আজ শুক্রবার

এশিয়া ও আফ্রিকার মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে শুক্রবার একটি পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত যারা নামাজ পড়ে না তারাও শুক্রবারে মসজিদে উপস্থিত হয়। প্রচলিত একটি নিয়ম শোনা যায়; তিন শুক্রবার নামাজে না গেলে মুসলমান থেকে নাম কাটা যায়। যাই হোক, কেউ নাম কাটার ভয়ে কেউবা বেহেস্তের লোভে, কেউবা নিজের ইচ্ছায় কেউবা পরিবারের চাপে মসজিদে যায়। তবে বর্তমানে এই দিনটিতে এক ধরনের আতংক বোধ করি!

পাকিস্তানে প্রায় সময় শুক্রবারে মসজিদে বোমা ফাটিয়ে জুম্মা মোবারক পালন করে। আমাদের মিডিয়া খুব সচেতনতার সহিত কেন বোমাবাজি হয় এই বিষয়টি এড়িয়ে যায়। একটু অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে ঐ সমজিদগুলো শিয়া অথবা ভিন্ন সম্প্রদায়ের মসজিদ। এসব সম্প্রদায়িককে শরীয়াপন্থী সুন্নীগোষ্ঠী খাঁটি মুসলিম ভাবে না। তাই তাদেরকে লাইনে আনার জন্য এসব হামলা করে! কাদিয়ানীদের অমুসলিম গন্য করে হত্যা করার ইতিহাস পাকিস্তানে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় তদন্তে একটি বিষয় হাজির হয় তাহল; পাকিস্তানের কোন সম্প্রদায় কেউ কাউকে সহি মুসলিম ভাবে না। গত সপ্তাহে অনলাইনে একটি ছবি দেখলাম। ছবিটি ব্রিটেনের একটি শিয়া মসজিদের। দেওয়ালে লিখে রেখেছে;- শিয়া কাফের। ছবিটা দেখে মনে যে প্রথম বাধ্যটি আসল তাহল; শিয়ারাই যেখানে কাফের সেখানে ওদের কাছে অন্যরা কী?
10658777_1042035249147600_4867143635344413848_o

ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি শাখার জন্ম হয় নাম “মুতাজিলা”। কারণ ও যুক্তির আলোকে এই সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে এর প্রাধান্য ছিল। উমাইয়া যুগে মুতাজিলা আন্দোলনের আবির্ভাব হয় এবং আব্বাসীয় যুগে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছায়। ওয়ালিস ইবনে আতাকে মুতাজিলা মতবাদের জনক হিসেবে ধরা হয়। খলিফা আল মামানের সময় মুতাজিলা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায় এবং বিস্তার লাভ করে। এই মুতাজিলা সম্প্রদায়কেও কাফের হিসেবে চিহ্নিত করে এদের কম অত্যাচার করেনি। মুসলীম পণ্ডিত, সাহিত্যিক সব মুতাজিলা আন্দোলনের ফসল। ব্যক্তিজীবনে এরা শরীয়াপন্থীদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন। কিন্তু মজার বিষয় হল বর্তমানে শরীয়াপন্থীদের কাছে এরাই বড় পীর হিসেবে আর্বিভূত হয়েছেন। এর মূল কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে শরীয়াপন্থীদের উল্লেখযোগ্য কোন অবদান নেই। তারা তাদের একটি কিতাব নিয়ে জীবন কাটাতে চায়। অনেক বাসাতে গিয়ে দেখবেন তাদের বাসায় একটি কোরান শরীফ আছে আর কোন বই নেই। কারণ তারা মনে করে; জীবনের জন্য, জানার জন্য, জ্ঞানের জন্য অন্য কোন বইয়ের প্রয়োজন পরে না। এই ধারণা থেকেই বাসায় বই থাকে একটি এবং থাকে সবার উপকে যেন অশ্রদ্ধা না হয়!

গত শুক্রবারে তিউনেশিয়া, কুয়েত এবং ফ্রান্সের হামলা হয়। আমাদের দেশীয় পত্রিকায় হামলার খবর প্রকাশ করলেও হামলার কারণটি পূর্বের ন্যায় এড়িয়ে গেলেন। কুয়েতের মসজিদে আত্মঘাতি বোমা হামলা হয়। মসজিদটি ছিল শিয়া মসজিদ। অসংখ্য শিশু আহত হলেও বাংলার মুমিন ও জিহাদী সমাজ এতে কোন শব্দ করেনি। কারণ যেহেতু হামলা করেছে সুন্নিপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসআইএস সুতরাং তারা সবারের মতন নীরব থাকত। অন্যদিকে ফ্রান্সে বরাবরের মতন জঙ্গি হামলা করে। শুক্রবারের আত্মঘাতি বোমা হামলা করলে সম্ভবত দ্রুত সার্ফিসের মতন দ্রুত বেহেস্তে চলে যাওয়া যায়। পাকিস্তানে এক আত্মঘাতি জঙ্গিকে পুলিশ ধরে ফেলে। জঙ্গিটির সারা শরীর পরীক্ষা করে দেখা গেলে সে লোহার আন্ডারওয়্যার পরেছে। এর কারণ হিসেবে সে বলে; শিশ্নটি যেন অক্ষত অবস্থায় বেহেস্তে যায় সেই জন্যেই এই লোহার বস্ত্র!

তিউনেশিয়ার হামলার বিষয়ে বলতে গেলে এর আগে বিভিন্ন পর্যটন এলাকার হোটেল ও নাইট ক্লাবের হামলাগুলোর কথা স্মরণে আনতে হবে। পর্যটন এলাকায় অনেক বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন দেশ থেকে আনন্দ করতে আসে। ফলে তাদের আনন্দ ও পোশাক কোনটাই তৈহিদি জনতার পছন্দের সাথে যায় না। আর এগুলো বন্ধ করার জন্য তারা এমন বোমা হামলা বা বন্দুক হামলা করে থাকে। অথচ হামলার সকল কারণ আমাদের মিডিয়া চেপে যেতে পছন্দ করে। তবে তিউনিশিয়ার সরকার এই হামলার পর ৮০টি মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছে। এই মসজিদগুলো থেকে উগ্রবাদী আদর্শ প্রচার হতো এই অভিযোগের ভিত্তিতে মসজিদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশের কাঁটাবন মসজিদ থেকে শুরু করে অনেক মসজিদ জঙ্গিদের ঘাটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিউনেশিয়া ঘটনার আগে আফ্রিকার মুসলিম দেশ চাঁদ নিরাপত্তার স্বার্থে মুখে কাপড় দিয়ে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করেছে। এই দেশগুলোর বর্তমান পদক্ষেপ থেকে ভাবনার অনেক কিছুই আছে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে এমন আইন অমুসলিম রাষ্ট্র করলে আমাদের হেফাজতিরা রাস্তায় নেমে যেত। কিছু বুদ্ধিজীবী জুটে যেত সাথে।

নাস্তিকদের ফাঁসি অথবা ইসরাইলের ফিলিস্তিন হামলা ছাড়া আমাদের দেশীয় মসজিদ থেকে কোন জিহাদী মিছিল হয় না। আজকে এলাকায় মাইকিং হচ্ছে; আগামীকাল শুক্রবারের নাস্তিক লতিফ সিদ্দিকীর ফাঁসির দাবীতে মিছিল হবে। সবাই যেন নেকি কামানোর জন্য মিছিলে যোগ দেয়। আর এই প্রতিবাদের আয়োজন করছে বাংলাদেশের আইএসআইএস হেফাজতে ইসলাম। লতিফ সিদ্দিকী ভাল লোক নাকি খারাপ লোক সেটা বিষয় না। কিন্তু আপনাকে অবশ্যই ধর্মীয় পাণ্ডাদের বিপক্ষে সবসময় অবস্থান নিতে হবে যদি দেশে বোমা হামলা না চান। এরাই সেই পান্ডা যারা ওসামা বিন লাদেনকে বলেছিল মুক্তির সৈনিক। বাংলার পথে ঘাটে তাদের চোখে নায়ক ওসামার ছবি বিক্রি। রাজ পথে স্লোগান; বাংলা হবে আফগান আমরা হবো তালেবান! বাংলাদেশের প্রতিটি শুক্রবারে মসজিদে এতো লোক হয় যে প্রতি শুক্রবার ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। মাঝে মধ্যে ভাবি; এতো ধার্মিক চারদিকে তার পরও দুর্নীতিতে আমরা সবসময় এগিয়ে থাকি কী করে।

বাংলাদেশের অনেক মসজিদে শুক্রবারে, ইসলামিক জলসায় অথবা ওয়াজ মাহফিলেগুলোতে যতোটুকু না আত্মশুদ্ধির কথা থাকে তার থেকে বেশি থাকে সাম্প্রদায়িকতার উষ্কানি, ইহুদি নাসাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা অথবা ছলে বলে কৌশলে জামাত বা জঙ্গিপন্থীদের পক্ষে বয়ান। জামাতপন্থীরা আগেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। তাই তো বিএনপির আমলে বাচ্চু রাজাকারকে টিভিতে ইসলামিক প্রশ্নের জবাব দিতে দেখি! আমার বাসার পাশে মসজিদ ছিল। শীত কালে মানুষের ঘুম নষ্ট করে পঁচা মাইকের বয়ান ইচ্ছে না হলেও শুনতে হতো তাই এগুলো শুনার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি; বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিল, খুতবার বয়ান বেশির ভাগ সময় থাকে ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে। এসব জায়গা থেকে যখন মৃত্যুর হুমকি অথবা উষ্কানি দেওয়া হয় তখন স্বাভাবিক ভাবে এগুলো অপরাধ হিসেবে গন্য হওয়ার কথা। কিন্তু ধর্মান্ধ দেশ বলে এগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেয় না। আর দুঃখের বিষয় হল; যখন এটাইপ বয়ান শুরু করে তখন কোন ইমানদার এর প্রতিবাদও করে না। হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করা উচিত; মুগদা পাড়ার ওয়াজ মাহফিলে রাজাকার সাইদি এই কথা বলে। অথচ এর বিরুদ্ধে কোন একশান নিতে দেখা যায়নি। মানুষের মধ্যে উগ্রতা ছড়ানো ও হত্যা করার আহবান জানিয়ে বক্তব্যের কারণে যে কোন সভ্যরাষ্ট্রে গ্রেফতার হয়ে যেত।

ব্যস্ততাকে ছুটি দিয়ে অসংখ্য মানুষ তার প্রিয় মানুষগুলোর হাত ধরে ছুটে যাবে পর্যটন এলাকাগুলোতে। হয়তো কেউবা সাপ্তাহিক নামাজের জন্য যাবে কোন মসজিদে। অন্যদিকে কেউবা শরীয়া প্রতিষ্ঠা করার জন্য বন্দুক ও বোমা হাতে নেমে পরবে কোন এক পর্যটন এলাকায় কেউবা বেহেস্তের জন্য আত্মঘাতি হবে অভিন্ন গোত্রের মসজিদে। কেউবা মিছিল বের হবে নাস্তিকদের ফাঁসির দাবীতে। কেউবা আজকের দিনে পুরষ্কার হিসেবে ঘোষণা করবে কুমারী কিশোরী। হ্যা! আমি শুক্রবার দিনটির কথাটিই বলছি।

[42 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0

Leave a Reply

8 Comments on "আজ শুক্রবার"

avatar
Sort by:   newest | oldest
Manzurul Islam Noshad
Member
Manzurul Islam Noshad
ধর্মের নানাবিধ অপকৌশলগুলো প্রয়োগ করা হয় ঠিক ছোটবেলায় যখন একটি শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশ হতে থাকে। ঠিক এসময়ের মধ্যে যে ধারণা গুলো তার মধ্যে সেট আপ হয়ে যায় তা থেকে বেরিয়ে আসাটা খুব কঠিন হয়ে যায়। বর্তমানে যুক্তির বিচারে অনেকে এটা মেনে নেয় যে স্রষ্টা বলে কেউ নেই কিন্তু শিশুকালে ভয়ের যে বীজ বপন করে দেওয়া হয়েছে তার কারণে সর্বশেষ একটি প্রশ্ন করে তারা আবার অয়ৌক্তিকভাবে বিশ্বাস শুরু করে। তারা যা বলে তা হল “ ধরে নিলাম সৃষ্টিকর্তা নেই; কিন্তু যদি থেকে থাকে তখনতো আমি জাহান্নামে যাব। তার চেয়ে বরং বিশ্বাস করা ভাল”। ধর্মটা ছাপা খানায় মুদ্রিত হয়, এতে… Read more »
নশ্বর
Member

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মিডিয়া মৌলবাদকে সমর্থন করে , এ আমাদের আজ নির্বাক সত্য ।। 🙁

অভিষেক
Member

মিডিয়াগুলো মৌলবাদকে সমর্থন করে না ! এরা ব্যবসা করে ! মিডিয়ার সম্পাদকেরা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, তাঁরা মোটেই ধার্মিক নন।

নশ্বর
Member

এরা যে ব্যবসা করে এই কথার সাথে একমত। এরা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা করে তা এই রোজার মাসে টিভি, পেপার ইত্যাদির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষভাবে করছে …

জাবেদ হাসান
Member
জাবেদ হাসান

সংযুক্ত ছবিটা আরো ওপরে প্রাসাঙ্গিক প্যারাটির কাছে দিলে ভালো হত, যেখানে শিয়াদের কাফের বলার কথা বলেছেন। আর বাংলাদেশের মিডিয়ার কথা কি বলবো আর! এরা কিভাবে সংবাদ করে সেটা দেখাচ্ছি…

তিউনিশিয়ার মুসলিম জঙ্গিদের বোমা হামলায় এতজন নিহত এই সংবাদটাকে জঙ্গি শব্দটা বাদ দিয়ে লিখবে এভাবে তিউনিশিয়ার বোমা হামলায় এতজন নিহত। আবার তিউনিশিয়ায় জঙ্গিবাদের মদদ দেয়ায় ৮০ টি মসজিদ বন্ধ এই সংবাদটাকে এরা লিখবে এভাবে, এবার তিউনিশিয়ায় নিষিদ্ধ/বন্ধ হলো ৮০টি মসজিদ!!! দায়িত্বশীলতা বলতে এদের কিছু নেই। মুসলিম দেশের গর্ধব মুসলিমরা কি খায় তা এরা জানে, আর সে অনুযায়ী সব সংবাদ ছাপায়।

কাজী রহমান
Member
বাংলাদেশের অনেক মসজিদে শুক্রবারে, ইসলামিক জলসায় অথবা ওয়াজ মাহফিলেগুলোতে যতোটুকু না আত্মশুদ্ধির কথা থাকে তার থেকে বেশি থাকে সাম্প্রদায়িকতার উষ্কানি, ইহুদি নাসাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা অথবা ছলে বলে কৌশলে জামাত বা জঙ্গিপন্থীদের পক্ষে বয়ান। জামাতপন্থীরা আগেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু কি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান? বাংলাদেশের সবখানে আছে, ছিল এবং সম্ভবত থাকবে এরা। দীর্ঘ্যদিন ধরে ঢুকেছে এরা দেশের সবখানে। গু-আযমের পুত্র যদি মিলিটারির অতি উচ্চ পদস্থ অফিসার হয়ে যেতে পারে তা’হলে আর কি ছিলো বাকি? অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, সরকারী; আধাসরকারি, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা বানিজ্য, শিল্প সাহিত্য, সাধারণ নাগরিকে তথা দেশের সর্বস্তরে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি খুঁটি গেড়েছে। বহুকাল ধৈর্য্য ধরে,… Read more »
wpDiscuz

মুক্তমনার সাথে থাকুন