আসিফ মহিউদ্দীনের শাহবাগ থেকে কারাবাস

আসিফ মহিউদ্দীনের বই 'আমার কারাবাস, শাহবাগ এবং অন্যান্য'

আসিফ মহিউদ্দীনের বই ‘আমার কারাবাস, শাহবাগ এবং অন্যান্য’

সেই প্রথম দিনের জেল প্রবেশের কথা মনে পড়ছে। গাড়ি থেকে যখন নামানো হলো, তখন আমরা সংখ্যায় পরিণত হয়েছিলাম। গরু-বাছুরের মতো আমাদের বারবার গোনা হচ্ছিল, এরপরে একটা অন্ধকার করিডোরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা চারজন একজনার পিছনে আরেকজন ঢুকছি, আমাদের সামনে পিছনে চারজন কারাপ্রহরী। সবার আগে রাসেল ভাই (রাসেল পারভেজ), তারপরে শুভ (সুব্রত অধিকারী শুভ), তারপরে আমি, সবশেষে বিপ্লব ভাই (মশিউর রহমান বিপ্লব)। আমাদের ১৪ সেলে নিয়ে গেল। ১৪ সেলের দরজা দিয়ে ঢোকার সাথে সাথেই চারদিক থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল, তাদের টিনের বাসন দিয়ে শব্দ করে কান ঝালাপালা আবস্থা। তারা সবাই একসাথে শ্লোগান দিতে লাগলো; বলতে লাগলো, “নাস্তিকমুক্ত জেলখানা চাই”, “নাস্তিকদের আজই ফাঁসি চাই”, “জেলখানায় নাস্তিক, মানি না মানবো না”।— এভাবেই ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘আমার কারাবাস, শাহবাগ এবং অন্যান্য’ বইটিতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি দাবিতে গড়ে ওঠা জনগণের গণ-বিস্ফোরণের ফলাফল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চ। শুরু থেকেই এ জন-আন্দোলন ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছিল যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গ সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। দেশে বিদেশে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা প্রপাগান্ডা, মিথ্যাচার, বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল এ দল দুটি। আর এদের সাথে যুদ্ধাপরাধের দায় কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপিও একই সুরে কথা বলতে থাকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাহবাগের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপি-জামায়াত বারবার দাবি করতে থাকে শাহবাগের আন্দোলন নাস্তিক-ব্লগারদের আন্দোলন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও জনসমাবেশে শাহবাগের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিষাদগার করে তাঁর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। গণজাগরণ মঞ্চকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে গড়ে তোলে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। দেশ ও দেশের বাইরে এ বলে প্রচার করা হয়— “শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের সকলেই নাস্তিক-ব্লগার। বিভিন্ন লেখায় তারা আল্লাহ-রাসুলকে হেয় প্রতিপন্ন করে (?) লেখা প্রচার করছে।” বিএনপি-জামায়াতের এ কথাকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা বিভিন্ন ছলচাতুরিরও আশ্রয় নেয়। শাহবাগের আন্দোলনকারী ব্লগার রাজীবকে হত্যার পর তার নামে একটি (থাবা বাবা) ব্লগপেজ খুলে সেখানে নানা কুরুচিপূর্ণ কথা সেঁটে দেওয়া হয়। প্রমাণ হিসেবে এসব লেখাকে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে। যদিও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির বাইরে ধর্মীয় কোনো বক্তব্যের প্রমাণ মেলেনি, তারপরেও একসময় কেউ কেউ বিশ্বাস করতে শুরু করে শাহবাগের আন্দোলন ‘নাস্তিকদের আন্দোলন’। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর লক্ষ্যে কাজ করা দলগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার তথাকথিত নাস্তিকের নামে কয়েকজন মুক্তচিন্তা চর্চাকারী, প্রগতিশীল গণজাগরণকর্মী তরুণদের গ্রেপ্তার করে। তাদেরই একজন আসিফ মহিউদ্দীন।
আসিফ লিখেন—

“একটা সিনেমাতে এমনটা দেখেছিলাম। খুব বিখ্যাত একজন খুনী জেলে ঢোকার পরে সিনেমাটায় এমন হয়েছিল। জেলখানায় খুনি, ধর্ষক, মাদকব্যবসায়ী সকলেই আছেন, এমন কোনো অপরাধ নেই যা এক একজন করেনি। কেউ নিজের মাকে হত্যা করেছে তো কেউ ছোট একটা বাচ্চা মেয়েকে ধর্ষণ করেছে, আবার কেউ ২০-২৫টা খুন করেছে, কেউ বা দেশ ফেনসিডিলের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছে। সবাই আছে, থাকবে, ছিল। কিন্তু পুরো জেলখানায় চারজন ধর্মে অবিশ্বাসী নাস্তিকের জায়গা নেই! যেন পৃথিবীর সবচাইতে বড় অপরাধ হচ্ছে ঈশ্বরে অবিশ্বাস করা, মনে হচ্ছিল চিন্তা করতে পারার মতো, নিজের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সিদ্ধান্ত নিজে পছন্দ করার মতো খারাপ কাজ এই শতাব্দীতে আর একটিও নেই।

সত্যিকথা বলতে কী, এই কথাটি বলে তারা ধার্মিকদের জয়গান গাইলো নাকি প্রকারান্তরে নাস্তিকদেরই জয়ধ্বনি দিলো, সেটা বোঝা গেল না। কারণ জেলখানা তারা ধার্মিক দিয়ে পূর্ণ করে ফেললে ধর্মের সম্মান হয় নাকি অসম্মান, সেটা একটা সুন্দর বিতর্কের বিষয় হতে পারে, তবে সেই বিতর্কে তখন যাবার মতো অবস্থা ছিল না। আমি সম্ভবত তাদের বেশ পছন্দের ছিলাম, তারা বলতে লাগলো, “ঐ যে তিন নম্বরটা আসিফ মহিউদ্দীন” এবং সেই সাথে আমার পরিবার-পরিজন পূর্বপুরুষের সবাইকে উদ্দেশ্য করে খুব সভ্য-ভদ্র-মার্জিত ভাষার বুলি শোনাতে লাগলো। স্বঘোষিত ধর্মরক্ষকগণের এহেন বুলি শুনে কারো মনে তাদের পবিত্র ধর্ম সম্পর্কে কী ধারণা হওয়া উচিত, তা পাঠক মাত্রই বুঝে নেবেন। এর চাইতে বেশি কিছু বলা শোভন হবে না, এই মুহূর্তে আরেকটি মামলা খেয়ে যাবার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে খাঁটি ধর্মপ্রাণ সমাজ আসলেই এরকমই হবে, এরকমই হবার কথা।”

শাহবাগের আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন আসিফ। এ বইয়ে সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেছেন লেখক। আসিফ বলছেন— “আমরা জানি না, আমাদের ছেড়ে দেবে নাকি আটকে রাখবে। আমরা ভাবছি আজকের রাতটাই তো, সকালেই ছেড়ে দেবে। আমাদের বিরুদ্ধে তো পুলিশ কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তখনও জানতাম না, দুঃস্বপ্নের সবে শুরু।”

আমার কারাবাস, শাহবাগ এবং অন্যান্য; লেখক : আসিফ মহিউদ্দীন; প্রকাশনা : গুরুচণ্ডালি, কলকাতা; প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৪; প্রচ্ছদ : সুমেরু মুখোপাধ্যায়; মূল্য : ১২০ টাকা।

বাংলাদেশ নিবাসী লেখক এবং মুক্তমনা সদস্য।

মন্তব্যসমূহ

  1. গীতা দাস নভেম্বর 25, 2014 at 4:34 অপরাহ্ন - Reply

    লেখাটির অসম্পূর্ণ লাগলো।

  2. বিপ্লব রহমান নভেম্বর 11, 2014 at 7:51 অপরাহ্ন - Reply

    মান্যবর অ্যাডমিন,

    ওপার বাংলার ব্লগাজিন গুরুচণ্ডালি ডটকম-এ আসিফ মহিউদ্দীনের ধারাবাহিক রচনা “আমার কারাবাস” প্রকাশিত হয়েছে। পরে এসব লেখাই চটি সিরিজ আকারে গত ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে মুক্তমনায় কয়েক দফায় আলোচনাও হয়েছে।

    আর ওই ধারাবিহকটি আসিফ নিজে কখনোই গুরুচণ্ডালির বাইরে মুক্তমনা বা অপর কোনো ব্লগে প্রকাশ করেননি।

    তো, হঠাৎ করে সেই সব পুরনো লেখা আরেক সহব্লগারের পুন:প্রচারের প্রয়োজন কি পড়লো, তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া আন্তর্জালে আগে প্রকাশিত লেখা মুক্তমনায় পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রেও নীতিমালায় বোধকরি বেশ কিছুটা বিধি-নিষেধ আছে।

    এ পর্যায়ে চলতি লেখাটি সরিয়ে ফেলার বিনীত অনুরোধ করছি।

    • বিপ্লব রহমান নভেম্বর 11, 2014 at 7:53 অপরাহ্ন - Reply

      পুনশ্চ: গুরুচণ্ডালিতে আসিফ মহিউদ্দীনের ধাবাবাহিক রচনা “আমার কারাবাস” এইখানে

      • অভিজিৎ নভেম্বর 12, 2014 at 8:10 পূর্বাহ্ন - Reply

        @বিপ্লব রহমান,

        গুরুচণ্ডালিতে আসিফের লেখাটা পড়লাম। কিন্তু অঞ্জনের লেখার সাথে তার মিল পেলাম না।

        যতদূর মনে হচ্ছে, অজন হয়তো এতদিনে আসিফকে নিয়ে প্রকাশিত বইটি (‘আমার কারাবাস, শাহবাগ এবং অন্যান্য’) পড়েছেন এবং এটি হয়তো তার রিভিউ।

        সেটা সত্য হলে এটা থাকতে পারে কিন্তু। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। তবে অঞ্জন নিশ্চয় তার নিজের ব্যাখ্যা দেবেন।

        • বিপ্লব রহমান নভেম্বর 12, 2014 at 12:59 অপরাহ্ন - Reply

          @অভিজিৎ দা,

          আপনার প্রতিক্রিয়া পেয়ে ভালো লাগলো, যদিও অ্যাডমিন বা লেখক অঞ্জন আচার্য এ বিষয়ে এখনো কিছু বলেননি। যাই হোক, আসিফের ওই ধারাবাহিকের পাঠ প্রতিক্রিয়া থাকা খুব জরুরি। আর লেখক যদি সে প্রয়াসই নিয়ে থাকেন, তাহলে লেখাটি মুক্তমনায় যেমন আছে, তেমনই থাক না। অহেতুক সব কিছু যান্ত্রিকভাবে দেখার পক্ষপাতি আমিও নই।

          মনে পড়ছে, আসিফের ওই চটি বইটিতে অভি দা, আপনি একটি অসামন্য ভূমিকা লিখেছেন। পরে সেটি ফেবুতেও পড়েছি। এই সুযোগে এই ভূমিকাটি এখানে হুবহু সংযুক্ত করছি। জয় হোক মুক্তচিন্তার।

          আসিফ মহিউদ্দীন লেখক। তিনি লিখেন। না তিনি গাদা গাদা ‘আঁতেলেকচুয়াল’ বই বের করেননি, প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রেও তিনি কলাম লেখেন না। আসিফের বিচরণ ইন্টারনেটে – মূলতঃ বাংলা ব্লগে, ফেসবুকে। এ ধরনের লেখকেরা সাধারণত সবার অগোচরেই থেকে যান। কিন্তু আসিফের ক্ষেত্রে তা হয়নি। আসিফ আক্রান্ত হয়েছেন। মৌলবাদীরা তো তাকে কুপিয়েই মেরে ফেলতে চেয়েছে। পারেনি।

          হেফাজতী মাওলানারা, যারা আসিফের কেন কোন ব্লগারদের লেখাই কোনদিন পড়ে দেখেনি, ব্লগের সংজ্ঞা যাদের চিন্তায় কেবল ‘ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালানো’ পর্যন্ত, তারা ব্লাসফেমি আইনে আসিফের বিচার করতে চেয়েছে। আসিফ কেবল মৌলবাদীদেরই রোষের শিকার হয়নি, আক্রান্ত হয়েছে রাষ্ট্র-যন্ত্র দিয়েও। যে রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা দেবার জন্য তৈরি বলে আমরা জানি, যে দেশের সংবিধানে ‘নাগরিকদের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সুরক্ষিত’ থাকার কথা বলে, যে রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার কথায় কথায় ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ বুলি কপচায়, সেই দেশ, সেই সরকার, সেই রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা আসিফকে তার লেখার জন্য নির্যাতন করেছে, কারাগারে প্রেরণ করেছে একাধিকবার। চাপ প্রয়োগ করে আসিফের ব্লগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সামহোয়্যারইনে।

          নতুন করে কালাকানুন বানানো হয়েছে যাতে আসিফের মত ব্লগাররা আর কাউকে কখনো ‘জ্বালাতে’ না পারে। কিন্তু এতে করে কি মুক্তচিন্তার গতি স্তব্ধ করা যায়? আমরা তো জানি, একটা সময় বাইবেল বিরোধী সূর্যকেন্দ্রিক সত্য উচ্চারণের কারণে গ্যালিলিওকে অন্তরিন করে রাখা হয়েছিল, ব্রুনোর মত দার্শনিককে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, কিন্তু সূর্যের চারিদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন থামাতে পারেনি ঈশ্বরের সুপুত্ররা।

          হাজারো অপন্যাস আর চটুল সাহিত্যের ভীরে আসিফের ব্লগ আর ফেসবুক স্ট্যাটাস যেন একপ্রস্ত সুবাতাস। আসিফের লেখা অজ্ঞেয়বাদী মুক্তচিন্তক রবার্ট গ্রিন ইঙ্গারসোলের উক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয় – ‘বিশ্বাসী মন খাঁচায় বন্দী পাখি, আর মুক্তমন যেন মুক্ত বিহঙ্গ – ঘন মেঘের পর্দা ভেদ করে উড়ে চলা অবিশ্রান্ত এক ডানামেলা ঈগল’। এই নীলিমায় ডানামেলা ঈগলদের ডানা ভেঙে খাঁচায় বন্দী করে রাখতে চেয়েছিল সরকার। এ বছরের পয়লা এপ্রিল জামাতি আর হেফাজতি মোল্লাদের তোষামোদ করতে গিয়ে যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রগতিশীল ব্লগারদের হাতকড়া পরিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এর পর থেকেই আমরা চেষ্টা করেছি ব্লগারদের মুক্ত করতে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। আমাদের সে আহবানে সাড়া দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তচিন্তক আর মানবতাবাদীরা রাস্তায় নেমেছেন প্ল্যাকার্ড হাতে। অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিএফআই, অ্যাথিস্ট ইন্টারন্যাশনাল, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সহ বহু সংগঠনই বিবৃতি দিয়েছিল সরকারের বাক স্বাধীনতার উপর এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে। আমি নিজেও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আর বাংলাদেশে ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টরা তো কয়েক দফা করে পথে নেমেছেন। আসিফ সহ অন্যান্য ব্লগারদের অবশেষে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

          হুমায়ুন আজাদকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে, রাজীব হায়দারকে হত্যা করে কিংবা আসিফকে ছুরিকাঘাত কিংবা কারাবন্দী করে জনযুদ্ধ বন্ধ করা যায়নি, যায় না। স্মরণ করি মিখাইল বুলগাকভের উপন্যাস ‘মাস্টার এণ্ড মার্গারিটার’ বিখ্যাত উদ্ধৃতি –‘পাণ্ডুলিপি পোড়ে না’। মুক্তচিন্তককে আক্রমণ করা যায়, কিন্তু তার চিন্তাকে নাশ করা যায় না। মুক্তপথের সৈনিকদের ওপর ক্রমাগত আগ্রাসনে বোঝা যাচ্ছে রাষ্ট্র আর ধর্ম দুই ‘পালোয়ান’ই কতোটা মরিয়া। এখন আর ব্লগার এবং ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্টদের প্রভাবকে তারা অস্বীকার করতে পারছেন না। মুক্তচিন্তার প্রসারে তারাই আসলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে, তাই বেছে নিয়েছে সহিংসতা আর নির্যাতনের পথ। আসিফ প্রমাণ করে দিয়েছে নপুংসক ঈশ্বরের আর ‘শান্তির ধর্মের’ সাচ্চা সৈনিকদের আদর্শ আর ঠুনকো বিশ্বাস যুক্তির সামনে কত অসহায়, কত মুমূর্ষু। বিজ্ঞান, যুক্তি আর মানবতার আঘাতে যেন তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়ে ধর্মের অচলায়তন। শান্তির মুখোশ ভেদ করে উঁকি দেয় ধর্মের সফেদ মুখ। বড়
          কুৎসিত সেই রূপ। আসিফ যেন অভিমন্যুর মতোই ব্যূহভেদ করে ভেতরকার কদর্য রূপটি আমাদের চিনিয়ে দিয়েছে। অভিনন্দন আসিফ।

          বাংলাদেশের একজন ব্লগারের নামও বহির্বিশ্বে কেউ জানলে, সেটা আসিফ । আসিফ আজ একটি চেতনার নাম, নাম একটি অসমাপ্ত জনযুদ্ধের। যে জনযুদ্ধ মৌলবাদ, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, শোষণ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপোষহীন। নিঃসীম আঁধারের সমস্ত কালিমা ঘুচিয়ে আলোর নিশান জ্বালাবার ব্রত নিয়েছে যেন আসিফ। স্বর্গলোভ, আত্মা, অমরত্ব, ব্রাহ্মন্যবাদী কপটতা প্রভৃতি অস্বীকারের যুক্তিবাদ আর মুক্তবুদ্ধির যে বহ্নিশিখা সেই চার্বাক, ভৃগুদের হাতে প্রজ্বলিত হয়েছিল এক সময়,যে শিখা জাজ্বল্যমান রেখেছিলেন ভগৎ সিং, আরজ আলী মাতুব্বর, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ, কিংবা পশ্চিমে ফ্রান্সিস বেকন, বার্ট্রান্ড রাসেল, রবার্ট গ্রিন ইঙ্গারসোল আর রিচার্ড ডকিন্সের মত বরেণ্য চিন্তাবিদেরা, তরুণ আসিফ আমাদের সময়ে সেই চলমান যুদ্ধের মশালবাহী পাঞ্জেরি।

          আসিফকে অভিবাদন আবারো, সেই সাথে অভিবাদন গুরুচণ্ডালীকেও এরকম একটি ব্যতিক্রমী প্রকাশনার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।

          অভিজিৎ রায়
          গবেষক এবং বিজ্ঞান লেখক
          মুক্তমনা সাইটের প্রতিষ্ঠাতা
          ইউ.এস.এ

          • অঞ্জন আচার্য নভেম্বর 12, 2014 at 4:08 অপরাহ্ন - Reply

            @বিপ্লব ভাই,
            শুভেচ্ছা নেবেন। আপনার মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি আসিফ মহিউদ্দীনের লেখাটি এর আগে ধারাবাহিকভাবে গুরুচণ্ডালিতে পড়েছি। সেই সাথে অভিজিৎ দা’র লেখা চমৎকার রিভিউটিও আমার পড়া। আমার লেখাটি আসলে বইটির এক ধরনের পরিচিতিমূলক-রিভিউ মাত্র। পুরো লেখার গঠনমূলক সমালোচনা কিন্তু এটা নয়। তাই অন্য কোনো রিভিউয়ের সাথে সেটি সাদৃশ্য হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তারপরেও যদি মান্যবর অ্যাডমিন মনে করেন, আমার এ লেখাটি মুছে ফেলতে, সেক্ষেত্রে আমার আপত্তি নেই। আমি তা সহজভাবেই গ্রহণ করবো।

            মূলত এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শাহবাগের গণজাগরণের ওপর প্রকাশিত ১৩টি বই (যতদূর জানি, বইমেলাতে মোট ১৩টি বই-ই প্রকাশিত হয়েছে) আমি নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করে সেগুলোর রিভিউ করেছি। আসিফের বইটি-ই একমাত্র বই, যেটি দেশের বাইরে থেকে (কলকাতা) প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের পাঠকেরা যা সহজেই চাইলেই পাবেন না। কারণ আপনি তো জানেন, কলকাতার সব বই বাংলাদেশে বসে চাইলেই পাওয়া যায় না। পেতে চাইলেও হ্যাপার শেষ নেই। এক ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ বইটি হাতে পেতে আমাকে স্বয়ং কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের মিত্র অ্যান্ড ঘোষের নিজস্ব বিপণিতে পর্যন্ত যেতে হয়েছে। যে যাই হোক।

            আত্মপক্ষ সমর্থনে বলছি, চেতনার দিক থেকে আমি শাহবাগ-আন্দোলনের একজন হিসেবে এই বইগুলোর পরিচিতি তুলে ধরা আমার নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে করেছি। আমি চেয়েছি, বইগুলো গণ-মানুষের কাছে পৌঁছাক। মানুষ অন্তত জানুক, বইগুলোতে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উৎসুক পাঠকের কৌতূহলকে উস্কে দিতেই এ আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

            আপনি জেনে খুশি হবেন, ইতোমধ্যে শাহবাগের ওপর লেখা বইয়ের রিভিউ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি এখনো প্রকাশিতব্য আছে। পড়লে কৃতজ্ঞ থাকবো। ভালো থাকবেন সবসময়…

            প্রকাশিত রিভিউ :
            http://www.risingbd.com/detailsnews.php?nssl=75649

            http://www.banglamail24.com/news/2014/11/06/id/87126/

মন্তব্য করুন