আল্লাহ হাফিজের দেশে (২য় পর্ব)
আকাশ মালিক

বিমানের দরজা খুলে দেয়া হল, সিড়ির সামনে এসে বুক ভরে দীর্ঘ একটা শ্বাস নিলাম। আহ, আমার দেশের মাটি ও বাতাসের গন্ধটাই আলাদা। যথারীতি বিমানবালা একে একে সবাইকে আল্লাহ হাফিজ বলে বিদায় জানাচ্ছেন। দীর্ঘ সময়ের যাত্রায় প্লেইনের ষ্টাফ কেবিনে বসে কর্মচারীদের সাথে সুখ দুঃখের কিছু আলাপন হয়েছিল। সেই সুবাদে হয়তো সমস্ত পথ জুড়েই একটু আলাদা বন্ধুত্বপূর্ণ অথিতীয়তা তাদের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। বাংলাদেশ বিমানের কর্মচারীদের ব্যাপারে অনেক অভিযোগ লোক মুখে শুনেছি তবে আমি বা আমরা তাদের মাঝে এমন কিছু পাইনি। ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের লাইনে এসে আমরা দাঁড়ালাম। এমন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা নেই, প্রায় সকলের পেছনেই আমাদের স্থান হল। কুঁকড়ো চুলি এক ভদ্রলোক বড় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন। পলকের দৃষ্টিতে আমাদের পাঁচজনকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে ফলাফল ঘোষণা করলেন-

– আপনি আকাশ মালিক না?
– জ্বি।
– দেন পাসপোর্টগুলো দেন।
– কেন?
– আরে দেন না। এই দেশে ‘কেন’ কথার কোন মা’নে নাই। পাসপোর্টে সীল মারাতে হবে না?

আশ্চর্য, লোকটা বলে কী? আমার নাম জানলো কীভাবে? বউ দেখলাম তার হাতের হ্যান্ডব্যাগটা বুকে চেপে ধরলেন। এর ভেতরেই আছে পাঁচটা লাল বৃটিশ পাসপোর্ট। তিনি নিজেই মুখ খুললেন, বললেন ‘আপনার কষ্ট করা লাগবেনা আমরা নিজেরাই সীল মারাতে পারবো। কথাটা বউ ভয়ে, না কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে বললেন বুঝা গেলনা। ঠিক তখনই ছোট মেয়ে বললো- ‘আম্মু ভীষণ গরম লাগছে, আই এম ফিলিং সিক’। আমাদের শুভাকাংখী ভদ্রলোক বললেন- ‘এখান থেকে কাউন্টারে যেতে আপনাদের তিন ঘন্টা লাগবে, ততক্ষণে দুপুর গড়ায়ে সন্ধ্যা, এর মা’নে আজ আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হচ্ছেনা। এই গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কচি বাচ্চাগুলো গলে মোমবাত্তি হয়ে যাবে। এবার রাহেলা কিছুটা ভয় পেলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করেন- কী করা যায় বলুন তো। ‘ভয় পাবার কিছু নেই ভাবী, আমি আপনাদেরই লোক। আপনার ভাসুর অর্থাৎ আপনার স্বামীর বড় ভাই——আমাকে পাঠিয়েছেন, উনি আমার বন্ধু আমি পাসপোর্ট অফিসে কাজ করি’। হাসিমুখে ভদ্রলোক বউকে কনভিন্স করার চেষ্টা করলেন। ভাইয়ের নামও জানে, ভাবছি বিষয়টা কী? ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এক পা জায়গাও সামনে অগ্রসর হই নি। স্ত্রীকে বললাম, ‘পাসপোর্ট আমার কাছে দাও আর বাচ্চাগুলোকে শক্ত করে ধরে রাখো যেন কেউ হাত ছাড়া না হয়, আমি একটু দেখি’। আমার হাতে ধরে এক প্রকার টেনে টেনে দ্রুত বেগে ভদ্রলোক কাউন্টারের ভেতরের লোকটির মুখের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। মৃদু স্বরে বললেন-

– দেন স্যার, তাড়াতাড়ি দেন। অনেক দূরের যাত্রী সন্ধ্যার আগে বাড়ি পৌছুতে হবে, সঙ্গে বাচ্চা আছে।
– তোমাকে না বললাম এত ঘন ঘন এসোনা। আধা ঘণ্টার মধ্যে তিনবার আসলে—
– স্যার এই শেষ, আজ আর আসবোনা, দেন তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন।

লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলো কেউ হয়তো জানতে পারছেন না সামনে কী নাটক প্রতি মুহুর্তে মঞ্চস্থ হয়ে যাচ্ছে তবে কয়েকজন দর্শক দেখলাম মঞ্চের সন্নিকটে স্বশরীরে উপস্থিত দাঁড়িয়ে প্রতিটি পর্ব বেশ তৃপ্তি ও মনযোগ সহকারেই উপভোগ করছেন। তারা আমাদের দেশপ্রেমিক, পুলিশ সমাজের সুযোগ্য সদস্যবৃন্দ। ইংল্যান্ড থাকতেই বিমানবন্দরের দূর্নীতি আকাম কুকামের কথা বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে শুনেছিলাম। মনে মনে প্লান করেছিলাম বিমান থেকে বের হয়েই ভিডিও ক্যামেরা অন করবো আর দেখবো মানুষ এ সব করে কী ভাবে? সব কিছু ক্যামেরায় ধারণ করে একদিন ক্যাসেটটি দূর্নীতি দমন কমিশনের কাছে জমা দিয়ে আসবো। সেই আমিই বাংলার মাটিতে নেমে প্রথম যে কাজটি করলাম সেটি একটি অন্যায় কাজ হলো। পেছনে সারিবদ্ধ লোকের দিকে তাকিয়ে ভীষণ লজ্জা পেলাম নিজেকে বড় অপরাধী মনে হল। কাজটা মোটেই ঠিক হয় নি। আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ়, এই প্রচন্ড ভীড় এই আসহনীয় গরমের মাঝে, ছোট মেয়ে রস্তায় বমি করার উপক্রম এমন অবস্থায় কী করা যায়, কী বলা যায়? এক প্রকার চোখ বন্ধ করেই অফিসার সাহেব খপ খপ করে সীল মেরে পাসপোর্টগুলো লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, ‘যাও আজ আর এসোনা’। লোকটি বললো, ‘স্যার, আল্লাহ হাফিজ’।

সেখান থেকে আমাদেরকে এসকর্ট করে নিয়ে আসা হলো ল্যাগেজ কালেকশন রুমে। এখানে এসে আমাদের হীতাকাংখী ভদ্রলোক বললেন, ‘ভাইয়া এবার আমাকে চা নাস্তার জন্যে কিছু বিদেশী টাকা দিয়ে বিদায় দিন’। কথাটা আমার কানে যতটুকু পরিষ্কার শোনালো তার চেয়ে একটুও কম শোনেন নি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের ইউনিফর্ম পরা দু জন লোক। বোকার মত হা করে তারা যেন দূর্বোধ্য ভাষার কোন ছবি দেখছেন। ঝড়ের বেগে এক ভদ্রলোক আমাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। বিরাট চিন্তিত চেহারায় শুধালেন-

– এখানে করছোটা কী? তাড়াতাড়ি বের হয়ে এসো, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছেন।
– আমাদের ল্যাগেজ?
– আরে ধুর, থও ফালাইয়া তোমার ল্যাগেজ। বাচ্চাগুলো নিয়ে এই গরম থেকে বের হও।
– আপনাকে চিনলাম নাতো?
– চোখ বড় হয়ে গেলে মানুষ চেনা কঠিন হয়ে যায়। চেনা জানা পরে হবে, টিকেট দাও, ল্যাগেজের ভার আমার উপর ছেড়ে দিয়ে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা করো। সন্ধ্যা হয়ে গেলে রাস্তাঘাটে অসুবিধে আছে।
– সন্ধ্যা হলে রাস্তায় সিংহ বাঘ বেরিয়ে পড়ে বুঝি?

বউয়ের প্রসন্ন চেহারা সাক্ষী দিচ্ছে তিনি মানুষটাকে চিনতে পেরেছেন। কানে কানে আমাকে বলেন ‘মনে হয় উনি আমাদের বদরুল ভাই’। আমি বললাম-

– তুমি বদরুল?
– এতক্ষণ লাগলো চিনতে? তোমাকে চিনতে আমার এক সেকেন্ডও লাগেনি।
– আমার ছবি, আই ডি, প্রোফাইল সব বুঝি বড় ভাই তোমার হাতে দিয়ে পাঠিয়েছেন?
– আরে ভাই আমরা বাতাসের গন্ধ শুঁকে মানুষের চেহারা চিনতে পারি।
– তাই? তা তোমার এই অবস্থা কেন? সফদার ডাক্তার হয়ে গেলে কবে? মাথায় টাক, হেই মোটা পেট, গাল ভরা দাড়ি, এ সব কী?
– সব বলা হবে, আগে বাড়ি যাও।
– শুনলাম তুমি নাকি একবার সৌদি আরব ছিলে?
– কাফিরের দেশ।
– সৌদি আরব কাফিরের দেশ?
– হুম। কিং ফুয়াদের জেলখানা। মানুষ নয় সব বেদ্বীন। বেদ্বীনের দেশে মানুষ থাকে? আকামা ছিড়ে ফেলেছি। ওরা নামে মুসলমান, নিজের দেশে ভালই আছি।
– তো, কী করো এখন?
– তোমাদের মত মানুষের খেদমত করি।
– এটা তোমার জীবিকা?
– আরে ভাই, তোমাকে কিচ্ছু দিতে হবেনা, তোমার বড় ভাই সব বন্দোবস্ত করে রেখেছেন। আচ্ছা পাসপোর্টে সীল মারাতে ঐ লোকটিকে কোন পাউন্ড ডলার দাও নি তো? ও আমাদেরই লোক, তার পাওনা তাকে আগেই দিয়ে রেখেছি।

চারদিক তাকিয়ে দেখি সেই লোকটি নেই। আল্লাহ হাফিজ না বলেই চলে গেল? গেইটের সামনে এসে দেখি বড় ভাই, ভাবী, ছোট বোন সবাই আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। সামনেই একটি মিনি-কোচ, তাদের ভাষায় মাইক্রোবাস। বাহিরে এসে বুঝতে পারলাম জোট সরকারের উন্নয়ণের জোয়ারে দেশীয় সংস্কৃতির অনেক কিছুই উধাও হয়েছে, কিন্তু এয়ার্পোর্টের আর রাস্তার ভিখারীগুলো মোটেই উধাও হয় নি। পঁচিশ বছরে আমার দেশ একটুও বদালায় নি, অন্তত এয়ারপোর্ট যে বদলায়নি তা নিশ্চিত বলতে পারি। লিকলিকে দেহের, খালি গায়ে ময়লা হাফ প্যান্ট পরা, বুক থেকে অর্ধহস্ত উঁচু পেটের এই মেয়েটিকেই তো এখানে পঁচিশ বছর আগেও দেখেছিলাম। ঐ তো ফোকলা দাঁতের, ধুলো মাখা চুলে, গামছা পরা অর্ধাবৃত শরীরে সেই বুড়ি। সবই তো আগের মতই আছে। কিছুই বদলায় নি। গেইট থেকে মাইক্রোবাস পর্যন্ত, এয়ার্পোর্টের গর্ব ও শোভা বর্ধনকারী ভিক্ষুকেরা আমাদের ধার ভিড়তে পারেন নি, আত্মীয়রা ঘেরাও করে রাখার কারণে। কোচে উঠার সাথে সাথে কমপক্ষে দশ-পনেরোটা হাত এক সাথে ধপা ধপ কোচের জানালায় এসে পড়লো। বড় ভাই সিংহের মত হুংকার দিয়ে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। যে ভাষাকে আমরা ইংরেজিতে ষ্ট্রং ল্যাঙ্গুয়েজ বলে থাকি তাও ব্যবহার করলেন। ভাই যতই ধমকান না কেন , আল্লাহর নাছোড় বান্দারা পণ করেছেন তারা খালি হাতে ফিরে যাবেন না। ইতোমধ্যে ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। পাশে বসা বড় মেয়ে বললো, ‘আব্বু লুক, সি ইজ সো টাইনি’। ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করে, ‘ আম্মু, এরা খুব গরিব মানুষ বুঝি’? ৫ / ৬ বছরের একটি মেয়ে অনেক্ষণ ঝাপ্টা ঝাপ্টি, ঠেলা ঠেলি করে জানালায় ঝুলে কোন রকম তার একটি হাত গাড়ির ভেতরে ঢুকাতে সক্ষম হয়েছে। একটা পাউন্ড তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি তাড়াতাড়ি বলো আল্লাহ হাফিজ, অন্যতায় এক্ষুণি গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যাবে।

Untitled

দুপুর গড়িয়ে সূর্য এখন পশ্চিমাকাশে কিঞ্চিত হেলে পড়েছে। ডানে বামে সবুজের মেলা, বিস্তৃত ফসলের মাঠ, কলা পাতায় ঘেরা ছোট ছোট্ট ঘর, টিলায় টিলায় চা বাগান, এ সব পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি চলেছে বাতাসের বেগে। অলস দুপুরে নিশ্চিন্ত মনে রাস্তার দু পাশে কোথাও গরু কোথাও ছাগল বিশ্রাম নিচ্ছে। শহরের কাছাকাছি আসার পর দেখা গেল কিছু দোকান পাট। ছোট্ট বাজারই হবে। অজুহাত খুঁজছি ড্রাইভারের সাথে কথা বলার জন্যে। বাজারের ভেতরে এসে ড্রাইভার সাহেব গাড়ির স্পিড কিছুটা কমাতে বাধ্য হলেন। এক পর্যায়ে থামতেই হল। কোন এক মিলাদ মাহফিল নাকি তাফসির মাহফিলের মিছিল রাস্তা পার হবে। দু একটা কুকুর দোকানের পাশে ঘুরাঘুরি করছে, এরা বোধ হয় মিটিং মিছিল করে কারো রাস্তা আটকায় না। সুযোগ পেয়ে ড্রাইভার সাহেবকে বললাম-

– পূর্ব জনমে বিমানের পাইলট ছিলেন বুঝি? কত মাইল স্পিডে এতক্ষণ গাড়ি চালালেন বলে আপনার মনে হয়?
– জানি না, মিটারের কাঁটা তো নড়ে চড়েনা, জিরোতে পড়ে আছে আজ বহুদিন।
– আপনি কম হলেও ষাট মাইল স্পিডে গাড়ি চালিয়েছেন।
– আপনাদের দেশে তো শুনেছি, আরো বেশী স্পিডে গাড়ি চলে।
– ‘আপনাদের দেশ’ মা’নে, আমি বিদেশী? এখন থেকে গাড়ি বিশ মাইলের ওপরে নিবেন না। আর আল্লাহর ওয়াস্তে হোর্ণ থেকে হাতটা সরায়ে রাখবেন। অনবরত পেঁ পেঁ বাজাবেন না, কানে ধরে বুঝেছেন?
– জ্বি আচ্ছা।

পেছন থেকে বড় ভাই ভাবীকে ফিসফিস করে বলেলেন-‘শুনলে তার ভাষা, ড্রাইভারের সাথে কী ভাষায় কথা বললো’? গলা বাড়িয়ে আমাকে বললেন ‘ও আমাদের গ্রামের মফিজুদ্দির বড় ছেলে কমরুদ্দিন, বয়সে তোমার অনেক ছোট হবে’। বুঝলাম ভাই বলতে চাইছেন আমি যেন ড্রাইভারের সাথে প্রথাসিদ্ধ ভাষায় কথা বলি। আমাদের ভাষাবিদগণ শ্রেণী বৈষম্যের কথা মাথায় রেখেই বুঝি ভাষাটাকে এমন ভাবে সাজিয়েছিলেন। মানুষের ষ্ট্যাটাস, কর্ম, জাত, ও বয়স ভেদে তুই, তুমি, আপনি, আয়, আসো, আসুন, কি চমৎকার শ্রেণী বিন্যাস। ইংরেজিতে ‘ইউ’ আর ‘কাম’ দিয়েই কাজ চলে যায়।

আম্বরখানা থেকে গাড়ি এবার জিন্দাবাজারের সীমানায় এসেছে। সিলেট শহরের এমন কোন অলিগলি নেই যেখানে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াইনি। আজ সবই যেন চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা। একদিন আম্বরখানা চৌহাট্টা রাউন্ড এবাউটে আম্বার লাইট ছাড়াই একটি ট্রাফিক লাইট ছিল। এর এক পাশে একটি আমগাছের নিচে বসে একজন লোক লাল-সবুজের বোতাম টিপে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতেন। সেই লাইটটা তো নেইই, সারা সিলেট শহরে কোন ট্রাফিক লাইট খুঁজে পেলাম না। স্বাধীনতার পঁয়ত্রিশ বছরে এই পেয়েছে সিলেটবাসী? বদরুদ্দিন কামরান, এস এম কিবরিয়া, হুমায়ুন রশিদ, আব্দুস সামাদ আযাদ, জেনারেল ওসমানী, সাইফুর রহমান, এই সিলেটেরই সন্তান। ড্রাইভারকে আর বিশ মাইল স্পিডে গাড়ি চালাতে হয় নি। গাড়ি এখন চলছে শামুকের গতিতে। জিন্দাবাজার পেরুতে হেঁটে পাঁচ মিনিট লাগার কথা, গাড়িতে লাগলো পঁচিশ মিনিট। সম্পূর্ণ সিলেট শহর রিকশার দখলে। হাসান মার্কেটের মাথায় এসে দেখলাম, শেষ বিল্ডিংটির দেয়ালে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাহেবের বিরাট এক ছবি। মন্ত্রী দুহাত ওপরে তোলে আল্লাহর কাছে সিলেটের মঙ্গল ও উন্নয়ণের জন্যে প্রার্থনা করছেন। ছবির নিচে দোয়া লেখা আছে, দূর থেকে দোয়াটা স্পষ্ট পড়া যাচ্ছেনা। তবে সারমর্মটা মুটামুটি বুঝেছি। বাংলাদেশ বিমানের ওডিও টেইপের দোয়ার সারমর্ম ছিল ‘তুমি মারো তুমি বাঁচাও’ আর দেয়ালের পোষ্টারে টাকা-মন্ত্রীর দোয়ার সারমর্ম হল ‘তুমি খাওয়াইলে আমরা খাই’। টাকা যদি আল্লাহর কাছ থেকে না আসে তাহলে অর্থমন্ত্রীর তো কিছু করার নেই। ভন্ডামীরও একটা সীমা আছে। কল্পনা করা যায় ইউরোপের কোন দেশে, রাস্তার দেয়ালে টাঙ্গানো অর্থমন্ত্রীর এমন ছবি? লক্ষ্য করলাম, প্রত্যেকটা যানবাহনের সামনে পেছনে কিছু না কিছু নীতিবাক্য লেখা আছে। ওগুলো আগেও ছিল বিশেষ করে রিকশায় ও দূরপাল্লার ট্রাকে বা কোচে। ‘এলাহী ভরসা’ ‘আল্লাহর নামে’ ‘খোদা হাফিজ’ ‘আল্লাহর দয়া’ ‘মায়ের দোয়া’ ইত্যাদি। এবার দেখলাম বেশ কিছু নতুন জিনিস যোগ হয়েছে যেমন, ‘আপনার শিশুকে ইসলামি শিক্ষা দিন’,‘আল্লাহ হাফিজ’ ‘শালীনতা ঈমানের অঙ্গ’ ইত্যাদি। একটি বেবিট্যাক্সির পেছনে লেখা একটি বাক্য দেখে আঁতকে উঠলাম। ‘আপনার মেয়েকে মাদ্রাসায় পাঠান’ আর নিচে লেখা ‘সৌজন্যে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ,জিন্দাবাজার সিলেট’। এই বাক্যটা দেখে আসলেই ভয় পেয়েছিলাম। তাহলে বাংলাদেশ কি তালেবান রাষ্ট্র হয়েই গেছে? জগতের শ্রেষ্টতম দূর্গন্ধের নর্দমার পাড় ঘিরে বাসা বাড়ির দীর্ঘ দেয়াল। দেয়ালে দেয়ালে ছাপার অক্ষরে লেখা দুনিয়ার সকল চিরন্তন বাণী, সাথে কোরান আর হাদিস। সুরা ইয়াসিনের কোন আয়াত পড়লে কোন বালা মুসিবত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, কোন আয়াত ফসল বৃদ্ধির কাজে লাগে আর কোন আয়াত কীটনাশক ঔষধের কাজ দেয় তাও লেখা আছে। নিচে ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা-‘সৌজন্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন’। এবার বুঝলাম সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্মের ভুত ঢুকেছে, পচন ধরেছে রাষ্ট্রের মাথায়। আরেকটা মিছিল আসবে বোধ হয় মাইকের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। না, মিছিল নয় মাইকিং করা হচ্ছে সিরাতুন্নবি মহা সম্মেলন হবে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে।

বড় ভাই বললেন, হোটেল বুক করা আছে সেখানে এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে আছরের নামাজের পরে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়া হবে। হোটেলে ঠান্ডা সফট ড্রিংক পান করে শীতল বাতাস পেয়ে অল্প সময়ে ছেলে মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লো। বউ ইতোমধ্যে তার বড় বোনের বাসায় ফোন করে আমাদের আগমনের কথা জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং অনুমান করলাম আপা আসবেন, এক ঘণ্টার মহিলা অধিবেশন বসবে। এখানে বসে থাকলে আমাকেও ক্ষণে ক্ষণে গাইতে হবে-‘ওলো সই, তোদের এত কী যে আছে বলার ভেবে অবাক হই’। ড্রাইভার কমরুদ্দিন এসে বললো, এই সুযোগে আধ ঘণ্টার জন্যে সে তার অসুস্থ ভাবীকে দেখতে মেডিকেল যাবে। আমি বললাম, চলো আমিও তোমার সাথে যাবো। ওসমানী মেডিকেল হসপিট্যালের গেইট পেরিয়ে প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পাশের দেয়ালে ঝুলানো জনৈক পীর সাহেবের একটি বিজ্ঞাপনের দিকে চোখ পড়লো। সন্তান না হওয়া, জ্বীন পরীর আছর, যাদু-টোনা, বাণ মারা, ব্যবসায় লোকসান, চাকুরী না পাওয়া, পরীক্ষায় ফেল করা, স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য, পরকিয়া প্রেম, মনের মানুষ অবাধ্য, সন্তান অবাধ্য, দুনিয়ার এমন কোন রোগ ব্যাধী, এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান পীরের কাছে নেই। বিজ্ঞাপনটি ছিল নিম্নরূপ, যদিও এটি সেই বিজ্ঞাপন নয়।

piraki

একটি হাসপাতালের দরজার সামনে এমন বিজ্ঞাপন আল্লাহর দুনিয়ায় আর কোন দেশে আছে কি না আমার জানা নেই। হাসপাতালের ভেতরের অবস্থা কল্পনা করলে আজও আমার গা শিহরিয়া ওঠে। আমাদের ড্রাইভার হসপিট্যালের রিসেপশনিষ্টকে জানালেন যে তিনি ওপরে তার ভাবীকে দেখতে যাবেন। রিসেপশনিষ্ট বললেন-‘সামনে যান দরজায় লোক আছে, দেখিয়ে দিবে’। দরজায় গিয়ে দেখি খাকি পোষাক পরা ছড়ি হাতে পুলিশের মত ত্রস্ত-ব্যস্ত একজন মানুষ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয় আবার কাউকে দেয় না। আমাদেরকে দেখে বললো-‘রিসেপশন কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে আসুন’। ফিরে এলাম রিসেপশনে। বললাম,‘ দরজার উনি তো টিকেট ছাড়া ঢুকতে দেয় না। এই মানুষটি ওপরে তার ভাবীকে দেখতে যাবে টিকেট দিন’। রিসেপশনিষ্ট বললেন ‘এখানে টিকেট দেয়া হয় না, আপনারা তার কাছেই যান’। আমি বললাম,‘আশ্চর্য, আপনি বলেন তার কাছে যেতে, সে বলে আপনার কাছে আসতে বিষয়টা কী সাহেব’? দুষ্ট একটা হাসি ঠোঁটে তুলে উনি বললেন- ‘বিষয়টা বুঝেন না লন্ডনী সাহেব? নুতন এসেছেন বুঝি? গরীব মানুষ, দারোয়ানের কাজ করে। দশ-পাঁচটা টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়ে ওপরে চলে যান। পয়সা কড়ি হাতের ময়লা আজ আছে তো কাল নাই’। আমি একটু উচ্চস্বরেই বললাম ‘ঘুষ চাইছেন’? উনি বললেন ‘আরে না, একটু আস্তে বলেন, ঘুষ না বকশিস। আমার না খেলে চলে কিন্তু ওর চলেনা। এখানে ভিড় জমায়ে সময় নষ্ট করে লাভ নাই। সবই আল্লাহর ইচ্ছে, আশা করি অনেক দূর থেকে এসেছেন রোগী না দেখে যাওয়া ঠিক না। যান ওর কাছে যান, আল্লাহ হাফিজ’। ড্রাইভার কাতরচোখে আমার দিকে তাকায়। দরজায় ফিরে গিয়ে লোকটাকে বললাম ‘আমার কাছে বাংলাদেশী টাকা নেই, একটা পাউন্ড আছে নিবেন’? হ্যাঁ না কিছু না বলে, চিলের মত খপ করে আমার হাত থেকে পাউন্ডটা এক রকম কেড়ে নিয়ে বললো-‘তাড়াতাড়ি যান’। আল্লাহ হাফিজ, শয়তান হাফিজ কিচ্ছুই বললোনা। পিপীলিকার মত ব্যস্ত মানুষটা। দরজার সামনে ভিড় ঠেকানো তার দায়ীত্ব। সকলে সহজে ঘুষ দিতে চায় না সুতরাং ভিড় জমেই থাকে।

ওসমানী মেডিকেল থেকে হোটেলে যখন ফিরে এসেছি তখন ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। বিষ্ময়ভরা চোখে দেখছে বাংলাদেশের রূপ, রঙ ও মানুষকে। এ দিকে বউ তার পঁচিশ বছরের কানাকানি পঁচিশ মিনিটে শেষ করে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখনই শোনা গেল, এক সাথে কুদরত উল্লাহ মসজিদ, তালতলা মসজিদ, দরগাহ মসজিদ, ঈদগাহ মসজিদের মিনার থেকে আজানধ্বনি ভেসে আসছে। বড় ভাই বললেন ‘তোমরা গাড়িতে উঠতে উঠতে আমি আছরের নামাজটা সেরে আসি’। গাড়িতে ষ্ট্রাট দিয়েই ড্রাইভার কমরুদ্দীন তার ক্যাসেট প্লেয়ার অন করে দিল। প্রথম গানটা ছিল গিয়াস উদ্দিনের লেখা সিলেট বেতারের প্রখ্যাত শিল্পী বিদিত লাল দাসের কণ্ঠের-

‘ তোরা শোন্ সেই আজানধ্বনি আইজও হইতাছে
যে ধ্বনিতে পাথর গইলা পানি হইয়াছে,
সিলেট পরথম আজানধ্বনি বাবায় দিয়াছে—-।।

এক সময় সিলেট বেতার কেন্দ্রের গানের ভুবনে মেয়েদের মধ্যে চারজন কণ্ঠশিল্পীর একচেটিয়া রাজত্ব ছিল। আরতি ধর, ইয়ারুন্নেসা, আমিরুন্নেসা ও শুক্লা দে আর পুরুষদের মধ্যে বিদিত লাল দাস, হিমাংসু বিশ্বাস, সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগীর সুরকার রামকানাই দাশ আর সুনামগঞ্জের শুকাইর জমিদার বাড়ির সন্তান কণ্ঠশিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরী। সিলেটের আঞ্ছলিক ভাষায় বিয়ের গান আর হাসন রাজার গান এরাই সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। নাট্যাভিনেত্রীদের মধ্যে জনপ্রীয় ছিলেন, আয়েশা আখতার, দিলারা বেগম ও রাবেয়া খাতুন দুলু। হাইস্কুল জীবনে তেহাত্তর সালে খুব অল্প সময়ের জন্যে তাদের সাথে কিছু নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুবাদে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সাতাত্তর সালে খান আতা, আলী আসগর, সাবিনা ইয়াসমিনের দলের সঙ্গী হয়ে আসা ইয়ারুন্নেসার সাথে দেখা হয়েছিল লন্ডনের একটি থিয়েটারে। আর একই সালে মোহাম্মদ রফির দলের সাথী হয়ে আসা নির্মলেন্দুকে দেখেছিলাম নিউক্যাসেলের একটি সিনিমা হলে। সিলেটের মাটিতে এসে বিদিত লাল দাসের কণ্ঠে আজ এই গানটা শুনে মনটা আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলো। কত অনুষ্ঠানে এই গান সমেবেত কণ্ঠে গেয়েছি। গানটি যতক্ষন চলছিল আমি ততক্ষণ সেই হারানো দিনগুলো খুঁজছিলাম, আর মনে মনে গাইছিলাম- ‘দিনগুলো মোর সোনার খাঁচায় রইলোনা’।

চলবে-

নোটঃ (সকল ছবি ও ভিডিও চিত্র ইন্টারনেট থেকে নেয়া শুধুমাত্র উদাহরণ হিসেবে)

৩য় পর্ব-

১ম পর্ব-

[444 বার পঠিত]