আনন্দ হচ্ছে। সত্যিই তীব্র আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে বাঙলা সাহিত্য নিয়ে দুটো কথা বলা যাচ্ছে এই দূর পরবাসেও। তবে আজকের এই অনুভুতি কিন্তু এমনি এমনি হচ্ছে না। বেশ তৃপ্তি করে আমার জন্মভূমির ভাষায় মন খুলে এই যে লিখতে পেরেছি আর বলতে পারছি এটিও হয়নি এমনি এমনি। বেশ একটা পরিচ্ছন্ন ভঙ্গিতে কথা বলবার এই শক্তি আমি পেয়েছি আমাদের সাহিত্য থেকেই। পন্ডিতেরা বলেন ‘চিন্তা চেতনা, অনুভূতি, সৌন্দর্য্য ও শিল্পের লিখিত প্রকাশই হচ্ছে সাহিত্য’ [১]। গদ্য, পদ্য, নাটক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গল্প, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি ইত্যাদি সবটাই সাহিত্য বটে। লিখিত বা মুদ্রিত হলেই হোল। কেই কেউ বলেন; কথা বলেও সাহিত্য হয়। কিন্তু ব্যপারটা কি সত্যিই তাই; এতটাই সহজ সরল নাকি? তা’ই যদি হয় তবে তো খুব কুৎসিত কথা আর লেখাগুলোও সাহিত্য হয়ে যায়। আসলে অত ভাবনার কিছু আছে কি? একটি জাতির সংস্কৃতির নিয়মে সাহিত্য টিকে থাকে মানুষের ভালবাসায়। সাহিত্য বাঁচে ও বড়ও হয় মানুষের গ্রহণে আর চর্চায়। যা ভালো তা টিকে থাকে বহুকাল কারণ মানুষ তা গ্রহন করে, বারেবার পড়ে, ভাবে আর চর্চা করে। টিকে যায় সেসব অনেক দিন। আর যা কিছু খারাপ, মানুষ বর্জন করে সেসব। সেইসব লেখনী পরিত্যাক্ত হয় বলে তা হয়ে পড়ে ক্ষনজন্মা। প্রবাসে বাঙলা লিখতে পেরে, বলতে পেরে আমরা যেমনি আনন্দিত হচ্ছি, পড়তে পেরেও আনন্দ পাচ্ছি যথেষ্ট। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের অনাদরেই আবার যেন প্রিয় বাঙলা সাহিত্য ক্ষনজন্মা হয়ে না পড়ে। “অভিবাস জীবনে সাহিত্যচর্চা” না হলে আর আদর না পেলে তা পরিত্যাক্ত হবার শঙ্কা রয়েছে।

এই দূর পরবাসের জীবনে সাহিত্যচর্চা নানা কারণে বেশ কষ্টসাধ্য। ‘মানুষের জীবনচেতনার বারো আনাই দেশ-কালের দান, বাকি চার আনা অনুশীলন লব্ধ’ [২]। আবার ‘সামান্য অর্থে জীবন চেতনাই সংস্কৃতি’ [৩]। ব্যপারটা যদি তা’ই হয় তবে প্রবাসী বা অভিবাসীদের জন্য সাহিত্যচর্চা কষ্টসাধ্য মেনে না নেওয়া ছাড়া উপায় কি? দেশটা যেখানে অনুপস্থিত, কাল যখন তথ্য প্রযুক্তির; অবশিষ্টাংশ যখন চার আনা, তা’ও আবার ঐচ্ছিক; তখন আবার উপায় কি? “অভিবাস জীবনে সাহিত্যচর্চা” যে স্বাভাবিক নিয়মেই সঙ্কটে থাকে, এটা যে একটা সমস্যা, সেটুকু অন্তত পরিস্কার। তারপর কথা যা পড়ে রইলো তা হোল বিদেশে বাঙলা সাহিত্য বাঁচাবার উপায় সন্ধান। বাঙলাকে যদি সত্যিই ভালবাসি আমরা, তা হলে ভালোবাসার এই স্পন্দন-সম্পদকে দীর্ঘজীবি করবার উপায় ভাবনায় আন্তরিক হতে হবে। মনে রাখা দরকার, আন্তরিকতার ঐচ্ছিক সুযোগ মাত্র চার আনা। ফাঁকিঝুঁকি দিলে ওটাও থাকবে না, ষোল আনাই মিছে হয়ে যাবে।

প্রথম প্রজন্মের বিদেশে যারা থাকেন, তারা কি বাস্তবিক ভাবে মেনে নেন আমাদের সাহিত্যের অসহায়ত্ব? অথচ এরা কষ্ট পান দেশমাটি বিহীন শেকড় আঁকড়ে। শর্তহীন ভাবেই যেন বয়ে আনা চেতনার রসে শেকড় ভিজিয়ে রাখেন। প্রবাসে বাঙলার সংস্কৃতি-সাহিত্য লালন পালন প্রসার প্রচার করতে হলে পরবাসীদেরকেই নিতে হবে দায়িত্ব। তাদেরকেই ভেবে বের করতে হবে নিত্য নতুন উপায়। যার যার সংস্কৃতি তার তার মননে, তার তার ভালবাসা আর আন্তরিকতায়। এ জাত্যভিমান শুধু স্বজাতির মানুষের কাছেই থাকে; বিজাতীয় অনুভবে নয়। তাই শক্ত করেই ধরে রাখতেই হবে আমাদের সাহিত্যভাবনা একটি হাতে; অন্যহাতে থাকতে হবে বাস্তব ভাবনা। পরবাসের শিশুরা বহুভাষী হচ্ছে, তারা তা হচ্ছে প্রয়োজনে, তারা তা হচ্ছে কারনে, তারা হচ্ছে জনমে। জোর করে ওদের ওপর আমাদের দায় চাপানো যাবে না। জোর করলেই হতে পারে প্রতিক্রিয়া, অনেক কিছুই হতে পারে প্রত্যাখাত। অথচ আমরা চাইবো, আমাদের বাঙালি চেতনা ওদের মাঝেও বাঁচুক; যেমন বেঁচেছে আমাদের মাঝে; পরম্পরায়। প্রবাসী নতুন প্রজন্মের জন্য এই পরবাসে আমাদের মনে রাখতে হবে ওদের ভাষা শুধুমাত্র বাঙলা নয়। বহুভাষী হয়ে বড় হচ্ছে তারা। ‘একটি বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত মানবগোষ্ঠীর মনের ভাব প্রকাশ ও অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রতিনিয়ত যা ব্যবহৃত হয়; তা’ই ভাষা ‘[৪]। পরবাসে বেড়ে ওঠা আমাদের শিশুরা আমাদের দেশ বিহীন ভিন্ন একটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানবগোষ্ঠীর অংশ। এটাই বাস্তবতা। এটা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে আমাদের সাহিত্য বাঁচাবার।

শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে জাত্যভিমানে আমরা অনেক বাস্তবতাই অস্বীকার করে বসি, একবারও হয়ত ভাবি না এসব জোর করে করবার নয়। এসব ভালোবাসার। আদরের। আমাদের অনেক দায়িত্ব। ‘এবং সে দায়িত্ব পালন করতে সন্মুখ দৃষ্টির প্রয়োজন। ফেলে-আসা পশ্চাতের দিকে তাকাতে হলে দেহ ফিরিয়ে পশ্চাত্কেই সন্মুখ করতে হয় এবং তাতে অগ্রগতি কেবল ব্যাহতই হয়। এমনি ঐতিহ্যনিষ্ঠ শিল্পী-সাহিত্যিকের দানে পাঠকের মন-আত্মার বিকাশ অসম্ভব, কেননা এতে লেখক-পাঠক কারো চিত্তের বদ্ধতা ও অন্ধত্ব ঘুঁচে না’ [৫]। কাজেই আমাদের ভাবনা, প্রবাসের সাহিত্যভাবনা বাস্তবমুখী করে ভাবতে হবে, তা না হলে সাহিত্য খর্বের অপরাধে আমরাই অপরাধী হয়ে যাবো প্রবলভাবে।

“অভিবাস জীবনে সাহিত্যচর্চা” নিয়ে এতসব সঙ্কটের কথা তো বলা হোল, এবার না’হয় উত্তরণের ভাবনায় কিছু বলা যাক। সংস্কৃতি সাহিত্য এসবের সাধারণ সংজ্ঞা এখন কিন্তু বদলে গেছে। তথ্য প্রযুক্তির আলোগতি ছুঁয়ে ফেলেছে আমাদের ভাবনার প্রসারে। সাহিত্য সংস্কৃতি এখনও কিছুটা স্থানিক তবে পুরোপুরি কিন্তু নয়। সময় বা কাল এখন তীব্র গতি পেয়েছে। যাতায়ত হয়েছে সহজ। বিদেশে বসে লিখছেন, পড়ছেন, বই বের করছেন অনেক বাঙালি। আবার সে সব বই স্বদেশ বিদেশ সবখানেই হয়ে যাচ্ছে সহজলভ্য। কাজেই স্থানিক সংস্কৃতিও দেশ ছেড়ে বিশ্বময় উড়ে বেড়ানোর পাখা পেয়েছে। পুরো ভাবনা এখন গতির কারণে পেয়েছে সহজ বিশ্বায়নের পরশ। অগ্রসর বাঙালির আদর পেলে আমাদের সাহিত্য নিয়ে খুব বেশি ভাবনা আছে বলে মনে করছি না। বিদেশ বিভূঁয়েও যে পৃথিবী কাঁপানো বাঙলা সাহিত্য জন্মে বাংলা ভাষায় সনেট বা ‘চতুর্দ্দশপদী কবিতা’-র জনক মাইকেল মধুসুদন দত্ত তা প্রমান করে দ্খিয়েছেন আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগেই। ‘প্রথম ওই সনেটের পরে বাকিগুলো সবই জন্ম নেয় বিদেশে। ১৮৬২ সালের জুন মাসে ক্যাণ্ডিয়া জাহাজে করে বিলেত যান মাইকেল। ভার্সাইয়ে থাকার সময়ে সনেট লেখা মন দেন তিনি। এমনই মন দেন যে, বিপ্লব আসে সনেটে। ধমাধম লিখে ফেলেন এক গাদা অসাধারণ মানের সনেট’ [৬]। বাংলা সাহিত্যের এই অন্যতম কবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত ও লাল সালুখ্যাত ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লা ফ্রান্সের প্রবাস জীবনেই লিখেছেন অনবদ্য গল্প, কবিতা ও উপন্যাস। নামকরা অনেক অনেক লেখকরা লিখে চলেছেন একের পর এক। পাঠকদের পাকা হিসেব না থাকলেও বাঙলা সাহিত্য যে বিদেশে চর্চা হচ্ছে তা সহজেই বোঝা যায় বইগুলোর কাটতি দেখে।

পরবাসে বাঙলা না পড়লে, না লিখলে বা চর্চা না করলে বোঝা যাবে এ সাহিত্য পরিত্যাক্ত হচ্ছে শুধুমাত্র অবহেলায়। মানগত কারনে নয়। আমাদের মাতৃভাষার দায় রয়েছে জন্মভূমির কাছে। দেশ চেতনার কাছে আর নতুন মানুষদের কাছে। এ হেলাফেলার ব্যপার নয়। বাঙলা সাহিত্য পরবাসে এখন চর্চিত, বেশ সহজলভ্য, প্রায় যথেষ্ট এবং গুণেমানে মনকাড়া; এবং এই দূরদেশেও হাত বাড়ালেই বই। বিদেশে বসে বাঙলা সাহিত্যকে ভালবাসতে হলে, একে প্রচার, প্রসার আর দীর্ঘজীবি করতে হলে শুধু হাত বাড়ালেই হবে না, হাত বাড়াবার আগে মন বাড়াতে হবে।

বক্তব্য:

কাজী রহমান, প্রথম গ্রন্থ উৎসব, লস এন্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া, নভেম্বর ৮, ২০১৪।

১. http://bn.wikipedia.org/wiki/সাহিত্য
২. নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ ৪৪, সাহিত্যের দেশ কাল ও জাতিগত রূপ, আহমদ শরীফ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯, ঢাকা।
৩. সাহিত্যের দেশ কাল ও জাতিগত রূপ, পৃ ৪৪, আহমদ শরীফ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯, ঢাকা।
৪. আধুনিক ভাষাতত্ব, পৃ ১, প্রথম অধ্যায়, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, মওলা ব্রাদার্স, ১৯৮৫, ঢাকা।
৫. নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ ৪৬, সাহিত্যের দেশ কাল ও জাতিগত রূপ, আহমদ শরীফ, আগামী প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯, ঢাকা।
৬. কবতক্ষ নদ, ফরিদ আহমেদ, http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=43263.

[67 বার পঠিত]