প্লেটোর সংলাপ গোর্গিয়াস (Γοργίας/Gorgias, ৩৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এর তিনটি ইংরেজি অনুবাদ (Benjamin Jowett, Terrence Irwin, Donald J. Zeyl) এর সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং E. R. Dodds এর ভাষ্যের সহায়তায় একটি বাংলা অনুবাদ।

চরিত্রসমূহ: কালিক্লিস, সক্রেটিস, কাইরেফোন, গোর্গিয়াস, পোলোস

কালিক্লিস: প্রবাদে বলে না, বিজ্ঞ ব্যক্তি যুদ্ধে দেরি করতে পারে, কিন্তু উৎসবে কক্ষনো নয়! ((এই গ্রিক প্রবাদটির উৎস জানা যায়নি; অনুরূপ একটি ইংরেজি প্রবাদ হচ্ছে: “first at a feast, last at a fray”; উইলিয়াম শেকসপিয়ার, Henry IV, Part I, Act 4, Sc. 2.)) {৪৪৭} ((দ্বিতীয় বন্ধনীর ভিতরের সংখ্যাগুলো E. R. Dodds সম্পাদিত মূল গ্রিক টেক্সট এ উক্ত লাইনের অবস্থান নির্দেশক।))

সক্রেটিস: তো আমরা কি উৎসবের জন্য বড্ড দেরি করে ফেললাম?

কালিক্লিস: হ্যাঁ; আর উৎসবটাও ছিল অতি-প্রীতিকর, কারণ গোর্গিয়াস এই মাত্রই তার চমৎকার বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা ((সোফিস্টরা শ্রোতাদেরকে নিজেদের বাক্‌চাতুর্য দেখানোর জন্য নিয়মিত যেসব উপস্থাপনা—প্রাচীন গ্রিক ভাষায় এপিদেইক্সিস—পেশ করত।)) শেষ করল।

সক্রেটিস: সব দোষ কাইরেফোনের; ও-ই তো আমাদেরকে এতক্ষণ বাজার বেড়ানোতে ব্যস্ত রাখল।

কাইরেফোন: কোনো সমস্যা নেই সক্রেটিস। যে ক্ষতি করেছি তা উসুলের ব্যবস্থাও করব। গোর্গিয়াস আমার বন্ধু, সুতরাং সে নিশ্চয়ই আমাদের জন্য উপস্থানাটা আবার দিবে—তুমি চাইলে এখনই, বা এখন না চাইলে অন্য কোনো সময়।

কালিক্লিস: কী ব্যাপার কাইরেফোন; সক্রেটিস কি গোর্গিয়াসের কথা শুনতে আগ্রহী না কি?

কাইরেফোন: হ্যাঁ, সেই জন্যই তো আমাদের আসা।

কালিক্লিস: তাহলে যেকোনো সময় আমার বাড়িতে চলে আসো না কেন! গোর্গিয়াস আমার সাথেই থাকছে এবং সেখানেই তোমাদেরকে একটা উপস্থাপনা দিতে পারবে।

সক্রেটিস: খুব ভাল, কালিক্লিস। কিন্তু ও কি আমাদের সাথে একটা আলোচনায় বসতে রাজি হবে? আমি সরাসরি তার কাছ থেকে জানতে চাই যে, তার শিল্পটা ((τέχνη—টেকনি—আর্ট—শিল্প। বাংলায় ‘শিল্প’ দিয়ে আর্ট ও ইন্ডাস্ট্রি দুটোই বুঝানো হয় তেমনি গ্রিক ভাষায়ও এক ‘তেকনি’ দিয়ে সব বুঝানো হয়।)) কী করতে পারে, তার দাবীগুলো কী নিয়ে এবং সে ঠিক কী শেখায়। আর ঐ অন্য যে জিনিসটার কথা বললে—অর্থাৎ উপস্থাপনা—সেটা না হয় সে তোমার কথামতো অন্য কোনো সময় দিক।

কালিক্লিস: আরে সক্রেটিস, তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করাটা এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। আসলে প্রশ্নোত্তরই ছিল তার উপস্থাপনার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। এই একটু আগেই সে ঘরের সবাইকে প্রশ্ন করতে আহ্বান জানাচ্ছিল এবং বলছিল যে, সে সব প্রশ্নের উত্তর দিবে।

সক্রেটিস: কী সৌভাগ্য! ওকে জিজ্ঞেস করবে, কাইরেফোন–?

কাইরেফোন: কী জিজ্ঞেস করব?

সক্রেটিস: সে কে? ((ὅστις ἐστίν—অনুবাদ অসম্ভব। তবে কাইরেফোন এমন অর্থই করেছেন।))

কাইরেফোন: মানে?

সক্রেটিস: যেমন, সে যদি জুতো বানানোর কাজ করত তাহলে এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে যে, সে মুচি; ঠিক না? বুঝলে?

কাইরেফোন: হ্যাঁ, বুঝেছি। এবং জিজ্ঞাসাও করব। আচ্ছা গোর্গিয়াস, কালিক্লিস যে বলল তুমি যে কারো যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারার দাবী করো, সেটা কি ঠিক?

গোর্গিয়াস: পুরো ঠিক, কাইরেফোন। এই মাত্রই তো ঠিক এই দাবীটা করছিলাম, এবং সাথে আমি এটাও বলি যে, অনেক বছর আমাকে কেউ কোনো নতুন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেনি।

কাইরেফোন: তাহলে আমার ধারণা তুমি এই প্রশ্নটার উত্তর খুব সহজেই করতে পারবে, গোর্গিয়াস।

গোর্গিয়াস: আমাকে পরখ করে দেখার এই তোমার সুযোগ, কাইরেফোন।

পোলোস: হায় জিউস, কাইরেফোন! চাইলে আমাকে পরখ করো! আমার মনে হয় গোর্গিয়াস ক্লান্ত হয়ে গেছে; এই মাত্রই তো একটা লম্বা বক্তৃতা শেষ করল।

কাইরেফোন: তাই নাকি, পোলোস? তোমার কি মনে হয় তুমি গোর্গিয়াসের চেয়েও প্রশংসনীয় উত্তর দিতে পারবে?

পোলোস: তাতে আর কী আসে যায় যদি উত্তরটা তোমার জন্য যথেষ্ট ভাল হয়?

কাইরেফোন: কিচ্ছু আসে যায় না, যদি চাও তো উত্তর কোরো।

পোলোস: ছুঁড়ো প্রশ্ন।

কাইরেফোন: করছি। ধরো যদি গোর্গিয়াস তার ভাই হেরোদিকোসের শিল্পে পারদর্শী হতো, তাহলে তাকে কী ডাকা যুক্তিযুক্ত হতো? তার ভাইকে যা ডাকা হয় সেটাই নয় কি?

পোলোস: হ্যাঁ, সেটাই।

কাইরেফোন: তাহলে সেক্ষেত্রে তাকে ডাক্তার বলাটা ঠিক হতো?

পোলোস: হ্যাঁ।

কাইরেফোন: আর যদি সে আগ্লাওফোনের ছেলে আরিস্তোফোন বা তার ভাই পলিগ্নোতোসের শিল্পে অভিজ্ঞ হতো, তাহলে তাকে কী ডাকা উচিত হতো?

পোলোস: নিঃসন্দেহে চিত্রশিল্পী।

কাইরেফোন: আচ্ছা, এখন যেহেতু তার কোনো একটা শিল্পে দক্ষতা আছে, সেহেতু সেই শিল্পটা কী, এবং তাকে কী ডাকাটা ঠিক হবে?

পোলোস: মানবসমাজে এমন অনেক শিল্প আছে যেগুলো অভিজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞার মাধ্যমে গড়ে উঠে, কাইরেফোন। হ্যাঁ, এই অভিজ্ঞতাই আমাদের দিনগুলোকে শিল্পের পথ ধরে যেতে বাধ্য করে, যেখানে অনভিজ্ঞতা তাকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিত। এই বিভিন্ন শিল্পে একেক জন একেক ভাবে অংশ নয়, এবং সেরা শিল্পগুলোতে অংশও নেয় সেরারা। আমাদের গোর্গিয়াস সেই দলেরই সদস্য; সে অংশ নিয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পটিতে। ((এই অলঙ্কারসমৃদ্ধ উত্তরটিতে অর্থ খুব কম, এবং সম্ভবত প্লেটো সোফিস্টরা এমন বাক্যই ব্যবহার করে বলে তাদেরকে ব্যঙ্গ করতে চাচ্ছেন।))

সক্রেটিস: পোলোস নিঃসন্দেহে ভাষণ দেয়ার জন্য খুব ভালভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছে, গোর্গিয়াস। কিন্তু কাইরেফোনের কাছে করা প্রতিজ্ঞা সে পালন করছে না।

গোর্গিয়াস: ঠিক কিভাবে করছে না, সক্রেটিস?

সক্রেটিস: তাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছে সে তার ধারেকাছেও যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

গোর্গিয়াস: তবে তাকে নিজেই জিজ্ঞাসা করো না কেন?

সক্রেটিস: না, আমি তাকে করব না, অন্তত যতক্ষণ তুমি উত্তর দিতে রাজি আছ ততক্ষণ না। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে বেশি আগ্রহী। তার কথা শুনে এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে সে নিজেকে আলোচনার চেয়ে বাগাড়ম্বর সাধনায় বেশি নিয়োজিত করেছে।

পোলোস: তেমনটা কেন মনে হলো সক্রেটিস?

সক্রেটিস: কারণ, পোলোস, কাইরেফোন যখন তোমার কাছ থেকে গোর্গিয়াস কোন শিল্পে দক্ষ সেটা জানতে চাইল তখন তুমি কেবল শিল্পটার গুণকীর্তণ করলে, যেন কেউ শিল্পটার খুঁত ধরেছে। অথচ শিল্পটা কী সেটাই বললে না। ((এখানে সক্রেটিস পোলোসকে যুক্তিবিদ্যার সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষাটি দিচ্ছেন: কোনোকিছুর গুণ দিয়ে তার সংজ্ঞা দেয়া যায় না। যেমন “গণতন্ত্র সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা” বললে গণতন্ত্র কী সে সম্পর্কে জ্ঞান একটুও বৃদ্ধি পায় না।))

পোলোস: কেন, আমি কি বলিনি যে এটা মহত্তম শিল্প?

সক্রেটিস: হ্যাঁ, তা অবশ্যই বলেছ। কিন্তু কেউ তো তোমাকে জিজ্ঞাসা করেনি গোর্গিয়াসের শিল্পটা কেমন, বরং প্রশ্নটা ছিল: গোর্গিয়াসের শিল্প কী এবং তাকে আমাদের কী ডাকা উচিত। সুতরাং, কাইরেফোনের আগের প্রশ্নগুলোর উত্তর তুমি যেমন প্রশংসনীয় সংক্ষিপ্ততার সাথে দিয়েছিল, এখন ঠিক সেভাবেই বলো, তার শিল্প কী এবং তাকে আমাদের কী ডাকা উচিত। কিংবা, গোর্গিয়াস, তুমি নিজেই কেন বলো না যে, তুমি কোন শিল্পে জ্ঞানী, এবং সে অনুসারে তোমাকে আমাদের কী ডাকা উচিত?

গোর্গিয়াস: বাগ্মিতা, সক্রেটিস।

সক্রেটিস: তাহলে তোমাকে ডাকা উচিত বাগ্মী? ((ῥήτορ—rhetor—বাগ্মী। বাগ্মিতা বা অলঙ্কারশাস্ত্রে অভিজ্ঞদেরই বাগ্মী বলা যায়, কিন্তু তখনকার গ্রিসে এই ‘রিতোর’ শব্দটা বিশেষ করে যারা সংসদে গণবক্তৃতা দিত তাদেরকে বুঝাতে ব্যবহৃত হতো। সেক্ষেত্রে এর অর্থ আসলে রাজনীতিবিদ। বাগ্মিতা বা অলঙ্কারশাস্ত্রের শাখা ছিল মূলত দুটি: রাজনীতি ও আইনশাস্ত্র।))

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, এবং খুব বড় বাগ্মী, সক্রেটিস, যদি তুমি আসলেই আমাকে সেই নামে ডাকতে চাও যা—হোমারের ভাষায়—“হতে পেরে আমি গর্বিত”।

সক্রেটিস: আমি অবশ্যই চাই।

গোর্গিয়াস: ডাকো তাহলে।

সক্রেটিস: আমাদের কি এটাও বুঝে নেয়া উচিত না যে তুমি অন্যদেরও বাগ্মী বানাতে পারো?

গোর্গিয়াস: আমি ঠিক সেই দাবীটাই করি। কেবল এথেন্সেই নয়, অন্য সবখানেও।

সক্রেটিস: আচ্ছা গোর্গিয়াস, আমাদের আলোচনা এখন যেভাবে এগোচ্ছে, অর্থাৎ পাল্টা পাল্টি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও উত্তর দানের মাধ্যমে, তুমি কি শেষ পর্যন্ত সেই ধারা বজায় রাখতে, এবং পোলোস শুরুতে যেমন লম্বচওড়া ভাষণ শুরু করেছিল তেমনটা অন্য কোনো সময়ের জন্য তুলে রাখতে রাজি আছ? রাজি থাকলে প্রতিজ্ঞাটা যেন আবার মাঝপথে ভুলে যেওনা; সব প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে দেয়ার চেষ্টা কোরো।

গোর্গিয়াস: এমন কিছু প্রশ্ন আছে, সক্রেটিস, যার উত্তর দীর্ঘ ভাষণের মাধ্যমেই দিতে হয়। তারপরও, আমি যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত থাকার চেষ্টা করব। আসলে, এটাও আমার করা দাবীগুলোর মধ্যে অন্যতম। দুনিয়াতে এমন কেউ নেই যে একই জিনিস আমার চেয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলতে পারে।

সক্রেটিস: আমাদের সেটাই দরকার, গোর্গিয়াস! এখন ঠিক এই জিনিসটা, অর্থাৎ কথার সংক্ষিপ্ত সংস্করণটা উপস্থাপন করো, লম্বা সংস্করণটা নিয়ে নাহয় পরে কোনো এক সময় ভেবো।

গোর্গিয়াস: বেশ তবে, তাই করব। এক পর্যায়ে তুমি নিশ্চিত বলবে যে এত সংক্ষিপ্ত ভাষণ জীবনে কাউকে দিতে শুনোনি।

সক্রেটিস: তবে শুরু করা যাক। তোমার দাবী হচ্ছে এই যে, তুমি বাগ্মিতা শিল্পে জ্ঞানী এবং অন্যদেরকেও বাগ্মী করে তুলতে পারো। বিশ্বের তাবৎ জিনিসের মধ্যে বাগ্মিতা ঠিক কোনগুলো নিয়ে কাজ করে? ((এমন প্রশ্ন দিয়েই সক্রেটিস সাধারণত প্রতিপক্ষকে প্যাঁচে ফেলেন: “এটা কী বিষয়ে?” কার্মিদিস, লাকিস ইত্যাদি সংলাপেও ঠিক এমন প্রশ্ন দিয়ে প্যাঁচের সূচনা।)) যেমন, তাঁতশিল্প পোশাক উৎপাদন নিয়ে কাজ করে, ঠিক কি না?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং, একইভাবে, সঙ্গীত শিল্পের বিবেচ্য বিষয় সুর সৃষ্টি নয় কি?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: হেরা’র দোহাই, গোর্গিয়াস, তোমার উত্তর পছন্দ না করে কোনো উপায় নেই। এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত আর কিছু হতে পারে না।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, সক্রেটিস। আমিও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমার কাজটা খুব সুন্দর হচ্ছে।

সক্রেটিস: আসলেই হচ্ছে। ঠিক এভাবেই তাহলে বাগ্মিতা বিষয়ক প্রশ্নটারও উত্তর দাও দেখি। বাগ্মিতা ঠিক কোন জিনিসগুলো বিষয়ক জ্ঞান?

গোর্গিয়াস: ভাষণ বিষয়ক। ((বাগ্মিতার প্রথম সংজ্ঞা: περὶ λόγους—‘লোগোস’ বিষয়ক। জ্ঞান অর্থে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর আরেকটা অর্থ শব্দ, কথা বা ভাষণ। বাগ্মিতার এই সংজ্ঞা সক্রেটিস অল্পক্ষণের মধ্যেই খণ্ডিয়ে ফেলেন, কারণ লোগোস বিষয়ক শিল্প অনেক আছে।))

সক্রেটিস: কোন ধরণের ভাষণ, গোর্গিয়াস? যেমন ভাষণ রোগীরা কোন চিকিৎসার মাধ্যমে আরোগ্য লাভ করতে পারে তা জানায় তেমন ভাষণ?

গোর্গিয়াস: না।

সক্রেটিস: তার মানে বাগ্মিতা সব ধরণের ভাষণ নিয়ে কাজ করে না।

গোর্গিয়াস: একেবারেই না।

সক্রেটিস: কিন্তু এটা মানুষকে কথা বলতে সক্ষম করে তোলে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং যে বিষয় নিয়ে তারা কথা বলছে সেটাতে প্রাজ্ঞও করে তোলে?

গোর্গিয়াস: অবশ্যই।

সক্রেটিস: তাহলে একটু আগেই যে চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কথা বলছিলাম সেটাও কি রোগীদের সম্পর্কে প্রজ্ঞা অর্জন করতে ও কথা বলতে শেখায় না? {৪৫০}

গোর্গিয়াস: অপরিহার্যভাবেই।

সক্রেটিস: এই প্রমাণের ভিত্তিতে তাহলে বলতে হয় যে, এই শিল্পও ভাষণের সাথে সম্পৃক্ত।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: অবশ্যই কেবল রোগ সম্পর্কিত ভাষণের সাথে।

গোর্গিয়াস: ঠিক তাই।

সক্রেটিস: শারীরচর্চাও কি ভাষণ নিয়ে কাজ করে না, মানে শরীরের ভাল বা খারাপ দশা সম্পর্কিত ভাষণ নিয়ে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, করে।

সক্রেটিস: বস্তুত, গোর্গিয়াস, অন্য সব শিল্পের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটা সত্য। প্রতিটি শিল্পই যার যার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কিত ভাষণ নিয়ে কাজ করে।

গোর্গিয়াস: তাই তো দেখা যাচ্ছে।

সক্রেটিস: তাহলে, যেহেতু তুমি ভাষণ নিয়ে কাজ করা যেকোনো শিল্পকে বাগ্মিতা বলছ সেহেতু এগুলোকেও বাগ্মিতা বলছ না কেন? তাদেরও তো ভাষণের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

গোর্গিয়াস: কারণ হলো, সক্রেটিস, অন্য শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে জ্ঞানের প্রায় পুরো অংশ জুড়েই থাকে হাতেকলমে কাজ করা বা তেমন কিছু একটা। অন্যদিকে, বাগ্মিতার ক্ষেত্রে তেমন কোনো হস্তচালিত কাজের বালাই নেই। এর কর্ম ও প্রভাব পুরোটাই নির্ভর করে ভাষণের উপর। এই কারণেই আমি মনে করি বাগ্মিতা ভাষণ নিয়ে কাজ করে। এবং আমি বলছি যে, এমন মনে করাটা যথার্থ। ((কেবল “আলোচ্য বিষয়” এর উপর নির্ভর করে বাগ্মিতার সংজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর গোর্গিয়াস এখন বাগ্মিতা’র কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে তাকে অন্যান্য ভাষণ-শিল্প থেকে আলাদা করার চেষ্টা শুরু করলেন। তাই গোর্গিয়াস বাগ্মিতার দ্বিতীয় সংজ্ঞা দেন: বাগ্মিতা কেবল ভাষণ ব্যবহার করে কার্যসিদ্ধি করে, যেখানে অন্য শিল্পের ক্ষেত্রে অনেক কায়িক শ্রমের ব্যাপার থাকে। কিন্তু সক্রেটিস অচিরেই দেখাবেন, এই সংজ্ঞাও অনেক ব্যাপক। যেমন, পাটিগণিতেও কোনো কায়িক শ্রম লাগে না।))

সক্রেটিস: আমি ঠিক নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারছি না যে, তুমি এটাকে কেমন শিল্প বলতে চাচ্ছ। শীঘ্রই আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব। একটা ব্যাপার পরিষ্কার করো। এমন অনেক শিল্প আছে যেগুলো আমরা চর্চা করতে পারি, ঠিক নয় কি?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: সকল শিল্পের মধ্যে, আমি ধরে নিচ্ছি যে, এমন অনেকগুলো আছে যাদের প্রধান কাজ কোনো জিনিস তৈরি করা এবং যারা ভাষণ নিয়ে খুব একটা কাজ করে না; এমনকি এমন অনেকগুলো আছে যাদের সাথে ভাষণের কোনো সম্পর্কই নেই, যেগুলো একেবারে নিরবে সম্পাদন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে চিত্রশিল্প, ভাস্কর্যশিল্প ইত্যাদি আরো অনেক কিছুর নাম করা যায়। যখন তুমি বললে বাগ্মিতার সাথে অন্য শিল্পগুলোর কোনো সম্পর্কই নেই তখন আমার মনে হয় তুমি অন্য শিল্প বলতে এগুলোকেই বুঝিয়েছ। নাকি ভুল বললাম?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, সক্রেটিস। তুমি ঠিক অর্থই ধরেছ।

সক্রেটিস: কিন্তু এমন অনেক শিল্পও আছে যেগুলো তাদের সব কাজ কেবলমাত্র কথার মাধ্যমে করে এবং যেগুলো করতে কোনো কায়িক শ্রম লাগে না, বা লাগলেও খুব কম কম লাগে। উদাহরণ হিসেবে পাটিগণিত, গণনা, বা জ্যামিতির কথা ধরো, কিংবা এমনকি দাবা খেলা বা আরো অনেক কিছুর কথা ধরতে পারো। এগুলোর অনেকগুলোতে কথা ও কর্ম প্রায় সমান পরিমাণ লাগে, কোনো কোনোটিতে আবার কথাই বেশি লাগে। এগুলোর সব কাজ ও প্রভাব পুরোপুরি ভাষণের উপর নির্ভরশীল। আমার মনে হচ্ছে তুমি বাগ্মিতা বলতে এই ধরণের কোনো শিল্পকে বুঝাতে চাচ্ছ।

গোর্গিয়াস: সত্য।

সক্রেটিস: কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই এই শিল্পগুলোর কোনোটিকেই বাগ্মিতা বলতে রাজি নও যদিও তুমি বলেছ যে, বাগ্মিতা এমন শিল্প যা কেবল কথার মাধ্যমে তার প্রভাব বিস্তার করে, ঠিক না? খুঁৎখুঁতে কেউ চাইলে এ নিয়ে তোমার সাথে বিতণ্ডা শুরু করে দিতে পারে এই বলে যে, “তার মানে, গোর্গিয়াস, তুমি বলতে চাচ্ছ পাটিগণিত এক ধরণের বাগ্মিতা শিল্প?” কিন্তু আমি নিশ্চিত তুমি পাটিগণিত বা জ্যামিতি কোনোটাকেই বাগ্মিতা বলছ না।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, তোমার কথা পুরো ঠিক, সক্রেটিস। ব্যাপারটা ঠিকই ধরেছ।

সক্রেটিস: বেশ। আমার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তাহলে তোমার উত্তরটা শেষ করো। যেহেতু বাগ্মিতা এমন শিল্প যা প্রধানত ভাষণ ব্যবহার করে, এবং যেহেতু তেমন শিল্প আরো অনেক আছে, সেহেতু যে প্রশ্নের জবাব তোমার দেয়ার চেষ্টা করা উচিত তা হচ্ছে: বাগ্মিতা, যা কথার মাধ্যমে নিজের প্রভাব বিস্তার করে, তা বস্তুত কিসের সাথে সম্পৃক্ত। ধরো, কেউ একজন আমাকে একটু আগে আলোচিত শিল্পগুলোর যেকোনো একটা নিয়ে বলল, “সক্রেটিস, পাটিগণিত শিল্পটা আসলে কী?” সেক্ষেত্রে তুমি বাগ্মিতা নিয়ে যেকথা বলেছ আমি তাকে ঠিক সেটাই বলতাম, অর্থাৎ এটা এমন শিল্প যা কথার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। এবং সে যদি আবার জিজ্ঞাসা করত, “কী বিষয়ক কথার মাধ্যমে?” তাহলে আমি বলতাম যে, জোড় ও বিজোড় সংখ্যা কী এবং তারা কতগুলো করে আছে সে বিষয়ক। তারপর যদি সে জিজ্ঞাসা করত, “গণনা বলতে কোন শিল্পকে বুঝাচ্ছ?” তাহলে বলতাম যে, এটাও সেই শিল্পগুলোর একটা যারা কেবলমাত্র কথার মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তার করে। এবং এই সূত্র ধরে যদি সে বলত, “এটার কথা কী নিয়ে?” তাহলে সংসদে সদ্য কথা বলার সুযোগ পাওয়া কারো মতো করেই বলতাম, অন্য সব দিক দিয়ে গণনা অনেকটা পাটিগণিতের মতোই— যেহেতু এটাও সেই জোড় ও বিজোড় সংখ্যা নিয়েই— কিন্তু এর অনন্যতা হচ্ছে এই যে, এটা জোড় ও বিজোড় সংখ্যাগুলোর নিজেদের মধ্যে এবং পরষ্পরের মধ্যে সম্পর্ক নিয়েও কথা বলে। এবং কেউ যদি জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে প্রশ্ন করত এবং আমি বলতাম যে, এটাও কথার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে, এবং যদি সে আবার জিজ্ঞাসা করত, “জ্যোতির্বিদ্যার কথাগুলো কোন বিষয়ে, সক্রেটিস?” তবে আমি বলতাম, সূর্য, চাঁদ ও তারাসমূহের গতি এবং তাদের একের সাপেক্ষে অপরের বেগ নিয়ে। ((প্লেটো তখনও “বিশুদ্ধ” পাটিগণিত এর মতো “বিশুদ্ধ” জ্যোতির্বিদ্যার ধারণা তৈরি করেননি, যে ধারণামতে জ্যোতির্বিদ্যা যেকোনো গতিশীল বস্তু নিয়ে আলোচনা করে, যার মধ্যে চাঁদ-সূর্য-গ্রহ কেবল এক ধরণের বস্তু।))

গোর্গিয়াস: এবং এমনটা বলা পুরোপুরি ঠিকই হতো, সক্রেটিস।

সক্রেটিস: ঠিক আছে, গোর্গিয়াস, এবার তোমার পালা। কারণ, বাগ্মিতা তো সেই শিল্পগুলোরই একটি যেগুলো কেবল ভাষণের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তার করে ও কর্ম সম্পাদন করে, ঠিক না?

গোর্গিয়াস: ঠিক।

সক্রেটিস: তাহলে বলো তার বিষয়বস্তু কী? কথা বলার যত বিষয় আছে তার মধ্যে বাগ্মিতা ঠিক কোনগুলো নিয়ে ভাবে?

গোর্গিয়াস: মানুষের চিন্তার সবচেয়ে বড় ও সেরা বিষয়টা নিয়ে, সক্রেটিস। ((তৃতীয় সংজ্ঞা: এটা মানুষের সেরা চিন্তা বিষয়ক “বিশুদ্ধ” ভাষণ-শিল্প।))

সক্রেটিস: কিন্তু এই উক্তিও বিতর্কযোগ্য, গোর্গিয়াস। তাছাড়া, এটা কিছুই পরিষ্কার করছে না। নিশ্চয়ই তুমি পানোৎসবে মানুষকে সেই গানটি গাইতে শুনেছ যাতে তারা গণনার ভঙ্গিতে বলতে থাকে, “সবচেয়ে ভাল হচ্ছে সুস্বাস্থ্য উপভোগ করা; দ্বিতীয় ভাল সুদর্শন হতে পারা; এবং তৃতীয় ভাল”— গীতিকারের ভাষায়— “সৎভাবে ধনী হওয়া।” ((স্বাস্থ্য-চেহারা-ধন এর এই ধারাবাহিকতার ব্যাপারে সম্ভবত প্রাচীন গ্রিক অভিজাতরা একমত ছিল। গানটি ছিল
“ὑγιαίνειν μὲν ἄριστον ἀνδρὶ θνατῷ
δεύτερον δὲ φυὰν καλὸν γενέσθαι
τὸ τρίτον δὲ πλουτεῖν ἀδόλως
καὶ τὸ τέταρτον ἡβᾶν μετὰ τῶν φίλων.”
তিন লাইনে তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে, চতুর্থ লাইনের বিষয় বন্ধুত্ব যা প্লেটো এড়িয়ে গেছেন কারণ এর সাথে কোনো শিল্পের সম্পর্ক নেই।))

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, শুনেছি। এই গানের কথা কেন হঠাৎ?

সক্রেটিস: ধরো এই গানে যে জিনিসগুলোর প্রশংসা করা হয়েছে সেগুলো যারা উৎপাদন করতে পারে তারা এই মুহূর্তে এখানে এসে উপস্থিত হল, অর্থাৎ একজন ডাক্তার, একজন শারীরচর্চার প্রশিক্ষক, এবং একজন অর্থ-বিশারদ। ধরো প্রথমে ডাক্তারটি বলল, “সক্রেটিস, গোর্গিয়াস তোমাকে মিথ্যা বলছে। তার শিল্প মানবকূলের সর্বোচ্চ ভাল নিয়ে কাজ করে না, বরং সেটা করে আমার শিল্প।” এরপর যদি আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, “সেটা বলার তুমি কে?” তাহলে আমার ধারণা সে বলত যে সে একজন ডাক্তার। “এটা কী বলছ? তোমার শিল্পের উৎপন্নদ্রব্য কি আসলেই সর্বোচ্চ ভাল?” আমার এই প্রশ্নের উত্তরে সম্ভবত সে বলবে, “নিশ্চয়ই, সক্রেটিস, যেহেতু এর উৎপন্নদ্রব্য সুস্বাস্থ্য। মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি ভাল আর কী হতে পারে?” এবং ধরো এরপর প্রশিক্ষকটি বলল, “আমিও বিস্মিত হব, সক্রেটিস, যদি গোর্গিয়াস তার শিল্প থেকে উৎপন্ন এমন কিছু দেখাতে পারে যা আমার শিল্পের উৎপন্নদ্রব্যের চেয়ে ভাল।” এই লোককেও তখন আমি জিজ্ঞাসা করতাম, “তুমি কী জনাব, আর তোমার পণ্য কী?” সে বলত, “আমার পণ্য হচ্ছে মানুষকে সুদর্শন ও শক্তিশালী করা।” এবং প্রশিক্ষকটির দেখাদেখি তখন অর্থ-বিশারদ, আমি নিশ্চিত অন্য সবাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, বলত, “বিচার করে দেখো, সক্রেটিস, এমন কিছু পাও কি না, গোর্গিয়াস বা অন্য যে কারো শিল্প থেকে, যা সম্পদের চেয়ে ভাল।” আমরা তাকে বলতাম, “তাই নাকি? আর তুমি কি এটাই উৎপাদন করো?” সে বলত হ্যাঁ। “কী হিসেবে?” “একজন অর্থ-বিশারদ হিসেবে।” আমরা বলতাম, “বেশ, তোমার মতে কি সম্পদই মানবকূলের জন্য সবচেয়ে ভাল।” “নিশ্চয়ই,” বলত সে। “ও, কিন্তু এই গোর্গিয়াস তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে। তার দাবী তার শিল্প এমন একটা ভাল’র উৎস যা তোমারটার চেয়েও মহত্তর,” বলতাম আমরা। এবং এরপর সে কী জিজ্ঞাসা করত তা বুঝাই যাচ্ছে। “এবং সেই ভালটা কী, বলো দয়াকরে। গোর্গিয়াস আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিক।” সুতরাং, শুরু করো গোর্গিয়াস। মনে করো এই মানুষগুলো এবং সাথে আমিও প্রশ্নটা করছি, এবং উত্তর দাও। এই যে জিনিসটাকে মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ভাল বলছ, যা তোমার শিল্পের উৎপন্নদ্রব্য তা আসলে কী? উত্তর দাও।

গোর্গিয়াস: সেই জিনিস যা আসলেই সর্বোচ্চ ভাল, সক্রেটিস। সেটা একদিকে গোটা মানবকূলের জন্য স্বাধীনতার উৎস এবং অন্যদিকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষমতার উৎস যা দিয়ে সে তার নগরের অন্যদেরকে শাসন করতে পারে।

সক্রেটিস: কী সেই জিনিস?

গোর্গিয়াস: সেটা হচ্ছে কোনো আদালতে বিচারকদেরকে, কোনো সভায় সভাসদদেরকে, কোনো সংসদে বা যেকোনো রাজনৈতিক বৈঠকে উপস্থিতদেরকে ভাষণের মাধ্যমে কোনো ব্যাপারে রাজি করাতে পারার সামর্থ্য। বাস্তবিকপক্ষে, এই সামর্থ্যের মাধ্যমে তুমি ডাক্তারটিকে নিজের দাসে পরিণত করবে, এবং সাথে প্রশিক্ষকটিকেও। আর ঐ যে অর্থ-বিশারদের কথা বললে সে নিজের পরিবর্তে অন্য কারো জন্য বেশি অর্থ তৈরি করা শুরু করবে; আসলে তোমার জন্যই, যদি তোমার কোনো জমায়েতকে কথা বলার মাধ্যমে কোনো বিষয়ে রাজি করানোর ক্ষমতা থাকে। ((চতুর্থ সংজ্ঞা: কেবল ভাষণের মাধ্যমে কোনো গণসমাবেশে মানুষক‌ে কোনো বিষয়ে রাজি করানো অর্থাৎ তাদের মনে প্রত্যয় জন্মানোর শিল্পই বাগ্মিতা।))

সক্রেটিস: এখন আমার মনে হয় তুমি বাগ্মিতা শিল্প বলতে যা বুঝাও তা পুরো স্পষ্ট করার সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পেরেছ। যদি তোমাকে একটুও অনুসরণ করতে সক্ষম হয়ে থাকি, তাহলে বলতে হবে তুমি বলছ যে, বাগ্মিতা প্রত্যয় উৎপাদনকারী। এর পুরো ব্যাবসাই প্রত্যয় নিয়ে, এটাই তার কাজ বিষয়ক শেষ কথা। নাকি শ্রোতাদের অন্তরে প্রত্যয় জন্মানো ছাড়া আরো কিছু আছে যা বাগ্মিতা করতে পারে?

গোর্গিয়াস: আর কিচ্ছু নেই, সক্রেটিস। আমি মনে করি তোমার সংজ্ঞা যথেষ্ট সন্তোষজনক। এটা আসলেই শেষ কথা।

সক্রেটিস: শোনো তাহলে, গোর্গিয়াস। তুমি সম্ভবত জানো যে আমি সত্যিই নিজেকে এমন মানুষ মনে করি যে অন্য কারো সাথে আলোচনা করার সময় আলোচনার বিষয়বস্তুটা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে চায়। এবং আমি তোমাকেও তেমন মানুষ মনে করি।

গোর্গিয়াস: আচ্ছা, ঠিক কি বুঝাতে চাচ্ছ, সক্রেটিস?

সক্রেটিস: ঠিক আছে, আমাকে বলতে দাও। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে, তুমি বাগ্মিতা যে প্রত্যয়ের জন্ম দেয় বললে সে সম্পর্কে আমি অজ্ঞ এবং প্রত্যয়টা কি নিয়ে তাও আমার কাছে অজানা; যদিও তুমি কোন ধরণের প্রত্যয় বুঝাতে চাচ্ছ এবং সেটা কী নিয়ে তা কিছু কিছু অনুমান করতে পারছি। তারপরও আমি তোমাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই, অর্থাৎ বাগ্মিতা থেকে উৎপন্ন এই প্রত্যয়টা কী এবং কোন বিষয়ের। তুমি জানতে চাইতে পারো কেন আমার অনুমানগুলো প্রকাশ না করে প্রথমে তোমাকেই জিজ্ঞাসা করছি। কারণ, আমি তোমার পিছনে লেগে নেই, আমার লক্ষ্য এই আলোচনা; আমি চাই এটা এমনভাবে আগাক যাতে তার বিষয়বস্তুটা আমাদের সবার কাছে পরিষ্কার হয়। সুতরাং ভেবে দেখ পুরনো প্রশ্নটা আবার করা অন্যায্য হচ্ছে কি না। ধরো যদি আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করতাম জেউক্সিস কোন ধরণের চিত্রকর। উত্তরে যদি তুমি আমাকে বলতে যে, সে এমন চিত্রকর যে ছবি আঁকে, তাহলে আমার কি পাল্টা এটা জিজ্ঞাসা করা ন্যায্য হতো না যে, “সে কোন ধরণের ছবি আঁকে, এবং কোথায় আঁকে?”

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, হতো।

সক্রেটিস: এবং ন্যায্য হওয়ার কারণ কি এই হতো না যে, আরো অনেক চিত্রকর আছে যারা আরো অনেক ধরণের ছবি আঁকে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: কিন্তু জেউক্সিস ছাড়া যদি আর কোনো চিত্রকর না থাকত তাহলে তোমার উত্তরটাই যথেষ্ট ভাল হতো, ঠিক না?

গোর্গিয়াস: অবশ্যই।

সক্রেটিস: বেশ, তবে তোমার বাগ্মিতা নিয়ে বলো। তোমার কি ধারণা বাগ্মিতা একাই প্রত্যয় জাগায় নাকি অন্যান্য শিল্পও তা করতে পারে। আমি যেমনটা বুঝাতে চাচ্ছি তা হল: যে ব্যক্তি কোনো বিষয় শেখায় সে কি সেই বিষয়টা সম্পর্কে মানুষের মনে প্রত্যয় জাগায় না?

গোর্গিয়াস: অবশ্যই জাগায়, সক্রেটিস। প্রত্যয় জাগানোটাই তার মুখ্য কাজ।

সক্রেটিস: একটু আগে যে শিল্পগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম সেগুলোর কথাই আবার ধরা যাক। পাটিগণিত বা পাটিগণিতবিদ কি আমাদেরকে সংখ্যা সম্পর্কিত সবকিছু শেখায় না?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, শেখায়।

সক্রেটিস: এবং সে প্রত্যয়ও জাগায়?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: সুতরাং পাটিগণিতও প্রত্যয় উৎপাদক।

গোর্গিয়াস: তাই দেখা যাচ্ছে।

সক্রেটিস: এখন কেউ যদি আমাদের জিজ্ঞাসা করে এটা কোন ধরণের প্রত্যয় উৎপাদন করে এবং প্রত্যয়টা কী নিয়ে তাহলে আমার মনে হয় আমরা উত্তর করব যে, এটা শিক্ষার মারফতে জন্মানো প্রত্যয় এবং প্রত্যয়টা জোড় ও বিজোড় সংখ্যা নিয়ে। এবং আমরা আরো দেখাতে পারব যে অন্য যেসব শিল্প নিয়ে কথা বলছিলাম সেগুলোও প্রত্যয় উৎপাদক এবং প্রত্যয়টা কেমন ও কী নিয়ে তাও বলতে পারব। ঠিক কি না?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: সুতরাং বাগ্মিতাই প্রত্যয়ের একমাত্র উৎপাদক নয়।

গোর্গিয়াস: তা সত্য।

সক্রেটিস: সেক্ষেত্রে, যেহেতু এটা এই পণ্য উৎপাদনকারী একমাত্র শিল্প নয় বরং অন্যান্য শিল্পও তা তৈরি করতে পারে, সেহেতু চিত্রকরের ক্ষেত্রে আমরা এরপর যে প্রশ্নটা করেছিলাম এখানে সেটার পুনরাবৃত্তি করাটা নিশ্চয়ই ঠিক হবে। প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে, “বাগ্মিতা শিল্পের প্রত্যয়টা কোন ধরণের এবং প্রত্যয়টাই বা কী নিয়ে?” নাকি তুমি প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি ঠিক মনে করছ না?

গোর্গিয়াস: ঠিক মনে করছি।

সক্রেটিস: বেশ তবে গোর্গিয়াস, যদি ঠিকই মনে করো তাহলে উত্তর দাও।

গোর্গিয়াস: যে প্রত্যয়ের কথা বলছি, সক্রেটিস, তা হল সেই ধরণের যেমনটা আদালতে বা তেমন অন্যান্য বড় জমায়েতে জন্মে, একটু আগেই যা বলছিলাম। এবং প্রত্যয়টা কোনো বিষয়ের ন্যায্যতা এবং অন্যায্যতা নিয়ে। ((অনেক শিল্পই প্রত্যয় জাগায়, সক্রেটিস জানতে চান কোন বিষয়ে কেমন প্রত্যয় বাগ্মিতা জাগায়। তাই গোর্গিয়াসের পঞ্চম সংজ্ঞা: আদালতে বা গণসমাবেশে ন্যায়-অন্যায় বিষয়ক প্রত্যয়। এই ন্যায়-অন্যায় নিয়ে আসাটাই গোর্গিয়াসের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ আদালতী বাগ্মিতা’র (forensic rhetoric) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু সব বাগ্মিতার ক্ষেত্রে নয়।))

সক্রেটিস: হ্যাঁ, গোর্গিয়াস, তুমি এই ধরণের এবং এমন বিষয়ের প্রত্যয় বুঝাচ্ছ বলেই আমি অনুমান করেছিলাম। কোনো বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে বলে ধারণা জন্মানোর পরও আমি তা নিয়ে আবার প্রশ্ন করছি, কারণ, যা বলছিলাম, আমি চাই আলোচনাটা সুশৃঙ্খলভাবে আগাক। সুতরাং এমন প্রশ্ন যদি আবার করি আশাকরি আর বিস্মিত হবে না। তোমার পিছু নেয়া আমার উদ্দেশ্য নয়; এমনটা করছি যাতে আমরা একে অন্যের মনোভাব আগে থেকেই অনুমান করে তার মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয়া চালিয়ে না যাই। এর মূল উদ্দেশ্য তোমাকে তোমার মতো করে তোমার ধারণাগুলো গঠনের সুযোগ করে দেয়া।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, তোমার এমনটা করা ঠিকই মনে হচ্ছে, সক্রেটিস।

সক্রেটিস: ঠিক আছে, তাহলে চলো একটা বিষয়ের উপর আলোকপাত করি। তোমার কি মনে হয় “জ্ঞানার্জন করা” বলতে কিছু আছে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: খুব ভালো। এবং “বিশ্বাস করা” বলতেও কিছু আছে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এখন, তুমি কি মনে করো জ্ঞানার্জন করা ও জ্ঞান, আর বিশ্বাস করা ও বিশ্বাস একই জিনিস, নাকি ভিন্ন?

গোর্গিয়াস: আমি অবশ্যই ধরে নেই যে তারা ভিন্ন, সক্রেটিস।

সক্রেটিস: তোমার ধরা ঠিক আছে। ঠিক না ভুল তা এভাবে নির্ণয় করা যায়: কেউ যদি তোমাকে এসে জিজ্ঞাসা করে, “সত্য ও মিথ্যা বিশ্বাস বলতে কি কিছু আছে, গোর্গিয়াস?” তুমি নিশ্চয়ই বলতে, হ্যাঁ।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: আচ্ছা, এখন সত্য ও মিথ্যা জ্ঞান বলতে কি কিছু আছে?

গোর্গিয়াস: মোটেই না।

সক্রেটিস: সুতরাং এটা পরিষ্কার যে এই দুটো এক নয়। ((জ্ঞান ও বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্যই হচ্ছে প্লেটোর অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্বের মূলভিত্তি, এবং এটা তিনি এখানেই জীবনে প্রথমবারের মতো খোলাসাভাবে উপস্থাপন করছেন। পরবর্তীতে মিনো তে একে আরো দৃঢ় রূপ দেবেন।))

গোর্গিয়াস: সত্য।

সক্রেটিস: কিন্তু নিশ্চয়ই যারা জ্ঞানার্জন করেছে ও যারা বিশ্বাস করেছে উভয়ের মনেই তা নিয়ে প্রত্যয় জন্মেছে।

গোর্গিয়াস: তা ঠিক।

সক্রেটিস: সুতরাং তুমি কি চাইবে যে আমরা দুই ধরণের প্রত্যয়ের কথা বলি, একটা জ্ঞান ছাড়া বিশ্বাস যোগায়, আর অন্যটা জ্ঞান যোগায়?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ চাইব।

সক্রেটিস: এখন আদালতে এবং অন্যান্য জমায়েতে ন্যায্য ও অন্যায্য বিষয়াদি সম্পর্কে বাগ্মিতা যে প্রত্যয় উৎপাদন করে তা কোন ধরণের? যেটার মাধ্যমে জ্ঞান ছাড়া বিশ্বাস জন্মে সেটা নাকি যেটা জ্ঞান যোগায় সেটা?

গোর্গিয়াস: সে তো অবশ্যম্ভাবী, নিশ্চয়ই, যেটার মাধ্যমে বিশ্বাস জন্মে সেটা।

সক্রেটিস: সুতরাং, প্রমাণ বলছে, বাগ্মিতা কোনটা ন্যায্য আর কোনটা অন্যায্য সে বিষয়ে এমন প্রত্যয় তৈরি করে যার উৎস বিশ্বাস, কিন্তু ন্যায় বা অন্যায়ের কোনো জ্ঞান সে সরবরাহ করে না। ((শেষ ও ষষ্ঠ সংজ্ঞা: যাতে নতুন সংযোজন হচ্ছে, বাগ্মিতা প্রত্যয়টা জন্মায় বিশ্বাসের মাধ্যমে, জ্ঞানের মাধ্যমে নয়।)) {৪৫৫}

গোর্গিয়াস: ঠিক।

সক্রেটিস: এবং সুতরাং একজন বাগ্মী আদালতে বা অন্য কোনো জমায়েতে কোনো কিছুর ন্যায্যতা ও অন্যায্যতা বিষয়ে শিক্ষাও দেয় না, বরং কেবল প্রত্যয় উৎপাদন করে, কারণ আমার মনে হয় না তার পক্ষে এতগুলো মানুষকে এত কম সময়ে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় শেখানো সম্ভব।

গোর্গিয়াস: না, অবশ্যই সম্ভব না।

সক্রেটিস: আচ্ছা, তবে দেখা যাক আমরা বাগ্মিতা নিয়ে ঠিক কী বলছি। কারণ, মনে রেখো, এমনকি আমার নিজের বলা কথাগুলোও আমার কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যখন কোনো শহরে ডাক্তার বা জাহাজ-নির্মাতা কিংবা অন্য কোনো শিল্পী বা কারিগর নিয়োগের জন্য বৈঠক বসে তখন নিশ্চয়ই বাগ্মীদের উপদেশ চাওয়া হয় না, নাকি চাওয়া হয়? কারণ, নিশ্চয়ই প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে দক্ষ কারিগরকেই নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি দেয়াল উত্তোলন বা পোতাশ্রয় ও জাহাজঘাটা নির্মাণ সংক্রান্ত বৈঠকেও নিশ্চয়ই কোনো বাগ্মী উপদেশ দেবে না, দেবে প্রধান কারিগরেরা। তেমনি যখন কোনো সেনানায়কের নিয়োগ, শত্রুর বিরুদ্ধে সৈন্যসজ্জা, বা কোনো অঞ্চল দখল নিয়ে পরামর্শ-সভা বসে তখনও কোনো বাগ্মী নয়, বরং একজন সেনানায়ক উপদেশ দেয়। এসব বিষয়ে তোমার মতামত কী, গোর্গিয়াস? যেহেতু তুমি নিজে বাগ্মী হওয়ার এবং অন্যদেরও বাগ্মী করতে পারার দাবী করো, সেহেতু তোমার কাছ থেকেই তোমার শিল্পের বৈশিষ্ট্য সবচেয়ে ভাল জানা যাবে। তোমার উচিত আমাকে তোমারই স্বার্থ সংরক্ষণে আগ্রহী একজন হিসেবে ভাবা। হয়ত এখানে এমন কেউ আসলেই আছে যে তোমার ছাত্র হতে আগ্রহী। আমি কয়েক জনকে লক্ষ্য করেছি, কয়েকজন না, আসলে অনেককেই, এবং তারা হয়ত সরাসরি তোমাকে প্রশ্ন করতে বিব্রত বোধ করবে। সুতরাং তোমাকে যখন আমি প্রশ্ন করছি তখন ভেবো যে ওরাও প্রশ্ন করছে: “তোমার সাথে সম্পৃক্ত হলে আমরা কী পাব, গোর্গিয়াস? নগরের কোন বিষয়ে উপদেশ দিতে সমর্থ হব? কেবল ন্যায্য ও অন্যায্য বিষয়ে নাকি সক্রেটিস এইমাত্র যে বিষয়গুলোর কথা বলছিল সেগুলো নিয়েও?” ওদেরকে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করো। ((বাগ্মিতার চূড়ান্ত সংজ্ঞায় তার “রূপ” ও “আলোচ্য-বিষয়” দুটোই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সক্রেটিস দেখাচ্ছেন তার রূপ আর তার বিষয় একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ যে বিষয়ে বাগ্মিতা প্রত্যয় জন্মাতে চায় সে বিষয়ে তার কোনো দক্ষতা নেই, অথচ স্বাস্থ্য, প্রকৌশল বা যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোতে দক্ষতা থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই স্ববিরোধিতা দিয়েই সক্রেটিস গোর্গিয়াসের উপর চূড়ান্ত আক্রমণটি চালাবেন, এবং একসময় আক্রমণটাকে চালিত করবেন এথেনীয় গণতন্ত্রের দিকে। শেষে পোলোস এসে গোর্গিয়াসের সংজ্ঞায় রূপের ব্যাপারটি গ্রহণ করলেও বিষয়ের ব্যাপারটা অস্বীকার করবেন।))

গোর্গিয়াস: আচ্ছা, সক্রেটিস, বাগ্মিতা যা যা করতে পারে তার সবই তোমার কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করছি। পথটা তুমি নিজেই সুন্দর করে তৈরি করে দিয়েছ, কারণ তুমি তো জানো, জানো না কি, যে এথেন্সের এসব জাহাজঘাটা ও দেয়াল নির্মাণ এবং পোতাশ্রয়ের সজ্জা প্রধানত থেমিস্তোক্লিসের এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পেরিক্লিসের ((থেমিস্তোক্লিস ও পেরিক্লিস ৫ম খ্রিস্টপূর্বাব্দের এথেনীয় রাজনীতিবিদ। এদের উল্লেখ করেই গোর্গিয়াস বলছেন, রাষ্ট্রীয় সব কাজেই চাইলে রাজনীতিবিদরা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং নিয়েছেন।)) উপদেশে হয়েছে, কোনো কারিগরের উপদেশে নয়?

সক্রেটিস: থেমিস্তোক্লিস সম্পর্কে মানুষ তেমনই বলে, গোর্গিয়াস। আর মধ্য-দেয়াল সম্পর্কে পেরিক্লিসের উপদেশ-বাণী আমি নিজ কানেই শুনেছি।

গোর্গিয়াস: আর যখন এসব কাজের জন্য ঐ কারিগরদের নিয়োগ দেয়া হয়, যাদের কথা তুমি বলছিলে, তখন, সক্রেটিস, খেয়াল করে দেখো যে, বাগ্মীদেরই উপদেশ নেয়া হয় এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

সক্রেটিস: হ্যাঁ, গোর্গিয়াস, বাগ্মিতার প্রকৃতিটা কী তা যখন জানতে চেয়েছিলাম তখন তার এই গুণের কথা— যা আমাকে সবসময় বিস্মিত করেছে— ঠিকই মাথায় ছিল। আর এভাবে দেখলে বাগ্মিতাকে আসলেই প্রসিদ্ধির বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত বলে মনে হয়। ((সক্রেটিস এথেনীয় গণতন্ত্রের উপর চূড়ান্ত আক্রমণটি শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে কিছুকাল আগ পর্যন্ত যেমন ছিল প্রাচীন এথেন্সের গণতন্ত্রও তেমন ছিল, অর্থাৎ সেখানে কোনো সার্বক্ষণিক পেশাদার সিভিল সার্ভিস ছিল না। যার ফলে সকল বিষয়ে সংসদ সদস্যদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হতো, অথচ তারা কোনো বিষয়েই দক্ষ নন। তারা বাগ্মিতার অস্ত্র দিয়ে সব সাধন করতেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কতটা নেয়া উচিত সেটা বর্তমানেও অনেক আলোচিত বিষয়। সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রু সিনেমায় ডাক্তার-চেয়ারম্যান দ্বন্দ্বের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ-বাগ্মী সমস্যাটি তুলে ধরতে দেখা যায়।))

গোর্গিয়াস: ওহ হো, সক্রেটিস, যদি কেবল পুরোপুরি জানতে বাগ্মিতা কিভাবে সকল অধস্তন শিল্পকে নিজের প্রভাবাধীনে নিয়ে আসতে পারে এবং বশ মানাতে পারে। তোমাকে প্রচুর প্রমাণও দিতে পারি। অনেক বার আমি আমার ভাইয়ের সাথে এমন কারো কাছে গিয়েছি যে কোনো ওষুধ গ্রহণ করতে অথবা ডাক্তারকে ছেঁকার মাধ্যমে সংক্রমণরোধ বা অস্ত্রোপচার করতে দিচ্ছে না। এবং যেখানে ডাক্তাররা তাকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে আমি কেবল এই বাগ্মিতা শিল্প দিয়েই তাকে রাজি করাতে সফল হয়েছি। এবং আমি মনে করি যদি একজন ডাক্তার ও একজন বাগ্মী যেকোনো শহরে গিয়ে উপস্থিত হয় এবং তাদেরকে যদি সেই শহরের ডাক্তারের পদের জন্য কোনো সভা বা জমায়েতে ভাষণ দেয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করতে হয়, তাহলে ডাক্তারটির কোনো সুযোগই থাকবে না, বরং যার কথা বলার সামর্থ্য আছে সে-ই নিয়োগ পাবে, যদি সে চায়। এবং সে যদি অন্য যেকোনো শিল্পের পেশাদারদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে তাহলেও নিজের নির্বাচন নিশ্চিত করতে অন্য যে কারো তুলনায় বেশি সক্ষম হবে। বাগ্মিতার এমনই প্রকৃতি আর ক্ষমতা! তবে, সক্রেটিস, বাগ্মিতাকে অন্য সব প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের মতোই ব্যবহার করতে হবে, মানে সবার বিরুদ্ধে নয়— কোনো বাগ্মীর তার শক্তির অপব্যবহার করা উচিত হবে না ঠিক যেমন একজন মুষ্টিযোদ্ধার বা মল্লযোদ্ধার বা তলোয়ারবিদেরও নিজের ক্ষমতার ব্যবহার করি অনুচিত। যেহেতু এদের শক্তির সাথে বন্ধু, শত্রু নির্বিশেষে কারো শক্তির তুলনা হয় না, সেহেতু সেই শক্তি খাটিয়ে কোনো বন্ধুকে আক্রমণ, ছুরিকাঘাত বা হত্যা করা নিশ্চয়ই তাদের উচিত নয়। ধরা যাক এক ব্যক্তি পালাইস্ত্রাতে ((প্রাচীন গ্রিসের মল্লযুদ্ধ ও মুষ্টিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।)) মুষ্টিযোদ্ধা হওয়ার প্রশিক্ষণ শেষ করে গিয়ে তার বাবা বা মা অথবা তার পরিবার বা বন্ধুমহলের কাউকে খুন করে ফেলল; কিন্তু এই কারণে নিশ্চয়ই তার প্রশিক্ষকদেরকে ঘৃণা করা বা তাদেরকে নগর থেকে বহিষ্কার করা ঠিক হবে না। কারণ তারা তো তাদের শিল্প শিখিয়েছিল একটা ভাল উদ্দেশ্যে: শত্রু বা মন্দলোকদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য, আগ্রাসন নয় বরং আত্মরক্ষার খাতিরে ব্যবহারের জন্য। অন্যরা তাদের সেই শিক্ষাকে বিকৃত করে নিজেদের শক্তি ও দক্ষতা খারাপ কাজে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এই কারণে প্রশিক্ষকরা কোনোভাবেই দোষী নয়, এবং শিল্পটাও ত্রুটিপূর্ণ নয়, অন্তত অন্তর্নিহিতভাবে তো নয়ই। আমার বরং বলা উচিত যারা কোনো শিল্পকে খারাপ কাজে ব্যবহার করে দোষ তাদের। একই যুক্তি বাগ্মিতার ক্ষেত্রেও খাটে। একজন বাগ্মী যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে বা যেকোনো বিষয়ে এমনভাবে কথা বলতে পারে যাতে কোনো জমায়েতের সবাই তার সাথে একমত হয়, সংক্ষেপে, সে মানুষকে কোনো বিষয়ে অন্য যে কারো চেয়ে বেশি রাজি করাতে পারে। কিন্তু কেবল ক্ষমতা আছে বলেই তার কোনো চিকিৎসককে বা অন্য যেকোনো শিল্পের কাউকে ঠকানো উচিত হবে না; মল্লবীরের যেমন মল্ল-নৈপুণ্য ন্যায্যভাবে ব্যবহার করা উচিত তেমনি বাগ্মীরও নিজের ক্ষমতা ন্যায্যভাবে ব্যবহার করা উচিত। এবং বাগ্মী হয়ে উঠার পর যদি সে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাহলে তার শিক্ষককে ঘৃণা বা নির্বাসিত করা ঠিক না। কারণ শিক্ষক তার শিক্ষার ভাল ব্যবহার চেয়েছিল, তাকে খারাপ দিকে নিয়ে গেছে ছাত্রটি। সুতরাং এই দোষে কাউকে ঘৃণা, নির্বাসিত বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে হলে ছাত্রটিকেই করা উচিত, শিক্ষককে নয়। ((গোর্গিয়াস বলছেন বাগ্মিতা নৈতিকও নয় আবার নৈতিকতা বিরোধীও নয়, এটা নৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, অন্যসব শিল্পের মতোই। এরিস্টটলের রেটরিক এর নিরপেক্ষতাও এখানে উল্লেখ্য।))

সক্রেটিস: আমার মতোই তুমি, গোর্গিয়াস, অনেক ধরণের বিতর্কের অভিজ্ঞতা লাভ করেছ, এবং আমার ধারণা তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছ যে, এগুলোতে সবসময় জ্ঞানের পারস্পরিক লেনদেন ঘটে না এবং অনেক ক্ষেত্রেই তার্কিকেরা যে বিষয়ে কথা বলছে তার একটা সাধারণ সংজ্ঞার ব্যাপারে একমত হতে পারে না। বরং মতানৈক্য চলে আসাটা অনিবার্য—ধরো একজন আরেক জনকে স্পষ্ট ও সৎ ভাবে কথা না বলার দোষে দোষী করল আর সাথে সাথে উভয়েই আবেগের বশে ঝগড়া শুরু করে দিল; প্রত্যেকেই ভাবতে থাকল যে অপরজন কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে এবং তার প্রতি হিংসা থেকে কথা বলছে, আলোচ্য প্রশ্নটির স্বার্থে নয়। কখনো কখনো তারা একে অপরকে কটুকাটব্য করতেই থাকে যতক্ষণ না শ্রোতারা এতক্ষণ তাদের কথা শুনেছে বলে নিজেরাই নিজেদের উপর বিরক্ত হয়ে উঠে। কেন এগুলো বলছি? কেননা, তুমি এখন যা বলছ তা বাগ্মিতা সম্পর্কে বলা তোমার আগের কথাগুলোর সাথে যে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা সঙ্গতিপূর্ণ নয় তা না ভেবে আমি আর পারছি না। তাই আগে ঐ কথাগুলো বলে নিলাম, পাছে তুমি আবার ভেবে বসো যে তোমার প্রতি আমার কোনো শত্রুতা আছে এবং আমি সত্যাবিষ্কারের পরিবর্তে তোমার প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে কথা বলছি। এখন তুমি যদি আমার মতো হও তাহলে তোমাকে আরেকটু জেরা করব আর যদি না হও তবে এখানেই ইস্তফা দেব। এবং তুমি নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করবে আমার মতো হওয়া মানে কী। আমি সেইরকম একজন যে কোনো অসত্য কথা বললে ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে রাজি এবং অন্য কেউ অসত্য কথা বললে তাকেও ভ্রান্ত প্রমাণ করতে আগ্রহী; অর্থাৎ কাউকে ভুল প্রমাণ করতে ও নিজে ভুল প্রমাণিত হতে আমি সমান পরিমাণ প্রস্তুত। কারণ, আমি মনে করি এতে দু’জনেরই বেশি লাভ হয়, ঠিক যেমন কোনো বড় অশুভ থেকে নিজে আরোগ্য লাভ করাটা অন্য কাউকে আরোগ্য দেয়ার চেয়েও বেশি লাভজনক। ((একটু পরেই সক্রেটিস সবার কাছে শ্রদ্ধেয় গোর্গিয়াসকে যুক্তির বাণে বিদ্ধ করবেন, তাই তার আগে ডায়ালেক্টিক বা দ্বান্দ্বিকতা’র মূল প্রকৃতিটা কৈফিয়তের সুরে বলে নিচ্ছেন: দ্বন্দ্বের সময় কোনোকিছু ব্যক্তিগতভাবে নেয়া যাবে না, হার-জিত নির্বিশেষে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখতে হবে। প্লেটো সক্রেটীয় দ্বান্দ্বিকতা এবং তার জাল রূপ কূটতর্ক (eristic, antilogic) এর মধ্যে পার্থক্য করার ব্যাপারে সবসময় সচেতন থাকতেন। কূটতর্কে ব্যক্তিগত জয়ই মুখ্য, যেখানে সক্রেটিসের মূল লক্ষ্য থাকত যেকোনো মূল্যে সত্যে পৌঁছানো।)) আমার মতে আমরা এখন যে বিষয় নিয়ে কথা বলছি তা এত গুরুত্বপূর্ণ যে এ সম্পর্কে কারো মধ্যে কোনো ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার চেয়ে অশুভ আর কিছু হতে পারে না। সুতরাং তুমি যদি আমার মতো হও তাহলে চলো আরো খোলাখুলিভাবে আলোচনা করি, আর যদি না হও তাহলে এখানেই ক্ষান্তি দেই। ((প্রথম ঘোষণা এল যে, এখানে কেবল বাগ্মিতার সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে না, বরং এই আলোচনার উপর নির্ভর করবে একজনের গোটা বিশ্বদর্শন (worldview/Weltanschauung)।))

গোর্গিয়াস: আমার বলা উচিত, সক্রেটিস, তুমি যেমন মানুষের দিকে ইঙ্গিত করছ আমি ঠিক তেমনই; কিন্তু আমাদের, সম্ভবত, শ্রোতাদের কথাও ভাবা উচিত, কারণ তুমি আসার আগেই আমি ওদেরকে একটা সুদীর্ঘ উপস্থাপনা দিয়েছি এবং এখন আমরা এগোনো শুরু করলে যুক্তি আরো অনেক দীর্ঘায়িত হবে। সুতরাং আমার মনে হচ্ছে আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমাদের কথা শোনার বদলে অন্যকিছু করতে ইচ্ছুক কাউকে আমরা আটকে রাখছি কি না।

কাইরেফোন: তোমরা তো শ্রোতাদেরকে উল্লাস প্রকাশ করতে শুনছই, গোর্গিয়াস ও সক্রেটিস, যা থেকেই তাদের আগ্রহটা বুঝা যায়। আর আমার নিজের কথা বললে বলতে হয়, এত আকর্ষণীয় ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত একটা আলোচনা শোনার পরিবর্তে অন্যকিছু করার প্রয়োজনীয়তা যেন আমার জীবনে কোনোদিন না আসে।

কালিক্লিস: দেবতাদের দোহাই, কাইরেফোন, আমি এর আগে আরো অনেক আলোচনায় উপস্থিত থাকলেও সম্ভবত এতটা চমৎকৃত কখনো হইনি। সুতরাং তোমরা যদি সারাদিনও আলোচনা চালিয়ে যাও তাতে বরং আমি আরো খুশিই হব।

সক্রেটিস: আমি সত্যি বলছি, কালিক্লিস, গোর্গিয়াস রাজি থাকলে আমিও পুরো রাজি।

গোর্গিয়াস: এত কিছুর পরে, সক্রেটিস, রাজি না হলে তো বেইজ্জতি হয়ে যাবে, বিশেষ করে যেহেতু আমি আগত সবার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। সবার সম্মতি যেহেতু আছে সেহেতু তুমি শুরু করো এবং আমাকে যে প্রশ্ন ইচ্ছা করো।

সক্রেটিস: তাহলে, গোর্গিয়াস, আমাকে বলতে দাও আমি তোমার কথার কোন জায়গায় এসে বিস্মিত হয়েছি, যদিও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, হয়ত তোমার কথাই ঠিক বা হয়ত তুমি কোন অর্থে বলেছ সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। তুমি বলেছ যে তুমি তোমার কাছ থেকে শিখতে ইচ্ছুক যে কাউকে বাগ্মী বানাতে পারো।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: তুমি কি বুঝাতে চাচ্ছ যে তুমি তাকে কোনো জমায়েতেকে কোনো বিষয়ে রাজি করানো শেখাতে পারো এবং সেটা শিক্ষা নয় বরং প্রত্যয় উৎপাদনের মাধ্যমে?

গোর্গিয়াস: ঠিক তাই।

সক্রেটিস: আসলে, তুমি এটাও বলছিলে যে, বাগ্মীর প্রত্যয়-উৎপাদন ক্ষমতা চিকিৎসকের চেয়েও বেশি, এমনকি স্বাস্থ্য বিষয়ক কিছুতেও, ঠিক না?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, তবে অবশ্যই কেবল একটি জমায়েতের প্রত্যয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে।

সক্রেটিস: অর্থাৎ, তুমি বলতে চাচ্ছ, অজ্ঞদের ক্ষেত্রে; কারণ যারা জানে তাদের ক্ষেত্রে তার প্রত্যয়-উৎপাদন ক্ষমতা নিশ্চয়ই বেশি হবে না।

গোর্গিয়াস: খুব ঠিক।

সক্রেটিস: কিন্তু তার প্রত্যয়-উৎপাদন ক্ষমতা ডাক্তারের চেয়ে বেশি হওয়ার অর্থ কি এই নয়ে যে, তার ক্ষমতা যে জানে তার চেয়েও বেশি।

গোর্গিয়াস: নিশ্চয়ই।

সক্রেটিস: যদিও সে কোনো ডাক্তার নয়, ঠিক না?

গোর্গিয়াস: ঠিক।

সক্রেটিস: এবং যে ডাক্তার নয় সে ডাক্তার যা জানে সে বিষয়ে অজ্ঞ হতে বাধ্য।

গোর্গিয়াস: স্পষ্টতই।

সক্রেটিস: তাহলে, বাগ্মী যখন ডাক্তারের চেয়ে বেশি প্রত্যয়-উৎপাদনকারী হয় তখন আসলে অজ্ঞ অজ্ঞদের কাছে জ্ঞানীর তুলনায় বেশি প্রত্যয়-উৎপাদনকারী হয়। ঠিক এই সিদ্ধান্তটাই কি বেরিয়ে আসছে না?

গোর্গিয়াস: নির্দিষ্টভাবে এই প্রসঙ্গে, হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং বাগ্মিতার সাথে অন্য সব শিল্পের সম্বন্ধের ক্ষেত্রেও একথা খাটে। বাগ্মীর কোনো জিনিসের সত্য জানার কোনো দরকার নেই, তার কেবল দরকার এমন একটা উপায় বের করা যার মাধ্যমে উক্ত বিষয়ে অজ্ঞদের মধ্যে এই প্রত্যয় জন্মানো যায় যে, সে যারা জানে তাদের চেয়েও বেশি জ্ঞানী।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, সক্রেটিস, এবং এই ব্যাপারটা কি বড় আরামদায়ক নয় যে, তোমাকে অন্য কোনো শিল্প শিখতে হচ্ছে না এবং কেবল একটি শিল্প, অর্থাৎ বাগ্মিতা, শিখেই তুমি অন্য সব শিল্পে সেগুলোর শিল্পকারদের তুলনায় আর অধস্তন থাকছ না? ((ফরাসি রাজনীতিবিদ Léon Gambetta বলেছিলেন, গণতন্ত্র মানে অবিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিশেষজ্ঞদের চালনা। এথেনীয় গণতন্ত্রের প্রতি প্লেটোর প্রধান সমালোচনাও ছিল এটি। প্লেটো বারবার বলতেন, যেভাবে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় তেমনভাবে নির্বাচিত কোনো নাবিক এর চালানো জাহাজে আমরা উঠতে চাইব কি না। গোর্গিয়াস এখানে কেবল এক বাগ্মিতা শিল্প শিখে অন্য সবাইকে নিজের অধস্তন করে রাখার সুযোগের কথা বলে প্লেটোর সেই শঙ্কাকেই আরো বাড়াচ্ছেন।))

সক্রেটিস: বাগ্মী এই ক্ষেত্রে আসলেই অধস্তন কি না সেই প্রশ্নে আমরা পরে আসব যদি সেই অনুসন্ধান আমাদের আদৌ কোনো কাজে লাগে; কিন্তু এখন আমি অন্য একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে চাই: বাগ্মী চিকিৎসাশাস্ত্র বা অন্যান্য শিল্প সম্পর্কে যতটা অজ্ঞ ন্যায্য ও অন্যায্য, প্রশংসনীয় ও লজ্জাকর, শুভ ও অশুভ এসব বিষয়েও ঠিক ততটা অজ্ঞ কি না। আমি বলতে চাচ্ছি, সে কি আসলেই কোনো কিছুতে শুভ ও অশুভ, প্রশংসনীয় ও লজ্জাকর বা ন্যায্য ও অন্যায্য কী আছে তা জানে, নাকি তার কেবল এমন একটা কৌশল আছে যা দিয়ে সে অজ্ঞদেরকে বুঝাতে পারে যে, অজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানীর চেয়ে সে বেশি জানে? নাকি কোনো ছাত্রকে এই ব্যাপারটা তোমার কাছে বাগ্মিতা শিল্প শিখতে আসার আগেই জেনে আসতে হয়? সে যদি অজ্ঞ হয়, তাহলে বাগ্মিতার শিক্ষক হিসেবে তুমি তাকে কিছুই শেখাবে না, কারণ সেটা তোমার কাজ নয়, বরং তুমি এমন ব্যবস্থা করবে যাতে উপরের জিনিসগুলো না জানা সত্ত্বেও কোনো জমায়েতের কাছে মনে হয় যে সে সেগুলো জানে। যেমন, সে ভাল মানুষ না হলেও যেন তাকে ভাল মানুষ মনে হয়। নাকি সে এই ব্যাপারের সত্যগুলো আগে থেকে না জানলে তুমি তাকে বাগ্মিতা শিল্প একেবারেই শেখাতে পারবে না? এসব নিয়ে কী বলার আছে? জিউসের দোহাই, গোর্গিয়াস, কতই না ভাল হতো যদি তুমি তোমার একটু আগের কথামত আসলেই বাগ্মিতার ক্ষমতা আমার কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারতে! {৪৬০}

গোর্গিয়াস: আচ্ছা, সক্রেটিস, যদি ছাত্রটি ভাগ্যক্রমে আসলেই আগে থেকে এই বিষয়গুলো না জেনে থাকে, তাহলে আমার কাছ থেকেই তার এগুলো শিখে নিতে হবে।

সক্রেটিস: আর বলার দরকার নেই, এ ব্যাপারে তুমি পুরো ঠিক। এবং সে হিসেবে যাকে তুমি বাগ্মী বানাবে তার হয় আগে থেকে ন্যায্য ও অন্যায্যর প্রকৃতি জেনে আসতে হবে, নয় তোমার কাছ থেকে শিখে নিতে হবে। ((বাগ্মীরা কোনো বিষয় সম্পর্কে না জেনেও সে বিষয়ে সর্বজনগ্রাহ্য বক্তব্য দিতে পারে, এই ব্যাপারটা ন্যায়-অন্যায় এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না সক্রেটিস জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে গোর্গিয়াস বলেন, তার ছাত্র যদি আগে থেকে ন্যায়-অন্যায় এর জ্ঞান না নিয়ে তার কাছে বাগ্মিতা শিখতে আসে তবে তিনি তাকে ন্যায় শেখাতে পারবেন। অন্য কথায়, গোর্গিয়াস তার শিল্পের একটা মাননির্ধারক (normative) কাজ আছে বলে মেনে নিলেন। এটাই গোর্গিয়াসের যুক্তির চূড়ান্ত পরাজয়ের কারণ, পোলোস এসে এটা অস্বীকার করবেন। আসলে প্লেটো এখানে ঐতিহাসিক গোর্গিয়াসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। আসল গোর্গিয়াস ‘আরেতি’ (ἀρετή—virtue—গুণ) শেখাতে পারেন বলে দাবী করতেন না; প্লেটো পরবর্তীতে মিনো সংলাপে এই ভুল স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তবে তারপরও বাগ্মিতার সাথে নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই সেটা স্বয়ং গোর্গিয়াসও অস্বীকার করতে পারতেন না; তাই এই সংলাপে গোর্গিয়াসের উপস্থাপনটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। রাজনীতি ও নৈতিকতার সম্পর্ক বেশ জটিল।))

গোর্গিয়াস: নিশ্চয়ই।

সক্রেটিস: আচ্ছা, তাহলে যে কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখে তাকে কি আমরা কাঠমিস্ত্রি বলি না?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: আর যে সঙ্গীত শিখে সে সঙ্গীতজ্ঞ।

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং একইভাবে যে চিকিৎসাশাস্ত্র শিখেছে সে ডাক্তার? যে কিছু না কিছু শিখেছে সে-ই তার শিক্ষা মানুষকে যা বানায় তা হয়ে যায়।

গোর্গিয়াস: নিশ্চয়ই।

সক্রেটিস: এবং সেই সূত্রেই যে ন্যায্য কাকে বলে শিখেছে সে নিশ্চয়ই ন্যায়পরায়ণ? ((এটাই সক্রেটিসের সবচেয়ে অযৌক্তিক ধারণা। তিনি মনে করতেন, ঠিক যেমন যে লিখতে জানে সে লেখক, তেমনি যে ন্যায় জানে সে ন্যায়পরায়ণ। তবে আমাদের কাছে এই ব্যাপারটা শোনামাত্রই যত অদ্ভুত ও অযৌক্তিক মনে হয় প্রাচীন গ্রিকদের কাছে তেমন লাগত না। কারণ তারা মানুষকে তার কাজ দিয়ে বিচার করতে অভ্যস্ত ছিল, উদ্দেশ্য দিয়ে নয়—Οἰδίπους (ওইদিপোস/ইডিপাস) না জেনে পাপ করার কারণে তার পাপ ছোটো হয়ে যায়নি। তাই সক্রেটিসের এহেন বক্তব্যে যখন গোর্গিয়াস সাথেসাথে সায় দিয়ে দেন তখন অতটা অবাক হওয়ার কিছু নেই।))

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই।

সক্রেটিস: এবং যে ন্যায়পরায়ণ সে ন্যায্য কাজ করবে বলেই ধরে নেয়া যায়?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি কি সবসময়ই ন্যায্য কাজটা করতে চাইবে না?

গোর্গিয়াস: যুক্তির পরিণাম তো তাই দাঁড়াচ্ছে।

সক্রেটিস: তাহলে নিশ্চয়ই, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি কখনোই অন্যায্য কাজ করতে রাজি হবে না?

গোর্গিয়াস: অবশ্যই না।

সক্রেটিস: এবং যুক্তি অনুসারে বাগ্মী ন্যায়পরায়ণ হতে বাধ্য?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: এবং সুতরাং সে কখনোই অন্যায্য কাজ করতে রাজি হবে না?

গোর্গিয়াস: নিশ্চয়ই না।

সক্রেটিস: কিন্তু তোমার কি মনে পড়ে যে একটু আগেই বলছিলে, মুষ্টিযোদ্ধা যদি মুষ্টিযুদ্ধ শিল্পের কোনো অপব্যবহার করে তাহলে তার জন্য তার প্রশিক্ষককে দায়ী করা বা নির্বাসিত করা যাবে না; এবং একইভাবে যদি কোনো বাগ্মী বাগ্মিতার খারাপ ও অন্যায্য ব্যবহার করে তাহলে সেটার দায়ও তার শিক্ষকের ঘাড়ে চাপানো যাবে না এবং সুতরাং শিক্ষককে নির্বাসিত করা যাবে না, করলে করতে হবে মন্দলোকটিকে যে বাগ্মিতার অপব্যবহার করেছে?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ, মনে পড়ে।

সক্রেটিস: কিন্তু এখন আমরা বলছি যে, উপর্যুক্ত বাগ্মীর পক্ষে কখনো অন্যায্য কাজ করা সম্ভবই নয়, ঠিক না?

গোর্গিয়াস: সত্য।

সক্রেটিস: এবং একেবারে শুরুতেই বলা হয়েছিল যে, বাগ্মিতা ভাষণ নিয়ে কাজ করে, পাটিগণিতের মতো জোড় বা বিজোড় সংখ্যা বিষয়ক ভাষণ নয়, বরং ন্যায্য ও অন্যায় বিষয়ক। এটাই কি বলা হয়নি?

গোর্গিয়াস: হ্যাঁ।

সক্রেটিস: তোমাকে এটা বলতে শোনার সময় আমি ভাবছিলাম, বাগ্মিতা, যা সবসময় ন্যায্যতা নিয়ে কথা বলে, নিশ্চয়ই অন্যায্য হতে পারে না। কিন্তু একটু পরে যখন তুমি এর সাথে যোগ করলে যে, একজন বাগ্মী বাগ্মিতার খারাপ ব্যবহার করতে পারে তখন তোমার কথার অসঙ্গতি আমাকে বিস্মিত করেছিল। এবং বলেছিলাম, তুমি যদি আমারই মতো মনে করো যে ভুল প্রমাণিত হওয়ার মধ্যেও লাভ আছে তাহলে প্রশ্ন চালিয়ে যাওয়াতে লাভ আছে, অন্যথায় ক্ষান্তি দেয়াই উত্তম। এবং অনুসন্ধান করতে গিয়ে, লক্ষ্য করলে দেখবে, আমরা স্বীকার করেছি যে বাগ্মীর পক্ষে বাগ্মিতার অন্যায্য ব্যবহার করা অসম্ভব, এবং সে কখনো অন্যায্য কাজ করতে চায়ও না। ((গোর্গিয়াসের কথায় স্ববিরোধিতা এনেই ছাড়লেন সক্রেটিস। অনেকের মনে হতে পারে ব্যাপারটা বেশি আরোপিত। কিন্তু গোর্গিয়াসের কেবল দুটো কথা মাথায় রাখলে স্ববিরোধিতাটা ভাস্বর হয়ে উঠে: ১) বাগ্মিতা ন্যায়-অন্যায় শেখাতে পারে, ২) অন্যায় সাধনকারী বাগ্মীর শিক্ষককে কোনো দোষে অভিযুক্ত করা যাবে না। নিশ্চিতভাবেই যে শিল্পের সাথে ন্যায়-অন্যায়ের সম্পর্ক আছে সে দায়িত্বহীন থাকতে পারে না। পরবর্তীতে পোলোসের সাথে আলোচনায় সক্রেটিস দাবী করবেন, কোনো প্রত্যয় উৎপাদনকারী শিল্প যদি তাকে চর্চা করার ফলাফলের ব্যাপারে দায়িত্ব না নেয় তাহলে তাকে কোনো শিল্পই বলা চলে না।)) কুকুরের দোহাই, ((সক্রেটিস এই রাদামান্থিসীয় শপথটি মাঝেমধ্যেই নিতেন; রাজা Rhadamanthys তার দেশে দেবতাদের বদলে প্রাণীদের নামে শপথ নেয়ার আইন জারি করেছিলেন বলে এমন নাম। কুকুর দ্বারা লুব্ধক তারাকেও বুঝানো হতে পারে।)) গোর্গিয়াস, এই সবকিছুর সত্যে পৌঁছাতে আরো অনেক আলোচনার প্রয়োজন।

সংলাপের এই পর্যায়ে গোর্গিয়াসের একনিষ্ঠ শিষ্য পোলোস নাক গলান এবং তারপর সংলাপের মূল পাত্র হয়ে উঠেন সক্রেটিস ও পোলোস। পরবর্তী পর্বে পোলোসের সাথে সংলাপটুকু থাকবে। সেই সংলাপের শেষ পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করবেন কালিক্লিস, এবং ৩য় ও শেষ পর্বে থাকবে সেই কালিক্লিসের সাথে কথোপকথন।

[121 বার পঠিত]