নামে কি আসে যায়, কিম্বা গাফফার খেদাও আন্দোলনের অসারতা

By |2015-07-06T19:55:10+00:00জুলাই 6, 2015|Categories: ব্লগাড্ডা|20 Comments

আমার নাম মোঃ আশরাফুল আলম। Md. Ashraful Alam. বাংলায় বিসর্গ, আর ইংরেজীতে ডট। বাপের রাখা নাম। মোঃ এর পুর্ণ রুপ কেন দিল না, সেইটা কোন রহস্য না – আমার আমলে শতকরা ৫০ ভাগ বাঙালি মুসলমান ছেলের নামেই মোঃ থাকত। ইদানিং অবশ্য মোহাম্মদ, মুহাম্মদ, মুহাম্মাদ ও মুহম্মদ দেখি বেশি।

আমাদের আমলে একবার এই বিসর্গ আর ডট নিয়ে বিরাট এক সমস্যা দেখা দিল। বিসিএস এর প্রিলিমিনারী পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পরীক্ষার ফরম পূরণ করার সময় বৃত্ত ভরাট করতে গিয়ে এমডি এর পরে ডট পূরণ করব নাকি স্পেস দেব, সেই প্রশ্নের কোন সদুত্তর পাই নি কারো কাছে। সে বছরই এই সব কম্পিউটার প্রযুক্তি নতুন চালু হয়েছে পরীক্ষা পদ্ধতিতে। এমসিকিউ পরীক্ষার খাতাও নাকি দেখা হবে কম্পিউটারে। আমরা বেশ ভয়ে ভয়ে আছি। রেজাল্ট হওয়ার আগে গুজব শোনা গেল, যারা নামের এমডি’র পরে ডট পূরণ করেছে, তারা নাকি কম্পিউটারের ডাটাবেজ থেকে বাদ পড়ে যাবে, অর্থাৎ তাদের খাতা দেখাই হবে না। এই ডটের কারণে নাকি কম্পিউটারের লজিক উলটাপালটা হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। রেজাল্ট হওয়ার পরে দেখা গেল, সে সব নিছক গুজব ছিল। তবে আমাদের নামের মধ্যে বিসর্গ বা ডটের উপদ্রব নিয়ে বেশ মানসিক অশান্তিতে ছিলাম কয়েক সপ্তাহ।

প্রবাসে এসে ইদানিং অশান্তি বেড়েছে। অনেকেই জিজ্ঞেস করে, এমডি মানে কি ডক্টর অফ মেডিসিন? না, আমার বাপের জন্মে কেউ মেডিসিন পড়ে নি, কিন্তু কে শোনে কার কথা? একবার ইন্টারপ্রেটিং করতে গেলাম। কর্তব্যরত অফিসার আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তার দুই মক্কেলের সাথে, দিস ইজ এমডি, এন্ড দিস ইজ এমএসটি। যারা ভুলে গেছেন, এমএসটি মানে মোসাম্মাত। অনেকের নামে এমএসটি আকারেই থাকত। এমএসটি এক্রোনিমের আসল অর্থ আমার আজো জানা হয় নি।

তুরুষ্কের বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা আমার নাম দেখেই সালাম দিয়ে বসে। ব্রাদার বলে কাছে ডাকে, নামাজে ডাকে। তাদেরকে আশাহত করতে হয়। তবে ওরা তার চেয়ে বেশী আশাহত হয় আমাদের ভারতীয়দের নামে মোহাম্মদের পূর্ণরুপ না দেখে। ওদের দেশে মোহাম্মদ শব্দটা নামের আগে বসানো কোন অলংকার নয়, মোহাম্মদ একটা প্রপার নাউন। মানুষের নাম। এমডি লেখা নাকি রাসুলের জন্য অসন্মানের ব্যাপার। হতেও পারে। আমার নাম রাখার সময় রাসুলের সন্মান বিবেচনা করা হয়েছিল কি না তা আজ আর জানার উপায় নেই।

পশ্চিমা দুনিয়ায়, বিশেষ করে ইংরেজী-ভাষী দেশগুলিতে, মানুষের নামের প্রথম অংশ ও শেষ অংশ আলাদা আলাদা কাজে ব্যবহ্রত হয়। বাংলাদেশে কারো নাম মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম / রফিকুল ইসলাম হলে তাকে সবাই রফিকুল বলে ডাকবে, আবার কারো নাম মোহাম্মাদ রফিক হলে তাকে রফিক বলে ডাকবে। অর্থাৎ নামের প্রথম, মধ্য অথবা শেষ, যে কোন অংশ ধরেই ডাকা হতে পারে, তার নামের উপরে নির্ভর করে। পশ্চিমে মানুষ একে অপরকে নামের প্রথম অংশ ধরে ডাকে, মোটামুটি বড় রকমের ব্যতিক্রম ছাড়া। এই রকম একটি ব্যতিক্রম হল, খুব সন্মানিত কাউকে তার নামের শেষাংশ দিয়ে ডাকা যায়, তবে তার আগে সন্মানসুচক মিস্টার/মিসেস লাগাতে হয়। যেমন, বারাক হুসেইন ওবামাকে তার বন্ধুরা বারাক বলে ডাকবে, কিন্তু মিডিয়াতে অথবা হোয়াইট হাউসের কলীগেরা তাকে মিস্টার ওবামা বলে সম্বোধন করবে। এর ফলে আমাদের দেশের মানুষেরা দেশের বাইরে এলে অনেকেই নাম নিয়ে বিড়ম্বনাতে পড়েন। যার নাম কাজী মকবুল হোসেন, তাকে সবাই বলে কাজী; যার নাম মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম, তাকে সবাই বলে মোহাম্মদ। আসল নাম ঢাকা পড়ে যায় সম্বোধন ও নামকরনের এই নতুন তরিকার পাল্লায় পড়ে। খুশবন্ত সিং এই নিয়ে লিখেছিলেনঃ “লন্ডনে একবার এক ফিরিঙ্গী আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি বলেছিলাম, আমার নাম সিং। সেই ফিরিঙ্গী খুশী হয়ে বলল, নাইস টু মিট ইউ। আমি ভারতে গেলে আপনার সঙ্গে দেখা করব, মিস্টার সিং। ভালো কথা। তবে ওই বেটা ফিরিঙ্গী তো আর জানে না যে, ভারতে কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন মানুষের নাম সিং। কাজেই, আমাকে খুঁজে পাওয়া ওর পক্ষে দুস্কর”। এই প্রবাসে আসার পর আমার ক্ষেত্রেও ওই একই অবস্থা। আমার পিত্রদত্ত নাম হল মোঃ আশরাফুল আলম, কিন্তু সবাই আমাকে ডাকে এমডি বলে। আমি বলি, এই নাম তো আর আমার একার নয়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৮ কোটি হল পুরুষ, যার মধ্যে ৭ কোটিই হল মুসলমান, এবং তাদের কমপক্ষে ২-৩ কোটি মানুষের নামেই এমডি বা মোহাম্মদ শব্দটা আছে।

একবার আমি আমার এক বন্ধুর সঙ্গে এক সরকারী অফিসে গেলাম একটা কাজের জন্য। আমরা দুইজনেই আমাদের কাগজপত্র জমা দিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। ঘটনাক্রমে, আমার ওই বন্ধুর নামও আমার নামের মতই, মোঃ রফিকুল আলম, অর্থাৎ একই ফার্স্ট নেম ও লাস্ট নেম। আমাদের দুজনেরই নাম মোঃ আলম, অফিসিয়াল সব কাগজ-পত্রে। যখন কাউন্টার থেকে ডাকা হল, এমডি আলম, আমরা দুইজনেই এগিয়ে গেলাম। পরে ওই কর্মকর্তাকে আমাদের দেশীয় নামকরনের উপরে একটা লেকচার দিতে হয়েছিল এই ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য। ভাবুন একবার, নামে কত কিছু আসে যায়!

আমার দুই ছেলের জন্ম বাংলাদেশে। এই প্রবাসে এসে আবার ওদের নাম নিয়ে ঝামেলায় পড়লাম। আমাদের দেশে অনেকের নাম শুরু হয় পদবী দিয়ে, যেমন সৈয়দ আলী আশরাফ, শেখ হাসিনা, খন্দকার হাসান মাহমুদ ইত্যাদি। হাসান মাহমুদ খন্দকারের চেয়ে খন্দকার হাসান মাহমুদ একটু বেশী ফ্যাশনেবল, অন্তত আজকালকার মানদন্ডে। সেই সুত্র ধরে আমার যমজ ছেলেদের নামেও খন্দকারটা রেখেছি প্রথমেই, খন্দকার ফাইয়াজ তানজীম ও খন্দকার সাদাত তানবীর। এই দেশে আসার পরে এক কলীগ আমাকে বলল, তোমার ছেলেদের গার্লফ্রেন্ডেরা খুব বিপদে পড়বে, কোন খন্দকারকে খুঁজতে গিয়ে কোন খন্দকারকে পাবে তা বুঝতে পারবে না। চেহারাও প্রায় একই রকমের। নামটাও যদি এক হয়, তাহলে তো মহা মুসিবত। ছেলেরা স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই ওদের নাম পাল্টাতে হবে। হাজার হোক, ছেলেদের গার্লফ্রেন্ডদেরকে তো আর বিপদে পড়তে দেওয়া যায় না!

কৌতুক রেখে কাজের কথায় আসি। আমাকে অনেকে বলেন, ধর্মকর্ম করেন না, কিন্তু নাম তো মুসলমানের বাচ্চার মত! আমি বলি, আমার বাপ তো ভবিষ্যত দেখতে পারতেন না। তাছাড়া, আপনাদের নবীর নাম যদি ইসলামের আগেই রাখা হয়ে থাকে, এমনকি বেশিরভাগ সাহাবীর আইয়ামে জাহেলিয়াতের নামই ইসলামের আমলেও বহাল থাকে, তাহলে আমি আর দোষটা করলাম কোথায়? আত্নপক্ষ সমর্থন করতে উদাহরণ দেই, সাদ্দামের আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারেক আজিজ ছিল ক্যাথলিক খ্রীস্টান। কিম্বা লেবানন-মিশরে আশরাফ নামের অনেক অমুসলিম আছে। তাতে আমার দূর্নাম আরো বাড়ে ধার্মিক বুজুর্গ মহলে।

নামে যে কিছু আসে যায় না, সে কথায় কারো দ্বিমত না থাকলেও একটা সুন্দর ও অর্থবোধক নাম সবাই পছন্দ করেন। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, তা আগের মতই সুরভী ছড়াবে, যদিও এই যুক্তি গোলাপের নামের সৌন্দর্য্যকে অস্বীকার করে না কিংবা সুন্দর নামকে অপ্রয়োজনীয়ও মনে করে না – সুন্দর সুরভীর পাশাপাশি সুন্দর একটা নাম থাকলে ক্ষতি কি? অনেকে অবশ্য মনে করেন যে ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ রাখাটা একটা বাড়াবাড়ি, তবে তারা ভুলে যান যে কানা ছেলের নাম ‘কানাবাবু’ রাখাটা আরো বেশি রকমের বাড়াবাড়ি। চোখ না থাকুক, অন্ততঃ একটা সুন্দর নাম থাকতে তো বাধা নাই।

নামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হল যে, এটা কোন বস্তুর নিজস্ব গুন নয়, এটা বাইরে থেকে আরোপিত। এ পৃথিবীতে অবস্থিত সকল প্রকার বস্তুর একটা নাম আছে। নামবিহীন কোন কিছু কল্পনা করা যায় না – কঠিন, তরল বা বায়বীয় যাই হোক না কেন। মানুষ যখন থেকে বুঝতে শিখেছে এবং ভাষার ব্যবহার আয়ত্ব করেছে, তখন থেকেই তারা আশেপাশের সবকিছুকে নাম দিয়েছে, কারন নাম ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্বকে বর্ননা করা যায় না। এই নামগুলো ভাষার কারসাজি – আর তাই একই জিনিসের নাম হাজার ভাষায় হাজারো রকমের। আমরা বলি ‘ভালোবাসা’, ভারতীয়রা/পাকিস্তানীরা বলে ইশক, ইংরেজরা বলে লাভ, ইতালিয়ানরা বলে ‘আমোর বা আমো’। আবার, আমাদের ভাষায় যাকে আমরা পাহাড় বলি, তাকে যদি নদী বলতাম, আর নদীকে পাহাড় বলতাম, তাতে এমন কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হত না। তখন হয়তো বলতে হত ‘পাহাড়ে বান ডেকেছে’ অথবা ‘গারো নদীতে বাস করে উপজাতীয়রা’ – পার্থক্য বলতে এইটুকুই। এখন বলি ‘পাহাড়সম বাধা’, তখন বলতাম ‘নদীসম বাধা’। তবে মজার ব্যাপার হল, নাম আদতে আলগা জিনিস হলেও সময়ের সাথে সাথে তা বস্তুর উপরে স্থায়িত্ব পেতে থাকে, ফলে তাকে সহজে বদলানো যায় না। সমাজে যে নাম প্রচলিত হয়ে যায়, তার একটা সহজাত অর্থ এবং ব্যঞ্জনা ভাষায় স্থান লাভ করে, ফলে তাকে বদলানো ভয়ানক কঠিন। পাহাড়কে নদী আর নদীকে পাহাড় বললে ক্ষতি নেই, তবে তা আজ প্রায় অসম্ভব। শুরুতে যা ছিল আরোপিত, আজ তা ঐ বস্তুগুলির সুনির্দিষ্ট পরিচয় বহন করে। হাজার বছর ধরে আমরা যা বলে আসছি, তাকে উপেক্ষা করে আমি যদি আজ লিখি ‘বর্ষার পানিতে পাহাড়ের দুকুল উপচে পরছে’ তাহলে সবাই ভাববে আমি হয়তো পাগল নয়তো ভাষায় নিতান্তই অপটু।

নামের মাহাত্ন্য এখানেই। নাম আরোপিত, তবে তা একবার আরোপ করা হয়ে গেলে হয়ে যায় স্থায়ী, আর সেই নামেই সবাই তাকে চেনে। মানুষের নামের বেলায়ও এটা শতভাগ প্রযোজ্য। কাজেই, নামকরন ব্যাপারটা বেশ গুরুত্ব বহন করে, বলা বাহুল্য।

যুগে যুগে মানুষ তাদের নবজাতকের নাম রেখেছে কিছু সাধারন নিয়ম অনুসরন করে, যেমন তাদের প্রিয় মানুষের নামে, অথবা সেই যুগের বা আগের যুগের কোন মহান ব্যক্তিত্বের নামে, অথবা ধর্মীয় সাধুপুরুষদের নামে, অথবা তাদের নিজেদের ভাষার কোন অর্থপুর্ন শব্দ থেকে। এর ব্যতিক্রমও প্রচুর। তবে এই সাধারন নিয়মের প্রতিফলন আমরা দেখি আজকের দুনিয়ায় – নাম শুনেই আমরা বলতে পারি কে জাপানিজ, কে ভারতীয়, কে জার্মান আর কে আফ্রিকান। তবে ধর্মের সঙ্গে নামকরনের একটা সম্পর্ক থাকায়, একই নাম সুদানের মুসলমান অথবা বাংলাদেশের মুসলমান উভয়েই গ্রহন করতে পারেন। একইভাবে, সংস্কৃত নাম যেমন ভারতীয় হিন্দু বুঝাতে পারে, তেমনি বাংলাদেশি বা পাকিস্তানী মুসলমানও বুঝাতে পারে, কারন এই তিনটি দেশের ধর্ম আলাদা হলেও এদের ভাষা (হিন্দি, উর্দু ও বাংলা) সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত। আবার, ফিলিপাইন দীর্ঘদিন স্পেনের উপনিবেশ ছিল বলে সেখানে অনেকে তাদের ছেলেমেয়েদের স্প্যানিশ নাম রাখতো। দক্ষিন ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে খ্রীস্টান মিশনারীদের অনেক ততপরতা থাকায় ওখানে অনেক মানুষ খ্রীস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়, এবং তাদের মত করে সন্তানদের নামকরন করতে থাকে। আজকে সেখানে রাহুল রোজারিও, বেলা জর্জ, অরবিন্দ ডি সিলভা কিংবা প্রবীন ফার্নান্ডেজ ধরনের নাম বহুল প্রচলিত।

খ্রীস্ট ধর্মে নামকরনের সময় প্রাচীন সাধুপুরুষদের নাম বহুল ব্যবহ্রত, যেমন মাইকেল, ডেভিড, আব্রাহাম, জোসুয়া ইত্যাদি। ইসলাম ধর্মে ব্যবহার হয় আল্লাহ ও নবী-রাসুলদের গুনবাচক নাম – যেমন আহম্মেদ, মোহাম্মদ, আব্দুল মালেক, আব্দুল খালেক, ইত্যাদি। আবার, প্রাচীন আরবে সমাজ ছিল পিত্রতান্ত্রিক, যেখানে সন্তানের মাতার পরিচয় ছিল গৌন। পিতার পরিচয়েই সন্তানেরা সমাজে পরিচিত হত, আর তাই সন্তানের নামের সঙ্গে পিতার নাম জুড়ে দিয়ে নামকরনের প্রথা ছিল সেখানে। উদাহরনঃ উমর ইবনে আব্দুল খাত্তাব, অর্থাৎ আব্দুল খাত্তাবের পুত্র উমর। হিন্দু ধর্মে নামকরন হত দেব-দেবীর নামে অথবা অর্থপূর্ণ শব্দ দিয়ে, তবে তা ছিল সমাজের বর্নভেদ প্রথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এবং কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে সেগুলো মানতে বাধ্য করা হত সবাইকে। এই ব্যাপারে সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যের শক্তিমান পুরুষ, নিম্ন-বর্গীয় হিন্দু বংশোদ্ভুত, জনাব হরিশংকর জলদাসের আত্নকথা ‘কৈবর্তকথা’ থেকে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা যায়ঃ

“আচারনির্ভর হিন্দু সমাজের সংবিধান হল মনুসংহিতা, যে গ্রন্থে ঋষি মনু শিশুদের নামকরণের ক্ষেত্রে কড়া নির্দেশ জারি করেছেনঃ ব্রাহ্মণসন্তানের নাম হবে মঙ্গলবাচক, বৈশ্যের ধনজ্ঞাপক, ক্ষত্রিয়ের বলসূচক এবং শুদ্রসন্তানের নাম হবে ঘৃণাজনক। এই নির্দেশানুসারে আমার নাম হওয়া উচিত ছিল ‘কফ জলদাস’ অথবা ‘বিষ্ঠা কৈবর্ত্য’। কিন্তু আমার বাবা সন্তানের নাম রাখতে গিয়ে বিদ্রোহী হলেন। তিনি তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রাখলেন হরিশংকর অর্থাৎ ব্রাহ্মণ সন্তানের নামের সমতুল্য নাম রাখলেন তিনি। তাঁর বাবা চন্দ্রমণিও মহাভারতের বিশিষ্ট ক্ষত্রিয় চরিত্রের নাম অনুসারে তাঁর একমাত্র সন্তানের নাম রেখেছিলেন যুধিষ্ঠির। এটা হিন্দু সংবিধানবহির্ভূত সিদ্ধান্ত। এইভাবেই এই জেলে পরিবারটি ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহের কথা জানিয়ে দিয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগে।“

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাটক-উপন্যাস-ছোটগল্পে চরিত্রদের নামকরন করতেন রুচিপূর্ণ ও সুন্দরভাবে, যেকারনে এই নামগুলো বাঙ্গালীসমাজে প্রচন্ড রকমের জনপ্রিয়। ধর্ম নির্বিশেষে আজকে আপনি লাবন্য, প্রভা, সুনয়না, বৈশাখী, সৌরভ, সুরভী, কৃষ্ণকলি, সবিতা, শুভ্রা, সেঁজুতি, সুজাতা এই নামগুলি বাংলাদেশে ও পশ্চিম বাংলায় খুঁজে পাবেন। কলকাতায় অনেক মানুষ তাদের সন্তানের জন্মের পরে কবিগুরুর দ্বারস্থ হতেন শিশুর নামকরনের জন্য। সাধারন মানুষতো বটেই, এমনকি ততকালীন সরকারও তার দ্বারস্থ হয়েছিলেন কলকাতা বেতার ও টেলিভিশনের আনুষ্ঠানিক নামকরনের জন্য। কবিগুরু কলকাতা বেতারের নাম দিলেন আকাশবানী, আর টেলিভিশনের নাম দিলেন দূরদর্শন। পরবর্তীতে দূরদর্শন শব্দটি অল-ইন্ডিয়া টেলিভিশনের নাম হিশেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

শেষের কবিতা উপন্যাসে নাম নিয়ে একটা মজার ধারনা এসেছে। নায়ক ‘অমিত রায়’ সমকালীন ফ্যাশনে নামটাকে একটু পালটিয়ে ‘অমিত রে’ করেছিল, এবং এর ব্যাখ্যা হিশেবে বলেছিল যে, নাম যত ছোট হবে, অন্যদের মনের গভীরে সেটা ততই ত্বরিত গতিতে প্রবেশ করবে। বস্তুর ভর কম হলে, যদি ভরবেগ একই থাকে, বেগ বেশী হওয়াটাই স্বাভাবিক। আকাট্য যুক্তি। আজকে আমরা যে আদর করে হুমায়রাকে বলি হুমা, ক্রিস্টোফারকে বলি ক্রিস, জোহরাকে বলি জোহু,মাশরাফীকে বলি ম্যাশ, আর শাবনাজকে বলি শাবা বা শাবু, সেটা এই নামের আপেক্ষিকতারই প্রতিফলন।

মুসলিম সমাজে জন্মানো প্রত্যেক শিশুর নামকরনের বেলায় অর্থপূর্ণ এবং শ্রুতিমধুর নাম রাখা প্রতিটি অভিভাবকের ধর্মীয় কর্তব্য। সুন্দর নাম রাখা মা-বাবার নিকট শিশুর প্রাপ্য অধিকার। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, “পিতার উপর নবজাতকের হক হলো তার জন্য সুন্দর নাম রাখা” (মুসলিম শরীফ)। আবু হুরাইরা নামের অর্থ অবশ্য বিড়ালের পিতা। প্লিজ হাসবেন না।

কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে গিয়ে মুসলমানরা কিছু ভুল করে ফেলছেন। লক্ষ্য করা গেছে যে অনেকেই সন্তানের নাম রাখার সময় আল্লাহতায়ালার পবিত্র নাম সমূহের সাথে মিলিয়ে রাখেন। যেমন-আব্দুল খালেক, রিয়াজ বিন খালেক ইত্যাদি। এখানে ‘খালেক’ নামটি আল্লাহতায়ালার পবিত্র নামসমূহের একটি।‘খালেক’ নামের অর্থ হচ্ছে ‘স্রষ্টা’ এবং আল্লাহতায়ালাই এই নামের অধি্কারী হতে পারেন, অন্য কেউ হতে পারে না। সেক্ষেত্রে একজন মুসলমানের নাম আব্দুল খালেক অর্থাৎ ‘স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তার চাকর বা বান্দা’ হওয়াটাই শ্রেয়। রিয়াজ বিন খালেক অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তার পুত্র রিয়াজ হতে পারে না। আবার আমরা নাম রাখলাম ঠিকই আব্দুল খালেক, অথচ ডাকার সময় ডাকলাম ‘খালেক সাহেব’ বা ‘খালেক ভাই’। প্রতি উত্তরে যিনি আব্দুল খালেক তিনিও খালেক সাহেব বা ভাই বলে তাকে ডাক দেওয়ায় কথপোকথন চালিয়ে যান। কিন্তু কোনো ব্যক্তি কি ‘খালেক’ হওয়ার উপযোগী? ইসলামের দৃষ্টিতে তো কখনোই নয়।

আরবী নামের ক্ষেত্রে আবার গ্রামারের গ্যাঁড়াকলে পড়ে নাম বা নামের অর্থ বিকৃত হতে পারে। আশরাফুল আলম এর অর্থ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ, কিন্তু এই নামের আসল রুপ হল আশরাফ-উল-আলম। ‘উল’ হল কঞ্জাংশান। কাজেই, শুধু ‘আশরাফুল’ শব্দটা পূর্নাঙ্গ নয় (আশরাফুল মানে best of … …, যেখানে প্রশ্ন জাগে, best of / best amongst what?), আশরাফ বা আশরাফুল-আলম বললেই কেবল সেটা অর্থবোধক হতে পারে। রফিকুল ইসলাম / হামিদুল ইসলাম জাতীয় সকল নামের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। হয় রফিক, নয় রফিকুল ইসলাম, কিন্তু রফিকুল অর্থহীন।

আজকের দুনিয়ায় নাম মানুষের পরিচয় বহন করে। নাম দিয়ে অনেক সময় মানুষের ভাষিক পরিচয়, ধর্ম, এমনকি জাতীয়তাও জানা যেতে পারে। এই নামগুল একটু পরখ করে দেখুনঃ তাকাশিগো মুরাকাশি, চ্যাং জুন লাই, আলবার্তো রোমারিও, মোহাম্মাদ মুবাশশের আহমেদ, ইন্দ্রমোহন কৃষ্ণমুর্তি, মাইকেল জ্যাকসন, গ্রায়েম স্মিথ, আবু সুফিয়ান ইবনে কুরাইশ, পিটার ভন ডি বোরেন, এনকালা মুগাবে, শেখ জাওয়াহিরি আল মাহমুদ ইবনে আব্দুল আজিজ মাশায়েখ, সের্গেই নোব্রাভস্কি। আশা করি বিষয়টা ধরতে পেরেছেন। তবে নিয়ম যেখানে আছে, ব্যতিক্রমও সেখানে আছে। একসময় পিত্রতান্ত্রিক সমাজে সন্তানকে পিতার পরিচয়ে পরিচিত করার জন্য সন্তানের নামের শেষে পিতার নামের একটা অংশ জুড়ে দেওয়া হত, এবং বংশ-পরস্পরায় তা চলতে থাকতো। এভাবে ফ্যামিলী নামের প্রথা চালু হয়। আবার অনেক পরিবার রাজ-রাজড়াদের আনুকুল্যে কোন সন্মানসুচক পদবী পেলে তা বংশ-পরস্পরায় ব্যাবহার করা হত। অনেক সময় জন্মস্থানকেও পরিচয়সুচক পদবী হিসেবে ব্যবহার করা হত, ফলে পরে তা ফ্যামিলী নেম-এ রুপান্তরিত হত, যেমন রাবেয়া বাসরী – ইরাকের বসরার অধিবাসী, আব্দুল কাদির জীলানি – পারস্যের জীলানের অধিবাসী, জওহরলাল নেহরু (নেহরু অর্থ নদীপাড়ের বাসিন্দা। নেহেরুর দাদা কাশ্মীর থেকে দিল্লীতে মাইগ্রেশন করে এলে তাদেরকে বলা হত ‘কাশ্মীরের নদীর পাড় থেকে আসা’ তথা নেহেরী, এবং কালক্রমে নেহেরু, সবশেষে নেহরু)। আজকাল আর এই ব্যাপারটা ততটা মানা হয় না, তবে অনেকেই এখনও অনেকটা গর্বের সঙ্গে তাদের বংশ-পদবী ব্যবহার করে থাকেন। বাংলাদেশ/ভারতে এই পদবী অনেক সময় সামাজিক অবস্থানের পরিচয়জ্ঞাপক। তালুকদার মানে ছোট জমিদার, সৈয়দ মানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা খানদানী মুসলিম বংশের লোক (অনেকে বলেন, সৈয়দরা কুরাইশদের বংশধর), মন্ডল মানে মাতব্বর বা গ্রামের অভভাবক-স্থানীয়, ভট্টাচার্য্য বা চৌধুরীরা অভিজাত, জলদাস/ফকিররা নিচুজাত। পেশা থেকেও পদবী হতে পারে, যেমন দুকানওয়ালা, লোখন্ডওয়ালা (লৌহ খন্ড ওয়ালা অর্থাৎ লোহার কারবারি), ঝুনঝুনিওয়ালা, পাতর (জেলে বা জলদাস) ইত্যাদি। প্রায় দুহাজার বছর আগে যীশুখ্রিস্ট যাকে সর্বপ্রথম খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল পিটার। পিটার ছিলেন মৎসজীবী। পরবর্তীকালে সেই খিস্ট্রধর্মালম্বী ব্রিটিশরা এদেশে পেশাভিত্তিক আদমশুমারি করার সময় বাউরি, চর্মকার, জেলে, মেথর প্রভৃতিকে তফসিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত করেছিল। এই সময় ব্রিটিশরা জেলেদের পদবি লিখল-পিটার। ‘পিটার’ শব্দটি পরে অপভ্রংশ হয়ে ‘পাতর’ এ রূপান্তরিত হলো। ব্রিটিশ আমলের জেলেদের জায়গা-জমির দলিলে ‘পাতর’ পদবির সন্ধান মেলে। যেমন : চন্দ্রমনি পাতর, যুধিষ্টির পাতর।

আল্লাহর ৯৯ নাম গুনবাচক নাম। এই সবগুলো নাম ইসলামপূর্ব যুগে পৌত্তলিক দেবতাদের গুনবাচক নাম হিসাবে এই নামগুলোর ব্যবহার হয়ে থাকত। কেউ কেউ ১০১ নামের কথাও বলেন। প্রাচীন কালে একটা বিশ্বাস ছিল যে আল্লাহ বেজোড় সংখ্যা পছন্দ করেন। এই বিশ্বাসটি খুব সম্ভবত প্রাচীন পারস্য থেকে পাওয়া। পারস্যের জোরাস্ট্রিয়ান ধর্মাবলম্বিরা তাদের খোদা আহুরা মাজদা’র ১০১টি গুনবাচক নামের লিস্ট বানিয়েছিল। খুব সম্ভবত প্রি ইসলামিক আরব নয়, বরং প্রি ইসলামিক পারস্যের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবেই ইসলামে আল্লাহর ৯৯টি নামের লিস্ট প্রচলিত হয়েছিল। আব্দুল গাফফার চৌধুরী নিউ ইয়র্কে যা বলেছেন সেটা কোন বক্তৃতাবাজী না, একটা একাডেমিক তথ্য। বাঙালির জাতীয়তা, পরিচয়ের সংকট, ভাষার ব্যবহার, ইত্যাদির অতীত বর্তমান ও বিকাশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাকে এগুলো বলতেই হত।

তিনি না বললেও অবশ্য আবু হুরায়রা মানে বিড়ালের পিতাই হবে, আর আবু বকর মানে গাভীর পিতা কিম্বা ছাগলের পিতাই থেকে যাবে। আবদুল গাফফার চৌধুরী ভুল কিছু বলেননি বা নতুন কিছুও বলেননি। এর কিছুই ইসলামের ইতিহাসের পাঠকদের অজানা নয়। আরবিতে ইসলামপূর্ব নাম বা অন্যান্য শব্দই ইসলামি টেক্সটগুলিতে ব্যাবহার হয়েছে। শব্দের কোন ধর্ম নাই এবং শব্দের ধর্মান্তরও হয়না। জল আর পানি নিয়ে যে রাজনীতি, তা কেবল একটা অতিমূর্খ ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীকেই মানায়।

নামের কারনে মানুষ সমাজে নন্দিত বা নিন্দিত হতে পারে, আর সেই কারনে নাম পরিবর্তন করে সমাজের বৃহত্তর অংশের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অথবা এ থেকে সুবিধা আদায়ের প্রবনতা চালু আছে ইতিহাসের আদিকাল থেকেই। আমেরিকায় যাওয়া অভিবাসীদের দ্বিতীয় বা তত-পরবর্তী প্রজন্মের উপরে চালিত এক গবেষনায় এই ধারার ইম্পিরিক্যাল তথা তথ্য-ভিত্তিক প্রমান মিলেছে। অতি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরাস্থ অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক প্রফেসর গবেষনা করেছেন সেদেশের কাজের ক্ষেত্রে্ অর্থাৎ কিনা জব-মার্কেটে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের নামের কোন প্রভাব আছে কি না তা নিয়ে। চমকপ্রদ ফলাফল পেয়েছেন তিনি। তিনি একই দরখাস্ত অনেক কপি করেছিলেন বিভিন্ন রকমের নাম দিয়ে, আর তারপরে সেই দরখাস্তগুলো দিয়ে একই চাকুরীর জন্য আবেদন করেছিলেন। দেখা গেল, ইঙ্গ-মার্কিন নামধারী চাকুরীপ্রার্থীরা অনেক বেশি সাড়া পাচ্ছেন, অথচ ইতালীয়ান/গ্রীক/চীনা/ভারতীয়/আফ্রিকানরা সাড়া পাচ্ছেন অনেক কম। এই পরবর্তী দলের মধ্যে আবার ইতালিয়ানরা ও গ্রীকরা সাড়া পাচ্ছেন তুলনামুলকভাবে বেশি, চীনারা আর একটু কম, আর ভারতীয়/আফ্রিকানরা সবচেয়ে কম। উক্ত গবেষনায় আবার অস্ট্রেলিয়ায় এই বিভিন্ন দেশের মানুষের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে এই চাকুরীর আবেদনের সাড়া পাওয়া-না পাওয়ার ধনাত্নক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সেটা স্বাভাবিক, বলাই বাহুল্য।

অতি সম্প্রতি, বিন-লাদেন ইফেক্টের কারনে, পশ্চিমা দুনিয়ায় খাঁটি আরবী নাম আবার এক ধরনের বিড়ম্বনার সুত্রপাত ঘটাচ্ছে। শুধু নাম নয়, এর সঙ্গে বেশভুষা এবং শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট (যেমন লম্বা দাড়ি রাখা) এক ধরনের সন্দেহবাদীদের কাছে সন্ত্রাসবাদের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটা দুঃখজনক। এর চেয়ে বড় কথা হল, আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-কানাডা-ব্রিটেনের মুসলমান জনগোষ্ঠী তাদের পরবর্তী প্রজন্মের নামকরনের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে মাথায় রাখবে, সেটা নিশ্চিত। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে বলে কথা! অনেক বাংলাদেশী প্রবাসীরা ছেলেমেয়ের নাম রাখছেন এইসব বাস্তবতা মাথায় রেখে – সেখানে আবু/ইবনে কিম্বা এমডি/মোহাম্মদ অনুপস্থিত। কাজেই, নামে হয়তোবা কিছুটা হলেও এসে যায়!

মুক্তমনা ব্লগার

মন্তব্যসমূহ

  1. Zahid জুলাই 10, 2015 at 5:29 অপরাহ্ন - Reply

    *আবু হুরাইরা অর্থ কি বিড়ালের বাবা?

    আমরা সাধারণত বলে থাকি আবু হুরাইরা অর্থ বিড়ালের বাবা।

    আসুন তাহকীক করি।

    ابو هريرة

    আরবী ব্যকরণ অনুযায়ী এ বাক্যটিতে “তারকীবে ইযাফাত” তথা সম্বোন্ধযুক্ত বাক্য।

    অর্থাৎ: اب কে هريرة এর সাথে সম্বন্ধ করা হয়েছে।‘আবু’ অর্থ বাবা এবং ‘হুরাইরা’ অর্থ বিড়াল ছানা। সে হিসেবে স্বভাবতই আমরা সকলে বলে ফেলি আবু হুরাইরা অর্থ বিড়ালের বাবা।

    আসলে ‘আবু হুরাইর’ বাক্যের অর্থ ‘বিড়ালের বাবা’ করা ভুল। কারন, اب শব্দের প্রসিদ্ধ অর্থ যদিও পিতা বা জন্মদাতা কিন্তু এটি ভিন্ন অর্থেও ব্যবহার হয়। সকল আরবী অভিধানগুলোতে এ বিষয়টি বিশদভাবে বর্ণিত আছে।

    আবু শব্দটি জন্মদাতার অর্থ ছাড়াও যথাক্রমে- মালিক, অাধিকারী, আবিষ্কারক, বিশেষ দোষ বা গুনের অর্থে এবং বিশেষ অবস্থা বা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে ব্যবহার হয়।

    যেমন:

    أبو الرَّاحة : النوم ، (আবু আল রাহাহ) এর শাব্দিক অর্থ: আরামের বাবা। অথচ এটি ‘ঘুম’ এর অর্থে ব্যবহার হয়।

    – أبو الكرم : كريم ، (আবুল কারম) এর শাব্দিক অর্থ: সম্মানের বাবা। অথচ এটি সম্মানিতের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

    – أبو جَيْبَين : المسرف(আবু জাইবাইন) এর শাব্দিক অর্থ: দুই পকেটের বাবা। অথচ এটি অপচয়কারীর অর্থে ব্যবহার হয়।

    ابو جهل (আবু জাহল) এর শাব্দিক অর্থ: মুর্খের বাবা কিন্তু এটি অতি মুর্খের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

    ابو الطب (আবু আত তিব্ব) এর শাব্দিক অর্থ: চিকিৎসার বাবা কিন্ত এটি এর আবিষ্কারকের অর্থে ব্যবহার হয়।

    সুতরাং উপরোল্লেখিত তাহকীক অনুযায়ী ‘আবু হুরাইরা’ শব্দের অর্থ হবে ‘বিড়াল ওয়ালা বা বিড়ালের মালিক’

    উল্লেখ্য যে, ‘আবু হুরাইরা’র ন্যয় ‘আবু বকর’ও।

    বকর শব্দের অর্থ: অগ্রগামী, বরকতপূর্ণ, সফল ইত্যাদি। সে হিসাবে ‘আবু বকর’ শব্দের অর্থ হবে বরকতময়।

    আরবীতে ق ও ك দুটি হরফ রয়েছে।যেগুলোর পরিবর্তনের কারনে অর্থেরও পরিবর্তন ঘটে কিন্তু বাংলাতে এ দুটি একই রকম উচ্চারন হওয়ায় মুর্খদের মুর্খতা প্রচন্ড আকার ধারন করে। بكر (বকর) অর্থ শুভ সকাল, বরকতময়, অগ্রগামী, সফল ইত্যাদি আর بقر (বাক্বার)ق দ্বরা অর্থ গুরু। আমাদের প্রধান সাহাবীর নাম ق দ্বারা নয় বরং ك দ্বরা। সে হিসেবে তাঁর নাম কি হবে তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে।

    • আশরাফুল আলম জুলাই 14, 2015 at 8:38 অপরাহ্ন - Reply

      জানলাম। ধন্যবাদ। তারপরেও অবশ্য ‘আবু হুরায়রা’ নামটা খুব একটা সুবিধাজনক ঠেকছে না। আবু বকরের ব্যাপারে আপনার ব্যাখ্যা বেশ যুতসই মনে হচ্ছে।

  2. নীলাঞ্জনা জুলাই 9, 2015 at 9:42 পূর্বাহ্ন - Reply

    আগেকার দিনে অনেক বাবা-মাই সন্তানের নাম রাখতেন পুণ্যের কথা মাথায় রেখে। নামের বর্তনাম মালিকের কোনো গুণ না থাকলেও নাকি সেই নামের আদি মালিক ধর্মীয় পুণ্যবান ব্যক্তির নাম ধারণে পুণ্যের মালিক হওয়া সম্ভব। এই ধারণা এখনও অনেকের মাঝে রয়েছে। নামে কিছুই এসে যায় না, আবার অনেক কিছুই এসে যায়। নামের সাথে পিতামাতার নামের অংশ বা পদবী যোগ করাও আমার পছন্দ না। কারণ প্রতিটি মানুষই স্বতন্ত্র এবং নিজ গুণে ও নামেই তার পরিচিত হওয়া দরকার। সন্তানের শ্রুতিমধুর ও অর্থপূর্ণ নামই রাখা উচিত। ভালো লেগেছে লেখাটি।

    • আশরাফুল আলম জুলাই 10, 2015 at 6:58 অপরাহ্ন - Reply

      আপনাকে ধন্যবাদ নীলাঞ্জনা। নামের সাথে পিতামাতার নামের অংশ বা পদবী যোগ করা আমারও পছন্দ না। তবে আমি আমার নিজের নামে খন্দকার না থাকলেও ছেলেদের নামে সেটা যোগ করেছি, স্রেফ আমার বাবার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য।

  3. ঋতব্রত জুলাই 8, 2015 at 11:58 অপরাহ্ন - Reply

    আপনার লেখার সাথে অনেক বিষয়ে একমত। কয়েকটি সামান্য মন্তব্য;

    আকাশবাণী শব্দটির স্রষ্টা হলেন সুকুমার রায়। সন্দেশ পত্রিকায় রেডিও বিষয়ক একটি লেখার শিরোনাম রূপে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেন। যতদূর জানি ১৯৩০ সালে ভারতে রেডিও সম্প্রচার শুরে হয়। সুকুমার রায় প্রয়াত হন ১৯২৩ সালে।

    হিন্দি বা উর্দু তে নহর শব্দটি ছোট নালা বা খাল অর্থে ব্যবহৃত হয়; ঠিক নদী অর্থে নয়। যতদূর জানি জবাহারলাল নেহেরুর পূর্বপুরুষরা কাশ্মীর থেকে এসে পুরান দিল্লির একটি খালের পাসে বসত করেন। এর ফলে এরা নেহরু নামে পারিচয় পান। আদিতে এরা কাশ্মীরি ব্রাহ্মন ছিলেন, এবং উপধি ছিল কল (বাংলার তান্ত্রিক কৌলদের কথা স্মরণ করুন)। কয়েক পুরুষ দিল্লিতে থেকে এরা কল শব্দটি ঝেরে ফেলেন। জবাহারলাল নেহেরুর প্রপিতামহ গঙ্গাধার নেহরু সিপাহি বিদ্রোহের সময় দিল্লির কোতয়াল ছিলেন। ব্রিটিশদের হাতে দিল্লির পতনের পর তারা সপারিবারে এলাহাবাদে পালিয়ে আসেন।

    ৮০/৯০ এ অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি পদবি বর্জ্যন বা পরিবর্তন করেন। আমার PhD supervisor শিখ কুলে জন্ম হলেও পদবি ব্যবহার করেন না এবং first name (অরবিন্দ) লেখেন। কোথাও surname এর একান্ত প্রয়োজন হলে (যথা bank account, credit card etc.) অরবিন্দ অরবিন্দ লেখেন। অনেকে আবার প্রাচীন ভারতের মত মাতৃ নামে পারিচিত হন। অনির্বাণ ধরিত্রিপুত্র নামে এক প্রাবন্ধিক একদা দেশ পাত্রিকায় লিখতেন। তবে বর্তমানে আমাদের বা পরবর্তী প্রজন্মে কাউকে তা করতে দেখিনি।

    • আশরাফুল আলম জুলাই 10, 2015 at 7:03 অপরাহ্ন - Reply

      ধন্যবাদ ঋতব্রত। জানা হলো। আকাশবাণীর বিষয়টা মনে হয় তাহলে ভুলই শুনেছিলাম কোথাও। আর নেহরুদের ব্যাপারটা স্মৃতির প্রতারণা – খালটা কাশ্মীরের নয়, দিল্লীর। আমি উল্টিয়ে ফেলেছি।

      ভালো থাকবেন। আপনার শিক্ষক অনুকরণীয়, যদিও এরকম মানুষ আজকাল একেবারেই বিরল।

  4. শুভ্র ভাই জুলাই 8, 2015 at 8:27 অপরাহ্ন - Reply

    খুবই তথ্যপূর্ণ কিন্তু লেখকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভংগীর প্রতিফলন ঘটেছে বেশী।

  5. জাহিদ জুলাই 8, 2015 at 1:28 অপরাহ্ন - Reply

    ভালো লাগলো !

  6. অবরোধবাসিনী জুলাই 7, 2015 at 9:55 অপরাহ্ন - Reply

    আজকেই মুক্ত-মনায় একটি মন্তব্যে তারিক আজীজের নাম উল্লেখ করলাম। আপনার লেখায় এ উদাহরণটি আগে পড়লে তা আমার উল্লেখ না করলেও চলতো।
    যাহোক, লেখাটি খুব ভালো লাগলো।

    • আশরাফুল আলম জুলাই 8, 2015 at 9:22 অপরাহ্ন - Reply

      তারেক আজিজের উদাহরণটা অনেকেই সহজে রিলেট করতে পারে – যেহেতু সাদ্দাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা আমাদের দেশের মুসলিমদের কাছে হিরো ছিল। সে কারণেই ব্যবহার করলাম। ধন্যবাদ।

  7. নশ্বর জুলাই 7, 2015 at 8:08 অপরাহ্ন - Reply

    নামের উপর লেখাটি বেশ ভালো লাগলো ।

  8. সৌম্য জুলাই 7, 2015 at 6:33 অপরাহ্ন - Reply

    নাম নিয়ে আর একটি ঘটনার কথা বলি। চাকরিসুত্রে আমাকে চেন্নাই (মাদ্রাজ​)-এ থাকতে হ​য়েছিল বেশ কিছু দিন​। ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী নেতা আন্নাদুরাই-এর আন্দোলনের একদা পিঠস্থান এই শহরে (এবং সম্ভবত তামিলনাড়ুর সর্বত্রই) পদবি হিসেবে বাবার নাম ব্যবহার হ​য়ে থাকে। জাতিগত পদবি বিশেষ কেউ ব্যবহার করে না। বিশেষ করে যদি সেটা আইয়ার বা আয়াঙ্গার হয়( দক্ষীনি ব্রাহ্মণদের পদবি)| যদিও ভারতের অনেক জায়গায় বাবার নাম middle name হিসাবে ব্যবহার হয়ে থাকে, পারিবারিক পদবি সমূলে তুলে দেয়াটা এখানেই প্রথম দেখা| আমারও এক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, আজকের যুগে তামিল সমাজে পারিবারিক পদবি ব্যবহার করাকে উদ্ধত বা কট্টরবাদী বলে মনে করা হয়| যদিও বাবার নামের সাথে পিতৃতন্ত্রের যোগটা থেকেই যায়| তবুও হাজার জাতিভেদের এই দেশে এই সামান্য পাওয়াটাও কম না|

    বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সমান্তরালে ভারতে যে ভাষা আর জাতিবাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, এটা তার ফল| সৌভাগ্যক্রমে আজ কট্টর হিন্দু-হিন্দিবাদি নেতরাও ষাটের দশকের সেই পথ আজ মাড়াতে চান না|

    • আশরাফুল আলম জুলাই 8, 2015 at 9:19 অপরাহ্ন - Reply

      আজকের যুগে তামিল সমাজে পারিবারিক পদবি ব্যবহার করাকে উদ্ধত বা কট্টরবাদী বলে মনে করা হয়|

      একথা শুনে বলতে হচ্ছে, ওরা অনেকদূর এগিয়েছে। আসলে নাম একটা আলগা ব্যাপার – কর্মই মানুষকে বিচারের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত।

  9. Manzurul Islam Noshad জুলাই 7, 2015 at 2:18 পূর্বাহ্ন - Reply

    যেখানে বাঘ নেই সেখানে বিড়ালকে বাঘের মতো মনে হয়। যারা অসীম মহাকাশের বিন্দু সীমানায় আটকে আছে তাদের কাছে নামটা বড় কিছু হবে এটাই স্বাভাবিক। এরাতো একটি ছেলে বিজ্ঞান চর্চা না করলে বিষ্মিত হয় না; এরা বিষ্মিত হয় ছেলেটি বৃহস্পতিবারে নখ না কাটলে। সুতরাং এরা আলোতে অন্ধকার।
    সুন্দর ব্যাপারটি সম্পূর্ণরুপে আপেক্ষিক।
    আপনি একটি সুন্দর নাম রাখার পক্ষে কথা বললেন কিন্তু আমার সুন্দরটা যদি আপনার সুন্দর না হয় তবে সেক্ষেত্রে কি হবে? সবাইবে সবার সুন্দর নিয়ে থাকতে দেওয়াটা উচিত; তবে এতটুকু নিশ্চিত করতে হবে যে আমার সুন্দর যাতে অন্যের যুক্তিযুক্ত ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।

    লেখাটি পড়েছি এবং ভালই লেগেছে। ধন্যবাদ। ভাল থাকবেন।

    • আশরাফুল আলম জুলাই 8, 2015 at 6:25 অপরাহ্ন - Reply

      নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে জাঁকিয়ে তোলে। আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  10. আবুল হাসান জুলাই 6, 2015 at 10:16 অপরাহ্ন - Reply

    আব্দুল গাফফার চৌধুরী নিউ ইয়র্কে যা বলেছেন সেটা কোন বক্তৃতাবাজী না, একটা একাডেমিক তথ্য।

    আমরা এখনো এ ধরনের একাডেমিক তথ্য হজম করার উপযুক্ত হইনি। ব্রাহ্ম সমাজের একসভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, তারা প্রচলিত সব ধর্মের মুল গ্রন্থ অনুশীলন করবে। সেই সভার সিদ্ধান্তক্রমে বাংলাদেশের নরসিংদির গিরিশ চন্দ্রের উপর দায়িত্ব পড়ে কোরান শরীফ বাংলায় অনুবাদের। তিনি যথারীতি অনুবাদ করলেন, কিন্তু প্রকাশ করলেন না। যদি অনুবাদে ভুল থেকে যায়! সারা বাংলা ঘুরলেন একজন আলেমের খোঁজে যাকে দিয়ে ভুল সংশোধন করাতে পারেন। পেলেন না কাউকে। শেষমেষ পেলেন এলাহবাদের কাছে হিন্দিভাষী একজন মাওলানা। তাকে দিয়ে সংশোধন করালেন, যাক সেই কাহিনী ভিন্ন।
    এই থেকে সহজেই বোঝা যায়, এই আঠারশতক পর্যন্ত এই বাংলায় এই ধর্মগ্রন্থ কেউ বুঝে পড়েনি।
    তবে আব্দুল গাফফার চৌধুরী বা লতিফ সিদ্দিকী এই প্রসংগগুলো নিয়ে কথা বলে সবার জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন সবার উচিত হবে এই বিষয়ে আরো পড়াশুনা করা, পত্রিকায়, ফেসবুকে, ব্লগে সত্যিকার বিষয় তুলে ধরা। মামলা, হত্যার হুমকি এসব কিছুই সহি ইসলাম হতে পারে না।
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বধর্ম বা এ জাতীয় একটি অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। উপরোক্ত দুজনের বক্তৃতায় যদি কোন সমস্যা থেকে থাকে প্রয়োজনে আমরা তাদের দ্বারস্থ হতে পারি। নামের নামকরন নিয়ে সচলায়তনে রাগীব হাসানের ভালো দুটি লেখা আছে। আরব অঞ্চলে বিন যুক্ত করে দাদা বা দাদার দাদার নাম পর্যন্ত যুক্ত করা হয়। এখন সারা বিশ্বে প্রচার প্রচারনার কারনে যার নাম যত বড়ই হোক না কেন দুই শব্দেই শেষ।

    ফেসবুক থেকে পাওয়া এই কথাটি কি সত্যি?

    ইসলামের দৃষ্টিতে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ্‌। কিন্তু আল্লাহ্‌ নারী বা পুরুষ নন এবং তাঁর কোন সন্তান নেই, কথাটি ডাহা মিথ্যা। মোহাম্মদের ইসলামের আগে আল্লাহ্‌ ছিলেন একজন নারী এবং পৌত্তলিক চন্দ্র’দেবী। চন্দ্র’দেবী আল্লাহ্‌’র সাথে বিবাহ হয় সূর্যের। তাদের ওরসে লাত, মানাত ও ওযযা নামে তিনটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এই তিন সুন্দরী নাচ, গান, মদ পান আর আনন্দ ফুর্তিতে সময় পার করতো। কাবাগৃহে তারা ছিল সম্মানীয়। মোহাম্মদের বাবা আবদুল্লাহ এই তিন কন্যার পূজা করতেন। কিন্তু মোহাম্মদ কেন তাদের উপর ক্ষেপে গিয়েছিলেন! জানেন কি?

    এবং ফেসবুক থেকে ধার করা একটি অংক, যে অংকটা আসলেই জটিল

    নবী মুহাম্মদের জন্ম কাহিনী দারুণ রহস্যভরা। মুহাম্মদের দাদা আবদুল মুত্তালিব যখন তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ’র সাথে ওহাবের কন্যা আমেনার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান। তখন মুত্তালিব ওহাবের ভাগ্নি হালার রূপদর্শন করে মোহিত হয়ে তার পাণিপ্রার্থী হন। ওহাব তাতে সম্মত হলে পিতা ও পুত্রের বিয়ের অনুষ্ঠানও একই দিনে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। মুত্তালিব আর হালার ঘরে যে পুত্রসন্তান জন্মায় তারই নাম হামজা, ইনি মুহাম্মদের চাচা এবং অন্যতম খ্যাতনামা সাহাবি ছিলেন। ইসলামী সূত্রমতে হামজা মুহাম্মদের চাইতে বয়সে চার বছরের বড় ছিলেন। অন্যদিকে বিয়ের ৬ মাসের মধ্যেই আবদুল্লাহ অকাল মৃত্যুবরণ করেন। ইসলামী সূত্রমতে এ সময় আমিনা গর্ভবতী ছিলেন এবং কিছুদিনের মধ্যে মুহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন। এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, বিয়ের এক বছরের মধ্যে মুহাম্মদের জন্ম হলে, হামজা কি করে মুহাম্মদের চেয়ে চার বছরের বড় হতে পারে? তবে কি আমেনা কি সকল লৌকিক নিয়মের বাইরে চারবছর ব্যাপী গর্ভবতী ছিলেন? জাগতিক নিয়ম মেনে মুহাম্মদ আমেনার পুত্র হলেও আবদুল্লাহ’র ঔরসজাত সন্তান হতে পারেন না। ধর্মের বিধিমতে তিনি একজন জারজ সন্তান। গুপ্ত সে প্রণয় আজও গুপ্তই রয়ে গেছে।

    1. Prophet Muhammad (S) and His Family: A Sociological Perspective By Aleem
    2. The Life of Muhammad: Al-Waqidi’s Kitab Al-Maghazi
    3. Muhammad ibn Saad, Tabaqat vol. 3. Translated by Bewley, A. (2013). The Companions of Badr, London: Ta-Ha Publishers
    4. Ibn Ishaq, The Life of Muhammad: A Translation of Ishaq’s Sirat Rasul Allah, Translated by A. Guillaume, Oxford University Press, Oxford, England,
    5. Al-Tabari (838? – 923 A.D.), The History of al-Tabari (Ta’rikh al-rusul wa’l-muluk), Translated by W. M. Watt and M.V. McDonald, State University of New York Press, Albany, NY, 1988

    • আশরাফুল আলম জুলাই 8, 2015 at 6:23 অপরাহ্ন - Reply

      আমরা এখনো এ ধরনের একাডেমিক তথ্য হজম করার উপযুক্ত হইনি।

      মানতেই হচ্ছে। ফেসবুকে ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডার প্রফেসর সেজান মাহমুদ বলছেনঃ

      বাংলাদেশের জন্যে কি কিছুই একাডেমিক দিক থেকে বলা যাবে না? ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব কোন দিক থেকেই? আব্দুল গাফফার চৌধুরী কী বলেছেন ন্যু ইয়র্কে যে তাঁকে মুরতাদ, ইসলাম থেকে খারিজ এইসব রায় দিচ্ছে হেফাজতের নেতারা? তিনি বলেছেন,

      এক। আরবি ছিল কাফের দের ভাষা। কিন্তু সাংস্কৃতিক উপাদান কীভাবে এক সমাজ, দেশ, কাল থেকে অন্য সমাজ, দেশ, কালে চলে যায়। নবী তা গ্রহণ করেছেন।

      কথাটি কি মিথ্যা? এই মূর্খগুলো কে বুঝাবে যে মূল আরবি ভাষা তো আগেও ছিল যা সেন্ট্রাল সিমেটিক ভাষার অংশ (হায়রে, সিমেটিক বলাতে আমাকে না জানি ইহুদীদের দালাল বলে আবার)। কোরান নাজিল হবার আগেও তা ছিল। আধুনিক আরবি এসেছে কোরআন থেকে। তাহলে?

      দুই। তিনি বলেছেন, আল্লাহ’র ৯৯ নামগুলো ইসলাম পূর্ব নামগুলো থেকে এডাপ্ট করা। কথাটি কি মিথ্যা?

      নবীর বাবার নাম ছিল আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ তো মুসলমান নাম ছিল না। তার মধ্যে আল্লাহ আছে। যা কাবা শরীফের অধিষ্ঠিত তিনটি মূর্তির প্রধানটির নাম। কেউ কেউ “ইলাহ” বলে। ইলাহ থেকে আল্লাহ’র উৎপত্তি। এখানে মিথ্যা টা কোথায়?

      তিন। তিনি বলেন আমাদের লোকেরা আরবি না জেনে ভুল আরবি নাম রাখে। যেমন, সাহাবা “আবু হুরায়রা” যা কিন্তু সাহাবার আসল নাম নয়। রসুলুল্লাহ তাঁকে ঠাট্টা করে এই নামে ডাকতেন যার অর্থ হলো “বিড়ালের বাবা”, তেমনি যার কাশেম বলে কোন ছেলে নেই তিনি নাম রাখেন “আবুল কাশেম”। এখানে তিনি বলেন আমরা আরবি না জেনেই নাম রাখি, ভুল করি। যেমন রসুল আর রাসুলুল্লাহ এক নয়। রসুল হলো দূত, রসুলুল্লাহ হলেন আল্লাহর দূত। তাই নেহেরু যখন সৌদি আরবে যান তাঁকে বলা হয়েছিল ” মারহাবা ইয়া রসুলে সালাম। হে শান্তির দূত তোমাকে সংবর্ধনা জানাই।” কিন্তু আমাদের দেশে কেউ যদি বলে অমুকে ‘রসুল’ তাহলেলে তাকে মুরতাদ বলে মেরেই ফেলা হবে। এখানে ভুলটা কোথায়?

      চার। তিনি হজ্জের কথা বলেছেন যে এটাও মুসলমান দের না। আগে থেকেই ছিল নবী তাতে একেশ্বরবাদ যোগ করেছেন। বুঝলাম না এখানে মিথ্যা টা কি?

      পাঁচ। তিনি এই সকল কিছুই বলেছেন বাংলা ভাষার মর্যাদার কথা বলতে গিয়ে। বাংলাদেশ টিকে থাকবে বাংলা ভাষা, ধর্ম নিরপেক্ষতা আর বঙ্গবন্ধু টিকে থাকলে। তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করতে পারেন কিন্তু এর মধ্যে কোন দোষের কিছু নাই। কিন্তু যারা তাঁকে ধর্ম বিরোধী, মুরতাদ ইত্যাদি খেতাব দিচ্ছে এই সকল লোকেরাই দেশকে ধরংসের দিকে ঠেলে দেবে। কোথাও সামান্য সত্য কি বলা যাবে না। কী অসামান্য (?) মূর্খতা মানুষের যা বাংলাদেশের জন্যে ভয়াবহ।!!

      আপনি লিখেছেন,

      তবে আব্দুল গাফফার চৌধুরী বা লতিফ সিদ্দিকী এই প্রসংগগুলো নিয়ে কথা বলে সবার জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এখন সবার উচিত হবে এই বিষয়ে আরো পড়াশুনা করা, পত্রিকায়, ফেসবুকে, ব্লগে সত্যিকার বিষয় তুলে ধরা। মামলা, হত্যার হুমকি এসব কিছুই সহি ইসলাম হতে পারে না।

      আশার কথা, এসব নিয়ে এখন অনেকেই কথা বলছেন, লিখছেন। মানুষ যত জানবে, অজ্ঞানতা তত কমবে।

      ভালো থাকবেন

মন্তব্য করুন