কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে আমরা পেয়েছিলাম একজন অভিজিৎ রায়, একজন হুমায়ূন আজাদকে!! এমন মানুষ চলে গেলেন, যার স্থান পূরণ করা আদৌ সম্ভব কিনা আমি সন্দিহান। শুধু এটুকু জানি, তার দেখানো পথে’আমরা সবাই আলো হাতে চলা আঁধারের যাত্রী’। যে যুদ্ধে নেমেছি সেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫:

ফেসবুক বন্ধু আসিফ-আল- আজাদ হাইপেশিয়াকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেই স্ট্যাটাসটি পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ে অভিজিৎ দার একটি ব্লগ আছে হাইপেশিয়াকে নিয়ে লেখা। তার লেখা এই ব্লগটি আমার খুব প্রিয় একটি ব্লগ। সময় পেলেই আমি ‘আগোরা’ ছবিটি দেখি, আর দাদার ব্লগটি উল্টে-পাল্টে পড়ি। যেখানে অভিজিৎ দা, ক্ষণজন্মা বিদুষী এই নারী গনিতজ্ঞকে তার সমস্ত মমতা আর আবেগ দিয়ে পাঠকের মাঝে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ব্লগটি থেকে জানা যায়, হাইপেশিয়া ছিলেন মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী ইতিহাসের শেষ ‘প্যাগান সায়েন্টিস্ট’। অথচ খ্রিস্ট ধর্মান্ধদের রোষানলে পুড়ে এই রূপসী বিদুষীকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে, ৪১৫ খ্রিস্টাব্দে। ব্লগটা পরিচয় করায় এমন এক আলোকিত নারীর সঙ্গে যিনি ধর্ম ও বিজ্ঞানের যুদ্ধে লড়তে লড়তে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমি খুব কম জানা একজন মানুষ, অভিজিৎদার এই ব্লগটি পড়তে পড়তে কখন যে হাইপেশিয়াকে ভালবেসেছি আর নিজের অজান্তেই দেখতে পেয়েছি তাকে হত্যার দৃশ্যটি। হাইপেশিয়া যেন সেইসব পুরুষ রমণীর একজন যারা শতাব্দীর অন্ধকারে হাতরে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে এক জন্মে আমাকে জন্ম জন্মান্তরের দরজা খুলে দিয়ে যায়। আমি দেখতে পাই আলো হাতে চলা একা এক আঁধারের যাত্রীকে। যার সঙ্গে লেখক ড. অভিজিৎ রায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

২০০৯ এর ১৫ জুনঃ

আমার হাতে ডঃ মিজান রহমানের ”দুর্যোগের পূর্বাভাস”। মিজান রহমানের কিছু ব্লগ আমি পড়েছিলাম পিডিএফ আকারে। কিন্তু বই এই প্রথম। মিজান রহমানের লেখা খুঁজতে গিয়েই মুক্তমনা ওয়েবসাইটটি খুঁজে পাই। যেখানে শুধু মিজান স্যার না, অসংখ্য ব্লগারের ব্লগ খুঁজে পাই, যাদের সঙ্গে ঠিক নিজের অপ্রকাশিত কথাগুলো মিলে যায়। পড়তে শুরু করি মুক্তমনার পুরনো থেকে পুরনো ব্লগগুলোও। আবুল কাশেমের ব্লগগুলো পড়ে নারী হিসেবে হোঁচট খেয়ে পড়ি, হোঁচট খেয়ে পড়ি পুরনো ধর্ম বিশ্বাসের দুর্গন্ধময় গলিতে যেখানে আমার অস্তিত্ব বিলুপ্ত পায়। আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী নই, কিন্তু বন্যা আপুর ব্লগ আমাকে সহজ ভাষায় বিবর্তন বোঝায়। বন্যা আহমেদের ব্লগ আমাকে ডারউইনকে নতুন করে চিনতে শেখায়। বিবর্তন নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দেন আমায় এই সুলেখিকা। আর অভিজিৎ রায়ের ব্লগগুলো সেই মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম এমন কোন বিষয় নেই যেখানে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেননি। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের বড় নাক উঁচু ভাব। অভিজিৎ রায় সেই দম্ভও দুমড়ে মুচড়ে দেন। একদিন অনেক সাহস করে পাঠিয়ে দেই ফেসবুকে বন্ধুত্বের অনুরোধ। তিনি তা গ্রহণ করলেন। আমার কাছে অভিজিৎ রায় শুধু মাত্র বন্ধু ছিলেন না। অনেক দূরের মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন আদর্শের অভিভাবক, পথ-প্রদর্শক আবার কখনো বা বড় ভাইয়ের মতন।

২০১৩ এর ফেব্রুয়ারিঃ

অভিজিৎ রায় শুধু লেখালেখি করেই তার দায়িত্ব পালন করেননি। মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল আন্দোলন করতে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক বিপদগ্রস্থ প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মীদের পাশে দাঁড়াতেন সব ধরণের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে। সেই মানুষটির পরিচয় যাই হোক না কেন, হোক না সে পাকিস্তানি কিংবা ভিন্নমত প্রকাশের মানুষ; অভিজিৎ রায় তার পাশে দাঁড়াতেন। ছো্ট্ট মালালার পাশে দাঁড়িয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস লিখেন অভিজিৎ রায়। যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তথাকথিত সুশীল শ্রেণি। তাদের উত্তরে অভিজিৎ রায় তার ব্লগে লিখেছিলেন, ”যে পাকিস্তান ও তার মিলিটারি ৩০ লক্ষ বাঙালির হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তার সবকিছু অস্বীকার করাটা দোষের কোথায়? এমনটি লিখেছেন এক ফেসবুক বন্ধু স্ট্যাটাসের মন্তব্যে। আমি বলব, কেউ কিন্তু অস্বীকার করছে না যে পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছিল। আমরা তার প্রতিবাদ করেছি, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিও চাচ্ছি। ঘৃণিত পাকসেনাদের বিচারও দাবি করছি, দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে। আমি নিজেও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি নিজেও বড় হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিমণ্ডলেই। তাই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ জিনিসটা এত সংকীর্ণ হবার কথা নয় যে, একটি সাহসী মেয়ে তালিবানদের বিরুদ্ধে একা যুদ্ধ করছে, নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করছে — অথচ তাকে আমরা সাধুবাদ দিতে পারব না, প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হব। এটা করলে আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই অপমান করা হয়। আসুন আমরা বিশ্বমানব হতে শিখি। বাঙালিত্বের অপর নাম যে বিশ্বমানব হবার শিক্ষা — তা ভুলে যাই কেন?” ২০১৩ তে ব্লগারদের যখন আটক করা হলো, তখন থেকে এক সঙ্গে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। অভিজিৎদা আমেরিকা বসেই আমাদের উৎসাহ দিয়ে যেতেন। কখনো কখনো কাজের অগ্রগতি না হলে হতাশ হতেন না, বরং বলতেন, থেমে যাবেন না, আমাদের কাজ করে যেতে হবে, তাহলেই আমরা জয়ী হবো। একদিন সত্যি সব ব্লগার মুক্তি পেলো। আজ বলতেই হয়, অভিজিৎ রায় শুধু যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে থেমে যাননি। এসময় বিশেষ কারো ক্ষেত্রে নিজের পকেট থেকে অর্থাসাহায্যও পাঠিয়েছিলেন তিনি, আর অন্যদেরকেও উৎসাহিত করেছিলেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ থেকে ১০ মার্চ ২০১৫:

শুধু একজন ফারাবী বা চাপাতিধারীরাই অভিজিৎ রায়ের হত্যাকারী নয়। অভিজিৎ রায়ের হত্যার পেছনে বিশাল এক ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র আছে, ঠিক যেমন সুপরিকল্পিত চক্রান্ত ছিল সক্রেটিস, হাইপেশিয়া, আলেকজান্দার ও ব্রুনোদের হত্যার পেছনে। সময় বলে দেবে আমি সত্য বলছি কিনা। যারা বলেন, অভিজিৎ রায় শুধু ইসলামের সমালোচনা করেছেন, তারা জেনে-শুনে মিথ্যা বলছেন। তাদের অন্য কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে যা দিয়ে তারা অসচেতন ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনগণের মন অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলতে চায়। অভিজিৎ রায় প্রতিটি ধর্মের অবৈজ্ঞানিক, অযৌক্তিক, অমানবিক দিকগুলোর জোড়ালো সমালোচনা করেছেন। তার প্রমাণ তার বই বিশ্বাসের ভাইরাস। যারা অভিজিৎ রায়কে নিয়ে কথা বলছেন, তারা অভিজিৎ রায়ের লেখা না পড়েই মন্তব্য করছেন। অভিজিৎ দা, বাংলাদেশের জন্য এমন একটি সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ ধর্মের নামে হানাহানি করবে না, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর জোর করে বা কৌশলে ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না, নারীদেরকে ধর্মের নামে অধিকার বঞ্চিত করা হবে না। এমন একটি সমাজ তিনি চেয়েছিলেন যেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে বৃহন্নলা, উভয়লিঙ্গ বা তৃতীয়লিঙ্গ আর সমকামীদের সামাজিক অধিকারও। তিনি বলেননি যে মানুষ ধর্ম-কর্ম করতে পারবে না। বরং তিনি ধর্মের অযৌক্তিকতা, অসারতা আর ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেছিলেন। আর তা করতে গিয়েই তিনি সেই ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী সমাজের চক্ষুশূল হয়ে ওঠেন। আর তার করুণ পরিণতি আমরা সবাই দেখেছি। মৌলবাদীরা নির্মমভাবে হত্যা করেছেন একজন নিরস্ত্র মানুষকে।

শেষ কথা:

অভিজিৎ রায়, অনায়াসে লিখে যেতে পারতেন আরো ৩০-৪০ বছর। সেই লেখাকে ভয় পেয়ে যারা তার কলম বন্ধ করতে চেয়েছে তারা নিঃসন্দেহে আমাদের দেশে শত্রু। কারন, অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান দিয়ে মানুষের মগজে প্রবেশ করতেন আর বিশ্বাসের ভাইরাসকে ধ্বংস করতেন। তারা বাঙলাদেশের মানুষকে অন্ধকারে রাখতে চায় বলেই এমন একজন আলোকিত মানুষকে হত্যা করলেন। একটা মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তার অবদান ও আদর্শের মৃত্যু হয় না। অভিজিৎ রায়কে যারা হত্যা করেছে, তারা দেশের মানুষকে অন্ধ করে রাখতে চায়। কারণ যতদিন মানুষ ধর্মান্ধ থাকবে, ততদিন ধর্ম-ব্যবসা করা সহজ হবে। হত্যাকারীরা ভাবছে এটা তাদের বিজয়। কিন্তু আসলে তাদের পরাজয় হয়েছে, কারণ এখন সবাই অভিজিৎ রায়ের লেখা পড়তে চাইছে। আর ঘরে ঘরে লুকিয়ে থাকা অভিজিৎরা বেরিয়ে এসে বলছে, আমরাই অভিজিৎ, তোমরা কতজনের মুখ বন্ধ করবে? অভিজিৎ রায়দের মৃত্যু হয় না। তারা বেঁচে থাকেন তাদের আদর্শে আর যুক্তিতে। ঠিক যেমন করে এখনও মানুষের মনে বেঁচে আছেন, সক্রেটিস, হাইপেশিয়া, আলেকজান্দার ও ব্রুনোরা। এত কিছুর পরও অভিজিৎ রায় তার মৃতদেহ দান করে যেতে পারেন, সেটি আমাদের ধর্মান্ধ সমাজের দিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া, আমি একজন সত্যিকারের মানুষ ছিলাম, যে মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন ত্যাগ করেতে পারি।। সময় বহমান, আর বহমান সময়েই অভিজিৎ রায় একজন খাঁটি মানুষ, দার্শনিক ও বিজ্ঞান লেখক হিসেবে বাঙলার প্রগতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের মনে স্থান করে নিবেন।

তবে আজ আমায় দুঃখের সঙ্গে বলতেই হয় অভিজিৎ রায় হাইপেশিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, ”মূলতঃ হাইপেশিয়ার মৃত্যুই সূচনা করেছিল মানব ইতিহাসের এক ঘোর কৃষ্ণ অধ্যায়ের, যে সময়ে মুক্তবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান-শিল্প-সাধনা তীব্রভাবে ব্যহত হয়। এ সময় জ্ঞানচর্চার বদলে চর্চা করা হয় ধর্মীয় আস্ফালন, কুপমুণ্ডুকতা, অরাজকতা আর বর্বরতার। এ সময়টাতে পৃথিবী এগোয়নি এক বিন্দুও বরং প্রগতির চাকাকে ঘোরানো হয়েছে উল্টো দিকে। এই কলঙ্কময় সময়টিকে ইতিহাসবিদরা আখ্যায়িত করেন একটি বিশেষ নামে – ‘অন্ধকার যুগ’ বা Dark Age।”বাঙলাদেশের ডার্ক এইজ বা অন্ধকার যুগ শুরু হয়েছে ২০০৪ এর ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখে ড. হুমায়ূন আজাদকে আক্রমণ আর তার ধারাবাহিকতায় ঘটলো ২০১৫ এর ২৬ ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ রায়কে হত্যার মাধ্যমে। এ যেন ১৯৭১ এর সেই সময়টা যখন আমাদের মেরুদন্ডকে ভেঙে দেওয়ার জন্য সব বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হচ্ছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই মৌলবাদী শক্তিই আজ বাঙলাদেশকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দিতে চায় না, সামনে যেতে দিতে চায় না। মেনে নিতে কষ্ট হলেও এটা সত্যি যে, যতদিন পর্যন্ত এ ধর্মান্ধ জাতি মেধার মূল্যায়ন করতে না শিখবে ততদিন এদেশে আরেকজন হুমায়ূন আজাদ কিংবা আরেকজন অভিজিৎ রায়ের জন্ম হবে না। আর সেই সময় পর্যন্ত আমাদের মৌলবাদকে আলিঙ্গন করে অন্ধকারেই থাকতে হবে।

[95 বার পঠিত]