ফেসবুক ব্যবহারকারী মাত্রই জানেন, ফেসবুকে কিছুদিন পর পর নতুন ধরণের প্রবণতা (Trend) দেখা যায়। সম্ভবত জাতিগত স্বভাবের কারণেই আমরা সবাই সেই প্রবণতায় গা ভাসিয়ে পরিতৃপ্তি পাই। তারপর আরো কিছুদিন পর আরেকটা নতুন প্রবণতা আসে; পুরাতন প্রবণতা তখন নতুনের জন্য ছেড়ে দেয় স্থান। ইদানীংকার একটা প্রবণতা হলো “মুরাদ টাকলা”র যেকোনো পোস্টে গিয়ে “ধুর মিয়া! আগের মতো মজা পাই না” ধরনের মন্তব্য করতে থাকা। অবশ্য “মুরাদ টাকলা” দাবী করতেই পারে যে তাদের ভাষাবিকৃতি বিরোধী অভিযানের কারণেই ফেসবুকে টাকলামি কমে গেছে। অথবা টাকলামি করলেও “আমরা একই নৌকার মাঝি” বা “আমার ভাগিনার সাথে আজ অনেক দুষ্টুমি করলাম” এর মতো বাক্যগুলো ইংরেজী প্রতিবর্ণে লেখার ক্ষেত্রে টাকলা-টাকলিরা এখন সতর্ক থাকে। ফলে “মুরাদ টাকলা”কে এখন অফটপিক পোস্ট দিয়েই বিনোদনের জোগান দিতে হচ্ছে।

তবে অনেক টাকলাই এখন বাংলা বর্ণে লিখছে; এবং টাকলামি অব্যাহত রেখেছে পুরোদমে। ইংরেজী প্রতিবর্ণ দিয়ে আরো একশো বছর টাকলামি করলেও সার্বজনীন ইংরেজী বা বাংলা কোনো ভাষায় বিকৃতি ঘটানো সম্ভব না, কিন্তু বাংলা শব্দ বাংলা বর্ণমালায় লেখার সময় ভুল করতে থাকলে ভাষাবিকৃতি ঘটবে। আমরা বেশি আতঙ্কিত হই যখন দেখি বানান ভুলের হিড়িক পড়েছে ফেসবুক সেলিব্রিটি, ব্লগার এবং প্রগতিশীল বন্ধুদের লেখালেখিতেও।

আতঙ্কের কারণটা আরেকটু পরিষ্কার করে বলি, ভাষা বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে গণমানুষই শব্দের উচ্চারণ তথা মৌখিক রূপে পরিবর্তন আনে। তবে ভাষাবিদ, বৈয়াকরণ আর সাহিত্যিকগণ শব্দের বানান তথা লৈখিক রূপকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে সামগ্রিক ভাষায় শৃঙ্খলা ধরে রাখেন। কিন্তু ফেসবুকের যুগে যখন গণমানুষের বিশাল অংশ লেখালেখি করছে এবং সেই লেখা প্রচারও পাচ্ছে, তখন ভাষাবোদ্ধাদের হাতে ভাষার শৃঙ্খল থাকবে কী করে? ফেসবুকের স্ট্যাটাস অপেক্ষা সদ-গ্রন্থ পাঠের পেছনে বেশি সময় ব্যয় করেন-এমন ক’জনইবা আছেন? এই অবস্থায় ভাষাকে রক্ষা করতে পারতেন তারা, যারা আন্তর্জালের জগতে বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু তাদেরই অনেকে একই দোষে দুষ্ট।

যেসব ক্ষেত্রে আমরা বেশি ভুল করি সেগুলো হলো, ই-কার/ঈ-কার, উ-কার/ঊ-কার, ঋ-কার/র-ফলা, জ/য, ণ/ন, র/ড়, শ/ষ/স; বিসর্গ, চন্দ্রবিন্দু ইত্যাদির ব্যবহার ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় যুক্তবর্ণের ক্ষেত্রে। নিচের তালিকাটি মন দিয়ে পড়লে অনেকগুলো যুক্তবর্ণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর হবে। আমি যেখানে “+” চিহ্ন দিয়েছি, টাইপিংয়ের সময় সেখানে হসন্ত দিতে হবে এ নিশ্চই আপনারা জানেন।

১। “ব্রাহ্মণ” বানানে “হ্ম” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “হ+ম” এভাবে;

২। “আকাঙ্ক্ষা” বানানে “ঙ্ক্ষ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ঙ+ক+ষ” এভাবে;

৩। “উজ্জ্বল” বানানে “জ্জ্ব” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “জ+জ+ব” এভাবে;

৪। “প্রজ্বলন” বানানে “জ্ব” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “জ+ব” এভাবে।

৫। “বিজ্ঞান” বানানে “জ্ঞ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “জ+ঞ” এভাবে।

৬। “বঞ্চিত” বানানে “ঞ্চ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ঞ+চ” এভাবে।

৭। “লাঞ্ছনা” বানানে “ঞ্ছ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ঞ+ছ” এভাবে।

৮। “সঞ্জয়” বানানে “ঞ্জ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ঞ+জ” এভাবে।

৯। “ঝঞ্ঝা” বানানে “ঞ্ঝ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ঞ+ঝ” এভাবে।

১০। “খড়্গ” বানানে “ড়্গ” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ড়+গ” এভাবে।

১১। “প্রত্নতত্ত্ব” বানানে “ত্ন” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ত+ন” এভাবে। আর “ত্ত্ব” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “ত+ত+ব” এভাবে।

১২। “উদ্যোগ” সঠিক বানান, “উদ্দোগ” ভুল।

১৩। “পদ্ম” বানানে “দ্ম” যুক্তবর্ণটি লিখতে হবে “দ+ম” এভাবে।

১৪। “সান্ত্বনা” সঠিক বানান, “সান্তনা” ভুল।

১৫। “বিষণ্ন” বানানে “ণ+ন” হবে।

১৬। “স্বাতন্ত্র্য” বানানে য-ফলা থাকবে, “স্বতন্ত্র” বানানে থাকবে না।

১৭। “বন্ধ্যা” সঠিক বানান, “বন্ধা” ভুল।

১৮। “ন্যুব্জ” বানানে ন-এর সাথে য-ফলা আছে, আর যুক্তবর্ণটি হবে “ব+জ” এভাবে।

শেষ পাঁচটি পয়েণ্ট গুরুত্বপূর্ণ:

১৯। “উষ্ণ” বানানে “ষ্ণ” যুক্তবর্ণটি হবে “ষ+ণ” এভাবে।

২০। “চিহ্ন” বানানে “হ্ন” যুক্তবর্ণটি হবে “হ+ন” এভাবে।

২১। “অপরাহ্ণ” বানানে “হ্ণ” যুক্তবর্ণটি হবে “হ+ণ” এভাবে।

২২। ট, ঠ, ড, ঢ এর সাথে “ন” যুক্ত হয় না; ত, থ, দ, ধ এর সাথে “ণ” যুক্ত হয় না।

২৩। বিদেশি শব্দের সাথে “ণ” ও “ষ” যুক্ত হয় না। যেমন “ফটোষ্ট্যাট” শব্দের সঠিক বানান “ফটোস্ট্যাট”।

এসব সমস্যা হতো না, যদি নিদেনপক্ষে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা ব্যাকরণ বইটা (এনসিটিবি প্রণীত) আমাদের ভালোভাবে পড়া থাকতো। ছোট্ট এই বইটা বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও দারুণ কাজ দেয়। আগে পড়িনি তাতে কী হয়েছে? এখন তো সংগ্রহ করে রাখতেই পারি। আমরা অনেকেই জানিনা ১ম শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা বোড ও কারিগরি বোর্ডে এনসিটিবি প্রণীত বইগুলোর চমত্‍কার একটি ওয়েবসাইট আছে। লিংক http://www.ebook.gov.bd।

অনেকের অভিযোগ, অভ্র ব্যবহার করে সঠিক বানান লেখা যায় না। এটা ঠিক নয়, সময় একটু বেশি লাগলেও অভ্র দিয়ে শতভাগ শুদ্ধ বাংলা লেখা যায়। যেমন “অন্য” শব্দটি লিখতে হলে টাইপ করতে হবে “onyo”, কারণ “য” এর প্রতিবর্ণ “yo”. আপনি “onno” টাইপ করলে অভ্র সেটাকে দেখাবে “অন্ন”, কারণ “n” হচ্ছে “ন” এর প্রতিবর্ণ। ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী সম্পাদিত “বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান” বইটিতে বাংলা বর্ণমালার ইংরেজী ও আরবি-ফারসি প্রতিবর্ণের একটি তালিকা রয়েছে। এছাড়াও আছে যুক্তবর্ণের তালিকা। অভিধানটিতে শব্দার্থ খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ায় ব্যাকরণ সম্পর্কেও আপনার ভালো ধারণা গড়ে উঠবে। যারা বাংলা ভাষায় লেখালেখি করেন তাদের সংগ্রহে এ বইটা অবশ্যই থাকা উচিত বলেই আমার মনে হয়।

ধন্যবাদ সবাইকে। ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলুক অবিরাম।

[129 বার পঠিত]