আজ সেই ৬ ই ডিসেম্বর । বাবরি মসজিদ ভাঙার দিন। কারুর কাছে শোকের, কারুর কাছে রাগের, কারোর বা উল্লাসের দিন। ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৯২ আমরা খালি পায়ে হেঁটেছিলাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য। পরের কয়েকটা দিন ছিল থমথমে। গুজুবে। দাঙ্গার ভয়ে বাড়ির বাইরে বেড়োনো নিশেধ।

আজ যখন স্মৃতির ক্যালিডোস্কোপে দেখি, আসলেই দুঃখ হয় না। বরং মানুষের মুর্খতায় আমোদিত হই।

রাম ওখানে জন্মেছিল ! স্পাইডারম্যানের মতন দুস্কৃতি বিনাশয় ফিকশনাল চরিত্র এই রাম। পার্থক্য এই যে স্পাইডারম্যানের ভক্ত বালকরাও জানে, ম্যানহাটনে স্পাইডারম্যানের আপার্টমেন্ট নেহাত কল্পনা। কিন্ত রামভক্ত ধেরে লোকেরা গভীর ভাবে বিশ্বাস করে রাম অযোধ্যায় শুধু জন্মায় নি-কোথায় জন্মেছিল সেটাও তারা ইঞ্চি প্রিসিশনে জানে। আর বিশ্বাসেই বা কি আসে যায়। কোন বিশ্বাসের জন্য যদি মুসলমানদের বাঁশ দেওয়া যায়, হিন্দু হিসাবে ভোটিং ব্লক একত্রিত করার সুযোগত গণতন্ত্রই দেয়!!

অনেকে বাবরি মসজিদের প্রসঙ্গ তুললেই বলেন বাংলাদেশে যে রোজ মন্দির ভাংছে তার বেলা? আসলে মন্দির মসজিদ ভাংলে আমি খুশীই হয়। কারন এগুলি প্রগতিশীলতার প্রতিবন্ধক। স্পেস এজের এক্সিমা। যখন দেখি একজন বাংলাদেশী হিন্দু মন্দির কেন ভাঙা হচ্ছে সে প্রশ্ন না তুলে –মনের গোপনে বা একজন নাস্তিকের কাছে স্বীকার করে, আসলেই কালী বা দূর্গাকে যতই জাগ্রত দেবতা ইত্যাদি ইত্যাদি সুপারম্যান ভেবে পূজো করিনা কেন, তারা আসলেই নির্বল নির্বোধ নির্বাক পুতুল। নইলে যেসব মুসলমানরা কালী মূর্তি ভাঙে তাদের কেন কিছু হয় না ?

হায় হায়!!

ঠিক এই কারনেই বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় নিশ্চয় কিছু বুদ্ধিমান অথচ ধার্মিক মুসলমান প্রশ্ন করেছিল, আল্লা যদি এত সর্বশক্তিমান সুপারম্যান হন কেন তিনি বাবরি মসজিদ রক্ষা করতে সক্ষম হলেন না ?

এতেব বন্ধুগন মন্দির মসজিদ মূর্তি ভাঙা আসলেই সমাজের প্রগতির পক্ষে ভাল। মধ্যযুগের ইউরোপে ইহুদিদের সিনাগগ প্রায় ভাংত খ্রীষ্ঠানরা। তাদের বার করে দিত অনেক সময় শহর থেকে। ঠিক এই কারনেই ইহুদিদের মধ্যে সেকুলার বা উন্নত চিন্তায় বিশ্বাসী দার্শনিকদের জন্ম হয়। স্পিনোজা, ফ্রয়েড, আইনস্টাইন, কার্লমার্ক্স সবাই ইহুদি কেন? কারন ধর্ম আর ইহুদিদের ঈশ্বর যে তাদের বাঁচাতে ব্যার্থ, এই চিন্তা থেকে সেকুলারিস্ট হিউম্যানিজমের চিন্তা প্রথমে ইহুদি মানসেই আসে।

দুঃখিত, আমি আপনাদের সাথে একমত নই । হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে এত সাম্প্রদায়িকতা চাপা হয়ে আছে, ধর্ম ছাড়তে না পারলে ( ঈশ্বরে বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিকতা ছাড়তে আমি বলছি না -কিন্ত ধর্মের পরিচিতি কেন?? ), সম্প্রীতি অলীক আলেয়া। ইল্যুউশন । ধর্ম পালন করব আবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও থাকবে, তা হওয়ার নয়। ওর্গানাইজড রিলিজনের স্তম্ভ, সিম্বল হচ্ছে এই মন্দির মসজিদ। এসব গুঁড়িয়ে দিলে ধর্মবিশ্বাস ও দুর্বল হয় ( যে সুপারম্যান আল্লা বা স্পাইডারম্যান রাম, আসলেই সর্বশক্তিমান না -কারন উনারা নিজেদের বাড়িই বাঁচাতে অক্ষম )।

ধর্ম পালনের, ধার্মিক হয়ে কাটিয়ে দেবার পেছনে কাজ করে ঈশ্বরভীতি। ভয় মহান সর্বশক্তিমান আল্লা বা ঈশ্বর নিশ্চয় বিশাল ক্ষতি করে দেবেন। ছোটবেলায় কতবার যে শুনতাম কালীকে অবজ্ঞা করার জন্য তার একমাত্র ছেলে ওলাওঠাতে পরের দিন মারা গেছে। হায় হায়। কালীকে অপমান করলে শুধু হিন্দুদেরই মরে। মূর্তি ধ্বংসকারী বাবর বা কোন মুসলমানকে হিন্দুদের জাগ্রত দেবতা কোনদিন কিস্যু করতে পারল না !! আবার মহান সর্বশক্তিমান আল্লা বাবরি মসজিদ বাঁচাতে পারল না ।

শিশু মনে ভয় ঢুকিয়ে তৈরী হয় সুপারম্যান আল্লা আর স্পাইডারমান রামের বানরবাহিনী। যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন আমাকে লক্ষীপূজোর প্রসাদ দিলে, খেতে অস্বীকার করি। আমার এক মামা বললো তোর এত সাহস, লক্ষীরে অবমাননা করিস ? আমি বললাম আমি ত এসব মানি না । মামা বললো তোর এত সাহস? এই লক্ষীর প্রসাদ কিছুই না । আমি বল্লাম না । বলে পা দিয়ে মারিয়েও দিলাম। তখন আমার বয়স এগারো! মামা বল্লেন লক্ষীর অভিশাপে নাকি সারাজীবন অর্থকষ্টে ভুগবো! ক্লাস টেনে একই অভিজ্ঞতা হলো স্বরস্বতীপূজোর দিন। আসলে সামনে পরীক্ষা। আমি আগের দিন রাত্রি থেকে কোন একটা অঙ্ক পারছিলাম না । চেষ্টা করছিলাম সকালেও। তাই অঞ্জলি দিতে বেরোলাম না । ব্যাপারটা একটু বেমানান ছিল। কারন আমার নিজের বাড়িতেই সরস্বতী পূজো হত। সেটাও ইস্যু না । আসলে সরস্বতীপুজো হচ্ছে সদ্য শাড়ি পড়া কিশোরীদের পেছনে ঝাড়ি মারার দিন। সেই দুর্বার হাতছানি কাটানো ছিল কঠিন। কিন্ত যেকারনেই হোক, অঙ্ক না মেলার জন্য উঠতেও পারছিলাম না । শেষমেস পাড়ার এক দাদা যে আমাদের বাড়িতেই অঞ্জলি দিতে এসেছিল, সে বললো তোর পড়াশোনা হবে না !!

আসলে শিশু মনে এই ভাবেই ভয় ঢুকিয়ে হিন্দুত্ব বা ইসলামের আইডেন্টি গুলো তৈরী করা হয়। আর সেই ভয়ের উর্বর জমিতে ফসল ফলায় ধূর্ত রাজনীতিবিদরা। সুতরাং দুচারটে মন্দির মসজিদ ভাংলে যদি সেই ঈশ্বরভীতি কমে, তাহলে তা সমাজ এবং দেশের জন্য মঙ্গল।

[195 বার পঠিত]