বিবিসি থেকে সম্প্রচারিত ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান দ্য গ্রেট ফিলোসফরাস (১৯৮৭) এ ব্রিটিশ দার্শনিক ব্রায়ান ম্যাজি অস্ট্রেলীয় দার্শনিক পিটার সিঙারের সাথে মূলত হেগেল এবং কিছুটা মার্ক্সকে নিয়ে কথা বলছেন। এটি একটি স্বেচ্ছাচারী বঙ্গানুবাদ।

ভূমিকা

ম্যাজি: বিশ্বের আমূল পরিবর্তনে হেগেলের মতো এত স্পষ্ট ভূমিকা খুব কম দার্শনিকই রাখতে পেরেছে। তার প্রত্যক্ষ প্রভাবটা রূপায়িত হয়েছে জার্মান জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে, আর পরোক্ষটা প্রকাশিত হয়েছে তার সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক শিষ্য কার্ল মার্ক্সের (বর্তমানের অনেকগুলো দেশই যার নামে নিজেদের পরিচয় দেয়) মধ্য দিয়ে। সুতরাং হেগেলের চিন্তাধারার ব্যবহারিক ফলাফলগুলো দেখার জন্য বর্তমানে আমাদের চারদিকে তাকানোটাই যথেষ্ট। আকাদেমীয় দর্শনেও হেগেলের প্রভাব বিশাল: অনেকে বলেন হেগেল-পরবর্তী দর্শনের ইতিহাসকে হেগেলের প্রতি বিভিন্ন দিক থেকে দেয়া কিছু জবাবের সমষ্টি হিসেবে দেখা যায়।

গেয়র্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিশ হেগেল ১৭৭০ সালে জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রায় সারা জীবনই তিনি বিভিন্ন রকমের শিক্ষকতা করেছেন এবং ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে প্রথমে হাইডেলবার্গ এবং পরে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হয়েছিলেন। দার্শনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে তার অনেক দেরি হয়েছিল—প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইটি লিখেছিলেন ৩৭ বছর বয়সে—কিন্তু ১৮৩১ সালে যখন মারা যান তখন তিনি নিঃসন্দেহে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলো হচ্ছে Phänomenologie des Geistes (মনের রূপতত্ত্ব), Wissenschaft der Logik (যুক্তির বিজ্ঞান), Grundlinien der Philosophie des Rechts (ন্যায়ের দর্শন), Vorlesungen über die Philosophie der Weltgeschichte (ইতিহাসের দর্শন)।

হেগেলের অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই অনেক বিখ্যাত হয়েছেন, কিন্তু অন্য যে কারো চেয়ে অনেক বেশি বিখ্যাত নিঃসন্দেহে কার্ল মার্ক্স। মার্ক্স ১৮১৮ সালে জার্মানির ট্রিয়ারে জন্মেছিলেন এবং ছাত্রাবস্থায় পুরোদস্তুর হেগেলবাদী ছিলেন। পঁচিশ বছর বয়সের আগে তিনি নিজেও সমাজতন্ত্রী হননি, এবং এই বয়স থেকেই জার্মান দর্শন, ফরাসি রাজনীতি ও ব্রিটিশ অর্থনীতিকে একত্রিত করে একটা সুবিস্তৃত, মৌলিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে শুরু করেন যার বর্তমান নাম মার্ক্সবাদ। তরুণ, ধনী শিল্পপতি ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস এর সাথে মিলে ১৮৪৮ সালে তিনি বিখ্যাত Manifest der Kommunistischen Partei লিখেন। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের জুটি সম্ভবত চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী জুটি। মার্ক্সের নির্ঝঞ্জাট কর্মজীবন নিশ্চিত করতে এঙ্গেলস আজীবন তাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে গেছেন, এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে মার্ক্সকে প্রায় পুরোটা জীবনই নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে: একত্রিশ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে আসেন এবং ১৮৮৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই ছিলেন। উত্তর লন্ডনের হাইগেইট গোরস্থানে তাকে কবর দেয়া হয়েছ। লন্ডনে তিনি একটা বড় সময় ধরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের পাঠকক্ষে কাজ করেছেন এবং এখানে বসেই তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই Das Kapital লিখেছেন যা ১৮৬৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

মার্ক্সবাদকে প্রথাগত অর্থে ঠিক দর্শন বলা যায় না, কিন্তু এর মধ্যে একটা বড় দার্শনিক উপাদান রয়েছে এবং এই উপাদানটা প্রায় আগাগোড়াই হেগেলবাদী। এই আলোচনায় আমরা মূলত হেগেলকে নিয়ে কথা বলব এবং তারপর দেখব কিভাবে হেগেলীয় দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো মার্ক্সবাদে স্থান করে নিয়েছে। আমার সাথে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত আছেন পিটার সিঙার যিনি হেগেল ও মার্ক্স দুজনের দর্শন নিয়েই চমৎকার ভূমিকাসূচক বই লিখেছেন। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। [বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। হেগেল ও মার্ক্সকে নিয়ে তার চমৎকার ভূমিকামূলক বই দুটো এখানে এবং এখানে পাওয়া যাবে।]

আলোচনা

ম্যাজি: সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিকদের মধ্যে হেগেল সবচেয়ে দুর্বোধ্য ও দুর্পাঠ্য হিসেবে বহুল পরিচিত, কিন্তু তাকে নিয়ে আপনার ছোট্ট বইটিতে তার মূল ধারণাগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আশাকরি এই আলোচনায়ও আপনার সেই স্পষ্টতাটা থাকবে। তো, কোত্থেকে হেগেল আলোচনা শুরু করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সিঙার: আমি সবসময় তার ইতিহাসের দর্শন অর্থাৎ Philosophie der Weltgeschichte বইটি থেকে শুরু করি, কারণ তার ইতিহাস বিষয়ক ধারণাগুলোই সবচেয়ে পাকাপোক্ত। হেগেল বুঝার একটা অসুবিধা হচ্ছে তিনি খুব বিমূর্ত। কিন্তু Philosophie der Weltgeschichte যেহেতু সুনির্দিষ্ট কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলে সেহেতু এটা তার দর্শনের অপেক্ষাকৃত বিমূর্ত অংশে ঢুকার একটা ভাল দরজা।

ম্যাজি: এই ইতিহাসচেতনাটাই পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে খুব নতুন একটা জিনিস: হেগেলের আগের কোনো বিখ্যাত দার্শনিকই ইতিহাস বা ইতিহাসের দর্শনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভাবেননি। এক্ষেত্রে ডেভিড হিউম বোধহয় একটা ব্যতিক্রম যেহেতু তিনি History of England লিখেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের দর্শন বলতে আমরা এখন যা বুঝি সেরকম কিছু তিনি তৈরি করেননি। একইভাবে গটফ্রিড লাইবনিৎস একটি পরিবারের ইতিহাস লিখেছিলেন কিন্তু কোনো ইতিহাসের দর্শন তৈরি করেননি।

সিঙার: হ্যাঁ, এটা আসলেই খুব নতুন। যেমন একে কান্টের সাথে তুলনা করা যায়। কান্টের দৃষ্টিতে মানব প্রকৃতি চিরন্তনভাবে যুক্তি ও কামনা এই দুই ভাগে বিভক্ত; মানুষকে যুগে যুগে যেমন দেবদূত ও বিনরের মাঝামাঝি কিছু একটা ভাবা হয়ে এসেছে অনেকটা সেরকম। কান্ট বলেন, মানব প্রকৃতিটাই এমন যে সে চিরকাল এই দুই মেরুর মধ্যে ছুটোছুটি করতে বাধ্য। কিন্তু হেগেল দাবী করেন, এই ব্যাপারটা অপরিবর্তনীয় নয়। মানব প্রকৃতিকে তিনি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তিনি বলেন, প্রাচীন গ্রিসে মানব প্রকৃতি তুলনামূলকভাবে বৈরিতামুক্ত ছিল। মানুষ তখন নিজেদের মধ্যে যুক্তি ও কামনার বৈরিতা নিয়ে অতটা সচেতন ছিল না। সুতরাং কান্ট যে বৈরিতা দেখেছেন সেটা নিশ্চয়ই ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে উদ্ভূত হয়েছে। আসলে হেগেল বলেন, প্রটেস্ট্যান্ট ইউরোপে ব্যক্তিগত বিবেক এর ধারণাটির জন্মের সাথে সাথেই এর উদ্ভব ঘটেছে। এটা যেহেতু ঐতিহাসিকভাবে ঘটেছ সেহেতু এর চিরস্থায়ী হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভবিষ্যতে কখনো হয়ত এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে এবং আবার ঐকতান প্রতিষ্ঠিত হবে।

ম্যাজি: হেগেল শুধু এটাই নয় বরং সব গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকেই ঐতিহাসিকভাবে দেখতেন, ঠিক না? তিনি মনে করতেন আমাদের ধারণাগুলো আমাদের জীবনপদ্ধতির মধ্যে এবং সে হিসেবে সমাজের মধ্যে প্রোথিত; এবং যখন সমাজ পরিবর্তিত হয় তখন ধারণাও পরিবর্তিত হয়।

সিঙার: হ্যাঁ, সেটা পুরোপুরি ঠিক। ইতিহাস যেভাবে চলে তাতে তিনি এক ধরণের উন্নয়ন দেখেছিলেন, অর্থাৎ ইতিহাস সবসময় সামনের দিকে ধাবমান। এটা সবসময়ই একটা প্রক্রিয়া, সুস্থির কিছু নয়।

ম্যাজি: এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে তিনি একটা নামও দিয়েছিলেন; ‘দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া’, যাকে অনেক সময় কেবলই ‘দ্বান্দ্বিকতা’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। হেগেলের দৃষ্টিতে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি ঠিক কেমন ছিল একটু ব্যাখ্যা করতে পারবেন?

সিঙার: আগের উদাহরণটাতে ফিরে যাওয়া যাক। হেগেল প্রাচীন গ্রিক সমাজকে এমন একটা সমাজ মনে করতেন যাতে যুক্তি ও কামনা’র মধ্যে ঐকতান ছিল; কিন্তু সেটা ছিল সরল ঐকতান। সরল কারণ প্রাচীন গ্রিসে মানুষ তখনো ব্যক্তিগত বিবেকের আধুনিক ধারণাটি তৈরি করেনি। সুতরাং তখন ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে ঐকতান ছিল, কারণ ব্যক্তিমানুষেরা তখন নিজেদেরকে তাদের নগররাষ্ট্র থেকে আলাদা কোনো সত্তা ভাবতে শুরু করেনি যে ভাল ও মন্দের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। এই সরল ঐকতানের মধ্যে আবির্ভূত হন সক্রেটিস যাকে হেগেল ঐতিহাসিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি মনে করতেন যেহেতু তিনিই প্রথম সবকিছুকে প্রশ্ন করার ধারণাটি উত্থাপন করেছেন। সক্রেটিস পথে ঘাটে মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেন: ‘ন্যায়বিচার কী?’, ‘গুণ কী?’ এবং মানুষ সেগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতদিন তারা গতানুগতিক অনুমানগুলোকে সত্য ধরে নিয়েছে যেগুলোর ত্রুটি সক্রেটিস খুব সহজেই দেখিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই গ্রিক সমাজের সরল ঐকতানটি ভেঙে গিয়েছিল। আসলে হেগেল মনে করতেন, এথেনীয়দের সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াটা ন্যায্যই ছিল। সক্রেটিস আসলেই এথেনীয় সমাজকে কলুষিত ও ভিত্তিচ্যুত করছিল। কিন্তু এটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির একটি আবশ্যকীয় অংশ ছিল এবং এরই ধারাবাহিকতায় একসময় ব্যক্তিগত বিবেকের জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিক অগ্রগতির দ্বিতীয় আবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে এই বিবেক। এটা গ্রিক সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী নীতিটির একেবারে বিপরীত। হেগেলের ভাষায়, আমরা সরল ঐকতান এর ‘থিসিস’ থেকে ব্যক্তিগত বিবেকের ‘এন্টিথিসিস’ এ সরে এসেছি যা প্রটেস্ট্যান্ট ইউরোপে সবচেয়ে চরম রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু এটাও ছিল অস্থিতিশীল। এর ফলশ্রুতিতেই ফরাসি বিপ্লবের ধ্বংসযজ্ঞ এবং বিপ্লবপরবর্তী ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে; সুতরাং এটাও একসময় ‘সিন্থেসিস’ এর জন্য জায়গা করে দিয়েছে। এটা একটা তৃতীয় ধাপ যাতে সরল ঐকতান ও ব্যক্তিগত বিবেকের সমন্বয় ঘটেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই সিন্থেসিসটা একটা নতুন থিসিস হিসেবে কাজ করে এবং তার বিপরীতে নতুন আরেকটি এন্টিথিসিস আবির্ভূত হয়; এবং এভাবে প্রক্রিয়াটা চলতেই থাকে।

ম্যাজি: প্রক্রিয়াটা চালু হওয়ারই বা কারণ কী? ঐতিহাসিক পরিবর্তন বলে কিছু একটাকে কেন ঘটতেই হবে? হাজার হোক একেবারে স্থির সমাজের কথাও তো আমরা ভাবতে পারি, প্রাচীন মিশর যার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একটা ভারসাম্যপূর্ণ ও ঐকতানপূর্ণ সমাজ—হেগেলের মতে প্রাচীন গ্রিস যা ছিল—অনন্তকাল ধরে সেরকম অবস্থাতেই থাকতে পারে না কেন? মলমের উপর মাছি বসে আবশ্যিকভাবেই একটা পরিবর্তনের উস্কানি কেন দেয়?

সিঙার: প্রাচীন গ্রিসের ক্ষেত্রে কারণটা হচ্ছে তাদের ঐকতানটা ছিল সরল—আরো ভাল একটা শব্দ হতে পারে কাঁচা (নাইভ)—এবং যুক্তির নীতি আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই সরলতা বজায় রাখা আর সম্ভব ছিল না। হেগেল গ্রিক মননে যুক্তির নীতি তৈরি হওয়ার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এটা অবধারিত ছিল। যৌক্তিক মানুষদের পক্ষে কোনো প্রশ্ন ছাড়া সামাজিক রীতি মেনে নেয়া আর সম্ভব ছিল না। ঠিক সেই সময়েই কেন প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল সেটা বুঝতে হলে ইতিহাসের অনেক খুটিনাটি নিয়ে কথা বলতে হবে; কিন্তু মোদ্দাকথা হচ্ছে, যৌক্তিক সত্তা হিসেবে এক সময় না এক সময় আমাদেরকে সরল ঐকতানকে প্রশ্ন করতেই হয়। প্রশ্ন শুরু হওয়ার পরই ব্যক্তিগত বিবেক জাগ্রত হয়ে সমাজ যে কাঁচা ঐকতানের উপর ভিত্তি করে গঠিত তা ধ্বংস করে দেয়।

ম্যাজি: এই ‘দ্বান্দ্বিক পরিবর্তন’ হেগেলের পর থেকেই এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে পরিণত হয়েছে—এবং মার্ক্সবাদীদের মধ্যে তা এখনো প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ—যে ব্যাপারটা আমাদের একেবারে পরিষ্কার করে নেয়া উচিত। আইডিয়াটি হচ্ছে, আমরা মানুষেরা একটা চিরন্তন পরিবর্তনের প্রক্রিয়াতে জড়িত কারণ প্রতিটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই কিছু পরস্পরবিরোধী উপাদান থাকতে বাধ্য; এবং এই উপাদানগুলো যেহেতু অস্থিরকারক সেহেতু পরিস্থিতিটা কখনো অনন্তকাল ধরে বজায় থাকতে পারে না। এসব অন্তর্কলহের চাপে পরিস্থিতিটা ধ্বসে পড়ে এবং এরপর একটা নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয় যাতে সেই অন্তর্কলহগুলো থাকে না, বা অন্তত প্রশমিত হয়। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিটাতে অবশ্যই নতুন কিছু অন্তর্কলহ থাকে। এবং তাই পরিবর্তন চলতেই থাকে। এই অনন্তকাল ধরে চলা প্রক্রিয়াটাই ইতিহাস গঠন করে। সুতরাং এখানে দ্বান্দ্বিকতা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির চালিকাশক্তি, সবকিছুর সদা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা। এবং পরিবর্তনটা কেমন রূপ ধারণ করে তাও এখানে বলা হয়েছে: প্রথমে থিসিস, তারপর এন্টিথিসিস, তারপর সিন্থেসিস, যা পরবর্তীতে একটা নতুন থিসিসের জন্ম দেয় যার পরে আসে আরেকটা এন্টিথিসিস, এবং এভাবে চলতেই থাকে।

এতক্ষণ পর্যন্ত হেগেলের কথা শুনে মনে হচ্ছে পরিবর্তন ঘটতেই হবে এটা ঠিক হলেও পরিবর্তনের প্রকৃত গতিপথটা অনির্ধারিত, অসংখ্য দৈব অন্তর্কলহে সৃষ্ট অনিশ্চিত ফলাফল। কিন্তু হেগেল আসলে তা মনে করেন না, ঠিক না? উল্টো তিনি মনে করেন যে, পরিবর্তনটা একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে—যে, এর একটা লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে।

সিঙার: ঠিক। হেগেলের মতে লক্ষ্যটা হচ্ছে মুক্তির দিকে মনের উত্তরোত্তর উন্নয়ন। আমরা সবসময় মানব স্বাধীনতা বা মুক্তি উপলব্ধির দিকে এগিয়ে চলেছি; এই প্রক্রিয়ায় মুক্তির চেতনা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়, এবং আমাদের আত্মজ্ঞানও দিনদিন বৃদ্ধি পায়।

ম্যাজি: আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে মুক্তি ও জ্ঞান ইতিহাসের মধ্যে একেবারে প্রোথিত, এমনকি মনে হচ্ছে ঐতিহাসিক পরিবর্তনটা যেন এই ধারণাগুলোরই মূর্তরূপ। এক্ষেত্রে বার্ট্রান্ড রাসেলের বিদ্রুপটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, তিনি বলেছিলেন, হেগেলের মতে ইতিহাস হচ্ছে ‘jellied thought’।

সিঙার: হ্যাঁ সেটা ঠিক, ইতিহাস এই ধারণাগুলোর উন্নয়নের প্রতিনিধিত্ব করে। ইতিহাস অনেকগুলো দুর্ঘটনার সমষ্টি নয়। এটা কোনো হাবা’র বলা গল্প নয়। এটা হলো মুক্তি ও জ্ঞানের উদ্দেশ্যময় অগ্রযাত্রা।

ম্যাজি: পরিবর্তনটা আসলে কার ঘটছে? মানে আমরা যখন কোনো পরিবর্তন নিয়ে কথা বলি তখন ধরেই নেই যে পরিবর্তনটা কিছু একটার ঘটছে। সেই কিছু একটা এখানে কী? হেগেল নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতে পারেন না যে এই বিমূর্ত ধারণাগুলোই ইতিহাসের সাবয়ব রূপ—ধারণা তো আর কোনো সারবস্তু (substance) নয়, এমনকি বিমূর্ত সারবস্তুও নয়। সুতরাং আমরা এখানে কিসের কথা বলছি? মানব ব্যক্তি? সমাজ? কে বা কী এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে?

সিঙার: ছোটো উত্তর হচ্ছে তিনি এখানে ব্যক্তির কথাও বলছেন না আবার সমাজের কথাও বলছেন না, বরং বলছেন ‘Geist’ এর কথা। ‘গাইস্ট’ একটা জার্মান শব্দ যা অনুবাদ করা বেশ কঠিন। সবচেয়ে সহজ করে বললে বলা যায় যে, হেগেল এখানে ‘মন’ এর কথা বলছেন। অনেক সময়ই এর অনুবাদ করা হয় ‘মন’। যেমন জার্মান শব্দ ‘Geisteskrankheit‘ এর অর্থ ‘মানসিক অসুস্থতা’। সুতরাং আমরা বলতে পারি, হেগেল মনে করতেন ইতিহাসটা অর্থাৎ পরিবর্তনটা ঘটছে মনের উপর, আমার মনের উপর, আপনার মনের উপর, আমাদের সবার ব্যক্তিগত মনের উপর। কিন্তু ‘গাইস্ট’ এর আরেকটা অর্থ আছে যা এই ধারণাকেও ছাড়িয়ে যায়, সেটা হলো ‘আত্মা’ বা ‘স্পিরিট’। আমরা অনেক সময় ‘Zeitgeist‘ অর্থাৎ ‘সময়ের স্পিরিট’ এর কথা বলি। বা জার্মানরা যখন পিতা, পুত্র এবং পবিত্র আত্মা’র কথা বলে তখনও গাইস্ট শব্দটা ব্যবহার করে—Heilliger Geist মানে Holy Ghost। সুতরাং এর একটা আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দিকও আছে—যা বলে এক অর্থে আমার ব্যক্তি মনের বাইরেও হয়ত কোনো এক রকমের বাস্তবতা আছে। সুতরাং এখানে আপনি বলতে পারেন প্রক্রিয়াটা ‘মনের’ উপর ঘটছে, তবে সাধারণ ব্যক্তি মনের উপর নয়, বরং উদ্ধৃতিচিহ্নওয়ালা ‘মনের’ উপর। [ইংরেজিতে এক্ষেত্রে Mind বড় হাতের M দিয়ে লেখা হয়।]

ম্যাজি: হেগেল কি বলতে চাইছেন যে, পুরো বাস্তবতা একটি একত্ব এবং সেটা মানসিক বা আত্মিক। সুতরাং আমরা যে প্রক্রিয়াটা নিয়ে কথা বলছিলাম তা পুরোই ঘটছে এই মানসিক বা আত্মিক কিছু একটার উপর।

সিঙার: হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত হেগেলের দৃষ্টিতে বাস্তবতা হচ্ছে গাইস্ট। এটা শেষ পর্যন্ত মানসিক, বা বুদ্ধিবৃত্তিক। আমরা যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছি তা গাইস্টের উপর ঘটে, অর্থাৎ ইতিহাসের পথ ধরে গতিশীল ‘মনের’ উপর ঘটে।

ম্যাজি: এই আলোচনা যারা শুনছেন তাদের অনেকের কাছে এটা খুব অদ্ভুত লাগতে পারে। সুতরাং আমার মনে হয় এখানে বলে নেয়া উচিত যে, এর কাছাকাছি অনেক রকমের ধারণার সাথে আমরা খুবই পরিচিত, যেমন ধর্মীয় বিশ্বাস; আমরা নিজেরা ধর্মবিশ্বাসী না হলেও এই বিশ্বাসটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। অনেক ধর্মবিশ্বাসী, যেমন অনেক খ্রিস্টান, বিশ্বাস করেন যে বাস্তবতা পুরোটা শেষ পর্যন্ত আত্মিক, এবং সমগ্র বাস্তবতার শেষ পর্যন্ত একটা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আছে। আমার মনে হয় হেগেল এর সাথে নিকটসম্পর্কিত কিছু একটাই বলতে চাচ্ছেন, যদিও হয়ত তার ধারণাগুলো ঠিক প্রথাগত অর্থে ধর্মীয় নয়।

সিঙার: পার্থক্য হচ্ছে, গোঁড়া খ্রিস্টানরা ঈশ্বরকে আত্মিক এবং বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হিসেবে বিবেচনা করে, বিশ্বটা বস্তুগত ও মামুলি, আর ঈশ্বর অবস্তুগত ও মহান। খ্রিস্টানদের দৃষ্টিতে বিশ্বের একটা আত্মিক তাৎপর্য আছে, কিন্তু বিশ্বটা নিজে আত্মিক নয়। সুতরাং খ্রিস্টানরা ঈশ্বর ও বিশ্বের মধ্যে একটা বিশাল পার্থক্য টেনে রাখে। বলা যায় হেগেল এর একেবারে বিপরীত কথা বলছেন—অর্থাৎ, কেউ হয়ত বলতে পারে হেগেল সর্বেশ্বরবাদী, যেহেতু তিনি মনে করেন ঈশ্বরই বিশ্ব, এবং সবকিছু আত্মিক যেহেতু সবকিছুই ঈশ্বরের অংশ। কিন্তু সেটাও পুরোপুরি ঠিক নয়। ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলে হেগেলকে গতানুগতিক খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বেশ্বরবাদের মাঝামাঝি কোথাও ফেলতে হবে। হেগেলের মতে, গাইস্ট সবকিছুতে প্রকাশিত হয়, যদিও এটা অস্তিত্বশীল সবকিছুর সাথে অভিন্ন নয়; [বিশ্বটাই গাইস্ট নয়, তবে বিশ্বে গাইস্ট প্রকাশিত হয়।]

ম্যাজি: ঘটনা হচ্ছে, হেগেলের পর থেকেই অনেক হেগেল বিশেষজ্ঞ ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন: হেগেলের দর্শন শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় কি না? অনেকে জোড়ালোভাবে দাবী করে যে এটা ধর্মীয়, অনেকে আবার বিপরীত কথা বলে। এই বিতর্কে আপনার অবস্থান কোথায়?

সিঙার: আমি মনে করি হেগেলকে অধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেক্ষেত্রে আপনি বুঝতে পারবেন যে তার দর্শনের একটা বিশাল অংশের একেবারে অধর্মীয় ব্যাখ্যা দেয়া যায়। সে যখন গাইস্টের কথা বলে তখন আমরা সেটা দিয়ে কোনো ব্যক্তির মন বুঝাতে পারি, বা সকল মানুষের মনের সমষ্টিকেও বুঝাতে পারে যেটা অনেক ক্ষেত্রে একটা একক ‘মন’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এই অভিন্ন মন দিয়ে আমাদের সবার মনে যে অভিন্ন জিনিসগুলো রয়েছে সেগুলো বুঝানো যায়, যেমন আমাদের যুক্তি প্রদর্শনের সাধারণ ক্ষমতা, কিংবা আমাদের মনের গাঠনিক দিকটা যেটা মূলগতভাবেই সবার ক্ষেত্রেই এক। কিন্তু আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, এই ব্যাখ্যাটা অনেকদূর এগিয়ে নিতে পারলেও এর মাধ্যমে হেগেলকে একেবারে একশ ভাগ ব্যাখ্যা করা যায় না। শেষ দশ শতাংশে আমাদের স্বীকার করতেই হয় যে, হেগেলের কথার অন্তরালে মন বা আত্মার একটা ধর্মীয় বা আধা-ধর্মীয় ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে।

ম্যাজি: আমরা এতক্ষণ পাশ্চাত্য দর্শনে হেগেল প্রবর্তিত দুটি একেবারে মৌলিক ধারণা নিয়ে কথা বলেছি। প্রথম ধারণাটি হচ্ছে, সমগ্র বাস্তবতা একটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। হেগেলের আগে একমাত্র যে দার্শনিক এর কাছাকাছি কিছু একটা বলেছিলেন তিনি হলেন সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিক হেরাক্লিতোস, কিন্তু তিনি এর সামাজিক দিকটা নিয়ে একেবারেই কথা বলেননি। এটা বলা একেবারেই অত্যুক্তি হবে না যে, হেগেল-পরবর্তী সকল সামাজিক ধারণা তার দ্বারা প্রভাবিত—এবং কেবল সামাজিক ধারণাই নয়। তার দ্বিতীয় ধারণাটি হচ্ছে দ্বান্দ্বিকতা, যেটা মার্ক্সবাদের কারণে আমাদের বর্তমান বিশ্বেও খুবই প্রভাবশালী। এর সাথে আমরা তৃতীয় আরেকটা ধারণা যোগ করতে পারি: সেটা হলো ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ (‘এলিয়েনেশন’)। এটাও হেগেল পত্তন করেছিলেন। এর দ্বারা তিনি কি বুঝিয়েছিলেন?

সিঙার: যে জিনিসটা আমাদের একেবারে নিজস্ব বা আমাদেরই অংশ সেটাকে আমাদের বাইরের, বা এমনকি আমাদের প্রতি সহিংস ও এলিয়েন কিছু ভাবাকে হেগেল বলেছিলেন ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ বা ‘এলিয়েনেশন’। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। হেগেল আমাদের সামনে একটি ‘অসুখী আত্মা’-র ছবি তুলে ধরেছিলেন, যা ধর্মের বিচ্ছিন্নতাবোধক ব্যাখ্যার মাধ্যমে তৈরি হয়। অসুখী আত্মা বলতে এমন একজন ব্যক্তিকে বুঝায় যে একজন সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বোত্তম ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে, এবং এর বিপরীতে নিজেকে শক্তিহীন, অজ্ঞ ও নিকৃষ্ট মনে করে। এই মানুষটি অসুখী কারণ সে নিজেকে অবমূল্যায়ন করে এবং নিজের সব ভাল বৈশিষ্ট্যকে তার থেকে ভিন্ন আরেকটি সত্তার প্রতি অর্পণ করে। হেগেল বলেন এটা ঠিক নয়। আসলে আমরা ঈশ্বরেরই অংশ, বা আপনি ভাবতে পারেন, আমরা আমাদের গুণগুলোকে প্রক্ষিপ্ত করছি ঈশ্বরের উপর। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে মুক্তি পেতে হলে বুঝতে হবে যে আমরা এবং ঈশ্বর এক, এবং যে বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা ঈশ্বরের উপর আরোপ করি সেগুলো আসলে আমাদেরই বৈশিষ্ট্য, এগুলো আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বা এলিয়েন কিছু নয়।

ম্যাজি: তিনি অবশ্য এগুলোকে কেবল মানব বৈশিষ্ট্য বলতেন না, ঠিক না? বরং হয়ত বলতেন এই বৈশিষ্ট্যগুলোতে মানুষেরও ভাগ আছে।

সিঙার: এগুলোকে কেবলই মানব বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রথম দাবী করেছিলেন হেগেলের একজন শিষ্য, লুডভিগ ফয়ারবাখ। হেগেল এমনটা বলতেন না, কিন্তু বলতেন ঐ ধরণের দিব্য আত্মা এবং আমরা সবাই একই বাস্তবতার অংশ, এবং বাস্তবতাটি হলো গাইস্ট বা ‘মন’।

ম্যাজি: আপনি স্পষ্ট করেছেন যে, হেগেল সমগ্র বাস্তবতাকে একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতেন এবং মনে করতেন এই পরিবর্তন দ্বান্দ্বিকতার মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসরমান। এটুকু শোনার পর যে প্রশ্নটা সাথেসাথে মাথায় আসে সেটাই আমি একটু আগে আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম: দ্বান্দ্বিক পরিবর্তনটি কিসের দিকে অগ্রসরমান? সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া আগেই আমরা একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেছি। এবার চলুন তাতে ফিরে যাওয়া যাক। হয়ত এর উত্তর দেয়ার জন্য আমরা এখন অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায় আছি। ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কি কোনো লক্ষ্য আছে?

সিঙার: দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটি এমন দিকে অগ্রসর হয় যাতে ‘মন’ নিজেকে পরম বাস্তবতা হিসেবে জানতে পারে, এবং যাতে এতদিন সে যে জিনিসগুলোকে পরকীয় এবং নিজের প্রতি সহিংস ভেবে এসেছে সেগুলোকে নিজেরই অংশ ভাবতে পারে। হেগেল এর নাম দিয়েছিলেন ‘পরম জ্ঞান’। একইসাথে এটা পরম মুক্তি, কারণ বাইরের শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পরিবর্তে এখন সে বিশ্বকে যৌক্তিক উপায়ে সাজাতে পারে। এটা তখনই সম্ভব যখন ‘মন’ বুঝতে পারে যে সে-ই বিশ্ব। এরপর বিশ্বকে যৌক্তিকভাবে সাজানোর জন্য ‘মন’ তার নিজের অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতাকেই অনুসরণ করতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হচ্ছে, এই চূড়ায় তখনই পৌঁছানো যায় যখন ‘মন’ বুঝতে পারে যে সে নিজেই একমাত্র পরম বাস্তবতা। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: এমনটা আসলে কখন ঘটে? উত্তর হচ্ছে এটা তখনই ঘটেছে যখন হেগেল তার দার্শনিক চেতনা দিয়ে বুঝতে পেরেছেন যে যা কিছু বাস্তব তা-ই ‘মন’। সুতরাং হেগেল যে কেবল লক্ষ্যটা—পরম জ্ঞান ও পরম মুক্তির দশা যার দিকে অতীতের সকল মানবেতিহাস অচেতন সংগ্রামের মাধ্যমে ধাবিত হয়েছে—বর্ণনাই করেছেন তা নয়, বরং তার দর্শনটাই এই পুরো দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াটির চূড়া।

ম্যাজি: আমি ভাবি হেগেল কি আসলেই নিজের এই গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন কি না, তিনি কি আসলেই জানতেন যে তিনি নিজের দার্শনিক সত্তাটিকে বিশ্ব ইতিহাসের চূড়া হিসেবে উপস্থাপন করছেন? মনে হয় না।

আপনি বলেছেন এই চূড়ায় পৌঁছালে একইসাথে পরম জ্ঞান এবং পরম মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু জ্ঞান ও মুক্তি কেন এক হতে হবে তা একেবারেই সহজবোধ্য নয়। হেগেল কি মনে করতেন তারা এক?

সিঙার: আত্মজ্ঞান মুক্তিতে পর্যবসিত হয়, কারণ হেগেল মনে করতেন ‘মন’ বিশ্বের পরম বাস্তবতা। ‘মনের’ নিজেকে পরম বাস্তবতা হিসেবে বুঝতে পারার আগে মানুষের গোটা ইতিহাসে মানুষ ছিল দাবার গুটি। আমরা সেই ইতিহাস কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কারণ আমরা নিজেদের অজ্ঞাতে অন্য কিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিলাম, এবং কেন আমাদের জীবনে এমনটা ঘটছিল তা বুঝতেও পারছিলাম না। আমরা নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না কারণ আমরা নিজেদের অন্তর্নিহিত একটা অংশকে পরকীয় এবং নিজেদের প্রতি সহিংস ভাবতাম। যখন বুঝতে পারলাম বিশ্বে যা কিছু আছে আমরা তা-ই, তখন আমরা প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারলাম; ভাবতে পারেন, আমরা অবশেষে ঐতিহাসিক অগ্রগতির নীতিগুলো বুঝতে পেরেছি। এবং তারপর বুঝতে পেরেছি যে এই নীতিগুলো আসলে আমাদের অন্তর্নিহিত যৌক্তিকতারই নীতি, আমাদের মন এবং চিন্তার নীতির সাথে তার কোনো পার্থক্য নেই।

ম্যাজি: আমার মনে হয় এই প্রসঙ্গেই হেগেলের সেই বিখ্যাত উক্তিটা বলা হয়ে থাকে: “বাস্তবতাটাই যৌক্তিকতা, যৌক্তিকতাটাই বাস্তবতা।”

সিঙার: ঠিক। এবং এটা বুঝতে পারার পরই আমরা মুক্ত হয়ে যাই। মুক্তি বাস্তবতার জ্ঞানের উপরই নির্ভর করে, কারণ বাস্তবতার যৌক্তিকতাটা বুঝতে পারলে আমরা আর বাস্তবতার বিরুদ্ধে বৃথা সংগ্রাম করব না। আমরা বুঝতে পারব যে বাস্তবতার সারধর্ম হচ্ছে আমাদের নিজেদেরই যৌক্তিক নীতি। এরপর থেকে আমরা এর সাথে ভেসে চলতে পারি, এমনকি ঐ যৌক্তিকতার নীতিগুলোর আলোকে এটাকে সাজাতে পারি, নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

ম্যাজি: হেগেলের চিন্তাধারার যে বিষয়টা আপনি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা হলো, তিনি কোনো আইডিয়াকে বিমূর্ত, কালহীন, চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ভাবতেন না (যেমনটা প্লেটো ভাবতেন), বরং সব আইডিয়াকে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রোথিত হিসেবে দেখতেন, ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে দেখতেন যেগুলো পরিবর্তিত হয়। এটা যদি ঠিক হয় তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ধরণের সমাজে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পরম পূর্ণতা ঘটতে পারে বলে হেগেল মনে করতেন?

[চলবে…]

7 Comments

  1. সুব্রত শুভ July 13, 2015 at 6:04 pm - Reply

    চমৎকার। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

  2. তানভীর July 13, 2015 at 8:29 pm - Reply

    দারুণ একতা ‘ক্লিফ হ্যাঙ্গারে’ শেষ হলো এই পর্বটা।

    প্রাচীন গ্রীক সমাজে মানব প্রকৃতি বৈরিতামুক্ত ছিলো হেগেলের এই ধারণার পিছনে কারণ কি? নাকি এখানে শুধু ‘সুবিধাপ্রাপ্ত’ সমাজের কথা বলা হচ্ছে?

    বিবেক এর প্রসংগে মনে পড়ল। গ্রাম্য যাত্রাপালায় কিছু ‘বিবেক’ চরিত্র থাকে। এই ধারনাটা কি এই অঞ্চলের আবহমান নাকি বাইরের কোনো অঞ্চলেও এমন ছিলো। ইউরোপীয় নাট্যকলাতেও কি ‘বিবেক’ চরিত্রটি দেখা যায়? গ্রাম্য যাত্রাপালার বিবেককে দেখি গল্পের চরিত্রগুলোর অমানবিক কর্মকান্ডে বেদনার্ত হতে। সে হয়তো মূল গল্পের কারো সাথে কথা বলে না। কিন্তু দর্শকের সাথে কথা বলে। এক হিসাবে এভাবে দর্শককে মানবিকতার শিক্ষাও দেয়। যদিও এইভাবে সরাসরি বিবেকের কথা বলা একটু বেশিই মেলোড্রামাটিক। এই বিবেক বেশিরভাগ সময়ই ‘সেক্যুলার’! অর্থাৎ যাত্রাপালার বিবেককে ধর্মীয় নৈতিকতার বদলে বরং মানবীয় নৈতিকতার দ্বারস্থ হতে দেখি। যাইহোক, সক্রেটিস প্রাচীণ গ্রীসে ‘বিবেকের’ কাজ করেছেন বা বিবেক জাগিয়ে তুলেছেন এমন কথার প্রসংগে এসব মনে এল।

    এই চূড়ায় তখনই পৌঁছানো যায় যখন ‘মন’ বুঝতে পারে যে সে নিজেই একমাত্র পরম বাস্তবতা।

    এই যে হেগেলের ‘মন’ কেন্দ্রীক বাস্তবতা সেটা কিছুটা কার্তেসীয় ধারণার কাছাকাছি নয়? আই থিঙ্ক দেয়ারফোর আই এম?

    ধারনাগত বিবর্তনের থিসিস, এন্টিথিসি, সিন্থেসিস চক্রটা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

    আমরা সেই ইতিহাস কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কারণ আমরা নিজেদের অজ্ঞাতে অন্য কিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিলাম, এবং কেন আমাদের জীবনে এমনটা ঘটছিল তা বুঝতেও পারছিলাম না।

    এই কথাগুলো অতীত কালে বলা হচ্ছে কেন? আমার তো মনে হয় আমরা এখনো ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নই। এবং অন্যকিছু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি।

  3. শিক্ষানবিস July 13, 2015 at 10:36 pm - Reply

    @তানভীর:
    ১। আসলে শুধু হেগেলই নয়, অনেকেই প্রাচীন গ্রিসের ‘প্রাকৃতিক’, ‘বৈরিতামুক্ত’, ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ সমাজের কথা বলে, এবং এর দ্বারা অধিকাংশ সময় গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলোর কেবল ‘নাগরিকদের’ কথাই বলা হয়; অবশ্যই এর মধ্যে দাসরা পড়বে না। বৈরিতামুক্ত বলার মানে এই নয় যে সেই সমাজটা থাকার জন্য আমাদেরটার চেয়ে খুব ভাল ছিল। বরং বুঝানো হয়, বৈরিতামুক্ত একটা পরিবেশ সেখানে ছিল যা কেউ চাইলে লালন করতে পারত, যা তাদের পুরাণ, কাব্য ও ভাস্কর্যশিল্পে ফুটে উঠেছে। হেগেল, নিট্‌শে থেকে শুরু করে সবাই প্রাচীন গ্রিসের এই অবস্থার পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তাদের শৈল্পিক সৃষ্টিগুলোই তুলে ধরে সম্ভবত।

    ২। এইরকম ব্যক্তিবিবেক চরিত্র সম্ভবত ইউরোপীয় নাটকেও, এমনকি কিছু সিনেমাতেও দেখা যায়। থিমটা বেশ জনপ্রিয়।

    ৩। কার্তেসীয় ধারণার কাছাকাছি হওয়া সম্ভব না, যেহেতু এখানে ‘মন’ বলতে একজন মানুষের মন বুঝানো হচ্ছে না। এখানে ব্যক্তি মুখ্য না, যেখানে দেকার্তের মূল মাথাব্যথাই ছিল একজন বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমানুষ নিয়ে। হেগেলের ‘মন’ একমাত্র হেগেলই বোধহয় বুঝতেন। তিনি আসলে নিজের দর্শনকে ‘মনের’ (গাইস্ট) আত্মোপলব্ধির চূড়া হিসেবে দেখতেন। রবীন্দ্রনাথের এই গানটা শুনতে পারলে বোধহয় সে তৃপ্তি পেতো: “আমি চোখ এই আলোকে মেলব যবে, তোমার ঐ চেয়ে দেখা সফল হবে।” এখানে “আমি” বলতে হেগেল নিজেকে বুঝতেন, আর “তোমার” বলতে বুঝতেন গাইস্টকে।

    ৪। হ্যাঁ, আমারও ধারণা আমরা ইতিহাসের গতিপথ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম নই। কিন্তু হেগেল ভেবে নিয়েছিলেন তার দর্শন চলে আসার পর মানুষের অবশেষে চোখ খুলবে এবং তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্যের চালকের আসনে বসবে। মার্ক্স এই ধারণা দ্বারাই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন মনে হয়; তিনি ভেবে নিয়েছিলেন হেগেলবাদ কাজে লাগিয়ে তিনি যে মতবাদ তৈরি করেছেন তা মানব সমাজকে (ব্যক্তিমানুষকে নয়) আত্মনিয়ন্ত্রণ দিবে, যেটা বাস্তবে হতে পারেনি।

  4. বন্যা আহমেদ July 14, 2015 at 9:10 pm - Reply

    এইটাই সমস্যা দর্শন নিয়ে। যেমন ইচ্ছা তেমন করেই ব্যাখ্যা করা যায় (সারকাজম ১ :))। অবশ্য রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে হেগেলকে ব্যাখ্যা করতে পারাটা ভালো লাগল, দুই চরম ভাববাদের মধ্যে সখ্যতা থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক(সারকাজম ২ :))। অনেক ছোটবেলায় হেগেল পড়েছিলাম, অনেক কিছুই মনে নেই, আর সে সময় পড়েছিলাম মার্ক্সবাদ বুঝার জন্য, সে জন্য মার্ক্সবাদে হেগেলের অবদান বুঝলেও হেগেলের খুঁটিনাটি সবকিছু বুঝি না, গাইস্টের কথা শুনলেই আমার জ্বর আসে। তবে এখন যেহেতু অনেক ওষুধ খেতে হয় এবং তার ফলে মাথাও ঘোরে তাই মনে হচ্ছে এখনই হেগেল নিয়ে আলোচনার উপযুক্ত সময়। এরকম ডিলিউশানাল অবস্থায় না থাকলে আমার পক্ষে হেগেল নিয়ে আলোচনা করা খুব কঠিন (সারকাজম ৩ :))।

    হেগেলের এই ব্যক্তি নৈতিকতা নিয়ে আমার সারাজীবনই প্রশ্ন ছিল, অনেকটা দ্বিমতও বলতে পারো…

    সক্রেটিস আসলেই এথেনীয় সমাজকে কলুষিত ও ভিত্তিচ্যুত করছিল। কিন্তু এটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির একটি আবশ্যকীয় অংশ ছিল এবং এরই ধারাবাহিকতায় একসময় ব্যক্তিগত বিবেকের জন্ম হয়েছে। ঐতিহাসিক অগ্রগতির দ্বিতীয় আবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে এই বিবেক। এটা গ্রিক সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী নীতিটির একেবারে বিপরীত।

    মানুষের মাথা কিভাবে কাজ করে সেটা ভাবলে আমার মেনে নিতে অসুবিধা হয় যে, সক্রেটিসের আগে ‘ব্যক্তি নৈতিকতা’র ধারণাটা ছিলনা। আমার কাছে রাষ্টীয় বা সামাজিক বা সমষ্টিগত যেকোনো নৈতিকতাকে সেই নির্দিষ্ট স্থান এবং কালের (বা অধিকাংশ জনগোষ্ঠী যাকে আমরা তথাকথিত ‘গনতন্ত্র’ বলি বা শুধুমাত্র ক্ষমতাধারী জনগোষ্ঠীর সমষ্টিগত রূপ) ব্যক্তিগত সব নৈতিকতার একটা যোগফল বা গড় বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়। যেমন ধরো দাসদের সাথে কিরকম আচরণ সহ্য করা হবে সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণের পিছনে তখনকার অভিজাতবর্গের ধারণ করা ব্যক্তিগত নৈতিকতার একটা বড় ভূমিকা ছিল। তবে সভ্যতার বিভিন্ন সময়ে কখনো সমষ্টি বা কখনো ব্যক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন ধরো, পাশ্চাত্যের লিবারেলিজম, বিশেষ করে নিও-লিবারেলিজমে ব্যক্তি বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম খুব গুরুত্বপূর্ণ এখন। অন্যদিকে, এই নৈতিকতাটাকে আমরা কোনো বিমূর্ত জিনিসও ভাবতে পারি না। সে সময়ের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থা/সীমাবদ্ধতা/নির্ভরতা এর পিছনে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমার অভিজিতের সাথে অনেক বিতর্ক/আলোচনা হত। যেমন ধরো আজকের যুগে একজন পুরুষ নারী সম্পর্কে কী নৈতিকতা পোষণ করবে ব্যক্তিগতভাবে সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এখনকার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এবং সেটার সমষ্টিগত একটা ‘গণতান্ত্রিক’ প্রতিফলন দেখা যায় রাষ্ট্রীয় নৈতিকতায়। মেনে নিচ্ছি ব্যাপারটা এর চেয়ে আসলে আরো অনেক জটিল, এখানে আমাদের বংশগতীয় গঠন (হার্ডওয়্যারিং), প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব ইত্যাদিকেও হিসেবে আনতে হবে। নারীমুক্তি কিংবা দাসপ্রথা বিলোপের উদাহরণ নিয়ে যদি কথা বলি, তাহলে বলব এগুলো সম্পর্কে আমাদের আজকের রাস্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত নৈতিকতা বা ধারণাগুলো উৎপাদনযন্ত্রের সাথে আমাদের যে সম্পর্ক তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উৎপাদনব্যবস্থায় মানুষের শারীরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার পরই শুধুমাত্র নারীমুক্তি (এমনকি দাস প্রথার বিলোপ) সম্ভব হয়েছে, এর সাথে আবার জড়িত হয়েছে সন্তানের সাথে মা-বাবার সম্পর্ক, সমাজে নারীর অবস্থান ইত্যাদির ব্যাপারগুলো। আজকে একটা ছেলে নারী সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে যে মনোভাব পোষন করে তাকে কোনভাবেই তার চারপাশের পারিপার্শ্বিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি থেকে আলাদা করা যায় না (ব্যতিক্রমের কথা বলছিনা)।

    যেমন ধরো

    ঠিক সেই সময়েই কেন প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরি হয়েছিল

    এটার সাথেও আমি একমত হতে পারি না, কেমন যেন বিমূর্ত মনে হয়। প্রশ্ন বোধ হয় ছিল মানবসমাজে সবসময়েই, দুই লক্ষ বছর ধরেই, হয়ত বা তারও আগে, হয়ত তার মধ্যে জটিলতার পরিমাণ কম ছিল। ক্রমান্বয়ে জটিলতা বেড়েছে প্রশ্ন করার ক্ষমতায়, মানুষের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার বোঝার ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে।

    এখানে দ্বান্দ্বিকতা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটির চালিকাশক্তি, সবকিছুর সদা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা।

    এটাই মূল কথা হেগেলের বক্তব্যের, কিন্তু সেটা আবার আরেক আলোচনা। যাই হোক এত অল্প কথায় হেগেল নিয়ে মন্তব্য করাটা ঠিক না, চরম ঔদ্ধত্য হয়ে যায়। কিন্তু এখন সময়ও নেই বিস্তারিত আলোচনার, তোমার এই অনুবাদটার সাথে সাথে আরেকবার হেগেল নিয়ে নাড়াচাড়া করেই না হয় আরো বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকা যাবে। এর পরের অংশে মার্ক্স আসলে আলোচনাটা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রইল। তুমি ব্যক্তিগতভাবে ‘ব্যক্তি নৈতিকতা’ নিয়ে কী ভাবো সেটা জানারও ইচ্ছা রইল।

    • শিক্ষানবিস July 15, 2015 at 3:52 am - Reply

      ঘোষণা দিয়ে সারকাজম এর একটা নতুন নাম দেয়া উচিত। এটাকে শুধু সারকাজম বললে মানায় না। 😀
      আমি আশা করেছিলাম মাথা যেহেতু ঘুরে সেহেতু এই সময় ভাববাদ গিলতে আপনার আগের চেয়ে সুবিধা হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে ডিলিউশনের মধ্যেও আপনার ভাববাদ অ্যালার্ট ঠিকমতোই কাজ করে। 😀

      ১।
      আপনি বলতে চাচ্ছেন: প্রতিটি ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন বিবেকের গড় হিসেবে সমাজের বিবেক প্রকাশিত হয়, এবং বলেছেনও ব্যাপারটা এত সরল না। এবং আমাদের আসলেই আরো জটিলতার দিকে তাকানো উচিত। কারণ ব্যাপারটা তো এমন না যে, প্রতিটি ব্যক্তি আসমান থেকে একটা বিবেক নিয়ে সমাজে এসে জুড়ে বসেছে এবং তারপর সবার উড়ে এসে জুড়ে বসা বিবেকগুলোর গড় সমাজে প্রকাশিত হচ্ছে। বরং প্রত্যেকের বিবেকই সেই সমাজ থেকেই ধার করা যেই সমাজের সার্বিক বিবেক তাদের বিবেকের গড় দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। প্রটেস্ট্যান্ট নৈতিকতা আসার আগে ইউরোপে অধিকাংশ মানুষই সামাজিক বিবেক দ্বারা চালিত হতো; তারা যেটাকে নিজেদের বিবেক বলে দাবী করত সেটাও আসলে তাদের অজান্তেই ছিল পুরোমাত্রায় সামাজিক, তারা প্লেজারিজম করত কেবল। আর এখানে কিন্তু কেবলই ইউরোপের কথা হচ্ছে। ইউরোপের ইতিহাসের দিকে তাকালে এই ব্যাপারটা আসলেই দেখা যায়। অন্যদের কথা জানি না।

      ২।
      প্রশ্ন করার মানসিকতা বলতে এখানে কিন্তু একেবারে “যুক্তি” বুঝানো হচ্ছে। সক্রেটিসপূর্ব দার্শনিকদের হাত ধরে সক্রেটিস আসার আগ পর্যন্ত কিন্তু পৃথিবীর কোথাও পুরাণ-নিরপেক্ষ বিশ্বমডেল ছিল না। গ্রিসের মিলেতুসের দার্শনিকদের আগ পর্যন্ত সর্বত্রই মহাবিশ্বকে দেবতাদের পুরাণ দিয়ে রূপকার্থকভাবে ব্যাখ্যা করা হতো। মিলেতুসের অভ্যুত্থান থেকে এরিস্টটল পর্যন্ত ৩০০ বছরে যা ঘটেছে সেটাকে হুট করে “প্রশ্ন করার মানসিকতা”-র উদ্ভব বলাই যায় যদি প্রশ্ন করার মানসিকতা বলতে আমরা বিশেষভাবে পুরাণ-নিরপেক্ষ যৌক্তিকতার কথা বলি। সংজ্ঞাগুলো ঠিক করতে হবে আগে।

      ৩।
      ব্যক্তি-নৈতিকতা না বলে ব্যক্তি-বিবেক বলি। আমার বর্তমান ধারণা হচ্ছে, আমি কোনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিই নই যে আমার একটা বিচ্ছিন্ন বিবেক থাকতে পারে। আমার বিবেকের ৯০ শতাংশই আসলে সামাজিক, বৈশ্বিক বা আরো বড় অর্থে বললে মহাবৈশ্বিক। এখানে আমার একটা বড় ভূমিকা আছে, কিন্তু ভূমিকাটা সৃষ্টিকর্তার না (কারণ আমি কিছু সৃষ্টি করছি না) বরং ব্যবহারকারীর। আমি সামষ্টিক বিবেকের বিভিন্ন অংশ ক্ষেত্রবিশেষে নিজের মতো সাজাতে পারি, কিন্তু আমি কিছুই সৃষ্টি করতে পারি না, এবং অধিকাংশ সময় সামাজিক বিবেকটাই নিজের অজান্তে প্রয়োগ করি। আত্মসচেতনতার অভাব আছে আমার মনে হয় অধিকাংশ মানুষের মধ্যে।

    • নামহীন July 21, 2015 at 1:24 pm - Reply

      দারুন!

  5. তন্ময় July 21, 2015 at 5:24 pm - Reply

    চিন্তার ক্ষেত্রে অন্তত দুইজন জার্মান দার্শনিকের কাছে মার্কস-এঙ্গেলস চিরঋনী থাকবেন। তাঁদের একজন হেগেল, আর একজন ফয়েরবাখ।

    দর্শনের ইতিহাসে মার্কসবাদের অনেক আগেই দ্বন্দ্বতত্ত্ব ও বস্তুবাদের উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু প্রাক-মার্কসবাদী এসব দর্শনের ত্রুটি এই যে সেখানে দ্বন্দ্বতত্ত্ব ও বস্তুবাদকে আলাদা করে দেখা হতো। যেমন হেগেল ছিলেন দ্বান্দ্বিক ভাববাদী অন্যদিকে ফয়েরবাখ ছিলেন যান্ত্রিক বস্তুবাদী। মার্কসীয় দর্শনেই সর্বপ্রথম দ্বন্দ্বতত্ত্ব ও বস্তুবাদের মধ্যকার এ ব্যবধান দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে দর্শনের ক্ষেত্রে এক অখণ্ড বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এ অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই মার্কসীয় দর্শন আগের সব দর্শন থেকে গুনগতভাবে আলাদা।

    আলোচনাটা চলুক। ভালই লাগছে।

Leave A Comment