জনৈক শিবলি আজাদ হুমায়ুন আজাদের সাতটি বইকে (নারী, বাক্যতত্ত্ব,, শিল্পকলার বিমানবিকীকরন, প্রবচনগুচ্ছ, আমার অবিশ্বাস জলপাই রঙের অন্ধকার আর নিবিড় নীলিমা) প্রমাণ ছাড়াই নকল বলে দাবী করেছিলেন। আমরা ইতোমধ্যে শিবলির দাবীগুলোর মধ্যে নারী, বাক্যতত্ত্ব, শিল্পকলার বিমানবিকীকরণ, প্রবচনগুচ্ছ, আমার অবিশ্বাস বনাম রাসেলের ‘why I am not a Christian’ এই দাবীগুলো যুক্তিসহ ডিটেইলস আলোচনার মাধ্যমে খণ্ডন করেছি। এবারকার আলোচনা ‘আমার অবিশ্বাস’ বনাম ইবনে ওয়ারাকের বইগুলো।

হু-আর অবিশ্বাস বইটি সম্পর্কে শিবলি কি দাবী করেছিলেন প্রথমে পড়ে নেই চলুনঃ

“একইভাবে, আমার অবিশ্বাস আসলে বারট্রান্ড রাসেল ও ইবনে ওয়ারাকের বইয়ের পাঞ্চ। রাসেল লিখেছেন খৃষ্টান ধর্মতত্ত্ব নিয়ে, ওদিক ইসলামী কৃষ্টি নিয়ে লেখার যোগ্যতা আজাদের নেই—বিশেষ করে, প্রাক-ইসলামী আরব কালচার, কোরানের ভাষা জানা ইত্যাদি। ইসলামের বা আরো স্পেসিফিকভাবে বললে কোরানের উৎস যে ওহী বা দৈববাণী নয়—সমকালীন প্যাগান উৎসে কোরানের রুট নিহিত, সেই আশির দশক থেকেই আরেক পাকিস্তানী লেখক ইবনে ওয়ারাক এমন দাবী করে আসছেন। ইসলামের প্যাগান ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ওয়ারাক এর মতো পড়াশোনা অবশ্য আজাদ কখনো করেননি। সেজন্যে, আপনি লক্ষ্য করবেন যে, ইসলাম বা কোরানের প্রসঙ্গ এলেই (ক’বায় লাত, মান্নাত এর অধিষ্ঠান, স্যাটানিক ভার্সেসের সত্যতা, হজরে অসওয়াদ, যমযম কুপের পানি ইত্যাদি প্রসঙ্গ) আজাদ পাতার পর পাতা ইবনে ওয়ারাক এর লেখা থেকে তুলেছেন—যদিও কোথাও ওয়ারাক-কে কোট করেননি। ইবনে ওয়ারাক-কে ক্রেডিট দেননি।” লেখাটির শেষে শিবলি লিখেছেন “আজাদের বইয়ের পাশে মূল বইগুলোর নাম এবং আমাজনের লিঙ্ক দিলাম।” সেই অংশে হুমায়ুন আজাদের “আমার অবিশ্বাস” বইয়ের নামের পাশে তিনি ইবনে ওয়ারাকের “অরিজিনস অফ কোরান” এবং বারট্রান্ড রাসেলের Why I am not a Christian বই দুটোর আমাজন লিংক দিয়েছেন।

১/ পাঠক সবার প্রথমে খেয়াল করেন, “পাতার পর পাতা” কপি করার কথা! শিবলি কি পারতেন না “আমার অবিশ্বাস” আর “অরিজিনস অফ কোরান” বই দুটোর মিলে যাওয়া পাতাগুলোর ছবি আমাদের দেখাতে। বারবার প্রমাণ চাইবার পরেও তিনি সেটা দেখাতে পারেননি। কারণ হচ্ছে দেখাবেন কিভাবে? তিনি সম্ভবত ইবনে ওয়ারাকের বইটিই পড়েননি। পড়লে ‘উচ্চডিগ্রিধারী’ শিবলি এমন মারাত্মক ভুল দাবী করতেন না। প্রিয় পাঠক, মজার ভুলটা হচ্ছে হুমায়ুন আজাদের বইটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছে ১৯৯৭ সালে, আগামী প্রকাশনী থেকে। আর ইবনে ওয়ারাকের এই বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৮ সালে, আমেরিকার প্রমিথিউস বুকস প্রকাশনী থেকে। যে বই এক বছর পরে প্রকাশিত হয়েছে সেই বই থেকে ‘পাতার পর পাতা’ কিভাবে চুরি করলেন হুমায়ুন আজাদ সেটা আমার মোটেই বোধগম্য না। এত কাঁচা কাজ করে ধরা খাবেন শিবলি এইটা ভাবি নাই। সম্ভবত শিবলি ভেবেছেন হুমায়ুন আজাদ একজন টাইম ট্র্যাভেলার ছিলেন, অতীত থেকে ভবিষ্যতে যেয়ে আবার অতীতে ফিরে যেতেন প্রায়ই! এই দিক থেকে চিন্তা করলে, শিবলি, পিনাকী, মির্জা আর ওয়াহিদুজ্জামানরা কিন্তু খুবই রিস্কে আছেন; কবে যে আবার টাইম ট্রাভেল করে এসে হুমায়ুন আজাদ এদের ভণ্ডামি প্রকাশ করে আরও ক্ষুরধার কিছু লিখে ফেলবেন কে জানে! 😛
আজাদের অবিশ্বাস আর ইবনে ওয়ারাকের অরিজিনস অফ কোরান বইদুটি প্রকাশের সময়কালের স্ক্রিনশট বই থেকে তুলে দিলাম।

২/ ওয়ারাকের বইয়ের আগেই হুমায়ুন আজাদের বইটি প্রকাশ থেকে বোঝা যায় নকল করে লেখার দাবীটি পুরোপুরি মিথ্যা। কিন্তু প্রিয় পাঠক, ছাগুদের ছলের অভাব নেই সেটা আমরা সবাই জানি। এবার হয়ত শিবলি ভক্তরা দাবী করবেন ওয়ারাকের এই বইয়ের আর্টিকেলগুলো আগে নানান স্থানে বা পেপার/ম্যাগাজিনে ছিল, হুমায়ুন আজাদ সেখান থেকে নিয়েছেন। কোনও বই খণ্ড খণ্ড ভাবে আর্টিকেল আকারে আগে কোথাও প্রকাশিত হলে সেটা বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করাটা নিয়ম। ওয়ারাক এই বইয়ের লেখাগুলো আর্টিকেলগুলো আকারে আগে কোথাও প্রকাশ করেছেন এমন কোনও উল্লেখ যেহেতু বইটি সহ তাঁর ইন্টারভিউ ও ওয়েবসাইটের কোথাও নাই সেহেতু মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি।

“সেই আশির দশক থেকেই আরেক পাকিস্তানী লেখক ইবনে ওয়ারাক এমন দাবী করে আসছেন।”

শিবলির বক্তব্যে এই বাক্যটা আছে।

শিবলির এই বাক্যটিও তার অন্য দাবীগুলোর মত যথারীতি মিথ্যা। কেনও মিথ্যা সেটা বোঝাতে ইবনের ওয়ারাকের জীবনী ছোট্ট করে বলছি। ১৯৪৬ সালে ভারতবর্ষের এক মুসলিম ধর্মাবলম্বী পরিবারে জন্মানো এই ভদ্রলোক দেশ ভাগের পর সপরিবারে পাকিস্তানে চলে যান। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবার্গ থেকে আরবি ও ফিলসফি নিয়ে পড়াশোনা করে গ্র্যাজুয়েট হবার পর ওয়ারাক ১৯৭৬-৮১ পর্যন্ত এই পাঁচ বছর ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাইমারি স্কুলের টিচার, ১৯৮২ সালে ফ্রান্সে যেয়ে খুলেন খাবার রেস্টুরেন্ট। তারপর হন কুরিয়ার কোম্পানির ট্রাভেল এজেন্ট। ১৯৮৯ সালে সালমান রুশদীকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা শুরু হবার বছরখানেক পর তিনি এনোনিমাস হিসেবে কয়েকটা সংক্ষিপ্ত লেখা প্রকাশ করেন আমেরিকার সেক্যুলার হিউম্যানিস্ট প্রকাশনীর Free Inquiry Magazine এ। ১৯৯৩ সালে লেখা শুরু করেন তার প্রথম বই “Why I am not Muslim.” যা কিনা প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে, তখন তিনি University of Toulouse এর প্রফেসর।
এমনকি তার এই “ইবনে ওয়ারাক” নামটাই ছদ্মনাম, ৯ম শতাব্দীর স্কেপটিকাল স্কলার আবু ঈসা আল-ওয়ারাকের নামের সাথে মিলিয়ে তিনি এই নাম গ্রহণ করেন ১৯৯৫ সালে প্রথম বইটি প্রকাশের সময়। ইসলামের ইতিহাসে আরও বেশ কয়েকজন লেখক ও স্কলার ইসলামের সমালোচনা করার সময় ঘাড়ের উপরের মাথাটা বাঁচাতে ওয়ারাক ছদ্মনামে লিখেছেন। তাই মুসলমানরা ধর্ম বিষয়ক সত্য সমালোচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে উগ্রভাবে নেয় বলে এবং ইসলামে ধর্ম ত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলেই তিনি সতর্কতা হিসেবে এই ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। আর আমাদের বর্তমান আলোচ্য লেখক নিজেকে বলছেন ওয়ারাকের সন্তান (ইবনে ওয়ারাক)!

“In Islam, you don’t have the right to leave your religion. You’re born a Muslim and that’s it. An apostasy, that is to say, leaving your religion in Islam, is punishable by death.” – Ibn Warraq

মোট কথা, এই পয়েন্টের সারমর্ম হচ্ছে, ৮০ এর দশকে ওয়ারাক পরিচিত কেউ ছিলেন না, লেখালেখি শুরু করেছেন ৯০ এর দশকে এসে, ইবনে ওয়ারাক নামে পরিচিত হয়েছেন ১৯৯৫ সালে অর্থাৎ ১৯৯৫ সালের আগে ইবনে ওয়ারাক “নামের” কোনও লেখক ছিলেনই না। অথচ শিবলি তাকে ৮০এর দশকের লেখক বানিয়েছেন মিথ্যা-মিথ্যা। সুতরাং তার ‘অরিজিন অফ কোরান’ বইয়ের আর্টিকেলগুলো থেকে পাতার পর পাতা চুরি করার যে দাবী শিবলি করেছেন সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তারপরও কেউ যদি এমন দাবী করতে আসে তবে তাকে সাথে সাথে বলুন সেই আর্টিকেল প্রকাশের সময়, প্রকাশনী সংস্থা উল্লেখ করে কতটুকু মিল আছে সেটার ছবি সহকারে দেখাতে। আবারো বলছি, হু-আ কোনও পীর না, নবীও না। প্রমাণ পেলে হু-আর লেখাকে প্লেইজারিজম মানতে আমাদের কোনও আপত্তি নাই।

৩/ অরিজিনস অফ কোরান বইটি চার খণ্ডে বিভক্ত, মোট পৃষ্ঠা ৪১১। আর আজাদের বইটি মাত্র ১৫৬ পৃষ্ঠার। ওয়ারাক নিজেই বলছেন, পুরো বইটি মূলত কোরানের ঐতিহাসিক উৎস, বিশ্লেষণ আর সূত্র নিয়ে, বিশ্বাস–অবিশ্বাসের ফিলোসফিকাল আলোচনায় বইটি যায়ই নাই। আর আজাদের বইটি তার অবিশ্বাসের কারণ, দর্শন ও ব্যক্তিগত অনুভব নিয়ে।

অরিজিনস অফ কোরান বইটির মৌলিক লেখক কিন্তু ইবনে ওয়ারাক নন, বইটির কভার পৃষ্ঠা সহ সবখানে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন এডিটর হিসেবে। বইটির পুরো নাম আসলে, “The Origins of The Koran : Classic Essays on Islam’s Holy Book ”। এখানে Classic Essays বলতে কিন্তু ওয়ারাক তাঁর নিজের প্রবন্ধ বোঝাননি। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে গত কয়েক শতাব্দীর লেখক, স্কলার ও গবেষকদের প্রবন্ধের সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ওয়ারাক। অর্থাৎ তার কাজটা যতটা না সাহিত্যিকের তার চেয়ে বেশী গবেষক ও সংকলকের অর্থাৎ খিচুড়ি রান্নার কৃতিত্বটা ওয়ারাকের। বইটি মূলত ১৩ টা প্রবন্ধের উপর ভিত্তি করে লেখা যেগুলোর ১২ টি লেখা হয়েছে, ১৮৯০-১৯৪০ সালের মাঝে আর একটা হয়েছে ১৯৮৫ সালে। এই বিশালাকার প্রবন্ধগুলো যাদের লেখা তাদের নামগুলো উইকি থেকে তুলে দিচ্ছিঃ Ibn Warraq, Theodor Nöldeke, Leone Caetani, Alphonse Mingana, Arthur Jeffery, David Samuel Margoliouth, Abraham Geiger, William St. Clair Tisdall, Charles Cutler Torrey and Andrew Rippin.

প্রথম খণ্ড হচ্ছে সার্বিক আলোচনা এবং ইসলামের ইতিহাসের ‘রিভিশনিস্ট’ পাঠ হিসেবে পরিচিত থিওডর নলডেকের প্রবন্ধটাকে বেইজ করে বিশ্লেষণ।
দ্বিতীয় খণ্ড “The Collection and the Variants of the Koran : কেনও কোরানের নির্ভরযোগ্য উৎস পাওয়া কঠিন সেটা নিয়ে আলোচনা। অর্থাৎ সমগ্র কোরআনের সংকলন, বিতরণ ও বর্তমানের সাথে পুরাতন ভার্সনগুলোর মিল-অমিল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা। Caetani, Mingana, Jeffrey এবং Margoliouth এর প্রবন্ধগুলো হচ্ছে এই খণ্ডের মূল সোর্স।
তৃতীয় খণ্ড “The Sources of the Koran” কোরআনের টেক্সটগুলোর উৎস হিসেবে জুদাইজম(ইহুদী), খ্রিস্টান আর জরাথুস্ত্রবাদে নিহিত থাকা তথ্যগুলোর বিশ্লেষণ আছে এই খণ্ডে। Geiger, Tisdall ও Torrey এর প্রবন্ধগুলো হচ্ছে এই খণ্ডের মূল সোর্স।
আর চতুর্থ খণ্ডঃ“Modern Textual Criticisms of the Koran”: অন্যান্য ইসলামিক তথ্যের উৎসগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এখানে। Rippin এর প্রবন্ধ এই অংশের মূল সোর্স।

৪/ শিবলি গংরা এখন তাদের কথা আরও ঘুড়িয়ে দাবী করতে পারেন, অরিজিনস অফ কোরান থেকে না, হুমায়ুন আজাদ তার অবিশ্বাস বইটি “Why I am not Muslim.” বই থেকে নিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত এমন দাবী তারা করেননি।
দেখা যাক ওয়ারাকের ৪১৭ পৃষ্ঠার “Why I am not a muslim” (১৯৯৫) বইটির অধ্যায়গুলো কি নিয়েঃ
1. The Rushdie Affair
2. The Origins of Islam
3. The Problem of Sources
4. Muhammad and His Message
5. The Koran
6. The Totalitarian Nature of Islam
7. Is Islam Compatible with Democracy and Human Rights?
8. Arab Imperialism, Islamic Colonialism
9. The Arab Conquests and the Position of Non-Muslim Subjects
10. Heretics and Heterodoxy, Atheism and Freethought, Reason and Revelation
11. Greek Philosophy and Science and Their Influence on Islam
12. Sufism or Islamic Mysticism
13. Al-Ma’arri
14. Women and Islam
15. Taboos: Wine, Pigs, and Homosexuality
16. Final Assessment of Muhammad
17. Islam in the West

হু-আর ‘আমার অবিশ্বাস’ বইটিতে কি আছে দেখা যাকঃ
প্রথম অধ্যায়টিতে করেছেন বিশ্বাস সম্পর্কিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপারগুলোর আলোচনা। দ্বিতীয় অধ্যায়টি মূলত রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ, দান্তে সহ অন্যান্য কবিদের কাব্যে-লেখনীতে বিশ্বাসের উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়টিতে এসেছে ইয়েটস, ডিলান টমাস, এজরা পাউন্ড, এলিয়ট, অডেন, ডিলান টমাস, কিটস, জীবনানন্দ, মোহিতলাল মজুমদার আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যালোচনা। চতুর্থ অধ্যায়টিতে দেখিয়েছেন মহাবিশ্বে পৃথিবীর অবস্থান আর বিশ্বসৃষ্টির ধর্মীয় উপাখ্যানগুলো। পঞ্চম অধ্যায় হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তি আর ক্রমবিকাশ নিয়ে। ষষ্ঠ অধ্যায়টি হচ্ছে বিধাতা বিষয়ক ফিলোসফিকাল আলোচনা। সপ্তম অধ্যায়টিতে রাড়িখালে হুমায়ুন আজাদের বাল্যজীবন, স্কুলজীবনের কথা এতে এসেছে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, আবুল ফজল, সুফিয়া কামাল, ইব্রাহিম খা এর সমালোচনা এতে আছে।

ম্যাথিউ আরনল্ড, নিটশে, জর্জ স্মিথ, বোকাচ্চিও, দেমোস্থেনেস, প্লাউতুস, নজরুল, ভলতেয়ার, পিটার পেত্রিক্স, খুশবন্ত সিং, চার্লস প্লাস, মিহজান, মার্ক্স, থিয়াগনেস, জেনোফানেস, ম্যাক্স মুলার, ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট, ঋগ্বেদ, ক্লেমেন্ট, টাইরিউস, ডেভিড স্ট্রাউস, বাউআর, আল-মারি, জালালুদ্দিন রুমি, খলিফা উমর, টমাস পেইন, সন্ত পল, দস্তভয়স্কি, এরিস্টটল, টলেমি, কান্ট, চার্লস গ্লাস, স্টিফেন হকিং, আইনস্টাইন, স্পিনোজা সহ আরও অনেকেরই বক্তব্য হুমায়ুন আজাদ তাদের নাম উল্লেখ করেই ব্যবহার করেছেন।
বইদুটির অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনার পার্থক্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, হুমায়ুন আজাদের অবিশ্বাস বইটির সাথে ওয়ারাকের “Why I am not a muslim” বইটির পার্থক্য বিশাল।

শিবলি আজাদের বইটিকে অরিজিনস অফ কোরান থেকে আমার অবিশ্বাস লেখা বলে যে ধরা খেয়েছেন সেই একই ভুল কিন্তু আরিফুল হোসাইন তুহিন করেননি। প্রথমে আরিফুলের লেখার অংশটুকু পড়ে নেয়া যাকঃ

“আমার অবিশ্বাস” এর প্রণোদনা রাসেলের “হোয়াই আই এম নট এ ক্রিশ্চিয়ান” এবং ইবন ওয়ার্কের “হোয়াই আই এম নট এ মুসলিম” থেকে এসেছে এটা বলাই যেতে পারে। কিন্তু এটি কোনভাবেই এই দুই বই এর কোনটারই মত নয়। রাসেলের বইটা আসলে মূলত ফিলসফিক্যাল। এখানে বিভিন্ন পদের লেখা সংকলিত হয়েছে। যেমন ক্যাথলিক প্রীস্টের সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে ডিবেট, ক্রাইস্টের মোরালিটি ইত্যাদি। রাসেলের বইতে ইসলাম ধর্মের তেমন কোন উল্লেখ নেই। শুধু নবীর নাম একবার দুইবার উল্লেখ করা আছে। সাহিত্য সম্পর্কেও কোন আলোচনা নেই। অন্যদিকে হুমায়ুন আজাদের বই এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত। সাহিত্য নিয়েও বেশ বড় একটি অংশ আছে। সাহিত্যের অংশটিকে আমরা মৌলিক হিসেবে নিতে পারি। কারণ সাহিত্য নিয়ে তেমন কোন আলোচনা রাসেল কিংবা ওয়ার্ক কারো বইতেই নেই। ওয়ারাকের বইতে ইসলামের “প্যাগান” অরিজিন সংক্রান্ত একটি লম্বা অধ্যায় আছে। হুমায়ুন আজাদ একই ইস্যুতে যে তথ্য গুলো উল্লেখ করেছেন তার অনেকগুলোই সেই অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ অন্য কোন উৎস হতেও এই তথ্যগুলো জানতে পারতেন। ……ওয়ারাক সাইট করতে ব্যর্থ হননি। যেইটা হুমায়ুন আজাদ “আমার অবিশ্বাস”-এও মোটাদাগে ব্যর্থ।”

পাঠক, খেয়াল করুন আরিফুল কিন্তু দাবী করেননি আমার অবিশ্বাস বইটি “হোয়াই আই এম নট এ ক্রিশ্চিয়ান” এবং “Why I am not Muslim.” বই থেকে প্লেইজারিজম করে লেখা। তিনি লিখেছেন, “এটি কোনভাবেই এই দুই বই এর কোনটারই মত নয়।” আরিফুলের এই বক্তব্যের সাথে শতভাগ সহমত প্রকাশ করছি।

“ওয়ারাক সাইট করতে ব্যর্থ হননি। যেইটা হুমায়ুন আজাদ “আমার অবিশ্বাস”-এও মোটাদাগে ব্যর্থ।”

আরিফুলের এই কথার সাথে কিছুটা দ্বিমত আছে আমার। কারণ হচ্ছে পাশ্চাত্যে বনাম উপমহাদেশে সাইটেশন পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে বলা যায় না আজাদ সাইটেশন উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বাংলাভাষার অধিকাংশ বড় লেখকের বইয়ের সাইটেশন পদ্ধতি আজাদের চাইতেও খারাপ! আজাদ কিন্তু প্রতিবারই প্রাইমারি সোর্সের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁর লেখায়।

ওয়ারাকের “Why I am not Muslim.” এর সাথে আজাদের অবিশ্বাস বইটির মিলগুলো এবার দেখা যাকঃ

>মদ, শুয়োর নিয়ে কোনও টপিক মিলে যাবার দাবী শিবলি তোলেননি। তবে এই টপিক দুই বইতেই আছে। আজাদের বইয়ের ১৪৭-১৪৯ পৃষ্ঠাব্যাপী আছে মুসলমানদের মদ ও শুয়োর খাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আলোচনা। ওয়ারাকের “Why I am not a muslim” বইটির ১৫ নং অধ্যায়েও আলোচনা এই টপিকেই। আজাদ এই প্রসঙ্গে লিখেছেন মাত্র আড়াই পৃষ্ঠা, ওয়ারাক লিখেছেন ১২ পৃষ্ঠা। দুইজনের লেখনীর ধরণে পার্থক্য সুস্পষ্ট। তবে শুয়োর নিয়ে আজাদ আর ওয়ারাকের বইতে কোনও মিল পাইনি। আজাদ এই টপিকে মূলত সিপাহী বিদ্রোহ আর তার জীবনের ব্যক্তিগত ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
ওয়ারাক মদ নিয়ে আলোচনায় খুশবন্ত সিং-এর অনেকগুলো বক্তব্য, হানিফ কুরায়শী, ওয়ালিদ বিন ইয়াজিদসহ মধ্যযুগীয় খিলাফতের অনেকগুলো রেফারেন্স, আবু মিহজান, চার্লস গ্লাস, আবু নুয়াস, ইবন আল-মুতাজ, ফাইজ আহমেদ ফাইজ এর বক্তব্য সাইট করেছেন। আজাদ তার আলোচনায় মদ নিষিদ্ধ হবার কারণ ডিটেইলসে লিখেছেন, সাথে লিখেছেন নজরুল, খুশবন্ত সিং, আবু নুয়াস, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, আর চার্লস গ্লাসের বক্তব্যসহ তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
কিন্তু এমন তো না যে, ইসলামে মদ খাওয়া যে হারাম সেটা ওয়ারাকের আবিষ্কার। এইটা গত দেড় হাজার বছর ধরেই সবাই জ্ঞাত। মুসলিম কবিদের মদ সংক্রান্ত গজল, কবিতা যে অসংখ্য তাও আমরা জানি। আবু নুয়াসের নাম দুই লেখাতে থাকলেও মিল নেই তথ্যে। খুশবন্ত সিং, আবু মিহজান আর চার্লস গ্লাসের বক্তব্য দুইজনের লেখাতেই আছে। দুইজনই সাইট করেছেন প্রপারলি। ওয়ারাক খুশবন্তের একাধিক বক্তব্য ব্যবহার করেছেন, আজাদ একটি।

শিবলির দাবী ছোট্ট করে আবারো বলে নেইঃ

“সমকালীন প্যাগান উৎসে কোরানের রুট নিহিত…ওয়ারাক এমন দাবী…সেজন্যে, ইসলাম বা কোরানের প্রসঙ্গ এলেই (ক’বায় লাত, মান্নাত এর অধিষ্ঠান, স্যাটানিক ভার্সেসের সত্যতা, হজরে অসওয়াদ, যমযম কুপের পানি ইত্যাদি প্রসঙ্গ) আজাদ পাতার পর পাতা ইবনে ওয়ারাক এর লেখা থেকে তুলেছেন”

শিবলি ‘পাতার পর পাতা’ মিলের অভিযোগ করেছেন অথচ আজাদের বইতে ইসলামের প্যাগান অরিজিন টপিকে আলোচনাই আছে মোট আড়াই পৃষ্ঠা(৯৯-১০১)! প্রিয় পাঠক আবারও খেয়াল করুন, মাত্র আড়াই পৃষ্ঠা। এই টপিকে হুমায়ুন আজাদের লেখা খুবই ভাসাভাসা, গভীরে যানই নাই বলতে গেলে। বাংলা অনলাইনে বর্তমানে আজাদের এই কথাগুলোর চাইতে শতগুণে ডিটেইলস আলোচনা রয়েছে। সম্ভবত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশের নাগরিক বলে এসব লিখে বিপদে পড়তে চাননি আজাদ।

>কাবায় লাত, মান্নাত এর অধিষ্ঠানঃ লাত-মানাত-উজ্জা নিয়ে ওয়ারাক বিশদ আলোচনা করেছেন আর আজাদ লিখেছেন তিন লাইন। এই তিন লাইনের কোনও মিল আমি খুঁজে পাইনি ওয়ারাকের সাথে। ওয়ারাকের বইতে এই সংক্রান্ত আলোচনা আছে: al-Uzza, 38, 77, 101-102, Manat, 39, 77,101-102 নং পৃষ্ঠায়।

> হজরে অসওয়াদঃ হজ্বের সময় ক্বাবার কালো পাথরটিতে চুমু খাওয়া নিয়ে আলোচনা দুই বইতেই আছে। হজ্ব এর আনুষঙ্গিক প্রথাগুলো নিয়ে ওয়ারাকের বইতে আলোচনা বিশদ। আল-মারির একাধিক কবিতা কোট করেছেন ওয়ারাক এই প্রসঙ্গে। আর হুমায়ুন আজাদ আল-মারির একটা কবিতার মাত্র দুই লাইন প্যারাফ্রেইজ করেছেন। খলিফা উমর, ক্ল্যামেন্ট অফ আলেক্সান্দ্রিয়া, টাইরিউসের এক লাইন করে বক্তব্য কোট করেছেন দুইজনই।
কালো পাথরটিকে গ্রহাণু বলা প্যারাটুকুতে কিছু মিল আছে দুই বইতেই। ওয়ারাক এই প্যারার রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন Margoliouth এর, তবে আজাদ এই পয়েন্ট কোথা থেকে নিয়েছেন তা সাইট করেননি। কালো পাথরটি আকাশ থেকে পরা স্বর্গীয় বস্তু হিসেবে পরিচিত ছিল নবি মুহাম্মদের আবির্ভাবের আগে থেকেই। আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একে সর্বপ্রথম উল্কাপিণ্ড হিসেবে দাবী করেছিলেন Paul Partsch সেই ১৮৫৭ সালে। তার সেই বক্তব্য অনেক লেখকই পরবর্তী শতাব্দীতে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ কালো পাথরটিকে গ্রহাণু বলাটা ওয়ারাকের কোনও নিজস্ব বক্তব্য না যে আজাদ তাকে ক্রেডিট দিতে বাধ্য। ওয়ারাকের বইতে এই সংক্রান্ত আলোচনা আছে: Black Stone, 36, 38, 39, 287-88 নং পৃষ্ঠায়।

>সাফা-মারওয়া পাহাড়: ওয়ারাক যথারীতি এই টপিকে অনেক লিখেছেন। আজাদ এই টপিকে লিখেছেন দুই লাইন:

“আস-সাফা ও আল মারওয়া পাহাড় দুটির নাম বোঝায় পাথর। আরবরা সৌভাগ্যলাভের জন্য এ দু-পাহাড়ে ছোটাছুটি করে ছুঁতো ও চুমু খেত দুই পাহাড়ে স্থাপিত ইসাফ ও নায়লার দুটি মূর্তি।”

আজাদের এই লাইনের সাথে ওয়ারাকের নিম্নোক্ত লাইনটুকুর মিল আছে:

The names of the two hills As Safa and al-Marwa signify a stone, that is, an idol. Pagans ran between the two hills in order to touch and kiss Isaf and Naila, the idols, placed there as a means of acquiring luck and good fortune.

ওয়ারাক এই লাইনটুকু সম্পর্কে কোনও সাইট করেননি, আজাদ ও করেননি। তবে দুইজনই কমন সোর্স থেকে নেয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট।

>স্যাটানিক ভার্সেস আর যমযম কূপের পানি নিয়ে কোনও আলোচনা আজাদের বইটিতে নাইই। অথচ শিবলি দাবী করেছেন আজাদ নাকি এই তথ্যগুলোও চুরির করে লিখেছেন! 😀

সারমর্ম করলে, ওয়ারাক “Why I am not Muslim.” আর আজাদের আমার অবিশ্বাস বই দুটিতে সরাসরি মিল আছে মাত্র এক লাইন(সাফা-মারওয়া), আর বিভিন্ন লেখকের কোটেশন মিল আছে সাত-আটটি। এখন কথা হচ্ছে, শতশত কোটেশনের মধ্যে এই সাতটি কোটেশন মিল থাকলে এবং যার যার বক্তব্য তার নাম ব্যবহার করে দেয়ার পরও প্লেইজারিজম বলা যায় কি? উত্তর হচ্ছে: না। কেনও বলা যায় না তাঁর কারণ হচ্ছে দুইটাঃ
> একই টপিকে দুই জন ব্যক্তি যখন কথা বলতে যাবেন, তখন তারা যাদের বক্তব্য কোট করবেন সেগুলোর মাঝে খুবই অল্প কয়েকটা মিলতেই পারে। যেমন ধরেন, আমি রাজনীতির উপর একটা প্রবন্ধ লিখলাম যেখানে রবীন্দ্রনাথের একটা বক্তব্য উধৃত(কোট) করলাম। আবার আপনি রাজনীতি নিয়েই আরেকটা প্রবন্ধ লিখলেন যেখানে প্রাসঙ্গিক বিধায় রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যটা আপনিও কোট করলেন। এখন তার মানে কি এই যে আপনি আমার থেকে চুরি করলেন? ইসলাম নিয়ে কথা বলা সময় ওয়ারাক ও আজাদ যাদের বক্তব্য কোট করেছেন সেগুলোও খুবই কমন বক্তব্য।
>যে সাতটা কোটেশন মিলেছে সেগুলো হুমায়ুন আজাদ যদি ইবনে ওয়ারাকের বই থেকে পেয়েও থাকেন তবেও সেক্ষেত্রে ওয়ারাকের ক্রেডিট দেয়ার দরকার পরে না বা ওয়ারাককে ক্রেডিট না দিলেও সেটাকে প্লেইজারিজম বলা যাবে না। কারণ আজাদ প্রতিবারই প্রাইমারি সোর্সের নাম উল্লেখ করেছেন। আজাদ যদি ওয়ারাকের নিজস্ব বক্তব্য নিজের বলে চালিয়ে দিতেন সেটা ভিন্ন কথা হত। [কেনও এক্ষেত্রে প্লেইজারিজম বলা যাবে না তা বুঝতে অর্থাৎ প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি সোর্সের সাইটেশন কিভাবে করতে হয় তা নিয়ে আমি অপর একটা লেখায় পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে লিখেছি, আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। লেখার নামঃ তথ্যসূত্র, রেফারেন্সিং, সাইটেশন বনাম প্লেইজারিজম।

পাঠক তথ্য আর নিজস্ব বক্তব্যের মাঝে যে ফারাক সেটা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি। তাছাড়া তথ্যের এই কয়েকটা মিল কোনভাবেই প্রমাণ করেনা যে আজাদ ওয়ারাক থেকে নিয়েছেন। কারণ অনুরূপ তথ্যগুলো Encyclopedia of Islam, Dictionary of Islam, Encyclopedia of religions and ethics, নলডেকের history and civilization of Islam,মন্টোগোমারি ওয়াটের ‘Muhammad at Mecca’(1953), প্রফেসর হিট্টির বই সহ আরও অনেক সোর্স থেকেই পাওয়া সম্ভব। বিশেষত ওয়ারাক নিজেও বলছেন, তাঁর এই বইয়ের তথ্যগুলোও তাঁর নিজের লেখা না। এই সতেরটা অধ্যায় কোন কোন স্কলারের আর্টিকেল থেকে নিয়ে তিনি খিচুড়ি রান্না করেছেন তা তাঁর বইতেই বলা আছে। এর মাঝে ইসলামের প্যাগান ওরিজিন সম্পর্কে আলোচনা আছে মূলত দ্বিতীয় অধ্যায়ে যা ওয়ারাক নিয়েছেন Tisdall, Boyce, Zwemer, Torrey, and Geiger থেকে। ওয়ারাক এত যায়গা থেকে তথ্য নিয়েছেন যে তিনি নিজেই চিন্তিত ছিলেন প্লেইজারিজমের অভিযোগ তাঁর উপর আসে কিনা তা নিয়ে।”Why I am not Muslim.” বইতে তিনি লিখেছেনঃ

“what is there is mine, and whether I got it from a book or from life is of no consequence. The only point is, whether I have made a right use of it.”

আজাদও একই কাজ করেছেন, তথ্যের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন, যার-যার বক্তব্যকে তার-তার নাম উল্লেখ করেই।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ইসলামে পশু উৎসর্গকে জড়িত করা হয় হিব্রু নবি আব্রাহামের নিজের পুত্র ইসমাইলকে উৎসর্গ করার উপাখ্যানের সাথে। এই বাক্যে কিছুটা তথ্য ভুল হয়েছে। ইহুদি-খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে অর্থাৎ হিব্রু বাইবেলে আছে আব্রাহাম তার স্ত্রী সারার গর্ভে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় সন্তান ইসহাককে উৎসর্গ করার চেষ্টা করেন আর মুসলমানরা বিশ্বাস করে, আব্রাহামের প্রথম সন্তান দাসী হ্যাগারের(হাজেরার) গর্ভে জন্ম নেয়া ইসমাইলকে উৎসর্গ করার উপাখ্যান, যদিও কোরআন-হাদিসে ইসমাইলকে উৎসর্গ করার কথা বলা নেই। মুসলমানরা কেনও এই টুইস্টেড তথ্যে বিশ্বাস করেন তা বুঝতে আগ্রহী পাঠক নেটে সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন।

৪/ হাইনে তাঁর স্মৃতি-ফলকের জন্য লিখে গিয়েছিলেন,

“আমার কবিত্ব-গৌরবকে আমি তেমন গুরুত্ব দেই না, আমার সংগীত প্রশংসিত কিম্বা নিন্দিত হলেও আমার কিছু আসে যায় না। তবে আমার শবাধারের উপর একটা তলোয়ার রেখে দিয়ো; কারণ মানব মুক্তির সংগ্রামে আমি একজন সুযোদ্ধা ছিলাম”

হাইনরিখ হাইনে যেমন জার্মান সাহিত্যে তেমনি বাংলা সাহিত্যে হুমায়ুন আজাদ। প্রথা বিরোধিতায় দুইজনই আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন। ‘আমার অবিশ্বাস’ বইতে হু-আ লিখেছেন

“ভক্ত কখনো আমি হ’তে পারিনি, যদিও আমি অনেকেরই অনুরাগী।”

প্রিয় পাঠক,আমার অবস্থাও অনেকটা এমনই। হুমায়ুন আজাদ এই অনেকেরই একজন। তাই তাকে নিয়ে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অনলাইনের আমরা অনেকেই শিবলি আজাদ ও তার সমমনাদের প্রায় সবগুলো দাবীই যে মিথ্যা তা প্রমাণ করেছি ইতোমধ্যে। পাঠকরা যদি আগ্রহী হন তবে হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে সর্বশেষ দাবীগুলো অর্থাৎ জলপাই রঙের অন্ধকার, নিবিড় নীলিমা ইত্যাদি সংক্রান্ত দাবী চেক করে দেখতে পারি।

Ref:
১/Der Spiegel August 2007 Interview with Ibn Warraq & other interviews
২/ Why I am not a muslim & Origins of Koran—by Ibn warraq
৩/Personal website of Warraq
৪/ Wikipedia

পুনশ্চঃ আমার অন্য একটি লেখায় লিখেছিলাম, অরিজিনস অফ কোরান ১২১৪ পৃষ্ঠার বই। আসলে আমার কাছে যে পিডিএফটি আছে সেটি ১২১৪ পৃষ্ঠারই তবে সেটি সম্ভবত ইপাব ভার্সন থেকে কনভার্ট করার সময় ফন্ট সাইজের পার্থক্যের কারণে এমন হয়েছে। পরে ইপাব নামিয়ে দেখেছি পৃষ্ঠা সংখ্যা আসলে ৪১১। এই অনাকাঙ্ক্ষিত তথ্য বিভ্রাটের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি সবার কাছে।

koran1

koran

WhyImnotaMuslim

why muslim

10482796_1101558476539961_651393813_n

11830115_1101558483206627_1674453194_n

[408 বার পঠিত]