আল্লাহ হাফিজের দেশে

আকাশ মালিক

(প্রায় আট বছর পূর্বের অসমাপ্ত এই লেখাটির প্রাসঙ্গীকতা অনেকটাই এখন হারিয়ে গেছে। পরিবেশ, পরিস্থিতি ও সময়ের পরিবর্তনে কাহিনির আকর্ষণ, তার আবেদন অনেকটা হারিয়ে যায়। সিরিজটি শেষ করবো বলে একদিন যাদেরকে কথা দিয়েছিলাম তাদের সম্মানার্থে কিছুটা পরিবর্তন পরিবর্ধন করে আজকের এই লেখাটি। )

দ্বিতীয়বারের মত বাংলাদেশে যাবো। এবার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। এর আগে একবার গিয়েছিলাম, তখন বাংলাদেশ সবেমাত্র কৈশোরে পদার্পণ করেছে। কিশোর বাংলাদেশকে ততদিনে জিয়াউর রহমান সাহেব খতনা করায়ে মুসলমান বানিয়ে দিয়েছেন। সল্প সময়ে জিয়ার খাল কেটে কুমীর আনা ও রাস্তার কুকুর মেরে শহর উন্নয়ণের নমুনা দেখেছি। জিয়া খুন হওয়ার পরবর্তি মাসে ইংল্যান্ড ফিরে আসি। এরপর কাঁধে সংসারের ঘানি অন্তরে দেশে ফেরার বাসনা, এভাবেই চলেছে সুদীর্ঘ পঁচিশ বৎসর। এই পঁচিশটি বছরের প্রতিটি দিবস প্রতিটি রজনী স্বপ্ন দেখেছি, আমি একদিন ফিরে যাবো আমার জন্মভূমির মাটিতে যেখানে আমার নাড়ি পুতা আছে। দিন যত গড়িয়েছে স্বপ্নের প্রাচীর ধীরে ধীরে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়েছে। নিজেকে বিদেশী ভাবতেও আমার ভয় হয়, অথচ এটাই আজ চরম সত্য। আপন দেশে, পরদেশে সব জায়গায় আমার পরিচয় আমি বিদেশী। প্রবাসীদের বোধ হয় স্বদেশ বলতে কোন দেশ হয় না। বিদেশীরা বাড়ি যায় না, যায় বাংলাদেশে। নিজের বাড়িতে থাকার জন্যে যায় না, পরদেশে ফেরার জন্যে যায়। ২০০৬ সালে সিদ্ধান্ত নিলাম জীবনের শেষ লগ্ন এসে উপস্থিতি ঘোষণা দেয়ার আগে নুতন প্রজন্মকে শেকড়ের সন্ধান জানিয়ে দেবো। দেশে যাওয়ার প্রস্তুতির পুরো একমাস সন্তানদের সাথে ডিনার টেবিলে আলোচনার প্রসঙ্গ হলো বাংলাদেশ ভ্রমণ। ছেলে মেয়েরা স্কুল থেকে ছুটি নেয়ার সময় শিক্ষক জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় যাচ্ছো? তারা বলেছিল Going to Bangladesh, আর আমাকে জিজ্ঞেস করায় আমি বলেছিলাম Going Home বাড়ি যাব। প্রবাসীদের যে আপন কোন বাড়ি থাকেনা সেটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আসলে আমিও ভ্রমনেই যাচ্ছি, কিছুদিনের মুসাফির হয়ে।

বাংলাদেশ নিয়ে সন্তানদের জানার আগ্রহের সীমা নেই। ডিনার টেবিলে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে প্রবল ঔৎসক্য নিয়ে তারা আমার দিকে তাকায়। একজন জিজ্ঞেস করে-

– আব্বু আমরা যে গ্রামে যাবো সেটা দেখতে কেমন?
– এক্কেবারে ছবির মতন, তার মাটির তলায় রতন ছড়ানো।
– সেটা তো বইয়ে পড়েছি।
– এবার স্বচক্ষে দেখবে।
– আচ্ছা আব্বু, বাড়িতে সুইমিং পুল আছে?
– আছে মা’নে? বিরাট সুইমিং পুল, যার এক কোণায় আছে লাল শালুকের ফুল।
– সুইমিং পুলে লাল শালুকের ফুল? প্লাষ্টিকের?
– আরে না প্লাষ্টিকের। জীবন্ত, একদম লাইভ। রাতের বেলা ওরা চাঁদের সনে হাসাহাসি করে। সুইমিং পুলের অন্য কোণায় আছে কলমিলতা ফুল, আরো আছে শেওলা ঘেরা ঘাট। জীবন্ত কলমিলতা ফুল মেয়েদের খোপার শোভা বর্ধনে বেশ উপযোগী।
– আর ঘাট? সেটা কেমন হয়?
– সেটা? এর সিড়িতে বসে, জলের ওপর পা দুখানি ছড়ায়ে, সখীদের কানাকানি।
– আচ্ছা ওখানে আর কিছু নাই তো?
– আছে আছে। ঘাটের এ পাড়ে আছে সারি বাঁধা নারিকেল গাছ আর ওপারে সুপারী গাছ। আর আছে সুইমিং পুলের অর্থাৎ পুকুরপাড়ের দুই কর্ণারে দুটো কৃষ্ণচুড়ার গাছ, মাঝখানে বিশাল আকারের একটি শিমুল আর একটি কদম ফুলের গাছ।
– আর?
– আর আমাদের শোবার ঘরের পাশে আছে একটি হাসনা হেনা ও একটি কাঁঠাল চাঁপার গাছ। বাংলাদেশে এয়ারফ্রেশেনার নেয়ার দরকার নেই। রাতের বেলা ফুলের গন্ধে সারা বাড়ি মউমউ করে।
– না, আমি বলছিলাম ওখানের জলে সাপ, ব্যাঙ——
– আমি যখন দেশে ছিলাম, জলে সাঁতার কাটার জন্যে মাঝে মাঝে একজোড়া পানকৌড়ি আসতো আর প্রতিদিন ভোরবেলা একটি মাছরাঙ্গা পাখি কদম গাছের আগডালে বসে থাকতো। এখনও তারা আছে কি না জানিনা। তোমরা গেলে হয়তো ওরা ফিরে আসতেও পারে।
– তো আব্বু বাংলাদেশে আর কী কী দেখা যাবে?
– দেখবে শরতের চাঁদ, রাতের আকাশে জোনাকীর মেলা, ক্ষেতের মাঠে রাখালের বাঁশী, সবুজ ঘাস, শেফালীর হাসি, শুনবে নদীর কলতান, দোয়েলের শীষ আর কোকিলের গান।
– সব কিছু লাইভ দেখা যাবে, শোনাও যাবে?
– একদম লাইভ, তোমাদের আশে-পাশে, হাতের কাছে, চোখের সামনে। তোমরা ইংল্যান্ডে আম দেখেছো, আমের বকুল দেখোনি, এবার দেখবে। ঝিঙ্গে দেখেছো এবার ঝিঙ্গে ফুলও দেখবে। বাড়ির উঠোনের দক্ষিণ কোণে, রক্তজবা ফুলের গাছের ঠিক ডান পাশে ঝিঙ্গে ফুল ফুটে। ওখানে প্রতিদিন বিকেলে রঙ-বেরঙের প্রজাপতির মেলা বসে। আমি যখন তোমাদের মত ছোট ছিলাম, তোমাদের দাদীমা কী করতেন জানো? প্রায়ই বিকেল বেলা আমাকে বলতেন- ‘দেখতো বাবা ঝিঙ্গেফুল ফুটলো কি না’। ঐ ঝিঙ্গে ফুল দেখে তোমাদের দাদীমা আসরের নামাজের সময় বুঝতেন। বাংলদেশের ফুলগুলো দিনের ঘড়ির কাজ করে দেয়। কেউ ফুটে সকালে, কেউ দুপুরে, কেউ বিকেলে আর কেউ রাতে।
– খুব সুন্দর দেশ না আব্বু?
– অসম্ভব সুন্দর, সুন্দরের রাণী। খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর-দিঘী, গাছ-বিছালির দেশ। অপূর্ব সুন্দর একটি দেশ, এমন দেশটি আর কোথাও খুঁজে পাবেনা।
– গ্রামের বাড়িতে মসকিউটো আছে?
– মশা? না, না। শুনেছি ঐ একটা প্রজাতি বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

মনে মনে চিন্তা করি, ডিনার টেবিলে, স্কুলে আসা যাওয়ার পথে বাচ্চাদেরকে বিগত কয়দিন যাবত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে গর্বিত কণ্ঠে, বুকটা উঁচু করে যে মেসেইজটা দিচ্ছি তা মিথ্যে হবেনা তো? হঠাৎ বুকটা ধুরু ধুরু করে কেঁপে উঠে। আমি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে, যে দেশে চলেছি সেই দেশে বাংলা ভাইয়ের মত নরপশুরা বাস করে। দিনদুপুরে প্রকাশ্যে মানুষের গলা কেটে লাশ উলটো করে বৃক্ষের ডালে ঝুলিয়ে দেয়। আমি চলেছি সেই দেশে, যে দেশে মুফতি হান্নান, আব্দুর রহমান, নিজামীরা বাস করে। পত্রিকায় ওদের ছবি দেখেছি, চেহারা দেখলেই ভয় হয়, যেন এক একটা হিংস্র জানোয়ার। নতুন প্রজন্মের সামনে আমার দেশ আমাকে লজ্জা দিবেনা তো।

পঁচিশ বছরে পৃথিবী অনেক বদলেছে, বাংলাদেশও বদলাবে তা অনুমান করেছিলাম, কিন্তু এতটুকু বদলাবে তা এ দেশের সৃষ্টিকর্তারা, কোন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী, কোন গণক-ঋষীরাও বোধ হয় কল্পনা করেন নি। বাংলাদেশ বিমানে উঠেই পরিবর্তনটার কিছু নমুনা টের পেলাম।

বিমান যখন ইংল্যান্ডের মাটি ছেড়ে শুন্যে ভাসমান, ওপরে অন্ধকার আকাশ, নিচে আলোক সজ্জায় সজ্জিত পৃথিবী, মনে পড়লো সূর্যের কথা। সে এখন কোথায় আছে? তেত্রিশ হাজার ফুট ওপরে এসেছে বিমান, আরেকটু ওপরে গেলে কি সম্পূর্ণ গোল পৃথিবীটা দেখা যাবেনা? ইশ, শুন্যে ভাসমান নীল গোল পৃথিবীটা দেখতে পারলে কতইনা মজা হত। ভেবেছিলাম একবার ছোট ছেলেকে জিজ্ঞেস করি- বলতো বাবা সূর্য এখন কোথায়? কিন্তু আমি জানি সে এ প্রশ্নের উত্তর জানে। কারণ পৃথিবী যে গোল এবং শুন্যে ভাসমান তা সে স্কুলে শিখেছে। বউ অবশ্য জানেন না। তিনি জানেন সূর্য এখন এক বিশাল চেয়ারের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছে। কাল সকালে উঠতে পারে, যদি দরখাস্ত করে অনুমতি পায়। না পেলে এই শেষ আর দেখা হবেনা। সাধারণত ট্রেইন বা প্লেন ছেড়ে দেয়ার পর প্রথমে লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান বলে যাত্রীদেরকে ওয়েলকাম জানানো হয়, কেবিন ক্রু, চালকের নাম, সময় সূচী ও অন্যান্য বিষয়াদীর কথা ঘোষণা দেয়া হয়, বাংলাদেশ বিমানে সেটা হলোনা। হঠাৎ আচম্বিতে হিরা পর্বতের গুহায় জিব্রাইলের কণ্ঠস্বরের মত কানে আওয়াজ আসলো- সুবহানাল্লাজি সাখখারা লানা হা-জা ওমা কুন্না লাহু মুকরিনিন——————আল্লাহুম্মা ইন্না নাসয়ালুকা ফী সাফারিনা হা-জাল-বিররা ওয়াত্তাকওয়া———। দোয়া আর শেষ হতে চায়না, অনেক লম্বা দোয়া সাথে বাংলা অনুবাদ। এ কোথায় এসেছি আমি, কোথায় চলেছি? অনুমান করেছি আওয়াজটা কোন ওডিও ক্যাসেটে পূর্ব থেকে ধারণ করা। ভয় পাওয়ার মত স্বর্গীয় বাণীর সাউন্ড এফেক্ট। পুরুষ না নারীকণ্ঠ ছিল তা আজ আর মনে নেই। পত্রিকায় পড়েছিলাম, লঞ্চ ডুবে মানুষ মরলে এ দেশের মন্ত্রী নাকি বলেন, আল্লাহর মাল আল্লায় নিছে, তার একটু প্রমাণ হলো এই দোয়া। অসুবিধে কিছু ঘটলে নিয়তি আর আল্লাহকে দোষ দেয়া যাবে। এর আগে বেশ কয়েকবার লোক্যাল ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করেছি কিন্তু এই দোয়া শুনানো হয়েছিল বলে মনে পড়েনা। ভাবছি সময় মত আজানও হবে নাকি? এখন কিবলা কোনদিকে হবে? কা’বা তো আমাদের নিচে। একজন এয়ার হোষ্টেসকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, শাহনাজ রহমত উল্লাহর সেই গানটা নাই – ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’? বেচারী পলকহীন চোখে রোবট হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন আমি এমন অশ্লীল কিছু বলে ফেলেছি যা মুখে উচ্চারণ করা যায় না। শুকনো গলায় আমার সন্তানদের দিকে ঈঙ্গীত করে জিজ্ঞেস করলেন-

– এই চাঁদের হাট আপনার?
– জ্বী, আমাদের। আসমান থেকে নিয়ে এসেছি।
– বাংলা জানে?
– একদম রাবীন্দ্রীক বাংলা।

আর কোন কথা না বলে, ঠোঁটে অকৃত্রিম এক ঝলক বিশুদ্ধ বাঙ্গালী হাসি তোলে বিমানবালা প্রস্থান করলেন।

ভোর চারটায় দুবাই এয়ার্পোর্ট বিমান অবতরণ করলো। অনেক দিন হয় এমন ঊষার আলো দেখিনি। প্রভাতের আকাশের দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে আছি সূর্যটাকে দেখার আশায়। বউ বললেন ‘ওঠোনা? এক ঘণ্টা থামবে বিমান, একটু বাইরে ঘুরে আসি’। বলা বাহুল্য এই ‘বাইরে ঘুরে আসি’ মা’নে আশে পাশে শপিং সেন্টারের আলামত পাওয়া গেছে। ইমামের সাথে জামাতে নামাজ পড়লে যদি অতিরিক্ত পূণ্য হয়, তাহলে বউয়ের সাথে জামাতে শপিং করা পাপ হওয়ার কথা। সময়ের এত অপচয় আর কোন কাজে বোধ হয় নারীরা করেন না।

রাঙ্গা ঠোঁটে ট্রেইনিং করা কৃত্রিম হাসি তোলে বিমানবালা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দুবাই যারা নামবেন তারা একজন একজন করে ল্যাগেজ হাতে বেড়িয়ে যাচ্ছেন আর বিমানবালা বলছেন ‘আল্লাহ হাফিজ’ ‘আল্লাহ হাফিজ’। ভাবলাম সকল চলে গেলে একবার জিজ্ঞেস করবো, এই ‘আল্লাহ হাফিজ’ কার আবিষ্কার, কোন সময় থেকে এর প্রচলন শুরু। কিন্তু বউয়ের যন্ত্রণায় আর পারা গেলনা।

দুবাইয়ের আকাশ ছেড়ে দেয়ার পর মনটায় কেমন জানি প্রচন্ড উচাটন শুরু হল। সময় যেন শেষ হতে চায় না। সম্পূর্ণ বাংলাদেশের মানচিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। এই আবেগ, উচ্ছাস, এই উত্তেজনা কাউকে বলা যায় না, বুঝানো যায় না। মনে পড়লো মরুতীর্থ হিংলাজ ছবির হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সেই মায়া ভরা গানটি-

পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো
বলো কবে শীতল হবো, কত দূর আর কত দূর বল মা?

সকাল দশটায় বিমান বাংলাদেশের আকাশের অনেক নিচে নেমে এল। সিলেট পৌছুতে আরো আধ ঘণ্টা বাকি। জানালা দিয়ে পুরো দেশটা দেখার চেষ্টা করছি। মেঘমুক্ত নীল আকাশের নিচে বিস্তৃত সবুজ গালিচা, তার ওপর মাঝে মধ্যে আঁকা বাঁকা নদীর জলরেখা, যেন সারা দেশ জুড়ে বিছানো একখানা নকসী কাঁথা। এই খাল-বিল, নদী-নালা, ঝোপ-ঝাড়, এই বালিচর, এই আকাশ আমার একান্ত আপন, এরাই আমার জন্মের পরিচয়।

বিমান অনেক নিচে নেমে এসেছে, এখন মানুষ দেখা যাচ্ছে কিন্তু খুব ছোট্ট ছোট্ট। দু একটা গরুও। ইটের ভাট্টা, শনের ছাউনির কুঁড়ে ঘর, নদীর জলে রবি ঠাকুরের খেয়া পাতার ছোট্ট ছোট্ট নৌকা, লাঙ্গল কাঁধে লুঙ্গী পরা মানুষ, শষ্য নাকি শবজির ঝুড়ি মাথায় রমণী, ধান ক্ষেতের আলের উপর ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে সম্ভবত উনি গৃহস্থ হবেন। আহা! পাইলট মশাই হঠাৎ বিমানের স্পিড এত বাড়িয়ে দিলেন কেন? এ স্বর্গীয় দৃশ্য দেখার জন্যে সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর অপেক্ষা করেছি। এত তাড়া কিসের, একটু ধীরে নামলে ক্ষতি কী? ক্ষণিক পরেই ত্রিপদী বিমান সিলেটের মাটিতে তার পেছনের পা দুখানি রাখলো আর আমার মনে হল যেন শিশুকালে হারানো মায়ের বুকে এই প্রথম মাথা রাখলাম।

চলবে-

২য় পর্ব-

By | 2015-02-26T17:33:00+00:00 January 27, 2015|Categories: স্মৃতিচারণ|15 Comments

15 Comments

  1. শফি আমীন January 27, 2015 at 6:54 pm - Reply

    অপেক্ষায় থাকলুম পরবর্তী অংশের জন্যে…।

  2. মণিকা রশিদ January 28, 2015 at 1:03 am - Reply

    প্রথম যখন ‘খুদা হাফিজ’ এর পরিবর্তে ‘আল্লা হাফিজ’ শুরু হলো, আমি সবে সংসারজীবন শুরু করেছি। এই দুই শব্দের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছিলো। একজন বলেছিলেন- ফার্সি ভাষাভষি মানুষেরা যেহেতু শিয়া- এবং সুন্নী মুসলমানরা তাদেরকে অনেকটা অমুসলমানই মনে করেন তাই প্রকৃত আরবী শব্দ দিয়ে ‘খুদা’ শব্দটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সে যাই হোক- আমাকে সারাজীবনে এই দুটো এক্সপ্রেশানের কোনোটাই ব্যবহার করতে হয়নি। ব্যবহার করার সুযোগ এলেও আমি বাংলা ভাষা দিয়ে প্রয়োজনীয় সম্ভাষণ সচেতনভাবেই সেরে নিয়েছি।

    কিন্তু এই একটি সামান্য পরিবর্তিত সম্ভাষণ থেকে আশেপাশের মানুষের সূক্ষ্ম বিদ্বেষের কিছুটা হদিস তো পাওয়াই যায়। আমারই বাসায় একবার ফুকুওকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু ছত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিলেন। সেখানেই একজনকে দেখেছিলাম সদ্য আগত এক ছাত্রকে খুব কড়া উপদেশ দিয়ে বলতে – খুদা হাফিজ বলাটা মোটামুটি কাফেরি- কারণ ফার্সি খুদা মানে আল্লাহ নয়, বা খুদা বলতে অন্যদের ঈশ্বরকেও বুঝানো হয়। যারা এই কথাগুলো বলছিলেন বা উপদেশ দিচ্ছিলেন তাদের কাউকে আমি মৌলবাদী বলে জানিনি কোনোদিন, বরং স্বাভাবিক অনুভূতি সম্পন্ন বাঙালি বলেই জেনেছি। পরবর্তিতে তাদের পরিবর্তনগুলোও দেখেছি-। সুতরাং মনে হয়- একটা শব্দ অন্য আর একটা শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়- একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হতে পারে সেটা। ভালো লেগেছে লেখাটা। অনেক ধন্যবাদ, আকাশ মালিক।

    • আকাশ মালিক January 28, 2015 at 6:54 am - Reply

      @মণিকা রশিদ,

      আমাকে সারাজীবনে এই দুটো এক্সপ্রেশানের কোনোটাই ব্যবহার করতে হয়নি। ব্যবহার করার সুযোগ এলেও আমি বাংলা ভাষা দিয়ে প্রয়োজনীয় সম্ভাষণ সচেতনভাবেই সেরে নিয়েছি।

      কত সুন্দর কত মিষ্ট সমৃদ্ধ আমাদের বাংলা ভাষা। ঘটা করে আল্লাহ হাফিজ বলা সুক্ষ্ণ ভন্ডামী ছাড়া আর কিছু নয়।

      একটা শব্দ অন্য আর একটা শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়- একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হতে পারে

      আসলেই তা’ই। আনন্দিত হলাম লেখাটি আপনার ভাল লেগেছে শুনে।

  3. ডাইনোসর January 28, 2015 at 7:39 pm - Reply

    জীবনে কখনো দশেরে সীমানা পেরুইনি তবু এই ধরনের কথায় কেন জানি চোখ পানি চলে আসে। ২য় পর্বের অপেক্ষায়।

    • আকাশ মালিক January 28, 2015 at 8:30 pm - Reply

      @ডাইনোসর,

      জীবনে কখনো দশেরে সীমানা পেরুইনি তবু এই ধরনের কথায় কেন জানি চোখ পানি চলে আসে।

      প্রবাসীদের দুঃখ ব্যথার সাথী, লেখাটি পড়ে মন্তব্য করার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। একবার আসতে পারলে আপনিও হয়তো একখানা ‘কপোতক্ষ নদ’ লিখতেন।

      সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে
      সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।
      সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে
      শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে
      জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।
      বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে
      কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে
      দুগ্ধস্রোতরূপি তুমি মাতৃভূমি স্তনে।
      আর কি হে হবে দেখা যত দিন যাবে
      প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
      বারি রূপ কর তুমি এ মিনতি গাবে
      বঙ্গজ জনের কানে সখে-সখারিতে।
      নাম তার এ প্রবাসে মজি প্রেমভাবে
      লইছে যে নাম তব বঙ্গের সঙ্গীতে।

  4. রতন January 28, 2015 at 9:53 pm - Reply

    খোদা ! এদের বিচার কর। আল্লা ১২০০ বছর কিছুই করতেই পারেই নাই!
    খোদা অহিনশ।

  5. ইমরান ওয়াহিদ January 29, 2015 at 5:07 am - Reply

    আকাশ মালিক ভাই, অভিমান ভেঙেছেন তাহলে। অনেক দিন পরে আপনার কোন লেখা পড়লাম। আমাদের সোনালী দিনগুলো মনে পড়ে গেলো।

    ভালো আছেন?

    • আকাশ মালিক January 29, 2015 at 8:02 pm - Reply

      @ইমরান ওয়াহিদ,

      আমাদের সোনালী দিনগুলো মনে পড়ে গেলো। ভালো আছেন?

      ভাল আছি আপনাদের দোয়ায়। সোনালী দিনগুলো ফিরে আসুক একান্ত চিত্তে সেটাই কামনা করি। এই তো সেদিনও আমাদের দেশ এমন কালো অন্ধকারে ঘেরা ছিলনা। কী হতে কী হয়ে গেল, এমন দেশ তো আমরা কোনদিন কল্পনাও করিনি। সাধক কবি, আউল-বাউল, বৈষ্ণব -সন্যাসী, সাহিত্যিক মণীষীদের দেশে বেদুইন যাযাবর ডাকু সন্ত্রাসী ইসলাম ঢুকলো কী ভাবে, একে আনলো কারা? এখনও আশায় বুক বাঁধি আমাদের নতুন প্রজন্ম একদিন এই অসুরটাকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে। তারা এই দেশটাকে তাদের মত করে স্বর্ণালী, বর্ণালী রূপে সুন্দর করে গড়ে তুলবে। আমাদের লেখা তাদের পথের দিশারী হয়ে থাকবে। আপনিও লিখুন।

      • ইমরান ওয়াহিদ January 30, 2015 at 6:51 pm - Reply

        @আকাশ মালিক,

        আমিও লেখালেখিতে সিরিয়াস হচ্ছি। একটা বই অনুবাদের চেষ্টা করছি, কিছুদুর এগিয়ে গেলেই এখানে পোস্ট করা শুরু করবো

  6. আদিল মাহমুদ January 31, 2015 at 12:47 pm - Reply

    ব্লগ জীবনের প্রথম দিককার সেই সব অসাধারন লেখার কথা মনে পড়ে যায়। যতদুর মনে পড়ে আল্লাহ হাফেজের দেশে লেখার একটা পার্টই পড়তে পারছিলাম তখন। এবারকার লেখাটা মনে হয় কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে।

    • আকাশ মালিক January 31, 2015 at 5:37 pm - Reply

      @আদিল মাহমুদ,

      এবারকার লেখাটা মনে হয় কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে।

      যে কারণে থামিয়ে দিয়েছিলাম সেই কারণেই কিছুটা রদবদল করতে হয়েছে বিশেষ করে স্থান সময় ও নামের ব্যাপারে। পাছে যদি মদীনার সনদানুযায়ী লতিফ সিদ্দিকীর অবস্তা হয় তাহলে তো বউ বাচ্চার জন্যে সমুহ বিপদ। আজ শুনলাম ইসলামের বিধান ‘পর্দা তথা বোরকা নিয়ে কটাক্ষ করায় সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত ইসলামি দলসমূহ।

      মন্ত্রী আমাদের সিলাটের মানুষ। তার ব্যাপারে কী বলবো, আস্ত একটা গাধা একটা গন্ডমূর্খ পাগল। এই মানুষকে ভোট দিয়ে মানুষ মন্ত্রী বানায়? অনেক সময় তো আবার মন্ত্রী হতে হলে ভোটও লাগেনা। ধর্ম নিয়ে কথা বলে জুতার বাড়ি খেয়েও ওদের হায়া হয়না।

      তো আপনি এতদিন ছিলেন কোথায়? একেবারে অমাবশ্যার চাঁদ হয়ে গেলেন যে। কোন সুসংবাদ আছে নাকি?

  7. মানবিক মানব February 1, 2015 at 4:54 pm - Reply

    মেঘমুক্ত নীল আকাশের নিচে বিস্তৃত সবুজ গালিচা, তার ওপর মাঝে মধ্যে আঁকা বাঁকা নদীর জলরেখা, যেন সারা দেশ জুড়ে বিছানো একখানা নকসী কাঁথা। এই খাল-বিল, নদী-নালা, ঝোপ-ঝাড়, এই বালিচর, এই আকাশ আমার একান্ত আপন, এরাই আমার জন্মের পরিচয়।

    একদম স্বপ্নের মত।

  8. khokon June 10, 2015 at 2:21 am - Reply

    আকাশ মালিক ভাই,
    আমি আপনার অনেকদিনের ভক্ত, পড়তে খুব ভালোবাসি কিন্ত লেখার হাত একেবারে নাই ।আমি আপনার মত ২০ বছর বয়সে ‘খুদা হাফিজ’ দেশ ছেড়ে
    জার্মান আসি, ২ ছেলেকে নিয়ে ১২ আর ১৪ বছর আগামি মাসে প্রথম বারের মত দেশে যাছি। আমি নিজেকে একজন নাস্তিক পরিচয় দিতে পছন্দ করি ।
    দেখি কি হয় !

  9. নশ্বর February 24, 2016 at 12:42 pm - Reply

    মালিক ভাই, আপনার লেখাটা পড়তে পড়তে চোখের পানি কখন চলে আসলো টের পাইনি । অনেক ভালো লেগেছে আপনার লেখাটি । শুভ কামনা রইলো ।

  10. ইন্দ্রনীল গাঙ্গুলী February 25, 2016 at 4:07 pm - Reply

    দারুন , মানুষ দেশ থেকে বিদেশে যেতে পারে , কিন্তু মন থেকে দেশ ………………………… কক্ষনো যায় না।
    আমিও বাঙ্গালী , পশ্চিমবঙ্গে থাকি , কর্ম সুত্রে UAE ছিলাম কিছুকাল, তারপর যখন দেশে ফিরলাম , মন গেয়ে উঠল বন্দেমাতরম ,
    আর…………………… আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালবাসি , চিরদিন তোমার আকাশ , তোমার বাতাস , আমার প্রানে জাগায়
    হাসি …………………………………………………

Leave A Comment