সমকামিতা নিয়ে খেজুরে আলাপ

মুক্তমনায় আমার প্রথম ব্লগটা যখন পোস্ট করতে যাচ্ছি, এই কাঠখোট্টা হৃদয়েও কোথা থেকে যেন প্রচণ্ড আবেগ এসে ভর করছে। প্রায় পাঁচ বছর হয়ে গেছে অ্যাকাউন্ট খুলেছি। এর মধ্যে কয়েকটা কমেন্ট করা পর্যন্তই ছিল আমার দৌড়। মন্তব্য দেখে অভিজিৎ দা বেশ কয়েকবার আমাকে তাগাদা দিয়েছিলেন ব্লগে লেখালেখি করার। একে তো মুক্তমনার মতো প্ল্যাটফর্মে লেখালেখি করার জ্ঞান নেই, তার উপর লেখার হাতও প্রচণ্ড খারাপ। একরকম ভয়েই মন্তব্য করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। এর প্রায় দুই বছর পর যেদিন প্রথম অভিজিৎ দা’র সঙ্গে দেখা হলো, সেদিনও জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি লিখছি না কেন। এরও তিনবছর পর যেদিন আবার প্রথম কমেন্টটি করি, সেদিনও সেই একই কথা! প্রতিবারই মনে মনে ভেবেছি, মুক্তমনায় একদিন আমিও লিখবো। তাতে প্রথম মন্তব্যটি করবেন অভিজিৎ দা। এতদিন লিখি নি বলে হালকা তিরস্কার করে শেষে বলবেন, “লেখা ভালো হয়েছে, চালিয়ে যাও। মুক্তমনায় স্বাগতম।”

আমার এখনো মনে হয় না এখানে লেখালেখির জন্য তৈরি হতে পেরেছি। আর প্রথম পোস্টেই ঠিক এ বিষয়টি নিয়ে কেন লিখছি তা-ও জানি না। এদেশে সমকামী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অভিজিৎ দা’র জ্বালিয়ে যাওয়া আলোকবর্তিকা বয়ে নেবার জন্য অবচেতন মনের তাগিদ থেকেই কিনা কে জানে। আজ আমার একটা স্বপ্ন পূরণ হতে পারতো। স্বপ্নের সবচেয়ে আরাধ্য মুহূর্তটি কি সবসময় অধরা রয়ে যায়? প্রথম লেখা পোস্ট করছি আজ, কিন্তু তাতে অভিজিৎ দা’র মন্তব্য থাকবে না। এমনকি পরের আর কোন লেখাতেই না।

এটি লিখেছিলাম গতকাল, ফেসবুকে নোট আকারে। এখানে পোস্ট করবো বলে ঠিক করি নি তখনো। ফেসবুকে নানা মুনির নানা মত দেখে একরকম বাধ্য হয়েই লেখা। লোকজনের বক্তব্যে দেখলাম কয়েকটা বিষয়ই ঘুরেফিরে আসছে। প্রশ্নোত্তর আকারে ওগুলোর জবাব লিখে ফেলার চিন্তা থেকেই এই পোস্ট। আমার পড়াশুনা যেহেতু বায়োলজিতে নয়, তাই কিছু বিষয়ে ভুল বলে থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ওগুলো কেউ ধরিয়ে দিলে কৃতার্থ হবো।


সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ।

প্রকৃতিবিরুদ্ধ মানে কী? যেটা প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না? তাহলে এ লিঙ্কটি ফলো করে দেখে নিন মানুষের বাইরে প্রকৃতিতে আর কোন কোন প্রজাতিতে সমকামের নজির পাওয়া যায়। ২০০৬ সালের এক হিসেবে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির জীবে সমকামিতার অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়।[১] এবার বলুন, সমকামিতাকে কি প্রাকৃতিক বলা যায়?

কিন্তু প্রকৃতি নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেছে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হবার জন্য, সমলিঙ্গের প্রতি নয়।

প্রকৃতি নিয়ে আরেকটু জানাশোনা থাকলে বুঝতেন যে প্রকৃতি কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বা না। এর কোন মস্তিষ্ক নেই, চিন্তা করার ক্ষমতা নেই, স্বভাবতই কোন উদ্দেশ্যও নেই। কোন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রকৃতি নারী-পুরুষ তৈরি করে নি। বিবর্তনের পরিক্রমায় প্রায় ১২০ কোটি বছর আগে বিশেষ কিছু কন্ডিশনে যখন সেক্সুয়াল রিপ্রডাকশন অ্যাসেক্সুয়াল রিপ্রডাকশনের চেয়ে বাড়তি সিলেক্টিভ অ্যাডভান্টেজ পেয়েছিলো, ঠিক তখন প্রথমবারের মতো সেক্সুয়াল অর্গানিজমের উদ্ভব হয়। এরপর বিভিন্ন সময় অনেক জীবই আবার অ্যাসেক্সুয়াল পদ্ধতিতে ফিরে গেছে। উদ্ভিদের মধ্যে আমরা এরকম দুই ধরনের রিপ্রডাকশন পদ্ধতিই দেখতে পাই। প্রাণীদের মধ্যেও অ্যাসেক্সুয়াল রিপ্রডাকশন দেখা যায়, যেমন হুইপ্টেইল লিজার্ড কিংবা এরকম আরও।

নূহের নৌকায় প্রতিটি প্রজাতির প্রাণী থেকে নারী-পুরুষ দুইটি করে উঠলেও প্রকৃতিতে দেখা যায় অনেক প্রজাতিতেই লিঙ্গ আছে দুইয়ের বেশি। যেমন, এই গিরগিটিগুলোকে দেখুন, ওদের মধ্যে লিঙ্গ আছে পাঁচ পাঁচটি। আমরা প্রধানত দুই লিঙ্গবিশিষ্ট প্রজাতিদের থেকে বিবর্তিত। বিবর্তনের মাধ্যমেই আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে hard-wired হয়েছে যাতে আমরা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হই। মস্তিষ্কের এরকম বৈশিষ্ট্যের পেছনে কলকাঠি নাড়ে আমাদের ডিএনএ। বিভিন্ন জিনের পারষ্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক করে আমরা কার প্রতি আকৃষ্ট হবো আর কার প্রতি হবো না।

প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য থাকে। এ পার্থক্যটা হয় জিনের ভ্যারিয়েশনের কারণে। এ ভ্যারিয়েশন তৈরি হয় মিউটেশনের মাধ্যমে। প্রকৃতি যেহেতু মস্তিষ্কবিহীন নিরেট গর্দভ এবং একে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও বুদ্ধিমান কেউ নেই, তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতিতে এ ভ্যারিয়েশনগুলো তৈরি হয়।

মন, কনশাসনেস ইত্যাদি জিনিসকে আমরা যেভাবে আত্মা বা এ টাইপের কোন অতিপ্রাকৃতিক সত্ত্বার কাবজাব বলে মনে করি, আসলে তা নয়। আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনার উৎস হচ্ছে মস্তিষ্ক যেটা আবার কাজ করে বিভিন্ন হরমোন ও অন্যান্য রাসায়নিকের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায়। এগুলোও যেহেতু জিনের অভিব্যক্তির ফল, তাই এসবের ভ্যারিয়েশনে আমাদের বৌদ্ধিক আচার-আচরণেও ভিন্নতা দেখা যায়। ঠিক একারণেই সবার চরিত্র, মানসিকতা বা পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি কখনো পুরোপুরি মেলে না। এর সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ইত্যাদি আরো নানারকম পারিপার্শ্বিক প্রভাব যুক্ত হয়ে এ পার্থক্যকে আরও বড় করে তোলে। মোদ্দা কথা হলো, আমাদের যেকোনরকম শারীরিক-মানসিক বৈশিষ্ট্যের প্রকরণই হচ্ছে প্রকৃতিজাত। এখানে অতিপ্রাকৃতিক কোন এজেন্টের কিরিঞ্চি নাই।

তো, এই ভ্যারিয়েশন এবং তার উপর চলা ন্যাচারাল সিলেকশনের মাধ্যমেই কোটি কোটি প্রজন্ম ধরে বিবর্তিত হয়ে আজ আমরা এই দুই লিঙ্গের প্রজাতিতে এসে পৌঁছেছি। স্বাভাবিকভাবেই বিবর্তনের মাধ্যমে আমরা নারী-পুরুষেরা আমাদের দেহে স্ব স্ব রিপ্রডাক্টিভ অ্যাপারেটাস পাওয়ার সাথে সাথে এগুলোকে ব্যবহার করার জন্য যে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ দরকার হয়, সেটাও পেয়েছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সবকিছুর ভ্যারিয়েশনের মতো এই আকর্ষণ বোধেও ভ্যারিয়েশন থাকে। বেশিরভাগই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হলেও কেউ কেউ হয় সমলিঙ্গের প্রতি। অর্থাৎ, প্রকৃতি আমাদেরকে সন্তান জন্মদানের উপযোগী নারী-পুরুষরূপে তৈরি করা সত্ত্বেও নেহাত মিসফায়ারবশত কাউকে কাউকে অনিচ্ছুকরূপে তৈরি করে থাকে। এরকম আরো কিছু মিসফায়ারের ফসল আমরা প্রত্যেকেই বয়ে বেড়াচ্ছি। আপনি ছেলে হয়ে থাকলে একবার নিজের দিকে তাকিয়ে বলুন আপনার স্তনবৃন্ত কী কাজে আসছে।

কিন্তু রিসার্চে প্রমাণিত হয়েছে সমকামিতা জেনেটিক নয়।

ভুল। গবেষকেরা চেষ্টা করেছিলেন সমকামিতার জন্য কোন জিন দায়ী কিনা খুঁজে দেখতে। দেখা গেছে, চোখের আইরিস বা চুলের রঙের মতো ‘গে জিন’-কে যতটা সোজাসাপ্টা মনে করা হয়েছিল, আসলে তা নয়। আইডেন্টিক্যাল টুইনদের মধ্যে পরিচালিত বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যেখানে দু’জনেরই সমকামী হবার কথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেরকম হচ্ছে না। এর থেকে আসলে এটা প্রমাণিত হয় না যে সমকামিতার জন্য কোন জিন দায়ী নয়। এপিজেনেটিক্সের গবেষণা থেকে আমরা জানি পরিবেশগত প্রভাবকের উপস্থিতিতে বিভিন্ন জিনের এক্সপ্রেশন কীভাবে বদলে যেতে পারে। আইডেন্টক্যাল টুইনরা জেনেটিক্যালি ১০০% এক হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে তাদের জিনগুলো একইভাবে এক্সপ্রেস করে না সবসময়। বিভিন্ন প্লায়োট্রপিক জিনের এক্সপ্রেশনের উপর নির্ভর করে অন্য আরো অনেক জিন কীভাবে আচরণ করবে। এগুলোর একটিতে এপিজেনেটিক পরিবর্তন ঘটলে অন্য অনেক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। আইডেন্টিক্যাল টুইনদের সমকামিতার ক্ষেত্রেও এরকম কিছু ঘটার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

সমকামিতার কারণ হিসেবে ইতোমধ্যেই বেশ কিছু জেনেটিক মার্কার খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা।[২] কিন্তু এ নিয়ে শেষ কথা বলে দেবার সময় এখনো আসে নি। এখনো অনেক গবেষণা চলছে এ নিয়ে, হয়ত ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে অন্যান্য সব প্রাণী প্রজাতির মতো মানুষের মাঝেও সমকামিতার অস্তিত্ব বিদ্যমান। সমকামিতা একটা brute fact, এর ব্যাখ্যাটাই কেবল অজানা।

বুঝলাম, কিন্তু সেক্স তো কেবল সন্তান জন্মদানের জন্যই। শিশ্নের সঠিক স্থান হলো যোনি। পায়ুকামকে কোনভাবেই প্রাকৃতিক বলা যায় না, এটা বিকৃতি।

এ ধরণের ফ্যালেইশাস আর্গুমেন্টকে বলা হয় appeal to nature। প্রাকৃতিক না হলেই কোন কিছু বিকৃত হয়ে যায় না। তা-ই যদি হয়, তাহলে হস্তমৈথুন বা স্বপ্নদোষও বিকৃতি। চুল-দাড়ি কামানো বা যৌনকেশ শেভ করাও তাহলে বিকৃত কাজ। খৎনা করাও বিকৃতি। সেক্সের উদ্দেশ্য কেবল সন্তান জন্মদান হয়ে থাকলে কনডম বা অন্য কোন কন্ট্রাসেপ্টিভ মেথড ব্যবহার করাও মানসিক বিকৃতি। অসুখ হলে চিকিৎসা করা, ভ্যাক্সিন নেয়া, গাড়িতে চড়া, সিনেমা দেখা, ফ্যানের বাতাস খাওয়া, ফেসবুকিং করা, এমনকি কাপড়চোপড় পড়াও বিকৃত রুচির পরিচায়ক। লিস্ট বড় হয়ে যাচ্ছে? এর চেয়ে বরং আমরা সারাদিনে প্রাকৃতিক কোন কাজগুলো করি তার লিস্ট করুন, এক পেইজেই এঁটে যাবার কথা।

সমকামিতা একটা মানসিক রোগ।

আর সব ব্যাপারে পণ্ডিতি করেন ঠিক আছে, অন্তত ক্যানভাসারের লিফলেট পড়া জ্ঞানে চিকিৎসাবিজ্ঞান কপচাতে আসবেন না। রোগ নির্ণয়ের জন্য মেডিক্যালে পড়ে আসা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা আছেন, তাদের মতামত নিন, নিজে রোগ ডায়াগনোজ করতে যাবেন না কখনো। এ উপদেশটুকু মাথায় রাখুন, হিতে আপনারই উপকার হবে।

একসময় রাম-শ্যাম-যদু-মধু থেকে শুরু করে মনোবিজ্ঞানীরা পর্যন্ত সমকামিতাকে রোগ বলেই মনে করতেন। এর চিকিৎসায় লবটমি, কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন, ইলেক্ট্রিক শকের মতো নানারকম যন্ত্রণাদায়ক কনভার্শন থেরাপির পরে যখন দেখা গেলো সমকামীকে কোনভাবেই বিষমকামীতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না, তখন হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় একসময়। এটা এখন একটা সায়ান্টিফিক কনসেন্সাস যে, সমকামীকে বিষমকামীতে রূপান্তর করা অসম্ভব।[৩]

অনেক রোগই তো থাকে অনিরাময়যোগ্য, এটাও কি তাহলে অমন কিছু? মোটেও না। রোগ নির্ণয়ের ক্রাইটেরিয়াগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় এ লাইনে কাজ করা গবেষকদের সম্মতিক্রমে বিশ্বের সব বড় বড় স্বাস্থ্য সংস্থাই ঘোষণা করেছে যে সমকামিতা কোন মানসিক রোগ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে নামজাদা সাইকোলজিস্টদের সংগঠন আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসসিয়েশনের পর ১৯৯০ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনও ঘোষণা করে যে সমকামিতা কোন রোগ নয়।[৪] কোন মানসিক কন্ডিশন যদি কারো ব্যক্তি বা কর্মজীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলেই সেটিকে রোগ বলে চিহ্নিত করা হয়। রোগ চেনার আরেকটা সহজ উপায় হচ্ছে এটা কোন শারীরিক বা মানসিক যন্ত্রণার কারণ কিনা দেখা।[৫] সমকামিতার ক্ষেত্রে এমন কিছুই পরিলক্ষিত হয় না। সমকামীরা ব্যক্তি জীবনে যেমন সুখী, কর্মজীবনেও দারুন সফল। ওদের প্রতি সমাজের নির্মমতাই ওদের সুখী জীবনকে ব্যহত করে।

তবু সমলিঙ্গ বিবাহের আইনিকরণ সমর্থন করতে পারি না। এটা ধর্মে নিষেধ।

আপনার ধর্মে আন্তঃবিশ্বাস বিবাহ নিষেধ বলে কি সেটা সবারই মানা? আপনার ধর্মে প্রেম করা নিষেধ, তাহলে কি সরকারের উচিৎ ছেলে-মেয়ে প্রেম করাও বেয়াইনি করে দেয়া? আজকে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে বেয়াইনি করতে বলবেন, সেটা করলে কাল বলবেন প্রেম বেয়াইনি করতে। এভাবে আশকারা পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে এরপর হয়ত বলে বসবেন, ধর্মে মূর্তিপূজাও নিষেধ, অতএব…

ধর্মে নিষেধ থাকলে আপনার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আপনি বসে থাকুন, তা দিয়ে অন্যের ন্যয্য অধিকারকে ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালাবেন না। ধর্ম যার যার, অধিকার সবার।

কথাপ্রসঙ্গে বলে রাখি, হারাম হলেই কিছু যেমন খারাপ হয়ে যায় না, হালাল হলেও তা সবসময় ভালো হয় না। যেমন ধরেন, ইসলামে বউ পেটানো হালাল, কিন্তু আইনে এটা অপরাধ।

তথ্যসূত্রঃ

১। http://www.nhm.uio.no/besok-oss/utstillinger/skiftende/againstnature/index-eng.html

২। http://www.newscientist.com/article/dn26572-largest-study-of-gay-brothers-homes-in-on-gay-genes.html#.VZPCUSoa69E

৩। http://www.apa.org/topics/lgbt/orientation.aspx

৪। http://www.psychiatry.org/lgbt-sexual-orientation

৫। http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3101504/


পুনশ্চঃ মুক্তমনাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ তোলা হয় এই বলে যে তারা ইসলাম-বিদ্বেষী, নাস্তিকতার আড়ালে তাদের আসল টার্গেট হচ্ছে ইসলাম। এখানেও ইসলামকে টেনে আনায় আমাকেও আবার একইভাবে ইসলাম-বিদ্বেষী ট্যাগ দিয়ে বসবেন না যেন। যেকোন আলোচনা থেকে ধর্মকে দূরে রাখতে চাই সবসময়। এদেশীদের মধ্যে অন্য কোন ধর্মের লোককে সমকামিতার বিরোধিতায় ধর্মের কান টানতে দেখি নি এখনো। সমকামিতা নিয়ে আলোচনায় বিরোধী পক্ষ যেহেতু বার বার ইসলামকেই টেনে আনছে, তাই এটা নিয়ে কিছু বলাটাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক মনে করেছি। সত্যি বলতে অন্যান্য আরো অনেক বিষয় নিয়ে এদেশীয় মুক্তমনাদের লেখাতেও ঠিক একই কারণেই ইসলাম এসে পড়ে। এজন্য তাদেরকে কেবল ইসলাম-বিদ্বেষী ভেবে ভ্রম হয়, বস্তুত তারা কমবেশি সব ধর্মেরই বিদ্বেষী।

About the Author:

মুক্তমনা ব্লগ সদস্য

মন্তব্যসমূহ

  1. নাস্তিকের ধর্মকথা জুলাই 10, 2015 at 4:38 অপরাহ্ন - Reply

    অভিষেক, কি বলে যে ধন্যবাদ দিবো বুঝতে পারছি না … অভিজিৎ দা’র মত আমিও খুব করে চাইতাম আপনি মুক্তমনায় লেখা শুরু করুন … সেই বিশ্বাসের ভাইরাস, সেলফিশ জিন- এই বিষয়গুলো কেবল আমাকে বুঝানোর জন্যে ফেসবুকে লাইনের পর লিখেছিলেন- কিন্তু মুক্তমনায় পোস্ট দেয়ার ক্ষেত্রে কত আপনার ওজর আপত্তি ছিল … আমি নিশ্চিত জানি, আপনাকে মুক্তমনায় লেখতে দেখলে আজ অভিজিৎ দা’র চাইতে খুশী আর কেউ হতো না … এই কথাটা যতবার মনে হচ্ছে- ততই ইমোশনাল হয়ে পড়ছি …

    প্লিজ লেখা থামাবেন না …

    • অভিষেক জুলাই 12, 2015 at 11:37 অপরাহ্ন - Reply

      মিম নিয়ে ঐ লেখাটিতে প্রায় তিন বছর বিরতির পর প্রথম কমেন্ট করেছিলাম। তা-ও করতাম না, যদি ফেসবুক থেকে ওভাবে রীতিমতো টেনে না আনতেন। প্রথমে পোস্টের মন্তব্যের ঘরেই আলোচনা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অভি দা’র ভয়ে ফেসবুকে মেসেজ দিই। লাভ কী হলো, মেসেজ থেকে আমার বক্তব্য কপিপেস্ট করলেন ব্লগে, টোপ গিলে আমিও সুন্দর মতো চলে এলাম। ভেবেছিলাম অভি দা ভুলে গেছেন। কিন্তু কীসের কী! সেই একই কথা – লিখছেন না কেন? সেদিনের কথাগুলো ভাবতে গেলে আজও চোখ ভিজে আসে…

  2. Manzurul Islam Noshad জুলাই 4, 2015 at 1:47 অপরাহ্ন - Reply

    আপনার অভিষেক হওয়ায় আপনাকে স্বাগতম ও পাশাপাশি যুপোপযোগী বিষয় নির্বাচন করাই ধন্যবাদ। আশাকরি আপনার কাছ থেকে আরো পাবো।

    • অভিষেক জুলাই 6, 2015 at 12:55 পূর্বাহ্ন - Reply

      ধন্যবাদ আপনাকে। চেষ্টা থাকবে আরও লেখালেখি করার। এররকম উৎসাহ পেলে কে না চায় লিখতে বলুন? 🙂

  3. Manzurul Islam Noshad জুলাই 4, 2015 at 1:46 অপরাহ্ন - Reply

    ইসলামে বউ পেটানো হালাল, কিন্তু আইনে এটা অপরাধ।
    সূরা নিশার 3 নং নম্বর আয়াত এটি; যেখানে বলা হয়েছে——–
    ”পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ ধনসম্পদ ব্যয় করে। … স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন করো এবং তাদের প্রহার করো”
    কেমন কথা এটি। সংসার যদি একটি পশুর সাথেও হয় তবে তাতেও তার শরীরে প্রহার অনৈতিক।

  4. বিপ্লব রহমান জুলাই 4, 2015 at 9:23 পূর্বাহ্ন - Reply

    মুক্তমনাায় অভিষেকটি চমৎকার হয়েছে। অভিনন্দন! ?

    • অভিষেক জুলাই 6, 2015 at 12:51 পূর্বাহ্ন - Reply

      অসংখ্য ধন্যবাদ। এতদিন যাদের লেখা পড়ে এসেছি, তাদের কাছ থেকে মন্তব্য পাওয়ার অনুভূতিই অন্যরকম। 😀

  5. প্রসূনজিৎ জুলাই 3, 2015 at 6:50 পূর্বাহ্ন - Reply

    মুমিন দের কথা বাদই দিলাম, আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন মডারেট মুসলমানদেরও কখনো বোঝানো যাবে না যে বিপরীতকামিতার মত সমকামিতাও একটি স্বাভাবিক বিষয়। একজন সমকা্মিকে দেখলেই আরেকজন সমকামি হয়ে যাবে না। একটি ছেলে বা মেয়ের প্রতি আরেকটি ছেলে বা মেয়ের ভালবাসা যেমন শুধুই শারিরীক নয় একটি সামগ্রিক ভাললাগার বিষয়; সমকামিতাও একি জিনিস। এখানে আকর্ষনটি শুধু বিপরীতলিঙ্গের প্রতি না হয়ে সমলিঙ্গের প্রতি হবে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই।
    আর মডারেটদের প্রসঙ্গ আসলে বলতে হয় এরা হচ্ছে জ্ঞানপাপী শব্দের আদর্শ উদাহরণ। কারণ এরা অনেকেই আমার আপনার চেয়ে কম জানে না বরং বেশীই জানে। কিন্তু ধর্ম বা কোরাণবিরুদ্ধ কোনো কিছু মানতে রাজী নয়। অনেকটা ‘সব মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’ মত। তাই তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করা অনেকটা উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর মতই।
    আর যেহেতু এই ‘মহাগ্রন্থ’ সম্পূর্ণ অপরিবর্তনশীল এবং সংস্কারের কথা বলা মানে ঘাড়ে চাপাতির কোপ নিশ্চিত করা; সেখানে আমাদের দেশে সমকামিতা নিয়ে কোনো ইতিবাচক জনমতের আশা করা কাকস্য পরিবেদনা মাত্র। আর তাই যারা আশা করছেন এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা বা বৈজ্ঞানিক তথ্য সমৃদ্ধ প্রবন্ধের মাধ্যমে একটা কিছু হয়ে যাবে তা সম্পূর্ন দিবাস্বপ্ন দেখার নামান্তর।

    • অভিষেক জুলাই 3, 2015 at 3:53 অপরাহ্ন - Reply

      মডারেট মুমিনদের একটা গুণ আছে, সেটা হচ্ছে নিজে যেটা করে, সেটাকে জায়েজ আখ্যা দিতে ধর্মগ্রন্থকে পছন্দমতো ব্যাখ্যা করে নিতে পারে এরা। সমকামিতার ব্যাপারে ব্যক্তিগত প্রেজুডিসের কারণে এখনো এরা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ইন্টারপ্রিটেশনের বাইরে চিন্তা করতে পারছে না। সমকামিতা নিয়ে আরো বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর লেখালেখি চালিয়ে নিতে থাকলে আমার বিশ্বাস এরা পূর্বসংষ্কার থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। ধর্মগ্রন্থকে টুইস্ট করা তখন সময়ের ব্যাপার।

      এদেশে এখনো প্রেম করে বিয়ে করাকেই সবাই মেনে নিতে পারে না। এমনকি ভিন্ন ধর্মে বিয়েই যে সমাজে ট্যাবু, সেখানে সমলিঙ্গের বিয়ে রাতারাতি মেনে নেবে সবাই এমন আশা করাটা বোকামি। তবু সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে, নিজেদের জন্য না হোক, অন্তত আমাদের পরের প্রজন্মের কথা চিন্তা করে হলেও। লেখালেখি করে আসলে বড়জোর জনমত তৈরি করা যায়, অচলায়তন ভাঙতে এটাই বা কম কী?

  6. তানভীর জুলাই 2, 2015 at 8:01 অপরাহ্ন - Reply

    মুক্তমনায় লেখালিখির জগতে স্বাগতম! আপনার প্রথম লেখা হলে কী হবে খুবই পরিণত লেখনী! সত্যি বলতে এই বিষয়ে সাম্প্রতি যতগুলো লেখা পড়লাম তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে গোছানো মনে হলো। অভিজিৎ দা অনেক খুশি হতেন আপনাকে শুরু করতে দেখে।

    শিরোনামটা সম্ভবত বিনয়বশত এভাবে দিয়েছেন। কিন্তু লেখাটা মোটেই খেঁজুরে আলাপ হয়নি। বরং এই বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়েছে। আশা করি নিয়মিত আরো অনেক লেখা পাব আপনার থেকে।

    • অভিষেক জুলাই 3, 2015 at 3:51 অপরাহ্ন - Reply

      ধন্যবাদ ভাইয়া। এরকম উৎসাহ দিলে আমার মতো কুঁড়ের বাদশাহর পক্ষেও না লিখে বসে থাকা সম্ভব নয়। ইচ্ছে আছে আরও লেখালেখি করার, আর কতদিন মনের কথাগুলো পুষে রাখা যায় বলেন?

  7. নশ্বর জুলাই 2, 2015 at 6:30 অপরাহ্ন - Reply

    আপনার তথ্যপূর্ণ লেখাটির জন্য অনেক ধন্যবাদ ।

    অজ্ঞতাই সবচেয়ে বেশি দায়ী সমকামীদের প্রতি এ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি…

    • অভিষেক জুলাই 3, 2015 at 3:50 অপরাহ্ন - Reply

      সহমত। সত্যি বলতে, আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের থেকে ভিন্ন অভিরুচির কারও যে ঠিক আমাদের মতোই অধিকার থাকতে পারে – সেটা স্রেফ প্লেটনিক প্রেমভালোবাসাই হোক কিংবা যৌনতা – সামান্য চিন্তা করলেই কিন্তু যে কারও পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব। খুব বেশি যে জ্ঞানগম্যির দরকার আছে এজন্য, তা নয়। ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য। 🙂

  8. জাবেদ হাসান জুলাই 2, 2015 at 6:15 অপরাহ্ন - Reply

    প্রথম পোস্টেই তো হৃদয় কেড়ে নিয়েছেন। চমৎকার লেখা। অনেক কিছুই জানতে পারলাম। যদিও সমকামীদের আলাদা চোখে দেখাটা এম্নিতেই অমানবিক মনে হয় আমার কাছে, তারপরও যাদের সহজে মানবিকতা স্পর্শ করেনা, একেবারে ওভার এন্ড আউট যুক্তি না দেয়া পর্যন্ত যারা মিনমিন করেই যায় তাদের জন্য এই লেখা আয়োডিন হিসেবে ভালো কাজে দিবে।

    • অভিষেক জুলাই 3, 2015 at 3:49 অপরাহ্ন - Reply

      আমার মনে হয় না এতেও কাজ হবে। বিবেকবুদ্ধি কেউ ধর্মের কাছে বন্ধক রেখে দিলে কোন যুক্তিই তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তবু স্বপ্ন দেখে যাই একদিন সবারই ঘুম ভাঙবে। সুন্দর মন্তব্যটির জন্য ধন্যবাদ। 🙂

মন্তব্য করুন