হুসার্ল, হাইডেগার ও আধুনিক অস্তিত্ববাদ – ২

<< গত পর্বের পর

ম্যাজি: এই ধারণাগুলো দিয়ে হাইডেগার শুধু মানুষের পরিস্থিতিই নয় বরং স্বয়ং মানব সত্তার অর্থাৎ মানুষের পরিচয়েরই একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছিলেন যা গতানুগতিক যেকোনো দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একেবারে আলাদা। সেই দৃষ্টিভঙ্গিটার সাথে কি এবার আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারবেন?

ড্রাইফাস: আচ্ছা। এটা তো নিশ্চিত যে তিনি কর্তা, ব্যক্তি, মন বা চেতনা থেকে শুরু করতে পারবেন না। আমাদের সত্তার যৌথ উপলব্ধির পটভূমিতে আমাদের চলমান কর্মকাণ্ডকে বর্ণনা করার একটা উপায় তার বের করতে হবে। এটা করার জন্য তিনি মারাত্মক একটা শব্দ বেছে নেন: Dasein (উচ্চারণ: ডাজাইন)। জার্মান ভাষায় ‘ডাজাইন’ অর্থ অস্তিত্ব, একেবারে নিত্য নৈমিত্তিক অস্তিত্ব। কিন্তু শব্দটির দুটো অক্ষরকে যদি আলাদা করে ফেলা হয় তাহলে ‘Da-sein’ অর্থ দাঁড়ায় ইংরেজিতে ‘being-there’ বা ‘সেথা-বিরাজন’। যে পরিস্থিতির সাথে আমরা মানিয়ে চলি, বা যে পরিস্থিতিতে আমরা বিভিন্ন কিছুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করি, ডাজাইন বলতে সেই পরিস্থিতিটা হয়ে যাওয়াকেই বুঝানো হচ্ছে। [এখানে ‘ডা’ বা ‘সেথা’ দিয়ে পরিস্থিতিটার দিকেই ইঙ্গিত করা হচ্ছে, এবং এরকম ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা থেকে যে আমাদেরকে একেবারেই আলাদা করা যায় না সেটাই বলার চেষ্টা করা হচ্ছে।]

ম্যাজি: কিন্তু আমি কিভাবে স্বয়ং একটা পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারি?

ড্রাইফাস: একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আমি যখন গাড়ি চালাচ্ছি তখন—যদি আমার ভৌত দেহের কথা না ভেবে কেবল আমার মানানোতে রত দিকটার কথা ভাবি—আমার ‘সেথা-বিরাজন’ টা নির্দেশিত কাজকর্মের ঐ পরিস্থিতিটার সাথে পুরোপুরি মিশে যায়। আমার দক্ষতাগুলো পরিস্থিতিটার সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। হাইডেগার একটু নিগূঢ় ভাষায় বলেছিলেন, “Dasein is its world existingly.” মানব সত্তা বলতে কী বুঝায় ডাজাইন তার একটা একেবারে নতুন ব্যাখ্যা। মানুষকেই তিনি ডাজাইন বলছেন। এবং “মানব সত্তা” দ্বারা যেমন একজন ব্যক্তিমানুষ বুঝানোর পাশাপাশি মানুষের সার্বিক অস্তিত্বশীলতা বুঝানো যায়, তেমনি ডাজাইন দ্বারাও মানুষের বিরাজ করার গোটা প্রক্রিয়াটাকে বুঝানো যায়, যে প্রক্রিয়ার একটা নিদর্শন হচ্ছে একজন একক ডাজাইন। হাইডেগার দুই অর্থেই ‘ডাজাইন’ ব্যবহার করেছেন। এর ফলে যৌথ পরিস্থিতির মধ্যে পুরোপুরি নিমজ্জিত মানুষের ক্ষেত্রে তিনি যেমন ডাজাইন ব্যবহার করতে পেরেছেন, তেমনি ধীর-স্থির মনে সম্মুখে উপস্থিত কিছু নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ-গবেষণায় রত মানুষকেও ডাজাইন বলতে পেরেছেন। তবে অবশ্যই ডাজাইন যে দশাতেই থাকুক না কেন, সবসময়ই সে একটা যৌথ পটভূমিতে অবস্থিত।

ম্যাজি: আমাদেরকে তিনি যে বিশেষ বিরাজন-প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তাকে শেষ পর্যন্ত মূলগত দিক দিয়ে তিনি সরাসরি সময়ের সাথে মিলিয়েছিলেন, ঠিক না? যেখান থেকেই তার সবচেয়ে বিখ্যাত বইটার শিরোনাম এসেছে। এই সম্পর্কটা কি আমাদেরকে একটু বলতে পারবেন?

ড্রাইফাস: হ্যাঁ, সেটা এখন প্রকাশ করে দেয়াই উচিত। কোনো পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জিনিসের প্রতি এই উন্মুক্ততাকে হাইডেগার আরেকটা নামে ডাকতেন: খোলামাঠ (clearing)। আমাদের একটা যৌথ খোলামাঠ আছে যেখানে আমরা বিভিন্ন জিনিসের মুখোমুখি হই বা বিভিন্ন জিনিসের সাথে মিথস্ক্রিয়া করি, এবং এই খোলামাঠটিকে উন্মুক্ত হিসেবে ধরে রাখার কার্যক্রম অর্থাৎ উন্মুক্তকরণটাই হচ্ছি আমরা। হুসার্লের বিপরীতে হাইডেগার ভাবতেন, সক্কলের একটা যৌথ উন্মুক্তকরণের কর্মকাণ্ড আছে এবং সেই কর্মকাণ্ডের পটভূমিতেই একজন একক মানুষের নিজস্ব উন্মুক্তকরণ সংঘটিত হয়। এই কর্মকাণ্ডের একটা তিন স্তরের কাঠামো হাইডেগার তৈরি করেছিলেন। প্রথম স্তর হচ্ছে পরিস্থিতির সাথে ডাজাইনের ঐকতান (attunement), যাকে মেজাজের (mood) সমার্থক হিসেবেও ভাবা যায়। এই মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকার কারণেই ডাজাইনের কাছে কোনো জিনিস গুরুত্বপূর্ণ ঠেকে, বা ডাজাইন বিভিন্ন জিনিসকে পরোয়া করে, যেমন কোনোকিছুকে তার আকর্ষণীয়, হুমকিজনক, উপকারী, একগুয়ে ইত্যাদি মনে হয়। হাইডেগারের মতে এই ধরণের তাৎপর্যকে গতানুগতিক দর্শনে এতদিন অবহেলা করা হয়েছে, যেহেতু একে সরাসরি কোনো জ্ঞানার্জন, কামনা বা অনুধ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বরং এই সবকিছুর পটভূমি হিসেবে তাকে পূর্বানুমান করে নিতে হয়। ঐকতান আছে বলেই আমাদের যেকোনো পরিস্থিতি সবসময়ই আমাদের কাছে অর্থবহ বা গুরুত্বপূর্ণ ঠেকে। [অর্থাৎ আমরা সবসময়ই কোনো না কোনো মেজাজের মধ্যে নিজেদের আবিষ্কার করি।] আর মেজাজ যে কেবল একজন একক ব্যক্তির মনের মধ্যেই পাওয়া যায় তা নয়। একটা জনসমাগমের একটা যৌথ মেজাজ থাকতে পারে, কোনো কোম্পানির নিজস্ব সংস্কৃতি থাকতে পারে, এমনকি একটা গোটা যুগেরও একটা নির্দিষ্ট সংবেদনশীলতা বা সুবেদিতা থাকতে পারে। সমাজ যে মেজাজগুলো আমাদেরকে দেয় তার মধ্য থেকেই ব্যক্তিকে তার নিজস্ব মেজাজ বেছে নিতে হয়। এবং অবশ্যই মেজাজের ঊর্ধ্বে উঠা কখনো সম্ভব নয়, এক মেজাজ থেকে বেরিয়ে মেজাজহীনভাবে কিছুক্ষণ থেকে তারপর অন্য মেজাজ বেছে নেয়া সম্ভব নয়, বরং একটি মেজাজ থেকে আমরা সরাসরি অন্য একটি মেজাজে পতিত হই।

ডাজাইনকে হাইডেগার সবসময়ই একটা ক্রিয়াপদ হিসেবে দেখতে বলেছেন। তো এই ডাজাইনগিরির দ্বিতীয় গাঠনিক উপাদানকে তিনি বলছেন ‘আলোচনা’ (discourse)। আলোচনা শব্দটা একটু বিভ্রান্তিকর হতে পারে যেহেতু এখানে ঠিক ভাষাগত আলোচনার কথা বলা হচ্ছে না, ‘আলোচনা’ ভাষার ব্যবহারের থেকেও মৌলিক একটা জিনিস, কিন্তু এখানে তিনি একটা চমৎকার শব্দখেলা খেলেছেন যা একটু পরেই পরিষ্কার হবে। বিশ্বটা সবসময় ইতিমধ্যেই ‘গ্রন্থিবদ্ধ’ (articulated)। অর্থাৎ সবকিছু সবসময় যার যার কাজের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সজ্জিত হয়ে থাকে; আমাদের কোনো যন্ত্র ব্যবহার করতে পারার জন্য প্রতিটি যন্ত্রকে অন্য যন্ত্রগুলোর সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। মানুষ এই গ্রন্থিবদ্ধ বিশ্বের কিছু গ্রন্থিকে ছিন্ন করার মাধ্যমেই বিরাজ করে, অর্থাৎ গোঁড়া থেকেই মানুষের উপস্থিতি বিশ্বটাকে ভেঙে একটা নতুন রূপ দিয়ে দেয়। তারপর কোনো একটা যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ সেই নতুন রূপকে আরো নতুন কোনো রূপ দিতে থাকে। তাৎপর্যের এই পূর্ণাঙ্গ কাঠামো থেকে আমি একটি হাতুড়ি তুলে নিলে একটা গ্রন্থি ভেঙে যাবে, তারপর হাতুড়িটা দিয়ে কোনো পেরেক গাঁথতে পারি বা বিপরীত প্রান্ত দিয়ে কোনো পেরেক তুলতেও পারি; দুই ক্ষেত্রে আমি হাতুড়িটার দুই রকম নতুন তাৎপর্য তৈরি করলাম। এবং আমি যা করেছি সে সম্পর্কে কথাও বলতে পারি। যেমন, বলতে পারি যে পেরেক গাঁথা বা তোলাটা সহজ ছিল। সেক্ষেত্রে আমি ইতিমধ্যে যা গ্রন্থিবদ্ধ করেছি তার উপর আরেকটি গ্রন্থি রচনা করব। জিনিসপত্রকে এভাবে বিভিন্ন উপায়ে সজ্জিত করাকেই তিনি আলোচনা বলেছিলেন। যে পরিস্থিতির মধ্যে আমরা নিজেদেরকে আবিষ্কার করি তাকে নতুন রূপ দেয়াই আলোচনা। [এক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের সাথে সর্বদা আলোচনায় রত, এবং সেই আলোচনার অনেক মাধ্যম রয়েছে যার মধ্যে কথা একটি।]

ডাজাইনের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি ইতিমধ্যেই কিছুটা উঠে এসেছে। তা হলো, ডাজাইন সর্বদা নতুন সম্ভাবনার দিকে ধাবমান। আমার হাতুড়ি দিয়ে পেরেক লাগানোর উদ্দেশ্যে হয়ত কোনো ঘর মেরামত করা, আর ঘর মেরামত করার উদ্দেশ্যে আমার মিস্ত্রি পেশার সম্মান রক্ষা। ডাজাইনের নানান যন্ত্র ব্যবহারের কারণকে এদিক থেকে দার্শনিকদের ভাষায় “লক্ষ্য” বলা যেতে পারে। হাইডেগার বলেন, আমাদের সব কর্মকাণ্ড একটা “যার-দিকে” (towards-which) এর প্রতি নিবদ্ধ। এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের গোটা জীবনের যে পরিকল্পনা থাকে সেই চূড়ান্ত বা অন্তিম যার-দিকে কে হাইডেগার বলেছেন “যার-তরে” (for-the-sake-of)। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে হাইডেগার সাধারণ অর্থে “জীবনের” লক্ষ্য বা পরিকল্পনার কথা বলছিলেন না, বরং কেবল বোঝানোর সুবিধার্থে এমন শব্দগুলো ব্যবহার করেছিলেন। আসল ব্যাপার হচ্ছে, প্রাত্যহিক স্বচ্ছ মানানোয় রত ডাজাইন সবসময় নিজের অজান্তেই ভবিষ্যতের দিকে মুখ করে থাকে, অর্থাৎ সে একটা কাজ এই কারণে করে যাতে পরবর্তিতে আরেকটা কাজ করার মতো অবস্থা তৈরি হয়। এবং এই সবকিছুর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি চূড়ান্ত কোনোকিছুর দিকে ধাবিত হতে থাকে, যদিও সেই কোনোকিছুটা সম্পর্কে সে একেবারেই সচেতন নয়। এবং সমাজ প্রদত্ত অনেকগুলো যৌথ যার-তরে এর পটভূমির সাপেক্ষেই আমাদের কোনো সময়ের কোনো একটা কাজের অর্থ থাকে। আমাদের মধ্যে কেবল তখনই ডাজাইন তৈরি হয় যখন আমরা সামাজিকীকরণের মাধ্যমে এক সেট যৌথ যার-তরে অর্জন করি। সুতরাং ডাজাইন ইতিমধ্যেই সংস্কৃতি থেকে আসা অনেকগুলো সম্ভাবনার জগতে বিচরণশীল, এবং সে এগুলোর মধ্যে কোনো একটা সম্ভাবনার দিকে ধাবিত হয়, কিন্তু সেই সম্ভাবনা সে সচেতনভাবে পছন্দ করে না এবং কোনো মুহূর্তেই সে ধাবমান না থেকে পারে না। এই সবকিছুকে হাইডেগার বলেছিলেন বোধ।

সুতরাং এই কাঠামোর স্তর তিনটি হচ্ছে: ইতিমধ্যেই কোনো একটা মেজাজে নিক্ষপ্ত অবস্থায় নিজেদের আবিষ্কার করা যার কারণে কোনোকিছুকে আমাদের কাছে গুরুত্ববহ মনে হয়, কোনো জিনিস ব্যবহার করে তার ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করা, এবং সর্বদা কোনো সম্ভাবনার দিকে ধাবমান থাকা। এই কাঠামোটা আসলে স্বয়ং ডাজাইন এরই গঠন কাঠামো। “বিরাজ ও সময়” এর দ্বিতীয় অংশে হাইডেগার দেখিয়েছিলেন যে, এই কোনো পরিস্থিতিতে বিরাজ করার এই তিনটি স্তর আসলে যথাক্রমে সময়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মাত্রা তিনটির সমার্থক।

ম্যাজি: আসলে আমার শেষে মনে হয়েছিল হাইডেগার বলছেন, বিরাজ করাই সময়। তিনি বোধহয় প্রায় আক্ষরিক অর্থেই বলছিলেন যে, আমরা হচ্ছি সময়ের মূর্তরূপ, বা সংক্ষেপে, মূর্ত সময়।

ড্রাইফাস: তার ভাষায়, ডাজাইন হচ্ছে পরোয়া করা, আর পরোয়া করার কাঠামোটা কালিক। বিরাজন ও সময়ের মৌলিক সম্বন্ধটা বুঝার পথে এটাই হচ্ছে প্রথম পদক্ষেপ।

ম্যাজি: এতক্ষণ যাবৎ আমরা কেবল একজন ব্যক্তি মানুষ নিয়ে কথা বলেছি, অর্থাৎ এতক্ষণ আমাদের ডাজাইন ছিল একবচন। কিন্তু পৃথিবীতে অবশ্যই অনেক মানুষ আছে, এবং একমাত্র উন্মাদ ছাড়া আর কেউই মনে করে না যে, সে ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব নেই। আপনি এতক্ষণ যে বিশ্লেষণটা পেশ করলেন সেটা কিভাবে এই ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে? অন্যান্য কোটি কোটি ডাজাইনের কথা এখানে কিভাবে আসে?

ড্রাইফাস: হ্যাঁ, আসলে তাদের কথা অবশ্যই একেবারে শুরু থেকেই আসতে হবে। হুসার্লের মতো দেকার্তবাদীরা শুরু করে একজন বিচ্ছিন্ন, একক ব্যক্তি থেকে, যার ফলে তাদের জন্য বহির্জগতের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যত কষ্টকর, ভিন্ন মন অর্থাৎ অন্য মানুষের অস্তিত্ব প্রমাণ করাও ততটাই কষ্টকর। হাইডেগার একেবারে ভিন্নভাবে শুরু করেন; ভিন্ন মনের রূপ আমাদের অভিজ্ঞতায় যেভাবে ধরা দেয় তার কাছাকাছি থাকার কারণে তাকে এই সমস্যায় পড়তে হয়নি। আমরা ডাজাইন হই, বা আমাদের মধ্যে ডাজাইন রূপলাভ করে কেবল তখনই যখন সামাজিকীকরণের মাধ্যমে আমরা বেশকিছু মানানোর দক্ষতা, মেজাজ, সম্ভাবনা ইত্যাদি অর্জন করি। ডাজাইন সবসময়ই ইতিমধ্যেই সঙ্গে-বিরাজ করে, অন্য সবার সঙ্গে, [যাকে বলা যায় সহ-বিরাজন।] আর এই দক্ষতাগুলো যেহেতু সামাজিক, সেহেতু ডাজাইন তার সমাজের অন্য সবাই কোনো পরিস্থিতিতে যা করে ঠিক তা-ই করে। আমি হাতুড়ি দিয়ে কিছু একটাকে বাড়ি দেই কারণ আমার সমাজে সবাই হাতুড়ি দিয়ে বাড়িই দেয়। সবাই যেভাবে খায় আমিও সেভাবেই খাই। আমার দেশে সবাই যেভাবে কোনো শব্দ উচ্চারণ করে আমিও সেভাবেই করি…

ম্যাজি: এবং আমাকে সেভাবে উচ্চারণ করতেও হবে, কারণ নইলে কেউ আমার কথা বুঝবে না…

ড্রাইফাস: ঠিক। হাইডেগার বলেছিলেন, মানুষ গতানুগতিক রীতি থেকে বিচ্যুতি সহ্যই করতে পারে না। যেমন, প্রায় সবাই অন্যের ভুল উচ্চারণ শুধরে দিতে তৎপর থাকে। সবাই যা করে তা করাতে প্রায় কাউকেই বাধ্য করতে হয় না। প্রথা মেনে চলতে মানুষ নিজে থেকেই সবসময় ব্যাগ্র থাকে। প্রতিটি মানুষ কিভাবে ডাজাইনে রূপলাভ করে হাইডেগার তা বিস্তারিত বলেননি, কিন্তু আমরা ব্যাপারটা পরিষ্কার করার জন্য এখানে বলতে পারি যে, একটি শিশু যখন সবাই যা করে তা-ই করতে পারে, সবাই যা বলে তা-ই বলতে পারে তখনই বলা যায় তার মধ্যে ডাজাইন আছে। সুতরাং সামষ্টিক রীতির অনুবর্তী হয়ে চলাটা ডাজাইনের গাঠনিক বৈশিষ্ট্য। অবশ্যই এর মানে গণজোয়ার যেদিকে যায় সেদিকেই যাওয়া নয়। হাইডেগার একবার বলেছিলেন, এমনকি সবাই গণজোয়ার থেকে যেভাবে পালায়, কোনো একজন সেভাবেই পালায়। দেখা যাচ্ছে, স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা রীতিই অনুসরণ করি, সবাই যেভাবে স্রোতের বিপরীতে যায় সেভাবেই যাই। হাইডেগার পরিশেষে বলেছিলেন: One is what one does, or Dasein’s self is a one’s self.

ম্যাজি: আপনার বলা বিভিন্ন কথাগুলোকে পাশাপাশি স্থাপন করলে যে চিত্রটা ফুটে উঠে তা বেশ উদ্বেগজনক হতে পারে। আগে আপনি বলেছিলেন, আমরা অধিকাংশ কাজ চিন্তাভাবনা করে অর্থাৎ সচেতনভাবে করি এই ধারণা হাইডেগার উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এখন আবার বলছেন, সবাই যা করে আমরাও তা-ই করি, এবং আমাদের স্বাধীনতা খুবই কম। এই ধারণাগুলোকে একসাথে নিলে তা কি মানুষকে এক প্রকারের জীয়ন্ত লাশে পরিণত করে ফেলে না, যে নিজের পছন্দ মতো কিছু করে না, বাইরের বিভিন্ন চাপের প্রতি প্রায় অচেতনভাবে সাড়া দেয় কেবল?

ড্রাইফাস: সেটা ঠিক। সবাই যা করে কোনো চিন্তাভাবনা না করে তা-ই করে যাওয়া এই সত্তাকে জীয়ন্ত লাশের মতোই লাগে। কিন্তু আসলে একটি বিচ্ছিন্ন, একক ব্যক্তি থেকে শুরু করলে যে কার্তেসীয়/হুসার্লীয় সমস্যার জন্ম হয় তা এড়ানোর জন্য হাইডেগার সবকিছু উল্টো দিক থেকে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছিলেন। প্রথানুবর্তী গণসত্তা থেকে শুরু করার পর তিনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে এর মধ্যেই স্বায়ত্তশাসিত ব্যক্তিসত্তা রূপলাভ করতে পারে। “বিরাজ ও সময়” এর দ্বিতীয় অংশে যথার্থতার (authenticity) ধারণার মাধ্যমে সেটাই দেখানো হয়েছে। অস্তিত্ববাদীরা হাইডেগারের এই অংশটাই নিয়েছিল। এই অংশে হাইডেগার সুপরিচিত ও জনপ্রিয় অস্তিত্ববাদী বিষয়গুলো যেমন মৃত্যু, অপরাধবোধ, পতন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেন যার গভীরে যাওয়ার সুযোগ এখানে নেই। তবে তিনি দেখিয়েছিলেন, অপরাধবোধ ও মৃত্যু উদ্বেগের দুটি সংস্করণ, তাই উদ্বেগ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। হাইডেগারের মতে, ডাজাইন, যেকোনো ডাজাইন, সবসময় এই ব্যাপারে সামান্য পরিমাণে হলেও সচেতন থাকে যে, বিশ্বের কোনো দৃঢ় ভিত্তি নেই, [বিশ্বে যা কিছু ঘটছে তার কোনো অর্থ নেই।] এর দ্বারা আমি যা বুঝাতে চাচ্ছি তা হলো, সবাই যা করে আমারও তা-ই করার কোনো কারণ নেই। কোনো ঈশ্বর আমাকে এমনটা করার আদেশ দেননি, এবং মানব প্রকৃতিও এমনটা দাবী করে না। এই অস্তিত্ববাদী অবস্থান ব্যক্ত করতে গিয়ে হাইডেগার বলেছিলেন, অস্তিত্বই ডাজাইনের সারধর্ম (essence), [এবং এই সারধর্মের বাইরে তার আর কোনো সুনির্ধারিত ধর্ম নেই।] এর অর্থ হচ্ছে, মানব প্রকৃতি বলতে কিছু নেই, আমরা নিজেদের যা ভাবি আমরা তা-ই, আমাদের কাজকে আমরা যেভাবে ব্যাখ্যা করি তা দিয়েই আমাদের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। কিন্তু এটা বেশ অস্বস্তিকর। কোনো ভিত্তি, অর্থ না থাকার কারণে আমরা, হাইডেগারের ভাষায়, উনহাইমলিখ (Unheimlich) বোধ করি, অর্থাৎ বিশ্বকে আমাদের অজানা, অচেনা, ভুতুড়ে, ছমছমে মনে হয়। সেথা-বিরাজ করার এই অস্বস্তিকর, মূলোৎপাটিত অবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই আমাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?’ একটা উপায় হতে পারে পলায়ন; আমরা উদ্বিগ্নতা থেকে পালাতে পারি, সেটা ভুলে থাকতে পারি, যেক্ষেত্রে আগের মতো প্রথানুবর্তী জীবন যাপনই আমাদের ভাগ্য হবে, এবং সবার মতো কাজ করা, সবার মতো কথা বলাকে ব্যবহার করে আমরা অস্বস্তি থেকে মুক্তি খুঁজব। এমনকি আমরা হয়ত প্রাণপন চেষ্টা করে যাব সবার মতো করে কাজ করতে, কথা বলতে, পোশাক পড়তে, যাতে কোনো দিক দিয়েই কোনো উদ্বেগ আমাদের স্পর্শ করতে না পারে। এই কাজটাকে বলা যায় অযথার্থতায় পলায়ন। এটা ডাজাইন বলতে যা বুঝায় তা অস্বীকার করা, বা ডাজাইনের সব সম্পত্তি বিকিয়ে দেয়ার সমতুল্য। কিন্তু ডাজাইনের সম্পত্তি ধরে রাখতে হলে পালানো যাবে না, বরং উদ্বেগকেই আঁকড়ে ধরতে হবে। এটা যদি কেউ করতে পারে, তাহলে চিন্তাহীনভাবে কোনো একটা সম্ভাবনার পশ্চাদ্ধাবনের পরিবর্তে সে চিন্তাভাবনা করে সম্ভাবনা নির্বাচন করতে পারবে, এবং নিজের জন্য মানুষ হওয়ার একেবারে নতুন একটা সংজ্ঞা বানিয়ে নিতে পারবে। এর মানে এই নয় যে, এতদিন যা করে এসেছে তাকে তার থেকে ভিন্ন কিছু করতে হবে। কারণ, সবাই যা করে তা না করলে তো সে নিছক উন্মাদে পরিণত হবে। সুতরাং, সে আগে যা করত তা-ই করতে থাকে, কিন্তু ভিন্নভাবে, একই কাজ এবার সে ভিন্ন ভঙ্গিতে বা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করে। এবার আর সে জীবনের কোনো নিগূঢ় অর্থ বা পরম লক্ষ্য, বা বিশ্বের কোনো যুক্তিসম্মত ভিত্তির আশা করে না। সুতরাং কোনো কাজ সে এই ভেবে করে না যে এটা করলে অবশেষে সে জীবনের অর্থ খুঁজে পাবে, বা কোনো কাজ জীবনের অর্থ যোগান দিতে না পারলে তা ছুঁড়ে ফেলেও দেয় না। আমার এক ছাত্র একবার ব্যাপারটা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিল, “You are able to stick with things without getting stuck with them .”

এভাবে মানুষ যথার্থ বা অথেন্টিক হয়ে উঠে। এবার বিশ্বের সাধারণ পরিস্থিতির প্রতি সাড়া দেয়ার পরিবর্তে মানুষ একটা অনন্য পরিস্থিতির প্রতি সাড়া দেয়। এর কোনো উদাহরণ হাইডেগার দেননি। তবে আমি ব্যাপারটা এভাবে ভাবি। সেই পরিচিত কাঠমিস্ত্রিকেই আবার নিয়ে আসা যাক। দুপুড়ের খাবারের সময় হাতুড়িটি নামিয়ে রেখে মিস্ত্রি চাইলে সবসময় সবাই যা করে তা-ই করে যেতে পারে, অর্থাৎ খাবার খেতে পারে। কিন্তু হয়ত বাইরে যদি সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটতে দেখা যায়, এবং সে যদি যথার্থ হয়, তাহলে সব মিস্ত্রি এই পরিস্থিতিতে সর্বদা যা করে সে তা নাও করতে চাইতে পারে। সে খাবারের কথা ভুলে বাগানে ফুলেদের মাঝে বেড়িয়ে আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো পরিস্থিতিতে সবাই সম্ভাব্য যত কিছু করতে পারে তার থেকে ভিন্ন কিছু করা তার পক্ষে অসম্ভব। সে গায়ের সব কাপড় খুলে বাগানে গড়াগড়ি যেতে পারে না, কারণ লোকে সেটা করে না। কিন্তু তারপরও যথার্থতার সুযোগ আছে। এখানেও সে সবাই যা করে তা-ই করছে, কিন্তু ভিন্নভাবে, সামাজিক মর্যাদা ও অনুবর্তীতায় গা ভাসিয়ে না দিয়ে সে তার অনন্য পরিস্থিতির প্রতি অনন্যভাবে সাড়া দেয়। এই ধরণের জীবন যাপন করলে, অর্থাৎ জীবনের কোনো পরম অর্থ না খুঁজলে এবং কেবল বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি সচেতনভাবে সাড়া দিতে থাকলে মানুষ আর জীয়ন্ত লাশ থাকে না, বরং একজন ব্যক্তি হয়ে উঠে। হাইডেগার বলেছিলেন, এটা মানুষকে নমনীয়, জীবন্ত ও হাসিখুশি করে তোলে। তার মতে মানুষের এভাবেই জীবন যাপন করা উচিত।

ম্যাজি: আপনার এখনকার কথা আগের চেয়ে অন্যরকম লাগছে। এখন মনে হচ্ছে এই দর্শনটা আসলে এক ধরণের ব্যক্তিগত মুক্তির দর্শন।

ড্রাইফাস: হ্যাঁ, কিন্তু এটা এক ধরণের অস্তিত্ববাদী মুক্তিদর্শন। এদিক থেকে এটা সব ধরণের মুক্তিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে নবীন ও সবচেয়ে অদ্ভুত। এখানে যৌন কামনার বা নির্যাতিত শ্রেণীর মুক্তির কথা হচ্ছে না। বরং মুক্তিটা আসছে এই চিন্তা থেকে যে, উন্মুক্ত করার মতো কোনো নিগূঢ়, গভীর অর্থই নেই। ব্যক্তিমানুষের মধ্যেও ফ্রয়েডের বর্ণনার মতো কোনো নিগূঢ় সত্য নেই, বা ইতিহাসের মধ্যেও মার্ক্সের বর্ণনার মতো কোনো সত্য নেই। ডাজাইনের কোনো অন্তর্নিহিত অর্থই নেই। বরং ডাজাইনের এই অস্বস্তিকর ভিত্তিহীনতাকে সাহসের সাথে গ্রহণ করে নেয়ার মাধ্যমেই মুক্তিটা আসে।

ম্যাজি: আলোচনা জুড়ে আপনি বেশ কিছু অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করেছেন। কেবল ডাজাইন-ই নয়, আরো আছে আনরেডি-টু-হ্যান্ড, অ্যাটিউনমেন্ট ইত্যাদি। আপনি একজন মানুষকেই একটা পরিস্থিতি হিসেবে দেখেছেন, এবং যার-দিকে কে বলেছেন যার-তরে। আরো একটা অদ্ভুত কথা ছিল “Dasein is its world existingly.” অধিকাংশ পাঠক হাইডেগারের প্রথম দিককার রচনাতে বিশেষ করে “বিরাজ ও সময়” এর যতটুকু নিয়ে আমরা কথা বললাম ততটুকুতে এসব অদ্ভুত শব্দ দেখে ঘাবড়ে যান। এমনকি আমি বলতে চাই, আমার জীবনে পড়া সবচেয়ে কঠিন ও দুর্বোধ্য বইগুলোর একটা ছিল “বিরাজ ও সময়”। এটা এতই গুপ্তভাষায় লেখা যে অনেকে এর মধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দর্শন থাকার ব্যাপারটাই অস্বীকার করেছেন। যা মোটেই সত্য নয়, আপনার লেখাতেই আপনি হাইডেগারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দর্শনের কথা বলেছেন। আমার প্রশ্নটা এখানেই। হাইডেগার যা স্পষ্ট করতে পারেননি, আপনি সেটা কিভাবে পারলেন? হাইডেগারও আপনার মতো করেই লিখলেন না কেন? এত নিগূঢ় ও দুর্বোধ্য হওয়ার কী দরকার ছিল?

ড্রাইফাস: আসলে উত্তরটা আমার এতক্ষণের আলোচনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। আমি কোনো জটিল দার্শনিক ধারণাকেও প্রাত্যহিক ব্যবহার্য একটা শব্দ দিয়ে বর্ণনা করেছি, এবং তারপর পিছু হটে আবার বলে দিয়েছি যে প্রাত্যহিক শব্দটা যথার্থ নয়, এবং আসল দার্শনিক শব্দটা এই। হাইডেগারও যদি এমনটা করতেন তাহলে হয়ত আরো ভালো হতো। যেমন, আমি লক্ষ্য শব্দটা ব্যবহার করেছি, কিন্তু পরে আবার বলে দিয়েছি যে লক্ষ্য একটা মানসিক ব্যাপার, এবং সত্যিকার অর্থে আমাদের মনে কোনো সুচিন্তিত লক্ষ্যই থাকে না। একইভাবে জীবনের পরিকল্পনার কথা বলা যায়, যা গতানুগতিক অর্থে কোনো পরিকল্পনাই নয়। তারপর আমি হাইডেগারের অদ্ভুতুড়ে নবশব্দগুলোও উল্লেখ করেছি, যেমন মন-বহির্ভূত লক্ষ্য ও পরিকল্পনাকে বলেছি যথাক্রমে যার-দিকে ও যার-তরে। একইভাবে আমরা ডাজাইন এর মতো শৈল্পিক শব্দ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে, আমরা অধিকাংশ সময় যৌথভাবে সমাজ ও বিশ্বের মধ্যে বিরাজমান, এবং খুব সামান্য সময়ই সচেতন ব্যক্তি হিসেবে কোনো বস্তুর দিকে নিবদ্ধ থাকি। হাইডেগার বলতেন, হাজার বছরের গোটা দর্শনচর্চাটা আমাদের বিরাজনের সত্যিকারের রূপটাকে পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়েছে, এর প্রথম কারণ সবকিছু মসৃণভাবে চলতে থাকলে সেই বিরাজনের ব্যাপারটা আমরা বুঝতেই পারি না, আর দ্বিতীয় এবং প্রথমটির সাথে সম্পর্কিত কারণটা হচ্ছে, সেই বিরাজন ফুটিয়ে তোলার মতো কোনো শব্দও আমাদের ভাষাতে নেই। বিশ্বের কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করার জন্য আমাদের ভাষা আছে, যেমন দরজার বেশি টাইট হাতল, বা বেশি ভারী হাতুড়ি বুঝানোর জন্য আমাদের শব্দ আছে। কিন্তু সবকিছু একেবারে স্বচ্ছ ও মসৃণভাবে চলতে থাকলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা ফুটিয়ে তোলার মতো কোনো শব্দই আমাদের নেই, আর আমাদের প্রাত্যহিক কাজকর্মের পটভূমিতে যে যৌথ বোধ আছে সেটা ভাষায় প্রকাশ তো আরো অসম্ভব। এজন্যই হাইডেগার এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটা শব্দভাণ্ডার তৈরি করে নিয়েছিলেন। একবার সে ভাণ্ডারে ঢুকতে পারলে তাকে বেশ কার্যকরি ও মিতব্যয়ী মনে হয়, এবং এই শব্দগুলো হাইডেগার খুব নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব জায়গায় ব্যবহার করেন। একবার “সদাপ্রস্তুত”, “বিদ্যমান” বা “জগৎ-মধ্যে-বিরাজন” এর মতো শব্দগুলো উত্থাপন করার পর তিনি সেগুলো সবসময় ব্যবহার করে যান।

ম্যাজি: এবার তাহলে হাইডেগারের পরবর্তী দর্শনগুলোতে যাওয়া যাক। “বিরাজ ও সময়” প্রথমবার প্রকাশিত হওয়ার সময় বলা হয়েছিল যে, এটা দুই খণ্ডের একটা কাজের কেবল প্রথম খণ্ড। কিন্তু সেই দ্বিতীয় খণ্ড আর প্রকাশিত হয়নি। অনেকে এর কারণ হিসেবে বলেন, হাইডেগার “বিরাজ ও সময়” এর ধারণাগুলো পরবর্তীতে নিজেই পরিত্যাগ করেছিলেন যার ফলে সেটা শেষ করা আর তার কাছে অর্থবহ মনে হয়নি। এই মতপরিবর্তন হাইডেগার গবেষণায় খুবই আলোচিত একটা বিষয় এবং এর একটা গালভরা নামও আছে: ‘die Kehre’ বা ‘দ্য টার্ন’। ‘পরবর্তী হাইডেগার’ বলতে এই টার্নের পরের হাইডেগারকেই বুঝানো হয়, আরে টার্নের আগেরটাকে বলা হয় ‘পূর্ববর্তী হাইডেগার’। এতক্ষণ আমরা যত কিছু বলেছি তার সবই পূর্ববর্তী হাইডেগারের কথা, এবং এটা এখন পর্যন্ত অনেক বেশি প্রভাবশালী হলেও কে জানে হয়ত ভবিষ্যতে পরবর্তী হাইডেগারই পূর্ববর্তীকে ছাড়িয়ে যাবে। তো এই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী হাইডেগারের মধ্যে প্রধান মতানৈক্য কী কী?

ড্রাইফাস: হাইডেগারের ‘টার্ন’ নিয়ে অনেক রকমের ব্যাখ্যা আছে এবং হাইডেগার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এটা খুব বিতর্কিত বিষয়। অনেকে বলেন প্রথমে হাইডেগার সবকিছুর মর্মার্থ একেবারে বুঝে ফেলার দাবী করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে সেখান থেকে সরে এসে কেবল ভাসাভাসা ভাবে বুঝতে পারার কথা বলেন। অন্যদের মতে, তিনি ব্যক্তি নিয়ে চিন্তা করা থেকে সরে এসে সংস্কৃতি নিয়ে ভাবা শুরু করেছিলেন। আমি মনে করি এগুলো সবই সত্য, কিন্তু টার্নের মূল ব্যাপারটা অন্য। এক পর্যায়ে হাইডেগারই স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, তিনি তুরীয় (transcendental) ব্যাখ্যা থেকে সরে এসে অর্থাৎ hermeneutics বর্জন করে ইতিহাসনির্ভর ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই তার দর্শনে নতুন। আগে তিনি এটা করছিলেন না। এতক্ষণ আমি যা বলেছি তা যেন সব যুগে, সব স্থানে সব মানুষের মৌলিক কাঠামো। এমনকি উদ্বেগকেও তিনি সব স্থানে, সব কালে, সব সংস্কৃতির মধ্যে একটা অভিন্ন উপাদান হিসেবে দেখেছিলেন যা থেকে পালাতে হয় বা যাকে আঁকড়ে ধরতে হয়।

পরবর্তী হাইডেগার দেখেন যে, পাশ্চাত্যে বিরাজন বুঝার একটা ইতিহাস আছে, এবং তিনি যে বিরাজ নিয়ে কথা বলছিলেন সেটা আসলে কেবল আধুনিক বিরাজন, যদিও তখন তিনি সেটা টের পাননি। তিনি বিভিন্ন যুগের বিরাজের সংজ্ঞা তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, প্লেটোর আগে গ্রিকরা বিশ্বে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, এবং তখনও তাদের মধ্যে অস্বস্তি ও উদ্বেগ দেখা দেয়নি। কোনো জিনিসকে তারা হয় প্রকৃতির নয় মানুষের সৃষ্টি হিসেবে সানন্দে গ্রহণ করত। পরবর্তী খ্রিস্টান রীতি সবকিছুকে ঈশ্বরের সৃষ্টি হিসেবে দেখা শুরু করে, এবং বলে যে, বিশ্বকে দেখার মাধ্যমেই ঈশ্বরের পরিকল্পনা বুঝে ফেলা সম্ভব। আর আমরা অর্থাৎ আধুনিক পাশ্চাত্য মানুষেরা নিজেদেরকে ব্যক্তি হিসেবে দেখি এবং সকল বস্তুকে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের অভিলাষ পূরণ করতে চাই। এই যুগেরও একেবারে শেষ সময়ে অর্থাৎ বর্তমানে আমরা সবকিছুকে, এমনকি স্বয়ং আমাদেরকেও এক ধরণের সম্পদ হিসেবে দেখছি যাকে বাড়াতে হবে এবং কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। একটা বস্তু, একজন ব্যক্তি, বা একটি প্রতিষ্ঠান হওয়া বলতে কি বুঝায় এগুলো তারই বিভিন্ন সংজ্ঞা। হাইডেগার হলে বলতেন, বিরাজ করার বিভিন্ন বোধ বা বোধগম্যতা আছে, এবং যখন যেমন বোধ উপস্থিত থাকে তখন তেমন ধরণের জিনিস বা মানুষই দেখা দেয়। যেমন হোমার বা তারও আগে গ্রিসে মহাবীর বা বিভিন্ন চমকপ্রদ জিনিস দেখা দিত। খ্রিস্টানরা দেখা পেত সাধু ও পাপী, পুরস্কার ও প্রলোভনের। প্রাচীন গ্রিসে সাধু-সন্ত থাকতে পারত না, থাকলেও তারা হতো কেবল ভয়ানক দুর্বল মানুষ যাদেরকে সবাই মাড়িয়ে চলে যায়। একইভাবে মধ্যযুগে গ্রিক মহাবীর বা মহানায়ক থাকতে পারত না, থাকলেও তারা হতো পাপী-তাপী, অহংকারী ব্যক্তি যারা ঈশ্বরের উপর পরম নির্ভরতাকে অস্বীকার করে সমাজ ধ্বংস করতে চায়। সুতরাং আমাদের সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরণের মানুষ ও জিনিসপত্র দেখা দেয়, এবং পরবর্তী হাইডেগার কেবল এই বিষয়টার দিকেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন যে, বিরাজনের বোধ একটি নয়, অনেকগুলো।

হাইডেগারের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পরিবর্তনটা ভালোভাবে ফুটে উঠে তার উদ্বেগের ধারণা থেকে। পরবর্তীতে তিনি উদ্বেগকে আর কোনো সর্বজনীন কাঠামো মনে করতেন না। প্রাচীন গ্রিকরা সবকিছুর অর্থহীনতা দেখে উদ্বিগ্ন হতো না, এমনকি খ্রিস্টানরাও হতো না। উদ্বেগ, তার মতে, একটা আধুনিক বিষয়, এবং বিরাজ করার মূলহীন, মূলোৎপাটিত, নাস্তিবাদী ও প্রাযুক্তিক বোধের কারণেই আমাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

পরবর্তী হাইডেগার “বিরাজ ও সময়” এর সকল বিরাজনকে ইতিহাসায়িত করে ফেলেন, এমনকি যন্ত্রপাতির বিরাজনকেও। এদিক থেকে দেখলে পরবর্তীতে তিনি কম কান্টের মতো এবং বেশি হেগেলের মতো হয়ে উঠেন। তবে হেগেলের সাথে তার পার্থক্য হচ্ছে, তিনি পাশ্চাত্যের ইতিহাসকে ক্রমান্বয়িক পতনের ইতিহাস হিসেবে দেখেন, যেখানে মানুষ দিনদিন নিজেদের-নিয়ন্ত্রণ-নিরপেক্ষভাবে কোনো বস্তুর অস্তিত্বের বোধটা হারিয়ে ফেলছে, যে বোধটা সক্রেটিস-পূর্ব গ্রিসে ছিল। এবং আধুনিক মানুষেরা এটাও বুঝতে অক্ষম যে, বিরাজনের বোধটা মানুষকে একেবারে শুরু থেকেই দিয়ে রাখা হয়েছে। আমাদের কাজকর্মেই বিরাজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশিত হয়, এটা আমাদের উৎপাদন করতে হয় না, বরং সে-ই আমাদেরকে এমন মানুষ হিসেবে উৎপন্ন করে। হাইডেগারের মতে, তার আগের কোনো দার্শনিকই এটা বুঝতে পারেনি, তবে সক্রেটিস-পূর্ব গ্রিকরা না বুঝলেও এটা অন্তত অস্বীকার করত না যেমনটা দেকার্ত থেকে নিট্‌শে পর্যন্ত সবাই করে এসেছে। আমাদের কাজকর্মের মধ্যে বিরাজনের এই বোধটা ক্রমান্বয়ে ভুলে যাওয়ার এই ব্যাপারটা—যাতে দার্শনিকদের অবদান আছে—হাইডেগারের মতে আবশ্যিক ছিল না। এর কারণ বেশ কিছু ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা, তবে একটা দুর্ঘটনা ঘটার জন্য তার পূর্বের অন্য একটা ঘটা আবশ্যিক ছিল।

ম্যাজি: অর্থাৎ হাইডেগার আগে যে জিনিসগুলোকে মানুষের অভিজ্ঞতার চিরন্তন ও সর্বজনীন ব্যাপার মনে করতেন এবার সেগুলোকেই মনে করছেন সাময়িক ও স্থানীয়। তার মানে তার দর্শনে আগে যা ছিল চিরস্থায়ী এবারে তা ক্ষণজীবী হয়ে গেল, তাই নয় কি? সুতরাং আজ থেকে কয়েক শতাব্দী পরে যখন আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে বিশাল কোনো পরিবর্তন আসবে তখন হয়ত পূর্ববর্তী হাইডেগারের তুলনায় পরবর্তী হাইডেগার বেশি পুরনো হয়ে যাবে। এবং পরবর্তী হাইডেগারের প্রভাব হয়ত তখন আসলেই খুব সাময়িক ও অগভীর মনে হবে।

ড্রাইফাস: আসলে আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি যদি আর আট দশটা সংস্কৃতির মতোই হতো, বা আমাদের সংস্কৃতিরই প্রাচীন ধাপগুলোর মতো হতো তাহলে হয়ত হাইডেগার আপনার সাথে একমত হয়ে বলতেন যে, তার দর্শন অচিরেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। কিন্তু হাইডেগার মনে করেন আমাদের সংস্কৃতিটা খুব অনন্য, এবং আমরা সেই অনন্য সংস্কৃতির খুব অনন্য একটা ধাপে আছি। আমরাই একমাত্র ‘ঐতিহাসিক’ সংস্কৃতি। অবশ্যই যেকোনো সংস্কৃতিতে একটার পর আরেকটা ঘটনা ঘটে, ইতিহাসের ধারার মতোই। কিন্তু আমাদেরটাই একমাত্র সংস্কৃতি যেখানে স্বয়ং বিরাজনের বোধটাই যুগে যুগে পাল্টেছে: গ্রিক থেকে খ্রিস্টান হয়ে আধুনিক আমাদের বিরাজন-বোধ পর্যন্ত। একেই হাইডেগার ঐতিহাসিকতা বলেছেন, এবং তার মতে আমরা বিরাজনের ইতিহাসের একটা বিশেষ পর্যায়ে বাস করছি। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্লেটো বিরাজনকে সকল সত্তার মধ্যে উপস্থিত একটা অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিরাজনকে ভুল বুঝার ধারা শুরু করেছিলেন, [কারণ বিরাজন কোনো বিচ্ছিন্ন বৈশিষ্ট্য নয়, বরং একটা সমগ্র বিরাজের পটভূমিতে একটা নির্দিষ্ট খোলামাঠের মতো যেমনটা আমরা আগে বলেছি।] এর পর বিরাজনের বোধ অনেক দার্শনিক ও প্রায়োগিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়ে আজ প্রায় ‘পূর্ণতা’ লাভ করেছে, এই ছিল হাইডেগারের মত। তার মানে এ নিয়ে যত দার্শনিক খেলা খেলা যায় সবই খেলা হয়ে গেছে, সব আলোচনা শেষের পথে। তার এই ধারণাতে নিট্‌শের প্রভাব আছে। নিট্‌শে মনে করতেন দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের ঈশ্বর মরে গেছে, এবং এ কারণেই আমাদের বর্তমান বিরাজন-বোধ নাস্তিবাদী (nihilistic)। আমরা গোটা গ্রহটা অধিকার করে নেয়ার পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, এবং অচিরেই আমাদেরকে ঈশ্বর বা দার্শনিক সান্ত্বনা বা দিকনির্দেশনা ছাড়া চলতে শিখতে হবে, এই ছিল নিট্‌শের মত। হাইডেগার এর সাথে যোগ করেন যে, বিরাজনের বর্তমান বোধটি অন্য সব বোধকে মুছে ফেলছে, এবং এই প্রাযুক্তিক বিরাজন-বোধটি এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সে আর কোনো দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। হাইডেগার এটাকেই নাস্তিবাদ বলেছিলেন।

ম্যাজি: অস্তিত্ববাদীরা অনেক সময় মানুষের দুর্দশার কথা বলে, এবং আমার মনে হয় দুর্দশা দ্বারা তারা এই ব্যাপারটাকেই বুঝাতে চান। হাইডেগার কি এ থেকে মুক্তির কোনো উপায়ের কথা বলেছেন?

ড্রাইফাস: আসলে প্রথমে দেখা দরকার নাস্তিবাদ দ্বারা তিনি ঠিক কী বুঝাচ্ছেন। তিনি মূলত বুঝিয়েছিলেন যে, বর্তমানে আমাদের আর কোনো অর্থপূর্ণ দিকনির্দেশনা নেই। হাইডেগার ঠিক এই শব্দটা ব্যবহার করেননি, কিন্তু তার উদাহরণ থেকে সেটাই মনে হয়। যেমন তিনি গ্রিক মন্দিরের উদাহরণ দিয়েছিলেন। আমার মতে প্রাচীন গ্রিসের সাংস্কৃতিক প্যারাডাইম ছিল মন্দির যা তাদের কাছে অর্থপূর্ণ ছিল। মন্দির তাদের নায়ক ও খলনায়ক, বিজয় ও সম্মানহানি, বিপর্যয় ও আশীর্বাদ ইত্যাদির জন্ম দিত। মন্দিরের দিকনির্দেশনাই তাদেরকে একটা উত্তম জীবন যাপনে সাহায্য করত। একইভাবে মধ্যযুগের সাংস্কৃতিক প্যারাডাইম ছিল ক্যাথিড্রাল যা তাদেরকে পরিত্রাণ ও অভিসম্পাতের মাত্রা দেখাত, এবং তখনও মানুষ নিজেদের অবস্থান ও করণীয় জানত। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি যত উন্নত হয়েছে আমরা সবকিছুকে ততই বেশি নিছক বস্তু হিসেবে দেখা শুরু করেছি, এবং সবকিছুকে এক মাত্রায় নামিয়ে এনেছি। হাইডেগার হলে বলতেন, প্লেটো থেকে শুরু করে সব দার্শনিকরা একটিমাত্র পরম জিনিসের সন্ধান করে গেছেন যার সাপেক্ষে সবকিছু বুঝা যায়, এবং সেই পরম জিনিসটার মাধ্যমেই সব সত্য বলার চেষ্টা করেছেন। এই দার্শনিক প্রকল্পটা আমাদের বর্তমান বিরাজন-বোধেরই প্রতিফলন যেখানে সবকিছু একমাত্রিক। এমনকি আমরা আর সত্যের সন্ধানও করি না, বরং আমাদের লক্ষ্যবস্তু কেবল সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা। আমরা সবকিছুকে যত সম্ভব নমনীয় করে ফেলতে চাই যাতে সেটা সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। এই মুহূর্তে হাতে একটা স্টাইরোফোমের কাপ থাকলে ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে বুঝানো যেত। স্টাইরোফোম প্রচণ্ড রকমের নিখুঁত একটা জিনিস, এটা গরম জিনিস গরম রাখে, ঠাণ্ডা জিনিস ঠাণ্ডা রাখে এবং ব্যবহার শেষে তা সহজেই ফেলে দেয়া যায়। এটা সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দক্ষতা ও নমনীয়তার সাথে আমাদের চাহিদা পূরণ করে। এর তুলনায় একটা জাপানী চায়ের কাপ একেবারেই আলাদা। জাপানী কাপগুলো খুব সুকুমার, কমনীয়, ঐতিহ্যবাহী এবং সামাজিকীকরণের সহায়ক। এতে চা বেশিক্ষণ গরম থাকে না, কিন্তু তাতে আর তেমন কি আসে যায়। মোটামুটি এক শতাব্দী আগে আমরা এমন একটা পর্যায়ে ছিলাম যখন যেকোনো কিছুকে বাস্তব বা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার জন্য তাকে আমাদের কোনো একটা বাসনা পূরণ করতে পারতে হতো। সেটা ছিল ব্যক্তি-বস্তুর পর্যায়। কিন্তু বর্তমানে একটা সাইবারনেটিক সমাজে আমরা নিজেরাই এক ধরণের সম্পদে পরিণত হয়েছি যেখানে আমাদের সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতাই আমাদের বাস্তবতা নির্ধারণ করে। নিজের ভিতরের সম্ভাবনাগুলোকে যথাসম্ভব বের করে আনার জন্যই আমরা আজ সমাজের সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা করি। বিরাজনকে আমরা এভাবেই বুঝি। এ প্রসঙ্গে স্ট্যানলি কুবরিক এর ২০০১: আ স্পেস অডিসি সিনেমাটার কথা মনে পড়ছে। সিনেমার হ্যাল নামক রোবট চরিত্রটিকে যখন প্রশ্ন করা হয় সে সুখী কি না তখন সে উত্তরে বলেছিল: “আমি আমার সকল সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছি। একটি যুক্তিসম্পন্ন সত্তার এর চেয়ে বেশি আর কী চাইবার থাকতে পারে?” আমাদের বিরাজন-বোধ এর সাথে পরিচিত যে কেউ ঠিক এই উত্তরটাই দিত, এর চেয়ে সুন্দরভাবে ব্যাপারটা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব না। সুতরাং আমরা এমন একটা ব্যবস্থার অংশ যা কেউ নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং ব্যবস্থাটা নিজেই তার সর্বোচ্চ কল্যাণের জন্য তার মধ্যকার সব সত্তার সব সামর্থ্যের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার দিকে এগোতে থাকে।

হাইডেগারের মতে সমস্যাটা হলো, এখন আর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই। আমাদের সময়কেই বা আমরা উত্তরোত্তর আরো বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে চাচ্ছি কেন? শেষ পর্যন্ত ঠিক কিসের তরে? কেবল ভবিষ্যতে আরো বেশি কার্যকরভাবে সময় ব্যবহার করতে পারার জন্য? হাইডেগার মনে করতেন অতি শীঘ্রই আর কোনোকিছুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। নায়ক ও খলনায়কের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না, থাকবে কেবল কর্মদক্ষতা, সবকিছুকে আরো বেশি কার্যকর করা হবে যাতে ভবিষ্যতে সেগুলোকে আরো বেশি কার্যকর করা যায়, অন্য কোনো কারণে নয়। একেই তিনি নাস্তিবাদ বলেছিলেন।

ম্যাজি: এটা শুনে আমার আগের প্রশ্নটি আরো প্রবলভাবে করতে হচ্ছে। এই দুর্দশা থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই?

ড্রাইফাস: হাইডেগার আশাবাদী নন। তিনি মনে করতেন, মানুষ এমনকি ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার রাত্রিটিতে চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তিনি নৈরাশ্যবাদীও নন। তিনি ভেবেছিলেন, অর্থপূর্ণ পার্থক্য এবং স্থানীয় জিনিসের গুরুত্ব হারিয়ে যাওয়ার কারণেই হয়ত মানুষ অকার্যকর বা অদক্ষ জিনিসের গুরুত্ব আবার বুঝতে শুরু করবে—এর নাম তিনি দিয়েছিলেন নগণ্য জিনিসের উদ্ধারক্ষমতা। নগণ্য জিনিস বলতে তিনি সম্ভবত বন্ধুত্ব, বনে বাদাড়ে হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বুঝিয়েছিলেন। তিনি বন্ধুদের সাথে মিলে স্থানীয় ওয়াইন খাওয়া, বা বর্তমান শিল্পকর্মে মজে থাকার কথাও বলেছিলেন। এগুলো বর্তমানে প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার কারণ আর কার্যকর নয়। অবশ্য সুস্বাস্থ্য ও আরো বেশি কর্মদক্ষতার কথা ভেবেও কেউ এই কাজগুলো করতে পারে, যেটা আরো ভয়ংকর। তবে এই কাজগুলো একত্রিত হয়ে একটা নতুন সাংস্কৃতিক প্যারাডাইম তৈরি করে দিতে পারে যাতে এগুলোই হয়ে উঠবে কেন্দ্রীয় বিষয় আর কর্মদক্ষতা হবে প্রান্তিক। অনেকে সত্তরের দশকের রক কনসার্টকে তেমন একটা বিকল্প প্যারাডাইমের পূর্বসূরি ভাবতে শুরু করেছিলেন। সেরকম রক্ষক প্যারাডাইম যদি আসলেই আসে তাহলে আমার বিরাজনকে নতুন আরেকভাবে বুঝতে শুরু করব। মানুষের কাজকর্ম এই কারণেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে তা বিরাজনের একটা সদা পরিবর্তনশীল, ঐতিহাসিক বোধের সাথে যুক্ত। মানুষের বিরাজনের এই অনৈতিহাসিক বিষয়টিকে হাইডেগার আজীবন সত্য মনে করেছেন। বিরাজনের এরকম বোধ আমাদের বর্তমান প্রাযুক্তিক জীবনের পাশাপাশিই চলতে পারে—হাইডেগার অবশ্যই সক্রেটিস-পূর্ব গ্রিসে ফিরে যেতে চান না—ঠিক যেমন জাপানীরা ভিসিআর ও কম্পিউটারের পাশেই তাদের গতানুগতিক চায়ের কাপ ও গেরস্থালির দেবতাদের রাখতে পারে। নাস্তিবাদ থেকে মুক্তি হাইডেগারের দর্শনে সম্ভব, কারণ এই মুক্তির অর্থ বিরাজনের প্রাযুক্তিক বোধ থেকে মুক্তি, প্রযুক্তি থেকে মুক্তি নয়।

ম্যাজি: হাইডেগারের দর্শনের একটা দিক আমরা এখনও আলোচনা করিনি, কিন্তু পরবর্তী অস্তিত্ববাদী চিন্তাবিদদের নিয়ে আলোচনার আগে সেটা করে নেয়া উচিত। সেই দিকটা হচ্ছে, হাইডেগার ভাষা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। আসলে পরবর্তী হাইডেগারকে ভাষা নিয়ে কেবল চিন্তিত বলা যাবে না, তিনি যেন ভাষার চিন্তা দিয়ে পুরোপুরি আচ্ছন্ন ছিলেন। কেন?

[চলবে…]

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. সার্থক জুন 1, 2015 at 1:41 পূর্বাহ্ন - Reply

    মানব প্রকৃতি বলতে কিছু নেই, আমরা নিজেদের যা ভাবি আমরা তা-ই, আমাদের কাজকে আমরা যেভাবে ব্যাখ্যা করি তা দিয়েই আমাদের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়

    কিন্তু এটা বেশ অস্বস্তিকর। কোনো ভিত্তি, অর্থ না থাকার কারণে আমরা, হাইডেগারের ভাষায়, উনহাইমলিখ (Unheimlich) বোধ করি, অর্থাৎ বিশ্বকে আমাদের অজানা, অচেনা, ভুতুড়ে, ছমছমে মনে হয়। সেথা-বিরাজ করার এই অস্বস্তিকর, মূলোৎপাটিত অবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই আমাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?’ একটা উপায় হতে পারে পলায়ন; আমরা উদ্বিগ্নতা থেকে পালাতে পারি, সেটা ভুলে থাকতে পারি, যেক্ষেত্রে আগের মতো প্রথানুবর্তী জীবন যাপনই আমাদের ভাগ্য হবে, এবং সবার মতো কাজ করা, সবার মতো কথা বলাকে ব্যবহার করে আমরা অস্বস্তি থেকে মুক্তি খুঁজব। এমনকি আমরা হয়ত প্রাণপন চেষ্টা করে যাব সবার মতো করে কাজ করতে, কথা বলতে, পোশাক পড়তে, যাতে কোনো দিক দিয়েই কোনো উদ্বেগ আমাদের স্পর্শ করতে না পারে। এই কাজটাকে বলা যায় অযথার্থতায় পলায়ন। এটা ডাজাইন বলতে যা বুঝায় তা অস্বীকার করা, বা ডাজাইনের সব সম্পত্তি বিকিয়ে দেয়ার সমতুল্য। কিন্তু ডাজাইনের সম্পত্তি ধরে রাখতে হলে পালানো যাবে না, বরং উদ্বেগকেই আঁকড়ে ধরতে হবে। এটা যদি কেউ করতে পারে, তাহলে চিন্তাহীনভাবে কোনো একটা সম্ভাবনার পশ্চাদ্ধাবনের পরিবর্তে সে চিন্তাভাবনা করে সম্ভাবনা নির্বাচন করতে পারবে, এবং নিজের জন্য মানুষ হওয়ার একেবারে নতুন একটা সংজ্ঞা বানিয়ে নিতে পারবে।

    আচ্ছা কেউ ধরুন ভিত্তিহিনতা বা অর্থহীনতা কে উপলব্ধি করেছেন ও উদ্বেগ কে স্বীকার করে নিয়েছেন। তবুও তার কাছে এই স্বাধীনতাটা থাকছে যে তিনি নিজের মত করে জীবনের একটা উদ্দেশ্য নির্বাচন করতে পারেন। মানে উদাহরণ স্বরূপ বলি, কেউ জানেন জীবনের কোন পরম উদ্দেশ্য নেই তবু তিনি নিজে ভেবে বুঝে ঠিক করলেন যে সুখ হচ্ছে তাঁর জীবনের পরম বা অন্তত প্রধান উদ্দেশ্য। এই পরিস্থিতি তে কিন্তু তাঁর অনন্য পরিস্থিতিগুলি ওই সাধারণ উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত বা বিবেচ্য হবে। এমনকি সেই বিক্তি এই অনন্য পরিস্থিতিকে কি ভাবে দেখবে তা নির্ভর করবে ওই সাধারণ উদ্দেশ্যর উপর। (সুখ যদি তাঁর পরম উদ্দেশ্য হয় তবে সে ধরুন “পথের পাঁচালি” দেখা থেকে নিজেকে আটকাতে পারে কারন তাঁর মনে হয়েছে যে এটা তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য (যা সে নির্ণয় করেছে) তা দিতে ব্যর্থ হবে।) আমার প্রশ্ন হল, এই পরিস্থিতিকে কি authentic জীবন বলা যাবে?

    এটা ঠিক যে এই বেক্তি নিজে নিজের জীবনের উদেশ্য ভেবে চিন্তে ঠিক করেছে। জীবন যে আসলে ভিত্তিহীন তাও সে জানে। কিতু তবুও সে জীবনের একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আর এই লক্ষ তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ভূমিকা রাখছে। ঠিক যেমন লাল রঙের চশমা পরলে সব কিছু লাল দেখায়, এই লক্ষও তেমন এনার জীবনকে প্রভাভিত করবে। তবে কি এর জীবন সিদ্ধান্ত গুল সত্যিই authentic (খাঁটি)? আমরা একদিক দিয়ে বলতে পারি, হ্যাঁ কারন বেক্তি জানেন তাঁর লক্ষ এক বানানো লক্ষ- তাঁর নিজের বোধবুদ্ধি দ্বারা ঠিক করা লক্ষ। কিন্তু অপর দিক থেকে এই পরিস্থিতি আর পাঁচটা মানুষের থেকে, যারা কোন কোন ভাবাদর্শ বা ধর্মের অনুসরণকারী, থেকে তেমন ভিন্ন নয়। কারন ইনিও ভাবাদর্শ বা ধর্মের অনুসরণকারীদের মতই পরিস্থিতিকে সাধারণ উদ্দেশ্যর আলোকে বিবেচনা করছেন। তাহলে কি আমরা বুঝব সত্যি সত্যি authentic হতে গেলে যেমন জানতে হবে যে জীবনের কোন পরম উদ্দেশ্য নেই, তাঁর সাথে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কোন সাধারণ উদ্দেশ্য খাঁরা করা ঠিক হবে না। বরঞ্চ কোন সাধারণ উদ্দেশ্য ছাড়াই জীবনের অনন্য ঘটনাগুলি নিজের মত করে, পরিস্থিতির বুঝে, স্বাধীন ভাবে ব্যাখা বা deal করতে হবে। এ হেন authentic জীবন বেশ জীবন্ত হতে পারে স্বীকার করা যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এমন জীবন যাপন করা বেশ শক্ত মনে হয়।

  2. তানভীর মে 31, 2015 at 2:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    মানুষ এই গ্রন্থিবদ্ধ বিশ্বের কিছু গ্রন্থিকে ছিন্ন করার মাধ্যমেই বিরাজ করে, অর্থাৎ গোঁড়া থেকেই মানুষের উপস্থিতি বিশ্বটাকে ভেঙে একটা নতুন রূপ দিয়ে দেয়।

    হাইডেগারের এই কথার সঙ্গে আমি একমত নই। এটা সত্যি যে মানব চৈতন্যের জুড়ি প্রকৃতিতে আর মেলে না, কিন্তু সেই চৈতন্য বিবর্তনের মাধ্যমে প্রকৃতি থেকেই উদ্ভব হয়েছে, ফলে মানব অস্তিত্ব গ্রন্থিবদ্ধ বিশ্বের কোনো গ্রন্থিকেই ছিন্ন করছে না। বরং সেও আর দশটা যন্ত্রের মতই অপরাপর যন্ত্রের সাথে যুক্ত। এটা সত্যি যে আমরা আমদের চৈতন্যকে বুঝি না। কিন্তু সেই অজ্ঞতাহেতু মানব অস্তিত্বকে সবকিছু থেকে আলাদা জ্ঞান করা আমার কাছে এক ধরনের অলৌকিকত্ব আরোপ মনে হচ্ছে। যেটা আরোপিত হচ্ছে ডাজাইন শব্দটার ব্যবহারের মধ্যদিয়ে।

    এছাড়া, ডাজাইন শব্দটা কি নতুন কোনো ধারণার অবতারণা করছে নাকি পুরোনো কোনো ধারনাকেই নতুন নাম দিচ্ছে, এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি চিন্তিত। আলোচনা থেকে মনে হচ্ছে ডাজাইন হচ্ছে মানব স্বত্তার বিরাজমান অবস্থা। কিন্তু এটাকে স্রেফ ‘অস্তিত্ব’ কেন বলা হচ্ছে না?
    এছাড়া ডাজাইন এর ‘লক্ষ্য’ ব্যাপারটা সেই অ্যারিস্টটলীয় পদার্থবিজ্ঞানের কোনো বস্তুর ‘প্রবণতা’র সাথে তুলনীয় মনে হচ্ছে। অ্যারিস্টটল যেমন বলেছিলেন, ভারী বস্তু নিচে পড়ে কারণ সেটাই তার সহজাত প্রবণতা। তেমনিভাবে হাইডেগারের ধারণা কাঠামোতে বর্ণিত ডাজাইন এর প্রবণতাই বুঝি বিভিন্ন গ্রন্থি ছিন্ন করা। যদিও তিনি বলছেন এই প্রবণতার কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই। যেটা ডাজাইনকে নস্তিবাদী ফ্রেমওয়ার্কে আবদ্ধ করছে।

    ====
    discourse এর একটা বাংলা সম্ভবত তুমি করেছিলে ‘জ্ঞানভাষ্য’।
    উনহাইমলিখ (Unheimlich) বোধকরার অর্থ শুনে মনে হচ্ছে বাংলায় এটা ‘ত্রস্ত’ বোধ করা। ‘সন্ত্রস্ত’ শব্দটাও হতে পারে।

    ====
    এই পর্ব পড়তে গিয়ে মনে হলো, নিবীড় পাঠ প্রয়োজন এমন ধারাবাহিক এবং দীর্ঘ্যপর্ববিশিষ্ট লেখায় পাঠককে আগের পর্বগুলোর ‘পাঠসূত্র’ ধরিয়ে দিলে উপকার হবে। অনেকটা টিভি সিরিয়ালগুলোর কিছু পর্বের শুরুতেতে যেমন ‘রিক্যাপ’ থাকে, তেমন। কারণ এই পর্বে পড়ার আগে ফিরে গিয়ে আগের পর্বটাও আবার দেখে আসতে হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে আমার সাম্প্রতি পোস্টে তেমন পুনোরালোচনা যুক্ত করলাম।

    ====
    কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে হাইডেগার যেসব ধারণা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, সেগুলো করতে গিয়ে এত বেশি নতুন জার্গনের অবতারণা না করলেও পারতেন। যেমন ডাজাইন শব্দটার অবতারণা না করেও, মানব প্রকৃতির ও মানব অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত প্রবণতা (যা তিনি ডাজাইনের প্রবণতা বলছেন) ইত্যাদি নিয়ে তার ধারণাগুলো প্রকাশ করা সম্ভব ছিল। ম্যাজি কিন্তু একবার এই প্রশ্ন ড্রাইফাসকে করেছেনও যে কেন ড্রাইফাস যখন হাইডেগারের ধারণা ব্যাখ্যা করছেন তখন সেটা বোধগম্য হচ্ছে যেখানে হাইডেগারের নিজের লেখনী বেশ দুর্বোধ্য…

    • শিক্ষানবিস মে 31, 2015 at 6:40 পূর্বাহ্ন - Reply

      হাইডেগার কোনো অলৌকিকত্ব আরোপ করতে চেয়েছেন কি না আমি জানি না। কিন্তু যতটুকু বুঝেছি তাতে কোনো অলৌকিকত্ব আরোপের দরকার আছে বলে মনে হয়নি। কারণ প্রথমত, হাইডেগার এখানে নতুন কোনো অধিবিদ্যক ব্যবস্থা তৈরি করছেন না। আমরা নিজেদের অস্তিত্ব যেভাবে অনুভব করি, মানে আমাদের অস্তিত্ব আমাদের সামনে যেভাবে প্রকাশিত হয় সেটা বিশ্লেষণ করাই ছিল তার কাজ। আমরা কিভাবে বিবর্তিত হয়েছি সেটা কিন্তু হাইডেগারের প্রশ্ন ছিল না। আমরা যে প্রকৃতিরই একটা অংশ, একটা প্রাণী, প্রকৃতি থেকেই বিবর্তিত এ নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন সেটা ছিল না। এমনকি আমরা কেন এত অনন্য এসবও প্রশ্ন নয়, সেসব বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীদের কাজ। অনেককাল থেকে মানুষ বলে আসছে যে তারা “অনন্য”। হাইডেগার প্রশ্ন করলেন, সেই অনন্য জিনিসটা কী? মানুষের অনন্যতা কোথায়? একমাত্র মানুষই “আমি আছি” কথাটা বলতে পারে, এবং এখান থেকেই হাইডেগার শুরু করেন। তিনি মানুষের জৈবিক উৎপত্তি নিয়ে চিন্তিত নন, সেটা অন্যের গবেষণার বিষয়। তিনি “আমি আছি” বলতে পেরে ভয়ানক চমকে গিয়েছিলেন, এবং এই “আমি আছি” বলতে আসলে কী বুঝায় সেটাই “বিরাজ ও সময়” বইয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

      আমি নিজে আমার অস্তিত্বকে কোনো ভাষা দিয়ে প্রকাশ করতে পারি না, এবং হাইডেগারও নিজের ভাষায় সেটা প্রকাশ করতে পারেননি, এবং সেজন্যই তিনি নতুন শব্দ বানিয়েছেন, এবং সেই শব্দগুলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। এটা আমার কাছে খুবই মজা লেগেছে, কারণ আমি নিজেও নতুনশব্দ বানাতে পছন্দ করি। তবে আমি নিশ্চিত হাইডেগার নিজেও জানতেন তার নতুনশব্দগুলো প্রচলিত হবে না, এবং আসলেই হবে না। ডাজাইন হারিয়ে যাবে, কিন্তু ডাজাইন বলার মাধ্যমে তিনি যে ধারণাটা ব্যক্ত করতে চাচ্ছিলেন সেটা টিকে থাকবে। “ডাজাইন” এর অর্থ ঠিক “অস্তিত্ব” নয়, ডাজাইন এর যদি কোনো অর্থ করতেই হয় তাহলে সেটা হবে “মানুষ”। কেবলমাত্র অস্তিত্বের রূপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি মানুষের একটা সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন এবং সেই সংজ্ঞারই নাম দিয়েছেন ডাজাইন, এর মধ্যে অলৌকিক কিছু নেই, বরং হাইডেগারের সংজ্ঞাই বোধহয় সবচেয়ে লৌকিক। অস্তিত্ববাদী দর্শনে সবার আগে অস্তিত্ব, existence precedes essence. দেকার্ত যেখানে বলতেন “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।” হাইডেগার সেখানে বলেন “আমি আছি, তাই আমি চিন্তা করি।” এদিক থেকে হাইডেগারের দর্শনই বিজ্ঞানের সাথে সবচেয়ে বেশি মিলে। কারণ বিবর্তনও আমাদের বলে যে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়া প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ এসেছে, সুতরাং মানুষের অস্তিত্বের কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ থাকতে পারে না, এবং মানুষ চিন্তা করে বলেই আছে এমন নয়, বরং একটা চিন্তাহীন দশা থেকে তার উৎপত্তি ঘটেছে। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক মতেও মানুষের অস্তিত্ব আগে এসেছে, চিন্তা নয়, এবং চিন্তা কোনো অলৌকিক বস্তু নয় যা মানুষের মধ্যে হঠাৎ প্রবেশ করেছে। বলা যায়: বিবর্তন বলে মানুষ কিভাবে জন্ম নিয়েছে, আর হাইডেগার শুরু করেন সেই জন্মের পর থেকে। আসলে ঠিক জন্মের পর থেকেও নয়, হাইডেগার শুরুতে কেবলই বর্তমানকালের মানুষ অস্তিত্বশীলতা বলতে কি বুঝে, বা বেঁচে থাকা বলতে কি বুঝে সেটা নিয়ে ভাবছিলেন, পরে পিছাতে পিছাতে প্রাচীন গ্রিসের অস্তিত্ব-ভাবনা পর্যন্ত গিয়েছিলেন, তারচেয়ে অতীতে নয়, বিবর্তনীয় সময়কাল তো দূরের কথা। অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করে তিনি “মানুষ” কে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন, এবং তার দেখাটা এতই নতুন ছিল যে তিনি “মানুষ” শব্দটা ব্যবহার করা যৌক্তিক মনে করেননি, কারণ সেটা overused. ম্যাজি’র নতুনশব্দে আপত্তির জবাবে ড্রাইফাস যা বলেছেন তার সাথে আমি একমত।

      হাইডেগার এরিস্টটল দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন গভীরভাবে। তিনি প্লেটোকে দেখতে পারতেন না, কিন্তু এরিস্টটলকে অনেক উপরে স্থান দিতেন। কিন্তু ডাজাইনের “লক্ষ্য” কে deterministic দর্শনের “লক্ষ্য” এর সাথে মিলানো যাবে না। এটা কিন্তু ড্রাইফাসও বলেছেন। তিনি বলেছেন লক্ষ্যটা কেবল বুঝার সুবিধার্থে তিনি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তারপরই বলে দিয়েছেন এই লক্ষ্য সেই লক্ষ্য নয়। হাইডেগার ঠিক এই কাজটাই করেননি, তিনি শুরু থেকেই নতুনশব্দ ব্যবহার করতে থাকতেন। লক্ষ্য আমি যেভাবে বুঝেছি:
      আমরা একটা কাজ করি যাতে পরবর্তিতে আরেকটা কাজ করার অবস্থা তৈরি হয়। পরবর্তিতে আরেকটা কাজ করা কিন্তু আমার পরিকল্পনায় ছিল না। এটা কোনো সুচিন্তিত লক্ষ্য নয়। এবং এটা কোনো ডিটারমিনিস্টিক ব্যাপারও নয়। কারণ একটা সুনির্দিষ্ট কাজ করাই তো আমাদের নিয়তি নয়, আমাদের নিয়তি হচ্ছে কেবল “কিছু একটা” করা, সেটা গাছ থেকে আপেল পড়ার মতো একেবারে সোজাসাপ্টা কিছুই হতে হবে এমন কথা নেই। সিমোন দ্য বোভোয়ার এর Pyrrhus and Cineas বইয়ের একেবারে শুরুতে এক গ্রিক রাজা নিয়ে একটা সুন্দর গল্প ছিল যার সারকথা হচ্ছে: মানুষ গল্প শেষ করতে চায় না, “শেষ হইয়াও হইল না শেষ” ই মানুষের ভালো লাগে, মানুষ সবসময়ই আজ কিছু একটা করছে কারণ সে কাল আরেকটা কিছু করবে। কী করবে সে জানে না, কিন্তু কিছু একটা করবে। এটাই এক সময় মানুষ মৃত্যুর পরও বর্ধিত করেছে, অনন্ত কাল ধরে কিছু একটা করে যাওয়াকে একটা বিশাল সংখ্যক মানুষ পছন্দ করেছে।

      এই ধারণাগুলো বেশ মজা লাগছে। আসলে এখন পর্যন্ত দার্শনিকদের মধ্যে হাইডেগারই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিতে পেরেছে। কিন্তু তার বই পড়ছি না। পড়ছি হাইডেগার নিয়ে দেয়া ড্রাইফাসের লেকচার। খুবই আকর্ষণীয়।

      ====

      জ্ঞানভাষ্যটা আমি করেছিলাম? মনে পড়ছে না। তবে শব্দটা ভালো। বিবেচনায় রইল।
      আসলেই। ত্রস্ত একটা ভালো অর্থ হতে পারে। শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অবশ্য ড্রাইফাসও যেহেতু এখানে জার্মান রেখে দিয়েছেন তাই আমিও জার্মান রেখে দিচ্ছিলাম। যেমন ভুন্ডারবার ও তিনি রেখে দিয়েছিলেন।

      ====

      আপনার পাঠসূত্রের ধারণাটা চমৎকার লেগেছে। তৃতীয় পর্বে এটা চেষ্টা করে দেখব।

      ====

      হ্যাঁ। এই কারণেই আমি হাইডেগার পড়ছি না। পড়ছি হাইডেগার নিয়ে লেখা ড্রাইফাসের বই। এতেই আমার কাজ চলে যাবে মনে হয়। আপাতত সরাসরি হাইডেগার পড়ার পরিকল্পনা নেই। অংশবিশেষ পড়েছি এবং পড়ব কিন্তু “বিরাজ ও সময়” পুরো বইটা পড়তে পারব না। সে অসম্ভব কাজ। 😀

      • তানভীর মে 31, 2015 at 7:04 অপরাহ্ন - Reply

        হাইডেকার বলছেন, জগৎ এর আর সবকিছুর প্রবণতা হচ্ছে গ্রন্থিবদ্ধ থাকা (মানে কার্যকরণ সূত্রে আবদ্ধ)। আর ডাজাইন এর প্রবণতা হচ্ছে এই গ্রন্থিবদ্ধতা ভাঙা। সম্ভব তিনি এখানে ডাজাইনের ‘ফ্রি উইল’ কে নির্দেশ করছেন। যেহেতু আর সবকিছুই স্রেফ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কার্যকরণ মেনে চলে আর ডাজাইন নিজ থেকে অন্য কিছুকে ব্যবহার করার বা না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার মতে এই কারণে ডাজাইন বিশ্বের আর সব কিছু থেকে মৌলিকভাবে আলাদা। আমি এই ‘ভিন্নতার’ ব্যাপারটা মানতে পারছি না।

        আমার মতে মানুষ আর দশটা জড়বস্তু থেকে আলাদা কিছু না। স্টিফেন হকিং এর ভাষা ধার করে বললে আমরা হলাম এক রকম ‘কেমিক্যাল স্কাম’। তো মানব চৈতন্য হচ্ছে এই ‘বস্তু মানুষের’ একটা বিক্রিয়াশীল অবস্থা। যেমন মোমবাতির আগুন হচ্ছে মোম, সুতলি, অক্সিজেন ইত্যাদির একটা সম্মিলিত বিক্রিয়াশিল অবস্থা। তেমন মানব চৈতন্যও বস্তুমানুষের মধ্যকার এবং তার সংস্পর্শে থাকা পরিবেশ (যেমন অক্সিজেন/খাদ্য ইত্যাদি) এর একটা বিশেষ বিক্রিয়াশীল অবস্থা। ফলে বস্তুগত ভাবে মানুষ, এবং মানব চৈতন্য জগতের আর কিছু থেকেই মৌলিকভাবে আলাদা নয়। আমরা যদি এই ‘বিক্রিয়াশীল’ অবস্থার গতিপ্রক্রিতিকে কোনো মেশিনে সিমুলেট করতে পারি, তখন সেই মেশিনও মানব চৈতন্যের অধিকারী বলে গণ্য করতে হবে। কারণ সেটি সেই সব প্রশ্ন ও ভাবনা, ধারন ও অনুসন্ধান করতে পারবে, যা আমরা করি।

        এখনো পর্যন্ত পড়ে মনে হচ্ছে, হাইডেগারীয় বস্তুবাদে সব অস্তিত্বশীল বস্তুর মত মানুষকেও একটা অস্তিত্বশীল বস্তু ভাবা হচ্ছে। কিন্তু বলা হচ্ছে মানুষের ডাজাইন একটি বিশেষ ধরনের বস্তু। যা আর সব বস্তু থেকে ‘আলাদা’। (এই ডাজাইনকে বাড়তি করে আলাদা গন্যকরাটাকেই আমার কাছে অলৌকিক সিদ্ধান্ত মনে হচ্ছে)। সেই তুলনায়, আমার উপরে বলা ধারণাটা যেন বস্তুবাদের আরেক ধাপ অগ্রসর হওয়া। যেখানে মানুষ আর সব বস্তুর মতই বস্তু। এবং বস্তুগত ভাবে তাদের কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। স্রেফ এই বিক্রিয়াশীল চৈতন্য ছাড়া। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আমার ধারণায় ‘চেতনা’ আর ‘প্রাণ’ এর তফাত কী? জীবন্ত বস্তু বলতে কী বোঝায় সেটা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে মোটামুটি ভালোভাবেই সংজ্ঞায়িত হয়েছে। (উদাহরণ স্বরূপ মাইনার্ড স্মিথ এর এ বিষয়ক কাজ)। তাই আমরা শুধু চেতনা নিয়েই আলোচনা করব।

        আমার মতে, মানব চৈতন্যর মত অন্যান্য প্রাণীরও চৈতন্য আছে। যে কারণে একটা পোষা কুকুর ভালোবাসা বুঝতে পারে। বা বাড়ির কাজলি গাইটাও। সেই মোমবাতি রূপকে, একেকটা চৈতন্য যেন একেক রকম আগুণ। কোনোটা ক্ষীণ, কোনোটা বর্ণীল, কোনোটা উজ্জ্বল এমন। প্রোগ্রাম অ্যানালজিতে ভাবলে, একেকটা একেক মাত্রার জটিলতা বিশিষ্ট প্রোগ্রাম। লক্ষ্যণীয় যে হাইডেগারের ডাজাইন ধারনায় অন্যান্য প্রাণীকে গণ্য করা হচ্ছে না। কিন্তু তারাও অস্তিত্বশীল। এবং বিভিন্ন মাত্রায় চেতন।

        আর-

        এখনো পর্যন্ত কার্তেসীয় “I think therefore I am” আর হাইডেগারীয় “I am there for I think” এই দুই ধারণার কোনর সাথেই আমি একাত্ম হতে পারছি না। বরং আমার ধারণা স্পিনোজার সাথে মেলে। অন্তত স্বল্প পাঠে যেমনটা বুঝেছি। স্পিনোজার ধারনায়, প্রকৃতিকে চিরবিরাজমান বস্তু হিসাবে ভাবা হয়। তার ভাষায় ‘সাবস্টেন্স’। আমার সেই আগুন রূপকে, আমাদের অস্তিত্ম হচ্ছে, এই ইতোমধ্যে বিরাজমান প্রকৃতিতে একটা সস্ফুলিঙ্গ, বা শিখার মত। যেটা দপ করে জ্বলে উঠে এক সময় নিভে যায়। সেই জ্বলন্ত অবস্থাটাই আমি, বা আমার চেতনা। ফলে প্রতিটি চেতন ব্যক্তি/ প্রাণীই এই প্রকৃতির মাঝে আলাদা আলাদা শিখা। এবং সবাই আমরা সেই ‘সাবস্টেন্স’ এর অংশ, বা একাংশের বিক্রিয়াশীল রূপ।

        ===

        এছাড়া-

        কিন্তু ডাজাইনের সম্পত্তি ধরে রাখতে হলে পালানো যাবে না, বরং উদ্বেগকেই আঁকড়ে ধরতে হবে

        এই ধরণের জীবন যাপন করলে, অর্থাৎ জীবনের কোনো পরম অর্থ না খুঁজলে এবং কেবল বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি সচেতনভাবে সাড়া দিতে থাকলে মানুষ আর জীয়ন্ত লাশ থাকে না, বরং একজন ব্যক্তি হয়ে উঠে। হাইডেগার বলেছিলেন, এটা মানুষকে নমনীয়, জীবন্ত ও হাসিখুশি করে তোলে। তার মতে মানুষের এভাবেই জীবন যাপন করা উচিত।

        এখানে হাইডেগার ought প্রশ্নের উত্তরে চলে যাচ্ছেন হঠাৎ করেই। এবং তার ডাজাইনের বর্ণনা থেকে কীভাবে এই উপসংহারে যৌক্তিক উপায়ে পৌছানো যায় তা দেখতে পাচ্ছি না।

        ===
        জ্ঞানভাষ্য কথাটা সম্ভবত পৃথ্বির লেখায় পড়েছি তাহলে।

        • শিক্ষানবিস মে 31, 2015 at 11:42 অপরাহ্ন - Reply

          আপনার মন্তব্যের সার তাহলে দাঁড়াল:
          ১। মানুষ একটা বস্তু বৈ আর কিছু নয়। সে পরমাণু দিয়ে গঠিত।
          ২। তাই মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা কিছু নয়।
          ৩। হাইডেগার মানুষকে ডাজাইন নামক একটা আলাদা কিছু বলে ভুল করেছেন।
          ১ ও ২ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, হাইডেগারেরও ছিল না মনে হয়। কিন্তু ৩ আমার মতে ঠিক নয়। হাইডেগার মানুষকে প্রকৃতি থেকে আলাদা বলেননি। উদাহরণ: একটা শিম্পাঞ্জি একটা তেলাপোকার তুলনায় কতটা অনন্য এবং বুদ্ধিমান সেটা আমরা আলোচনা করতে পারি, তার মানে কি এই যে শিম্পাঞ্জি অতিলৌকিক কিছু এবং প্রকৃতির অংশ নয়? মানুষকে অন্য যেকোনো প্রাণীর তুলনায় যতই বেশি অনন্য বলা হোক না কেন, তার অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে সে প্রকৃতি থেকে আলাদা? বরং তার অনন্যতাগুলোও তো কেবলই পরমাণুর সৃষ্টি।
          এখন,
          ১) কেউ শুধু সেই অনন্যতাগুলোর রূপ নিয়ে রূপতাত্ত্বিক (phenomenological) গবেষণা করেন
          ২) আর কেউ সেই অনন্যতার জৈবিক উৎপত্তিস্থল নিয়ে গবেষণা করেন।
          হাইডেগার ১মটি করতেন, আর চৈতন্য বিজ্ঞানীরা ২য়টি করেন। ১মটি করলে তো ২য়টি অস্বীকার করতে হয় না, উল্টো ১ম ও ২য়টি একে অপরের পরিপূরক, তারা একে অপরকে অনেক কিছু শেখাতে পারে। রূপতাত্ত্বিকরা যদি অনন্যতার সব রূপ ভালোভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারে, তাহলে সেই রূপগুলোর উৎপত্তিস্থল খুঁজতে চৈতন্য বিজ্ঞানীদের আরো সুবিধা হবে।

          হাইডেগারের দর্শনে অলৌকিক কিছু নেই, আমার মনে হচ্ছে এটা আপনার দিক থেকে অনেক বেশি আরোপিত, হাইডেগারে তা নেই।

          আরেকটা জায়গায় ভুল হতে পারে। আপনি হয়ত ভাবছেন, আদর্শবাদীরা যেমন বস্তুনিরপেক্ষ আত্মা বা মন এর কথা বলে, হাইডেগার ডাজাইন দ্বারা সেরকম কোনো নতুন সত্তা বুঝাচ্ছেন, অনেকটা হেগেল এর Geist এর মতো। কিন্তু সেটা ঠিক নয়। ডাজাইন কোনো সত্তা বা being নয়, মানে ডাজাইন কোনো বিশেষ্য নয়, ডাজাইন একটা ক্রিয়াবোধক ব্যাপার। বলা যায় ডাজাইন noun অর্থে being নয়, বরং verb অর্থে be-ing. “বিরাজ ও সময়” বইয়ের শুরুতেই বলা ছিল: দার্শনিকেরা এতদিন কিসের অস্তিত্ব আছে আর কিসের অস্তিত্ব নেই তা নিয়ে কথা বলেছে, কিন্তু স্বয়ং অস্তিত্ব কাকে বলে বা এর অর্থ কী সেটা কেউ বলেনি। হাইডেগার সেটাই শুরু করেছেন। which beings exist? না বলে তিনি বলেছেন what is be-ing? আর বিশেষভাবে মানুষের বিরাজ করার রূপ হাইডেগার যেমন দেখেছেন সেটাকেই ডাজাইন বলছেন, যার অর্থ সেথা-বিরাজন, মানে জগৎ-মধ্যে-বিরাজন, প্রকৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে বিরাজন। ডাজাইনের মধ্যেই কিন্তু প্রকৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যতা অন্তর্ভুক্ত আছে। আর অন্যান্য প্রাণী যে ডাজাইন না সেটাও তো তিনি বলেননি। তিনি নিজে যেহেতু মানুষ সেহেতু কেবল নিজেদের অস্তিত্বের রূপটাই তার কাছে ভালোভাবে ধরা পড়ে, এবং সেটাই তিনি বর্ণনা করেছেন। ডাজাইনকে একটা verb হিসেবে দেখলে অলৌকিকতা বা ভাববাদীতার কোনো সন্দেহই কিন্তু আর থাকে না। হাইডেগারের দর্শনে অবশ্যই অনেক সমস্যা আছে, তিনি নিজেও তো তার অনেককিছু পরে পরিত্যাগ করেছেন। কিন্তু অলৌকিকতা সেই সমস্যাগুলোর একটি নয়। অবশ্য এখনো পড়ছি। আরো পড়লে আরো বুঝব। আপাতত যা মনে হয় বললাম।

          এবং আসলে এমনও হতে পারে হাইডেগার একসময় আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু সেটা তার ব্যাপার। কোনো আধ্যাত্মবাদ ও অলৌকিকতা অন্তর্ভুক্ত না করেই হাইডেগারের দর্শন থেকে উপকারী অনেক কিছু গ্রহণ করা যায়।

          =====

          সব মানুষই সচেতন বা অচেতনভাবে ডাজাইন হয়ে উঠে। কিন্তু কেউ যখন ডাজাইন হওয়া সম্পর্কে সচেতন হয় তখন তার মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়, কারণ সে অস্তিত্বের অর্থহীনতা ও ভিত্তিহীনতা টের পায়। এই উদ্বেগ যার মধ্যে আছে তাকেই তিনি অথেন্টিক ডাজাইন বলেছিলেন। এবং তারপর এই উদ্বেগজনিত হতাশা থেকে মুক্তির জন্য তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন “বিরাজ ও সময়” বইয়ের ২য় অংশে। অবশ্যই মানুষের কী করা উচিত তা যুক্তিবিদ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। হিউম তো বলেছেনই যে, is থেকে ought প্রতিপাদন করা যায় না। তাই হাইডেগার যখন ঔচিত্য বাতলাচ্ছেন তখন তাকে একজন ডাক্তার হিসেবে দেখতে হবে, তখন তিনি আর দার্শনিক নেই। তিনি উদ্বেগাক্রান্ত মানুষকে মুক্ত করার জন্য ডাক্তারের মতো কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন, আর কিচ্ছু না। কারণ হাইডেগার ঈশ্বরহীন নতুন পৃথিবীর জন্য একটা গোটা জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন প্রথম জীবনে, পরবর্তী জীবনে সেটা পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন।

    • শিক্ষানবিস মে 31, 2015 at 6:49 পূর্বাহ্ন - Reply

      ও, গ্রন্থিবদ্ধের ব্যাপারটা নিয়ে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আসলে এই ব্যাপারটা আমার কাছেও পুরো পরিষ্কার না এখনও। কিন্তু আগেই যেমন বলেছি, মানুষের অস্তিত্বের মাধ্যমে গ্রন্থি ছিন্ন হয়ে যাওয়া বলতে তিনি মানুষের বিশেষ কোনো অলৌকিক ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করেননি এটা নিশ্চিত। তিনি শুধু মানুষের অনন্যতা বিশ্লেষণ করছিলেন। মোটকথা ডাজাইনের ৩টি ধর্ম সময়ের সমার্থক:
      ঐকতান=অতীত, আলোচনা=বর্তমান, ধাবমানতা=ভবিষ্যৎ
      এখানে আলোচনাতে তিনি আর্টিকুলেশন ও গ্রন্থিবদ্ধতার কথা বলেছেন। আপাতত ব্যাপারটা পরিষ্কার করে রাখলাম। আরো পরিষ্কার হয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছি।

      তবে আপাতত একটা উদাহরণের কথা ভাবা যায়: আমি যখন কোনো হাতুড়ি তুলে নিচ্ছি তখন যেন গোটা সাজানো বিশ্বে একটা পরিবর্তন চলে আসছে, বিশ্বের একটা গ্রন্থি ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো: গাছের পাতা নড়লেও তো বিশ্বের গ্রন্থি ছিঁড়তে পারে। হয়ত ডাজাইনের হাতুড়ি তোলাতে গাছের পাতা নড়ার চেয়ে ভিন্ন কোনো ব্যাপার থাকে যেটার কথা হাইডেগার বলছিলেন। এখন দেখতে হবে তিনি ঠিক কী বলছিলেন।

মন্তব্য করুন