নোম চমস্কি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেখানে ভুল পথে – পর্ব ২

chomsky
[আগের পর্বের পর]

একটা খুবই মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুর দিকে মানুষ এই ক্ষেত্রের অগ্রগতির ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ছিলো, কিন্তু পরে দেখা গেছে অতটা উন্নতি হচ্ছে না। ব্যাপারটা এত কঠিন হবার কারণ কী? স্নায়ুবিজ্ঞানীদের যখন প্রশ্ন করা হয় যে মস্তিষ্ককে বুঝতে আমাদের এত কষ্ট হচ্ছে কেন, তখন তারা অসন্তোষজনক উত্তর দেয়, এই বলে যে ব্রেইনে কয়েক বিলিয়ন কোষ আছে তাদের সবগুলোর কর্মকান্ড আমরা রেকর্ড করতে পারি না… ইত্যাদি ইত্যাদি।

চমস্কি: এ কথাটা কিছুটা সত্যি। আপনি যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির দিকে তাকান দেখবেন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলো ধারাবাহিক, কিন্তু সেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন শাখায় ভাগ করেছি। সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে বিজ্ঞানের সেসব শাখায় যারা সবচেয়ে সরল ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে। যেমন ধরুন পদার্থবিজ্ঞান— সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে এই শাখায়। এর একটা কারণ হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা সুবিধা আছে যা অন্য কারো নেই। যদি কোনো কিছু খুব বেশি জটিল হয়ে যায় তাহলে তারা সেটা অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেয়।

যেমন রসায়নবিদদের হাতে?

চমস্কি: কোনো অণু যদি খুব বড় হয়ে যায় তাহলে আপনি সেটা রসায়নবিদদের হাতে ছেড়ে দেবেন। রসায়নবিদ যদি দেখে কোনো ব্যবস্থা তাদের পক্ষেও অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে তখন তারা সেটি জীববিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দেয়। জীব বিজ্ঞানিদের জন্য যেটা খুব বেশি বড়, সেটা তারা ছেড়ে দেয় মনোবিজ্ঞানীদের হাতে, এভাবে চলতে চলতে এটা একসময় হাজির হয় সাহিত্য সমালোচকদের হাতে… । তাই স্নায়ুবিজ্ঞানীরা যেটা বলছেন সেটা আসলে পুরোপুরি মিথ্যা না।

যেমন হেবিয়ান প্লাস্টিসিটি? [সম্পাদকের নোট: ডোনাল্ড হেবের নামে প্রচলিত এক তত্ত্ব যা মনে করে পরিবেশ থেকে কী প্রেরণা পেলে কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা নিউরনসমূহের বিভিন্ন সিন্যাপটিক সংযোগের জোর দিয়ে নির্ধারিত হয়]

চমস্কি: হুম, সিন্যাপটিক সংযোগের জোর বৃদ্ধির মত। বহু বছর ধরে গ্যালিস্টেল এটা বলে আসছেন যে তুমি যদি মস্তিষ্ককে ঠিকভাবে বুঝতে চাও তাহলে [ডেভিড] মারের মত পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। তার জন্য শুরুতেই জিজ্ঞেস করতে হবে, মস্তিষ্ক কী কাজ করছে। উনি অবশ্য পোকামাকড় নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। আপনি যদি পিঁপড়ার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করতে চান শুরুতে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, পিঁপড়ারা কী করে? দেখা গেছে পিঁপড়ারা বেশ জটিল সব কাজ কর্ম করে থাকে, যেমন ধরুন পাথ ইন্টিগ্রেশন! যদি মৌমাছিদের কথা ভাবেন তাদের দিকনির্ণয়ের জন্যও সূর্যের অবস্থান, এটা সেটা সহ আরো অনেক কিছু মিলিয়ে জটিল গণনা করতে হয়। তার যুক্তি হচ্ছে আপনি যদি মানুষ সহ যেকোনো প্রাণীর চৈতন্যের ব্যাপারটা খেয়াল করেন দেখবেন এগুলো আসলে এক ধরনের গণনাযন্ত্র। ফলে এই গণনার বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে আপনি জানতে চাইবেন। টুরিং মেশিনের কথা চিন্তা করুন। এটা সবচেয়ে সরলতম গণনাযন্ত্রের মডেল। সেটাও এমন কিছু একক দিয়ে গঠিত যাদের ‘পড়া’, ‘লেখা’, ‘নির্দেশ করার’ ক্ষমতা আছে। কোনো গণনার জন্য এই তিনটি একক (unit) লাগবেই। আপনি হয়তো মস্তিষ্কের মধ্যেও এমন কিছু একক উপাদান খুঁজতে চাইবেন। শুধু সিন্যাপটিক সংযোগের জোর হ্রাস-বৃদ্ধি বা এদের ক্ষেত্রগুণাবলি বিবেচনা করে এগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনাকে প্রথমে দেখতে হবে মস্তিষ্কে আসলে কী আছে, এবং তারা কী কার্যসমাধা করছে অর্থাৎ মারের প্রস্তাবিত ত্রিস্তর বিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর থেকে।

ঠিক, কিন্তু বেশিরভাগ স্নায়ুবিজ্ঞানীই শুরুতে তারা যে সমস্যাটা নিয়ে গবেষণা করছেন তার ইনপুট আউটপুট সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করেন না। তারা মূলত, কোনো ইদুরকে কোনো একটা কাজ শেখানোর সময় যত বেশি সম্ভব নিউরনের কর্মকান্ড রেকর্ড করা সম্ভব তা করতে থাকেন। আবার কখনো কোনো জিন X কোনো একটা কাজ শেখার জন্য প্রয়োজন কি না সেসব নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। তাদের গবেষণায় এই ধরনের বক্তব্য বের হয়ে আসে।

চমস্কি: ঠিক বলেছেন।

এটা কি ধারনাগতভাবে ভুল?

চমস্কি: উমম, এ থেকে কিছু কাজের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভিতরে যদি সত্যিই কোনো ধরনের গণনা চলতে থাকে তাহলে সেই গণনার এককগুলোর খোঁজ এভাবে পাওয়া যাবে না। অনেকটা ভুল ল্যাম্প পোস্টের নিচে খোঁজার মত। এটা একটা চলমান বিতর্ক… আমি মনে করি না যে গ্যালিস্টেলের অবস্থান স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মধ্যে খুব বেশি গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে, যদিও এটা মূলত মারের বিশ্লেষণের মতই। যেমন, দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণার সময় আপনি জিজ্ঞেস করবেন, এই দৃষ্টি ব্যবস্থা কী ধরণের গণনামূলক কাজ করছে? এরপর আপনি একটা অ্যালগরিদম খুঁজে বের করবেন যেটা ঐ ধরনের কাজ করতে পারে, এরপর আপনি এমন সব কলকব্জা খুঁজবেন যারা এই অ্যালগরিদমটাকে চালাতে পারে। এভাবে না খুঁজলে হয়তো আপনি কখনোই কিছু খুঁজে পাবেন না। এমনকি ভৌত বিজ্ঞানেও এ ধরনের অনুসন্ধানের অনেক উদাহরণ আছে, আর সামাজিক বিজ্ঞানে তো আছেই। মানুষ যেসব বিষয়ের ব্যাপারে জানে যে কীভাবে গবেষণা করতে হবে সেগুলো নিয়েই গবেষণার প্রতি তার ঝোঁক থাকে। এক হিসাবে ব্যাপারটা ঠিক। আপনার হাতে কিছু পরীক্ষণ পদ্ধতি আছে, কিছু ব্যাপার আপনি বোঝেনও আপনি চাইবেন এই বোঝার সীমাটা বাড়াতে— সেটা তো একরকম ঠিকই, আমি কোনো সমালোচনা অর্থে বলছি না, কিন্তু মানুষ সাধারণত সেটাই করে যেটা সে করতে পারে। অপরদিকে আপনার লক্ষ্য সঠিক দিকে আছে কি না সেটাও ভাবার দরকার। আবার, আপনি যদি মার-গ্যালিস্টেল এর দৃষ্টিভঙ্গিটা গ্রহণ করেন (ব্যক্তিগতভাবে যার প্রতি আমারো সহানুভূতি আছে) তাহলে আপনি ভিন্ন ভাবে কাজ করবেন, ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নীরিক্ষার চেষ্টা করবেন।

ঠিক, আমার মতে মারের একটা মূল ধারণা হচ্ছে, যেমনটা আপনি বললেন, সমস্যাটাকে বর্ণনার সঠিক এককগুলো চিহ্নিত করা, অর্থাৎ সঠিক মাত্রায় বিমূর্তরূপে (right level of abstraction) সমস্যাটিকে দেখতে পারা। এখন আমরা যদি একটা বাস্তব উদাহরণ বিবেচনা করি, যেমন স্নায়ুবিজ্ঞানের একটা নতুন শাখা- সংযুক্তিতত্ত্ব Connectomics-, যেখানে কোনো প্রাণীর যেমন মানুষ বা ইঁদুরের সেরিব্রাল কর্টেক্সের সকল নিউরনের সংযুক্তির একটা নকশা তৈরির চেষ্টা করা হয়। সিডনি ব্রেনার এ ধরনের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন যদিও ঐতিহাসিকভাবে তিনিই এই অ্যাপ্রোচের স্রষ্টা। এই অ্যাপ্রোচের পক্ষপাতীরা অবশ্য এটা বিবেচনা করেন না যে এটা সত্যিই সঠিক মাত্রার বিমূর্তায়ন কি না— হয়তো তা না, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

চমস্কি: আচ্ছা, এরচেয়েও অনেক সহজ প্রশ্ন আছে। যেমন এখানে MIT তেই একটা আন্তবিভাগীয় কার্যক্রম আছে যারা গোলকৃমি C. elegans নিয়ে কাজ করছে কয়েক যুগ ধরে। আমি যতদূর বুঝি, এই খুদে প্রাণীর ক্ষেত্রেও, যার প্রতিটি নিউরণের সংযুক্তির নকশা জানা, … সম্ভবত ৮০০ টা নিউরন আছে এর…

আমার মনে হয় ৩০০…

চমস্কি: … তারপরেও এটা (C. elegans nematode) কী করতে যাচ্ছে এই নকশা থেকে তা অনুমান করা সম্ভব হয়নি। হয়তো সমাধানটা আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি।

chomsky600.1

আলোচনাটা একটু ভিন্ন দিকে নেই, আমি AI গবেষণায় পূর্বে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যেটাকে আজকাল, “Good Old Fashioned AI” বলা হয়। পুরাতন AI তে গোটলব ফ্রেগে এবং বারট্রান্ড রাসেলের গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা বা এর থেকে উৎসরিত ননমনোটনিক রিজনিং এর মত পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। বিজ্ঞানের ইতিহাসের দৃষ্টিকোন থেকে এটা বেশ আগ্রোহদ্দীপক যে অতি সম্প্রতি এই পুরাতণ পদ্ধতিগুলো মূল ধারা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে আধুনিক AI চর্চার সূচনা হয়েছে, যেখানে এসব পদ্ধতির স্থান নিয়েছে সম্ভাবনাতত্ত্ব এবং পারিসাংখ্যিক কাঠামো। এই পরিবর্তন আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? এটা কি সঠিক দিকে যাচ্ছে?

চমস্কি: এ নিয়ে অনেক বছর আগে প্যাট উইনস্টনকে বক্তৃতা দিতে শুনেছি। সে একটা বিষয় তুলে ধরেছিলো যে AI এবং রোবটিক্স এর উন্নতিটা এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সেখান থেকে ব্যবহারিক কাজে লাগে এমন প্রযুক্তি বানানো সম্ভব। ফলে মূল মৌলিক অনুসন্ধানগুলোকে একটা পাশে সরিয়ে এইসব প্রযুক্তিগত লক্ষ্য পূরণের ব্যাপারেই সবাই মেতে ওঠে।

তারমানে, এই ক্ষেত্রটা প্রকৌশলে পরিণত হয়েছে?

চমস্কি: এটা কিসে পরিণত হয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে… কিন্তু এর ফলে মানুষ মূল প্রশ্ন থেকে সরে এসেছে। আমি অস্বীকার করব না যে, আমি নিজেও শুরুর দিককার গবেষণার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের আশাবাদী। তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে স্রেফ জটিল যন্ত্র ব্যবহার করেই এমন সব সিস্টেমকে বাস্তবিক অর্থে বুঝে ফেলা সম্ভব যেগুলো সম্পর্কে সত্যিকারে তেমন কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না। আপনি যদি তা করেন তাহলে আপনার সাফল্যের ধারণাটা হয়ে যাবে স্ব-প্রতিপাদী কারণ সাফল্যগুলো এই ধারণার আলকেই অর্জিত হবে। কিন্তু বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে না। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক, কেউ যদি চায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগটাই তুলে দিয়ে সব কিছু সঠিক উপায়ে করতে। ‘সঠিক’ উপায় টা হচ্ছে এটা একটা ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে একটা জানালার বাইরে কী হচ্ছে তা ভিডিও করতে থাকবে। এবং সেটাকে সবচেয়ে বড় সবচেয়ে দ্রুততম কম্পিউটারে ইনপুট দেবে। কম্পিউটারটি এই বহু গিগাবাইট উপাত্ত নিয়ে নানান রকম জটিল পারিসাংখ্যিক হিসাব নিকাশ, বা বায়েসীয় হেন তেন করে [সম্পাদকের টীকা: বায়েসীয় পদ্ধতি হচ্ছে, উপাত্তবিশ্লেষণের একটা আধুনিক পদ্ধতি যেটা সম্ভাবনাতত্ত্বকে উপর্যুপরী ব্যবহার করে] অনুমান করতে সক্ষম হলেন জানালার বাইরে পরবর্তীতে কি ঘটতে যাচ্ছে। হয়তো এভাবে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ে অনেক নিখুঁতভাবেই অনুমান করা সম্ভব হবে। অবশ্য যদি সাফল্য বলতে বিপূল পরিমান অবিশ্লেষিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মোটামুটি সঠিক একটা অনুমানে আসতে পারাকে বুঝানো হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। পদার্থবিজ্ঞানীদের মত করে, ঐসব ঘর্ষণহীন তল টল নিয়ে মাথা ঘামানোর আর কী দরকার। কিন্তু এর ফলে চিরকাল বিজ্ঞান সবকিছুকে যেভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছে সেই ধরনের উপলব্ধি অর্জন সম্ভব নয়— আপনি যা পাবেন তা হচ্ছে, বিভিন্ন ঘটনাবলির একটা ভাসা ভাসা অনুমান।

এই ধরনের কাজ প্রচুর করা হচ্ছে। ধরুন আপনি আগামীকালের আবহাওয়া অনুমান করতে চান। তার জন্য শুরুতে আমি কিছু পারিসাংখ্যিক পূর্বানুমান ধরে নেব, এরপর এর সাথে নানান রকম পর্যবেক্ষণ যুক্ত করতে থাকব। যেমন, এখানকার আজকের আবহাওয়া গতকালের ক্লিভল্যান্ডের আবহাওয়ার সাথে মেলে, সেটা যোগ করবো, এই সময়ের সূর্যের অবস্থানেরও কিছু প্রভাব থাকবে, আমি সেটা যোগ করব, এভাবে করে কিছু অনুমান পাওয়া যাবে, সেইসব খাটিয়ে সিমুলেশন চালাবো, এভাবে প্রাপ্ত প্রাথমিক ফলাফলের উপর বায়েসিয়ান পদ্ধতির বিশ্লেষণ প্রয়োগে আরো উন্নততর পূর্বানুমান পাব। এইভাবে পুনরাবৃত্তি করতে করতে এক সময় আগামীকালের আবহাওয়ার একটা কার্যকর অনুমান করা সম্ভব। এটা এক ধরনের সাফল্য কিন্তু আবহাওয়াবিদরা শুধু অনুমান করতে চান না তারা বুঝতে চান কীভাবে সবকিছু কাজ করছে। এখেত্রে সাফল্য আর অর্জনের ধারণা তাই দুই প্রকারের [অনুবাদকের টীকা: স্রেফ ফলাফল অনুমান করতে পারা, বনাম গভীর ভাবে বোঝা]। আমার নিজের ক্ষেত্র ভাষাতত্ত্বে এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব। গাণনিক চৈতন্যবিজ্ঞান (computational cognitive science) যখন ভাষাতত্ত্বে ব্যবহার করা হয় তখন সফলতা বলতে এরকম কিছুই বোঝায়। অর্থাৎ, আপনার হাতে যদি বিপুল পরিমান উপাত্ত থাকে, শ্রেয়তর পরিসংখ্যান থাকে, তাহলে কোনো বিপুল লিখিত করপাসের, যেমন ধরুন ওয়াল স্ট্রিড জার্নালের আর্কাইভ, একটা শ্রেয়তর আন্দাজ আপনি করতে পারবেন, কিন্তু এর ফলে ভাষাটি সম্পর্কে আপনি কিছুই শিখতে পারবেন না।

আমার মতে সঠিক, কিন্তু এসব থেকে বহুলাংশে ভিন্ন একটা পদ্ধতি হচ্ছে, শুরুতে মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা বুঝতে চেষ্টা করা। এবং এটা বোঝা যে ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে এইসব নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গে আরো হাজারটা চলক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, মানে তখন আপনি আমাদের ঐ জানালার বাইরে কী ঘটছে সেসব উপাত্তও কাজে লাগাতে পারেন। এই হচ্ছে বিজ্ঞানের দুই রকমের ধারণা। পরে বলা এই পদ্ধতিটাই আধুনিক বিজ্ঞান, সেই গ্যাগিলিলিওর থেকে বিজ্ঞান এভাবে চলে এসেছে। এই এসব বিপুল পরিমান অবিশ্লেষিত উপাত্ত থেকে অনুমান করার পদ্ধতিটা মূলত এযুগের একটা নতুন প্রচেষ্টা, অবশ্য পুরোপুরি নতুনও নয়, অতীতেও এ ধরনের কিছু জিনিস ছিল। অবশ্য, আমার মতে, এই নতুন অ্যাপ্রোচ গাণনিক চৈতন্যবিজ্ঞানকে অনেকটা ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকে চালিত করছে…

… প্রকৌশলের দিকে?

চমস্কি: … কিন্তু মৌলিক জ্ঞানঅর্জন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। হ্যাঁ, হয়তো কিছু কার্যকর প্রযুক্তি পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে প্রকৌশল বিদ্যাতে কী ঘটছে সেটাও বেশ আগ্রোহদ্দীপক। আমি যখন MIT তে আসি, ১৯৫০ এর দিকে, তখনো এটা ছিল স্রেফ একটা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। খুব ভালো গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ছিলো, কিন্তু সেগুলো ছিল সেবাদানকারী বিভাগ। এরা ইঞ্জিনিয়ারদেরকে নানান রকম ব্যবহারিক কৌশল শেখাতো। যেমন তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষার্থীরা তড়িৎ বর্তনী বানানো শিখতো। অবশ্য ১৯৬০ এর দিকে, বা এখন, যদি আপনি MIT তে যান দেখবেন সবকিছু বদলে গেছে। আপনি যে বিভাগেরই হন না কেন, কিছু মৌলিক বিজ্ঞান ও গণিত আপনাকে শিখতেই হবে, এরপর সেগুলোর কিছু প্রয়োগও আপনি শিখবেন। কিন্তু এটা বেশ ভিন্ন একটা ভঙ্গি। এই পরিবর্তনের সূচনা হয় তখন যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মত মৌলিক বিজ্ঞান, যেমন পদার্থবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারদেরকে কিছু শেখাতে শুরু করে। আর প্রযুক্তিও খুব দ্রুত বদলাচ্ছিল, ফলে আজকের প্রযুক্তি শেখাটাও খুব বেশি লাভজনক ছিল না যদি সেটা ১০ বছর পর বদলেই যায়। অপরদিকে মৌলিক বিজ্ঞান শিখে ফেললে সামনে যে পরিবর্তনই আসুক তাতে আপনি আপনার জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারবেন। একই ব্যাপার ঘটেছে চিকিৎসাবিদ্যাতেও। ফলে গত শতাব্দীতে প্রথমবারের মত জীববিজ্ঞান চিকিৎসাবিদ্যাকে জরুরী কিছু শেখাতে পেরেছে। এখন ডাক্তার হতে গেলেও জীববিজ্ঞান আপনাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, কারণ প্রযুক্তি বদলাবে। এটা অনেকটা শিল্প (যেখানে, অতটা ভালো না বোঝা কিছু উপাত্ত থেকে ব্যবহারিক কিছু তৈরির চেষ্টা করা হয়) থেকে বিজ্ঞানে (মানে গ্যালিলিয়ান বিজ্ঞান) উত্তরণের মত ব্যাপার।

বুঝতে পারছি। আমাদের আগের বিষয়ে ফিরে আসি। ভাষা এবং চৈতন্যের বায়েসীয় পারিসাংখ্যিক কাঠামো সম্পর্কে। আপনার একটা যুক্তি বহুল প্রচলিত যে কোনো বাক্যের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলাটাই অবোধগম্য…

চমস্কি: হুমম, সম্ভাবনাটা আপনি হিসাব করতে পারেন। কিন্তু এর কোনো বিশেষ অর্থ নেই।

এর কোনো অর্থ নেই। কিন্তু, আপাত দৃষ্টে মনে হয় এই সম্ভাব্যতাত্ত্বিক পদ্ধতির সাথে অন্তর্নিহিত মানসিক প্রতিরূপ, নিয়ম-কানুন এবং সাংকেতিক কাঠামোর বেশ সরল একটা সংযোগ হতে পারে। যেখানে বাস্তব জগতের অপরিশুদ্ধ অপ্রতুল উপাত্তর সাথে এই অন্তর্নিহিত সাংকেতিক কাঠামোর মিলন ঘটবে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের মাধ্যমে। এর ফলে, এইসব সাঙ্কেতিক কাঠামোগুলো কীভাবে উদ্ভব হলো তা নিয়ে আপনাকে কিছু বলতে হচ্ছে না। (মানে, সেগুলো অনাদিকাল থেকেই ছিলো, নাকি আংশিক ভাবে ছিল যার কিছু চলক সময়ের সাথে সাথে বদলেছে এসব…)। সম্ভাব্যতাতত্ত্ব স্রেফ এই অপরিশুদ্ধ উপাত্তকে এই সমৃদ্ধ মানসিক প্রতিরূপের সাথে জুড়ে দেবার কাজটা করছে।

চমস্কি: হুমম, সম্ভাব্যতা তত্ত্বের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই, পরিসংখ্যানের মধ্যেও কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু এদের কি কোনো ভূমিকা আছে?

চমস্কি: আপনি যদি এটা ব্যবহার করতে পারেন, তাহলেতো ভাল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আপনি এটা কী কাজে ব্যবহার করছেন? এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, অপরিশুদ্ধ উপাত্ত বুঝে কী হবে? জানালার বাইরে কী ঘটছে সেটা বুঝেই বা কী হবে?

হুমম, প্রতিনিয়ত ভুরিভুরি অপরিশুদ্ধ উপাত্ত আমাদের সামনে এসে হাজির হচ্ছে। যেমন মারের দেওয়া একটা উদাহরণ, আমাদের সামনে সব সময়ই অপরিশুদ্ধ উপাত্ত এসে হাজির হয়, রেটিনা থেকে…

চমস্কি: তা সত্যি। কিন্তু তিনি যা বলেছেন তা হলো: চলুন আগে জিজ্ঞেস করি, জৈব ব্যবস্থাগুলো কীভাবে এই অপরিশুদ্ধ উপাত্ত থেকে অর্থপূর্ণ কিছু খুঁজে বের করে। রেটিনা, তার ভিতরে আসা অপরিশুদ্ধ উপাত্তগুলোর প্রতিলিপি তৈরির চেষ্টা করছে না। বরং, তা এটা-সেটা নানান জিনিস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা ভাষাজ্ঞান লাভের ক্ষেত্রেও একই। সদ্যভূমিষ্ট শিশু এসেই একটা বিপুল কোলাহলের মধ্যে পড়ছে, উইলিয়াম জেমস যেটাকে বলেছেন, “A booming, buzzing confusion” পুরো জগাখিচুড়ি যাকে বলে। একটা নরবানর, বিড়াল ছানা, বা পাখিকে যদি এই কোলাহলের মধ্যে আনা হয়, তাহলে কিছুই হবে না। কিন্তু মানবশিশু কিভাবে যেন, এই বিপুল কোলাহলপূর্ণ শব্দ থেকেই ভাষা সংক্রান্ত অংশগুলো চিহ্নিত করে ফেলে। এটা হলো প্রথম ধাপ। এই কাজ সে কীভাবে করছে? শিশুটি নিশ্চই পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণ চালাচ্ছে না, কারণ একটা নরবারের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ ক্ষমতা তো প্রায় শিশুটির মতই। শিশুটি সুনির্দিষ্ট কিছু জিনিস খুঁজছে। তাই, মনোভাষাতাত্ত্ববিদ, স্নায়ুভাষাতত্ত্ববিদ এবং অন্যরা গণনা ব্যবস্থার এই সুনির্দিষ্ট অংশগুলোই চিহ্নিত করতে চেষ্টা করছেন যেগুলো, পরিপার্শ্বের বিভিন্ন অংশের সাথে সুক্ষ্মসমন্বিত। দেখা গেছে, মস্তিষ্কে কিছু স্নায়ুবর্তনী আছে যারা সুনির্দিষ্ট কিছু ছন্দ পেলে প্রতিক্রিয়া করে। ভাষায় এ ধরনের ছন্দ প্রায়ই দেখা যায়, যেমন সিলেবাল এর দৈর্ঘ্য বা এমন আরো কিছু। এবং কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে যে শিশু মস্তিষ্ক সবার প্রথমে যা খোঁজে তা হচ্ছে এ ধরনের ছন্দময় কাঠামো। সেই গ্যালিস্টেল এবং মারের অনুমিত গাণনিক ব্যবস্থার মত কিছু একটা শিশুর মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, “এইসব উপাত্ত নিয়ে আমি এই কাজ করব” যেমন উদাহরণ স্বরুপ, জন্মের নয় মাসের মধ্যে সাধারণ কোনো শিশু তার মাতৃভাষায় যেসব ধ্বনি ব্যবহার করা হয় না সেগুলো তফাত করার ক্ষমতা মস্তিস্ক থেকে মুছে ফেলে। অবশ্য একদম শুরুতে যেকোনো শিশুকেই যেকোনো ভাষার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু ধরুন, জাপানী শিশুরা নয় মাস পরে আর ‘ল -র’ এর মধ্যে তফাত করতে পারে না। তাদের মস্তিষ্ক থেকে এই ক্ষমতা একেবারে সমূলে বিনাশ হয়ে যায়। তার মানে ব্যবস্থাটা অসংখ্য সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। আপনি চাইলে একটা অপভাষা বানাতে পারেন, যেটা শুরু থেকে শিশুটিকে শোনালে, তার পক্ষে কোনো ধ্বনিই বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না। তারপর ধরুন ভাষার বিভিন্ন বিমূর্ত কাঠামো খুঁজে বের করার ব্যাপারটা। প্রচুর প্রমাণ আছে যে রৈখিক ক্রম (linear order), মানে কীসের পরে কী আসবে সেই ধারণা, কোনো ভাষার শব্দবিন্যাস ও অর্থগত গণনা কাঠামোতে স্বাভাবিক ভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে মস্তিষ্ক এ ধরনের রৈখিক ক্রম খোঁজে না। তার মানে, বাক্যের শব্দসমূহের অর্থগত দূরত্বগুলো সরল রৈখিক দূরত্ব নয় বরং কোনো জটিল গণনার ফলে প্রাপ্ত। এর কিছু স্নায়ুতান্ত্রিক তথ্য প্রমাণও আছে। উদাহরণস্বরুপ, যদি কোনো রৈখিক ক্রম বিশিষ্ট কৃত্রিম ভাষা তৈরি করে মানুষকে শেখানো যায় যেখানে কনো বাক্যকে না বোধক করার জন্য, এই ধরুণ, তৃতীয় শব্দে কোনো পরিবর্তন করতে হয়। সেক্ষেত্রে মানুষ সেই ধাঁধার (puzzle) সমাধান করতে পারবে, কিন্তু এতে মস্তিস্কের ভাষাপ্রক্রিয়াকরণ অংশগুলো সক্রিয় হবে না— বরং অন্যান্য অংশ সক্রিয় হবে। তার মানে তাদের মস্তিস্ক এই কৃত্রিম ভাষার বাক্যকে না বোধক করার সমস্যাটিকে একটি ধাঁধা হিসাবে দেখছে, কোনো ভাষা বিষয়ক সমস্যা হিসাবে নয়। এ নিয়ে আরো কাজ করা দরকার, কিন্তু…

আপনি তাহলে মস্তিষ্কের কোনো অংশের সক্রিয়করণ বা নিস্ক্রিয়করণকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসাবে গণ্য করছেন…

চমস্কি: … এটা একটা প্রমাণ তো বটেই, অবশ্য একেবারে নিশ্চিত হতে আরো বেশি প্রমাণ লাগবে। আর এ থেকে ভাষা কীভাবে কাজ করে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, যেমন ‘বাক্যের তৃতীয় শব্দ’ ধরনের ব্যাপারগুলো ভাষায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হয় না। একটা সহজ উদাহরণ দেখা যাক, “Instinctively, Eagles that fly swim”, এখানে instinctively কথাটা swim এর সাথে যাচ্ছে, fly এর সাথে না, যদিও পুরো বাক্যটি অর্থহীন। এই ব্যাপারটা প্রতিবর্তি। “instinctively” ক্রিয়াবিশেষণটি তার সবচেয়ে নিকটবর্তি ক্রিয়াকে খুঁজছে না, বরং খুঁজছে গাঠনিকভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত ক্রিয়াটিকে। এ ধরনের গণনা (“বাক্যের তৃতীয় শব্দ” আকারের) সরল দূরত্ব বিচারের চেয়ে অনেক কঠিন। কিন্তু ভাষাতে শুধু এ ধরনের গণনাই ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের ভুরিভুরি উদাহরণ আছে, এমনকি স্নায়ুভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদিও আছে কিছু। যাদের সবই এই একই ব্যাপার নির্দেশ করে। আর আপনি যখন ভাষার আরো জটিল কোনো কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ করবেন, এ ধরনের উদাহরণ বাড়তেই থাকবে।

মারের ল্যাবে সিমন উলম্যান দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণা করে অনমনীয়তার নীতির ((Ullman’s Rigidity Theorem: “Suppose you are given three frames, each containing at least four points. If the points are placed at random in each frame, then the probability is zero that they have a rigid interpretation in three dimensions. If the points do have a rigid interpretation, then they almost surely have exactly two interpretations (which are mirror-symmetric).”)) মত উল্লেখযোগ্য কিছু আবিষ্কার করেছেন। আমার মতে কোনো কিছু কীভাবে কাজ করছে তা বুঝতে উলম্যানের ব্যহৃত পদ্ধতিই কার্যকর উপায়। পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণ করে এ ধরনের আবিষ্কার সম্ভব হত না। বরং খুব যত্ন নিয়ে করা কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে উলম্যান এই নীতিগুলো আবিষ্কার করেন। এর পরের ধাপে হচ্ছে স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে এই গণনার ভার যাদের সেই অংশগুলো চিহ্নিত করা। আমার মতে ভাষার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। আমাদের সাংখ্যিক সামর্থ্য, পরিকল্পনা করার ক্ষমতা, এ ধরনের সবকিছু নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেই এভাবে এগোনো উচিত। স্রেফ কিছু অবিশ্লেষিত বিশৃংঙ্খল উপাত্ত ঘাটাঘাটি করে কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, ঠিক যেমন গ্যালিলিও এভাবে এগোলে কিছুই করতে পারতেন না। আর, আপনি যদি গ্যালিলিও বা ১৭ শতকের গুরুত্বপুর্ণ বিজ্ঞানীদের কথা ভাবেন, তাদের পক্ষে এযুগের অভিজাতগোষ্ঠি মানে, NSF [ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশন] কে নিজের গবেষণা বোঝানো অসম্ভব হত। মানে, একটা ঘর্ষণহীন তলে একটি গোলকের গড়িয়ে পড়া নিয়ে কেন আপনি খামাখা মাথা ঘামাবেন, যার কোনো অস্তিত্বই নেই? এর চেয়ে বরং ফুলের বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করুন। আমার তো মনে হয়, সে যুগে যদি আপনি ফুলের বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করতেন তাহলে তাদের বাহ্যিক রূপের পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণের মত কিছু একটা পাওয়া যেত। এটা মনে রাখতে হবে যে চৈতন্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা এখনো গ্যালিলিওপূর্ব যুগে আছি। এই ক্ষেত্রটা তার সূচনালগ্নে আছে। ফলে আমার মনে হয় বিজ্ঞান সেই শুরুর দিকে কীভাবে কাজ করেছে তা থেকে এখনো কিছু শেখার আছে। এমনকি, ১৬৪০ এর দিকে রসায়নের একটি ভিত্তিমূলক পরীক্ষা করা হয় যেখানে পানি থেকে জীবন্ত বস্তুর সৃষ্টি হতে পারে এই বিষয়টা নিউটন সহ সব বিজ্ঞানীর সামনে প্রমাণ করা হয়। সে যুগে সালোকসংশ্লেষণ সম্পর্কে কেউ কিছু জানত না। তারা যেভাবে কাজটা করেছিল তা হচ্ছে— প্রথমে আপনি একটি মাটির স্তুপ নেবেন, তারপর সেটাকে উত্তপ্ত করবেন যেন তার মধ্যে থেকে সব পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এরপর আপনি সেই মাটিকে ওজন করবেন। তারপর সেই মাটিতে পানি দিয়ে একটি উইলো চারা রোপন করবেন। গাছটি বড় হয়ে যাবার পর, সেটাকে সমূলে উপড়ে ফেলে আবার আপনি সেই মাটি থেকে তাপ দিয়ে সব পানি সরিয়ে ওজন করবেন। দেখা যাবে মাটির ভরে কোনো হ্রাসবৃদ্ধি হয়নি। এখানে যেহেতু শুধুমাত্র বাড়তি পানি যুক্ত করা হয়েছিল তার মানে উইলো গাছটির শরীর সেই পানি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। তার মানে পানিকে জীবন্ত বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়। এটা মোটামুটি একটা বৈধ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, স্রেফ এক্ষেত্রে কী জিনিস অনুসন্ধান করতে হবে সেটা আপনি জানেন না। অনেক পরে এই ‘কী খুঁজতে হবে’ তার উত্তর পাওয়া যায়। প্রিস্টলি যখন আবিষ্কার করেন বাতাসও জগৎ এর একটা উপাদান, এবং এর মধ্যে নাইট্রোজেন সহ নানান জিনিস আছে; এছাড়া প্রকৃতিতে সালোকসংশ্লেষণ সহ নানান রকম প্রক্রিয়া ঘটে…। শুধু মাত্র এর পরই পুরপুরি সঠিক ভাবে পরীক্ষাগুলো আবার করা যম্ভব হয়। কী খুঁজতে হবে তাই যদি না জানা থাকে তাহলে আপাতত সফল মনে হওয়া পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই বিভ্রান্ত হওয়া সম্ভব। এইসব বিভ্রান্তি আরো বাড়বে যদি আপনি গাছের বৃদ্ধি কীভাবে হচ্ছে তা বুঝতে এইসব বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিপুল পরিমান উপাত্ত সংগ্রহ করে বিশাল এক কম্পিউটারে ঢুকিয়ে পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কী ঘটছে তা অনুমান করার চেষ্টা করেন।

জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মেন্ডেলের কাজকে কি আপনি সফল বলবেন? তিনি তো অপরিশুদ্ধ উপাত্ত (ঘটন সংখ্যা) দেখেই তার তাত্ত্বিক স্বীকার্যগুলো দাঁড় করিয়েছিলেন…

চমস্কি: … হুমম, উনি অনেক উপাত্ত যেগুলো তত্ত্বের সাথে মিলছিল না সেগুলো বাতিল করে দিয়েছিলেন।

… কিন্তু সেই বাতিলের হারটা গ্রহণযোগ্য, তার তত্ত্বটা বিবেচনা করলে।

চমস্কি: হ্যাঁ, তিনি সঠিক কাজটাই করেছিলেন। নিজের তত্ত্বকেই উপাত্তের দিকনির্দেশক হিসাবে ব্যবহার করে। কিছু বিপরীত উপাত্ত ছিল যেগুলো তিনি একরকম ফেলেই দিয়েছেন, মানে সবকিছু তো আর আপনি গবেষণাপত্রে লেখেন না। আর তিনি এমন কিছু একক (জিন) নিয়ে কথা বলছিলেন যার খোঁজ সে সময়ের কারো জানা ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান এভাবেই কাজ করে। রসায়নের কথা ধরুণ। এমনকি আমার শৈশবেও রসায়ন ছিলো মূলত কিছু হিসাবনিকাশ করার ব্যবস্থা। কারণ তখনো রসায়নের নিয়মগুলো পদার্থবিজ্ঞানের সাথে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই এটা ছিলো স্রেফ কোনো পরীক্ষার ফলাফল গণনা করার একটা উপায়। বোরের অ্যাটমকেও সেভাবেই বিবেচনা করা হত। মানে, এটা ছিলো কিছু রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল হিসাব করার কৌশলমাত্র, ফলে মডলেটাকে প্রকৃত বিজ্ঞান বিবেচনা করা হতো না কারণ সে সময়ের পদার্থ বিজ্ঞানের সাথে এটা মিলতো না। কিন্তু তার কারণ সেই সময়ে পদার্থবিজ্ঞানই ভুল ছিল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কারের পর এই পরমাণুতত্ত্ব রসায়নের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই তার সাথে একীভূত হয়। তাই শুরুতে একটার মাধ্যমে আরেকটাকে প্রকাশ করার প্রচেষ্টাতেই ত্রুটি ছিল। বরং এই দুইভাবে পৃথিবীকে দেখার উপায়কে একীভূত করার প্রচেষ্টাটিই সঠিক বলে পরিগণিত হয়। চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এই দুই ক্ষেত্রকে একীভূত করা সম্ভব হয় তাদের অন্তর্নিহীত বিজ্ঞানকে আমূল বদলে ফেলার মাধ্যমে। আমার মতে, পদার্থবিজ্ঞান একশ বছর আগে যতটা উন্নত ছিলো স্নায়ুবিজ্ঞান এখনো তার ধারের কাছেও নেই।

ব্যাপারটা বিভিন্ন অণুর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের রিডাকশনিস্ট প্রচেষ্টার (reductionist approach) বিরুদ্ধ…

চমস্কি: হ্যাঁ, রিডাকশনিস্ট প্রচেষ্টাগুলো প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। এর চেয়ে বরং একীভূত করার প্রচেষ্টাগুলো অর্থবহ। কিন্তু এভাবে একীভূত করার মাধ্যমে সব সময় রিডাকশোনে পৌঁছানো নাও যেতে পারে। বিশেষ করে যদি অন্তর্নিহিত বিজ্ঞানে কোনো ত্রুটি থাকে। যেমনটা রসায়ন-পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ছিল। আমার সন্দেহ হয়, স্নায়ুবিজ্ঞান-মনোবিজ্ঞানের মধ্যেও এমন কোনো মৌলিক ভ্রান্তি আছে। গ্যালিস্টেল যদি সঠিক হয়, তাহলে সেটা নির্দেশ করবে যে এদেরকে হয়তো একীভূত করা সম্ভব কিন্তু বর্তমান স্নায়ুবিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলো বদলাতে হবে।

এভাবে একীভূত করার লক্ষ্য কি অর্থবহ, নাকি এই দুটি ক্ষেত্রের সমান্তরালে অগ্রসর হওয়া উচিত?

চমস্কি: বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে একীভূত করার প্রচেষ্টা এক ধরনের সহজাত ধারণা। অনেকটা মহাবিশ্বের একীভূত তত্ত্ব খোঁজার মত। এটা হতেই পারে যে হয়তো এমন কোনো একীভূত তত্ত্ব নেই এবং বিভিন্ন অংশ বিভিন্নভাবে কাজ করে। তবে আমি ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ধরে নিতে চাই যে এমন একীভূত বর্ণনা আছে এবং সেটা খুঁজে বের করাই আমার লক্ষ্য। এ ধরনের একীভূত তত্ত্ব রিডাকশন পদ্ধতিতে নাও পাওয়া যেতে পারে, যেমনটা প্রায়ই দেখা যায়। ডেভিড মারের পদ্ধতির এটাই একটা মূলনীতি: গাণনিকভাবে (computationally) আপনি যেটা আজ আবিষ্কার করবেন, একদিন গাঠনিক স্তরের(Mechanism level) কোনো আবিষ্কারের সাথে সেটা একীভূত হবে, অবশ্য তখন গাঠনিক উপাদানগুলোকে বর্তমানে আমরা যেভাবে বুঝি তা হয়তো বদলাতে হবে।

[পরের পর্বে সমাপ্য]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0

18 Comments

  1. শিক্ষানবিস April 22, 2015 at 4:56 pm - Reply

    ১।

    চমৎকার লাগছে সাক্ষাৎকারটা। বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি ও ইতিহাস নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা আমূল পাল্টে যাচ্ছে পড়তে পড়তে।

    এর একটা কারণ হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা সুবিধা আছে যা অন্য কারো নেই। যদি কোনো কিছু খুব বেশি জটিল হয়ে যায় তাহলে তারা সেটা অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেয়।
    কোনো অণু যদি খুব বড় হয়ে যায় তাহলে আপনি সেটা রসায়নবিদদের হাতে ছেড়ে দেবেন। রসায়নবিদ যদি দেখে কোনো ব্যবস্থা তাদের পক্ষেও অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে তখন তারা সেটি জীববিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দেয়। জীব বিজ্ঞানিদের জন্য যেটা খুব বেশি বড়, সেটা তারা ছেড়ে দেয় মনোবিজ্ঞানীদের হাতে, এভাবে চলতে চলতে এটা একসময় হাজির হয় সাহিত্য সমালোচকদের হাতে…

    এভাবে ভাবিনি আগে কক্ষনো। একইসাথে ভিডিও ক্যামেরার উদাহরণটা চরম লাগল। গালিলেও’র মতো চিন্তা না করে আমরা যদি কেবল জানালাতে একটা ভিডিও ক্যামেরা বসিয়ে গিগাগিগা উপাত্ত সংগ্রহ করতাম, আর তারপর তা বায়েসীয় হেনতেন দিয়ে বিশ্লেষণ করে কিছু একটা বের করতাম, তাহলেও হয়ত প্রকৃতির অনেক ঘটনারই ভবিষ্যদ্বাণী করা যেত, কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রকৃতির মূলনীতি সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা হতো না। গালিলেও যদি আজকের যুগে তার ঘর্ষণহীন তল বিষয়ক গবেষণার জন্য টাকা চেয়ে প্রপোজাল লিখতেন তাহলে ‘ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন’ হয়ত তা গ্রহণ করত না; এই কথাটাও চিন্তা উদ্রেককারী।

    এবং এগুলো পড়ার পর আমার নিজের বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডকেই রীতিমত হাস্যকর মনে হচ্ছে; অবশ্য এর থেকে বেশি কিছু করার বৌদ্ধিক ক্ষমতাও আমার নেই, তাই এটাই সই। আমরা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আজকের যুগে যা করছি তা হচ্ছে, একটা দুরবিন বসিয়ে (জানালায় ভিডিও ক্যামেরা বসানোর মতোই) মহাকাশের গিগাগিগা ছবি তুলছি তারপর সেটাকে বায়েসীয় হেনতেন দিয়ে বিশ্লেষণ করে মোটামুটি অমৌলিক কোনো মডেলের সাথে তা মেলানোর চেষ্টা করছি (সব জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে অবশ্যই এটা প্রযোজ্য নয়, ভয়াবহ সাধারণীকরণ করে ফেললাম হতাশাবশত)। তবে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও বিশ্বতাত্ত্বিকেরা এদিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থানে আছে। আধুনিক স্ফীতি তত্ত্ব, স্ট্রিং তত্ত্ব হয়ত কোনোদিন বৈপ্লবিক কল্পলম্ফ (leap of imagination) হিসেবে দেখা দেবে; কে জানে। তবে সান্ত্বনা পাই এই ভেবে যে, পর্যবেক্ষণ বা ভিডিও ধারণটাও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এগুলা করতে থাকি, ভবিষ্যতে হয়ত কোনো আইনস্টাইন এসে সব একসূত্রে গেঁথে দেবে, এবং তারপর আমাদের শত বছরের পর্যবেক্ষণও এক নতুন মহিমায় মণ্ডিত হবে।

    মনোবিজ্ঞানী আর স্নায়ুবিজ্ঞানী দের মধ্যে গালিলেওর উত্থান ঘটুক এই আশাই করি। তবে তাকে গালিলেওর চেয়েও অনেক বড় কল্পলম্ফবিদ হতে হবে, কারণ নিশ্চিতভাবেই জীবমস্তিষ্ক গোটা মহাবিশ্বের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

    ২।

    বেশ কিছু নতুন পরিভাষা পেলাম।
    ape এর একটা বাংলা ফেসবুকে করা হয়েছিল ‘বিনর’। অবশ্য নরবানর বেশি প্রচলিত।
    পরিসংখ্যানিক না বলে পারিসাংখ্যিক বলা উচিত না? পারিসাংখ্যিক বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হতে দেখেছি।
    reductionist এর বাংলা ঠিক সংশ্লেষণী (synthetic) হয় না। এখনো খুঁজে পাচ্ছি না। ভেবে দেখতে হবে।
    গ্যালিলিয়ান না বলে গ্যালিলীয় বলা যায় না?
    আর কিছু বানান ভুল/টাইপো রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে হয়ত সময় পেলে একটা প্রুফরিড করে দেখতে পারেন। আমার চোখে পড়ল:
    বিমূর্তায়ণ -> বিমূর্তায়ন
    নিউরণ -> নিউরন (বিদেশী শব্দে ণ হয় না সাধারণত)
    গোট্টলব -> গোটলব বা গটলব
    আপাতত এটুকুই…

    • তানভীর April 22, 2015 at 6:22 pm - Reply

      ১)

      বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি ও ইতিহাস নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা আমূল পাল্টে যাচ্ছে পড়তে পড়তে।

      ঠিক এরকম একটা অনুভূতিই হয়েছিলো প্রথম এই সাক্ষাৎকারটা পড়তে গিয়ে। ক্যামেরা অ্যানালজিটাও একটা আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছে আমার বিজ্ঞানচেতনায়। সে জন্যই এই সুদীর্ঘ্য অনুবাদের প্রোজেক্ট হাতে নিলাম। ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’ নিয়েই যে অনেক গবেষণা/বিশ্লেষণ/আলোচনার দরকার আছে সেটা এই সাক্ষাৎকারে দারুণ ভাবে ফুটে উঠেছে। আমি আগে এটাকে একটা ‘সেটেলড’ বিষয় মনে করতাম। এই সাক্ষাৎকারটা ভালো লাগলে, কার্ল পপারের Unended quest ও অনেক ভাবনার খোরাক জোগাবে। আধুনিক দর্শনচিন্তা এবং বিজ্ঞানদর্শনচিন্তার গতিবিধি দারুণভাবে ফুটে উঠেছে এই বই তে। পপার নিজেই ইন্টেলেকচুয়াল অটোবায়োগ্রাফী হিসাবে লিখেছে বইটা। কীভাবে সে ফলসিফায়েবিলিটির ধারণায় পৌছালো তার একটা ঐতিহাসিক ধারাবিবরণ পাওয়া যায়। এ ছাড়া, সেই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে দার্শনিক/চিন্তাবিদরা কীভাবে নিজেদের গবেষণা পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন সেটাও বোঝা যায়।

      চমস্কিকে নিয়েও এধরণের একটা বই পেলাম, Chomsky: Language, Mind, and Politics এটা অবশ্য তার নিজের লেখা না। তবে ইন্টেলেকচুয়াল বায়োগ্রাফী বলা যায়। শুরুটা দেখে খুব আগ্রোহদ্দীপক মনে হচ্ছে।

      … এগুলো পড়ার পর আমার নিজের বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডকেই রীতিমত হাস্যকর মনে হচ্ছে; অবশ্য এর থেকে বেশি কিছু করার বৌদ্ধিক ক্ষমতাও আমার নেই…

      এভাবে হতাশ হওয়ার আসলে কিছু নেই। চাইলেই এই ব্যাপারগুলো নিয়ে গ্যালিলিয়ান পদ্ধতিতে ভাবতে শুরু করা যায়। আর জ্যোতিবৈজ্ঞানিক উপাত্তের গুরুত অপরিসীম। কেপলার তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথের সূত্রগুলোতে পৌছাতে পেরেছিলো টাইকোব্রাহের সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের উপর ভর করেই।

      চৈতন্যবিজ্ঞান নিয়ে ভাবছি আজকাল খুব। জীবনে কখনো গবেষণার অভিমুক বদলালে এইদিকেই যাবো নিশ্চিত।

      ২)

      পরিভাষা আর বানান সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর জন্য ধন্যবাদ। বদলে নিলাম। reductionist কে আপাতত ‘রিডাকশনিস্ট’ হিসাবেই রাখছি। ভোগাচ্ছে শব্দটা খুব। এটা তো দর্শনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। আর বাংলায় অনেক দর্শন টেক্সটবই লেখা হয়েছে। সম্ভবত কিছু একটা পরিভাষা আছে ইতোমধ্যেই।

      যেটা বুঝছি, কোনো কিছুকে তার গাঠনিক উপাদানসমূহে বিশ্লেষণ করে সেইসব ক্ষুদ্র অংশ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সামগ্রিকের বাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌছানোর প্রক্রিয়া হচ্ছে রিডাকশনিজম। এটাকে এক শব্দে কীভাবে ধরা যায়?

      • শিক্ষানবিস April 22, 2015 at 10:23 pm - Reply

        সেই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে দার্শনিক/চিন্তাবিদরা কীভাবে নিজেদের গবেষণা পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন সেটাও বোঝা যায়।

        আমাদের বর্তমান অবস্থার জন্য এটা উপকারী। পড়ে দেখতে হবে।
        বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা এমনকি বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়েও আসলে এখনো আলোচনার অবকাশ আছে। এ নিয়ে দর্শনে Demarcation problem নামে একটা বহুলালোচিত সমস্যাও আছে। সম্প্রতি মাসিমো পিলিউচ্চি সম্পাদিত Philosophy of Pseudoscience বইটা পড়ছি, বিজ্ঞানের সংজ্ঞা নিয়ে এতে একটা চমৎকার প্রবন্ধ আছে। এ নিয়ে কিছু লিখব শীঘ্রই। পপারের মিথ্যাখ্যানযোগ্যতা নিয়েও এতে অনেক কিছু আছে।

        • তানভীর April 23, 2015 at 4:53 pm - Reply

          মিথ্যাখ্যানযোগ্যতা পরিভাষাটাও পছন্দ হলো খুব। বেশ কিছুদিন ধরেই ফলসিফায়েবিলিটি শব্দটা ভোগাচ্ছিলো খুব।

          • শিক্ষানবিস April 23, 2015 at 6:12 pm - Reply

            হ্যাঁ। শব্দটা পাওয়ার ইতিহাস বলি। ভিয়েনা সার্কেল বিজ্ঞানের শর্ত হিসেবে verifiability র কথা বলত; অভিধানে দেখলাম verification এর একটা অর্থ সত্যাখ্যান। পপার তো বলেছিলেন, সত্য আখ্যা দিতে পারা নয় বরং মিথ্যা আখ্যা দিতে পারাটাই বিজ্ঞানের শর্ত। তাই সত্যাখ্যানের বিপরীতে মিথ্যাখ্যান ই যুৎসই মনে হলো; এমনকি ভেরিফায়েবিলিটি আর ফলসিফায়েবিলিটি র মধ্যে বৈপরীত্য যতটা না ফুটে উঠে, বাংলাতে সত্যাখ্যানযোগ্যতা ও মিথ্যাখ্যানযোগ্যতা দিয়ে সেটা আরো ভালভাবে ফুটে উঠছে।

            • ব্লাডি সিভিলিয়ান June 14, 2015 at 4:43 pm - Reply

              মুক্তমনায় সম্ভবত পড়েছিলাম, মিথ্যা প্রতিপাদনযোগ্যতা এবং সেটা অভিজিৎ রায়ের লেখাতেই। আমিও অনেক দিন ধরেই ফলসিফায়েবিলিটির একটা ভালো পরিভাষা খুঁজে বেড়াচ্ছি। পরিভাষার কথা উঠলোই যখন, একটা কথা বলি। এরকম একাধিক শব্দ বা সংজ্ঞা আছে যেসবের পরিভাষা এর আগে বাংলায় সৃজন করা হয়েছে, কিন্তু আমরা, দেখা যাচ্ছে, সেসবের সাথে পরিচিত নই বলে হাতড়াই লেখার সময়ে এবং নতুন কিছু তৈরি করি যেটা চাকা পুনরাবিষ্কারের ঘটনাটি ঘটায়। অবশ্য, এরকমও হয় যে, আমরা অনুবাদ করার সময়ে পুরনো পরিভাষা পছন্দ হয় নি বলে নতুন কিছু তৈরি করে নিলাম।

              তো, আমার মত এই যে, আমরা একটা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পারে যাতে যাঁর যা খুশি, তেমনটা ইনপুট (এটার ভালো পরিভাষা কী?) দেবেন, পাশাপাশি এতাবৎ সৃজিত সব পরিভাষাও সেখানটায় থাকবে। ব্যবহারকারীরা সেসব দেখে বেছে নিতে পারবেন বা নতুনতর কিছু বানিয়ে সেখানটায় রেখে দিতে পারবেন পরের ব্যবহারকারীদের কথা মনে রেখে।

              কেউ কি এগিয়ে আসবেন?

              • মুক্তমনা সম্পাদক June 15, 2015 at 3:52 pm - Reply

                আপনার প্রস্তাবটি মুক্তমনা সম্পাদক দলের পছন্দ হয়েছে। আমরা বিভিন্ন বিষয়ের পরিভাষার আর্কাইভ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছি। একটা খসড়া দাঁড়িয়ে গেলে পরিভাষা পাতার লিংক ব্লগের মেনুতে যোগ করা হবে। “সহায়িকা” এর অধীনে “পরিভাষা” নামে একটা পাতার লিংক পাবেন ভবিষ্যতে। সেখানে গেলে বিভিন্ন বিষয়ের পরিভাষার পাতার লিংক পাবেন। প্রতিটি পরিভাষা পাতায় মন্তব্য করার অপশন থাকবে। সুতরাং কোনো পরিভাষা কারো পছন্দ না হলে তিনি ভিন্ন কিছু প্রস্তাব করতে পারবেন।

  2. আমরা অপরাজিত April 23, 2015 at 11:10 am - Reply

    দারুন কাজ হচ্ছে,,,
    বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানবাদিতার জয় হউক।
    কলম যুদ্ধের দ্বারা আমাদের জং ধরা ভোতা মাথা চূর্ন-বিচূর্ন হয়ে যাক,,,,,

    • তানভীর April 23, 2015 at 4:51 pm - Reply

      ‘বিজ্ঞানবাদ’ শব্দটা আমার খুবই অপছন্দ। কয়েকটা কারণে। প্রথমত বিজ্ঞানবাদ কথাটা ভুল। যেমন- মার্ক্সবাদ হয়, কারণ সেটা একটা মতবাদ। বিজ্ঞান কোনো মতবাদ নয়। আপনি হয়তো ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ বুঝাতে চাচ্ছেন। একইভাবে ‘বিবর্তনবাদ’ কথাটাও ভুল। কারণ সেটাও কোনো মতবাদ নয়। পরীক্ষিত তত্ত্ব। বিবর্তনতত্ত্ব বা স্রেফ বিবর্তন কথাটা ব্যবহার করা যেতে পারে।

      বেখেয়ালে এই ধরনের ‘বাদ’ উপসর্গ ব্যবহার করার কারণেই ফরহাদ মজহারপন্থীরা বিজ্ঞানকেও একটা আর্থসামাজিকরাজনৈতিক হেজিপেজি হিসাবে তেনা প্যাচানোর সুযোগ পায়।

      • আমরা অপরাজিত April 23, 2015 at 5:28 pm - Reply

        আপনি ঠিক-ই বলেছেন,আসলে বিজ্ঞানমনস্কতাই বুঝাতে চেয়েছি।তবে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতা কাকে বলে তা যেন নষ্ট,পঁচা ভন্ড ফরহাদ(মাজার শরিফ)রা আপনারা যারা বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন তা যেন বুঝে…এ আশাই করছি।
        ভাল থাকবেন।

      • শিক্ষানবিস April 23, 2015 at 6:07 pm - Reply

        হ্যাঁ, শন ক্যারলের Let’s Stop Using the Word “Scientism” পড়ার পর থেকে আমিও বিজ্ঞানবাদ (Scientism) শব্দটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু স্টিফেন পিংকার আবার Science Is Not Your Enemy লেখাটিতে বিজ্ঞানবাদ শব্দটাকে ভালো অর্থে ব্যবহার করেছেন। আসলে পিংকারের এই লেখাটা আসার পরই ক্যারল, পিলিউচ্চি সহ অনেকে পিংকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।

        • তানভীর April 23, 2015 at 11:33 pm - Reply

          পিঙ্কারের লেখাটা আগে পড়েছিলাম। এই মন্তব্যের সূত্রে আবার পড়লাম। লেখার বিষয়বস্তুর সাথে আমি একমত। তবে যে টোনে লেখা হয়েছে তাতে হিউম্যানিটিস এর মানুষজন, আগ্রহী বা উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠার বদলে ‘ইনটিমিডেটেড’ বোধ করবে বলে আমার ধারণা। এই লেখার কিছু সমালোচনাতেও তেমনটাই চোখে পড়লো।

          তবে পিঙ্কারের এই ‘সহিহ সায়েন্টিসিসম/বিজ্ঞানবাদিতা’ ডিফাইন করার প্রচেষ্টাটা আসলেই পরিত্যাজ্য। এ সম্পর্কে আমার মতটা ক্যারলের সাথে হুবহু মিলে গেছে দেখে অবাক হলাম!

          আর আলোচনা প্রসংগে বলে রাখি স্যাম হ্যারিসের অনেক ধারণা আমার কাছে অপরিশুদ্ধ মনে হয়। ধারণাগুলোর শুদ্ধরূপ কেমন হতে হবে তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছি। শিঘ্রই এটা নিয়ে বিশদে লেখার ইচ্ছা আছে।

  3. পিডিএফ ফরমেটে ডাউনলোড করার অপশন কি বাদ দেয়া হয়েছে?

    • তানভীর April 23, 2015 at 10:11 pm - Reply

      লেখার শেষে ‘প্রিন্ট’ আইকনে ক্লিক করে সেখান থেকে PDF আকারে ডাউনলোড করার অপশন পাবেন। 🙂

  4. ধন্যবাদ 🙂
    আমি আমার BSc-র থিসিস করছি Natural Language Processing-এর উপর। হঠাৎ এই গুরুত্বপূর্ণ লেখা-টি চোখে পড়লো।

  5. প্রদীপ দেব April 25, 2015 at 1:56 pm - Reply

    বিষয়টা নিঃসন্দেহে খুবই জটিল। কিন্তু অনুবাদ খুব ভালো হচ্ছে। কিছু কিছু বিষয় আমাদের জ্ঞানের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন-

    অপরদিকে মৌলিক বিজ্ঞান শিখে ফেললে সামনে যে পরিবর্তনই আসুক তাতে আপনি আপনার জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারবেন।

    আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যেভাবে মৌলিক বিজ্ঞান উদ্দেশ্যমূলক ভাবে গৌরব হারাচ্ছে তার ফল আমরা ইতোমধ্যেই পেতে শুরু করেছি।

    পরের পর্বের অপেক্ষায়।
    কলম চলুক।

  6. তানবীরা May 2, 2015 at 12:43 am - Reply

    পড়লাম কিন্তু বুঝলাম কতোটা কে জানে

    পরের পর্বও পড়ব

  7. সত্যিই খুব অবাক করার মত বিষয়,বিজ্ঞানের অন্যসব শাখার তুলনায় এ শাখায় উন্নতি ১০০ বছর পিছিয়ে।
    নোম চমস্কির দৃষ্টিকোণ খুবই অসাধারণ!

Leave A Comment

মুক্তমনার সাথে থাকুন