তোমার মাতৃত্বের আবেদন সর্বজনীন ,সর্বকালীন

লেখক: সত্যান্বেষী

ব্যক্তিজীবনে তুমি রুমী-জামীর
স্নেহময়ী মা,
পেশাগত জীবনে একজন অনুকরণীয়
শিক্ষিকা,
সাহিত্যিক,
অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের ঘাতক
দালাল নির্মূল কমিটির আপোষহীন
নেত্রী-প্রতিটি ভূমিকাতেই তুমি
অনন্য,অসাধারণ।
একসময় ছিলে শুধু রুমী-জামীর মা,
১৯৭১-এ পরিণত হলে সকল মুক্তিযোদ্ধার মা
আর আজ তরুণ প্রজন্মের “প্রিয় আম্মা”।
তোমার মাতৃত্বের আবেদন সর্বজনীন, সর্বকালীন।
আজ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।

জাহানারা ইমাম(ডাক নাম জুডু) ১৯২৯ সালের ৩ মে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে এক বাঙালি রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জাহানারা ইমামের বাবা সৈয়দ আবদুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম।

গ্রামের দুরন্ত কিশোরী জাহানারাকে মটকা চাচা (বাবার বন্ধু) বেছে বেছে এমন সব বই উপহার দিতেন যেগুলো তাঁর মেধা ও মননের জগৎকে আলোকিত করেছে। দৃষ্টিকে করেছে দিগন্তবিস্তৃত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নারী শিক্ষা আন্দোলন, মুসলিম সমাজের জাগরণের প্রচেষ্টা, বেগম রোকেয়ার সাধনা- এসব বিষয়ের ওপর রচিত বইগুলো মটকা চাচাই নিয়ে আসতেন জাহানারার জন্যে। আর বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে জাহানারার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একজন গৃহশিক্ষক। জাহানারা তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব ছিলো ইংরেজী, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল আর ইতিহাস পড়ানোর। এই মাস্টারমশাই ছিলেন সাহিত্যপাগল। এই মাস্টারমশাই-এর কল্যাণেই, ওই বয়সেই টলস্টয়, ডস্টয়েভস্কি, ভিকটর হুগো, সেলমা লেগারলফ, শেক্সপীয়র, বার্নাড শ, ন্যুট হামসুন-এর অনেক বইয়ের বাংলা অনুবাদ জাহানারার পড়া হয়ে গিয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথ এবং শান্তিনিকেতন বিষয়েও জাহানারাকে প্রবলভাবে আগ্রহী করে তুলেছিলেন মাস্টারমশাই।

জাহানারার স্বপ্ন ছিলো- বড় হয়ে শান্তিনিকেতনে পড়তে যাবে। কিন্তু সে স্বপ্ন তাঁর সফল হয়নি। মটকা চাচা বাবাকে বলে কয়ে রাজিও করিয়ে ফেলেছিলেন। ডাকযোগে শান্তিনিকেতনে ভর্তির প্রসপেকটাসও এসে পড়েছিলো। কিন্তু ১৯৪১ সালের ৯ আগস্ট পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর খবর পড়ে জাহানারার শান্তিনিকেতন যাবার স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটলো। বাড়িতে বাবার কাছেই তাঁর শিক্ষা জীবনের শুরু। শিক্ষা জীবনে তাঁর বাবা সব ধরনের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। পড়াশুনা করতে জাহানারার ভালো লাগতো না। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়তেই তিনি অস্থির- আর পড়বেন না এরকম একটা সিদ্ধান্ত যখন প্রায় পাকা, তখনই মটকা চাচার (বাবার বন্ধু) কাছে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর উচ্চশিক্ষিতা, সভা- সমিতিতে বক্তৃতা দিতে পটু এবং সাহেব-সুবোদের সঙ্গে কথাবার্তায় চৌকস বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের ছবি দেখে মুগ্ধ জাহানারা সিদ্ধান্ত পাল্টালেন- ‘আমিও বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতের মতো লেখাপড়া শিখব।’ -এভাবেই একজন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত গাঁয়ের দুরন্ত কিশোরী জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ুর জীবনে প্রেরণার উৎস হয়ে তাঁর চিন্তায় মননে ও মেধায় জ্বেলে দিয়েছেন আলোর প্রদীপ।

জাহানারা ষষ্ঠ শ্রেণীর দরজা উতরে গেলেন। তারপর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কারণ, তখন কুড়িগ্রামে মেয়েদের স্কুল ছিল না তাই ছেলেদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে জাহানের নাম থাকবে। সময়মতো তিনি পরীক্ষাও দেবেন; কিন্তু ক্লাস করতে হবে না। বাড়িতে অবশ্য শিক্ষক নিয়োগ করা হলো। দু’জন শিক্ষক। তাঁরা দু’বেলা এসে জাহানারাকে পড়িয়ে যান। ১৯৪১ সালে কুড়িগ্রাম থেকে বদলি হয়ে তাঁরা চলে এলেন লালমনিরহাটে। লালমনিরহাটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার সেন্টার ছিলো না। জাহানারা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেন রংপুর থেকে। দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করলেন জাহানারা ১৯৪২ সালে। ম্যাট্রিক পাস করে জাহানারা ভর্তি হলেন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। সেখান থেকে আই.এ. পাস করে ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বি.এ. পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বি.এড. ডিগ্রি অর্জন করেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলারশীপ পেয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানডিয়াগো স্টেট কলেজ থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এম.এ. পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এম.এ. পার্ট ওয়ান পাশ করেন ১৯৬২ সালে।

জাহানারা ইমামের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতার মাধ্যমে। সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে ১৯৪৮-১৯৪৯ পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ- এর বিদ্যাময়ী গার্লস হাই স্কুলে কর্মরত ছিলেন। বিয়ের পর ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলে সরাসরি প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে আসীন ছিলেন। এরপর তিনি বুলবুল একাডেমির কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী সহ আরও দুইটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ সালে ফুলব্রাইট স্কলার জাহানারা ইমাম আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

এসময় জাহানারা ইমাম নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বাংলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী পরিষদে জুলাই ১৯৮০ সাল থেকে জুলাই ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সদস্য ছিলেন। ক্যান্সার অপারেশনের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইনস্টিটিউটে খন্ডকালীন চাকরি করেছেন। এছাড়াও জাহানারা ইমাম ১৯৬০ সালে এডুকেশনাল বোর্ডের প্রতিনিধি হয়ে সিলেবাস সেমিনারে যান পশ্চিম পাকিস্তানের পেশোয়ারে। পাকিস্তান অলিম্পিক গেমস্-এ খেলোয়াড়দের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। জাহানারা ইমাম ‘গার্লস গাইড’, ‘পাকিস্তান উইমেন্স ন্যাশনাল গার্ড’,’খেলাধুলা’, ‘অল পাকিস্তান উইমেন্স এসোসিয়েশন’ এবং বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ঢাকা বেতারে উপস্থাপিকাহিসেবে অনেক দিন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। জাহানারা ইমাম বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। তিনি ‘ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি মঞ্চে’ শেক্সপিয়ারের একটি নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।

রংপুরের মুন্সিপাড়ার মোহাম্মদ আলী উকিলের কনিষ্ঠ ছেলে শরীফ। এই শরীফের সঙ্গে জাহান-এর একসময় হৃদয় বিনিময় হয়ে যায়। উভয় পরিবারে আলাপ আলোচনার পর শরীফ-জাহানারার প্রেম অবশেষে পারিবারিক স্বীকৃতি পেলো। শরীফুল আলম ইমাম আহমদের সঙ্গে জাহানারা বেগমের বিয়ে সম্পন্ন হলো ১৯৪৮ সালের ৯ আগস্ট। শরীফ ইমাম ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ জাহানারা ইমামের কোল জুড়ে আসে শাফী ইমাম রুমী। এই রুমীই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন দুঃসাহসী গেরিলার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করে শাহাদৎ বরণ করেন। স্বাধীনতার পর শহীদ রুমী বীরবিক্রম (মরণোত্তর)
উপাধিতে ভূষিত হন। প্রাণপ্রিয় সন্তান রুমীকে ঘিরেই জাহানারা ইমাম রচনা করেন অমর গ্রন্থ ‘একাত্তরের দিনগুলি’। জাহানারা ইমামের জীবিত একমাত্র সন্তান সাইফ ইমাম জামীর জন্ম ১৯৫৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর।

জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় অঞ্জলি নামের একটি মেয়ের কথা। কলেজে জাহানারা ইমামের সহপাঠী অঞ্জলি। এই অঞ্জলির মাধ্যমেই কমিউনিজমের পাঠ নেন জাহানারা ইমাম। অঞ্জলি তাঁকে এ সংক্রান্ত বইপত্র পড়তে দিতো। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট যথেষ্ট উদার হলেও কমিউনিস্টদের পত্রিকা ‘জনযুদ্ধ’ দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ভর্ৎসনা করেছিলেন। মেয়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকুক এটা তাঁর বাবা চাননি। শরীফও চাননি। তাই জাহানারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথ ত্যাগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

আমি অনেক বিভ্রান্ত চিন্তাভাবনা ও নিঃসঙ্গ অশ্রুজলের ভেতর দিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম যে আব্বাকে অসন্তুষ্ট করে,শরীফকে অসুখী করে অনিশ্চিত রাজনীতির পথে পা বাড়ানোর আদর্শ আমার নেই। আমি আমার প্রেমকে ত্যাগ করতে পারলাম না, আমি আমার অস্ফুট, অপরিনিত রাজনৈতিক মতাদর্শকেই ফিরিয়ে দিলাম।

কলেজ জীবনে নেয়া এই সিদ্ধান্তে আজীবন অটল থাকতে পারেননি জাহানারা ইমাম। তাঁর মাঝে আগুন ছিলো, সে আগুন বরাবরই ছিলো নাকি একাত্তরে প্রতিদিন একটু একটু করে সংগৃহীত হয়েছে সমাধি- তারপর তা ধিকিধিকি জ্বলেছে আগুনে, আর দাবানলের মতো দেখা দিয়েছে বিশ বছর পর। একাত্তরের দিনগুলো যিনি পড়েছেন তিনি জেনেছেন জাহানারা ইমাম থেকে শহীদ জননীতে তাঁর রূপান্তরের ইতিহাস। স্বামী, দুই পুত্রসন্তান,আত্মীয়-পরিজন নিয়ে সুখে আর স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার ছিলো তাঁর। একাত্তর এসে উপড়ে নিল তার শান্তি আর স্বস্তির ভিত। ছেলে যুদ্ধে যাবে। ছোট ছেলে জামীকে পাশে বসিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন তিনি নিজে। পেছনে শরীফ আর রুমী। কতটা ইস্পাত কঠিন মনোবলের আধিকারী হতে হয় এই স্বদেশের জন্য যাত্রায়। সেক্রেটারিয়েটের সেকেন্ড গেটের কাছে এয়ারব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমে গেলো সূর্যের মতো পুত্র রুমী। পেছনে তাকাতে নিষেধ ছিলো । রিয়ারভিউ মিররে তাকে দেখার চেষ্টা সফল হলো না। জনস্রোতে ততক্ষণে সে মিশে গেছে।

লোহার সাঁড়াশি যেন পাঁজরের দু’পাশে চেপে ধরে মায়ের, নিশ্বাস আটকে আসে, চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার উপায় নেই। রুমী ফিরে আসে অল্পক্ষণের জন্য, আবার চলে যায়। মার্কিণ নভোচারীদের চন্দ্রাভিযান দেখে মায়ের মনে হয় আহা! তিনি যদি একটা টুটো-ফুটো আকাশযান পেতেন তাহলে কয়েক মাইল দূরে মেলাঘরে গিয়ে এক পলক দেখে আসতেন ছেলেকে। কিন্তু তা হয়না। মা নিজেই নেমে পড়েন কাজে। খবরা-খবর আনা নেয়া, কাপড় চোপড় ওষুধপত্র সংগ্রহ আরো কতো কি! তারপর আসে সেই ভয়াল দিন । ২৯শে আগষ্ট। বাড়ি ঘেরাও করে পাকিস্তান বাহিনী, ধরে নিয়ে যায় রুমী,জামী, শরীফ কে। দুদিন পরে ফিরে আসে জামী আর শরীফ অত্যাচার সয়ে। আসেনা কেবল রুমী। বাবা ফিরে এলেও প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। এমপি হোস্টেলে তার বুক থেকেই তো কেড়ে নিল রুমীকে জল্লাদের দল! তারপর রুমীকে কিভাবে হত্যাকরা হয় তা কল্পনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই পিতার। সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াতে বেড়াতে হার মানলেন শরীফ ইমাম। ১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১, আর এক ঝড় এলো জাহানারার জীবনে। হার্ট এ্যাটাক করলেন শরীফ। অনেক কষ্টে তাঁকে হাসপাতালেও নেয়া হলো। তার কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল পিজির কর্তব্যরত দুজন ডাক্তার শরীফ ইমামের দু’পাশে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিচ্ছেন। জাহানারা জানতে চাইলে- আপনারা মেশিন লাগাচ্ছেন না কেন? একজন ডাক্তার হাত দিয়ে শরীফ ইমামের বুকে চাপ দিতে দিতে বললেন- লাগাবো কি ভাবে। হাসপাতালের মেইন সুইচ তো বন্ধ। আজ তো ব্ল্যাক আউট!সেই ব্ল্যাক আউট সত্য করে জাহানারার জীবন থেকে চলে গেলেন শরীফ ইমাম। তাঁর কুলখানির দিন রেসকোর্স এ আত্মসমর্পন করলো পাক বাহিনী।
কেবল সে বিজয় দেখা হলো না পিতা-পুত্রের।

১৭ই ডিসেম্বর ফিরে এলো রুমীর সহযোদ্ধারা। কেবল ফিরল না রুমী। যে সত্য কে মেনে না নিতে রোজ নিজেকে সাহস যুগিয়েছেন জাহানারা, তা তাকে মানতেই হলো অবশেষে। শহীদ হয়েছেন রুমী আর জাহানারা হলেন শহীদ জননী। বিশ বছর পর সঞ্চিত দুঃখ, ক্ষোভ, বেদনায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন-

“যাহারা তোমার বিষাইছে বাযু, নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ,তুমি কি বেসেছ ভালো?”

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার বিরোধীতার অপরাধে স্বাধীন বাংলাদেশে যার নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছিল সেই নাগরিকত্বহীন নরঘাতক গোলাম আযম কে যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দল জামায়াতে ইসলামীর আমীর ঘোষণা করলে বাংলাদেশে জনবিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসরদেরবিচারের দাবিতে প্রতিকূল একসময়ে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। তিনি হন এর আহ্বায়ক। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। সর্বসম্মতিক্রমে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। এই কমিটি ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’ এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণআদালাতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদন্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

জাহানারা ইমাম গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেনঃ এডভোকেট গাজিউল হক, ডঃ আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, সুফিয়া কামাল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শওকত ওসমান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) কাজী নুরুজ্জামান, লেঃ কর্ণেল (অবঃ) আবু ওসমান চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার শওকত আলী খান।

গণআদালত অনুষ্ঠিত হবার পর সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর লাখো জনতার পদযাত্রার মাধ্যমে জাহানারা ইমাম ১২ এপ্রিল ১৯৯২ সালে গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিসংবলিত স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদের মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পেশ করেন। ১০০ জন সাংসদ গণআদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন।

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপি গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। সরকার ৩০ জুন ১৯৯২ সালে সংসদে ৪ দফা চুক্তি করে। ২৮ মার্চ ১৯৯৩ সালে নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায় । পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম, এবং তাঁকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি এবং শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। পত্র-পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন জাহানারা ইমাম। গোলাম আযমসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে।

২৬ মার্চ ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেত্রত্বে গণতদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। এই ঘৃণ্য আটজন যুদ্ধাপরাধীর নামঃ আব্বাস আলী খান, মতিউর রহমান নিজামী, মোঃ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আব্দুল কাদের মোল্লা ।

২৬ মার্চ ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। গণতদন্ত কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেনঃ শওকত ওসমান, কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, অনুপম সেন, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, খান সারওয়ার মুরশিদ, শামসুর রাহমান, শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক এবং সদরুদ্দিন। এই সমাবেশে আরো আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্ত
অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়।

সার্বিক শোষণ ও বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য যেমন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী যারা নির্বিচারে পাকিস্তানিদের সাথে গণহত্যা,ধর্ষণ,লুটে অংশ নিয়েছিল,সহযোগিতা করেছিল সেই সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে নেত্রী হিসেবে জাহানারা ইমাম আবির্ভূত হয়েছিলেন। অথচ তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার সেই গোলাম আযমের বিচার দাবি করায় জাহানারা
ইমামের নামে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়।

তবু থেমে থাকেননি জাহানারা ইমাম। মামলা মাথায় নিয়ে চালিয়ে গেলেন আন্দোলন। কিন্তু মরণব্যধি ক্যান্সার তার মনের সাহসী যাত্রাকে থামিয়ে দেয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ২রা এপ্রিল ১৯৯৪, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে মিশিখান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশ্যে দেশত্যাগ করলেন। ডাক্তার এবার জানালেন আর সম্ভব নয়। এবার শুধু অপেক্ষা মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়ার। মৃত্যু শয্যায় থেকেই কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতেন আন্দোলনের পরামর্শ।

তার লেখা খোলা চিঠি

“আমার সহযোদ্ধা বন্ধুগণ, আপনারা গত তিন বছর একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী
গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এ
লড়াই আপনাদের, দেশবাসীর অভূতপূর্ব একতা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।

আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল, লক্ষ্য
অর্জন না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাবো না।

মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি।
রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারোর নেই। তাই
আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার মনে
করিয়ে দিতে চাই। আপনারা অবশ্যই আপনাদের কথা রাখবেন। আন্দোলনের শেষ
পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন।

আমি না থাকলেও আমি জানবো, আমার কোটি কোটি বাঙালি সন্তানেরা আপনাদের
পুত্র-কন্যাদের নিয়ে মুক্ত সোনার বাংলায় বসবাস করছেন। এই আন্দোলন এখনো
দূরপথ পাড়ি দিতে হবে।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-মুক্তিযোদ্ধা-নারী-ছাত্র-যুবশক্তি-নারী
সমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে।

তবু আমি জানি, জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল শক্তির উৎস।
তাই গোলাম আযম ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং মুক্তিযুদ্ধের
চেতনা বাস্তবায়নে দায়িত্বভার আমি আপনাদের বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ
করলাম। নিশ্চিত জয় আমাদের হবেই।”

বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো তাঁর। এ সময় ছোট ছোট চিরকুট লিখে প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন। ২২ জুনের পর থেকে তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। সব ধরনের খাবার গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধ প্রয়োগও বন্ধ করে দেন। ২৬ জুন ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্টয়েট নগরীর সাইনাই হাসপাতালের বেডে ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি ২৮ জুন থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত শোক সপ্তাহ এবং ৬ জুলাই জাতীয় শোক দিবস পালন করে। ৪ জুলাই বিকেলে বাংলাদেশে আসে শহীদ জননীর মরদেহ। ৫ জুলাই সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদ জননীর কফিন রাখা হয় জনগণের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যে। দুপুরে যোহরের নামাযের পর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নামাযের জানাযা। জানাযা শেষে শহীদ জননীকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় মুক্তিযুদ্ধের আটজন সেক্টর কমান্ডার শহীদ জননীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।

শ্রদ্ধার্ঘ্য:
স্বাধীনতার পর হৃদয়কে পাথর করে
আমাদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য লিখে
রেখে গেছ “একাত্তরের দিনগুলি’-
মুক্তিযুদ্ধকালীন তোমার রক্তঝরা
স্মৃতিগুলোকে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন
করতে গিয়ে তুমি অনেক কস্ট সহ্য করেছ-
আগেই ছিল দেহে মরণব্যধি ক্যান্সার,
তোমাকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা
দিয়েছিল নরপিশাচরা, রাজপথে পুলিশের
লাঠিপেটার কারণে হাসপাতালে পর্যন্ত
ভর্তি হতে হয়েছিল তোমাকে।
তবু তুমি তোমার নীতির সাথে ছিলে
আপোষহীন।
একথা অনস্বীকার্য যে, চলমান
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তোমারই
আন্দোলনের ফসল।
তোমার আদর্শে উজ্জীবিত তরুণ প্রজন্ম
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে
শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আজ সমবেত,
তাদের মুখে গভীর শ্রদ্ধায় ও ভালবাসায়
উচ্চারিত হচ্ছে তোমার নাম।
আজকে তোমার ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ
রাজাকারমুক্ত,সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে
তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তোমার এ
প্রজন্মের সন্তানেরা অঙ্গীকারবদ্ধ।

যেখানে জীবন বাঁচে মৃত্যু মরে,
তুমি রবে সেখানে।

unnamed

About the Author:

মুক্তমনার অতিথি লেখকদের লেখা এই একাউন্ট থেকে পোস্ট করা হবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. সত্যান্বেষী জুলাই 2, 2015 at 4:43 অপরাহ্ন - Reply

    @বিক্রম মজুমদার,
    ধন্যবাদ মন্তব্যের জন।

  2. সত্যান্বেষী জুলাই 2, 2015 at 4:40 অপরাহ্ন - Reply

    @বিপ্লব রহমান,
    ধন্যবাদ।

  3. বিক্রম মজুমদার জুন 29, 2015 at 12:29 অপরাহ্ন - Reply

    শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে শতকোটি নমস্কার। যাঁর সন্তান দেশের ও দেশবাসীর জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, যিনি নিজে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁকে দেশবাসী কখনো ভুলতে পারবেনা।

  4. বিপ্লব রহমান জুন 27, 2015 at 6:25 অপরাহ্ন - Reply

    ছাত্র রাজনীতির কালে জাহানারা ইমামের গণ আদালতের আহ্বাবানে সাড়া দিয়ে আমরা এই লিফলেটটি ছেপেছিলাম।
    সেল্যুট শহীদ জননী!

    • বিপ্লব রহমান জুন 27, 2015 at 6:27 অপরাহ্ন - Reply

      লিফলেটের ইমেজ আরেকবার দেওয়ার চেষ্টা করছি। এবারও ব্যর্থ হলে আগাম ক্ষমা প্রার্থনা।

মন্তব্য করুন