অবিশ্বাসের দর্শন‘ বইটা যখন প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে তখন আমার ছোটভাই আহমেদ রেদওয়ান জান্না ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটারবিহীন ওর জীবনের একমাত্র সঙ্গী ছিলো ‘আউট বই’। কিন্তু সে বয়সের জন্য অবিশ্বাসের দর্শন একটু বেশিই ‘আউট’ হয়ে যায় তাই আমি তখন পড়ে দেখতে বলি নি। তাছাড়া ধর্মান্ধদের মতো আগ বাড়িয়ে ওকে নির্ধর্ম নিয়ে কখনও মোটিভেশন দিতে ইচ্ছা করতো না, কাউকেই করে না। মনে হতো, উপযুক্ত বয়স হলে ও নিজেই সিদ্ধান্ত নিবে, কোনো প্রশ্ন আসলে উত্তর দিতে আমি তো আছি। পড়তে উৎসাহ না দিলেও ওকে বইটি দেখিয়েছিলাম তখনই, পরিবারের একমাত্র সদস্য যে কিনা আমার লেখালেখির আপডেট পেতো আমার কাছ থেকে। প্রথম বই প্রকাশের আনন্দটা পরিবারের এই একজনের সাথেই তখন ভাগাভাগি করতে পেরেছিলাম।

দেখতে দেখতে দিন চলে যেতে থাকলো। অবিশ্বাসের দর্শনের সাথে সাথে জান্নাও বড় হতে থাকলো। ইদানিং রাতে বাসায় ফিরে প্রায়ই একটু সময়ের জন্য শুয়ে থাকতাম জান্না’র বিছানায়। ও পাশের টেবিলে পড়তো। আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে যাবার সাত দিন আগে জানতে চেয়েছিলো বিগব্যাং থেকে যদি আমাদের মহাবিশ্বের সূচনা হয় তাহলে বিগব্যাং এর আগে কী ছিলো? বিছানা থেকে উঠে বসে ওকে নিজে যতোটুকু জানি ততোটুকু ব্যাখ্যা করলাম। তারপর বললাম অভিদা আর আমার ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটায় একটা অধ্যায় আছে এই বিষয়ে, ও পড়ে দেখলে মজা পাবে। এই প্রথম ওকে বইটা পড়ে দেখতে বললাম, ওর সতের বছর বয়সে।

অদ্ভুত হলেও সত্যি, আমার নিজের কাছে অবিশ্বাসের দর্শনের কোনো কপি নেই। প্রথম সংস্করণও না দ্বিতীয়টাও না। বইটা মাঝে দরকার ছিলো বলে বন্ধু জামানের কপিটা নিয়ে এসেছিলাম বাসায়। জান্নাকে পড়তে দেবো ভেবে বাসায় ঢুকে খুঁজে দেখলাম, পেলাম না। ওকে গিয়ে বললাম, পাচ্ছি না, পরে দিবো।

গতকাল শাহবাগে গিয়ে হাতে পেলাম নতুন ছাপা হওয়া অবিশ্বাসের দর্শন বইটি। জাগৃতির প্রকাশক ফোন করে আগের দিনই জানিয়েছিলেন যে, বইটি ছাপা হয়ে অফিসে চলে এসেছে। সত্যি বলতে কী, এই প্রথম আমি নতুন বই হাতে পেয়ে আবেগে আক্রান্ত হলাম, নানা কারণে। অবিশ্বাসের দর্শন যখন প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিলো বইটি হাতে পেয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম, অসংখ্য বানান ভুল, ফরম্যাটিং, তথ্যসূত্র, পৃষ্ঠা নাম্বারে উলটপালট মিলিয়ে নিন্মমানের প্রডাকশন দেখে। শুদ্ধস্বরের প্রকাশক বললেন, পরের সংস্করণেই সব ঠিক করে ফেলা হবে। প্রথমদিন বইয়ের অবস্থা দেখেই অতিপ্রিয় ‘শাহরিয়ার মামুন রনি’ ভাই অফিসের প্রচন্ড কাজের চাপ থাকার পরও পাঁচ দিনে বইয়ের আপাদমস্তক রিভিউ করে দিলেন। সেটা প্রকাশককে দেওয়া হলো। যাই হোক, মেলায় প্রথমদিন প্রকাশিত হলেও দশ দিনেই শেষ হয়ে গিয়েছিল ছাপা হওয়া কপি গুলো। যদিও পরের ধাপে আবার যখন ছাপা হবে তখন একটা ‘ঠিকঠাক’ সংস্করণ প্রকাশ করার ইচ্ছা ছিলো। সেটা সেবার (২০১১) সম্ভব হয় নি। তারপর একবছর ধরে আবার ঠিকঠাক করে শুদ্ধস্বর থেকেই ছাপানো হলো বইটি পেপারব্যাক এডিশন আকারে (২০১২)। পেপারব্যাক এডিশন শেষ হবার পরেও বইটির চাহিদা ছিলো। কিন্তু প্রকাশকের ব্যর্থতায় পরের দুই বছর ২০১৩, ১০১৪ সালে বইটি আর ছাপা হয় নি। মানুষিকতা বইটি বের হয়েছিলো শুদ্ধস্বর থেকেই ২০১৩ সালে। সে বইটি হাতে পেয়েও অসম্ভব বিরক্ত হয়েছিলাম। এবার বইয়ের বিভিন্ন শব্দ একত্রে জোড়া লেগে যাতা অবস্থা।

সে তুলনায় এবারের অবিশ্বাসের দর্শন একেবারেই আলাদা। চারবছরে এসে অনেকটা সম্পূর্ণ হলো যেনো প্রজেক্টটা। নতুন অনেককিছু সংযোজন করা হয়েছে, কিছু জিনিস বিয়োজন করা হয়েছে। নতুন করে ফরম্যাটিং ঠিক করে দিয়েছেন প্রকাশক নিজের হাতে। ছোট হরফে হলেও ছাপার গুণগতমানে বইটি পড়তে এবার অনেক ভালো লাগবে বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। দীপন ভাইয়ের কাছ থেকে তাই ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ পাওয়া মাত্র পাতা উলটে পড়া শুরু করলাম। জান্নাকে যে অধ্যায়টা পড়তে বলেছিলাম সে অধ্যায়ে চলে গিয়ে যেনো জান্না হয়ে গেলাম। বই হাতে পেয়েই এভাবে মগ্ন হয়ে যাওয়া দেখে দীপন ভাই চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সব ঠিকঠাক আছে তো? আমি অবশ্য কান্না ভেজা চোখে ওনার দিকে তাকাতে পারি নি তখনই।

আমার জীবনের কিছু আর ঠিকঠাক না থাকলেও বইটা এবার ঠিকঠাক হয়েছে, তাই জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। অভিজিৎ দা এখনও বইটি দেখেন নি, তবে দেখার পর উনিও একই রায় দিবেন আমি নিশ্চিত। অবিশ্বাসের দর্শনের জন্য আপনারা যারা এতোদিন অপেক্ষা করে ছিলেন এবার তাদেরও অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। আমি অপেক্ষার কাছে হেরে গেলেও আশা করি অসংখ্য জান্না’র মনে বইটি আলো জ্বালিয়ে যাবে। সেটুকুই প্রাপ্তি হিসেবে জীবনের খাতায় লিখে রাখবো আমরা।

অবিশ্বাসের দর্শন তৃতীয় প্রকাশ

অবিশ্বাসের দর্শন তৃতীয় প্রকাশ

একনজরে তৃতীয় প্রকাশ

প্রচ্ছদ সামিয়া হোসেন
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩১৫
মুদ্রিত মূল্য: ৫৫০ টাকা
প্রকাশক: ফয়সাল আরেফিন দীপন, জাগৃতি প্রকাশনী, ৩৩ আজিজ সুপার মার্কেট, নিচতলা, শহবাগ, ঢাকা- ১০০০
ISBN: 9879849104360
জাগৃতি সংস্করণের ভূমিকা: ফেসবুকেগুডরিডসে

[225 বার পঠিত]