salam-age-21

১৯৫১ সালের শেষের দিকে প্রিন্সটন থেকে কেমব্রিজ হয়ে পাকিস্তানে ফিরে এলেন আবদুস সালাম। তখনো তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি পাওয়া হয়নি, কিন্তু পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের এম-এ, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-এ এবং বিদেশে গবেষণা ও গবেষণাপত্রের যোগ্যতায় লাহোর সরকারি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে যোগ দিলেন আবদুস সালাম।

সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে সেই সময় আবদুস সালামই একমাত্র তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। তাছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খানের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে আবদুস সালামের সরকারি কলেজের চাকরিটা না চাইতেই তাঁর হাতে চলে এসেছে। পাকিস্তানে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা হয় কলেজগুলোতে, আর স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবদুস সালাম লাহোর সরকারি কলেজের পাশাপাশি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগেও যোগ দিলেন। গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পেলেন তিনি।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক আবদুস সালামের চোখে অনেক স্বপ্ন তখন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি ছাড়া কোন দেশের পক্ষেই উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়। দেশে কারিগরি উন্নয়ন ঘটাতে হলে মৌলিক বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটাতেই হবে। আর গণিত হলো সকল বিজ্ঞানের মূল ভাষা। আবদুস সালাম দেখলেন পাকিস্তানের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গণিত পড়ানো হচ্ছে তা অনেক প্রাচীন। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে অথচ সেই অগ্রগতির কোন ছাপ এসে পড়ছে না পাকিস্তানে এটা মেনে নেয়া যায় না।

আবদুস সালাম সচেষ্ট হলেন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস আধুনিকীকরণে। ফলিত গণিতে তিনি ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম বা তড়িৎচৌম্বকত্ব পড়াতে শুরু করলেন। পড়াতে গিয়ে তাঁর মনে পড়লো ঝাং স্কুলে তাঁর শিক্ষক বলেছিলেন, “বিদ্যুৎ এমন একটা শক্তি যা ঝাং-এর মতো মফস্বলে থাকে না, থাকে লাহোরের মত শহরে।” আবদুস সালাম প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি দেখেছিলেন লাহোর কলেজে পড়তে এসে।

ইউরোপে কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কৃত হয়েছে প্রায় তিরিশ বছর আগে, অথচ পাকিস্তানের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের স্নাতকোত্তর কোর্সের সিলেবাসেও কোয়ান্টাম মেকানিক্স অন্তর্ভুক্ত নয়। সালাম চেষ্টা করলেন মাস্টার্সের সিলেবাসে কোয়ান্টাম মেকানিক্স অন্তর্ভুক্ত করতে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন পাকিস্তানের মত দেশে কোন কিছু পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের কোন সদস্যই আবদুস সালামের কথার কোন পাত্তা দিতে রাজি নন। তাঁরা প্রত্যেকেই আবদুস সালামের শিক্ষক ছিলেন কয়েক বছর আগেও।

কিছুটা হতাশ হলেও একেবারে দমে গেলেন না আবদুস সালাম। তিনি মাস্টার্সের ছাত্রদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স শেখানোর জন্য সান্ধ্যকালীন ক্লাস চালু করলেন। প্রথম ক্লাসে মাস্টার্সের প্রায় সব ছাত্রই মহা উৎসাহে উপস্থিত হলো। আবদুস সালাম খুশি হয়ে ক্লাস শুরু করলেন। তাঁর মনে হচ্ছিলো তিনি তাঁর প্রফেসর চাওলার মতো ছাত্রদের ভেতর গণিতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারবেন।

কিন্তু তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হতে তিনটা দিনও লাগলো না। পরের সন্ধ্যায় দেখা গেলো মাত্র অর্ধেক ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত হয়েছে। তৃতীয় ক্লাসে উপস্থিত ছাত্রের সংখ্যা দাঁড়ালো মাত্র দুই। এই দু’জন ছাত্র রিয়াজুদ্দিন ও ফয়েজুদ্দিন যমজ ভাই। রিয়াজুদ্দিন গণিতে মাস্টার্স করছিলেন আর ফয়েজুদ্দিন পদার্থবিজ্ঞানে। এই দু’জন ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ছাত্রই পরীক্ষায় পাসের জন্য পড়াশোনা করছিলো। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার কোন ব্যাপার না থাকলে কোন কিছু শেখার প্রতি কারোরই কোন আগ্রহ নেই দেখে খুবই হতাশ হলেন আবদুস সালাম। তিনি তাঁর সান্ধ্য ক্লাস বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন।

আবদুস সালাম আরো সমস্যায় পড়লেন যখন দেখলেন তাঁর ক্লাস নেওয়া, পড়ানোর স্টাইল, পরীক্ষার প্রশ্ন কিছুই পছন্দ করছে না তাঁর ছাত্ররা। ভালো ছাত্র বা মেধাবী গবেষক হলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। আবদুস সালামের ক্ষেত্রেও তা প্রমাণিত হলো। তিনি এত বেশি জানেন এবং এত দ্রুত বুঝতে পারেন যে তাঁর ছাত্ররা তাঁর সাথে গতি মেলাতে পারেন না। আর তিনিও প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে এত দ্রুত যান যে তুখোড় ভালো ছাত্র না হলে তাঁর লেকচার বুঝতে পারা সম্ভব নয়।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয় জায়গা থেকেই ছাত্ররা আবদুস সালামের নামে অভিযোগ করতে শুরু করলো। বিশেষ করে পরীক্ষার পর যখন ছাত্ররা দেখলো যে আবদুস সালাম তাঁর বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ধারা বদলে দিয়েছেন। ছাত্ররা আর বই মুখস্ত করে প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারছে না। আবদুস সালামের নামে অভিযোগ জমা হতে শুরু করলো কলেজের প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিনের টেবিলে।

ক্লাসে পড়ানোর জন্য ভালো ছাত্র পাচ্ছেন না, গবেষণা করার কোন সুযোগ পাচ্ছেন না বলে ভীষণ হতাশ অধ্যাপক আবদুস সালাম। তিনি বুঝতে পারছেন নামেই তিনি অধ্যাপক, অথচ অধ্যাপকদের মূল কাজ যে গবেষণা – তার কিছুই হচ্ছে না। কেমব্রিজের পড়াশোনা, গবেষণা কোন কাজেই লাগছে না লাহোরে। নিজেকে যে গবেষণা জগতের সাথে আপ-টু-ডেট রাখবেন সে সুযোগও নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে কোন রিসার্চ জার্নাল নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গবেষণা খাতে একটা পয়সাও খরচ করতে রাজি নয়। আবদুস সালাম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে বেতন পান তাতে নিজে যে ফিজিক্যাল রিভিউর মত জার্নাল কিনে নেবেন সেই সামর্থ্যও নেই তাঁর।

নিজের পরিবার তথা স্ত্রী ও কন্যার সাথে থাকবেন বলেই তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। অথচ তাঁদেরকে মুলতান থেকে নিজের কাছে লাহোরে এনে রাখবেন সেই অর্থনৈতিক সামর্থ্যও অর্জিত হয়নি তাঁর। কলেজের সরকারি কোয়ার্টারের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন তিনি। অথচ প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিন তাঁর দরখাস্তে সুপারিশ করতে রাজি হননি।

লাহোর কলেজের প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিন আবদুস সালামের শিক্ষক ছিলেন। ইংরেজি পড়াতেন তিনি। অক্সফোর্ড থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে স্বাধীন পাকিস্তানে লাহোর কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছেন। কিন্তু আবদুস সালাম যখন সরকারি নির্দেশে চাকরির শুরুতেই সাত বছরের সিনিয়রিটি পেয়ে গেলেন খুবই বিরক্ত হলেন সিরাজুদ্দিন। শুধু সিরাজুদ্দিন নন, কলেজের কোন শিক্ষকই আবদুস সালামের এই উন্নতি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাছাড়া সিরাজুদ্দিন ব্যক্তিগত কারণেও আবদুস সালামকে সহ্য করতে পারছিলেন না।

অনেক বছর আগে আবদুস সালাম যখন বিএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন তখনকার প্রিন্সিপাল জি ডি সন্ধির বড় মেয়ে উর্মিলার প্রেমে পড়েছিলেন আবদুস সালাম। উর্মিলা আবদুস সালামের এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। সালামের এক তরফা প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটেছিলো নিরবে। সালামই সরে এসেছিলেন যখন দেখলেন যে কলেজের প্রফেসর সিরাজুদ্দিনও উর্মিলার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। সিরাজুদ্দিন উর্মিলাকে বিয়ে করেছেন, কিন্তু আবদুস সালামকে তিনি ক্ষমা করতে পারেননি। প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিনের স্ত্রীকে ভালোবাসাই আবদুস সালামের একমাত্র অপরাধ নয়। উর্মিলা ছিলেন খুবই ভালো ছাত্রী। বিএ অনার্সে তিনি রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পেয়ে ফার্স্ট হয়েছিলেন। এ নিয়ে সিরাজুদ্দিনের খুব গর্ব ছিলো। কিন্তু পরের বছর আবদুস সালাম এত বেশি নম্বর পেয়েছিলেন যে উর্মিলার গড়া রেকর্ড একেবারে ভেঙেচুরে যায়। প্রফেসর সিরাজুদ্দিন আবদুস সালামের এই অপরাধ ক্ষমা করতে পারেননি।

আবদুস সালাম ভালো করে পড়াতে জানেন না – ছাত্রদের কাছ থেকে এই অভিযোগ পাবার পর আবদুস সালামকে বকাবকি করলেন প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিন।

“কী শিখে এসেছো বিলেত থেকে যে ঠিকমতো ক্লাসের লেকচারটাও দিতে পারো না? রিসার্চার হিসেবে সাত বছরের সিনিয়রিটি তুমি কীভাবে পেয়েছো আমি জানি না। কিন্তু আমার কোন রিসার্চারের দরকার নেই কলেজে। আমার দরকার ভালো শিক্ষক। সুতরাং তুমি গবেষণা-টবেষণা ওসব ভুলে যাও। কলেজের টিম ওয়ার্কে যোগ দাও।”

“কী ধরনের টিম ওয়ার্ক?”

“অনেক ধরনের টিম-ওয়ার্ক আছে কলেজে। তুমি ছাত্রদের বৃত্তি কমিটির দেখাশোনা করতে পারো, কিংবা হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হতে পারো। অথবা কলেজের ফুটবল ক্লাবের দেখাশোনা করতে পারো।”

“এগুলোর কোন একটা আমাকে করতেই হবে?”

“অবশ্যই করতে হবে। কলেজে চাকরি করবে অথচ টিম-ওয়ার্ক করবে না? তুমিই বেছে নাও কী করতে চাও?”

“যে তিনটি সুযোগের কথা আপনি আমাকে বললেন তার কোনটাতেই আমার কিছু যায় আসে না। আমার জন্য হোস্টেলের সুপার হওয়াও যা ফুটবলের মাঠে বসে থাকাও তাই।”

“যে কোন একটা বেছে নাও। ফুটবল ক্লাব না হোস্টেল?”

“ঠিক আছে, ফুটবল” – ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললেন আবদুস সালাম।

পরের তিনটা বছরে আবদুস সালামের অনেক সময় নষ্ট হয়েছে ফুটবল ক্লাবের পেছনে। তারপরেও প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিন আবদুস সালামের বার্ষিক গোপন রিপোর্টে লিখেছিলেন, “প্রফেসর সালাম সরকারি কলেজের উপযুক্ত নন। তিনি উন্নতমানের গবেষক হতে পারেন, কিন্তু ভালো কলেজ শিক্ষক নন।”

প্রিন্সিপালের রিপোর্টের কারণে আবদুস সালাম কলেজের কোন কোয়ার্টার পাননি। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল কাজি মোহাম্মদ আসলামের বাড়ির একটা রুম ভাড়া নিয়ে পেইং গেস্ট হিসেবে থাকতে হয়েছে তাঁকে আরো দেড় বছর।

১৯৫২ সালে পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষা বিভাগের বিশেষ অনুমতি নিয়ে কয়েক মাসের জন্য কেমব্রিজের সেন্ট জোন্স কলেজে উপস্থিত হলেন আবদুস সালাম। সেন্ট জোন্স কলেজ থেকে সামান্য একটা স্টাইপেন্ড নিয়ে তিনি মাস খানেকের মধ্যেই একটা গবেষণাপত্র তৈরি করে ফেললেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি পাবার তিন বছরের শর্ত পূরণ হয়েছে আবদুস সালামের। আনুষ্ঠানিক ভাবে ডক্টরেট ডিগ্রি পেলেন আবদুস সালাম।

তাঁর থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রুডল্‌ফ পিয়ার্লস। থিসিসের ভাইভায় প্রফেসর পিয়ার্লস সালামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “নিউট্রিনোর কোন ভর নেই মনে করা হচ্ছে কেন?”

প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন ড. সালাম। ফোটনের ভর নেই। আবার নিউট্রিনোরও ভর নেই? কেন এতগুলো ভরহীন কণার আনাগোনা হচ্ছে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে? উত্তর তখনো কারোরই জানা নেই।

লাহোরে ফিরে এসে কাজে যোগ দিলেন আবদুস সালাম। প্রাণহীন ক্লাস নেয়া আর নিজের মতো করে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা নিয়ে চিন্তা করে দিন কাটছে। নভেম্বর মাসে বোম্বের ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ থেকে একটা আমন্ত্রণ পেয়ে খুবই খুশি হয়ে গেলেন আবদুস সালাম। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনক উল্‌ফগং পাউলি হোমি ভাবার ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে এসেছেন। পাউলি যখন জানতে পেরেছেন যে আবদুস সালাম পাশের দেশেই আছেন, দেখা করতে চেয়েছেন তাঁর সাথে। হোমি ভাবাকে অনুরোধ করেছেন আবদুস সালামকে যেন প্লেনের টিকেট পাঠিয়ে নিয়ে আসা হয়।

প্রফেসর পাউলির কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে আবদুস সালাম এতটাই খুশি হয়ে উঠলেন যে কলেজ থেকে ছুটি নেবার কথাও ভুলে গেলেন। দ্রুত এয়ারপোর্টে গিয়ে প্লেন ধরে বোম্বে চলে গেলেন।

খুশি হবেন নাই বা কেন? পদার্থবিজ্ঞানের জগতে তখন উল্‌ফগং পাউলিকে রাজার সম্মান দেয়া হয়। তাঁর কথাকেই শেষ কথা বলে মানেন অধিকাংশ বিজ্ঞানী। পাউলি যখন কোন কিছুর সমালোচনা করেন এমন কড়া ভাষায় করেন যে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরাও ভয় পেয়ে যান।

আবদুস সালামের মনে পড়ছে পাউলির সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের কথা। বছর খানেক আগে জুরিখে একটা বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে ফ্রিম্যান ডাইসনের মাধ্যমে পাউলির সাথে সামান্য আলাপ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সালাম সাথে করে তাঁর রি-নরমালাইজেশান পেপারের ড্রাফ্‌ট নিয়ে গিয়েছিলেন। সাহস করে পাউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “স্যার আমার পেপারটা যদি একটু পড়ে দেখতেন।”

পাউলিকে এরকম অনেক অনুরোধ সামলাতে হয়। পদার্থবিজ্ঞানের সকল গবেষকই পাউলির আশীর্বাদ পেতে চান। পাউলিও তা জানেন। তাই তিনি নতুন গবেষকদের পাত্তা দিতে চান না খুব একটা। সালামের পেপারটার দিকে না তাকিয়েই পাউলি সেদিন বলেছিলেন, “তোমার পেপারটা পড়তে পারবো না, আমার চোখের সমস্যা আছে।”

নিজের মনে একটু হাসলেন আবদুস সালাম। এক বছরের মধ্যে আবদুস সালাম যখন রি-নরমালাইজেশান থিওরিতে নাম করেছেন পাউলির দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে তাঁর সম্পর্কে। তিনি নিজেই তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন।

বোম্বের হোমি ভাবার ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে গিয়ে পাউলির সাথে গবেষণা নিয়ে খুব আলাপ করলেন আবদুস সালাম। মনটা ভালো হবার পাশাপাশি কিছুটা খারাপও হয়ে গেলো তাঁর। টাটা শিল্পগোষ্ঠীর অর্থানুকুল্যে হোমি ভাবা যেরকম একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন বোম্বেতে, এরকম একটা প্রতিষ্ঠান কি পাকিস্তানেও হতে পারে না? পাকিস্তানে তো ধনী মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু সেরকম আশা তিনি কীভাবে করবেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের উদ্যোগে কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়াতে গেলে দু’জনের বেশি ছাত্র পাওয়া যায় না?

বোম্বে থেকে লাহোর কলেজে ফিরতেই প্রিন্সিপাল সিরাজুদ্দিন ডেকে পাঠালেন সালামকে।

“ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছো বলে কি নিয়ম কানুনের উর্ধ্বে উঠে গেছো তুমি?”

“কেন স্যার?”

“কোন ধরনের অনুমতি না নিয়ে তুমি ইন্ডিয়ায় চলে গেলে?”

“স্যার, আমি প্রফেসর পাউলির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তিনি এয়ার-টিকেট পাঠিয়েছিলেন। তিনি যে কত বড় পদার্থবিজ্ঞানী তা যদি স্যার আপনি জানতেন তাহলে এরকম কথা বলতেন না।”

“ড্যাম ইওর পাউলি। আমরা পাকিস্তানি, আমাদের ওসব পাউলি টাউলির দরকার নেই। তোমাকে শো-কজ করা হলো। সাত দিনের মধ্যে শো-কজের জবাব আমি চাই।”

বুদ্ধিবৃত্তির জগতে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছিলেন আবদুস সালাম। অনেক কষ্টে উপর মহলে দেন দরবার করে একটা সরকারি কোয়ার্টার পেয়েছেন। স্ত্রী ও সন্তানকে মুলতান থেকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন মাত্র কিছুদিন আগে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের রাজনীতির আকাশে নতুন দুর্যোগ ঘনাতে শুরু করেছে।

১৯৪৭-এর হিন্দু-শিখ ও মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কিছুই নিজের চোখে দেখেননি আবদুস সালাম। তিনি তখন কেমব্রিজে ছিলেন। লাহোরের অনেক কিছুই বদলে গেছে তারপর। হিন্দু আর শিখদের সবাই লাহোর ছেড়ে চলে গেছে। লাহোরে এখন সবাই মুসলমান। কিন্তু কট্টর ধর্মীয় নেতাদের মনে শান্তি নেই। তাঁদের মনে হচ্ছে করাচির মুসলিম লিগের নেতারা ধর্মকে খুব একটা প্রাধান্য দিচ্ছে না। তাই পাঞ্জাবে অন্য ধরনের ধর্মীয় ইস্যু সৃষ্টি করতে তৎপর হয়ে উঠলো এক শ্রেণির মানুষ। তারা আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার শুরু করলো। তাদের দাবি হলো আহমদিয়াদের অমুসলিম বলে ঘোষণা করতে হবে। আহমদিয়াদের উৎসস্থল কাদিয়ান এখন ভারতীয় ভূ-খন্ডের অন্তর্ভুক্ত। আহমদিয়াদের নতুন কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে পাঞ্জাবের রাবওয়াতে। ‘রাব-ওয়া’ নামটাতেও কট্টরপন্থীদের আপত্তি।

হিন্দু ও শিখদের পোশাক দেখেই তাদের চেনা যেতো। কিন্তু পোশাক, ভাষা, আচার আচরণ দেখে কে আহমদিয়া, কে আহমদিয়া নন তা বোঝা সম্ভব নয়। তবে আহমদিয়াদের মসজিদ আলাদা। কট্টরপন্থীরা আহমদিয়াদের মসজিদে আক্রমণ করা শুরু করলো। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নেতা স্যার মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান তখনো পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। লাহোরের রাস্তায় রাস্তায় জাফরুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে মিছিল হলো। জাফরুল্লাহ খান সহ সকল আহমদিয়াকে পাকিস্তান থেকে বিতাড়ন করার শপথ নেয়া হচ্ছে প্রতিটি মিছিলে। মিছিল করে আহমদিয়াদের মসজিদ দোকান ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ভয়ানক দাঙ্গা হতে লাগলো লাহোরে। মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের প্রাণ যেতে লাগলো।

আবদুস সালাম নিজে ধর্মীয় বিতর্ক থেকে সব সময় দূরে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু নিজে দূরে থাকলেই কি নিরাপদে থাকা যায়? আবদুস সালাম আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। জাফরুল্লাহ খান যে তাঁকে খুব স্নেহ করেন তাও জানে সবাই। আবদুস সালামের ওপর আক্রমণ হওয়াও খুবই স্বাভাবিক সেই পরিস্থিতিতে। স্ত্রী ও শিশু কন্যাকে নিয়ে প্রাণভয়ে নিজের কোয়ার্টার থেকে অন্যের বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে আবদুস সালামকে রাতের পর রাত। নিজেকে ভীষণ অপমানিত মনে করলেন তিনি।

ভয়াবহ দাঙ্গা থামানোর জন্য মিলিটারি নামানো হলো, সামরিক আইন জারি হলো লাহোরে। শক্ত হাতে দমন করা হলো উগ্রপন্থীদের। দাঙ্গার হোতা মৌলানা মওদুদীকে গ্রেফতার করা হলো। কোর্ট মার্শালে ফাঁসির আদেশ হলো মওদুদীর। কিন্তু কিছুদিন পরেই ফাঁসির রায় বদলে মাত্র কয়েক বছরের কারাদন্ড দেয়া হলো তাকে।

দাঙ্গা থেমে গেলেও আবদুস সালামের বিশ্বাস ভেঙে গেলো। তাঁর খোঁজ খবর নিচ্ছেন ইংল্যান্ডের সব পদার্থবিজ্ঞানী। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রুডল্‌ফ পিয়ার্লস সালামের জন্য একটা ফেলোশিপের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু সালাম সেখানে যেতে রাজি হলেন না। কিছুটা পিছুটান তাঁকে তখনো মনস্থির করতে দিচ্ছে না। আবার দেশে থেকেও কোন্‌ কাজে লাগবেন বুঝতে পারছেন না। তাছাড়া তাঁর নিজের দেশেরই কিছু মানুষ তাঁকে নিজের দেশ থেকে নিজের ধর্ম থেকে জোর করে বের করে দিতে চাচ্ছে।

এসময় বেশ ভালো একটা সুযোগ এলো কেমব্রিজ থেকে। প্রফেসর ম্যাক্স বর্ন এডিনবার্গ চেয়ার থেকে অবসর নিয়ে জার্মানি ফিরে যাচ্ছেন। তাঁর জায়গা নিচ্ছেন কেমব্রিজের প্রফেসর নিকোলাস কেমার। ফলে কেমারের ‘স্টোক্‌স লেকচারার ইন ম্যাথম্যাটিক্স’ পদটা খালি হচ্ছে। প্রফেসর সেই পদের জন্য আবদুস সালামের নাম প্রস্তাব করেছেন।

আবদুস সালাম জানেন লাহোরের কর্মজীবনের পরিবেশে চরম হতাশাবোধ তাঁকে ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে বাধ্য করছে। তাঁর ভাষায় তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ‘মগজ পাচারের’ শিকার হলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞানীরা কী চিন্তা করছেন তা আপনাকে জানতে হবে এবং তাদের সঙ্গে আপনাকে কথা বলতে হবে। আমার ভয় হয়েছিল যে আমি যদি লাহোরে থাকি, তবে আমার কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারপর আমার দেশের কোন্‌ কাজে লাগবো আমি? কেমব্রিজে প্রভাষক হওয়া লাহোরে অধ্যাপক হওয়ার চেয়ে অনেক ভালো।”

নিজের দেশ ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছেন এরকম কখনো ভাবেননি আবদুস সালাম। তাই কেমব্রিজে যাবার আগে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে তিন বছরের বিশেষ ছুটি নিলেন আবদুস সালাম। পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার তিন বছরের ছুটিকালীন সময়ে মাসিক ১৮০ রুপি ভাতাও বরাদ্দ করলো আবদুস সালামকে যা তাঁর বাবার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হতো প্রতি মাসে। সেই বছর কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন সালামের বাবা।

১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে আবদুস সালাম তাঁর স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী মেয়ে আজিজাকে নিয়ে চলে গেলেন কেমব্রিজে।

_______
**লেখাটা প্রদীপ দেবের “নোবেল বিজয়ী আবদুস সালাম” – বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়।

[486 বার পঠিত]