তিরিশ লক্ষ শহীদ, বাহুল্য নাকি বাস্তবতাঃ রিসার্চ-পেপার, ডিকশেনারি, এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে শহীদের সংখ্যা নিরূপণের প্রয়াস

এই পর্বটি সম্ভবত সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এই পর্বে আমরা আলোচনা করবো পৃথিবীময় বিভিন্ন গনহত্যা, রাজনীতি, সংঘাত গবেষকের দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালে হতাহতের সংখ্যা। দেখবো বিভিন্ন রিসার্চ পেপার, ডিকশনারি, এনসাইক্লোপিডিয়ায় এই গনহত্যা সম্পর্কে কি বলা হয়েছে। সংখ্যাটা ৩০ লাখ, তিন লাখ, এক লাখ অথবা ছাব্বিশ হাজার যাই হোক না কেন এটা তো মানতেই হবে সংখ্যাটা অনেক বড়।

১) Center for Systemic Peace এর ডিরেক্টর Dr. Monty G. Marshall তাঁর Major Episodes of Political Violence 1946-2014 পেপারে দেখিয়েছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে।

২) Dr.Ted Robert Gurr এবং Dr. Barbara Harff দুজন গনহত্যা গবেষক। এঁদের মাঝে Ted Robert Gurr বর্তমানে Maryland বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষক আর Barbara Harff ইউএস নেভি একাডেমীতে পল্যিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক। তারা দুইজনই পল্যিটিক্যাল সায়েন্সের দিকপাল হিসেবে পরিচিত। তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ Toward Empirical Theory of Genocides and Politicides যেটা প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে, সেই বইতে উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ১২,৫০,০০০ থেকে ৩০,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

৩) Milton Leitenberg এর গবেষণা পত্র। যেটা প্রকাশিত হয় coronell university থেকে, Deaths in Wars and Conflicts in the 20th Century শীর্ষক সেই প্রবন্ধে লেখা আছে মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ১.৫ মিলিয়ন অর্থাৎ ১৫ লক্ষ

৪) Dr. Jack Nusan Porter একজন লেখক গবেষক, সমাজকর্মী এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট International Association of Genocide Scholars তাঁর বই genocide and human right । এতে উল্লেখ আছে শহীদের সংখ্যা ১০-২০ লক্ষ

৫) 1945 থেকে 1995 সালের মধ্যে ৩০০ টি আন্তর্জাতিক সংঘাত সম্পর্কে বলা হয়েছে International Conflict: A Chronological Encyclopedia of Conflicts and Their Management, 1945-1995 বইটিতে। লেখক Jacob Bercovitch এবং Richard Jackson দুজনেই আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশেষজ্ঞ।

৬) গবেষক Tom Hartman এবং John Mitchel তাদের লেখা A world atlas of military history, 1945-1984 বইতে বলেছেন ৭১এর যুদ্ধে দশ লাখ মানুষ মারা যায়।

৭) World Almanac ১৯৮৪। যাদের বলা হয়ে থাকে almanac এর জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ। তারা তাদের বেস্ট সেলার ১৯৮৪ সালের সঙ্খ্যায় বলেছে শহীদের সংখ্যা ১০ লক্ষ

৮) Compton’s Encyclopedia তাদের গনহত্যা পরিচ্ছেদে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা লিখেছে ৩০ লক্ষ।

৯) Encyclopedia Americana তাদের 2003 সালের সংস্করণে বাংলাদেশ নামক অধ্যায়ে একাত্তরে মৃত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছে তিরিশ লক্ষ।

১০) গনহত্যা গবেষক লিও কুপার তাঁর বিখ্যাত জেনসাইড বইতে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছে। এই বইটি নিয়ে আমাদের এই গ্রন্থের অন্য অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

১১) বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী Rudolph Joseph Rummel STATISTICS OF DEMOCIDE, বইটিকে দাবি করা হয়ে থাকে বিশ্বে গণহত্যা নিয়ে সংখ্যাগতভাবে অন্যতম কমপ্রিহেন্সিভ বই। বইটির অষ্টম অধ্যায়ে Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources নিবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে সর্বনিম্ন ১৫,০৩,০০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০,০৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি বিভিন্ন সময় সংখ্যাটা ১৫ লাখ বলেই উল্লেখ করেছেন। আমরা আমাদের এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে রামেলের গবেষণা এবং তাঁর গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

কিছুদিন আগে আলমগীর মহিউদ্দিন জনকণ্ঠ পত্রিকায় ২০ আগস্ট ২০১৪ রামেলের গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন লিকেছেন। তিনি লিখেছেন;

“অতীত ও বর্তমানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণহত্যা, অত্যাচার, অনাচার, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও গুম চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। যুদ্ধ বা বিপ্লব হয় কখনো কখনো। দুই প্রক্রিয়াতেই জীবন নাশ ঘটে। একজন বিখ্যাত অনুসন্ধানকারী, ড. রুডলফ যোসেফ রামেল প্রথমবারের মতো জানার চেষ্টা করেন কোন প্রক্রিয়ায় বেশি জীবনহানি হয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, না যুদ্ধ-বিগ্রহ-বিপ্লব-অভ্যুত্থানে?”

প্রথমত আমরা আলোচনা করব কয়েকটি বহুল প্রচলিত শব্দ নিয়ে

Genocide বা গণহত্যা: Among other things, the killing of people by a government because of their indelible group membership (race, ethnicity, religion, language). অর্থাৎ গণহত্যা হচ্ছে এমন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা কোন সরকার বা শাসক কোন অমোচনীয় জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা ভাষাগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করে।

Politicide বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: The murder of any person or people by a government because of their politics or for political purposes. অর্থাৎ কোন সরকার বা গোষ্ঠী যদি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে তবে সেইরকম হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলা হবে।

Mass Murder বা নির্বিচারে মানব হত্যা: The indiscriminate killing of any person or people by a government. অর্থাৎ একটি সরকার দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নির্বিচারে হত্যা করা

ড. রামেল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে হত্যাকাণ্ডগুলোকে একটি নতুন নামে অবহিত করেন। যেটি ইংরেজি ভাষায় একটি নতুন সংযোজন, তাঁর আবিষ্কৃত শব্দটি ‘ডেমোসাইড’। রামেল এ ক্ষেত্রে আর একটি শব্দও আবিস্কার করেছেন তা হলো, ‘মরটাক্রেসি’। এ দুয়ের (Democide and mortacracy) মাঝে পার্থক্য হলো প্রথমোক্তটি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দ্বারা ইচ্ছাকৃত হত্যা। আর অপরটি অনিচ্ছাকৃত। তবে দুই প্রকারেই হত্যার সংখ্যা বিশাল।

ড. রামেল তাঁর গবেষণায় টানা আট বছরের ধরে খবরের কাগজ, পুরনো নথি, ইতিহাস ও বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে ‘ডেমোসাইড : সরকারি হত্যা’ নামে চারখণ্ডে একটি বই লিখেছেন।

রামেল পরিস্কার ভাবেই কোনো দল ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমকে ব্যবহার করে এবং সে প্রক্রিয়া ক্ষমতারোহণের পরেও বিরতিহীন চলতে থাকে, সে হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘ডেমোসাইড’ বলেছেন। যে দেশের সরকার যত স্বৈরাচার সেখানে এই ডেমোসাইড কর্মকাণ্ড তত প্রবল এবং এসব সরকার হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটায় সাধারণত প্রতিবাদী ও প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে। তারা এজন্য ক্ষমতায় গিয়েই সর্বাগ্রে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ বাহিনীসহ সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একান্ত নিজের মানুষ দিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। রামেল দেখিয়েছেন, এই শতাব্দীতে (১৯০০-৯৯) ডেমোসাইড হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা এ সময়ের সব যুদ্ধের হতের সংখ্যার চেয়ে ছয় গুণ। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এত মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। তিনি লিখেছেন এই একশ বছরে বিশ্বের ২৫টি দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটির ওপরে। রামেল তাঁর বই ‘ডেমোসাইড : সরকারি হত্যা’ শীর্ষক বইতে কোন সরকার কত হত্যা করেছে, তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। রামেল বলেছেন, সঠিক সংখ্যা নির্ণয় কঠিন, কেননা এর প্রকৃত তথ্য রক্ষা করা হয়নি বা করতে দেয়া হয়নি।

তার হিসাব অনুসারে বিংশ শতাব্দীতে;
চীনের সরকার (১৯২৮-৮৭) হত্যা করে ৭,৩০,০০,০০০;
সোভিয়েত রাশিয়া হত্যা করে ৬,৮০,০০০;
(জার্মানি) নাজি সরকার ১,০২,১৪,০০০;
জাপান সরকার ৫৯,৬৪,০০০;
খেমাররুজ ২০,৩৫,০০০;
ভিয়েতনাম ১৬,৭০,০০০,
পোল্যান্ড- ১৫,৮৫,০০০,
যুগোস্লাভিয়া ১০,৭২,০০০;
কোরিয়া ১৬,৬৩,০০০;
পাকিস্তান ১৫,০৩,০০০ থেকে ৩০,০৩,০০০;
মেক্সিকো ১৪,১৭,০০০।

সব মিলে রামেলের অনুসন্ধানে প্রায় ১০০ বছরে ২,৬২,০০,০০০ মানুষকে বিভিন্ন সরকার শুধু ক্ষমতার জন্য হত্যা করেছে। রামেল লিখেছেন, এ শতাব্দী (বিংশ শতাব্দী) ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের হত্যার ইতিহাস। আর যারা সহযোগী ছিল তারাও রাষ্ট্রের প্রকারান্তরে অংশ, যেমন ডেথ স্কোয়াড, ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডার অথবা ভাড়াটে গেরিলা। এই সহযোগীরা গণহত্যায় নিয়োজিত ছিল। এরা ডেমোসাইডের এক-চতুর্থাংশ মানুষ হত্যা করে, যা গণহত্যা (Genocide) বলে পরিচিত।

রামেলের গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন ব্লগার ডঃ পিনাকী ভট্রাচার্য। তাঁর সেই লেখাতে তিনি বলেন;

“পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সে যুদ্ধ গুলোর কোনটাতেই বেসামরিক মৃত্যুর কোন নাম ধরে তালিকা নাই। এমন তালিকা এখনো করা হয়না। কারণ এটা করা সম্ভব না। যুদ্ধ একটা অস্বাভাবিক অবস্থা, এটা রোড ট্র্যাফিক অ্যাকসিডেন্ট নয়। এসময় শুধু তথ্য সংগ্রহের সমস্যা নয়, এই অস্বাভাবিক অবস্থায় আরো অনেক ঘটনা ঘটে। যেমন, ব্যাপক সংখ্যক মানুষ দেশ ত্যাগ করে, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ফেরেনা, অনেকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, পরিবার-সমাজ বিহীন ভবঘুরে মানুষরাও নিহত হন যাদের খোঁজ পাওয়া সম্ভব হয়না। এছাড়াও আছে যুদ্ধের কারণে পরোক্ষ মৃত্যু। যারা হত্যা করে তারাও অপরাধ ঢাকার জন্য মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলে। এসব কারণেই যুদ্ধে নিহতের পরিসংখ্যান সব সময় একটা সংখ্যা; একটা নামসহ পুর্নাঙ্গ তালিকা নয়। এটাই পৃথিবীব্যাপী গৃহীত নিয়ম। যারা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা চায় তাদের যে কোন একটা গণযুদ্ধের বেসামরিক নিহত নাগরিকদের তালিকা দেখাতে বলুন। যুদ্ধে মৃত বা নিখোঁজ সামরিক ব্যাক্তিদের তালিকা করা সম্ভব কিন্তু বেসামরিক ব্যাক্তিদের নয়।”

এরপর তিনি আলোচনা করেন গবেষকরা কিভাবে সংখ্যাটা ধারণা করেন এবন রামেল কিভাবে এ সংখ্যাটি ধারণা করেছিলেন। আর জে রুমেল তার চায়নাস ব্লাডি পলিটিক্স বইয়ে এবং লিথাল পলিটিক্স বইয়ের পরিশিষ্টে গণহত্যার পরিসংখ্যান কিভাবে করতে হয় সেটার একটা মেথডোলজি দিয়েছেন। রামেলের পদ্ধতি অনুসারে প্রাপ্ত মৃতের সংখ্যাকে আরো সাব গ্রুপে ভাগ করতে হবে যেমন জেলা ওয়ারী, নারী পুরুষ অনুযায়ী এরপর প্রয়োজনে ধর্ম বা জাতি অনুযায়ী; ফলে একটা গ্রহণযোগ্য সংখ্যায় উপনিত হওয়া যায়। এটা অনেক সময়েই একটা রেঞ্জ, যেমন হলোকাস্টে মৃতের সংখ্যা ৪২ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ। রামেল দিয়েছেন তিনটা রেঞ্জ দিয়েছেন লো, মিডিয়াম, হাই।
রামেলের গবেষণার বাংলাদেশ অংশে এসে জেলা-থানা ওয়ারী যে হিসাব দেখানো হয়েছে তা যারপনাই বিস্ময়কর এবং কৌতূহল উদ্দীপক। ICSF গবেষক এবং দেশের বিখ্যাত ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম সচলায়তনের নিয়মিত লেখক কৌস্তুভ তাঁর তথ্য’বিনা মিথ্যা বোনা ব্লগে ভারতীয় গবেষক শর্মীলা বোসের প্রত্যুত্তরে রামেলের কথা লিখেছেন সবিস্তরে
রামেলের Statistics of Democide: Genocide and Mass Murder Since 1900, বইতে তিনি দু’শোরও বেশি শাসনকালকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন তাদের হত্যা তথ্য ‘The Pakistani Cutthroat State’ নামেরঅষ্টম চ্যাপ্টারে উনি লিখেছেন,
“In 1971 the self-appointed President of Pakistan and Commander-in-Chief of the Army, General Agha Mohammed Yahya Khan and his top generals prepared a careful and systematic military, economic, and political operation in East Pakistan (now Bangladesh). They also planned to murder its Bengali intellectual, cultural, and political elite. They also planned to indiscriminately murder hundreds of thousands of its Hindus and drive the rest into India. And they planned to destroy its economic base to insure that it would be subordinate to West Pakistan for at least a generation to come. This despicable and cutthroat plan was outright genocide.
After a well-organized military buildup in East Pakistan the military launched its campaign. No more than 267 days later they had succeeded in killing perhaps 1,500,000 people, created 10,000,000 refugees who had fled to India, provoked a war with India, incited a counter-genocide of 150,000 non-Bengalis, and lost East Pakistan.”
কৌস্তুভ লিখেছেনঃ

“ওনার অধ্যাগুলোর যা ধরন দেখলাম, এই ধরনের আলোচনায় ওনার নিজের কথা খুবই অল্প, ছোট খানিক ইন্ট্রোডাকশনের পরই একটি সামারাইজড (৮.১) এবং একটি বিস্তৃত (৮.২) টেবিলে উনি প্রতিটি সূত্র অনুসারে নানা বিভিন্ন বিষয় যেমন বাংলাদেশী হত্যা, বিহারী হত্যা, যুদ্ধে নিহত সেনা, অসুস্থ, উদ্বাস্তু ইত্যাদি সব কিছুর উপর আলাদা ভাবে সংখ্যাগুলো সাজিয়ে দিয়েছেন। সন-তারিখ, উৎস, টীকা তো দিয়েছেনই, সংখ্যাগুলোও তিনটে আলাদা কলামে সাজানো – যদি মূলে ‘অ্যাট লিস্ট’ বলা থাকে তবে ‘লো’, যদি ‘আপ টু’ বা ‘অ্যাট মোস্ট’ বলা থাকে তবে ‘হাই’, আর ‘অ্যারাউন্ড’ বা ‘অ্যাপ্রক্সিমেট’ ইত্যাদি বলা থাকলে ‘মিড’।

আর তথ্য সাজানো তো বটেই, ওনার হিসেব করার পদ্ধতিটাও বেশ যুক্তিসঙ্গত। ধরুন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর চলা একটা যুদ্ধে, ক বলেছেন জানুয়ারিতে ১০০জন মারা গেছে, খ বলেছেন ডিসেম্বরে ৫০০ জন মারা গেছে, গ বলেছেন পুরো যুদ্ধে ৩০০০ জন মারা গেছে, আর ঘ বলেছেন প্রথম ৫ মাসে ১০০০ জন মারা গেছে। তাহলে চারটে সূত্র থেকে চারটে মাসিক মৃত্যুর হার উনি বের করেছেন – ১০০, ৫০০, ২৫০, ২০০। সবচেয়ে কমটা নিলে মোট মৃত্যুর হার ১২০০, সবচে বেশিটা নিলে ৬০০০, আর গড়ে ৩১৫০। অবশ্য, যদি কোনো সূত্রে ঠিকমত রেফারেন্স দেওয়া না থাকে, বা তথ্য অসম্পূর্ণ বা দুর্বল বা অবাস্তব মনে হয়, উনি সেসব কারণ পাশে টীকায় উল্লেখ করে দিয়ে সেগুলো বাদ দিয়েছেন।”

এখানে উল্লেখ্য রামেল কেবল প্রাইমারী সূত্রই নিয়েছেন, অর্থাৎ কোনো সংবাদ প্রতিবেদন কোনো বইয়ের তথ্যকে রেফারেন্স হিসেবে দিলে উনি সেই খবরটাকে সূত্র না বলে সরাসরি বইটাকেই বলেছেন। তাঁর গবেষণাই যেমন বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা এসেছে তেমনি এসেছে বিহারী হত্যাকান্ড, পাকিস্তানী সেনা হত্যা, ভারতীয় সেনা হত্যার মত খুঁটিনাটি ব্যাপার গুলোও

ব্লগার তারিক লিংকন সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ “বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, প্রসঙ্গঃ ৩০ লাখ বাঙালী হত্যার আইকনিক মিথ” নিবন্ধে রামেলের ছক গুলো তুলে ধরেছেন প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা সহ

রামেলের STATISTICS OF DEMOCIDE, আট নাম্বার অধ্যায়ের Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে ৩০,০৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

ডেমিসাইড বাংলাদেশ তালিকার ৩৩ নম্বর সারিতে R.J. Rummel ৩০ লক্ষ ৩ হাজার মানুষের প্রাণ হারানোর কথা বলেছেন উচ্চ সম্ভাবনার কলামে আর মধ্যম সম্ভাবনায় বলেছেন ১৫ লক্ষের কথা। আর রিফিউজি বা শরণার্থীর ক্ষেত্রে ৩৭ নম্বর সারিতে মধ্যম এবং উচ্চ হিসেবে যথাক্রমে ১ কোটি এবং ১ কোটি ২০ লক্ষের কথা বলেছেন।

অনুসন্ধানী পাঠকের সুবিধার জন্য ৮.২ নাম্বার ছকটিও তুলে দিলাম

অনেকের মনে খটকা লেগে থাকতে পারে যে বেশিরভাগ গবেষকের মতে সংখ্যাটা ১০ থেকে ১৫ লক্ষের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি গল্পটা এখানেই শেষ হয় নি শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষের বেশিরভাগ গবেষক গণনায় আনেননি। এক কোটি বিশ লক্ষ মানুষের স্থানান্তরে প্রচুর মানুষের মৃত্যু অনিবার্য এই বইয়ের অন্য অংশে আমরা দেখিয়েছি আমাদের ধারণা অনুসারে কেবল শরণার্থী শিবিরে নিহত মানুষের সংখ্যাই ৫ থেকে সাত লাখ হতে পারে।

এছাড়া হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Global Health and Population বিভাগের অধ্যাপক Dr. Richard Cash বলেছেন,

“আমরা পাবলিক হেলথের লোক হিসাবে যুদ্ধের সরাসরি প্রাণহানি ছাড়াও ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজের’ দিকে নজর রাখতে চাই। এবং এই যুদ্ধের ফলে প্রায় দশ মিলিয়ন মানুষকে ঘরছাড়া হয়ে ভারতে পালাতে হয়েছিল, পাঁচ লাখ মানুষ যুদ্ধপরবর্তী মন্বন্তরে মারা গিয়েছিল”

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন,
“এইসব অতিরিক্ত সমস্যা/প্রাণহানির দায় কার ?
সবই ঈশ্বরের লীলা ?
নাকি যারা এই যুদ্ধ এনেছিল তাদের ?”

About the Author:

মন্তব্য করুন