দেবদাস-একজন জীবন্ত শহিদের নাম

By |2015-09-06T17:13:02+00:00ফেব্রুয়ারী 14, 2015|Categories: আমার চোখে একাত্তর|10 Comments

10993462_10205813444165768_8506211122905715770_n

পড়ছিলাম নাজিম মাহমুদের স্মৃতিগ্রন্থ ‘ যখন ক্রীতদাস : স্মৃতি ৭১। নাজিম মাহমুদ একাত্তরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পালিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। অনেক বাঙালি শিক্ষকের দালালি, শিক্ষক হত্যার সহযোগিতা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। তেমনি নাজিম মাহমুদ দেখেছিলেন মুজিবুর রহমানকে। যিনি পাকিস্তান হায়নাদের নির্মম অত্যাচার দেখে নিজের নাম বদলে রাখেন দেবদাস। অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এই বছর একুশে পদকে ভূষিত হলেন। আসুন লেখকেই মুখে শুনি বীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের নাম বদলানের ইতিহাসটুকু।


মে মাসের বারো তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনে সে কি চাঞ্চল্য! খুব চাপা গুঞ্জনে ও উত্তেজনায় মুখে মুখে খবরটি ছড়িয়ে পড়ল। গণিত বিভাগের এক অধ্যাপক, নাম মুজিবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একটি প্রতিবাদ লিপি দিয়েছেন, ভয়ঙ্কর সেই পত্র যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে সেনানিবাসে পরিণত করায় প্রতিবাদ লিখিত এবং বর্তমান কাল গণহত্যা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কাল বলে বর্ণিত। একাত্তর সালের ঊনত্রিশে এপ্রিল তারিখের সেই চিঠিতে কী লেখা ছিল, একবার দেখি:

This is to inform the authorities that I am going to leave the campus since the university campus has, at the moment, been degraded to the state of a military camp. I may come to the campus when the university regains its status and sanity and starts functioning as a university in true sense and when …
I hope to be kept informed about situation here in the address noted below. Where I hope to spend these days of calamity, genocide and freedom movement.
Please note the change of my name and from now this name should be used in future communications.
Sd/Devadas
previous name: Mujibur Rahman
Senior Lecturer, Mathematics
Vill: Maharul
PO: Parbatipur

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। তথাকথিত মুসলমান পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কীর্তিকলাপে বিক্ষুব্ধ অধ্যাপক মুজিবুর রহমান যে তাঁর মুসলমান পরিচয় ঘৃণা ভরে পরিত্যাগ করে হিন্দু নাম দেবদাস গ্রহণ করেছেন, শুধু তাই নয়; এমন একখানি প্রতিবাদ পত্র প্রশাসনের কাছে পাঠিয়েও সেই অধ্যাপক দিব্যি নিশ্চিত মনে ক্যাম্পাসে এক কোআর্টারে অবস্থান করেছেন। মানুষটি অবশ্যই পাগল হয়ে গেছেন। চারদিকে হত্যা ধর্ষণ লুন্ঠন নির্যাতনে তাঁর সুস্থতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সেটাই স্বাভাবিক। যে কোন সুস্থ আত্মমর্যাদা ও মানবিক বোধ সম্পন্ন মানুষই এমন পরিস্থিতিতে উন্মাদ হবে। কিন্তু আমাদের মতো পনেরো আনা মানুষের চরিত্রে তো নানা ঘটতি। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য বলে প্রাণ বিহঙ্গটি শকুনির থাবার নিচে ছুঁড়ে ফেলা বড়ই কঠিন। আর তাই বহু অন্যায়ের আমরা নীরব দর্শক মাত্র, সরব প্রতিবাদী নই।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টারকে লেখা অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের প্রতিবাদ কেমন করে সামরিক দফতরে ত্বরিত পৌঁছে গেল? যেখানে নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে জবাই করা হচ্ছে, সেখানে একজন প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবীর এই পত্র তাঁর জন্য কি ভয়াবহ পরিণাম রচনা করবে, তা কি অনুমান দুঃসাধ্য? এই চিঠিকে পাগলের প্রলাপ বলে চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় নথিপত্র স্তুপে কবরস্থান করা কি এমনই কঠিন?

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান তখন ক্যাম্পাসের পূর্ব পাড়ায় ছিলেন, তাঁরই সহকর্মী অধ্যাপক সুব্রত মজুমদারের পরিত্যক্ত ফ্লাটে। ডেপুটি রেজিস্টার সৈয়দ ইবনে আহমদ সেই বাসগৃহ চিনিয়ে দেবার জন্য এক সামরিক ক্যাপ্টেনের সঙ্গে গেলেন এবং বিশ পঁচিশ মিনিটের মধ্যে সেই অসম সাহসী অথবা বদ্ধউন্মাদ অধ্যাপককে গাড়িতে চড়িয়ে ফিরে এলেন। ইবনে আহমদ সাহেবকে নামিয়ে দেবার জন্য প্রশাসন ভবনে গাড়িটি দাঁড়াল কিছুক্ষণ। গেটের পাশেই আমার দপ্তর। প্রায় দৌড়ে বেরলাম। আমি সেই অধ্যাপককে এক নজর দেখার উদ্দেশ্যে যিনি সজ্ঞানে অথবা অচেতন অবস্থায় আমাদের মনের জ্বালাটি প্রকাশ করেছেন। ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তাই সেই মুহূর্তের একমাত্র ভাবনা, হয়ত এমন একটি সত্যিকারের মানুষকে কোনোদিন আর দেখতে পাবো না। গাড়িতে ক্যাপ্টেনের পাশে তখন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান নির্বিকার ভাবলেশহীন। চোখে মুখে তাঁর কোন ভয় দুশ্চিন্তা আদৌ নেই। একটু পরেই যে তাঁর প্রাণটি কাঁটামারা বুটের তলায় নিবিষ্ট হবে, তাও যেন তাঁর ভাবনায় নেই। অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে দেখে বারবার আমার মনে পড়তে লাগলো সব্যসাচীর উদ্দেশে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের সেই শ্রদ্ধার্ঘ্য: ‘তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়েছো……………।’

অকৃতদার অধ্যাপক মুজিবুর রহমান একাই ছিলেন শূন্য ফ্লাটে। ক্যাপ্টেন প্রশ্ন করলেন:
‘What is your name?’
“Devadas’ নির্বিকার উত্তর। অধ্যাপকের প্রতিবাদ পত্রেও এই নাম পরিবর্তনের কথা বলা আছে। পত্রের প্রসঙ্গক্রমে ক্যাপ্টেনের আবার প্রশ্ন:
‘What do you mean by genocide’?
অধ্যাপকের সাফ জবাব: That which you are committing these days.’
ক্যাপ্টেনের মুখের উপর ঠাস করে এমন কথা কেউ তখন ছুঁড়তে পারে কল্পনারও অতীত। তাই ক্যাপ্টেন ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেন:
‘Come with me.’
‘Let me have my lunch first. I am now cooking.’
অনুরোধ জানালেন অধ্যাপক রহমান। কেননা একমুঠো চাল তখন ফুটিয়ে নিচ্ছিলেন তিতি। কিন্তু ক্যাপ্টেন তাঁকে সেই সময় দিতে নারাজ:
‘Oh don’t bother. I will give you a better Lunch.’
সেই বেটার লাঞ্চটি কেমন হবে, ইবনে আহমদ (দালাল শিক্ষক) সাহেব চোখের ইংগিতে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। রাজশাহী, পাবনা ও নাটোর কনসেনটেশন ক্যাম্পে প্রায় চার মাস ধরে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সেই ‘বেটার লাঞ্চ’ খেয়ে খেয়ে অবশেষে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে পাঁচই সেপ্টেম্বর মুক্তি পেলেন অধ্যাপক রহমান। মুক্তির পর জয়পুর হাটে চলে যান তিনি।

তারপর দেশ স্বাধীন হল। ক্যাম্পাসে ফিরলে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ওরফে দেবদাস। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। কিন্তু অধ্যাপক রহমান আর কোনদিন তাঁর সেই স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেলেন না। পাকিস্তানী জল্লাদ বাহিনীর সদাচরণে তিনি আর চির উন্মাদ। অনেক টাকা ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা হাবিব (বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক) ব্যাংকে। কিন্তু সে টাকার মালিক তো মুজিবুর রহমান-দেবদাস নয়। স্বাধীনতার পর দু এক বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জুবেরী হাউসে অবস্থানের সুযোগ পান। তারপর একদিন কৌশলে তাঁকে উৎপাটিত করে পাঠানো হলো হেমায়েতপুর মানসিক হাসপাতালে। সেখানে তাঁর চিকিৎসার কোন পরিকল্পনাই কারো ছিল না। তাই দুদিন পরই তাঁকে পথে নামতে হলো। তিনি ফিরে এলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ফটক তাঁর জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে গেছে। জুবেরী ভবনে সুস্থ ভদ্রজনের পাশাপাশি এমন একজন ব্যতিক্রমী মানুষের কি স্থান হতে পারে! পাকিস্তানী জল্লাদের হাতে শহীদ হয়ে গেলে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের স্মৃতির উদ্দেশে না হয় প্রতি বছর পুষ্পমাল্য অর্পণ করা যেতো এবং তাঁর প্রতিপাল্যের ভরণ পোষণ বাসস্থান ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ নিশ্চিত হতো। কিন্তু তাঁর দুভার্গ্য তিনি জীবন্ত শহিদ। তাই আজো তিনি পথে পথে ঘুরছেন। বাংলাদেশের মাটিতে তিনি ঠাকানাবিহীন। একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ শহিদের হিসাব কেবল আমরা জানি, জীবন্ত শহিদের কোন পরিসংখ্যান আমদের জানা নেই।

এই মহান মানুষটির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
10984042_840489929341922_5266780394732514137_n
ছবি কৃতজ্ঞতায়-International Crimes Strategy Forum

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. নশ্বর জুন 30, 2015 at 12:34 অপরাহ্ন - Reply

    তার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে সেজন্য ক্ষমা চেয়ে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিৎ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

  2. পামাআলে ফেব্রুয়ারী 28, 2015 at 6:56 অপরাহ্ন - Reply

    বিগত ০৯ই ফেব্রুয়ারী প্রথম এ মহান প্রতিবাদী’র কথা জানি একটি ফেইসবুক পোস্ট থেকে। জানার পর সে মন্তব্যটি আমার ভিতর থেকে অবলীলায় বেড়িয়ে এসেছিল তা ই নীচে তুলে দিলামঃ

    যারা এ অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত ছিল তাদের কেউ বেঁচে থাকলে তাদের পরিচয় উন্মোচিত করার অনুরোধ রইল সরকারের কাছে। সরকার যেহেতু উনাকে খোঁজে বের করে একুশে পদক দিতে সক্ষম হয়েছে সেহেতু তারা তার প্রতি অন্যায়কারীদেরও খোঁজে বের করতে সক্ষম হবে বলে মনে করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী তারা যেন তাদের পূর্বসুরীদের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যেমনিভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে করা ভুলের জন্য ঘটনার বহু বছর পরে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে অনেক দেশ। আর নইলে তারাও পাকিস্তানের সমতুল্য হিসেবে প্রতীয়মান হবেন। পাকিস্তানও তাদের একাত্তুরের ভুলের জন্য এখনও ক্ষমা প্রার্থনা করেনি।

  3. Banglamail24 ফেব্রুয়ারী 20, 2015 at 1:32 অপরাহ্ন - Reply

    সত্যি বেদনা দায়ক। তবে অসাধারন

  4. আদিল মাহমুদ ফেব্রুয়ারী 16, 2015 at 12:18 পূর্বাহ্ন - Reply

    মুজিবুর রহমান সাহেবের কাহিনী বাংলাদেশে ইউনিক, সম্ভবত সে কারনেই ওনার কপালে স্বাধীন বাংলাতেও জুটেছে অনেক নিগ্রহ।

    ধর্মের নামে পাক আর্মির নির্বিচার অত্যাচার নিপীড়নের প্রতিবাদে উনি পৈত্রিক নাম ত্যাগ করে দেবদাস নাম ধারনা করেছিলেন (ধর্ম পরিবর্তন করেছিলেন কিনা জানা যায় না, সম্ভবত তেমন কিছু ঘোষনা দিয়ে করেননি)। শুনতে যেমন সহজ লাগে আসলে তেমন সহজ নয়; সে সময়টা ছিল নিজেকে যথাসম্ভব সাচ্চা মুসলমান পরিচয় দিয়ে যদি জান বাঁচানো যায় সেই সময়, হিন্দু ধর্মের বহু লোক প্রানের মায়ায় মুসলমান হচ্ছিলেন। সেই সময় উনি করেছিলেন তার উলটো।

    এমন ঘটনা আর আছে কিনা জানি না।

    • সুব্রত শুভ ফেব্রুয়ারী 16, 2015 at 1:03 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,

      সত্য কথা আদিল ভাই 🙁

  5. মনজুর মুরশেদ ফেব্রুয়ারী 15, 2015 at 7:20 অপরাহ্ন - Reply

    জীবনের শেষ বেলায় পৌঁছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা এই মানুষটি এখন নিঃসঙ্গ। রাজশাহী বিদ্যালয়ের উচিত মৃত্যুর আগেই ওনাকে আবার নিয়োগ দিয়ে (সম্ভব হলে পদোন্নতিসহ) ওনার পাওনা অর্থ পরিশোধ করে দেয়া। উনি হয়তো কিছুই বুঝবেন না, তবু এতে হয়তো তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো একটু সহজ হবে, আর একজন প্রতিবাদী মানুষের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচারের কলঙ্কও এতে কিছুটা লাঘব হবে।

    • মনজুর মুরশেদ ফেব্রুয়ারী 15, 2015 at 7:22 অপরাহ্ন - Reply

      ‘রাজশাহী বিদ্যালয়ের’ জায়গায় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’ হবে।

    • গীতা দাস ফেব্রুয়ারী 15, 2015 at 9:14 অপরাহ্ন - Reply

      @মনজুর মুরশেদ,

      রাজশাহী বিদ্যালয়ের উচিত মৃত্যুর আগেই ওনাকে আবার নিয়োগ দিয়ে (সম্ভব হলে পদোন্নতিসহ) ওনার পাওনা অর্থ পরিশোধ করে দেয়া। উনি হয়তো কিছুই বুঝবেন না, তবু এতে হয়তো তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো একটু সহজ হবে, আর একজন প্রতিবাদী মানুষের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচারের কলঙ্কও এতে কিছুটা লাঘব হবে।

      সহমত পোষণ করছি।

    • সুব্রত শুভ ফেব্রুয়ারী 16, 2015 at 12:14 পূর্বাহ্ন - Reply

      @মনজুর মুরশেদ,

      বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিনত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে। -হুমায়ুন আজাদ

  6. পাতাবাহার ফেব্রুয়ারী 14, 2015 at 11:51 অপরাহ্ন - Reply

    খুবি মর্মস্পর্শী লেখা।
    বিনম্র শ্রদ্ধ্যা অধ্যাপক দেবদাস। (FF)

মন্তব্য করুন