নারী-স্বাধীনতা বিষয়ক একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো। বলিউড খ্যাত নায়িকা দীপিকা পাদুকোনের এই বিজ্ঞাপন অনুসারে নারীর নিজের অধিকার আছে তার শরীরের । একান্তই তার ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে যে, সে তার শরীর নিয়ে কি করবে — বিয়ের আগে সেক্স করবে, নাকি বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক তৈরি করবে। “শরীর আমার, চয়েশ আমার” নামক এই ধরনের একটি অত্যন্ত ক্যাচি এবং বোল্ড মেসেজ ছড়িয়ে আছে এই বিজ্ঞাপনী বক্তব্যে ।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এই ধরনের বক্তব্যের বিরোধী। মনে হতে পারে, একজন শিক্ষিত নারী হয়ে কেন আমি এর বিরোধিতা করছি ? নারীর শরীরের অধিকার কি নারীর নেই ? গালাগালি দিন , অপমান করুন ক্ষতি নাই। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন অন্তত সবদিকটা। ভেবে দেখুন আমরা বিজ্ঞাপনের অর্ধসত্য এবং চাকচিক্যে নিজের বিচারের ক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলতে শিখে যাইনি তো ? এমন নয় তো, যে, এই আপাত নারীবাদী বিজ্ঞাপন সত্যি্কারের নারীবাদী নয় ? এমন নয় তো যে, এটি নারীবাদের আড়ালে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের চাহিদার প্রকাশ ? এর পিছনে সত্যিই পুরুষের নারী-শরীরের খিদে লুকিয়ে নেই তো ?

যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বলি , দীপিকার এই আপাত-স্বাধীনতার বানীও আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হর্ত্তা কর্তা বিধাতা পুরুষের উদগ্র কামনারই প্রকাশ। কেন ? কারণ, দেখতে পাচ্ছি নারী স্বাধীনতার নামে এই বিজ্ঞাপনে অদ্ভুত ভাবে শরীরের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। কেননা নারী স্বাধীনতার এই বিজ্ঞাপনেও নারীর সত্তাকে নারী শরীরের সমতুল্য করে দেখা হয়েছে। নারী মানেই যেন নারীর শরীর। তাই শরীরের স্বাধীনতাতেই নারীর স্বাধীনতা । আর একথা যুক্তি–বহির্ভূত ভাবে কেবল স্কুল কলেজের মেয়েদের আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য বারবার সমস্ত চ্যানেলে বলা হচ্ছে। আচ্ছা, নারীর স্বাধীনতার কথা কেন শরীরে এসেই থেমে যাবে? কেন শিক্ষার স্বাধীনতা, কর্মের স্বাধীনতা পর্যন্ত পৌঁছাবে না ?

হয়ত বলবেন, অবশ্যই পৌঁছানো উচিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন, এই বিজ্ঞাপনে অন্তত তেমন ইঙ্গিত নেই । কেন ? কেননা, হর্তা কর্তা বিধাতারা মনে করেছেন যে, নারীর মনস্তত্ত্বকে যদি তার নিজের কাছেই ‘কেবল নারী শরীর’ – প্রতিপন্ন করে দেওয়া যায়, তাহলে নারী তার স্বাধীনতা বলতে বুঝবে ‘শুধুমাত্র তার শরীরের স্বাধীনতা’। অবাধ যৌনতাই তখন তার স্বাধীনতার প্রকাশ হয়ে দাঁড়াবে। যেদিন এই কাজে সফলতা আসবে সেদিন পুরুষকে নারী শরীর পেতে আর কষ্ট করতে হবে না। নারী হয়ে উঠবে শরীর মাত্র। শরীরের কি আর বোধ আছে? শরীরের আছে খিদে। খিদে মেটাতে গিয়ে সে স্বাভাবিক ভাবেই অন্যের খাদ্য হয়ে উঠবে। আর নারীর কাছ থেকে শুধু এটাই তো চায় পুরুষ সমাজ। তাই না ?

প্রসঙ্গক্রমে একটু মনে পড়িয়ে দিতে চাই, সতীদাহ সংক্রান্ত যে সব তথ্য বর্তমান গবেষনায় বেরিয়ে আসছে, তাতে প্রমানিত হয়েছে যে, সতীদাহের জন্য খুব একটা জোর করে করা হত না। মেয়েরাই স্বেচ্ছায় সহমৃতা হত। এনিব্যাসান্তদের লেখা থেকে একথা প্রমানিত হয় যে, সেইসময় নারী সমাজের সামনে সহমরণকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের হর্তাকর্তা পুরুষেরা এতো উচ্চ মর্যাদার স্থানে স্থাপিত করতে সক্ষম হয়েছিল যে, মেয়েরা সতী হওয়াকেই পরম পুণ্যের কাজ বলে মনে করতো । এইভাবেই সেদিন নারী চিতায় উঠেছিল স্রেফ পুরুষের প্রচারণার ফাঁদে পা দিয়ে । আজো দীপিকাদের দিয়ে পুরুষ সমাজ এমন কিছুই করাতে চাইছে না তো, যাতে করে নারী নিজেই সহজলভ্যা হয়ে ওঠে পুরুষ সমাজের কাছে ?

বিষয়ের জটিলে না গিয়ে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, নারীবাদের সৃষ্টি কিন্তু নারীকে পুরুষের মর্যাদায় তুলে আনার জন্য বা নারী পুরুষের সমান অধিকারের দাবীতে এবং নারীর প্রতি শারীরিক ( বিশেষত যৌন) ও মানসিক অপরাধ কমানোর লক্ষ্যে । কিন্তু নারীবাদী চেতনার মধ্যে দিনের পর দিন ধীর গতিতে স্থান করে নিয়েছে একটি শরীর কেন্দ্রিক চেতনা, যা নারীকে আবার শরীরমাত্র করে তুলছে। কৌশলে অসম্ভব করে তুলছে নারীর সত্যিকারের স্বাধীনতার সম্ভবনাকে।
একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শরীরকেন্দ্রিক চেতনা, তা সে যৌনশিক্ষাই হোক, অবাধ যৌনতা বা নারী শরীরের অকারন প্রদর্শন – কোনটাই কখনোই যৌন অপরাধকে কমাতে সক্ষম হয়নি। বরং বৈষম্য-জনিত অপরাধকে বাড়িয়ে তুলেছে অনেক। নারীকে পুরুষেরসমান মর্যাদায় স্থাপন করতেও এই চেতনা সম্পুর্ন ব্যর্থ হয়েছে। পাশ্চাত্য দেশগুলি এই বিষয়ে আমাদের কাছে শিক্ষা হতে পারে। তাই ‘শরীর প্রদর্শনে আমার অধিকার আছে’ , ‘বিবাহ বহির্ভুত শারীরিক সম্পর্ক রাখার আমার অধিকার আছে’ জাতীয় সস্তা কথাগুলি কখনোই ‘নারী স্বাধীনতার প্রকাশ’ হিসাবে মেনে নেওয়া যায় না ।

চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা নারীর আজ বোঝা অত্যন্ত দরকার যে স্বাধীনতা আসলে কি । দর্শনের তথা নীতিবিদ্যার আধুনিক পাঠগুলি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, স্বাধীনতা মানে হল নির্বাচনের ক্ষমতা। একাধিক কর্তব্য বা বিষয়ের মধ্যে ইচ্ছামতো নির্বাচন করার সামর্থ্যই হল স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতাই আমাদের অস্তিত্ত্বের প্রকৃত প্রকাশ। রাস্ট্রবিজ্ঞান যারা পড়েছে তারা জানে যে, স্বাধীনতা কখনো অবাধ হতে পারে না। প্রাচীন ভারতের মুনি-ঋষিরা মনে করতেন যে, স্বাধীনতা মানে স্ব-নিয়ন্ত্রন বা আত্মনিয়ন্ত্রন। নারীর আজ সেইটে শেখা উচিত। ‘আত্ম’নিয়ন্ত্রনের অধিকার – কেবল ‘ আপন শরীর নিয়নন্ত্রনের অধিকারমাত্র’ নয়। মনে রাখতে হবে শরীরটা যন্ত্রমাত্র। তার খিদে আছে, বোধ নেই, নেই নিজেকে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। আজ তাই সমস্ত প্রভাবমুক্ত হয়ে নারীকে ধ্যানমগ্ন হতে হবে। নিজেকে খুঁজতে হবে। নিজের মধ্যের ‘নারী সত্তা’কে আবিষ্কার করতে হবে। তবেই সে নিজেকে বুঝতে পারবে, নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। ঠিক-ভুলকে নির্ধারন করে নির্বাচন করতে পারবে। তবেই তো সে প্রকৃত স্বাধীন হবে । ‘দীপিকার স্বাধীনতা’ আসলে স্বাধীনতা নয়, স্বাধীনতার মুখোশের আড়ালে পরাধীনতা — তবে সে তো কেবল আমার মত, সামগ্রিকভাবে নারী সমাজকে নির্বাচন করতে হবে, দীপিকার স্বাধীনতা কি আসলেই স্বাধীনতা ? নারী সমাজের উপরেই এটা ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এই বিষয়ে নির্বাচনের অধিকার কেবল নারীর, আর কারো নয় ।

[428 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0