সমকামীদের অধিকার নিয়ে আমার কোন আপত্তি নাই । সাধারণ মানুষের যেসব অধিকার তার সবগুলোই সমকামী, বিষমকামী, উভকামী, অকামী সবার জন্যই প্রযোজ্য ।

সমকামীদের বিবাহের অধিকার নিয়ে দুইখান কথা আছে । প্রথম কথা, আগে বিবাহ কি জিনিস সেটা নিয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারছি না । মানে বিবাহ কি রাস্ট্রের এখতিয়ারভুক্ত কিছু নাকি ধর্মীয় কিছু । দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সংগম ও সন্তান লালন করবে , এটাতে কেউ কিছু মনে করবে না , বিবাহের সংজ্ঞা এইরকম । দুইজন মানুষ নিজেদের সম্মতির ভিত্তিতে সংগম করলে এমনিতেও রাস্ট্রের বলার কিছু নাই । দ্যাট ইজ, আধুনিক নূন্যতম সভ্য রাস্ট্রের । মদীনা ছনদের ভিত্তিতে চলা রাস্ট্রের ক্ষেত্রে না । আবার দুজন যদি তাদের বায়োলজিক্যাল সন্তান, অথবা যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দত্তক নেয়া সন্তান লালন করে সেখানেও রাস্ট্রের বলার কিছু নাই ।

তাহলে কি বিবাহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ? ধর্ম তার নিজস্ব বোঝাপড়া অনুযায়ী তার অনুসারীদের জন্য কোনটা হালাল আর কোনটা হারাম সে দিক-নির্দেশণা দেয় । ধর্ম যেহেতু পরিষ্কার ভাবে সমকামী সম্পর্ককেই অবৈধ বলে ঘোষনা করে সেখানে সমকামী বিবাহের স্বীকৃতির জন্য ধর্মের কাছে ধর্ণা দেয়াটা ছাগলামি । আধুনিক সভ্য সমাজে ধর্ম যেহেতু আপনাকে তার অনুসারী হওয়ার জন্য বাধ্য করতে পারছে না , সেখানে আপনার কেনো ধর্মকে আপনার পছন্দের স্বীকৃতির জন্য চাপ দিতে হবে ? ধর্ম আপনার পছন্দকে মানছে না , আপনিও ধর্মকে টুট টুট বলে সরে আসুন ।

তবে না । আধুনিক রাস্ট্রে নানান দার্শণিক দিক অমীমাংসিত রেখে, নানান হেঁয়ালি রেখেও বিবাহ শেষমেশ রাস্ট্রের এখতিয়ারভুক্ত প্রতিষ্ঠানই রয়ে গেছে । রাস্ট্র বিবাহিত লোকজনকে বেশ কিছু সুবিধা দেয় । সেসব সুবিধা আবার সবার কাছ থেকে ট্যাক্স হিসাবে আদায় করা টাকা খরচ করেই দেয় । যেমন দম্পতিদের জন্য ট্যাক্স ব্রেক, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সহায়তা, কম ভাড়ায় বাড়ি দেয়া, একজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বুড়া বয়সে দুইজনকে পেনশন দেয়া, দম্পতির সন্তানদের জন্য কম খরচে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এইজাতীয় সুযোগ-সুবিধা এইসব ।

এখন কথা হচ্ছে, রাস্ট্র বিবাহিত দম্পতির জন্য এতকিছু যে করে, তার সবকিছুই একটা এজাম্পশনের উপর নির্ভর করে । সেটা হচ্ছে বিবাহিত দম্পতি, গড়পড়তা, সন্তান উৎপাদন এবং লালন করবে, যারা সমাজকে চলমান রাখবে যখন এক জেনারেশন বুড়ো হয়ে রিটায়ার্ড করবে তখন । সমাজকে চলমান রাখা যেহেতু সমাজের সবার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, সেটা আপনি নিতে চান কি না চান, সেজন্য রাস্ট্র সবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিবাহিত , সন্তান-উৎপাদনশীল লোকজনকে কিছুটা সাহায্য করে ।

সমকামীদের বিবাহে রাস্ট্রের এই এজাম্পসনতো টিকছে না । রাস্ট্র আগে থেকেই নিশ্চিত আপনাদের যুগল থেকে বায়োলজিক্যালি কোন সন্তান আসার সম্ভাবণা নাই । তাহলে রাস্ট্র কেনো আপনাদের জন্য পয়সা খরচ করবে ? হ্যাঁ , আপনারা সন্তান দত্তক নিয়ে রাস্ট্র ও সমাজের চলমানতায় ভূমিকা রাখতে পারেন । কিন্তু সেটাতেতো রাস্ট্র নিশ্চিত না । রাস্ট্র কি তবে আপনাদের এই শর্ত দিয়ে বিবাহ করতে অনুমতি দিতে পারে যে, প্রত্যেক সমকামী বিবাহিত যুগলকে কমপক্ষে দুইজন সন্তান দত্তক নিতে হবে ? না, সেটাও করা সম্ভব না । কারণ সেটা সমকামীদের উপর রাস্ট্রীয় নির্যাতনের পর্যায়ে পড়বে । অনেক বিবাহিত দম্পতি আছে যারা নিজেদের ইচ্ছাতে সন্তান নিচ্ছে না । রাস্ট্রকেতো তাহলে তাদেরও বাধ্য করতে হয় ।

আবার বিষমকামী দম্পতি বিবাহের পর সন্তান উৎপাদনের পর আলাদা হয়ে যেতে পারে । ডিভোর্স নিতে পারে । সেক্ষেত্রেও রাস্ট্র যৌক্তিকভাবে ধারণা করে নিতে পারে, আলাদা হয়ে যাবার পরও তারা নিজেদের সন্তানদের দেখভাল করবে । কারণ বায়োলজিক্যাল সন্তানের উপর বাবা-মা দুইজনেরই প্রানীগত টান থাকবে , যেটা ডিভোর্সের কারণে উধাও হয়ে যাবে না । সমকামী বিবাহিত যুগল কি আলাদা হয়ে যাবার পর দত্তক নেয়া সন্তানের ব্যাপারে একই রকম অনুভব করবে ? হয়তো করবে হয়তো করবে না । রাস্ট্রের পক্ষে , করবে বলে ধরে নেয়াটা অযৌক্তিক । কোন শক্ত বৈজ্ঞানিক কারণ নাই ।

তাহলে কথা হচ্ছে, সমকামী দম্পতি রাস্ট্রের ও সমাজের চলমানতায় কোন ভূমিকা রাখবে কি রাখবে না সেটা নিয়ে রাস্ট্র কোন যৌক্তিক এজাম্পশন করতে পারে না । সেজন্য সমকামীদের বিবাহকে রাস্ট্র স্বীকার না করতে চাইলে আমার কাছে দোষের কিছু মনে হয় না । আমি নিজেও আমার টাকায় সমকামী দম্পতিদের সুবিধা দিতে অনিচ্ছুক । তবে সভ্য গণতান্ত্রিক দেশের স্বিদ্ধান্তকে আমি মেনে নিচ্ছি । ভিতরে উসখুশ থাকলেও । রাস্ট্র এমনিতেও অনেক খাতেই আমার টাকা খরচ করছে যেগুলো আমি পছন্দ করছি না ।

সমকামী বিবাহ নিয়ে ঝামেলাটা দাঁড়িয়ে গেছে একটা মিথ্যা দ্বন্দের (False dichotomy) উপর ভর করে । সমকামী বিবাহেের বিপক্ষে যারা , তারা একেবারে প্যান-প্যাসেফিক বলদ । তাদের ঝামেলা বিবাহ, সন্তান দত্তক এইসব ফাইন পয়েন্ট বাদ দিয়ে একেবারে সমকামী সম্পর্কের গোড়া নিয়েই । তারা সমকাম জিনিসকেই দেখে নিজস্ব কূপমন্ডুকতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মীয় বিষজাত ঘৃণা থেকে । যারা এর পক্ষে কথা বলছে তাদেরও বেশিরভাগ মূলত সেই ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরোধীতা, সকল রকমের মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক করার যে অধিকার, সেখান থেকে করছে । রাস্ট্র, বিবাহের সংজ্ঞা, রাস্ট্রের এখতিয়ারের সীমা এসব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটাকে ভেবে দেখা হচ্ছে না । সমাজের সবাই যদি স্বাভাবিক এ সত্যটাকে, যে সমকামী লোকজনের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিজেদের ভিতর যেমন খুশি তেমন জীবনযাপনের অধিকার আছে , এইটুকু বেসিক অংশে একমত হতো, তাহলে আলোচনাটা আরো যৌক্তিক ও অর্থবহ হতে পারতো ।

আমার যৌক্তিক ঝামেলা এইটুকু । বাকীসব প্রতিক্রিয়াশীল ঘৃণাভরা হৃদয়ের মানুষ যারা আসলে নিজেদের ভিতরে নিজের চাইতে আলাদা লোকজনকে নিয়ে পোষণ করা তীব্র ঘৃণা ও তা থেকে উৎসারিত ভয়ের জন্য সমকামীদের বিবাহ ছাড়াও গোটা পছন্দব্যাবস্থাকেই অপছন্দ করেন , যারা মনে করেন সমকামীকাতে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলে সমকামীরা রাস্তায় বের হয়ে জোর করে সবার পায়ুমৈথুন করবে , বা সমকামীদের কথা মনে হলেই যাদের বমনোদ্রেক হয়, যারা বুঝতে পারেন না সমকামীরা কিভাবে একজন আরেকজনকে লাগাবে , এইসব চুলচামড়া সবাইকে টুট টুট টুট ।

ভালোবাসায় জয় হোক ।

[96 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0