বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সুফিদের ভূমিকা ছিল মূখ্য, এ বিষয়ে এখন আর কোনো দ্বিমত নেই। সুফিদের প্রচারিত ইসলাম ছিল সহজিয়া ইসলাম। তারা শরিয়ত অপেক্ষা মারেফাত বা ঈশ্বরপ্রেমকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং হিন্দুধর্ম সম্পৃক্ত স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতেন, সমঝোতা করে চলতেন। ফলে শরিয়তপন্থী ধর্মতাত্ত্বিকদের চেয়ে সুফিরা অনেক বেশি গ্রহণীয় ছিলেন বাংলার জনসাধারণের কাছে। সুফিরা আবার সালিক ও মজ্জুব দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিলেন। সালিকরা সুফি হলেও শরিয়তে পুরোপুরি বিশ্বাসী ছিলেন এবং মজ্জুবেরা শরিয়তকে গুরুত্ব দিতেন না। মজ্জুব বা বেশরা ফকিররাই ছিলেন বাংলার জনসাধরণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আদৃত। কারণ তারা ছিলেন ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ সম্পন্ন, যাকে বলা হয় ‘কারামত’। আদৌ তারা অলৌকিক কিছু দেখাতে পারতেন কিনা একালে এসে সেই বিচারে আমরা যাব না। কিন্তু এ কথা সত্য, গ্রামবাংলার মানুষ তাদের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেত। ঈশ্বরের অন্বেষণ করত তাদের মধ্য দিয়েই। এসব বেশরা ফকিরই বাংলাদেশে ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করেন এবং মুসলমানের পাশাপাশি বহু হিন্দুকেও তাদের মুরিদ বানাতে সক্ষম হন। সুফি সম্প্রদায়গুলির নানা ধর্মীয় সংস্থাসমূহ এবং সুফি প্রচারকদের সমাধিস্থল বা মাজারগুলি তীর্থস্থান হিসেবে ভারতে ইসলাম প্রচারে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

1101950012সুফির ইসলামি কট্টরপন্থাকে প্রশ্রয় দিতেন না। তারা ছিলেন সমন্বয়বাদী―হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের সমন্বয়। তাদের প্রচারিত সহজিয়া ইসলামে যারা দীক্ষিত হয়েছিল ইসলাম ধর্ম-শাস্ত্রাদি চর্চা না করে তারাও পূর্বপুরুষদের মতোই রামায়ণ-মহাভারত পাঠ করত। হিন্দুরা যেমন গুরুর প্রতি ভক্তিশীল তেমনই মুসলমানরা গুরুর পরিবর্তে পীরের প্রতি ভক্তিশীল। ফলে মুসলমানের পীর হলো হিন্দু গুরুর বিকল্প এবং ক্রমে ক্রমে সত্যপীর, মানিকপীর, ঘোড়াপীর, মাদারীপীর ও কুমীরপীর নামে পাঁচ পীরের পূজা আরম্ভ হলো। হিন্দুদের বনদুর্গা বা বনদেবী, ওলাইচণ্ডী প্রভৃতি লৌকিক দেবী মুসলমানদের বনবিবি, ওলাবিবির রূপ নেয়। এসব পীর ও লৌকিক দেবদেবীর প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস বাংলার গ্রামীণ সমাজেও আজও প্রচলিত। পীর-ফকিরদের মাজারে মাছ ও কচ্ছপকে খাদ্য দেয়া, গাছের ডালে সুতো বাঁধা ইত্যাদি গ্রাম্য হিন্দুসমাজে প্রচলিত নানা সংস্কার বাঙালি মুসলমানরা আগেও মানত, এখনো মানে। মানে ইসলামের নির্দেশে নয়, বহু পুরুষের ধারাবাহিত বিশ্বাসে।

শ্রীচৈতন্যের শ্রীকৃষ্ণনামসংকীর্তনের অনুকরণে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে প্রচলিত হলো মিলাদ অনুষ্ঠান। মিলাদের প্রচলন কিন্তু সৌদি আরবে নেই। যতটা জানি মিশর, ইরান, ইরাক, তুরস্ক বা অন্যান্য মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতেও নেই। তাহলে ভারতবর্ষে মিলাদ কোথা থেকে এল? এসেছে বৈষ্ণব ধর্ম থেকে। শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণসাধন পদ্ধতি ছিল দুই ধরনের। তিনি সংকীর্তন ও নগর কীর্তনের প্রচলন করেছিলেন। বৈষ্ণবরা সংকীর্তনে ভাগাবেগে আপ্লুত হয়ে ঢাকা-ঢোল-খোল-করতাল ও মৃদঙ্গ বাজিয়ে এবং পতাকা উড়িয়ে নগরকীর্তনে বের হতেন। তখন আনন্দে উদ্বেল হয়ে নৃত্যগীত করতে করতে শোভাযাত্রা সহকারে রাজপথসমূহ প্রদক্ষিণ করে সমস্ত শহর মুখর করে তুলতেন। শুরুতে চৈতন্যের শিষ্য শ্রীবাসের বাড়িতে প্রতিদিন নামকীর্তন হতো। সারারাত খোল-করতাল ও মৃদঙ্গ সহযোগে ভক্তবৃন্দসহ নেচে নেচে কীর্তন করতেন নিমাই।

মিলাদও কিন্তু নামকীর্তন। ইসলামের নবীর নামজপ। বৈষ্ণবরা নাম জপে শ্রীকৃষ্ণের, আর মুসলমানরা নাম জপে তাদের নবীর। নামেই শুধু ফারাক। আবার মিলাদে ‘কেয়াম’ বা মিলাদ পড়াকালীন নবীকে হাজির-নাজির জেনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করারও একটা নিয়ম প্রচলিত হয়। কেয়ামের প্রচলন এখনো ব্যাপকভাবেই আছে। কেয়ামের প্রচলনও হয় স্পষ্টতই শ্রীচৈতন্যের নামসংকীর্তনের রীতি থেকে। কীভাবে? খেয়াল করা দরকার, বৈষ্ণবদের নামকীর্তনটা হতো দাঁড়িয়ে, বসে নয়। মুসলমানদের মিলাদ তথা নবীর নামকীর্তনের মধ্যে এটিও প্রবিষ্ট হলো। মজ্জুব সুফিরা এই সমন্বয়টা করে নিয়েছিলেন। মিলাদ পাঠের একটা পর্যায়ে ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে মুসলমানরা দাঁড়িয়ে যায়। সালিক সুফিরা মিলাদকে ‘বেদায়াত’ বা ‘ইসলামে নতুন আবিষ্কার’ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মুসলমান সমাজে মিলাদের রেওয়াজটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে সালিক সুফিরা স্বীকৃতি না দিয়ে পারলেন না। কিন্তু মিলাদকে স্বীকৃতি দিলেও মিলাদের মধ্যে কেয়াম বা দাঁড়ানোকে তারা অস্বীকার করলেন। কারণ কেয়ামের মধ্যে তারা স্পষ্টতই হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির, শ্রীচৈতন্যের নামসংকীর্তনের রীতি, প্রভাব দেখতে পেতেন।

4444বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে হিন্দুদের জন্মাষ্ঠমীর মতোই উদযাপিত হতো নবীর জন্মদিন বা ঈদে মিলাদুন্নবী। এই বিশেষ দিনটিতে এখনো গ্রামবাংলার বাড়িতে বাড়িতে ভালো খাবারের পাশাপাশি কোনো কোনো মুসলমান সমাজে নাচ-গানেরও আয়োজন হয়ে থাকে। ঢাকা শহরেও দেখা যায় ছেলেপিলেরা ফটকা-বাজি ফাটাচ্ছে। অনেকটা হিন্দুদের জন্মাষ্ঠমীর মতো। দুটোই কিন্তু জন্মোৎসব। নাচগান বা ফটকাবাজিকে শরিয়তি ইসলাম সমর্থন করে না, বঙ্গীয় ইসলাম করে। কেননা নাচগান ফটকাবাজি বাংলার সংস্কৃতি। বাংলার মানুষ ইসলামকে কবুল করলেও তাদের আচরিত সংস্কৃতিকে পরিত্যাগ করতে পারেনি। এ ছাড়া হিন্দুদের শ্রাদ্ধের মতোই ছিল পীরের মৃত্যুদিন উপলক্ষ্যে উরস। বিষ্ণুপাদপদ্মের মতো পূজ্য ছিল নবীর পায়ের ছাপ, কদম রসুল। চট্টগ্রামের ‘কদম রসুল’ মসজিদ আজও বর্তমান। গৌড়ের একটি সৌধে আছে পাথরের কদম রসুল বা নবীর পায়ের ছাপ। বেরা ভাসান উৎসবের কথা আমরা জানি। এটি একটি ভারতীয় উৎসব। ভাদ্রমাসের বৃহস্পতিবারের বেরা ভাসান উৎসব আসলে ইসলামি মিথের সমুদ্র-শাসক খোয়াজ খিজিরের উপাসনা। ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত উৎসব বেরা ভাসানে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাও যোগ দিতেন। মুর্শিদাবাদের নবাব-প্রাসাদে দেওয়ালীও উদ্যাপিত হতো। দেওয়ালী হচ্ছে লঙ্কা বিজয়ের পর রামচন্দ্রের রাজ্যভিষেকের উৎসব। তার মানে এটি হিন্দু সংস্কৃতির উৎসব। মুসলমানরাও এটিকে গ্রহণ করল। নবীকন্যা ফাতেমাও বিবি ফাতেমা রূপে পূজিত হতেন বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে। কারবালার যুদ্ধের মহররম ও হাসান-হোসেনের প্রাণদানের কাহিনি প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করেছিল এ দেশের জনমানসে। তারই প্রভাবে মীর মশারফ হোসেন রচনা করলেন ‘বিষাদ সিন্ধু’, বেগম রোকেয়াও লিখেছেন হাসান-হোসেনের কাহিনি। হাসান-হোসেন ও অন্যান্য ইমামরা নবী ও তার খলিফাদের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বাংলার মুসলিম জনমানসে, বিশেষত মহিলাদের মধ্যে।

বাংলায় ইসলাম প্রসারের শুরুতে গ্রামীণ সমাজে যাত্রা এবং বারোয়ারী পূজার মতো আমোদ-প্রমোদ হিন্দু ও মুসলমানরা একত্রে সমভাবে উপভোগ করত। মুসলমানরা হিন্দুদের মতো সমভাবে চাঁদাও দিত এসব ব্যাপারে, যদিও হিন্দুরাই ছিল এ সমস্ত উৎসবের সংগঠক। মূর্তিপূজা এবং হিন্দুপুরাণের বিষয়বস্তু নিয়ে পৌরাণিক পালা ও কবিগান মুসলমানরাও উপভোগ করত। এছাড়া ছিল মুসলমানদের গাজীরামের গান এবং হিন্দুদের কীর্তনের দল। এইভাবে গ্রাম বাংলার কৃষক ও অন্যান্য পেশার মানুষদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন ছিল। পরম শান্তি ও সৌভ্রাতের মধ্যে বাস করত দুটি সম্প্রদায়। বলা বাহুল্য, মানুষের সহজাত এসব প্রবৃত্তি ইসলামি শরিয়ত বিরোধী, কিন্তু রক্তগত হিন্দু চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

উনিশ শতকের প্রারম্ভেও বাংলাদেশে একটি মিশ্র সামাজিক এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি বিরাজ করত। হিন্দু মুসলমানের জীবনযাত্রার মধ্যে কিছু কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও তারা মূলত একটি জাতিগোষ্ঠীই ছিল―সে জাতির নাম বাঙালি। ঐহিক কারণে উভয়ের মধ্যে বিবাদ ঘটলেও উপাসনা-আরাধনার কারণে বিবাদ কখনো ঘটত না। কারণ পীর-ফকিরদের সহজিয়া ইসলামের সাহায্যে ইসলামায়িত নিম্নবর্গের গ্রামীণ মুসলমানদের মধ্যে কট্টরপন্থা তথা জেহাদিতত্ত্ব তখনো প্রবেশ করেনি। ফলে তাদের আচার-আচরণ ছিল সম্পূর্ণ মানবিক। বাংলাদেশের মুসলমানরা চেহারায় ও বেশভূষায় হিন্দুদের থেকে পৃথক ছিল না। খাটো ধুতি, কাঁধে গামছা―এই ছিল গ্রামের সাধারণ মুসলমানদের পোশাক। দাড়ি রাখা বা না-রাখার বাছবিচার ছিল না। নামও ছিল তাদের হিন্দুঘেঁষা। যেমন পুরুষদের নাম দায়েম, কায়েম, সাজন, দানেশ, শেহেজান, শিহান, মধু এবং মেয়েদের নাম বাতাসী, কুড়ানী, শারী, শোভানী ইত্যাদি। এই মুসলমানরা নামাজ পড়ত ঠিকই, তবে একটিও আরবি শব্দের অর্থ না জেনেই।

বঙ্গীয় এই সহজিয়া মুসলমানদের কথা শুনেছিলাম শৈশবে বাবার কাছে। প্রাচীনকালে একবার এক সালিক বা শরিয়তপন্থী সুফি বাংলার কোনো এক গ্রামে শরিয়তি ইসলাম প্রচার করতে গেলেন। মুসলমানরা জড়ো হলো পীরের সাক্ষাতে। সবার পরনে ধুতি ও চাদর। তাদের নামগুলোও ঠিক ইসলামি রীতির নয়। একটারও মুখে দাড়ি নেই। পীর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা হিন্দু না মুসলমান?
সবাই বলল, হুজুর, আমরা মুসলমান।
: নামাজ পড়ো?
: না।
: রোজা রাখো?
: না।
: পাঁচ কালিমা জানো?
: না।
: তাহলে তোমার মুসলমান কীভাবে?
তাদের একজন বলল, তা তো জানি না হুজুর। আমার বাপ-দাদারা মুসলমান ছিল, সেই সূত্রে আমরাও মুসলমান।
এরাই হচ্ছে বঙ্গীয় সহজিয়া মুসলমান। তাদের মূল সংস্কৃতিটি ছিল পীর-ফকিরের সংস্কৃতি―যা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়, এমনকি দুয়ের সঠিক মিশ্রণও নয়। সেই সংস্কৃতি ছিল বাংলার চিরন্তন লোকসংস্কৃতি। ফলে আরবীয় ইসলামি সংস্কৃতি ও বাংলা-ভারতীয় ইসলামি সংস্কৃতির মধ্যে বড় ধরনের এক ফারাক তৈরি হয়।

তথাকথিত সংস্কার আন্দোলন
এই ফারাকটাকে, বাঙালি মুসলমানদের লোকায়ত সেই সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারল না এক শ্রেণির ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী। তারা চেষ্টা চালিয়েছে পূর্ণ শরিয়ত বাস্তবায়ন করে সমগ্র ভারতকে ‘দারুল ইসলাম’ বা ইসলামের দেশে পরিণত করতে। তাদের কাছে ইসলামই একমাত্র সত্য, আর সব মিথ্যা। সুলতানি শাসনামলে এই আরবের সপ্তম শতকীয় ইসলামি কট্টরপন্থার অনুসারী মৌলবাদীরা সুলনতানদের কাজেকর্মে আক্ষেপ প্রকাশ করেছে। সুলতানদের তারা বিধান দিয়েছে কী করে হিন্দুদের আঘাত হানতে হবে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। সব সুলতানই মৌলবাদীদের অল্প-বিস্তর হতাশ করেছিলেন। সুলতানরা ধর্ম নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করতেন না। ধর্মকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতেন না। কট্টরপন্থীদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছিলেন মোগল সাম্রাট আকবর। তার ‘দ্বীন-ই ইলাহী’র ঘোষণা যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করেছিল মৌলবাদীদের। নকশবন্দিয় তরিকার সুফি বাকি বিল্লাহ আকবরের রাজসভার ও অন্যান্য স্থানের বিদ্যান ব্যক্তিদের চিঠি লিখে আকবরের ‘দ্বীন-দ্রোহিতার’ কথা প্রচার করতেন।
উদারপন্থী সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর নূর-উদ-দ্বীন মহম্মদ জাহাঙ্গীরের আমলে বাকি বিল্লাহর শিষ্য শায়খ আহম্মদ শিরহিন্দি নামের এক ইসলামি কট্টরপন্থীর উদ্ভাস ঘটে, যিনি নিজেকে ‘মুজাদ্দিদে আলফে সানি’ বলে দাবি করেছিলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মুক্তিদাতা করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শায়খ আহম্মদের জন্ম বর্তমান পাঞ্জাবের শিরহিন্দে। নকশবন্দিয়া সুফি পরিবারে জন্ম হলেও ইসলামি শিক্ষাদীক্ষার ফলে শুরু থেকে তার অনুরাগ ছিল কোরান ও হাদিসের প্রতি। অনুরাগের এ প্রাবাল্যই তাকে গোঁড়া মৌলবাদী ও হিন্দু-বিদ্বেষী করে তোলে। তিনি ভারতের সমন্বয়বাদী সহজিয়া ইসলামকে স্বীকার করতেন না। স্থানীয় মুসলমানদের আচরিত সংস্কৃতিকে তিনি ‘কুসংস্কার’ হিসেবে সাব্যস্ত করলেন। সহজিয়া মুসলমানরা তার কাছে ছিল বেদ্বীনেরই নামান্তর। মৌলবাদ প্রচার করতে গিয়ে শিরহিন্দি সুফি আল আরাবির সমন্বয়বাদী সুফিতত্ত্বকে ইসলামের মধ্যে হিন্দুধর্মের অনুপ্রবেশের সিংহদুয়ার বলে বর্ণনা করলেন। আল আরবির তত্ত্বকে খারিজ করে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন ইমাম গাজালির শরিয়তবাদী সুফি মতাবাদ। মজ্জুব সুফিরা ছিলেন অদ্বৈতবাদী। ঈশ্বর ও মানুষকে তারা এক ও অভিন্ন জ্ঞান করতেন। শিরহিন্দি অদ্বৈতবাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হলেন শরিয়তি দ্বৈতবাদকে। তিনি মারেফতি ইসলামের যে ব্যাখ্যা প্রচার করতে লাগলেন, তাতে সহজিয়া সুফিবাদ হিন্দুদের থেকে অনেক দূরে সরে যেতে লাগল।
শিরহিন্দি কতটা হিন্দুবিদ্বেষী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় শায়খ ফরিদ বুখারীকে লেখা এক চিঠিতে, যে চিঠি শিরহিন্দির ‘মাকতুবাত’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ঐ চিঠিতে তিনি লিখেছেন :

‘ইসলামের সমস্ত সম্মান নিহিত আছে বিধর্ম আর বিধর্মীদের অপমানের মধ্যে। যে বিধর্মীদের সম্মান করে সে মুসলমানদের অপমান করে। তাদের সম্মান করা মানে তাদের সঙ্গী করা ও তাদের মূল্য দেয়া। তাদের কুকুরের মতো দূরে রাখাই কর্তব্য।’
সাম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের আমলে ভারতে গো-হত্য নিষিদ্ধ ছিল। শিরহিন্দি সবসময় গো-হত্যাকে উৎসাহ দিতেন। কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন গো-হত্যাকে হিন্দুরা অত্যন্ত গর্হিত করজ বলে মনে করে। পাটনার লালা বেগকে শিরহিন্দি লেখেন :
‘ভারতে ইসলামের সবচেয়ে মহান প্রথা হলো গো-কোরবানি করা। কারণ কাফেররা সারাজীবন ধরে জিজিয়া কর নিতে রাজি হবে কিন্তু গো-হত্যা করতে দিতে রাজি হবে না।’

কিন্তু সেই তুর্কি আমলেও শিরহিন্দি খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। অর্থাৎ তার মতবাদ কেউ গ্রহণ করত না। সেই আমলে নিষ্ঠাবান মুসলমানের অভাব ছিল না। কিন্তু তারা কেউই অমানুষ ছিলেন না, মুসলমান না হওয়ার অপরাধে কেউ নরহত্যা ও অত্যাচার করতে রাজি হতে চাইতেন না। শিরহিন্দির আবেদন-নিবেদন সীমাবদ্ধ ছিল আমীর-ওমরাহদের প্রতি, সাধারণ মানুষ নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন না। বঙ্গ-ভারতীয় লোক-ইসলামের বিলুপ্তি সাধন করে শিরহিন্দি কট্টরপন্থর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সমন্বয়ধর্মী তত্ত্ব নির্মূল করে তিনি শরিয়ত-ভিত্তিক এক গোঁড়া সুফিবাদের প্রবর্তন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ ভারতে সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বালিয়েছিলেন। এই আগুন পরবর্তীকালে সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে।

সম্রাট মুহী-আল-দ্বীন আওরঙ্গজেবের আমলে শিরহিন্দির স্বপ্ন অনেকটাই রাজধর্মে রূপায়িত হয়। শিরহিন্দির তত্ত্বে বিশ্বাসী আওরঙ্গজেব শরিয়ত অনুযায়ী দেশশাসন করতে লাগলেন। আগেই বলেছি, ভারতে ইসলামের প্রসারে সুফিদের মাজারগুলো বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। শিরহিন্দি মাজারকে শেরেকি গুনাহ মনে করতেন। আওরঙ্গজেবের কাছেও তাই মনে হলো। মুসলমানদের মধ্যে শেরেকি বা অংশবাদী প্রথা দূর করতে তিনি কবরের ওপর যে কোনো ধরনের নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। নিষিদ্ধ করলেন বিভিন্ন সুফি-সন্তের মাজার জেয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রাও। সামরিক অভিযানের সময় মন্দির ধ্বংসের, সুলমান মাহমুদ বা বখতিয়ার খিলজি যেমনটি করেছিলেন, নীতিকে আওরঙ্গজেব পুনঃরুজ্জীবিত করলেন। এই নীতি অনুসারে পালামৌ, কুচবিহার, রাজস্থান এবং পরে দাক্ষিণাত্যের মন্দিরগুলি নির্দয়ভাবে ধ্বংস করা হয়। বারানসী ছিল শাহজাদা দারাশুকোর জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রভূমি। বারানসীর ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সভা-সমিতিতে সুফিবাদের বিখ্যাত পণ্ডিত মুহাম্মদী নিয়মিত উপস্থিত থেকে ‘বেদান্ত’ ও ‘উপনিষদে’র নিগূঢ় বিষয়সমূহের জ্ঞানলাভ করতেন। সে-কারণে বারানসীই আওরঙ্গজেবের হিন্দুদলনের সবচেয়ে অনুকূল স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। সোমনাথের মন্দিরসহ অনেক মন্দির তিনি গুজরাটের গভর্নর থাকাকালীনই ধ্বংস করেছিলেন। পরে সেগুলি নানা সময়ে পুননির্মিত হয়। নতুন ফরমানে তিনি আবার সেগুলি ধ্বংসের নির্দেশ দিলেন।
আওরঙ্গজেবের কট্টর শরিয়তি বিধানসমূহ ভারতীয় মুসলমান সমাজ থেকে সমন্বয়বাদ এবং বহু শতাব্দী সঞ্চিত তথাকথিত ‘কুসংস্কার’ বিতাড়নে কিছুটা সাহায্য করেছিল বটে। সাহায্য করেছিল হিন্দুদের ওপর ইসলামের ক্ষমতা বলবৎ করতে। কিন্তু বিনষ্ট করেছিল মোগল সাম্রাজ্যের সুনাম ও শুভেচ্ছা, যা সম্রাট আকবরের সময় থেকে হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর বর্ষিত হয়েছিল করুণাধারার মতো। তখন হিন্দুরা ছিল মোট জনসংখ্যার তিন চতুর্থাংশ। সুতরাং অচিরেই মারাঠা, জাঠ, রাজস্থানী, শিখ প্রভৃতি হিন্দুশক্তিরা বিদ্রোহ শুরু করল। সেসব বিদ্রোহ ও বৈষম্যজনিত অন্য নানা কারণ সমগ্র মোগল সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে তুলে।
মোগল সাম্রাজ্যের ভাঙনের কালে উদ্ভাস ঘটল আরেক কট্টরপন্থীর, তার নাম শাহ্ ওয়ালিউল্লা দেহলভি। মক্কা ও মদিনায় শিক্ষিত এ কট্টরপন্থী লোকটি শিরহিন্দির মতোই নকশবন্দিয় সুফি। তিনিও বঙ্গ-ভারতীয় সহজিয়া ইসলামকে অস্বীকার করে সপ্তম শতাব্দীর আরবীয় কট্টরপন্থার ইসলামকেই এদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন। কাফের দমন করে ভারতকে তিনি পরিণত করতে চাইলেন ‘দারুল ইসলাম’ বা ইসলামের দেশে; যা করেননি সুলতানি আমলের সম্রাটগণ, মোগল আমলের সম্রাটগণ―একমাত্র আওরঙ্গজেব ছাড়া। শিরহিন্দির মতো তিনিও প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন কাফের হিন্দুদের দমনে। সৈয়দ আতহার আব্বাস রিজভীকৃত ‘শাহ ওয়লিউল্লা ও সমকালীন রাজনীতি’ গ্রন্থ সাক্ষী দিচ্ছে, দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে ওয়ালিউল্লা দিল্লির মোগল সম্রাটকে লিখেছিলেন :
‘সম্রাটকে ইসলামি শহরে এই মর্মে ফরমান জারি করতে হবে যে কাফেররা হোলি খেলা, ধর্মীয় স্নান ইত্যাদি যেসব ধর্মীয় উৎসব পালন করে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।’
দেহলভি কতটা কট্টর শরিয়তপন্থী ছিলেন সেই প্রমাণ পাওয়া যায় তার ‘হুজাজ্জাতাল্লা আল বালিঘা’ গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন :
‘শিশুকে যেমন করে তেতো ওষুধ খাওয়ায় ঠিক তেমন করে মানুষের গলার মধ্যে শরিয়ত ঢুকিয়ে দিতে হবে। এটা তখনই সম্ভব হবে যখন অমুসলমানদের নেতাদের হত্যা করা হবে। শক্তি ক্ষয় করা হবে তাদের। তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা হবে যে ওই সব অমুসলমান নেতাদের অনুগামী এবং বংশধররা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করবে।’
শাহ ওয়ালিউল্লার মৃত্যুর পর তার কট্টরপন্থী নীতি বাস্তবায়নে চেষ্টা শুরু করলেন সৈয়দ আহমদ বেরলবি নামের আরেক কট্টরপন্থী। ‘তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া’ নামে, যা ইতিহাসে ‘ভারতীয় ওয়াহাবি আন্দোলন’ নামে পরিচিত, জেহাদি সংগঠন গঠন করে হিন্দুধর্ম তথা পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে এবং হিন্দুদের মদতদাতা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বিশ্বজুড়ে আল্লার রাজত্ব কায়েম করার তত্ত্বে পরম বিশ্বাসী ছিলেন এই ইসলামি পণ্ডিত। ধারণা করতে পারি, ওয়াহাবিবাদ তিনি নিয়েছিলেন সৌদি আরবের ওয়াহাবি মতবাদের প্রবর্তক মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের কাছ থেকে। কে এই আবদুল ওয়াহাব? ইবনে ওয়াহাবের জন্ম ১৬৯১ সালে আরবের নজদের অন্তর্গত আয়না শহরে। হাম্বলি সুন্নি সম্প্রদায়ের এই ধর্মতাত্ত্বিকের শিক্ষাদীক্ষা প্রাথমিকভাবে তার পিতার কাছেই। পরে তিনি মক্কা, বাগদাদ ও বসরার ইসলাম-চর্চাকেন্দ্রগুলিতে শিক্ষালাভ করেন ইসলামের নিগূঢ় তত্ত্বসমূহ। ঐসব শহরের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারগুলিতে নিঃশেষে আত্মস্থ করেন ‘ফিকহ’ সংক্রান্ত যাবতীয় গ্রন্থ। এরপরে যৌবনে উপনীত হয়ে পিতার সঙ্গে তীর্থভ্রমণে বের হন। মক্কায় হজ করার পর উপস্থিত হন মদিনায়। সেখানে নবীর সমাধি বা রওজা দেখে শ্রদ্ধাপ্লুত হয়ে স্থির করেন সেখানে কিছুদিন অতিবাহিত করবেন। সে সময়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ ইবনে ইব্রাহিম ছিলেন মদিনার বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক। ইবনে ওয়াহাব তারই পদতলে বসে শিখলেন ইসলামি নীতি ও স্মৃতিশাস্ত্র। ফলে সম্পূর্ণ হলো শিক্ষাদীক্ষা। তিনি ফিরে এলে নিজের শহর আয়না। প্রচার করতে লাগলেন ‘বিশুদ্ধ’ ইসলামের কথা। তিনি অনুভব করলেন, মুসলমানরা সামগ্রিকভাবে নবীর মূল ‘এলাহিয়াত’ বা একেশ্বরবাদ ভুলে গিয়ে নানা অংশবাদী বা শেরেকির চর্চা শুরু করেছে। আল্লাহর মহিমা আরোপ করছে কোথাও পীর-আওলিয়াদের ওপর, কোথাও সমাধি-দরগা বা মাজার ইত্যাদি স্থাপত্যের ওপর। মুসলমানরা বাস করছে আরো নানা ধরনের কুসংস্কারের মধ্যে। সুতরাং তিনি সমস্ত মুসলমানকে বিশুদ্ধ এলাহিয়াত শেখাতে উঠেপড়ে লাগলেন। বললেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মানুষ বা স্থাপত্যের ওপর আল্লাহত্ব আরোপ করা শেরেক বা মহাপাপ। এ ব্যাপারে তিনি কোরান-হাদিসকে অভ্রান্ত মেনে বাকি সব ইসলাম প্রবক্তাদের অভিমত অগ্রাহ্য করলেন।
দিনে দিনে আবদুল ওয়াহাবের ভক্ত-শিষ্যের সংখ্যা বেড়ে চলল। তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভীত ও রুষ্ট হলেন জেলাশাসক। ফলে ওয়াহাবকে ছাড়তে হলো তার জন্মশহর। তল্পিতল্পা গুটিয়ে তিনি উপস্থিত হলেন ডেরাইয়াতে। সেখানকার শাসক মহম্মদ ইবনে সৌদ আশ্রয় দিলেন তাকে। শুধু আশ্রয়ই দিলেন না, ওয়াহাবের পাণ্ডিত্য ও বাগ্মীতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতেও আগ্রহী হলেন। ওয়াহাবের মেয়েকে বিয়ে করলেন ইবনে সৌদ। এবার সৌদ নিজেই প্রচার করতে লাগলেন ওয়াহাবিবাদ। দিগ্বিজয় করতে লাগলেন জামাতা ও শ্বশুর।

১৭৬৩ সালে সৌদের মৃত্যুর পর ওয়াহাবিবাদ প্রচারের দায়িত্বে এলেন সৌদপুত্র আবদুল আজিজ। তার আমলে সমগ্র আরবদেশ ওয়াহাবিবাদের পদানত হলো। কিন্তু শত্রুসংখ্যাও কম বাড়ল না। আবদুল আজিজ একদিন ডেরাইয়ার মসজিদে নামাজরত অবস্থায় একজন ইরানি ঘাতকের ছুরিতে তার জীবনাবসান ঘটল। ফলে ওয়াহাবিবাদের নেতৃত্বে এলেন আজিজপুত্র সৌদ। সৌদই ওয়াহাবিবাদকে ছড়িয়ে দেয়ার মনস্থ করলেন তুরস্কে। কিন্তু তুরস্কের অধিকাংশ মুসলমান ওয়াহাবিবাদকে স্বাভাবিকভাবে নিলো না। অটোম্যান সৈন্যদের সঙ্গে কয়েকবার সংঘর্ষও হলো সৌদের। এরপর সৌদ আক্রমণ করলেন মেসোপটেমিয়ার কারবালা। ধ্বংস করলেন বিভিন্ন মাজার তথা যাবতীয় অংশবাদ বা শেরেকির স্থাপত্য। হুসেনের সমাধি থেকে ছোট ছোট তামাকের পাইপ পর্যন্ত তার ধ্বংসকা- থেকে রেহাই পেল না। সেই বছরের শেষে মদিনাও করতলগত হলো সৌদের। সেখানে অংশবাদের যাবতীয় চিহ্নসমেত ইসলামের নবীর রওজাও আক্রান্ত হলো। আগেই বলা হয়েছে, মাজারকে ওয়াহাবিরা শেরেকি গুনাহ মনে করত। নবীর সমাধিও তো একটা মাজার। সেহেতু তাদের শিকার এবার নবীর মাজার বা রওজা। ধ্বংস করে ফেলা হলো রওজার গম্বুজের যাবতীয় অলংকার। প্রায় আট বছর ধরে সৌদ মক্কার ইসলামি উম্মার নেতৃত্বে রইলেন।
ওদিকে ওয়াহাবিবাদীদের সর্বগ্রাসী প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন অটোম্যান সম্রাট। তিনি আলী পাশাকে নির্দেশ দিলেন ওয়াহাবিদের দমন করতে। আলী পাশা ওয়াহাবিদের পরাস্ত করে পুনরুদ্ধার করলেন মক্কা ও মদিনা। ১৮১৪ সালে সৌদের মৃত্যুর পর ওয়াহাবিদের নেতা হলেন সৌদের জ্যোষ্ঠপুত্র আবদুল্লাহ। তিনি পিতার মতো সাহসী হলেও মানুষ চিনতেন না। ফলে তুরস্কের সঙ্গে কয়েকবার যুদ্ধে প্রচুর শক্তিক্ষয় হলো ওয়াহাবিদের। শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহ ইব্রাহিম পাশা কর্তৃক বন্দি হয়ে নীত হলেন কনস্টান্টিনোপলে। ১৮১৮ সালে সেন্ট সোফিয়ার এক চৌকে তার প্রকাশ্য ফাঁসি হলো। এভাবেই নির্মূল হলো ওয়াহাবিবাদের রাজনৈতিক শক্তি; যদিও তাদের তত্ত্ব আজও জাগরুক আরবের মরুভূমিতে।
ওয়াহাবিরা নিজেদের বলত ‘মুয়াহিদ’ বা একেশ্বরবাদী। অন্যদের বলত মুশরিক বা অংশবাদী। ওয়াহাবিদের মূল তত্ত্বগুলো হলো : ১. তারা আল্লাকে হস্তপদ ইত্যাদি অঙ্গযুক্ত মনে করে না, ২. তারা মনে করে দ্বীনের প্রশ্নে যুক্তি-তর্কের কোনো স্থান নেই। দ্বীন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর কোরান-হাদিস থেকেই সংগ্রহ করতে হবে, ৩. আইন প্রণয়নের প্রশ্নে ঐক্যমতকে অগ্রাহ্য করতে হবে। দ্বীনীয় রীতি-নীতিতে সংগ্রাহকের মত গ্রহণীয় নয়। যারা ওসব মতামতে বিশ্বাস করেন তাদের ইসলামে অবিশ্বাসী বলেই গণ্য করতে হবে, ৪. সব রকমের নজিরকে অগ্রাহ্য করতে হবে, ৫. যেসব মুসলমান ওয়াহাবি মতবাদের শরীক নন তাদের গণ্য করতে হবে ইসলামে অবিশ্বাসী বলে, ৬. কোনো পীর-ফকিরকে আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ মাধ্যম বলে স্বীকার করা চলবে না, ৭. পীর-ফকিরের মকবারা বা মাজার দর্শন অবৈধ, ৮. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর ইবাদত বা ভজনা নিষিদ্ধ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ নেওয়াও নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ পীর-ফকিরের মাজারে-মকবারাতে কোনো রকম উৎসর্গও।
তাহলে দেখা যাচ্ছে সৌদি আরবের ওয়াহাবিবাদ এবং ভারতের সৈয়দ আহমদ বেরলবির তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া আন্দোলনের মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। সুতরাং আমরা বেরলবির মতবাদকে ‘ভারতীয় ওয়াহাবি আন্দোলন’ হিসেবে ধরে নিতেই পারি। তবে সৌদি আরবের মূল ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল ইসলামের পুনরুজ্জীবন আন্দোলন আর তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া ছিল ইসলামায়িত হিন্দুদের পূর্ণ ইসলামায়ন আন্দোলন ও সঙ্গে সঙ্গে ভারতে এক দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও। কিন্তু দুর্ভাগ্য বেরলবির, ভারতবর্ষে ওয়াহাবি মতবাদ প্রচার ও এই দেশকে ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বালাকোটের যুদ্ধে মর্মান্তিকভাবে তিনি নিহত হন।
সৈয়দ আহমদ বেরলবি যখন হজ্বযাত্রার উদ্দেশে কলকাতায় আসেন তখন বহু বঙ্গবাসী মুসলমান তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এসব শিষ্যের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বারসতের মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। পেশাদার কুস্তিগীর ছিলেন তিনি। যৌবনে নদীয়ায় এক হিন্দু জমিদারের অধীনে লাঠিয়ালদের সর্দারি করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন এবং বিচারে কারাদণ্ড ভোগ করেন। কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে যশোহর জেল থেকে বেরিয়ে তিনি বেরলবির ‘তরিকায়ে মুহাম্মদিয়ায় যোগ দেন। এই তিতুমীর পরবর্তীকালে শরিয়তি বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামের প্রবেশ ঘটান বাংলাদেশের লোকায়ত ইসলামে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজজীবনে।

তিতুমীর তার এলাকায় তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া তথা বেরলবির অনুসারী ওয়াহাবিদের নিয়ে দল গঠন করে স্থানীয় মুসলমানদের বাধ্য করলেন নাম পরিবর্তন করতে, আরবীয়দের মতো জোব্বা পরতে, লম্বা দাড়ি রাখতে। উনিশ শতকের শুরুতে বঙ্গদেশের সাধারণ গ্রাম্য মুসলমানের পরিধেয় ছিল ধুতি। তিতুমীর ফতোয়া জারি করলেন, কাছা দিয়ে কাপড় পরা চলবে না। কেন? কারণ কোরান-হাদিসের কোথাও ধুতির কথা উল্লেখ নেই। তাই ধুতি পরা বাদ দিতে হবে। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন, গোঁফ ছাটতে হবে, দাড়ি রাখতে হবে, কামাতে হবে মাথার মাঝখানটা। তিনি ফতোয়া জারি করলেন, পুরোপুরি আরবি মুসলমানি নাম রাখতে হবে। তিনি স্থানীয় সহজিয়া মুসলমানদের পুরনো নাম পাল্টে নতুন নতুন আরবি নামও দিতে লাগলেন। সেই আমলে মুসলমান প্রজারা হিন্দু জমিদার ও তালুকদারদের বাড়িতে পূজা-পার্বণে ভেট পাঠাত। পরিবর্তে তাদের অনুষ্ঠানে পাতা পেতে খিচুড়ি ও প্রসাদ খেতো বিনা দ্বিধায়। তিতুমীর এই ভেট পাঠানো ও হিন্দুদের ধর্মানুষ্ঠানে খাওয়া দুটোই বন্ধ করতে বললেন। কারণ শরিয়ত অনুযায়ী একজন মুসলমান ‘কেতাবি’ খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের সঙ্গে একসঙ্গে আহার করতে পারে, কিন্তু পৌত্তলিক হিন্দুদের সঙ্গে আহার নিষিদ্ধ। অর্থাৎ তিতুমীরের কাছে হিন্দুদের তুলনায় খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা অপেক্ষাকৃত গ্রহণীয় ছিল। কারণ খ্রিষ্টান-ইহুদিদের ‘আসামানি কেতাব’ (তওরাত, যবুর ও ইঞ্জিল) আছে, হিন্দুদের তো কোনো আসমানি কেতাব নেই। সুতরাং হিন্দুদের সর্বাত্মকভাবে বর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে তিতুমীর গ্রাম বাংলার সম্প্রীতির বাতাবরণ বিষাক্ত করে তুললেন। বিনষ্ট করলেন তৎকালীন ধর্ম-সামাজিক ভারসাম্য। এতেই শঙ্কিত হয়ে উঠল হিন্দুসমাজ। বহু শতাব্দী ব্যাপী তুর্কি শাসনের দুঃস্বপ্ন থেকে হিন্দুসমাজ তখন সবে জেগে উঠছে।

ইংরেজরা বিধর্মী হলেও মূলত সাম্রাজ্যবাদী। সাম্রাজ্যের স্বার্থেই তারা হিন্দুদের ধর্মাচরণে তেমন হস্তক্ষেপ করত না। সেই আমলে খ্রিষ্টান মিশনারীদের প্রচার ছিল ঠিকই। ছিল তাতে সরকারি সমর্থনও। কিন্তু তারা অন্তত গো-মাংস খাইয়ে হিন্দুদের জাত মারার জন্য ব্যগ্র ছিল না। হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে পানাহারে আপত্তি করত না। ফলে তিতুমীরের কর্মকাণ্ড মোটেই ভালো ঠেকল না স্থানীয় জমিদারদের। তারা আরেক কট্টরপন্থী আওরঙ্গজেবের উদ্ভব আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। লর্ড কর্নওয়ালিশ প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণ জমিদার-তালুকদাররা তখন গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট শক্তিশালী। তিতুমীরের আচার-আচরণে তারা দেখলেন তাদের স্বাদু জলের পুকুরে কোথা থেকে বেনোজল ঢুকছে। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতিময় সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ ঢুকছে। সুতরাং জমিদারা এই নতুন বিভেদপন্থীদের শায়েস্তা করার সুযোগ খুঁজতে লাগলেন।
এদিকে সাবেকি বা সহজিয়া মুসলমানরা, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া লৌকিক সংস্কারগুলো ছাড়তে পারেনি, তারাও তিতুমীরের ওপর বিরক্ত হলো। তারা তিতুমীরের কর্মকাণ্ডকে ভালো চোখে দেখত না তার প্রমাণ সমসাময়িক সাহিত্যেও পাওয়া যায়-
এই মুল্লুকেউ সেই ওহাবীর ফছাদ
আসিয়া পৌঁছিল কত ঘটিল বিবাদ
(আকবর-ই-পীর-ই নজদ : আবদুল কাদির)
সাবেকি সহজিয়া মুসলমানরা মহরমের দিনে স্থানীয় দরগাতে ‘নজর’ দিত। তিতুমীর ও তার সাগরেদরা এসবের বিরোধিতা করত, এসবকে তারা ‘বেদাত’ বা ‘কুসংস্কার’ বলত। তারাগানিয়া গ্রামে একবার তিতুমীরের সাগরেদরা মহরম অনুষ্ঠানে বাধা দেয় এবং দরগায় লাথি মারে। এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলমানরা স্বভাবতই তিতুমীরের ওপর যারপরনাই বিরক্ত হয়। তার মানসিকতাও তারা পছন্দ করল না। তার বিরুদ্ধে তারা নালিশ করল জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের কাছে। শুরু হলো জমিদারের সঙ্গে তিতুমীরের বিবাদ, শুরু হলো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত। জমিদার ওয়াহাবিদের দাড়ির ওপর করারোপ করলেন। মনে রাখা দরকার, জমিদারের শত্রুতা কিন্তু সহজিয়া মুসলমানদের সঙ্গ নয়, ওয়াহবিদের বিরুদ্ধে।
পরের ইতিহাস তো আমাদের সবারই জানা। জমিদারের সঙ্গে তিতুমীরের সংঘর্ষ থামাতে স্বাভাবিক কারণেই হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হলো ইংরেজ সরকার। মামলা হলো তিতুমীর ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। ফলে হিন্দুদের মতো ইংরেজ সরকারও তিতুমীরের বিরোধী পক্ষ হয়ে গেল। তিতুমীরের সাগরেদরা নারকেলবেড়িয়ার মৈজুদ্দিন বিশ্বাসের জমিতে অজস্র বাঁশ দিয়ে এক বুরুজ বানাল, যেটি পরিচিতি লাভ করল ‘বাঁশের কেল্লা’ নামে। সেই কেল্লায় তারা অস্ত্রশস্ত্র জমাতে লাগল। ঐ কেল্লা থেকেই তিতুমীর ঘোষণা করলেন হিন্দু ও ব্রিটিশ-বিরোধী যুগপৎ আন্দোলন। কীভাবে হিন্দু-বিরোধী? তিতুমীর যেদিন আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন সেদিনই তার অনুসারীরা পুঁড়ার বাজার আক্রমণ করে মহেশ চন্দ্র ঘোষের একটা গরু ছিনিয়ে নিয়ে সেটি মন্দিরের সামনে কেটে গরুর রক্ত ছিটিয়ে দিল মন্দিরের গায়ে ও বিগ্রহে। লুট করল অসংখ্য হিন্দুবাড়ি, একজন হিন্দুকে বিবস্ত্র করে মারধর করল। তার জিহাদ যদি শুধু ইংরেজদের বিরুদ্ধেই হয় তাহলে হিন্দুদের ওপর তার এই অত্যাচার কেন? তিতুমীরের এই সাম্প্রদায়িক জেহাদি কর্মকাণ্ড দমনে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলো ইংরেজ সরকার। সরকারি বাহিনীর গোলার আঘাতে ধ্বংস হলো তার বাঁশের কেল্লা, পঞ্চাশজন জেহাদিসহ মারা গেলেন তিতুমীর।

এই হচ্ছে তিতুমীর, এই হচ্ছে তার বাঁশের কেল্লা। ইতিহাসে তিতুমীরকে ‘হিরো’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তিতুমীরের আন্দোলন শোষক-শোষিতের আন্দোলন! এই ইতিহাস ভুল ইতিহাস, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস। কেউ কেউ তিতুমীরের আন্দোলনকে কৃষক আন্দোলনও বলেছেন। আমার প্রশ্ন, তিতুমীরের আন্দোলনের মধ্যে কোথাও কি শোষক বনাম কৃষক চেতনার উন্মোষ ঘটেছিল? জমিদাররা তিতুমীরের অনুসারীদের দাড়ির ওপর আড়াই টাকা কর ধার্য করেছিলেন। ১৮৩১ সালের আড়াই টাকা মানে বর্তমানের অনেক টাকা। তিতুমীরের অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল সেই কারণে? মোটে না। ওই আড়াই টাকা দু-একজন দিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু তিতুমীর উত্তেজিত হয়েছিলেন শরিয়তে আঘাত লাগার জন্য। জরিমানাটা দু-পাই হলেও তিতুমীর মেনে নিতেন না। কারণ দাড়ি রাখাটা কোনো ফ্যাশনের ব্যাপার নয়, শরিয়তি আচার। এখানে কৃষক-চেতনা পর্যবসিত হয়েছিল মোমিন-চেতনায়। জমিদারদের সর্বদা মুশরিক কাফের হিসাবেই দেখছিলেন তিতুমীর। বাকি খাজনার দায়ে দু-একজনকে মারধর করার মধ্যেও সেই কাফের বনাম মোমিন চেতনাই বিরাজ করছিল। জমিদারেরা তিতুমীরের শরিয়তি মানসিকতা মেনে নিচ্ছিলেন না। সংঘর্ষের চেতনা সবসময়ই ছিল মোমিন বনাম কাফের।
ঐতিহাসিক থর্নটন তার ‘হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ায়’ বলেছেন, জরিমানা ধার্য করার উদ্দেশ্য ছিল জমিদারদের আয় বৃদ্ধি। কিন্তু আয় বৃদ্ধিই যদি জমিদার কৃষ্ণদেবের উদ্দেশ্য থাকত তাহলে জরিমানার হার হতো আড়াই পয়সা, আড়াই টাকা নয়। দাড়িটা যদি ফ্যাশন হতো তাহলে অসন্তোষ প্রকাশ করেও সবাই আড়াই পয়সা দিয়ে দিত। আয় বাড়ত জমিদারের। কিন্তু জরিমানাটা প্রতিরোধমূলক, অর্থাৎ কট্টরপন্থীদের দমনের জন্য, ছিল বলেই তার হার ছিল অত্যন্ত চড়া। এছাড়া জমিদাররা কয়েকজনের দাড়িও কেটে দিয়েছিলেন। সুতরাং থর্নটনের বক্তব্য ধোপে টেকে না।
অনেক ঐতিহাসিক তিতুমীরের অনুসারী জোলাদের বিদ্রোহের উৎসে অর্থনৈতিক কারণ নির্দেশ করলেও তেমন কোনো যুক্তির অবতারণা করতে পারেননি। বক্তব্যের সমর্থনে তারা ভারতীয় তাঁতিদের ওপর বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু বিদ্রোহটা শুধু বশিরহাট অঞ্চলে হলো কেন? শান্তিপুর, ফুলিয়া, ধনেখালি, বেগমপুর অঞ্চলে হলো না কেন তার সঙ্গত কারণ কেউ নির্দেশ করতে পারেননি। তাছাড়া ‘জোলা’ শব্দটি খুবই শিথিল। বহিরাগত মুসলমানরা ভারতীয় হিন্দু বংশজাত মুসলমানদের জোলা বলত। যেমন ভক্ত কবীর জোলা ছিলেন। জোলা মাত্রই তাঁতি নয়। তিতুমীরের শরিয়তি আন্দোলনে তাঁতিরা ছিল ঠিকই। তার কারণ অন্য ভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। তাঁতিদের কাজ বাড়ির মধ্যে, কৃষকদের মতো খোলা মাঠে লাঙ্গল দিয়ে এধার থেকে ওধার মাটি কাটা নয়। সুতরাং অনবরত কানে মন্ত্রণা দিয়ে নতুন একটা মতবাদে দীক্ষিত করার পক্ষে তাঁতিরা সুবিধাজনক, কৃষকরা নয়। তিতুমীর ইসলামের ইতিহাস বা ‘দ্বীনের তারিখ’ শেখাতে বাড়ি বাড়ি ফিরতেন। এ বাড়ি বাড়ি আক্ষরিক অর্থেই তাঁতিদের বাড়ি বাড়ি। তাছাড়া আশপাশের গ্রামগুলিতে জোলাদের আধিক্যও জোলাদের অংশগ্রহণের একটা বড় কারণ।
অনেকে আবার নীলকরদের অত্যাচারের কথা বলেন। বলেন, তিতুমীর নিলকরদের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নীলকররাই আগ বাড়িয়ে তিতুমীরের অনুসারী মৌলবিদের সঙ্গে শত্রুতা করেছিল। মৌলবিরা গোঁড়া থেকে নীলকরদের বিরোধিতা করেনি, নীলকররাই তিতুমীরের অনুসারীদের নতুন আপদ বলে চিহ্নিত করেছিল। আবার নীলকররা তিতুমীরকে বাদশাহ বলে মেনে নিয়ে কর দিতে চাইলে তিতুমীর তা মেনে নিয়েছিলেন। নীলকরদের সামগ্রিক উৎসাদন তিতুমীর কখনোই চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ‘দারুল ইসলাম’। সেই দারুল ইসলামে ‘কেতাবি’ খ্রিষ্টানরা জিজিয়া কর দিয়ে জিম্মি হতে চাইলে তিতুমীর আপত্তি করেননি। সুতরাং কৃষক বনাম নীলকর, শোষিত বনাম শোষক চেতনা তীতুমীরের আন্দোলনে অনুপস্থিত। তার আন্দোলন মূলত শরিয়তি আন্দোলন। শরিয়তি আন্দোলন মানে বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে, পৌত্তলিক হিন্দুদের বিরুদ্ধে এবং খ্রিষ্টান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন।

তিতুমীর আধা-ইসলামি মানবতাবাদী বঙ্গীয় জনগোষ্ঠীকে পূর্ণ ইসলামায়িত করতে গিয়ে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্বই প্রচার করেছিলেন। সমন্বয়বাদী আধা-মুসলমানদের মানসিকতার পরিবর্তন করার জন্য তিনি এবং তার পূর্বসূরীরা যা প্রচার করেছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণ অমানবিক, এ দেশের সংস্কৃতি বহির্ভূত একটি অকাজ। একইভাবে ফরায়েজি আন্দোলনও কিন্তু পূর্ণ-ইসলামায়নবাদী বা তথাকথিত সংস্কারবাদী আন্দোলন। এই আন্দোলন প্রবর্তন করেছিলেন হাজী শরিয়তউল্লা। তার মৃত্যুর পর আন্দোলনের ধারা বহন করে চলেন তার পুত্র দুদু মিঞা ও পৌত্র নোয়া মিঞা। ওয়াহাবি আন্দোলনের মতো ফরাজিরা গোড়া থেকেই জেহাদের ডাক দেয়নি। তারা সারা দেশে শরিয়ত প্রবর্তনেই গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তারাও ব্রিটিশ শাসন বাতিল করে দেশকে দারুল ইসলামে পরিণত করার প্রচেষ্টায় ছিল। দেশকে দারুল হরব ঘোষণা করেছিল তারা। ফরাজিদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সংঘর্ষ শুরু হলো যখন ফরাজি প্রভাবিত কৃষকদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য জমিদার ও নীলকরদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল সরকার। ফরাজিদের মধ্যে বহুসংখ্যক ওয়াহাবি মতাদর্শী জেহাদে অংশ নিয়েছিল বলে মনে করা হয়। কারণ সাধারণ ইংরেজ বিরোধী মানসিকতায় সবকটি মৌলবাদী আন্দোলনই এককাট্টা ছিল। এসব মৌলবাদী আন্দোলন স্বতই হিন্দুবিরোধী হয়ে উঠেছিল। কারণ দেশে খ্রিষ্টান রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকলেও তাত্ত্বিক দিক দিয়ে পৌত্তলিক হিন্দুরা ‘কেতাবি’ খ্রিষ্টানদের থেকেও ঘৃণ্য বলে মনে করত তারা।
ফরাজিরা গোটা দেশজুড়ে, বিশেষত বাংলার দক্ষিণপূর্বের জেলাগুলিতে এক সমান্তরাল সরকার চালাতে থাকে। তাদের বিনা অনুমতিতে কেউ ব্রিটিশ সরকারের কোনেনা সংস্থায় যেতে পারত না। তিতুমীরের মতোই ফরাজিরা যে হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের বিরোধিতা করল তাই নয়, সাবেকি সহজিয়া মুসলমানদেরও বিরোধিতা করল। তিতুমীরের মতো ফরাজিরাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিমণ্ডল বিনষ্ট করেছিল গ্রামবাংলায়। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এই সত্যকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার কোনো সুযোগ নেই। ব্রাহ্মণ ও হিন্দু দেবদেবীর অপমান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করত না ফরাজিরা। ১৮৩১ সালের ৭ এপ্রিল ফরিদপুর জেলার শিবচরে হাজী শরীয়তউল্লার পারলৌকিক অনুষ্ঠানের শেষে ৭টি গ্রামের ৭৬টি বাড়ি লুট করেছিল ফরাজিরা। ব্রাহ্মণদের বাড়িতে ঢুকে লুটপাট করে বহু দেবমূর্তি ভেঙেছিল। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল তাদের মতবাদে দীক্ষিত হতে অস্বীকৃত এক সহজিয়া মুসলমানকে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শায়খ আহম্মদ শিরহিন্দি ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন সেই আগুন দেহলভি, বেরলবি, তিতুমীর, হাজী শরীয়তউল্লা ও দুদু মিঞাদের হাত হয়ে সাড়ে তিন’শ বছর ধরে ধূমায়িত হতে হতে একসময় প্রবল বেগে প্রজ্জ্বলিত হয়ে বিচ্ছিন্ন করেছে উপমহাদেশের মৈত্রীসূত্র। বিচ্ছিন্নতার এই ঘোলা জলে মাছ শিকার করল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

ওয়াহাবি-ফরাজি আন্দোলনের পরবর্তীকালে বাঙালি মুসলমানদের একটা শ্রেণি যে সহজিয়া ইসলামের পরিবর্তে কট্টর ইসলামি ভাবাদর্শ গ্রহণ করতে শুরু করল তার পেছনে ওয়াহাবি ও ফরায়েজি আন্দোলনের যেমন ব্যাপক ভূমিকা ছিল, তেমনি ছিল হিন্দুসমাজের ভূমিকাও। কীভাবে? ইতিহাসের গভীরে যে সত্য প্রবাহিত হচ্ছে সেই সত্য সাক্ষী দিচ্ছে, ওয়াহাবি ও ফরায়েজি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির পরিমণ্ডল দূষিত হয়। এ ব্যাপারে সন্দেহের কেনো অবকাশ নেই। শিরহিন্দি, দেহলভি, বেরলবি, তিতুমীর ও শরীয়তউল্লার জীবন এবং কর্মকাণ্ড ভালো করে পাঠ করলেই বিষয়টা টের পাওয়া যাবে। ওয়াহাবি ও ফরায়েজি আন্দোলন এক বৃহৎ সংখ্যক মুসলমানকে বাকি দেশবাসীর কাছ থেকে আলাদা করে দেয়। চলনে-বলনে-পোশাকে-আশাকে তারা এ দেশের স্থানীয় মুসলমানদের থেকে, যারা সমন্বয়বাদী সহজিয়া বা সাবেকি মুসলমান, সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। আর ভুলটা এখানেই করেছে হিন্দুসমাজ। ওয়াহাবি ও ফরায়েজি তত্ত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ হিন্দুরা মুসলমান-মাত্রকেই ওয়াহাবি বা ফরাজি বলে ভাবতে শুরু করল। জমিদাররাও জ্ঞানে-অজ্ঞানে যে কোনো অবাধ্য মুসলমান প্রজাকে ওয়াহাবি বা ফরাজি বলে চিহ্নিত করতে লাগলেন। লেখা বাহুল্য, গ্রাম বাংলার সব মুসলমান কিন্তু ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনে যুক্ত ছিল না। গণহারে সবাইকে ওয়াহাবি ও ফরাজি তকমা দেয়াটা ছিল বড় ধরনের একটা সামাজিক ভুল।

ওয়াহাবি ও ফরাজি বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং হিন্দুসম্প্রদায়ের অজ্ঞতাজনিত ভুলের নেতিবাচক প্রভাব পড়ল মারাত্মকভাবে। সংখ্যাগুরু হিন্দুসমাজ কর্তৃক তকমা-খাওয়া মুসলমানরা সামাজিকভাবে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ল। ফলে তারা বিচ্ছিন্ন হতে থাকে দেশের অন্য জনসাধারণের কাছ থেকে। তাদের আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দিল। স্বাভাবিকভাবেই তারা মনোনিবেশ করল ইসলামি শরিয়তের দিকে। তারা বঙ্গভূমিকে আর নিজেদের দেশ ভাবতে পারে না, তারা খুঁজতে থাকে নিজেদের শেকড়। তারা যে বঙ্গভূমিরই সন্তান এই সত্যটি তারা মেনে নিতে পারছিল না। তারা ভাবল নেহাত দুর্ভাগ্যবশত এই পোড়া দেশে জন্ম হয়েছে তাদের। ফলে তারা চর্চা করতে লাগল মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতি। নিজেদের সম্পূর্ণভাবে আরবীয় মুসলমান ভেবে মুসলমানদের সুবর্ণ অতীত নিয়ে বিলাপ করতে লাগল। শরিয়তি ইসলাম তাদের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে আরব জাতীয়তাবাদ রূপে। ইসমাইল হোসেন সিরাজীকেও দেখা যায় এই বিলাপ করতে। তার ‘অনল প্রভা’য় তিনি লিখেছেন :
‘কোথা সে ভারতের স্বর্ণ সিংহাসন
কোথা সে স্পেনের মহিমা কেতন
কোথা সে আরবের প্রতাপ তপন
সকলি কি আজ ঘোর অন্ধকার?’
ওয়াহাবি ও ফারাজিরা এবং হিন্দুসমাজ কর্তৃক তকমা খাওয়া মুসলমানরা তাদের সন্তানদের নাম দিতে লাগল আরবিতে। আগে বাংলার মুসলমান সমাজে স্থানীয় রীতিতে খুড়ো-পিসি ইত্যাদি সম্মোধন চলত। স্বর্গ শব্দটির ব্যবহার ছিল। সৃষ্টিকর্তা অভিহিত হতেন শ্রীশ্রী হক, শ্রীশ্রী ঈশ্বর, শ্রীশ্রী করিম ইত্যাদি নামে। ওয়াহাবি-ফরাজি ও তকমা-খাওয়া মুসলমানদের সম্মোধন পরিবর্তিত হলো চাচা, খালায়। স্বর্গ পরিবর্তিত হলো বেহেস্তে। সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লা, আল্লাহ আকবর বা আল্লাহ গণি। শ্রী শ্রীযুক্ত ইত্যাদি বাতিল হয়ে হলো জনাব, মীর। বাঙালি মুসলমানদের রচিত পুস্তকের নাম হতে লাগল আরবিতে। বাঙালি মুসলমানরা পোশাক-আষাকেও হিন্দুদের থেকে অভিন্ন ছিল। নব চেতনার ফলে মুসলমানরা ধুতি-চাদর পরা ছাড়তে লাগল। এসব পোশাকের মধ্যে তারা হিন্দুত্ব অনুভব করতে লাগল। একইভাবে ভাষার মধ্যে যতদূর সম্ভব তৎসম শব্দ ছেঁটে ফেলে প্রবিষ্ট করতে লাগল আরবি-ফারসি শব্দ। উর্দু এবং ফারসি শেখার ঝোঁক বাড়ল তাদের মধ্যে। তারা উৎসাহিত হয়ে উঠল আরব, তুরস্ক ও পারস্যের ইতিহাস চর্চায়। ওইসব দেশ সম্পর্কে রচিত হতে লাগলো নানা কল্পনিক কাহিনি। তাতে লেখা হলো ওই সব দেশ হচ্ছে সব পেয়েছির দেশ। বঙ্গীয় মুসলমানরা নিজেদের পরিচয় দিতে লাগল মীর, সৈয়দ, পাঠান ইত্যাদি বিশেষণে। বাঙালি বলতে তারা শুধু বাঙালি হিন্দুদেরই বুঝতে লাগল। ১৮৭২ সালের লোকগণনায় দেখা গেল বঙ্গীয় মুসলমানরা নিজেদের বাঙালি বলছেন না। ছোট্ট একটা নমুনা হিসেবে হুগলীর ত্রিবেণীর উল্লেখ করা যেতে পারে। ত্রিবেণীর সমস্ত হিন্দু নিজেদের বাঙালি বলে জানাচ্ছেন। কিন্তু মুসলমানরা নিজেদের জানাচ্ছেন সৈয়দ, শায়খ, পাঠান বলে। উনিশ শতকের শুরুতে আবদুল হায়াত পূর্ববঙ্গের একটি মুসলমান-প্রধান গ্রামে গিয়ে মোড়লের মুখে শুনলেন, ‘হুজুর, এগ্রামে খালি মুসলমানরাই আছেন, এ গ্রামে বাঙালির বাস নাই।’
এভাবে পুরো উনিশ শতক জুড়ে জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানরা বিচ্ছিন্ন হতে লাগল প্রতিবেশি হিন্দুদের থেকে। সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রসারণশীল ও সংঘবদ্ধ হতে লাগল। হিন্দু ও মুসলমান এ দুটি সম্প্রদায় একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হেঁটে বেড়াত এক সময়। কিন্তু শিরহিন্দি, দেহলভি, বেরলবির উত্তরসুরী হাজী শরিয়তউল্লা-তিতুমীরের পূর্ণ ইসলামায়ন আন্দোলনের ফলে দেখা গেল এই হিন্দু-মুসলমানরা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে একে অপরের দিকে ক্রুদ্ধদৃষ্টি মেলে। সেই ক্রুদ্ধদৃষ্টির পরিণামই তো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। স্বীকার করি, দাঙ্গার নেপথ্যে ব্রিটিশের স্বার্থ ছিল, দেশীয় কায়েমী স্বার্থ ছিল; রাজনীতি, অর্থনীতি, আধিপত্যও ছিল। কিন্তু এ কথাও স্বীকার করতে হবে, দাঙ্গার পেছনে বহু কারণের মধ্যে উল্লেখিত কট্টরপন্থীদের প্রচারিত বিচ্ছিন্নতাবাদও অন্যতম কারণ ছিল।
যাই হোক, এভাবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ বঙ্গীয় মুসলমান সহজিয়া ইসলমি সংস্কৃতিকে পরিত্যাগ করে আরবীয় কট্টর ইসলামের অনুসারী হতে লাগল। আবারও বলছি, এর পেছনে ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের ভূমিকা যেমন ছিল তেমনি ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের অজ্ঞতা, একরোখামি, একদেশর্শিতার ভূমিকাও।

সমকালীন সহজিয়া ইসলামের সন্ধান
উপরের আলোচনায় বিষয়টি পরিষ্কার যে, বাংলায় সলামের রূপ দু-প্রকারের―শরিয়তি রূপ বা কট্টরপন্থা ও মারেফতি রূপ বা সহজপন্থা। কট্টরপন্থা আগেও ছিল, এখনো আছে। একইভাবে সহজপন্থা আগেও ছিল, এখনো আছে। বর্তমান বাংলাদেশে কট্টরপন্থা কারা চর্চা করছে সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে জানা যাক সহজিয়াপন্থীদের পরিচয়। কট্টরপন্থীদের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীন সহজিয়াপন্থীরা কি এই সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে? না, হারিয়ে যায়নি। গ্রামগঞ্জে এখনো বঙ্গীয় ইসলামের সেই সহজিয়া সমন্বয়বাদী রূপটি দেখা যায়। আগেই বলেছি, সুফি প্রচারকদের সমাধিস্থল বা মাজারগুলি তীর্থস্থান হিসেবে ভারতে ইসলাম প্রচারে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এখনো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে শত শত মাজার। যেমন চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারিয়া দরবার শরীফ, বায়েজিদ বোস্তামির মাজার, সিলেটের শাহজালাল ও শাহ পরাণের মাজার, রাজশাহীর শাহ মাখদুমের মাজার, বাগেরহাটের খান জাহান আলীর মাজার, ঢাকার শাহআলী বোগদাদির মাজার, গোলাপ শাহর মাজার। এ ছাড়াও বাংলাদেশের কত জায়গায় কত নামে কত মাজার যে আছে তার প্রকৃত কোনো শুমার নেই। এসব মাজারকে কেন্দ্র করে ধর্মব্যবসা চলছে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমার প্রসঙ্গ বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামের সন্ধান। এসব মাজারকে কেন্দ্র করে যে সংস্কৃতিটা চালু আছে তা আরবীয় ওয়াহাবিবাদী ইসলামি সংস্কৃতি নয়, বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামি সংস্কৃতি। মাজারভক্তদের মধ্যে রয়েছে মিলাদ, কেয়াম, উরস ও গান-বাজনার প্রচলন, যা বঙ্গীয় সংস্কৃতি প্রভাবিত। সাংস্কৃতিকভাবে মাজারভক্তরা উদার। তারা জঙ্গিবাদকে, ধর্মীয় বাড়াবাড়িকে, গোঁড়ামি বা কট্টরপন্থাকে প্রশ্রয় দেয় না। মাজারে মুসলমানরা যেমন যায় তেমনি যায় হিন্দুরাও। তাতে মুসলমান ভক্তদের তথাকথিত ধর্মানুভূতিতে কোনো আঘাত লাগে না। কোনো কোনো মাজারে ভক্তরা পীরের সমাধিকে সেজদা করে, পীর জীবিত থাকলে পীরকেও সেজদা করে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যেই তারা ঈশ্বরের সন্ধান করে। মানুষের মধ্যে ইশ্বরের সন্ধান কিন্তু শরিয়তি ইসলাম স্বীকার করে না। আল্লা ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা দেয়া শরিয়তে হারাম। কিন্তু সহজিয়া মুসলমানরা তো শরিয়তের ধার ধারে না। তাদের ইসলাম তো রূপান্তরিত বঙ্গীয় ইসলাম। তাদেরকে আরবীয় মৌলিক ইসলামের কথা বললে তারা মানবে কেন?

সমকালীন সহজিয়া ইসলামের রূপ-১
বাংলা-ভারতের বিস্তারিত ইতিহাস পড়তে গিয়ে যখন ইসলামের বঙ্গীয় রূপটির সন্ধান পাই, তখন থেকেই আমি বঙ্গীয় ইসলামের সহজিয়া রূপটির সন্ধান শুরু করি। এই রূপ আমি অনেকবার দেখেছি, কিন্তু ইতিহাসটা জানতাম না বলে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি।
২০১৩ সালের কথা। নিমন্ত্রণ পেয়ে একদিন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলাধীন দিঘলিয়া গ্রামে আবেদ ফকিরের বাড়িতে যাই। নামেই বোঝা যায় মরহুম আবেদ ফকির একজন পীর ছিলেন। তার মৃত্যবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর সেখানে পালাগানের আয়োজন করা হয়। রাতভর গানবাজনা চলে। মনে রাখা দরকার, গান-বাজনা কিন্তু শরিয়তি ইসলাম স্বীকার করে না। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে আবেদ ফকির কেন্দ্রিক যে ইসলাম, তা বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলাম।
পৌষের কনকনে শীতে আবেদ ফকিরের বাড়িতে পৌঁছি রাত প্রায় দশটা। বাড়ির ঘাটায় ছোটখাটো মেলা বসেছে। লাকড়ির চুলোয় ডালপেঁয়াজু ভাজা হচ্ছে। তারই পাশে অস্থায়ী চা-বিস্কিট, পান-সিগারেটের অস্থায়ী দোকান। বাড়ির উঠোনের একপ্রান্তে সার বেঁধে বসা নারী-পুরুষরা খানাপিনায় ব্যস্ত―ডালখিঁচুড়ি আর খেজুর-গুঁড়ের পায়েস। অন্যপ্রান্তে বিশাল জায়াগজুড়ে সামিয়ানা টাঙানো। খড় বিছিয়ে তার উপর কার্পেট বিছানো। মাঝখানে ছোট্ট একটা জলচৌকির উপর চার-পাঁচটি মোম ও আগরবাতি জ্বলছে। ‘আসন’ বলা হয় সেটিকে। আসন সামনে নিয়ে বসে আছেন আবেদ ফকিরের ‘বড় ছেলে’ বানেজ আলী। ঔরসজাত ছেলে নেয়, আত্মাজাত। অর্থাৎ প্রধান মুরিদ। চিশতিয়া তরিকার পীরদের সঙ্গে মুরিদদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের।
বনেজ আলীর বয়স প্রায় ৬০। মুখে লম্বা সাদা দাড়ি, গলায় একটি রঙিন কাগজের ফুলের মালা। সামনে যে আসনটি নিয়ে তিনি বসে আছেন সেটার কী মাহাত্ম্য? ভক্ত-শিষ্যদের বিশ্বাস, যখন পালাগান শুরু হবে তখন মরহুম আবেদ ফকিরের আত্মা এই আসনে উপবেশন করবে। এ কারণেই আসনটি পাতা হয়েছে। তার মানে এরা আত্মাবাদী, আত্মার অবিনশ্বরতায় বিশ্বাসী। আসনের বিপরীত দিকে বেহালা হাতে বসে আছেন রোগা-পাতলা চেহারার দীর্ঘ চুল বিশিষ্ট বাউল আতিক সরকার, তার পাশে মিনারা সরকার। আমন্ত্রিত হয়ে তারা সদলবলে টাঙ্গাইল থেকে এসেছেন। সঙ্গে এসেছে তাদের দোহাররাও। তাদের সঙ্গে আছে ঢাক-ঢোল-বাঁশি-হারমোনিয়াম-জুড়ি-মন্দিরাসহ নানা বাদ্যযন্ত্র।
রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ পালাগান শুরু হলো। বেহালায় সুর তুলে গান শুরু করলেন আতিক সরকার। বেহালার সুরে তেমন মাধুর্য নেই, খানিকটা একঘেঁয়ে এবং বেখাপ্পা। আর গান মানে ছন্দে আর সুরে নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, পীর-আওয়ালিয়া বন্দনা ইত্যাদি মিলিয়ে একটা দীর্ঘ পাঁচালি। টানা পনের মিনিট চলল এই পাঁচালি।
এরপর দাঁড়ালেন মিনারা সরকার। আতিক সরকারের চেয়ে তার গানের গলা কিছুটা ভালো। ছন্দে ছন্দে সুরে সুরে মিনারা সরকার নিজের নাম-সাকিনের বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। তার সুরেলা কণ্ঠ, শব্দের স্পষ্ট উচ্চারণ, বলার ভঙ্গি এবং ছন্দ-তাল মুগ্ধ হওয়ার মতো। ঠিক মধ্যযুগীয় রীতি। পূর্ববঙ্গ গীতিকায় যেমন কাহিনি শুরুর আগে গীতিকার নিজের পরিচয় আর আশপাশের গ্রামগঞ্জ নগর বন্দর নদী সমুদ্র যা আছে সব কিছুর বন্দনা করে তেমনি। মিনারা সরকারও তাই করছেন। গান শেষে বখশিসও পেলেন হাজারখানেক টাকা।
রাত গভীর থেকে গভীর হয়, গানে গানে চলে আতিক ও মিনারা সরকারের লড়াই। গান শুনতে যারা এসেছেন তারা আবেদ ফকিরের ভক্ত-শিষ্য। তাদের মনযোগ গানের দিকে। একপর্যায়ে দেখি, সারির ওমাথা থেকে একজন একটি বিড়ি ধরায়, দুই টান দিয়ে সেটা পাশের জনকে দেয়। সে দুই টান দিয়ে তার পাশের জনকে দেয়। একটা বিড়ি ভাগাভাগি করে সাত-আটজন মিলে টানছে। ভাবি, বিড়ির কি এতই আকাল লাগল দেশে! একজন জানাল, না বিড়ির আকাল নয়, এক বিড়ি সাত-আটজন মিলে টানার মধ্যে একটা মাহাত্ম্য আছে। কী সেই মাহাত্ম্য? মিল-মহব্বতের বন্ধন। ভাগাভাগি করে খাওয়ার মধ্যে কী আনন্দ সেটা তারা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়।
দুই পালাকার পালা অব্যাহত রাখেন। পালার বিষয় ইসলামের নবী ও বিবি ফাতেমা। কথাগুলো খুবই হালকা চালের। গানের যে ভাব, তাও তেমন গভীরতাপূর্ণ নয়। কিন্তু যখন গানের ফাঁকে ফাঁকে পালাকার কৌশলে এক-আধটু ভাবের কথা ঢুকিয়ে দেন তখন উপস্থিত শ্রোতাবৃন্দের অন্তর নরম হয়ে ওঠে। মাথা হেঁট করে তারা এদিক-সেদিক দোলায়। মাঝেমধ্যে ‘আহ্ হা হা’ করে বেদনাদীর্ণ আর্তনাদ করে ওঠে। পালাকার যখন পালার মধ্যে আরেকবার ভাবের কথা বলেন তখন শ্রোতারা বসা থেকে উঠে হাটুমুড়ে পরস্পরের সঙ্গে গলাগলি করে শুরু করে। পরস্পরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে এদিক-সেদিক দোলে আর হুহুস্বরে কাঁদে। একজনকে ছেড়ে দিয়ে আরেকজনকে ধরে, কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে ভিজিয়ে দেয় তাদের চোখ, নাক, মুখম-ল। কিছুক্ষণ পরপরই, যখন পালাকার তুঙ্গস্পর্শী ভাবের কথা বলে ওঠেন, এ দৃশ্যের অবতারণা হয়। অনেকটা বৈষ্ণবদের নামসংকীর্তনের মতো।
খেয়াল করি, তারা যে গলাগলি করে কাঁদছে, তার মধ্যে কোনো কৃত্তিমতা নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতাও। যে যখন যাকে ইচ্ছে তাকে ধরে গলাগলি করে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে কেউ মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছে, পড়ে থাকছে। মাঝেমধ্যে দেখি, কেউ কেউ বানেজ আলীর সামনে উপুড় হয়ে সেজদার ভঙ্গিতে তাকে তাজিম করছে। সেই দৃশ্য দেখে পালাকর কৌশলে তার গানে আরেকটু ভাব ঢুকিয়ে দেন। কান্না তখন আরও গতি পায়। বানেজ আলী, যিনি সুসজ্জিত আসন সামনে নিয়ে বসে আছেন, তিনি তাদের বর্তমান গুরু। তার মধ্য দিয়ে তারা আবেদ ফকিরের কাছে পৌঁছতে চাচ্ছে। আবেদ ফকির কে? তিনি তাদের গুরু, তাদের মুর্শিদ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এরা বুঝি নবী বা বিবি ফাতেমার কাহিনি শুনে কান্নাকাটি করছে। না, কাহিনিটা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। মূল লক্ষ প্রথমত আবেদ ফকির, দ্বিতীয়ত বানেজ আলী। দ্বিতীয়জনকে উপলক্ষ্য করে প্রথমজনের কাছে পৌঁছতে চাচ্ছে তারা। কেননা প্রথমজনের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বর। তার মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ। ঈশ্বর-অন্বেষণের এই পদ্ধতি শরিয়তি ইসলাম সমর্থন করে না, এটা একান্তই বঙ্গীয় ইসলামের রূপ, বঙ্গীয় ইসলামি সংস্কৃতি।

সমকালীন সহজিয়া ইসলামের রূপ-২
এক রোজার ঈদের পরের দিন গাজীপুরের হোতাপাড়াবাসী আয়োজন করেছে কবিগানের আসরের। নিমন্ত্রণ পেয়ে আমিও হাজির হলাম আসরে। বিভিন্ন উৎসব-আনন্দে কবিগানের আয়োজন করেন তারা। স্থানীয়রা বলে ‘বাউল গানের আসর’। দূরদূরান্ত থেকে বাউলদের আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে। বাউলদের দুটি দল। একটির দলনেতা শাহীন সরকার, অন্যটির রীনা সরকার। সন্ধার পরপরই আসর শুরু হলো। দর্শকসংখ্যা প্রায় দুই শ। মঞ্চে ঢোল-তবলা-হারমোনিয়াম-জুড়ি নিয়ে দোহররা বসে। সামনের মাঠে তেরপল বিছানো। ছোটরা বসেছে তেরপলের উপর এবং বড়রা সারি সারি প্লাস্টিকের চেয়ারে।
রাত আটটা নাগাদ স্থানীয় মোড়ল আবু তাহের মঞ্চে উঠে পালাকাররা কী পালা গাইবেন তা নির্ধারণ করে দিলেন―‘আদম ও শয়তানের পালা’। অর্থাৎ আল্লা কর্তৃক আদম সৃষ্টি ও শয়তান কর্তৃক আদমকে সেজদা না করা প্রসঙ্গের পালা। ‘শয়তানের পালা’ গাওয়ার জন্য মঞ্চে উঠলেন শাহীন সরকার। আটত্রিশ বা চল্লিশের মতো বয়স তার। ক্লিনসেভ করা মুখ, কুচকালো গোঁফ, মাথার ঝাঁকড়া চুল পেছনে মুঠো করে বাঁধা। মঞ্চে বসা দোহারদের প্রত্যেকেরই চুল প্রায় এরকম। তাদের বয়সও খুব বেশি নয়। বিশ থেকে শুরু করে চল্লিশ।
শাহীন সরকার বেহালা হাতে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। ঢোল তবলা বাঁশি হারমোনিয়াম জুড়ির সমবেত বাজনা শুরু হলো। সে কি সুর বাঁশির! মনপ্রাণ উতালা করা সুর। শুধুই বাজনা চলল মিনিট পাঁচেক। তারপর শুরু হলো গান, মানে পালা। পালার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এই যে, আদমসৃষ্টির শুরু প্রসঙ্গে গায়েন বলতে শুরু করলেন, আল্লাহ আদম সৃষ্টির জন্য তিনবার ফেরেশতাদের পাঠালেন পৃথিবী থেকে মাটি নেওয়ার জন্য। কিন্তু মাটি প্রতিবাদ করল। পৃথিবী মাটি দিতে নারাজ। তৃতীয় বারের সময় আল্লা খোদ আজরাইল ফেরেশতাকে পাঠালেন মাটি নেওয়ার জন্য। আজরাইল তার সর্বগ্রাসী শক্তি দিয়ে মাটির তীব্র প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে মাটি নিয়ে হাজির হলো আরশে আজিমে।
এখানে এসে গায়েন প্রশ্ন করলেন, আল্লাহ তো সর্বশক্তিমান। তার শক্তির কাছে মাটি কোন ছার! তিনি যদি সর্বশক্তিমান হয়েই থাকেন, পৃথিবীর সব কিছু যদি তারই নির্দেশ মেনে চলে, তবে মাটির এত বড় দুঃসাহস হলো কী করে যে, সে মাটি দিতে প্রতিবাদ করল?
গায়েন বয়ান করে চলেন, মানব জাতি সৃষ্টির আগে আল্লাহ প্রথমে পৃথিবীতে জিন জাতি সৃষ্টি করলেন। কিন্তু তারা পাপাচারে এত বেশি লিপ্ত হয়ে পড়ল, আল্লাহ তাঁর গজবের ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন পৃথিবীর সকল জিন জাতি ধ্বংস করে দিতে। ফেরেশতারা তাঁর নির্দেশ মোতাবেক ধ্বংসলীলায় মেতে উঠল। পৃথিবীর সব জিন ধ্বংস হলো। কিন্তু ফেরেশতাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু জিন পাহাড়ে, জঙ্গলে, গুহায় আশ্রয় নিয়ে ফেরেশতাদের রোষানল থেকে রেহাই পেল।
গায়েন প্রশ্ন করলেন, আল্লাহ তো সর্বদ্রষ্টা। পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা তাঁর অগোচরে। তাই যদি হয় তবে কিছু জিন যে পাহাড়ে, গুহায়, জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে জানে বেঁচে গেল, তিনি তা দেখলেন না কেন? দেখেছেন, নাকি দেখেও না দেখার ভান করেছেন। গায়েনের প্রশ্ন, এটা কি ন্যায় বিচার হলো আল্লার?
গায়েন বয়ান করে চলেন, আজরাইলের নেতৃত্বে গজবের ফেরেশতারা জিন জাতি ধ্বংস করে আসমানে ফিরে যাচ্ছিল। যাবার পথে দেখল আড়াই হাজার বছর বয়সী এক জিনশিশু তার স্বজন-পরিজন হারিয়ে পথের ধারে একা বসে কাঁদছে। তাকে দেখে আজরাইলের মায়া হলো। আজরাইল তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল আসমানে। শিশুটির কথা সে আল্লার গোচরে আনলো। আল্লা তার অধীনস্ত অন্যতম ফেরেশতা আজরাইলের ইচ্ছাকে অবজ্ঞা করলেন না। কিন্তু আসমানে এই জিনশিশু খাবে কী? না খেলে তো সে বাঁচবে না! তাই আল্লার হুকুমে তার জন্য এক বিশেষ ব্যবস্থা করা হলো। শিশু তার তর্জনী চুষলে দুধ বের হবে আর মধ্যমা আঙুল চুষলে মধু বের হবে। এভাবে অলৌকিক দুধ আর মধু খেয়ে খেয়ে ‘মকরম’ বা আজাজিল বড় হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। আল্লার রহমত পাওয়ার আশায় সে এবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকল। সাত আসমানের এমন কোনো জায়গা বাকি থাকল না যেখানে আজাজিলের সেজদা পড়ল না। তার এবাদত-বন্দেগিতে খুশি হয়ে আল্লা জাতিভেদ প্রথা বিলুপ্ত করে আগুনের তৈরি আজাজিলকে নূরের তৈরি ফেরেশতাদের সর্দার বানিয়ে দিলেন। যাকে বলে মুয়াল্লিমুল মালায়েকাহ। আযাযিল যথারীতি ফেরেশতাদের নেতার পদ অলঙ্কৃত করে তাদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে লাগল। তার উপর আল্লার হুকুম এল, সে যেন ফেরেশতাদের বলে দেয় যে, সে এবং ফেরেশতারা আল্লাহ ছাড়া কোনো কিছুকে যেন সেজদা না করে। আল্লার ফরমান যথারীতি পালন করতে লাগল আযাযিল ও তার অধীন ফেরেশতারা।
তারপর আল্লাহ আদম সৃষ্টি করলেন। আদমের ভেতর যখন আল্লা রুহ দিলেন তখন ফেরেশতাদের নির্দেশ দেয়া হলো তাকে সেজদা করতে। সব ফেরেশতা তাই করল, কিন্তু আযাযিল দাঁড়িয়ে রইল। হুকুম অমান্য করার কৈফিয়ত তলব করলেন আল্লাহ।
গায়েন বলে চলেন, আযাযিল বলল, হে আল্লা, আপনিই তো নিষেধ করেছেন আপনি ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে যেন সেজদা না করি। আমি আপনার কথার অবাধ্য হইনি সারা জীবন। আপনাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে সেজদা করি কিভাবে? এখন আপনি আবার বলছেন মাটির আদমকে সেজদা করতে। শুনেছি হাকিম নড়ে কিন্তু তার হুকুম নড়ে না। আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি সর্বশক্তিমান। আপনি যখন তখন পূর্বনির্দেশ বাতিল করে নতুন নির্দেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু তার আগে তো আপনার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সদস্যদের সঙ্গে একটু আলাপ আলোচনার দরকার ছিল, যেভাবে আলাপ-আলোচনা করেছিলেন আদম সৃষ্টির আগে। কিন্তু এখন কারো সঙ্গে আলাপ না করে আপনি যে মনগড়া নির্দেশ দিয়ে দিলেন এটা কি গণতন্ত্র হলো? তাছাড়া আপনি আগে বলেছেন কী, আর এখন বলছেন কী? আপনি তো আল্লাহ। আপনার হবে এক জবান। আপনি এক জবানে দুই কথা বলেন কীভাবে? শয়তান আমি নাকি আপনি?
গায়েন তার গানে গানে যে যুক্তি উপস্থাপন করলেন তার জবাব কী হতে পারে তা আমার জানা নেই। ইসলামি পণ্ডিতরাও এসব প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত কোনো উত্তর দিতে পারবেন না। এই গায়েনরা গানে গানে রঙ্গরসিকতায় গ্রামবাংলায় যে বিদ্যা প্রচার করছেন তা যুক্তিবিদ্যা। ধর্মের অন্ধকার কানাগলি থেকে মানুষকে মুক্ত করে একটা যুক্তিপূর্ণ জায়গায়, চিন্তার জায়গায় নিয়ে আসার জন্য এই গায়েনরা যৌক্তিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। গান-বাজনা ও যুক্তিপূর্ণ কবিগানের মধ্য দিয়ে তারা যে ধর্ম চর্চা করছেন তা বাঙালি মুসলমানের ধর্ম। ধর্মের নামে কঠোরতাকে, বাড়াবাড়িকে তারা অপছন্দ করেন। তারা মানবতাবাদী।

সমকালীন সহজিয়া ইসলামের রূপ-৩
একদিন, হেমন্তের শিশিরস্নাত এক ভোরে চলে যাই বিক্রমপুর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের পটভূমি পদ্মাপারের গ্রাম গাওদিয়ায়। পদ্মারপারে গাওদিয়া বাজার। আমার সঙ্গে ঢাকার রোদেলা প্রকাশনীর প্রকাশক রিয়াজ খান। হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে আসি রিয়াজ খান কথিত সেই হারু ঘোষের খালের ধারে। একটা বন্ধ দোকানের পাকা পাটাতনে বসি। হাঁটে অচেনা আমাদেরকে দেখে একটা লোক এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কই থেকে এসেছ গো তোমরা বাবা?’ আমরা আমাদের পরিচয় জানালাম। লোকটা আমাদের সঙ্গে করমর্দন করে তার নাম-পরিচয় জানালেন। নাম তার শেখ আবদুল মান্নান। লোকে বলে মান্নান শেখ। বয়স প্রায় সত্তরের কোঠায়। তবে শরীরটা এখনো বেশ শক্ত। কাঁধ পর্যন্ত পাকা বাবরি চুল, বুক অবধি সাদা দাড়ি। চোখে হাই পাওয়ারের কালো ফ্রেমের চশমা। গাওদিয়া বাজারের কাঠের কারবারি তিনি। কাঠমিস্ত্রি।
কথাপ্রসঙ্গে মান্নান শেখ জানালেন, তিনি নোয়াখালীর সেনবাগের মরহুম পীর মাওলানা আবদুল মতিনের শিষ্য। মারেফতি ভাষায় যাকে বলে ‘মুরিদ’। মতিন পীরকে তিনি ‘বাবা হুজুর’ বলে ডাকতেন এবং এখনো ‘বাবা হুজুর’ বলেই সম্বোধন করেন। প্রতি বছর মতিন পীরের দরগায় উরস হয়। উরসের সময় তিনি সেনবাগ চলে যান।
আমি আন্দাজি তীর ছুঁড়লাম, ‘আপনি তো মতিন মাওলানাকে সেজদা করতেন?’
মান্নান শেখ বললেন, ‘হ্যাঁ, করতাম। এখনো তার মাজারকে সামনে রেখে সেজদা করি।’
বললাম, ‘আল্লাহ তো লা-শারিক। তার কোনো শরিক নেই। তাকে ছাড়া আর কাউকে সেজদা করা কি শেরেকি গুনাহ নয়?’
মান্নান শেখ চুপ করে গেলেন। ডান হাতের আঙুলে লম্বা দাড়িগুলো আঁচড়াতে লাগলেন। মনে হলো প্রশ্নটি তিনি এড়িয়ে যেতে চাইছেন। আমি আবারও প্রশ্নটি করলাম। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি উত্তর দিলেন, ‘শোনো বাবা, আমি লালন সাঁইর দরগায় কখনো যাইনি। তিনি কোন তরিকার তাও জানি না। তবে তার একটা কথা আছে, ‘আপন সাধন কথা, না কহিও যথা তথা।’ তাই আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না বাজান।’
কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা, জবাব আমার জানা চাই। আমার জোরাজুরিতে মান্নান শেখ জবাব দিতে বাধ্য হলেন। বললেন, ‘যিনি মুর্শিদ তিনিই খোদা/ দুইজনে নয় আলাদা।’
এই বলে তিনি চুপ করলেন। তার এই উক্তির মর্মার্থ যে আমি বুঝিনি তা নয়। বুঝেছি। তবু তার কাছ থেকে ব্যাখ্যা শুনতে চাইলাম। কিন্তু তিনি এই বিষয়ে আর কথা বলতে চাচ্ছেন না। আমি বললাম, ‘তাহলে তো নামাজ পড়ার দরকার নেই। নামাজ কেন পড়েন?’
মান্নান শেখ এবার খানিকটা বিরক্তই হলেন বুঝি। বললেন, ‘আমি তো এই সমাজে বসবাস করি নাকি? সমাজে বসবাস করতে গেলে সমাজের অন্যদের মতো করে চলতে হয়। আমি যদি নামাজ না পড়ি কেউ আমাকে গ্রামে ঠাঁই দেবে? কাফের-বেদ্বীন বলে তাড়িয়ে দেবে না? মরার পর কেউ জানাজা দেবে? নইলে কে পড়ত নামাজ! শোনো বাজান, সৃষ্টিকর্তার আলাদা কোনো রূপ নাই। নবীপাকের ভেতর দিয়েই সৃষ্টিকর্তা জাহির হয়েছেন। যুগে যুগে তিনি জাহির হবেন মানুষের ভেতরেই। আমার বাবা হুজুরের ভেতর দিয়েই তো পাক মওলার প্রকাশ। তাকে সেজদা না করে আমার উপায় কী?’
মান্নান শেখ তার বাবা হুজুরের (মতিন পীর) নানা কেরামতির কথা শোনাতে লাগলেন। একদিন মতিন পীরের বাড়িতে তার আট-দশজন শিষ্য মিলে একটা মোষ জবাই করবে। কিন্তু মোষটাকে কিছুতেই শোয়াতে পারছে না। দড়ি দিয়ে চার পা বাঁধতে চাচ্ছে, কিন্তু পেরে উঠছে না। অগত্যা মতিন পীরকে ব্যাপারটা জানানো হলে তিনি এসে মোষটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘যা, পরের জন্মে মানুষ হয়ে আসবি।’ সঙ্গে সঙ্গেই মোষটা শুয়ে পড়ল। দেরি না করে ভক্ত-শিষ্যরা মোষটিকে জবাই করে দিলো।
আমি মান্নান শেখের কাছে জানতে চাইলাম, ‘আচ্ছা, মতিন মাওলানা কি জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতেন?’
মান্নান শেখ বললেন, ‘অবিশ্বাসের কী আছে বাজান? জন্মান্তরবাদ তো সত্য। চুরাশি লক্ষ যোনি পেরিয়ে চুরাশি লক্ষ বার জন্ম-মৃত্যুর পরই তো মানব জনম লাভ হয়।’
খেয়াল করা দরকার, মতিন পীরের ‘যা, পরের জন্মে মানুষ হয়ে আসবি’ কথাটার মধ্যে কিন্তু উপনিষদীয় জন্মান্তরবাদতত্ত্ব স্পষ্ট। উপনিষদীয় দর্শনে নানাভাবে মানুষের পুনর্জন্ম বিষয়ক তত্ত্ব ব্যক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কোনো মানুষই হঠাৎ মানুষরূপে ভূমিষ্ঠ হয় না। জীবজগতে চুরাশি লক্ষ যোনি পেরিয়ে চুরাশি লক্ষ বার জন্ম-মৃত্যুর পর মানব জনম লাভ হয়। তার মধ্যে পর্যায়ক্রমে তিরিশ লক্ষ বার বৃক্ষযোনিতে, নয় লক্ষ বার জলচর মৎস্যযোনিতে, দশ লক্ষ বার কৃমিযোনিতে, এগারো লক্ষ বার পক্ষীযোনিতে, বিশ লক্ষ বার পশুযোনিতে ঘুরতে ঘুরতে সর্বশেষ গাভি-যোনি হয়ে মানব-যোনিতে ক্রম উত্তরণের মধ্য দিয়ে মানবজন্ম ঘটে। এই জন্মান্তরবাদ কিন্তু আরবীয় ইসলাম স্বীকার করে না, বঙ্গীয় ইসলাম স্বীকার করে। তার মানে হিন্দু দর্শনকে কবুল করে নিয়েছে বঙ্গীয় ইসলামি দর্শন। এই হচ্ছে বঙ্গীয় ইসলামের রূপ।

সমকালীন কট্টরপন্থীর সন্ধান
পূর্বোক্ত শিরহিন্দি, দেহলভি, বেরলবি, শরিয়তউল্লা ও তিতুমীরের ওয়াহাবিবাদী কট্টরপন্থার উত্তরসুরী হচ্ছেন বর্তমান বাংলাদেশের ওয়াহাবি বা ‘কওমি’ তরিকার অনুসারীরা, অধুনায় যারা হেফাজতে ইসলামের অনুসারী। এদের বর্তমান নেতা হচ্ছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক শাহ আহমদ শফী। ওয়াহাবিবাদের অনুসারী আরো একটি দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামি। এদের তাত্ত্বিক নেতা পাকিস্তানের সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী, বাংলাদেশের স্থানীয় নেতা সদ্যমৃত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম। স্বরণ করুন, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন ‘বাঁশের কেল্লা’ নামে একটি ফেইসবুক ফেইজ থেকে শাহবাগে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটাতে থাকে। ওই ফেইজটি ছিল শিবির ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রিথ। তারা পেইজটির নাম বাঁশের কেল্লা কেন দিল? এই কারণে যে, তিতুমীরের কট্টরপন্থী আদর্শই তাদের আদর্শ, তিতুমীর নির্মিত ‘বাঁশের কেল্লা’র অনুকরণেই তারা ফেইসবুক পেইজের নাম দিয়েছিল বাঁশের কেল্লা।
জামায়াত ও হেফাজত একই ইসলামি তরিকার অর্থাৎ উভয় দলই ওয়াহাবি তরিকার অনুসারী। সহজ কথায় দু-দলই ইসলামি সংস্কারবাদী, সাত শতকীয় আরবীয় ইসলামবাদী। কিন্তু পরবর্তীকালে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা পাকিস্তানের সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর কিছু কিছু বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করতে না পেরে প্রচণ্ড জামায়াত-বিদ্বেষী হয়ে পড়ে হেফাজতের অনুসারীরা। মওদুদীকে তারা ‘কাফের’ বলতেও ছাড়ল না। বর্তমানে হেফাজত ও জামায়াতের আদর্শের মধ্যে কিছুটা ফারাক থাকলেও দু-দলই বঙ্গীয় সমন্বয়বাদী ইসলামকে স্বীকার করে না। তার পরিবর্তে তারা এদেশে আরবীয় কট্টর ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কট্টরপন্থীরা যেমন ভারতবর্ষে ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, জামায়াত-হেফাজতও বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই জামায়াত-হেফাজতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশে শুরু হয় জঙ্গি তৎপরতা। হরকাতুল জিহাদ, আল্লার দল, তওহিদি ট্রাস্ট, হিজবুত তাহরীর, তামির উদ-দীন, বাংলাদেশ ইসলামী সমাজ, উলামা আঞ্জুমান, আল বাইয়্যোনাত, ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি, তানজিম ইসলামী, হরকাতুল মুজাহেদীন, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী দাওয়াত-ই-কাফেলা, মুসলিম মিল্লাত, শাহাদাৎ-ই-নবুয়ত, হিজবুল্লা শরিয়া কাউন্সিল, জইশে মোস্তফা, তওহীদি জনতা ও আল তুরাসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশকে দারুল ইসলাম বানানোর জন্য তথা এ দেশে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য জেহাদ চালিয়ে যাচ্ছে। এই জঙ্গিরা সেই ওয়াহাবিবাদের অনুসারী কট্টরপন্থী। বাংলাদেশ তাদের কাছে ‘দারুল হরব’ বা যুদ্ধের দেশ। যুদ্ধ করে তারা এ দেশে ইসলাম কায়েম করতে চায়।
হেফাজতের অনুসারী ও জঙ্গিবাদীরা সালিক তরিকার সুফিবাদকে স্বীকার করলেও এবং এই ধারার চর্চা করলেও মজ্জুব তরিকাকে তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। মজ্জুবীয় সংস্কৃতিকে তারা বেশরা কাজ বা বেদাত বা ইসলামে নতুন আবিষ্কার হিসেবে দেখে এবং এসবের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। অপরপক্ষে জামায়াত ইসলামির অনুসারীরা সালিক বা মজ্জুব কোনো তরিকাকেই স্বীকার করে না। পীরবাদ তাদের কাছে অবাঞ্ছিত। বলা বাহুল্য, সালিক তরিকা বা মজ্জুব তরিকা কোনোটাই সপ্তম শতকীয় সৌদি আরবের ইসলামে নেই, পরবর্তীকালের ওয়াহাবিবাদে নেই, আছে বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামে। তাই জামায়াত এ দুটি তরিকাকেই অস্বীকার করে। বাঙালি মুসলমানের চর্চিত সংস্কৃতিকে তথা মাজার, মিলাদ, কেয়াম, উরস, সত্যপীর, মানিকপীর, ঘোড়াপীর, মাদারীপীর ও কুমীরপীর, বনবিবিকে স্বীকার করে না জামায়াত-হেফাজত। দেওয়ালী ও বেরা ভাসান উৎসবকে তারা সহ্যই করতে পারে না। গান-বাজনাকে তারা হারাম বলে ফতোয়া দেয়। তাদের নাম হয় আরবীয় ব্যাকরণ অনুযায়ী। যেমন, কামারুজ্জামান, হেদায়াতউল্লাহ, রাহমাতউল্লাহ, রাহিম, কারিম। উল্লেখ্য, সহজিয়াপন্থীরা কিন্তু নামের ক্ষেত্রে আরবি ব্যাকরণ মানে না। তাদের নাম যথাক্রমে কামরুজ্জমান, হেদায়েতুল্লা, রহমতুল্লা, রহিম, করিম। নামগুলো কিন্তু আরবীয়, বঙ্গে এসে সহজিয়া রূপ নিয়েছে।
সহজিয়া ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে জামায়াত-হেফাজত ও জঙ্গিবাদীদের যত জিহাদ। সিলেটে শাহজালালের মাজারে জেএমবি বোমা ফাটিয়েছে এ কারণেই। একই কারণে মাজারগুলোকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেয় জেএমবি। বর্তমানে ইরাকে ওয়াহাবিতত্ত্বের অনুসারী আইএস মাজারগুলোকে গুড়িয়ে দিচ্ছে। আইএস-এর আদর্শ ও নজদের ইবনে ওয়াহাবের আদর্শ এক ও অভিন্ন। পৃথিবীর সবচেয়ে অন্ধ, বর্বর, গোঁয়াড় মুসলিম সম্প্রদায়ের নাম ওয়াহাবি। ওয়াহাবি জঙ্গিরা মসুল শহরে ধ্বংস করেছে নবী ইউনূস-এর প্রসিদ্ধ মাজার। ২০১৪ সালে প্রায় ৩০টির মতো মাজার এবং ১৫টি হুসেইনিয়া মসজিদ তারা ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন নবী হযরত দাউদ-এর মাজার, ইমাম ইয়াহিয়া ইবনে আল কাশেমের মাজার তারা উড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াহাবি জঙ্গিরা বাংলাদেশেও মাজারগুলোকে গুড়িয়ে দেয় সেখানে নাস্তিক ও হিন্দুদের জন্য টয়লেট নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিল ইতোপূর্বে। কারণ বাংলাদেশের মাজারগুলো সহজিয়া ইসলামি সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র। এতেই তাদের আপত্তি। সহজপন্থাকে তারা ভালোবাসে না, কট্টরপন্থাকেই তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। মানুষকে ধর্মের কঠিন নিগড়ে বন্দি করে তারা ফায়দা হাসিল করতে চায়।

সহজিয়ার সমর্থক একটি শরিয়তপন্থী দল
বাংলাদেশে মাজার কেন্দ্রিক ইসলামি সংস্কৃতিকে নৈতিকভাবে সমর্থন দেয় শরিয়তপন্থী একটি ইসলামি দল―আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। সংক্ষেপে তাদের ‘সুন্নি’ বলা হয়। ওয়াহাবিরা কটাক্ষ করে তাদের বলে ‘গরম সুন্নি’। বলে রাখা ভালো, আমি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত অনুসারীদের ভালো বা মন্দ কোনোটিই বলছি না, আমি শুধু জামায়াত-হেফাজত ও আহলে সুন্নাতের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রার্থকটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
আহলে সুন্নাতের অনুসারীরা ওয়াহাবিদের মতো অতটা গোঁড়া নয়, কিছুটা উদার ও প্রগতিশীল। বঙ্গীয় ইসলামি সংস্কৃতিকে তারা মোটামুটিভাবে সমর্থন করে। কখনোই জামায়াত-হেফাজত বা তাদের দোসর জঙ্গিদের সমর্থন করে না। ফেনীর মুন্সিরহাটে আমি দেখেছি পাশাপাশি দুটি মসজিদ―একটি ওয়াহাবিদের, অন্যটি আহলে সুন্নাত অনুসারীদের। অর্থাৎ আহলে সুন্নাতের অনুসারীরা ওয়াহাবিদের পেছনে নামাজ পর্যন্ত পড়তে রাজি নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি তাদের মধ্যে কিছুটা কম। বাড়াবাড়ি থাকলেও সেটা অভ্যন্তরীণ। বিধর্মীদের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি খুব একটা করে না। স্বধর্ম বিধর্মীদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে না।
২০১৩ সালে আহলে সুন্নাত অনুসারী মৌলানারা যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য প্রদান এবং সাঈদীর বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সেকারণেই একই বছর চট্টগ্রামে আহলে সুন্নাতের শীর্ষ দশ আলেমকে হত্যার পরিকল্পনা করে জামায়াত। ঢাকায় আহলে সুন্নাতের নেতা মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের পেছনেও কিন্তু ওয়াহাবিপন্থীদের নাম সন্দেহের তালিকায় উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে আহলে সুন্নাত অনুসারীদের সংখ্যাধিক্য দেখা যায়। তারা একইসঙ্গে শরিয়তি এবং মারেফাতি। হেফাজত অনুসারীদের মতো তারা জোব্বা পারে না, পরে ‘কাটা পাঞ্চাবি’; বাঙালি হিন্দুরা যে ধরনের পাঞ্চাবি পরতো। তার মানে তারা পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্য দিয়েও কিন্তু আরবীয় সংস্কৃতিকে অস্বীকার করছে। এই সুক্ষ্ম ব্যাপারটি হয়ত অনেকের চোখে ধরা পড়ে না।
অপরদিকে তারা মিলাদ পড়ে, মিলাদে কেয়ামও করে। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’র সংযোজন বা বিয়োজন নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম না হিন্দুধর্ম রাখতে হবে এ নিয়ে তারা রাজপথে আন্দোলনে নামে না। তারা কিছুটা সহনশীল, হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়বাদী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বিশ্বাস করে, ১. নবীপ্রেমে সালাত ও সালাম (যা মিলাদে পাঠ করা হয়) নবীজি নিজ কানে শুনে থাকেন, ২. তার সুপারিশে জান্নাতীদের প্রমোশন হবে এবং সুন্নি দোজখবাসীরা মুক্তি পাবে, ৩. তার সুপারিশ হবে গুনাহগারদের জন্য, বদ আক্বীদাধারীদের জন্য নয়। (বদ আক্বীদা বলতে এখানে বিশেষত ওয়াহাবিদের বোঝানো হচ্ছে), ৪. আউলিয়ায়ে কামেলিন বা পরিপূর্ণ পীর ও হক্কানি ওলামায়ে সুন্নাহগণ আল্লাহর বন্ধু। তাদের প্রার্থনা অবশ্যই আল্লাহ কবুল করেন। (আউলিয়ায়ে কামেলিন বলতে এখানে বঙ্গীয় মজ্জুব পীর-ফকিরদেরও বোঝানো হচ্ছে), ৫. আউলিয়াদের কারামত কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (স্বীকার করে নিচ্ছে বঙ্গীয় পীর-ফকিররা যেসব ‘অলৌকিক ক্ষমতা’ দেখাতেন তা কোরান-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত), ৬. উম্মতে মোহাম্মদী ৭৩ ফেরকায় বিভক্ত, ৭২ ফেরকাই জাহান্নামী। মূল দলটি হবে জান্নাতী। উক্ত নাজাতপ্রাপ্ত দলের নাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। বর্তমানে নজদিপন্থী ওয়াহাবি, মওদুদীবাদী জামায়াত, আহলে হাদিস ও তাবলীগ জামায়াতের অনুসারীরা ৭২ ফেরকার অন্তর্ভূক্ত। ৭. মাজারসমূহের জিয়ারতের উদ্দেশে সফর করা এবং জিয়ারত করা দুটোই সুন্নাত। নবীজীর রওজা মোবারক জিয়ারতের নিয়তে সফর করা হাদিসের দ্বারা সুন্নত ও ওয়াজিব প্রমাণিত। (আগেই বলেছি, ওয়াহাবিরা মাজার জিয়ারত, জিয়ারতের উদ্দেশে যাত্রাকে স্বীকার করে না। এমনকি জিয়ারতের উদ্দেশে নবীর রওজা জিয়ারতকেও তারা অস্বীকার করে), ৮. দলীয় মতবাদ প্রচারের উদ্দেশে মসজিদে মসজিদে সফর করা ও রাত্রি যাপন করা নাজায়েয। (জামায়াত মসজিদে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালায়, ওয়াহাবিবাদী তাবলিগে জামায়াত মসজিদে অবস্থান করে ধর্মীয় প্রচারকার্য চালায়। এটাকে স্বীকার করে না আহলে সুন্নাত), ৯. মিলাদে কেয়াম করা মোস্তাহাব। উক্ত মোস্তাহাব অস্বীকার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, ১০. কুলখানি, ফাতেহা, চেহলাম, উরস ইত্যাদি নিঃসন্দেহে জায়েয ও উত্তম, ১১. আউলিয়ায়ে কেরামের সম্মানার্থ মাজার পাকা করা, গিলাফ চড়ানো, মোমবাতি জ্বালানো জায়েজ।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের উপরোক্ত বিশ্বাস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হচ্ছে তারা বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামকে মোটামুটিভাবে স্বীকার করে নিচ্ছে।

আওয়ামী লীগ : সহজিয়া মুসলমানের রাজনৈতিক দল
মাথাটাকে ঠান্ডা করে অনুসন্ধিৎসু মনোভাব নিয়ে একটু তলিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যাবে যে, আওয়ামী লীগ কিন্তু সহজিয়া মুসলমানদের রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল। মাওলানা ভাসানী কিন্তু সহজিয়া মুসলমান, তিনি কট্টরপন্থী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানও সহজিয়া মুসলমান। অতীতের ও বর্তমানের আওয়ামী লীগের লাখ লাখ সমর্থকও তাই। তারা এ দেশকে দারুল ইসলাম বানাতে চায় না। তারা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি মনে করে না। এই সহজিয়া মুসলমানরাই ১৯৭১ সালে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল কট্টরপন্থী জামায়াতে ইসলামির অনুসারীরা।
প্রিয় পাঠক, আপনার আশপাশে তাকালেই দেখবেন, আওয়ামী লীগকে ওয়াহাবিপন্থীরা সমর্থন করে না। জামায়াতপন্থীরা তো নয়ই। সারা দেশ খুঁজে খুব কম ওয়াহাবিপন্থী পাওয়া যাবে, কিংবা একজনও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ, যে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা―আওয়ী লীগের ইত্যাদি মূলনীতিকেই সমর্থন করে না ওয়াহাবিপন্থীরা। এসব নীতির চরম বিরোধী তারা। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে আরব জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। সমাজতন্ত্রের নাম তো তারা শুনতেই রাজি নয়। তাদের লড়াই তো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিরুদ্ধেই।
অপরপক্ষে আওয়ামী লীগের মূলনীতিগুলোকে সমর্থন করে শরিয়তপন্থী একটি ইসলামি দল, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত। তারা বঙ্গীয় সহজিয়া ইসলামকে সমর্থন করে বলে স্বাভাবিক কারণেই তাদের সমর্থন আওয়ামী লীগের প্রতি।

প্রয়োজন সাংস্কৃতিক সংগ্রাম
ভালো হোক মন্দ হোক, বাংলাদেশে ইসলাম একটি বাস্তবতা। ব্যাক্তিগতভাবে আমি ইসলামের অনুসারী না হতে পারি, কিন্তু এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় কি আছে? এই বাস্তবতাকে আমি অস্বীকার করে ধর্মদ্রোহী বক্তব্য দিতে পারি। দিতে হবেও। ধর্মের পক্ষে বলার কিছু নেই। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগের মানুষের কল্যাণে ধর্মের কোনো ভূমিকা আছে বলে মনে করি না। বর্তমানে ধর্ম কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি করছে। সুতরাং ধর্মকে খারিজ করে দেয়ার পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হবে সাংস্কৃতিক সংগ্রামও। কট্টরপন্থাকে দমাতে হলে সরকারিভাবে সুষ্ঠু আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার তেমনি সাংস্কৃতিক লড়াইও দরকার। এই সাংস্কৃতিক লড়াই কিন্তু চলছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, পীর-আওলিয়াভক্ত দেশের হাজার হাজার সহজিয়া মুসলমান, আবেদ ফকিরের ভক্তরা, বানেজ আলীরা, আতিক সরকার, মিনারা সরকার, শাহীন সরকার ও মান্নান শেখরা খুব নীরবেই এই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা রামায়ণ-মহাভারতের উত্তরাধিকারী, তারা চর্যাপদ-মঙ্গলকাব্যের উত্তরাধিকারী। রাধা, কৃষ্ণ, শ্রী চৈতন্য, চণ্ডীদাস তাদের পরমাত্মীয়। তারা লালন-রবীন্দ্রনাথের বংশধর। যতই চেষ্টা করুক তাদের সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে দমিয়ে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না ওয়াহাবি কট্টরপন্থীরা।
রাজধানী ঢাকায় বসে আমরা যারা ইসলাম বা ইসলামি কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে কথা বলছি, সাদা চোখে সহজিয়া মুসলমানদের এই সাংস্কৃতিক লড়াইটাকে দেখতে পাচ্ছি না, বুঝতেও চাচ্ছি না। দেখার দরকার আছে, বোঝার দরকার আছে। গণহারে সব মুসলমানকে ‘গোঁড়া’ তকমা দেয়া যাবে না কোনোভাবেই। যারা বঙ্গীয় সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে কট্টরপন্থীদের মোকাবেলা করে যাচ্ছে তাদের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। ধার্মিক, গেঁয়ো, গোঁড়া মৌলবাদী বলে অবজ্ঞা করে তাদের দূরে সরিয়ে দিলে চলবে না। তা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। হিন্দুসমাজ কর্তৃক সব বাঙালি মুসলমানকে গণহারে ওয়াহাবি-ফরাজি তকমা দেয়ার পরিণামের কথা আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি। সুতরাং এ সময়ে এসেও গণহারে গোঁড়া, মৌলবাদী, জঙ্গি ইত্যাদি তকমা দেয়া যাবে না। কট্টরপন্থাকে নির্মূল করতে চাইলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে এসব সহজিয়াপন্থীদের দিকে। তাহলে আইন প্রয়োগের দরকার হবে না, সহজিয়াপন্থীরাই একদিন এই কট্টরপন্থীদের বাংলার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

একটি আশাবাদ
না, হতাশা বা শঙ্কার কোনো কারণ নেই। ওয়াহাবি কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব খুব নীরবেই ঘটে চলেছে। ওয়াহাবিবাদী কট্টর সংস্কারকে ঝেড়েঝুড়ে বর্জন করে বাংলাদেশের সহজিয়া ইসলামপন্থী মানুষরা প্রতিনিয়তই নতুন নতুন সংস্কারকে গ্রহণ করছে। তা কেমন? এটা উদাহরণ দেয়া যাক। একটা সময় রেডিও শোনাটাকে হারাম ভাবা হতো। এই ভাবনাটা ছড়িয়েছিল ওয়াহাবিপন্থী মোল্লা-মৌলবিরা। শৈশবে এক ওয়াজ মাহফিলে রেডিওর ব্যবহার সম্পর্কে জনৈক ওয়াহাবিপন্থী মৌলবিকে বলতে শুনেছিলাম, তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝাচ্ছেন যে, ‘পুঁটি মাছ খাওয়া হালাল, আর ধোড়া সাপ খাওয়া হারাম। পুঁটি মাছটাকে যদি কোনো ধোড়া সাপ জ্যান্ত গিলে আবার উগরে দেয়, সেই মাছটা খাওয়াও হারাম। কেননা হালাল প্রাণীটা হারাম প্রাণীর সংস্পর্শে গিয়ে হারাম হয়ে গেছে। একইভাবে কোরান তেলাওয়াত শোনা পুণ্যের কাজ। কিন্তু ওই তেলাওয়াতটা যখন রেডিওর মাধ্যমে শোনা হয় তখন সেটা আর পুণ্যকর্ম থাকে না।’
এভাবে সপ্তম শতকীয় ইসলামি ভাবাদর্শীরা রেডিওর বিরুদ্ধে নানা ফতোয়া দিয়েও বাঙালি মুসলমানকে রেডিও শোনা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। রেডিওকেন্দ্রিক তাদের হালাল-হারামের প্রকল্পটা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়ে গেছে। টেলিভিশনকেও মোল্লা-মৌলবিদের এমন সব ফতোয়ার সঙ্গে মোকাবিলা করে বাঙালি মুসলমান-মানসে ঠাঁই করে নিতে হয়েছে, হচ্ছে। গ্রাম বাংলায় বাড়িতে টেলিভিশন রাখাটাকে একসময় গর্হিত কাজ হিসেবে ভাবা হতো, ওয়াহাবি মৌলবিরা টিভি দেখতে নিষেধ করত। তাদের সেই নিষেধাজ্ঞা ধোপে টেকেনি। এখন বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে ডিশ এন্টেনা। গ্রামীণ সংস্কৃতিটাকে বদলে দিচ্ছে ডিশসংস্কৃতি। সিনেমা হলের বিরুদ্ধেও ফতোয়া এসেছে, ফতোয়া এখনো জারি আছে ওয়াহাবিদের পক্ষ থেকে। কিন্তু গত শতকের শেষপাদে আমাদের কৈশোরে দেখেছি মাদ্রাসার ছাত্ররাই টুপিটা পকেটে ঢুকিয়ে, পাঞ্জাবিটা পায়জামা বা লুঙ্গির ভেতরে গুঁজে দিয়ে অথবা পাঞ্জাবির বদলে গোলগলার একটা গেঞ্জি পরে টুপ করে সিনেমা হলে ঢুকে পড়ছে। মাদ্রাসা ছাত্রদের সিনেমার প্রতি প্রবল আকর্ষণ এখনো অব্যাহত আছে। সনাতন ভাবাদর্শী ওয়াহাবি ওস্তাদদের কঠোর শাসন তাদের আকর্ষণকে দমাতে পারছে না। পারবেও না। কেননা নতুনের প্রতি, ব্যতিক্রম কিছুর প্রতি মানুষের কৌতূহল তো মজ্জাগত।
একইভাবে মোবাইলকেও কিন্তু এই ওয়াহাবিদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিছুটা হলেও। প্রথম যখন মোবাইল এল তখন ওয়াহাবি মৌলবিদেরকে মোবাইল ব্যবহারের ব্যাপারে দারুণ সংশয়ী দেখা গেল। এখন তো খতমের দাওয়াত নিতেও তাদের মোবাইলের ব্যবহার লক্ষণীয়। বহু মাদ্রাসা ছাত্রকে এখন মোবাইলে ফেইসবুক ব্যাবহার করতে দেখা যায়। শুধু ফেইসবুক নয়, কেউ কেউ পর্নোগ্রাফিও দেখছে।
নারী শিক্ষাকেও হারাম হিসেবে ফতোয়া দিয়েছিল ওয়াহাবি মৌলবিরা। আর এখন? এখন নারী শিক্ষাকে কেউ হারাম বললে আমজনতা তাকে গণধোলাই দেয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নারী নেতৃত্বের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। এক সময় নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ফতোয়ার কথা শোনা যেত। ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’―কট্টরপন্থী ওয়াহাবি ও জামায়াত নেতাদের মুখে এমন কথা তো এই সেদিনও শোনা গেছে। পাঁচ-সাত বছর আগেও ওয়াহাবিপন্থী মৌলবিরা নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওয়াজ করে মাহফিলের স্টেজ গরম করে তুলত। অথচ তারাও এখন নারী নেতৃত্ব হারাম কথাটি আর বলে না। কারণ এসব ফতোয়া অচল হয়ে গেছে, পাবলিক আর খায় না। এখন নারীকেই আমির বা নেতা মেনে ওয়াহাবি মোল্লা-মৌলবিরা তাদের নানা আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করছে। তার মানে নেতৃত্বের ব্যাপারে নারী-পুরুষের বিভেদটা দূর হয়ে গেছে বা যাচ্ছে।
পয়লা বৈশাখে কয়টা মানুষ জড়ো হতো রমনার বটমূলে? শাহবাগ বা চারুকলায় বৈশাখের কোনো অনুষ্ঠান কি আদৌ হতো? হলেও এত বৃহত্তর পরিসরে তো হতো না। আর এখন? সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখ কি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অবয়ব লাভ করেনি? জেএমবির বোমা হামলা কি তা দমাতে পেরেছে? পারেনি তো। কোনোদিনও পারবে না।
তার মানে বাংলাদেশের সমাজিক সংস্কৃতিটা ভাঙ্গছে, পরিবর্তন হচ্ছে। এই ভাঙ্গন, এই পরিবর্তন অবশ্যই ইতিবাচক। ওয়াহাবিবাদী মোল্লা-মৌলবিরা সপ্তম শতকীয় কট্টরপন্থী ইসলামি সংস্কৃতিকে ধারণ ও বহন করতে চাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। আধুনিক প্রাযুক্তিক সংস্কৃতির কাছে তারা বারবার হেরে যাচ্ছে, পর্যদুস্ত হচ্ছে। যেসব কট্টরপন্থী মোল্লা-মৌলবি সমাজের এই পরিবর্তনটাকে, সংস্কৃতির এই বিপ্লবটাকে মেনে নিতে পারছে না তারা হয়ে পড়ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী, উন্মূল। কিছুতেই কিছু করতে না পেরে তারা জঙ্গিবাদের পথ বেছে নিচ্ছে। যত যাই হোক, সহজিয়া ইসলামের দেশ বাংলাদেশে সামাজিকভাবে কিন্তু জঙ্গিরা প্রতিষ্ঠিত নয়। বাংলাদেশের মানুষ যতই ধর্মভীরু হোক তারা কিন্তু কট্টরপন্থী জঙ্গিদের মনেপ্রাণে ঠাঁই দিচ্ছে না। কারণ বাঙালি মুসলমান সহজিয়া ইসলামে বিশ্বাসী, কট্টরপন্থাকে তারা প্রশ্রয় দেয় না। ফলে জঙ্গিরা আন্ডারগ্রাউন্ড পলিসি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের অপতৎপরতা চলছে গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। জঙ্গিদের জঙ্গি তৎপরতা গ্রামবাংলার লোকসাধারণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কোনা সম্ভাবনা নেই। কেননা মানুষ এখন প্রযুক্তি নামের যে অমৃতের সন্ধান পেয়েছে বা পাচ্ছে, তাকে বিসর্জন দিয়ে ওয়াহাবি সনাতনপন্থী ওসব জঙ্গিপনাকে কোনোভাবেই প্রশয় দেবে না। সুতরাং এই সহজিয়া ইসলামপন্থীদের দেশ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে, কট্টরপন্থী মোল্লা-মৌলবিরা একচেটিয়া আধিপত্যের অধিকারী হবে কিংবা এ দেশ ‘দারুল ইসলাম’ তথা ইসলামি হুকুমত কায়েম হবে এমন আশঙ্কা করার কোনো কারণ নেই। অন্তত আমি শঙ্কিত নই।
সুতরাং হতাশা বা শঙ্কার কোনো কারণ নেই। সাংস্কৃতিক বিপ্লব হচ্ছে। এই বিপ্লবটাকে আরো এগিয়ে দিতে হবে। কেউ হয়ত প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই বিপ্লব তো বুর্জোয়া বা সাম্রাজ্যবাদী বা পুঁজিবাদী বা পণ্যসংস্কৃতির বিপ্লব। হোক না। অসুবিধা কি? এই সংস্কৃতি তো কট্টরপন্থী ধর্মীয় সংস্কৃতির চেয়ে খারাপ নয়। বরং অনেক অনেকাংশে ভালো। এই পণ্যসংস্কৃতিই তো ভেঙে দিচ্ছে কট্টরপন্থীদের সমস্ত ভাবাদর্শ, তাদের যত গোঁড়া সংস্কার। এখন শুধু প্রয়োজন সাধারণ শিক্ষার ব্যাপক প্রসার। সাধারণ শিক্ষা মানে বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষা; যে শিক্ষা মানুষকে সমকালীন বাস্তবতা সম্পর্কে বুঝতে শেখাবে। যে শিক্ষা বুঝতে শেখায় মানুষ তথাকথিত ঈশ্বরপুত্র নয়, মানুষই ঈশ্বর। মানুষ যখন এই শিক্ষায় শিক্ষিত হবে তখন সে নিজ থেকেই তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য উদগ্রীব হবে, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার―হোক সেটা বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা―আমূল পরিবর্তন চাইবে। পরিবর্তন না ঘটলে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তা ঘটাবে। হয়ত সেই বিপ্লবটাই হবে বহুল প্রত্যাশিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।

তথ্যঋণ :
১. প্রাচীন ভারতের ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) : সুনীল চট্টোপাধ্যায়
২. মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাস (সুলতানী আমল) : অনিরূদ্ধ রায়
৩. ভারতবর্ষ ও ইসলাম : সুরজিৎ দাশগুপ্ত
৪. শাহ ওয়লিউল্লা ও সমকালীন রাজনীতি : সৈয়দ আতহার আব্বাস রিজভী
৫. ভারতের সভ্যতা ও সমাজ বিকাশে ধর্ম শ্রেণী ও জাতিভেদ : সুকোমল সেন
৬. ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রসঙ্গ : ইরফান হাবিব
৭. নবরূপে তিতুমীর : রুদ্রপ্রতাপ চট্টোপাধ্যায়
৮. বাঙ্গলার ইতিহাস (নবাবী আমল) : কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়
৯. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম অবদান। সম্পাদনা : মোশাররফ হোসেন খান
১০. উপমহাদেশের আলিম সমাজের বিপ্লবী ঐতিহ্য : মাওলানা মুহাম্মদ মিঞা
১১. ভারতের সুফী : মোবারক করীম জওহর
১২. বাঙলা ভাগ হলো : জয়া চক্রবর্তী
১৩. বাংলার লোকসংস্কৃতি : ওয়াকিল আহমদ
১৪. প্রাক-পলাশী বাংলা : সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়
১৫. হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া : থর্নটন

লেখক : কথাসাহিত্যিক। সহযোগী সম্পাদক, সাপ্তাহিক ‘এই সময়’

[1402 বার পঠিত]