেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘Abuses against Asian Domestic Workers in Saudi Arabia’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়,

“সৌদি আরবে প্রায় ১৫ লক্ষ নারী গৃহকর্মী কাজ করে থাকেন যাদের বেশিরভাগই ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা এবং ফিলিপাইনের নাগরিক…অনেক গৃহকর্মীর জন্য সুষ্ঠু কাজের পরিবেশের ব্যবস্থা থাকলেও অন্যরা ব্যাপক মাত্রার বৈষম্যের শিকার হন যেগুলোর মধ্যে রয়েছে মজু্রি বিহীন শ্রম, জোরপূর্বক গৃহবন্দীত্ব, অনাহার, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং ব্যাপক মাত্রায় মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এধরণের ডজন ডজন কেইস নথিবদ্ধ করেছে যেখানে এই ধরণের একাধিক নিপীড়ণের ঘটনা ঘটেছে যেগুলো জোরপূর্বক শ্রম, মানব-পাচার এবং দাস-প্রথার মতো কর্মকাণ্ডের শামিল”। (৬)

লক্ষণীয় বিষয় হল, সৌদি বাদশাহ্ তার বক্তব্যে নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের বিষয়টি উত্থাপন করলেন না। ১১ই মার্চ, ২০০২ সালে মক্কায় ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনাটি নারী কিংবা কন্যাশিশুর প্রতি সহিংস আচরণের একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ। বাদশাহ্ আবদুল্লাহ কি তাহলে বুঝেশুনেই বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন? নাকি ধর্মীয় বিধান সকল পরিস্থিতিতেই অলংঘনীয়, তা যতো অমানবিক ঘটনার জন্ম দিক না কেন । সেজন্যেই হয়তো প্রাচীন প্রথাসমূহ বর্তমান যুগে অমানবিক বলে বিবেচিত হলেও, ধর্মীয় বিধান কিংবা মহাপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণের দোহাই দিয়ে সেগুলো অহরহ পালন করা হয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম দেশগুলোতে বাল্যবিবাহ একটি বহুল প্রচলিত প্রথা। ইউনিসেফের একটি রিপোর্ট বলছে যে, ১৮ বছর বয়স অতিক্রান্ত হবার আগেই আফগানিস্তানর ৫৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। নাইজারের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মেয়েদের ৪৪ শতাংশেরই ১৫ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। মিশরে আশির দশকে গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মহিলাদের ৪৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৬ বছর বয়সের নিচে।(৭) গতবছরে প্রকাশিত ইউনিসেফের আরেকটি রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।(৮) সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার বিয়ের নূন্যতম বয়স ১৬ করার জন্য তোড়জোড় শুরু করে। দুর্মুখেরা বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এমডিজি-৪(শিশুমৃত্যু হ্রাস) ও এমডিজি-৫(মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন) এর লক্ষ্য অর্জনে আশানুরুপ সাফল্য না পাওয়ায় এই হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

মুসলিম দেশগুলোতে বাল্যবিবাহের এই ধারাগুলোর পেছনে একমাত্র ইসলাম ধর্মকে দায়ী করা নিঃসন্দেহে অতি-সরলীকরণ হয়ে যাবে। তবে ইসলামি রীতিনীতিতে বিশ্বাস যে বাল্যবিবাহের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ইয়েমেন এক্ষেত্রে একটি শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত। ১৯৯৮ সালে ইয়েমেন পার্লামেন্ট ১৯৯২ সালে পাসকৃত একটি আইন সংশোধন করে। ১৯৯২ সালের আইন অনুযায়ী ১৫ বছরের কম বয়সে বিয়ে নিষিদ্ধ ছিল। সংশোধিত আইনে, ১৫ বছর বয়সেরও কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেবার সুযোগ করে দেওয়া হয়। যদিও মেয়েদের যৌন-পরিপক্কতা অর্জনের আগ পর্যন্ত স্বামীর সাথে বসবাসের অনুমতি ছিল না। রক্ষণশীল ইমামরা এই আইনের ব্যাখ্যায় বললেন যে, স্ত্রীর ৯ বছর বয়সেই বিবাহকে পরিপূর্ণতা প্রদান করা যাবে, অর্থাৎ ৯ বছর বয়সে স্ত্রী স্বামীর সাথে একসাথে বসবাসের মানসিক পরিপক্কতা অর্জন করে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ‘এই আইন প্রণয়ণের মাধ্যমে ইয়েমেনের মার্ক্সবাদী দক্ষিণাঞ্চলের উপর উত্তরাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল, ইসলামী সংস্কৃতির বিজয় সূচিত হয়’(৯)। মানবাধিকার কর্মীরা এই আইন পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন চালিয়ে গেলেও আজ অবধি সফলতা পাননি। রক্ষণশীল ইমামরা এক্ষেত্রে নবি মুহাম্মদের সাথে আয়েশার বিয়ের ঘটনাকে ঢাল হিসেবে সফলভাবে ব্যবহার করে আসছেন। পাশ্ববর্তী দেশ ইরানেও একই ধরণের টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর মেয়েদের বিয়ের বয়স কমিয়ে ৯ বছর করা হয়। ২০০০ সালে নারী-অধিকার কর্মীদের অব্যাহত চাপের মুখে ইরানের পার্লামেন্টে আয়োজিত এক ভোটাভুটি শেষে মেয়েদের বিয়ের বয়স বাড়িয়ে অনুর্ধ্ব ১৫ বছর করা হয়। যদিও ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ভেটোতে এই আইন বাতিল হয়ে যায়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আইন ইসলামি শরিয়া আইনের পরিপন্থি। চমকপ্রদ আরেকটি তথ্য হল যে, আয়াতুল্লাহ খোমেনি নিজেই আটাশ বছর বয়সে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে বিয়ে করেন। বাংলাদেশেও কট্টরপন্থী ইসলামি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সৌদি বাদশার দাবিগুলো তাই যুক্তির বিচারে ধোপে টেকে না, বরং তিনি সুচতুরভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিদ্যমান নাজুক মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেলেন। এর পরিবর্তে তিনি প্রাচীন একটি ধর্মীয় প্রবচনের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেনঃ পাপের ভারে পৃথিবী ধ্বংসের মুখোমুখি, প্রায়শ্চিত্ত করো এবং ঈশ্বরের কাছে ফিরে যাও।

বাদশাহ্ আবদুল্লাহ শুধুমাত্র একটি কমন ফর্মুলাই বাতলে দেননি, তিনি গোষ্ঠীবদ্ধতার গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। ধর্মগুলো এই কাজে ব্যাপক পারদর্শী। ধর্মগুলো তাদের অনুসারীদের মধ্যে সামাজিক ঐক্যবোধের একটি বীজ বপন করে দেয়। ধর্ম নিয়ে আলোচনা কিংবা ধর্মের সমালোচনার ক্ষেত্রে তাই এই ঐক্যবোধের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি ধর্ম শুধুমাত্র কতগুলো দাবিকৃত সত্যের সমষ্টি নয়, এর থেকেও বেশি কিছু। নৈতিকতা কিংবা মানবিক মূল্যবোধের মতো আরো অনেক বিষয় ধর্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে যেগুলোর সমাজে আলাদা কদর রয়েছে। সমস্যা হল, ধর্মের দাবিকৃত সত্য নিয়ে যেকোন পক্ষপাতহীন সমালোচনা কিংবা পর্যালোচনায় এই অন্যান্য বিষয়গুলো ধর্মের দাবিকৃত সত্যগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করে। ফলাফল দাঁড়ায় যে, দাবিকৃত সত্যগুলো শাশ্বতরূপ ধারণ করে এবং নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধের মতো আনুষাঙ্গিক বিষয়গুলোর বিকল্প উৎস খোঁজার প্রচেষ্টা দুরুহ হয়ে পড়ে।

ভ্রাতৃত্ব বোধ কিংবা গোষ্ঠীবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো দিয়ে ধর্ম মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে। ধর্মের অলৌকিকতার দাবিগুলোতে অবিশ্বাসী অনেকেও তাই সামাজিক ঐক্যবোধের আকর্ষণে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। একাত্মতাবোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্বিক প্রেরণা হিসেবে কাজ করে থাকে, যদিও অবশ্যম্ভাবীভাবে এর বহুমাত্রিক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রেই গোষ্ঠীগত চিন্তাধারাকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেয় নেয়, এক্ষেত্রে ব্যক্তির বিচার-বুদ্ধির প্রয়োগ কিংবা বিকাশ কোনোটিই ঘটে না। একটি গোষ্ঠী অবশ্যই নিজে বিশ্বাস করতে পারে না, তা পারেন কেবল গোষ্ঠীর সদস্যরাই। আবার একই গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যবোধের কারণে এর একজন সদস্যের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি অন্য সদস্যদের বিশ্বাসকে সত্য বলে ধরে নিতে। শেষ বিচারে তাই দেখা যাচ্ছে, গোষ্ঠীর নিজস্ব বিশ্বাস রয়েছে। গোষ্ঠীর সদস্যদের ভেতরে একাত্মতাবোধ যদি শতভাগের কাছাকাছি হয়, তাহলে গোষ্ঠীর নিজস্ব বিশ্বাস রয়েছে বলাটা অত্যুক্তি হবে না। এর ফলাফল দাঁড়ালো যে, দাবিকৃত সত্যগুলোর বিচারের নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিগুলো বিশ্বাসযোগ্যতাহীন কতগুলো মানদণ্ড দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যায়।

গুরুত্বহীন কতগুলো দাবি তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি না করলেও, সত্য বলে দাবিকৃত কতগুলো ধর্মীয় বিধানের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যাপক আবশ্যিকতা রয়েছে। কেননা আমাদের পর্যবেক্ষণমতে আমরা দেখেছি, ধর্মগুলো প্রায়ই একশ্রেণীর মানুষকে বাকিদের তুলনায় উচ্চ মর্যাদা প্রদান করে, একই সাথে আবার এধরণের বিধানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার প্রদানেও অস্বীকার করে।
১৬ই জুন, ২০০৮। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের(UN Human Rights Council) এর এক মিটিংয়ে এসোসিয়েশন ফর ওয়ার্ল্ড এডু্কেশন(AWE) এর এনজিও প্রতিনিধি ডেভিড লিটম্যানকে AWE এবং ইন্ট্যারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট এণ্ড এথিক্যাল ইউনিয়ন(IHEU) এর পক্ষ থেকে যৌথ ইশতেহার উত্থাপনের জন্য ফ্লোর দেওয়া হল। এজেন্ডা ৮ এর অধীনে এই ইশতেহারের শিরোনাম ছিলঃ Integrating the Human Rights of Women throughout the United Nations System। লিটম্যান তার বক্তব্য শুরুর বাইশ সেকেণ্ডের মাথায় মিশরের প্রতিনিধি আমর রুশদি হাসান তাকে থামিয়ে দেন। মিশরের প্রতিনিধি প্রটোকল ভেঙে এই দুই সংস্থার যৌথ ইশতারের কপি আগেই সংগ্রহ করে ফেলেন। লিটম্যানকে থামিয়ে দিয়ে হাসান বলেন, ‘প্রথম প্যারায় আপনি মিশরের প্রসঙ্গ টেনেছেন। দ্বিতীয় প্যারায় আপনি সুদান, পাকিস্তান এবং শরিয়া আইন নিয়ে আলোচনা করেছেন’। অথচ লিটম্যান শরিয়া আইন নিয়ে বক্তব্য দেবার আগেই তাকে থামিয়ে দেয়া হয়।

পাকিস্তান এবার মিশরের সাথে সুর মেলালো,

এই কাউন্সিলে শরিয়া আইনের উপরে যেকোনো প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, প্রাসঙ্গিকতাবিহীন, নির্দিষ্ট কোন আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রতি আমাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে।

পাকিস্তানের সমর্থন পেয়ে মিশর আরো কড়া ভাষায় জানালো,

আমরা বেসরকারী সংস্থাগুলোর কথা বলার অধিকার প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য প্রদান করছি না, বরং আমরা এই কাউন্সিলে শরিয়া আইন নিয়ে আলোচনা করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। আমরা আমাদের স্লোভেনিয় সহকর্মীদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি তারা যেন এই কাউন্সিলে শরিয়া আইন নিয়ে কোনো প্রকার আলোচনায় রাজি না হন, কেননা এই আলোচনা অনুষ্ঠিতই হবে না। আমরা এই বিষয়টিকে হালকাভাবে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি।

পাকিস্তান আবারো সাথে যোগ দিল,

আমি আবারো বলতে চাইতে যে, এই কাউন্সিল ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনার জায়গা নয়। এধরণের আলোচনা কাউন্সিলের নির্দিষ্ট সদস্যদের প্রতি বিষোদগার ছড়াবে।

বাদানুবাদ আরও কিছুক্ষণ ধরে চলার পর হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান চল্লিশ মিনিটের বিরতি ঘোষণা করলেন। বিরতির পর চেয়ারম্যান লিটম্যানকে ‘কোনো নির্দিষ্ট আইন-কাঠামোকে বিচার কিংবা পর্যালোচনা’ করতে নিষেধ করলেন। লিটম্যান যখন বিশেষ তথ্য –সংগ্রাহক হালিমা ওয়ারজারি কর্তৃক তৈরিকৃত নারীর খৎনা প্রথা বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে কিছু লাইন উদ্ধৃত করতে গেলেন, মিশরের প্রতিনিধি তাকে আবার থামিয়ে দিলেন,

এখানে ইসলামের সাথে আবহমান কাল থেকে পালন করে আসা একটি খারাপ প্রথাকে জুড়ে দেবার অপচেষ্টা করা হচ্ছে…স্যার আমার শেষ কথা হল, এই কাউন্সিলের ভোটে আমি হারি কিংবা জিতি, এ নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র পরোয়া করি না। আমার পয়েন্ট হল, এই কাউন্সিলে ইসলামকে ক্রুশবিদ্ধ করা যাবে না।

‘ইসলামকে ক্রুশবিদ্ধ করা যাবে না’-বক্তব্যটি অনেক আবেগঘন হিসেবে প্রতীয়মান হয়। চাইলে হয়তো একে ‘পরাধীনতার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়’ কিংবা ‘মুক্তি, হে ঈশ্বর অবশেষে আমরা মুক্ত হলাম’ এর মতো আবেগঘন কালজয়ী উক্তির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ কিংবা ‘মুক্তি’ শব্দগুলোর সাথে জড়িত উক্তিগুলো একমাত্র সত্যিকারের মানুষের সত্যিকারের মুক্তির ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ‘ইসলামকে ক্রুশবিদ্ধ করা যাবে না’ বক্তব্যটি এক্ষেত্রে সত্যিকার মানুষের স্বাধীনতার বিসর্জন দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক বিধিকে সুরক্ষা প্রদানের অপচেষ্টা মাত্র।

গোষ্ঠীগত একাত্মতাবোধ কিভাবে ব্যক্তির স্বাধীনতা, আকাঙ্ক্ষা এবং অধিকারকে খর্ব করে, এই ঘটনাটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গোষ্ঠীর মূল্যবোধকে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে গোষ্ঠীর মূল্যবোধের উপর যেকোনো আঘাত এর প্রত্যেক সদস্যকে পীড়া দেয়। ফলশ্রুতিতে গোষ্ঠীর যেকোনো আচরণ কিংবা প্রথাকে প্রশ্নবিদ্ধ কিংবা সমালোচনা করা দুরুহ হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই সমাজের প্রভাবশালী সদস্যরাই সামাজিক বিধান প্রণয়নের একচ্ছত্র অধিকার লাভ করেন যেগুলোকে বাকি সদস্যদের মেনে চলতে হয়।
(চলবে)

উৎসনির্দেশঃ
১। http://news.bbc.co.uk/2/hi/middle_east/1874471.stm
২। Mom’s boyfriend braved horrific burns to try to save little Kyra,’ Yorkshire Post, 14 December, 2007.
৩। http://www.alarabiya.net/articles/2008/07/16/53214.html
৪। Unicef, ‘Annual Report: Iran, 2013,’
http://www.unicef.org/about/annualreport/files/Iran_(Islamic_Republic_of)_COAR_2013.pdf
৫। ‘UN reports that Taliban is stockpiling opium,’ The New York Times, 27 November 2008, http://www.nytimes.com/2008/11/28/world/middleeast/28opium.html?ref=world
৬। As if I Am Not Human: Abuses against Asian Domestic Workers in Saudi Arabia,’ Human Rights Watch, July 2008, http://hrw.org/reports/2008/saudiarabia0708/
৭। UNICEF Innocenti Research Center, Early Marriage, Child spouse: Innocenti Digest No.7, March 2001, http://www.unicef.org/children-andislam/downloads/early_marriage_eng.pdf
৮। Ending Child Marriage, Progress and Prospects, UNICEF; 2014
http://www.unicef.org/media/files/Child_Marriage_Report_7_17_LR..pdf
৯। The New York Times, ‘Tiny voices defy child marriage in Yemen’, 29 June 2008, http://www.nytimes.com/2008/06/29/world/middleeast/29marriage.html?_r=4&oref=slogin&pagewanted=print&oref=slogin&oref=slogin

[230 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0

Leave a Reply

1 Comment on "ইসলামি রাষ্ট্রের চোখে মানবাধিকার(পর্ব-১)"

avatar
Sort by:   newest | oldest
আগন্তুক
Member
আগন্তুক
আমি অনুরুপ কিংবা আর ভয়ঙ্কর একটি ঘটনার কথা এই প্রাসঙ্গিক আলোচনায় জানাতে চাই- দুবাইএ এর থেকেও আরো একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেছে। অধিকাংশেই বলছেন ঘটনাটি সদ্য ২-৪ দিন আগের, আর প্রশাসনের বক্তব্য- ঘটনাটি ১৯৯৬ এর (ভাবখানা এই – যেন মুঘল যুগের কথা এবং ও নিয়ে চিন্তা করা অনাবশ্যক )। ঘটনাটি কি? সমুদ্রের ধারে সপরিবার ছুটি কাটাতে গেছেন বাবা- পরিবারের কর্তা। স্নেহশীল পিতার নজরদারিতেই কশোরী কন্যাসন্তান হুটোপাটি করতে নামল জলে এবং ডুবতে লাগল। হৈ হৈ করে ছুটে এলেন উপুকূলরক্ষীরা, আশেপাশের দক্সাঁষ সাঁতারু মানুষজন। কিন্তু হায়! কন্যা তো সমুদ্রে নামার সময় বোরখা পরেনি, এই অবস্থায় অচেনা পুরুষের হাতে উদ্ধার হবে কন্যা!! কি… Read more »
wpDiscuz

মুক্তমনার সাথে থাকুন