একাত্তরে আমাদের নারীদের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি সৈন্যদের যৌন নির্যাতনের কতটা মারাত্মক, কতোটা ভয়াবহ, কতোটা বীভৎস ছিলো- যুদ্ধ চলাকালে আমাদের দেশ থেকে প্রকাশিত কোনো দৈনিক পত্রিকায়ই তা প্রকাশিত হয় নি। গনহত্যা, শরণার্থীদের কথা যেমন বিদেশী সংবাদপত্র গুলোতে প্রকাশিত হয়েছিলো গুরুত্ব নিয়ে সে রকম করে ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের খবরগুলো প্রকাশিত হয়নি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে। এখানে লক্ষণীয় এই নারী নির্যাতন ইস্যু নিয়ে সমৃদ্ধ এখনকার কাজগুলোও তেমন প্রচারণা পায়নি। ডঃ ডেভিস কিংবা সুসান ব্রাউনমিলারের গবেষণা ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন কিংবা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কিছু কাজ ছাড়াও ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের করা কিছু দুর্দান্ত কাজ ঠিকই রয়েছে, কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে এসব কাজ খুব একটা আলোর মুখ দেখতে পারে নি এদেশের মানুষের কাছে। কেন এই নিস্ক্রিয়তা, প্রথমেই আমাদের খোঁজটা হোক এই প্রশ্ন।
ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের পর থেকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাক সেনা কর্তৃক নারী নির্যাতনের বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হলেও ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের ধরন, প্রকৃতি, শারীরিক, মানসিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে খুব কমই গবেষণা হয়েছে। “স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও দলিল প্রামাণ্যকরন” প্রকল্পের তৎকালীন গবেষক, বর্তমানে ইংরেজী দৈনিক ডেইলি ষ্টারের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক আফসান চৌধুরী এজন্য ইতিহাস রচনার সনাতনি দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করে বলেছেন, দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখনে বরাবরই সশস্ত্র লড়াই, ক্ষমতাসীন পুরুষদের কৃতিত্ব গ্রন্থিত করার উদ্যোগ চলছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে লাখ লাখ নারী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও যেভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার হয়েছে, সনাতনি মানুসিকতার কারণে কখনই তা নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সংঘর্ষকালীন ধর্ষণ এবং অন্যান্য নির্যাতনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষক ক্যাসান্দ্রা ক্লিফোর্ড,ধর্ষণ কীভাবে হয়ে ওঠে গণহত্যার অনিবার্য অস্ত্র সে সম্পর্কে লিখেছেন
“Rape as a Weapon of War and its Long-term Effects on Victims and Society”

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নারী নির্যাতনের এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করে। মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই নয় মাসে ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনকে একটি বিকৃত শিল্পের পর্যায়ে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এই নির্যাতনের সংখ্যাগত মাত্রা সুবিশাল, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে নির্যাতিত নারীর সংখ্যা ছয় লক্ষের বেশী। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শিকার নারী। সম্ভবত পৃথিবীতে এমন কোন যুদ্ধ ঘটেনি যেখানে ধর্ষণ হয় নি। আক্রান্ত গোষ্ঠীকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিতে,আতঙ্কের রাজত্ব সৃষ্টি করতে,প্রতিরোধ গড়ে ওঠার চেষ্টাকে গুঁড়িয়ে দিতে ধর্ষণ সহ অন্যান্য নারী নির্যাতন হয়ে ওঠে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের প্রধানতম অস্ত্র। তারপরেও আগ্রাসী সেনাবাহিনীকে নারী নির্যাতনে সরাসরি উৎসাহিত করেছে কর্তৃপক্ষ , এমন ঘটনা ইতিহাসে খুব বেশি ঘটেনি। এই বিরল নিদর্শন পাকিস্তান সেনাবাহিনী রেখে গেছে ১৯৭১ সালে,বাংলাদেশ ভূখণ্ডে।

ডঃ মুনতাসির মামুন যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতন নিয়ে লিখেছেন অনেক। তিনি তার ‘মুক্তিযুদ্ধ, নির্যাতন, বিচার’ শীর্ষক প্রবন্ধে গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন যুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাস লুকোনোর প্রচেষ্টা নিয়ে।

তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিমের কথা। তার অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছিলো ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ নামে দু’খণ্ডে এ সম্পর্কে তিনি গ্রন্থও। তার বিবরণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের নারী নির্যাতনের অনেক বিবরণ আছে। যেমন ‘আমাদের শাড়ি পরতে বা দোপাট্টা ব্যবহার করতে দেয়া হতো না। কোনো ক্যাম্পে নাকি কোনো মেয়ে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তাই আমাদের পরনে শুধু পেটিকোট আর ব্লাউজ। যেমন ময়লা তেমনি ছেঁড়া-খোঁড়া। মাঝে মাঝে শহরের দোকান থেকে ঢালাও এনে আমাদের প্রতি ছুঁড়ে ছেড়ে দিত। যেমন দুর্গাপূজা বা ঈদের সময় ভিক্ষা দেয় অথবা জাকাত দেয় ভিখারিকে। চোখ জলে জলে ভরে উঠত।

শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, বীরাঙ্গনাদের যে তালিকা ছিল স্বয়ং বঙ্গবন্ধু তা বিনষ্ট করে ফেলার জন্য বলেছিলেন কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ হলেও সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় নি। সমাজ এদের গ্রহণ করবে না।

স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কয়েকজন বীরাঙ্গনাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য এবং যুদ্ধাপরাধ এ মাটিতে কী পর্যায়ে গিয়েছিল তার সাক্ষ্য হিসেবে। সেই মহিলারা এতদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করেছিলেন। কিন্তু এ ঘটনার পর সমাজপতি ও পরিবারের সদস্যবৃন্দ তাদের প্রায় পরিত্যাগ করে। খুলনায় আমি একজন মহিলাকে পাগলিনি বেশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি যিনি ’৭১ সালে নির্যাতিত হয়েছিলেন। খুলনার অনেকেই তা জানেন, কিন্তু কেউ তার পুনর্বাসনে এগিয়ে আসেন নি। এই হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালির আসল রূপ। ডঃ মামুন লিখেছেন; সবাই প্রিয়ভাষিণী নন। প্রিয়ভাষিণীর যা আছে তা হলো চরিত্র, যা আমাদের নেই। থাকলে বাংলাদেশকে পোড়ার বাংলাদেশ বলতাম না।

নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করতো তা নিয়ে আলোচনা করেছেন শাহারিয়ার কবির এবং মুনতাসির মামুন। এছাড়া এ সম্পর্কে গবেষণা লব্ধ “নারী নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ICSF এর অফিসিয়াল ওয়েবে। সব কিছু মিলিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নির্যাতনের কয়েকটি প্রচলিত পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলোঃ

১. অশ্লীল ভাষায় গালাগালি, তৎসঙ্গে চামড়া ফেটে রক্ত না বেরুনো পর্যন্ত শারীরিক প্রহার,
২. পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা এবং সেই সঙ্গে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো এছাড়া রাইফেলের বাঁট দিয়ে নির্মম ভাবে প্রহার,
৩. উলঙ্গ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উন্মুক্ত স্থানে দাঁড় করিয়ে রাখা,
৪. সিগারেটের আগুন দিয়ে সারা শরীরে ছ্যাঁকা দেয়া,
৫. হাত ও পায়ের নখ ও মাথার ভিতর মোটা সুঁচ ঢুকিয়ে দেয়া,
৬. মলদ্বারের ভিতর সিগারেটের আগুনের ছ্যাঁকা দেয়া এবং বরফখন্ড ঢুকিয়ে দেয়া,
৭. চিমটে দিয়ে হাত ও পায়ের নখ উপড়ে ফেলা,
৮. দড়িতে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মাথা গরম পানিতে বারবার ডোবানো,
৯. হাত-পা বেঁধে বস্তায় পুরে উত্তপ্ত রোদে ফেলে রাখা,
১০. রক্তাক্ত ক্ষতে লবণ ও মরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়া,
১১. নগ্ন ক্ষতবিক্ষত শরীর বরফের স্ল্যাবের ওপরে ফেলে রাখা,
১২. মলদ্বারে লোহার রড ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া,
১৩. পানি চাইলে মুখে প্রস্রাব করে দেয়া,
১৪. অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন চোখের ওপর চড়া আলোর বাল্ব জ্বেলে ঘুমোতে না দেয়া,
১৫. শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বৈদ্যুতিক শক প্রয়োগ প্রভৃতি।

এটা তো সার্বজনীন, ছিল।গ ণহত্যার একেবারে শুরুতে ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ধরণ যেমন ছিল সেটা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য নির্যাতনের ভয়াবহতার কোন পরিবর্তন হয়নি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মাত্রায় নৃশংসতা চালানো হয়েছে।
নির্যাতনের এই ধরণগুলো সংক্ষেপে এরকম –
১. মার্চ এপ্রিলের দিনগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু মেয়েদেরকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে।কখনো ধর্ষণের পর তাদেরকে রাজাকার,আলবদর ও অন্যান্য দোসরদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ধর্ষণ ও ভোগ শেষে হত্যা করার জন্য।

২. মুসলিম সম্প্রদায়ের মেয়েদেরকে ( যাদের সংখ্যা মোট নির্যাতিতার শতকরা আশি ভাগ ) যেখানে পেয়েছে সেখানেই ধর্ষণ করেছে, বিশেষ করে একাত্তরের এপ্রিল থেকে।ক খনও তাদের বাসস্থলে,এককভাবে কিংবা পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও নিকটজন বিশেষ করে স্বামী-সন্তান। শ্বশুর-শাশুড়ি,বাবা-মায়ের সামনেই ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের এই বর্বর প্রক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়েছিল ধর্ষিতা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনসহ বাঙালি সম্প্রদায়ের অহংকার ও অস্তিত্বকে আঘাত করার জন্য। সেই সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর বিকারগ্রস্ত প্রকৃতি চরিতার্থ করার জন্য।

৩. কখনও তারা বাঙালি মেয়েদেরকে ক্যাম্পে বন্দি রেখে ভোগ্যপণ্য ও যৌনদাসী হিসাবে ব্যবহার করেছে।

৪. কখনও একক সম্পদ ও দাসী হিসাবে মেয়েদেরকে তারা এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে।

৫. প্রাথমিক অত্যাচারের সময় অথবা দীর্ঘভোগের পর পালিয়ে যাবার সময় পাকিস্তানি বাহিনী এই মেয়েদের স্তন,উরু,যৌনাঙ্গসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের অংশ কেটে নিয়ে গেছে fetichistic crisis ও মনোবিকারে আক্রান্ত হয়ে।
৬. সৈনিকেরা প্রতিটি যুবতী মহিলা ও বালিকার পরণের কাপড় সম্পূর্ণ খুলে একেবারে উলঙ্গ করে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়ে ধর্ষণে লিপ্ত হতো।

৭. সৈনিকেরা অনেক সময় মেয়েদের পাগলের মত ধর্ষণ করে আর ধারালো দাঁত দিয়ে বক্ষের স্তন কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিত,এতে অনেক অল্পবয়স্ক মেয়ের স্তনসহ বুকের মাংস উঠে এসেছিল।মেয়েদের গাল,পেট,ঘাড়,বুক,পিঠ ও কোমরের অংশ পাকিস্তানি সৈনিকের অবিরাম কামড়ে রক্তাক্ত হয়ে যেত।

৮. সাধারণত যে সকল বাঙালি মেয়ে এধরণের পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করতো তাদেরকে তখনই চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছিঁড়ে ফেলে,যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল,বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করা হতো।

৯. অনেক উচ্চপদস্থ অফিসার মদ খেয়ে উলঙ্গ বালিকা,যুবতী ও বাঙালি মেয়েদের সারাক্ষণ পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করতো। বহু অল্প বয়স্ক বালিকা উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে রক্তাক্ত শরীরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যেত।

১০. অনেক সময় প্রাণভয়ে অন্যান্য মেয়েরা স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি সৈনিকদের কাছ আত্মসমর্পণ করতো।তাদেরকেও হঠাৎ একদিন ধরে ছুরি চালিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে হত্যা করে আনন্দ উপভোগ করতো সৈনিকেরা।

১১. অনেক সময় যুবতী মেয়েকে মোটা লোহার রডের সাথে চুল বেধে ঝুলিয়ে রাখা হতো।পাকসেনারা প্রতিদিন সেখানে যাতায়াত করতো,কেউ কেউ এসে সেই উলঙ্গ যুবতীদের উলঙ্গ দেহে উন্মত্তভাবে আঘাত করতো,কেউ তাদের স্তন কেটে নিয়ে যেত,কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করতো।এসব অত্যাচারে কোন মেয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হতো।

১২. অনেক মেয়ের হাত পিছনের দিকে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।সৈনিকেরা এসব মেয়েদের এলোপাথাড়ি ভাবে প্রহার করতো।এভাবে প্রতিদিন বিরামহীন প্রহারের মেয়েদের শরীর থেকে রক্ত ঝরতো।কোন কোন মেয়ের সম্মুখের দিকে দাঁত ছিল না,ঠোঁটের দু’দিকের মাংস কামড়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল এবং প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল লাঠি ও রডের আঘাতে ভেঙ্গে,থেঁতলে গিয়েছিল।এক মুহূর্তের জন্যও প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনেও এসব মেয়ের হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হতো না।অবিরাম ধর্ষণের ফলে ফলে অনেক মেয়ে ঝুলন্ত অবস্থাতেই মারা যেত।

১৩. অনেক সময় বন্দি বাঙালি মেয়েদের নদীতে শিকল বাঁধা অবস্থায় গোসল করতে যেতে দিত।এসময় একটু দেরি হলেই সৈনিকেরা তাদের ঘাঁটি থেকে শিকল ধরে টানাটানি করতো।এধরণের টানাটানিতে অনেক সময়ই প্রায় বিবস্ত্র শরীরে এসব মেয়েকে ঘাঁটিতে ফিরতে হতো।

১৪. গণহত্যার প্রথম দিকে ক্যাম্পে পাকিস্তানি সৈনিকদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক মেয়ে ওড়না বা শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।এর পর থেকে এসব মেয়েকে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হয়।

১৫. পাকিস্তানি সৈনিকেরা গর্ভবতী এবং প্রসূতি নারীদেরও ধর্ষণ করে।এতে অনেকেরই মৃত্যু হয়।

১৬. সৈনিকেরা অনেক সময় হঠাৎ গ্রামে বা বসতিতে আক্রমণ চালিয়ে পলায়নরত মহিলাদের ধরে এনে উন্মুক্ত স্থানেই ধর্ষণে লিপ্ত হতো।

১৭. অনেক সময় পিতার সামনেই মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করতো পাকিস্তানি সৈনিকেরা। কখনও কখনও পিতাকে,ছেলেকে বা ভাইকে আদেশ করতো মেয়েকে,মাকে অথবা বোনকে ধর্ষণ করতে। এতে অবাধ্য হলে সাথে সাথে তাদের হত্যা করা হতো।

এ পর্যায়ে যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের কিছু মৌখিক বয়ান এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত ধর্ষণ সম্পর্কিত প্রকাশিত কয়েকটি প্রতিবেদন উল্লেখ করা হলোঃ

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার রাবেয়া খাতুনের বর্ণনা

” ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ রাতে হানাদার পাঞ্জাবী সেনারা যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উপর অতর্কিতে হামলা চালায় তখন আমি রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ ক্যান্টিনে ছিলাম। আসন্ন হামলার ভয়ে আমি সারাদিন পুলিশ লাইনের ব্যারাক ঝাড়ু দিয়ে রাতে ব্যারাকেই ছিলাম। কামান, গোলা, লাইটবোম আর ট্যাঙ্কের অবিরাম কানফাটা গর্জনে আমি ভয়ে ব্যারাকের মধ্যে কাত হয়ে পড়ে থেকে থরথরিয়ে কাঁপছিলাম। ২৬ শে মার্চ সকালে ওদের কামানের সম্মুখে আমাদের বীর বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী বীরের মত প্রতিরোধ করতে করতে আর টিকে থাকতে পারি নাই। সকালে ওরা পুলিশ লাইনের এস,এফ ব্যারাকের চারদিকে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং ব্যারাকের মধ্যে প্রবেশ করে বাঙ্গালী পুলিশদের নাকে , মুখে, সারা দেহে বেয়নেট ও বেটন চার্জ করতে করতে ও বুটের লাথি মারতে মারতে বের করে নিয়ে আসছিল। ক্যান্টিনের কামড়া থেকে বন্দুকের নলের মুখে আমাকেও বের করে আনা হয়, আমাকে লাথি মেরে, মাটিতে ফেলে দেয়া হয় এবং আমার উপর প্রকাশ্যে পাশবিক অত্যাচার করছিল আর কুকুরের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। আমার উপর উপর্যুপরি পাশবিক অত্যাচার করতে করতে যখন আমাকে একেবারে মেরে ফেলে দেওয়ার উপক্রম হয় তখন মার বাঁচবার আর কোন উপায় না দেখে আমি আমার প্রান বাঁচাবার জন্য ওদের নিকট কাতর মিনতি জানাচ্ছিলাম। আমি হাউ মাউ করে কাদছিলাম , আর বলছিলাম আমাকে মেরোনা, আমি সুইপার, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পায়খান ও নর্দমা পরিস্কার করার আর কেউ থাকবে না, তোমাদের পায়ে পড়ি তোমরা আমাকে মেরোনা, মেরো না, মেরো না, আমাকে মেরে ফেললে তোমাদের পুলিশ লাইন রক্ত ও লাশের পচা গন্ধে মানুষের বাস করার অযোগ্য হয়ে পড়বে। তখনও আমার উপর এক পাঞ্জাবী কুকুর , কুকুরের মতোই আমার কোমরের উপর চড়াও হয়ে আমাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করছিল। আমাকে এভাবে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলে দিলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন পরিস্কার করার জন্য আর কেউ থাকবে না একথা ভেবে ওরা আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমাকে এক পাঞ্জাবী ধমক দিয়ে বলতে থাকে ,’ ঠিক হায় , তোমকো ছোড় দিয়া যায়েগা জারা বাদ, তোম বাহার নাহি নেকলেগা, হারওয়াকত লাইন পার হাজির রাহেগা।’ এ কথা বলে আমাকে ছেড়ে দেয়।

পাঞ্জাবী সেনারা রাজাকার ও দালালদের সাহায্যে রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা এবং অভিজাত জনপদ থেকে বহু বাঙ্গালী যুবতী মেয়ে, রূপসী মহিলা এবং সুন্দরী বালিকাদের জীপে , মিলিটারি ট্রাকে করে পুলিশ লাইনের বিভিন্ন ব্যারাকে জমায়েত করতে থাকে। আমি ক্যান্টিনের দ্রেন পরিস্কার করছিলাম দেখলাম আমার সম্মুখ দিয়ে জীপ থেকে আর্মি ট্রাক থেকে লাইন করে বহু বালিকা যুবতী ও মহিলাকে এস,এফ ক্যান্টিনের মধ্য দিয়ে ব্যারাকে রাখা হল। বহু মেয়েকে হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং এ উপর তালায় রুমে নিয়ে যাওয়া হল, আর অবশিষ্ট মেয়ে যাদেরকে ব্যারাকের ভিতর জায়গা দেওয়া গেল না তাঁদের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা হল। অধিকাংশ মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখলাম, অনেক রুপসী যুবতীর দেহে অলংকার দেখলাম, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছিল। এরপরই আরম্ভ হয়ে গেল সেই বাঙ্গালী নারীদের উপর বীভৎস ধর্ষণ। লাইন থেকে পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত জিভ চাটতে চাটতে ব্যারাকের মধ্যে উম্মত্ত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রবেশ করতে লাগল। ওরা ব্যারাকে ব্যারাকে প্রবেশ করে প্রতিটি যুবতী, মহিলা ও বালিকার পরনের কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে মাটিতে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বীভৎস ধর্ষণে লেগে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই নিরীহ বালিকাদের উপর ধর্ষণে লেগে গেল, আমি ব্যারাকে ড্রেন পরিস্কার করার অভিনয় করছিলাম আর ওদের বীভৎস পৈশাচিকতা দেখছিলাম। ওদের উম্মত্ত উল্লাসের সামনে কোন মেয়ে কোন শব্দ পর্যন্তও করে নাই, করতে পারে নাই। উম্মত্ত পাঞ্জাবী সেনারা এই নিরীহ বাঙ্গালী মেয়েদের শুধুমাত্র ধর্ষণ করেই ছেড়ে দেয় নাই- আমি দেখলাম পাক সেনারা সেই মেয়েদের উপর পাগলের মত উঠে ধর্ষণ করছে আর ধারাল দাঁত বের করে বক্ষের স্তন ও গালের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে, ওদের উদ্ধত ও উম্মত্ত কামড়ে অনেক কচি মেয়ের স্তনসহ মক্ষের মাংস উঠে আসছিল, মেয়েদের গাল, পেট, ঘাড়, বক্ষ, পিঠের ও কোমরের অংশ ওদের অবিরাম দংশনে রক্তাক্ত হয়ে গেল। যে সকল বাঙ্গালী যুবতী ওদের প্রমত্ত পাশবিকতার শিকার হতে অস্বীকার করলো দেখলাম তৎক্ষণাৎ পাঞ্জাবী সেনারা ওদেরকে চুল ধরে টেনে এনে স্তন ছোঁ মেরে টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ওদের যোনি ও গুহদ্বারের মধ্যে বন্দুকের নল, বেয়নেট ও ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের পবিত্র দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। অনেক পশু ছোট ছোট বালিকাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে ওদের অসার রক্তাক্ত দেহ বাইরে এনে দুজন দু পা দুদিকে টেনে ধরে চড়চড়িয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিল, আমি দেখলাম সেখানে বসে বসে, আর ড্রেন পরিস্কার করছিলাম, পাঞ্জাবীরা শ্মশানের লাশ যে কোন কুকুরের মত মদ খেয়ে সব সময় সেখানকার যার যে মেয়ে ইচ্ছা তাকেই ধর্ষণ করছিল। শুধু সাধারণ পাঞ্জাবী সেনারাই এই বীভৎস পাশবিক অত্যাচারে যোগ দেয় নাই, সকল উচ্চপদস্থ পাঞ্জাবী অফিসাররাই মদ খেয়ে হিংস্র বাঘের মত হয়ে দুই হাত বাঘের মত নাচাতে নাচাতে সেই উলঙ্গ বালিকা, যুবতী ও বাঙ্গালী মহিলাদের উপর সারাক্ষন পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ কাজে লিপ্ত থাকতো। কোন মেয়ে, মহিলা, যুবতীকে এক মুহূর্তের জন্য অবসর দেওয়া হয় নাই, ওদের উপর্যুপরি ধর্ষণ ও অবিরাম অত্যাচারে বহু কচি বালিকা সেখানেই রক্তাক্ত দেহে কাতরাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, পরের দিন এ সকল মেয়ের লাশ অন্যান্য মেয়েদের সম্মুখে ছুরি দিয়ে কেটে কুটি কুঁচি করে বস্তার মধ্যে ভরে বাইরে ফেলে দিত। এ সকল মহিলা , বালিকা ও যুবতীদের নির্মম পরিণতি দেখে অন্যান্য মেয়েরা আরও ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তো এবং স্বেচ্ছায় পশুদের ইচ্ছার সম্মুখে আত্মসমর্পণ করতো। যে সকল মেয়ে প্রানে বাঁচার জন্য ওদের সাথে মিল দিয়ে ওদের অতৃপ্ত যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করার জন্য ‘ সর্বতোভাবে সহযোগীতা করে তাঁদের পিছনে ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁদের হাসি তামাশায় দেহদান করেছে তাদেরকেও ছাড়া হয় নাই। পদস্থ সামরিক অফিসাররা সেই সকল মেয়েদের উপর সম্মিলিতভাবে ধর্ষণ করতে করতে হঠাৎ একদিন তাকে ধরে ছুরি দিয়ে তার স্তন কেটে, পাছার মাংস কেটে, যোনি ও গুহ্যদ্বারের মধ্যে সম্পূর্ণ ছুরি চালিয়ে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে ওরা আনন্দ উপভোগ করত।

এরপর উলঙ্গ মেয়েদেরকে গরুর মত লাথি মারতে মারতে পশুর মত পিটাতে পিটাতে উপরে হেডকোয়ার্টারে দোতলা, তেতলা ও চার তলায় উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পাঞ্জাবী সেনারা চলে যাওয়ার সময় মেয়েদেরকে লাথি মেরে আবার কামরার ভিতর ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে চলে যেত। ইহার পর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারের উপর চুলের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবীরা সেখানে যাতায়াত করতো সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ যুবতীদের কেউ এসে তাঁদের উলঙ্গ দেহের কোমরের মাংস বেট দিয়ে উম্মত্তভাবে আঘাত করতে থাকতো, কেউ তাঁদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত, কেউ হাসতে হাসতে তাঁদের যোনিপথে লাঠি ঢুকিয়ে আনন্দ করত, কেউ উঁচু চেয়ারে দাঁড়িয়ে উম্মুক্তবক্ষ মেয়েদের স্তন মুখ লাগিয়ে ধারাল দাঁত দিয়ে স্তনের মাংস তুলে নিয়ে আনন্দে অট্টহাসি করতো। কোন মেয়ে এসব অত্যাচারে কোন প্রকার চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার যোনিপথ দিয়ে লোহার রড ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করা হত। প্রতিটি মেয়ের হাত বাঁধা ছিল পিছনের দিকে শুন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেক সময় পাঞ্জাবী সেনারা সেখানে এসে সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েদের এলোপাথাড়ি বেদম প্রহার করে যেত। প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের দেহের মাংস ফেটে রক্ত ঝরছিল, মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিল না, ঠোঁটের দুদিকের মাংস কামড়ে, টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল, লাঠি ও লোহার রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের আঙ্গুল, হাতের তালু ভেঙ্গে, থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এসব অত্যাচারিত ও লাঞ্চিত মহিলা ও মেয়েদের প্রসাব ও পায়খানা করার জন্য হাতের ও চুলের বাঁধন খুলে দেওয়া হতো না এক মুহূর্তের জন্য। হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় বারান্দায় এই ঝুলন্ত উলঙ্গ মেয়েরা হাত বাঁধা অবস্থায় লোহার তারে ঝুলে থেকে সেখানে প্রসাব পায়খানা করত- আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে এসব প্রসাব- পায়খানা পরিস্কার করতাম। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, অনেক মেয়ে অবিরাম ধর্ষণের ফলে নির্মমভাবে ঝুলন্ত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে। প্রতিদিন সকালে গিয়ে সেই বাঁধন থেকে অনেক বাঙ্গালী যুবতীর বীভৎস মৃতদেহ পাঞ্জাবী সেনাদের নামাতে দেখেছি। আমি দিনের বেলাও সেখানে সকল বন্দী মহিলাদের পুতগন্ধ, প্রসাব- পায়খানা পরিষ্কার করার জন্য সারাদিন উপস্থিত থাকতাম। প্রতিদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ব্যারাক থেকে এবং হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলা হতে বহু ধর্ষিতা মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বিকৃত লাশ ওরা পায়ে রশি বেঁধে নিয়ে যায় এবং সেই জায়গায় রাজধানী থেকে ধরে আনা নতুন নতুন মেয়েদের চুলের সাথে ঝুলিয়ে বেঁধে নির্মমভাবে ধর্ষণ আরম্ভ করে দেয়। এসব উলঙ্গ নিরীহ বাঙ্গালী যুবতীদের সারাক্ষন পাঞ্জাবী সেনারা প্রহরা দিত। কোন বাঙ্গালীকেই সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না। আর আমি ছাড়া অন্য কোন সুইপারকেও সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।

মেয়েদের হাজারো কাতর আহাজারিতেও আমি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঙ্গালী মেয়েদের বাঁচাবার জন্য কোন ভুমিকা পালন করতে পারি নাই। এপ্রিল মাসের দিকে আমি অন্ধকার পরিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে খুব ভরে হেডকোয়ার্টারের উপর তলায় সারারাত ঝুলন্ত মেয়েদের মলমুত্র পরিষ্কার করছিলাম। এমন সময় সিদ্ধেশ্বরীর ১৩৯ নং বাসার রানু নামে এক কলেজের ছাত্রীর কাতর প্রার্থনায় আমি অত্যন্ত ব্যাথিত হয়ে পড়ি এবং মেথরের কাপড় পরিয়ে কলেজ ছাত্রি রানুকে মুক্ত করে পুলিশ লাইনের বাইরে নিরাপদে দিয়ে আসি। স্বাধীন হওয়ার পর সেই মেয়েকে আর দেখি নাই। ১৯৭১ সনের ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ মুক্ত করার পূর্ব পর্যন্ত পাঞ্জাবী সেনারা এসকল নিরীহ বাঙ্গালী মহিলা, যুবতী ও বালিকাদের উপর এভাবে নির্মম-পাশবিক অত্যাচার ও বীভৎসভাবে ধর্ষণ করে যাচ্ছিল। ডিসেম্বরের প্রথমদিকে মিত্রবাহিনী ঢাকায় বোমাবর্ষণের সাথে সাথে পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের চোখের সামনে মেয়েদের নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টার অফিসের উপর তলায়, সমস্ত কক্ষে, বারান্দায় এই নিরীহ মহিলা ও বালিকাদের তাজা রক্ত জমাট হয়েছিল। ডিসেম্বরের মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রাজধানীতে বীর বিক্রমে প্রবেশ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সকল পাঞ্জাবী সেনা আত্মসমর্পণ করে।”

বীরাঙ্গনা তারা ব্যানার্জির বর্ণনায় সেই দিনগুলোর কথা।

“২৭ শে মার্চ অন্ধকার থাকতেই আমরা গ্রামের বাড়ীতে রওয়ানা হলাম সামান্য হাতব্যাগ নিয়ে। গাড়ি , রিকশা কিছুই চলছে না। হঠাৎ স্থানীয় চেয়ারম্যানের জীপ এসে থামল আমাদের সামনে। বাবাকে সম্বোধন করে বললেন, ডাক্তারবাবু আসেন আমার সঙ্গে। কোথায় যাবেন নামিয়ে দিয়ে যাবো। বাবা আপত্তি করায় চার পাচজনে আমাকে টেনে জীপে তুলে নিয়ে গেল। কোন গোলাগুলির শব্দ শুনলাম না। বাবা মা কে ধরে নিয়ে গেল নাকি মেরে ফেললো বলতে পারবো না। গাড়ি আমাকে নিয়ে ছুটল কোথায় জানি না। কিছুক্ষন হয়ত জ্ঞান হারিয়ে ছিল আমার। সচেতন হয়ে উঠে বসতেই বুঝলাম এটা থানা, সামনে বসা আর্মি অফিসার।

অফিসারটি পরম সোহাগে আমাকে নিয়ে জীপে উঠলো। কিছুদুর যাবার পর সে গল্প জুড়লো অর্থাৎ কৃতিত্বের কথা আমাকে শোনাতে লাগলো। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। হঠাৎ ঐ চলন্ত জীপ থেকে আমি লাফ দিলাম। ড্রাইভিং সিটে ছিল অফিসার, আমি পেছনে, পেছনে দু জন জোয়ান। আমার সম্ভবত হিতাহিত জ্ঞান রহিত হয়ে গিয়েছিল। যখন জ্ঞান হলো দেখি মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, আমি হাসপাতালের বিছানায়। ছোট্ট হাস্পাতাল। যত্নই পেলাম, সব পুরুষ। একজন গ্রামের মেয়েকে ধরে এনেছে আমার নেহায়েত প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য। মেয়েটি গুন গুন করে কেঁদে চলেছে। সন্ধ্যায় অফিসারটি চলে গেল। যাবার সময় আমাকে হানি, ডার্লিং ইত্যাদি বলে খোদা হাফেজ করল। দিন তিনেক শুয়ে থাকার পর উঠে বসলাম। সুস্থ হয়েছি এবার। আমাদের ভেতর সংস্কার আছে পাঁঠা বা মহিষের খুঁত থাকলে তাকে দেবতার সামনে বলি দেওয়া যায় না। আমি এখন বলির উপযোগী।

প্রথম আমার উপর পাশবিক নির্যাতন করে একজন বাঙালি। আমি বিস্ময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিলাম। অসুস্থ দেহে যুদ্ধ করতে পারলাম না। লালাসিক্ত পশুর শিকার হলাম। ওই রাতে কতজন আমার উপর অত্যাচার করেছিল বলতে পারবো না, তবে ছ’সাত জনের মতো হবে। সকালে অফিসারটি এসে আমাকে ঐ অবস্থায় দেখলো তারপর চরম উত্তেজনা, কিছু মারধরও হলো। তারপর আমাকে তার জীপে তুলে নিল, আমি তৃতীয় গন্তব্যে পৌঁছোলাম… ”

পাবনার মোসাম্মৎ এসবাহাতুন বলেন ,

“১৯৭১ সালের জুলাই মাসে পাক বাহিনী আমার বাবার বাড়ী নতুন ভাঙ্গাবারীতে প্রায় ৫০ জন অপারেশনে যায়। কিছু সময় পরে আমাদের বাড়ীর মধ্যে দুজন পাক সেনা ধুকে পড়ে। তারা ঢুকে পড়ার সাথে সাথে অন্যান্য যে মেয়েরা ছিলো তারা মিলিটারি দেখে দৌড়াদৌড়ি করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমার কোলে বাচ্চা থাকার জন্য আমি বেরুতে পারি না। পাক সেনারা দুজন আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার বাবা ও ভাই এসে বাঁধা দিতে চাইলে একজন পাক সেনা তাঁদের বুকে রাইফেল ধরে রাখে আর একজন আমাকে ঘরের মধ্যে ধরে ফেলে আমার নিকট হতে আমার পাঁচ মাসের বাচ্চা ছিনিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। আমার শিশু সন্তান কাঁদতে থাকে। তারপর সে আমার বাবা ও ভাই এর বুকে রাইফেল ধরে রাখে অন্যজন এসে আবার পাশবিক অত্যাচার শুরু করে। দুজন মিলে প্রায় এক ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করে। তারপর চলে যায়। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকি। তার আধ ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফিরে পাই।

বীরাঙ্গনা মোসাম্মৎ রাহিমা খাতুন এর বর্ণনায়

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে একদিন ভোর রাত্রি আমি আমার স্বামীর সাথে ঘুমিয়ে আছি সাথে আমার সাত মাসের শিশু সন্তান, মিলিটারি আসার শব্দ পেয়ে আমার স্বামী পালিয়ে যায়। হঠাৎ প্রায় সাত জন মিলিটারি বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এবং ঘরের দরজায় লাথি মেরে দরজা খুলে ফেলে এবং আমার শিশু সন্তানকে আমার নিকট থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মাটির সাথে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। তারপর আমাকে এক এক করে ৭ জন পাক সেনা পাশবিক অত্যাচার করে। প্রায় ঘণ্টা আমার উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার আধ ঘণ্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে শুনতে পাই যে আমার তিনজন জোরকে পাক সেনারা জোর করে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আর তাঁদের খোঁজ খবর পাওয়া যায় নাই। একই দিনে ঐ গ্রামের প্রায় ১০/১২ জন মহিলার উপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং প্রায় ৭ জন মহিলাকে তাঁদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা হবার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি।

বরিশালের বীরাঙ্গনা ভাগীরথীর বীরত্বের ইতিহাসও আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর এই বীরাঙ্গনার বীরত্বের ইতিহাস ছাপা হয়, ৩ রা ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ , দৈনিক আজাদ পত্রিকায়।

“’মহাদেবের জটা থেকে’ নয় বাংলা মায়ের নাড়ী ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছিলেন যে সোনার মেয়ে সে ভাগীরথীকে ওরা জ্যান্ত জীপে বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে টেনে হত্যা করেছে। খান দস্যুরা হয়তো পরখ করতে চেয়েছিলো ওরা কতখানি নৃশংস হতে পারে। বলতে হয় এক্ষেত্রে ওরা শুধু সফল হয়নি, বর্বরতার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অষ্টাদশী ভাগীরথী ছিল বরিশাল জেলার পিরোজপুর থানার বাঘমারা কদমতলীর এক বিধবা পল্লীবালা। বিয়ের এক বছর পর একটি পুত্র সন্তান কোলে নিয়েই তাকে বরণ করে নিতে হয় সুকঠিন বৈধব্য। স্বামীর বিয়োগ ব্যাথা তখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দেশে নেমে এল ইয়াহিয়ার ঝটিকা বাহিনী। মে মাসের এক বিকালে ওরা চড়াও হল ভাগীরথীদের গ্রামে। হত্যা করলো অনেক কে, যেখানে যেভাবে পেলো। এ নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভাগীরথীকে ওরা মারতে পারল না। ওকে ট্রাকে তুলে নিয়ে এলো পিরোজপুরে। তারপর ক্যাম্পে তার উপর চালানো হল হিংস্র পাশবিক অত্যাচার।

সতি নারী ভাগীরথী। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে তিনি একমাত্র পরিত্রানের উপায় বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে ভাবতেই এক সময় এল নতুন চিন্তা, হ্যাঁ মৃত্যুই যদি বরন করতে হয় ওদেরই বা রেহাই দেব কেন? ভাগীরথী কৌশলের আশ্রয় নিলো এবার। এখন আর অবাধ্য মেয়ে নয়, দস্তুরমত খানদের খুশি করতে শুরু করলো , ওদের আস্থা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগালো।

বেশি দিন লাগল না অল্প কদিনেই নারীলোলুপ সেনারা ওর প্রতি দারুণ আকর্ষণ অনুভব করল। আর সেই সুযোগে ভাগীরথী ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে শুরু করল পাক বাহিনীর সব গোপন তথ্য। এক পর্যায়ে বিশ্বাস ভাজন ভাগীরথীকে ওরা নিজের ঘরেও যেতে দিতো। আর কোন বাঁধা নেই। ভাগীরথী এখন নিয়মিত সামরিক ক্যাম্পে যায় আবার ফিরে আসে নিজ গ্রামে। এরই মধ্যে চতুরা ভাগীরথী তার মূল লক্ষ্য অর্জনের পথেও এগিয়ে গেল অনেকখানি। গোপনে মুক্তিবাহিনীর সাথে গড়ে তুলল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এরপরই এল আসল সুযোগ। জুন মাসের একদিন ভাগীরথী খান সেনাদের নিমন্ত্রন করল তার নিজ গ্রামে। এদিকে মুক্তিবাহিনীকেও তৈরি রাখা হল যথারীতি। ৪৫ জন খানসেনা সেদিন হাসতে হাসতে বাঘমারা কদমতলা এসেছিলো কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ফিরতে পেরেছিলো।

এরপর আর ভাগীরথী ওদের ক্যাম্পে যায় নি। ওরা বুঝেছে এটা তারই কীর্তি। কীর্তিমানরা তাই হুকুম দিল জীবিত অথবা মৃত ভাগীরথীকে ধরিয়ে দিতে পারবে তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরুস্কার দেয়া হবে।
কিন্তু ভাগীরথী তখনও জানত না ওর জন্য আরও দুঃসহ ভবিস্যত অপেক্ষা করছে। একদিন রাজাকারদের হাতে ধরা পরল ভাগীরথী। তাকে নিয়ে এল পিরোজপুর সামরিক ক্যাম্পে। খান সেনাদের এবার ভাগীরথীর উপর হিংস্রতার পরীক্ষার আয়োজন করলো। এক হাটবারে তাকে শহরের রাস্তায় এনে দাঁড় করানো হলো জনবহুল চৌমাথায়। সেখানে প্রকাশ্যে তার অঙ্গাবরন খুলে ফেলল কয়েকজন খান সেনা। তারপর দু’গাছি দড়ি ওর দুপায়ে বেঁধে একটি জীপে বেঁধে জ্যান্ত শহরের রাস্তায় টেনে বেড়ালো ওরা মহাউৎসবে। ঘণ্টা খানিক রাজপথ পরিক্রমায় পর আবার যখন ফিরে এল সেই চৌমাথায় তখনও ওর দেহে প্রানের স্পন্দন রয়েছে।

এবার তারা দুটি পা দুটি জীপের সাথে বেঁধে নিল এবং জীপ দুটিকে চালিয়ে দিল বিপরীত দিকে। ভাগীরথী দু ভাগ হয়ে গেল। সেই দুভাগে দুজীপে আবার শহর পরিক্রমা শেষ করে জল্লাদ খানরা আবার ফিরে এল সেই চৌমাথায় এবং সেখানেই ফেলে রেখে গেল ওর বিকৃত মাংসগুলো। একদিন দুদিন করে মাংসগুলো ঐ রাস্তার মাটির সাথেই একাকার হয়ে গেল এক সময়। বাংলা মায়ের ভাগীরথী এমনি ভাবেই আবা মিশে গেলো বাংলার ধূলিকণার সাথে।

হাতীবান্ধা,লালমনিরহাটের বীরাঙ্গনা খতিনার মৌখিক বয়ান

“কুত্তাগুলো আইসাই ঘরে ঢুকে পড়ে এবং আমাকে ডাক দিয়ে ঘরে নিয়ে যায়। আমি তো ঘরে ঢুকি না।ত খন ভয় দেখায় মাইরা ফেলবে। আমি আস্তে আস্তে দরজার কাছে যেতেই ছুঁ মাইরা ঘরে নিয়া যায়। কোলের বাচ্চাটাকে একজন ফেলে দেয়। আরেকজন কাপড়-চোপড় ধইরা টানাটানি শুরু করে। আমি চিল্লান দিতে চাইছি তখন আমার মুখ চেপে ধরে কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে শুরু করে ধর্ষণ। অন্যজন তখন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। এভাবেই তারা আমার উপর নির্যাতন করে। এক ফাঁকে আমি অতিকষ্টে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তখন আমার আব্বা আসছিলেন। পায়খানায় গিয়েছিলেন,সেইখান থেকে। আব্বা যখন আমার দিকে আসছে,তখন আব্বার মাথায় বন্দুক ধরে আর বলে নড়লে গুলি করে দিব। আমাকেও বলে,যদি কোন শব্দ করি তবে গুলি করে দিবে। আমার ভাই পশ্চিম ঘর থেকে বাইরে দৌড় দিচ্ছে তখন তারা অন্য ঘরে ঢুকে। দুই জন তো আগে থেকেই ছিল ঐ ঘরে। এই ফাঁকে আমি পালাই। পাটক্ষেতে,নির্যাতনের পরে। পালাবার সময় আমার পরনের কাপড়টা তুলে নিয়া যাই।
সকালে নাস্তা খাইয়া,গুছায়া-টুছায়া ঘরে যাব। স্বামীও চলে গেছে কাজে।তখন তারা আসে। যখন নির্যাতন করে তখন কেউ ছিল না।আর থাকলেই বা কি করার ছিল? না কিছুই করতে পারতো না। ছোট বাচ্চাটাতো কোলেই ছিল। আর বড় বাচ্চাটা মোহাম্মদ আলীর বয়স তখন ৭/৮ বছর হবে। আলী ভয়ে ঘরে চৌকির তলে ঢুকে ছিল। নির্যাতনের পর ঘরের সব জিনিসপত্র তছনছ করে ফেলেছিল। মনে হয় কিছু তল্লাশি করছিল। ছোট বাচ্চাটা সেই থেকে অসুখে ভুগতে ভুগতে শেষ হইয়া যাবার ধরছে। বহু টাকা খরচ করে ভালো করছি। আর আমার পেটে যে আর একটা বাচ্চা ছিল সাত মাসের,এই নির্যাতনের দুই দিন পরে পেটেই বাচ্চাটা মারা যায়। সেটাও ছেলে ছিল। শুধু নির্যাতন করে নাই ছুরি চাক্কু দিয়েও মারছিল। অনেক মার মারছে। তার ওপর আবার প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আমাকে নির্যাতন করে।”

হাতীবান্ধার একজন বিরঙ্গনা কমলার বর্ণনা

“আমার তখন একেবারে কাঁচা নাড়, ৩ দিন বয়স মেয়েটার। তখন আমার ওপর চলে এই অত্যাচার। আমি বসে বসে বাচ্চার তেনা ধুইতেছিলাম কলের পাড়। এইখানে ফালাইয়া আমার ইজ্জত মারে ঐসব জানোয়ার। মানুষ তো ছিল না। দেখতে যেমন শয়তানের মতো লাগছে,পরছিল কেমন পোশাক জানি। কাজগুলোও করছে শয়তান-জানোয়ারের মত। কোন মানুষের পক্ষে এই সময় এই কাজ করা সম্ভব নয়। আমি তো বসে বসে তেনা ধুইতেছি। হঠাৎ দেখি,হারামজাদা কুত্তাগুলো লাফাইয়া লাফাইয়া এসে আমার উপর পড়ছে। প্রথমে আমি তো ভয়ে চিল্লাচিল্লি শুরু করি। তারপর শুরু করে। আমি কিছু বলার,কওয়ার সুযোগ পাই নাই। আমার চিল্লাচিল্লিতে তখন অনেক লোক জড়ো হইছে ঠিকই। কিন্তু সবাই খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামাশা দেখছে। কেউ আসেনি এগিয়ে হামারে সাহায্য করতে। এক সময় আমি মরার মতো অজ্ঞান হয়ে যাই। কতজন,কতক্ষণ তারা এইসব করছে আমি জানি না, আমার যহন জ্ঞান আইছে তখন দেহি,আমি ঘরে,আমার স্বামী আছে পাশে বসা। যখন এই ঘটনা ঘটায় তখন আমার স্বামী বাড়ী ছিল না,বাজারে গেছিল। কে বা কারা আমারে ঘরে আনছে,তারে খবর দিছে কিছুই কইতে পারি না। পরে ডাক্তার আইনা চিকিৎসা করিয়ে বহুদিন পরে হামারে সুস্থ করে। পরে শুনছি লোকমুখে তারা নাকি ৪/৫ জন ছিল। সবাই নাকি এই কাজ করেছে। আর বাইরে পাহারা দিতেছিল কয়েকজন। পরে কোন দিক দিয়ে কখন যায়,কিছু আমি জানি না। একে তো আঁতুর ঘরে কাঁচা নাড় তার ওপর আবার শত শত লোকের সামনে এই কর্মকাণ্ড করেছে। শরীরের অবস্থা কি,মনের অবস্থা কি,ঘর থেকে আর বাইরে বের হবার মতো পরিবেশ রাখেনি। এক দিক দিয়ে লজ্জা,অন্য দিক দিয়ে শরীর,কোনটাই ভালো না।”

নরসিংদীর জাহেদা খাতুন

“আমাকে যে কোথায় কোন ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল তা বলতে পারিনি। পরে শুনেছি এটা ঢাকা জেলার গাজীপুর। এখন গাজীপুর একটা জেলা হয়েছে আর তেমন কিছু বলতে পারি না। কারণ,কেউ তো আর কারো সাথে কথা বলতে পারতাম না। যে দুই একটা কথা হতো খুব গোপনে। ঐসব দেখতে দেখতে এবং নিজেও নির্যাতন সইতে সইতে মনে হচ্ছিল,যদি দু’টি চোখ অন্ধ হয়ে যেত তবুও কিছুটা রক্ষা ছিল। একদিন একজন এসে আমার কাছে দাঁড়াল। একজন তার পুরুষাঙ্গটা দেখিয়ে বলল,যদি তোর স্বামীকে বাঁচাতে চাস তবে কোন শব্দ ছাড়াই আমার এটাকে খুশি করিয়ে দে – এটা শান্ত তো সব ঠিক, এই বলেই শুরু করল। তারপর থেকে দিনরাত ঐ শয়তানগুলো আসতো আমার কাছে। এরই মাঝে একদিন চার কি পাঁচজনকে ধরে নিয়ে গেছে। রাতে শুনতে পেলাম তাদেরকে মেরে ফেলেছে।”

গাজীপুরের পরী, তার বর্ণনা থেকেও উঠে আসে অনেক অজানা তথ্য।
“গাড়িতে ওঠানোর পরই চোখ বেধে ফেলল। অনেকক্ষণ যাবার পরে একটি ক্যাম্পে নিয়ে চোখ খুলল। চোখ খোলার পরে দেখি এখানে আরো অনেক মেয়ে,সবাই চুপ করে আছে। আমি কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু অন্যরা ইশারায় না করল। কিছুক্ষণ পর আমি কান্না শুরু করি। তখন পাশ দিয়ে একজন যাচ্ছিল। সে এসেই কোন কথা না বলে আমাকে লাথি মারল এবং আমার গায়ের উপর প্রস্রাব করে দিল। এটা চলে যাওয়ার পর আমি বকাবকি শুরু করলাম। অন্যরা কিছুই বলে না। শুধু ইশারায় এটা সেটা বোঝাতে চেষ্টা করে। বিকাল হতে না হতেই বুট জুতা পরা কয়েকজন এল। আসার পথে যেসব মেয়ে পড়ছে,তাদেরকে লাথি,কিল,ঘুষি মারছে। এগুলো দেখেই আমি চুপ,একেবারে চুপ। দুই তিনজন এসে আমার ওপর নির্যাতন শুরু করল। তারা আমাকে নিয়ে আনন্দ শুরু করল, এমনভাবে আনন্দ করছে, যেন তাদের কাছে মনে হচ্ছে আমি একটা মরা গরু আর ঐগুলো শকুন। আমার সারা শরীরটাকে টেনে কামড়ে যা খুশি তাই করছে।এক সময় আমি যখন আর সহ্য করতে পারছি না তখন একটু একটু কষ্টের শব্দ করছি।
তখন অন্য একজন ইশারা দিল চুপ করতে। কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম,কিন্তু আর পারছি না। নিজের অজান্তেই চিৎকার আইসা গেল, চিৎকারের সঙ্গে শুরু করল মাইর কারে কয়। একজন আইসা আমার মুখের মধ্যে প্রস্রাব করে দিল। এদের ইচ্ছামতো নির্যাতন করল এবং মারল। যাবার সময় আবার হাত বেঁধে রাইখা গেল। কিছুক্ষণ পর একসাথে আসলো অনেকজন। গণহারে নির্যাতন শুরু করল। কারো মুখে কোন কথা নাই। মাঝে মাঝে শুধু একটু শব্দ আসে কষ্টের। একজন সিগারেট খাচ্ছে আর তার পাশে যে ছিল তার গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখছে,অন্য একজন ধর্ষণ করছে। আরেকজন শকুনের মতো তার শরীর খাচ্ছে। ওর অবস্থা দেখে নিজের সব ভুলে গেলাম। কি বিশ্রীভাবে যে ধর্ষণ করছে মোটকথা তারা আমাদেরকে মানুষ বলেই মনে করছে না। এক সময় তারা চলে গেল। একটু-আধটু কথা বলছে সবাই। কিছুক্ষণ পর সবাই চুপ। কিছুক্ষণ পর একজন এল এবং অন্য একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর দু’জন তাকে নিয়ে এল। এসেই তার সব কাপড় খুলল এবং গরম লোহা দিয়ে তার সমস্ত শরীরে ছ্যাঁকা দিল,শেষে তার গোপন অঙ্গের ভিতরে বন্দুকের নল ঢুকাইয়া গুলি করে মেরে ফেলল। যখন বন্দুকের নল ঢুকাচ্ছে তখন সে একটা চিৎকার দিয়েছিল। মনে হয়,পৃথিবীর সব কিছুই তখন থমকে গেছে। তারপর তাকে নিয়ে গেল। দুই একদিন পরে জানতে পারলাম, তারা ভুল করে ঐ মেয়েকে নিয়েছিলো। তারা আমাকে নিতে এসেছিলো।

দুলজান, কুষ্টিয়া।

যেদিন আমার এই দুর্ঘটনা ঘটে আমার বাচ্চাটার বয়স ছিল মাত্র সাত দিন। চুল কামিয়ে আঁতুর ঘরে ধোয়া পরিস্কার করেছি। একেবারে কাচা নাড়, তার উপর এত অত্যাচার। জ্ঞান ছিল না। গলগল করে রক্ত বইতে লাগল। সবার অবস্থা খারাপ, কিন্তু আমার অবস্থা খুব বেশি খারাপ, এই দেখেন, আমার এ বুকের মাঝে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কী করেছে। এখনো দাগ আছে। এই দুধটা আর কোনদিন কোনো বাচ্চাদের খাওয়াতে পারিনি।

অনেক সময় ধর্ষণের প্রতিযোগিতা শুরু হত। বাজি ধরে, পাল্লা দিয়ে ধর্ষণ করা হত। এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল জামালপুরের রেশমীর –
আমাদের এখানে একজন বিহারী ছিল, সবাই তাকে করিম পাগলা বলেই জানত। আর সেই করিম পাগলা মান ইজ্জত মারার এক্সপার্ট ছিল।যখন করিম পাগলা যেদিক দিয়ে হেঁটে যেত আমার মনে হয়,তখন মাটিও ভয় পেত। কি ক্ষমতা যে ছিল তার এই মান ইজ্জত মারার! দিনে একই সঙ্গে কয়েক জন মহিলার মান-ইজ্জত মারতে পারত। আর যে একবার ঐ করিম পাগলার হাতে পড়েছে,তার আর রক্ষা ছিল না। এত শক্তি ছিল তার, আর কৌশলও জানত জানার মতো কৌশল। তার মান ইজ্জত আরার কৌশল দেখে অন্য মিলিটারিরাও বোকা হয়ে যেত। করিম পাগলা এসব যখন করতো তখন অন্যরা দাঁড়িয়ে দেখত আর সঙ্গে সঙ্গে তারাও উল্লাস করতো, শাবাস দিত। আর কি বিশ্রিভাবে হা হা করে হাসত। করিম পাগলা যখন ইজ্জত মারার কাজে ব্যস্ত থাকত,তখন অন্য কেউ এসে তার গালে মদ ঢেলে দিত। কতজনই না তার সাথে বাজি ধরত,কিন্তু কেউ তাকে হারাতে পারেনি। মাঝে মাঝে পাগলা বলত, তোরা দশ জন একটার পর একটা করবি, আর আমি একাই করতে থাকব। দেখব কে হারে,কে জিতে? তারপরও তাকে কেউ হারাতে পারেনি। সেই পাগলা ছিল এমন। সে প্রতিদিন কত নারীর ইজ্জত যে মারত তার কোন হিসাব ছিল না মনে হয়।

কিরণবালা; ভালুকা, ময়মনসিংহ।

“আমার পাশেই একটা মাইয়া ছিলো। দেখতে যেমন সুন্দর,বয়সটাও ছিল ঠিক। আর তারেই সবাই পছন্দ করত বেশি। তাই তার কষ্টও হইত বেশি বেশি। একদিন দুই তিনজন একলগে আহে। এরপর সবাই তারে চায়। এই নিয়া লাগে তারা তারা। পরে সবাই এক সঙ্গে ঝাঁপায় পড়ে ঐ মাইয়াডার উপর। কে কি যে করবে,তারা নিজেরাই দিশা পায়না। পরে একজন একজন কইরা কষ্ট দেয়া শুরু করে। তখন সে আর সইতে না পাইরা একজনরে লাথি মাইরা ফেলাইয়া দেয়। তারপর তো তারে বাঁচায় কেডা। হেইডারে ইচ্ছামত কষ্ট দিয়ে মাইরা ঘর থাইকা বের হয়ে যায়। আমরা তো ভাবছি,যাক বাঁচা গেল। কিন্তু না,একটু পরে হে আবার আহে,আইসাই বুটজুতা দিয়ে ইচ্ছামতো লাইত্থাইছে।তারপরে গরম বইদা ( ডিম ) সিদ্ধ করে তার অঙ্গে ঢুকায় দেয়। তখন তার কান্না, চিল্লাচিল্লি দেখে কেডা। মনে হইছিল যে,তার কান্নায় দেয়াল পর্যন্ত ফাইটা যাইতেছে। তারপরেও তার একটু মায়া দয়া হলো না। এক এক করে তিনটা বইদা ঢুকাল ভিতরে। কতক্ষণ চিল্লাচিল্লি কইরা এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।
তার পরের দিন আবার হেইডা আহে। আর কয় চুপ থাকবে। চিল্লাচিল্লি করলে বেশি শাস্তি দিব। সেই মেয়ের কাছে গিয়ে দেখে তার অবস্থা খুব খারাপ। তখন বন্দুকের মাথা দিয়ে তার ভেতরে গুতাগুতি করছে। আরেকজন তার পেটের উপর খাড়াইয়া বইছে। আর গড় গড়াইয়া রক্ত বাইর হইতেছে। যেন মনে হয়,গরু জবাই দিছে। সে শুধু পড়েই রইল। প্রথমে একটু নড়ছিলো পরে আর নড়ল না। তারপরেও তার মরণ হইল না। ভগবান তারে দেখল না। এমন কত রকম নির্যাতন করে প্রতিদিন। এই অবস্থায় বাইচা ছিল সাত-আট দিন। পরের দুই দিন চেতনা ছিল না। এক সময় অবশেষে মরল।”

সুজান ব্রাউনমিলার লিখেছেন তের বছরের কিশোরী খাদিজার কথা –
Khadiga, thirteen years old, was walking to school with four other girls when they were kidnapped by a gang of Pakistani soldiers. All five were put in a military brothel in Mohammedpur and held captive for six months until the end of the war. Khadiga was regularly abused by two men a day; others she said, had to service seven to ten men daily… At first, Khadiga said, the soldiers tied a gag around her mouth to keep her from screaming. As the months wore on and the captives’ spirit was broken, the soldiers devised a simple quid pro quo. They withheld the daily ration of food until the girls had submitted to the full quota.

২৭ মার্চ,১৯৭১,ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশ ঘর থেকে লাশ ট্রাকে তুলতে গিয়ে একটি চাদর ঢাকা ষোড়শী মেয়ের লাশ দেখতে পান ডোম পরদেশী। সম্পূর্ণ উলঙ্গ লাশটির বুক এবং যোনিপথ ছিল ক্ষতবিক্ষত,নিতম্ব থেকে টুকরো টুকরো মাংস কেটে নেয়া হয়েছিল। ২৯ মার্চ শাঁখারিবাজারে লাশ তুলতে গিয়ে পরদেশী সেখানকার প্রায় প্রতিটি ঘরে নারী,পুরুষ,আবাল বৃদ্ধ বনিতার লাশ দেখতে পান,লাশগুলি পচা এবং বিকৃত ছিল। বেশিরভাগ মেয়ের লাশ ছিল উলঙ্গ,কয়েকটি যুবতীর বুক থেকে স্তন খামচে,খুবলে তুলে নেয়া হয়েছে,কয়েকটি লাশের যোনিপথে লাঠি ঢোকানো ছিলো। মিল ব্যারাকের ঘাটে ৬ জন মেয়ের লাশ পান তিনি,এদের প্রত্যেকের চোখ,হাত,পা শক্ত করে বাঁধা ছিল,যোনিপথ রক্তাক্ত এবং শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা ছিলো।
ঢাকা পৌরসভার সুইপার সাহেব আলী ২৯ মার্চ তার দল নিয়ে একমাত্র মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে কয়েক ট্রাক লাশ উদ্ধার করেন। তিনি আরমানিটোলার এক বাড়িতে দশ এগারো বছরের একটি মেয়ের লাশ দেখতে পান,সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত,জমাট বাঁধা ছোপ ছোপ রক্ত সারা গায়ে,এবং তার দেহের বিভিন্ন স্থানের মাংস তুলে ফেলা হয়েছিল।ধর্ষণ শেষে মেয়েটির দুই পা দু’দিক থেকে টেনে ধরে নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। ৩০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের চারতলার ছাদের উপরে আনুমানিক ১৮ বছরের একটি মেয়ের লাশ পান সাহেব আলী,যথারীতি উলঙ্গ। পাশে দাঁড়ানো একজন পাক সেনার কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন মেয়েটিকে হত্যা করতে ধর্ষণ ছাড়া অন্য কিছু করার দরকার পড়েনি, পর্যায়ক্রমিক ধর্ষণের ফলেই তার মৃত্যু ঘটে। মেয়েটির চোখ ফোলা ছিল,যৌনাঙ্গ এবং তার পার্শ্ববর্তী অংশ ফুলে পেটের অনেক উপরে চলে এসেছে, যোনিপথ রক্তাক্ত, দুই গালে এবং বুকে কামড়ের স্পষ্ট ছাপ ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুজিত সরকার ,১৯৭১ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র। ক্যাম্পে বন্দী থাকার সময় দেখেছেন অনেক মেয়েকে অসুস্থ হয়ে যেতে। তাদের শরীরে দগদগে ঘা হয়ে যাচ্ছিল, যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত হত, তারপরও রেহাই পেতেন না তারা। দুই একজন উন্মাদ হয়ে প্রলাপ বকতেন। একদিন রাজাকারেরা ধর্ষণের সময় সুজিত সরকারকেও ধর্ষণে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা মেয়েদের যৌনাঙ্গে তার মুখ চেপে ধরে ঘষে দেয়।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের একজন সুবেদার খলিলুর রহমানের অভিজ্ঞতা;
মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে,ট্রাক থেকে নামিয়ে সাথেই সাথেই শুরু হত ধর্ষন,দেহের পোশাক খুলে ফেলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হত। সারাদিন ধর্ষণের পরে এই মেয়েদের হেড কোয়ার্টার বিল্ডিং এ উলঙ্গ অবস্থায় রডের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখ হত,এবং রাতের বেলা আবারো চলত নির্যাতন। প্রতিবাদ করা মাত্রই হত্যা করা হতো, চিত করে শুইয়ে রড, লাঠি, রাইফেলের নল, বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয়া হত যোনিপথে, কেটে নেয়া হত স্তন। অবিরাম ধর্ষণের ফলে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলেও থামত না ধর্ষণ।

’৭১ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে পাকবাহিনীর একটি বিরাট ক্যাম্পে পরিণত করা হয়। এখানে বন্দী ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মঞ্জিলা এবং তার দুই বোন মেহের বানু এবং দিলরুবা। তাদেরকে আরো ৩০ জন মেয়ের সাথে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়,সার্বক্ষণিক প্রহরায় থাকতো দুজন সশস্ত্র গার্ড। এই মেয়েগুলোকে ওই ক্যাম্পের সামরিক অফিসারদের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করা হত। প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ে যাওয়া হত ৫/৬ জন মেয়েকে, এবং ভোরবেলা ফিরিয়ে দেয়া হত অর্ধমৃত অবস্থায়। প্রতিবাদ করলেই প্রহার করা হত কায়দায়। একবার একটি মেয়ে একজন সৈনিকের হাতে আঁচড়ে দিলে তখনই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বন্দীশালায় খাবার হিসাবে দেয়া হত ভাত এবং লবন।
সাংবাদিক রণেশ মৈত্রের একটি অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং রংপুর আর্টস কাউন্সিল ভবনটি নারী নির্যাতনের জন্য ব্যবহার করা হত। এখানে বন্দী ছিল প্রায় একশ মেয়ে এবং প্রতিদিনই চলত নির্যাতন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়ত তাদের হত্যা করা হত সাথে সাথেই। স্বাধীনতার পরে আর্টস কাউন্সিল হলের পাশ থেকে বহুসংখ্যক মহিলার শাড়ি, ব্লাউজ, অর্ধগলিত লাশ, এবং কংকাল পাওয়া যায়।প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, রংপুর থেকে প্রায় তিনশ/চারশ মেয়েকে ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে পাচার করে দেওয়া হয়,তাদের আর কোন সন্ধান মেলেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যান বিভাগের ছাত্র ছাত্রীদের একটি গবেষণায় জানা যায় রাজশাহীর জুগিসশো গ্রামে মে মাসের কোন একদিন পাকবাহিনী ১৫ জনমহিলাকে ধর্ষণ করে এবং অন্যান্য নির্যাতন চালায়।এ অঞ্চলের ৫৫ জন তরুনীকেধরে নিয়ে যাওয়া হয়।বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পাকবাহিনী প্রায় দেড়শো জন বিভিন্ন বয়সী মেয়েকে ঘর থেকে বের করে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে। এদের মধ্যে ১০ জনের তখনই মৃত্যু হয়।
একই গবেষণা থেকে বাগমারা গ্রামের দেলজান বিবির কথা জানা যায়।সময়টা ছিলো রমজান মাস,দেলজান বিবি রোজা ছিলেন। হঠাৎ পাকসেনারা ঘরে ঢুকে পড়ে এবং ধর্ষণশুরু করে।একই গ্রামের সোনাভান খাতুনকেও রাস্তার মধ্যে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়। ১০ ডিসেম্বর যশোরের মাহমুদপুর গ্রামের একটি মসজিদ থেকে এগারোটি মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তাদেরকে যুদ্ধের সময় প্রায় সাত মাস ধরে মসজিদের ভেতরেই ধর্ষণ এবং বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হয়।
যশোর ক্যান্টনমেন্টে চৌদ্দ দিন বন্দী থাকা হারেছ উদ্দিনের ভাষ্যে জানা যায় ক্যান্টনমেন্টে ১২ থেকে ৫০ বছর বয়সের ২৯৫ জন মেয়েকে আটক রাখা হয়েছিল,তাদের উপর নির্যাতন চলত প্রতি রাতেই। হারেছ উদ্দিনের সেলটি বেশ খানিকটা দূরে থাকলেও নির্যাতনের সময় মেয়েদের চিৎকার তিনি শুনতে পেতেন। প্রতিদিন বিকেলে একজন সুবাদার এসে এসব কে কোথায় যাবে তার একটি তালিকা বানাত, সন্ধ্যা হলেই এই তালিকা অনুযায়ী মেয়েদের পাঠানো হত। অনেক সময় খেয়াল খুশিমত বাইরে নিয়ে এসে তাদের এলোপাথাড়ি ভাবে ধর্ষণ করা হত।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মাটিরহাট গ্রামের ফুলজান যুদ্ধের সময় আট মাসেরগর্ভবতী ছিল, তার বাবা মায়ের সামনেই তাকে কয়েকজন সৈনিক উপুর্যুপুরি ধর্ষণকরে। তার গর্ভের সন্তানটি মারা যায়।
কুমারখালির বাটিয়ামারা গ্রামের মোঃ নুরুল ইসলামের বর্ণনায় একটি আপাত-অদ্ভুত ঘটনা জানা যায়। ঐ এলাকার একজন রাজাকারকে একদিন দুজন পাকসেনা মেয়ে যোগাড় করে দিতে বললে সে তাদেরকে তার বাড়ি নিয়ে যায়,খবর পেয়ে বাড়ির সব মেয়ে পালিয়ে গেলেও তার বৃদ্ধা মা বাড়িতে থেকে যান। সৈনিক দু’জন রাজাকারটির বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে পালাক্রমে তার মাকে ধর্ষণ করে। এর পরে রাজাকারটির আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে কম যায়নি বিহারীরাও। নৃশংসতায় তারা কোন কোন সময়ছাড়িয়ে গিয়েছিল পাকবাহিনীকেও। ২৬ মার্চ ’৭১ মীরপুরের একটি বাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে ধরে আনা হয় এবং কাপড় খুলতে বলা হয়। তারা এতে রাজি না হলে বাবা ও ছেলেকে আদেশ করা হয় যথাক্রমে মেয়ে এবং মাকে ধর্ষণ করতে। এতেও রাজি নাহলে প্রথমে বাবা এবং ছেলে কে টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয় এবং মা মেয়ে দুজনকে দুজনের চুলের সাথে বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় টানতে টানতে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
খুলনার ডাঃ বিকাশ চক্রবর্তীর কাছ থেকে জানা যায়, সেখানকার পাবলিক হেলথ কলোনি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্থাপিত ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক মেয়েকে(প্রায় সববয়সের) আটকে রেখে পূর্বোক্ত কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়। যুদ্ধ শেষেক্যাম্পের একটি কক্ষ থেকে কয়েকটি কাঁচের জার উদ্ধার করা হয়,যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিল মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। অংশগুলি কাটা হয়ে ছিল খুব নিখুঁতভাবে।

যৌন দাসী হিসেবে বাঙালি মেয়েদের বন্দী করে রাখার একটি ঘটনা প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায়,২৫ অক্টোবর ১৯৭১ –
One of the most horrible revelations concerns 563 young bengali women,some of 18, who have been held captive inside Dacca’s dingy military cantonment since the first five days of the fighting,Seized from University and Private Homes and forced into military brohees,the girls are all three to five months pregnant.

১৯৭২ সালে নরওয়ের একদল টেলিভিশন সাংবাদিকের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে সেসময়কার স্বাস্থ্য ও শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী জানান, মিত্রবাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করে সাতশত বিবস্ত্র নারীকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পায়। জানা যায়,২৫ মার্চের পর থেকেই সারা দেশ থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে এখানে রাখা হতো। এছাড়াও সিলেট বিমান বন্দরে তিনশত মেয়েকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বিবস্ত্র অবস্থায়। ঢাকা,চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর তিনটি বন্দিশিবিরে পাঁচশতের বেশি মেয়ে বন্দি ছিল।

রাজশাহীর বাগমারার দেলজান বিবিকে রোজা থাকা অবস্থায় ধর্ষণ করা হয়।রাজশাহী শহরের একটি বাড়িতে আনুমানিক তিরিশ বছর বয়স্কা একজন মহিলা নামাজ পড়ছিলেন। সেই অবস্থাতেই ফেলে দিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়, তিনি মারা যান জায়নামাজের উপরেই। এই ঘটনা দেখে তার স্বামীও তখনই মারা যান। টাঙ্গাইলের ছাব্বিশা গ্রামের ভানু বেগমকে ধর্ষণ করতে গেলে তিনি বাধা দেন। তখন পাকিস্তানি সৈনিকেরা তার এক বছরের শিশু সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। নিরুপায় ভানু বেগমকে এরপর উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়, ধর্ষণ শেষে জ্বলন্ত আগুন চেপে ধরে সৈনিকেরা ঝলসে দেয় তার শরীরের বিভিন্ন অংশ।
এখান কয়েকজন নারীর কথা উল্লেখ করছি,যারা ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ফলে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হয়েছেন।
“গণ্ডগোল শুরু হওয়ার পর থাইকাই তো পালাইয়া পালাইয়া বেড়াইছিলাম। একদিন ঐখানে নিছে, কালাই ক্ষেতে। তখন নয় মাসের বাচ্চা পেটে। ছেলেটা হইছিল। পেটে বাচ্চাটা তহনই পইড়া যায়। তহন তো আমার অবস্থাও যায় যায় করে। এক দিকে এই অত্যাচার আবার অন্য দিকে পেটের সন্তানও মারা গেছে। একভাবে তো বাইর করতে হইবো। … আমার অবস্থা ক্রমে খারাপ হচ্ছে। এক সময় আমাকে বাঁচানোই দায় হইয়া পড়ছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও যখন কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি তখন গ্রামের লোকেরাই আমারে বাঁচানোর জন্য আগাইয়া আইল। তখন তারা দা,বটি দিয়ে ছেলেটারে কাইটা কাইটা পেট থেকে বের করে। তখন দেখে যেই সন্তান ছেলে সন্তান। তারপর তো আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়। তখন আমারে তাড়াতাড়ি করে মেডিকেলে নিয়ে গেল। ৪ বৎসর রইছি মেডিকেলে। নির্যাতনের কারণে পায়খানার রাস্তাটা আর সন্তানের রাস্তা এক হইয়া গেছিল। অপারেশন করতে হয় পাঁচটা বড় বড় অপারেশন। এই জায়গাটা এভাবেই আছে, সেই ৩০ বছর ধরে এভাবেই। এই পর্যন্ত কত কষ্ট করতাছি। সারাদিন ডোমা ( কাপড়ের নেকড়া ) দিয়া পেঁচায়া রাখি। ঐ যে খাঁচাটা আছে না,তার মধ্যে জমাই। পরে একবারে নিয়া ধুইয়া আনি। সারাদিন কি ধোয়া সম্ভব। একটু পর পর ডোমা পাল্টাতে হয়। এই পাঁচ,দশ মিনিট পরপর।… রাস্তা দুইটা এক হওয়াতে পায়খানার রাস্তা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তাই পায়খানার রাস্তাটা পেটের ঠিক নাভির পাশে করিয়ে দেয়। তাই কোন নির্দিষ্ট সময়ে তা করতে হয় না। সারাক্ষণই পায়খানা বের হতে থাকে। তাই এই ডোমা দিয়ে রাখি। গায়ে দুর্গন্ধ হয়ে থাকে। ঐ কাজ করার পরে তো পায়খানা আর পেশাবের রাস্তা এক হয়ে গেছে। ২ টা পর্দা আছে না? এক হয়ে গেছে। পরে পায়খানা সারাক্ষণ আসতেই থাকে সন্তানের রাস্তা দিয়ে। জরায়ু কয় না? জরায়ু দিয়েও পায়খানা আসে। তারপরই অপারেশন করে এই ব্যবস্থা করে দেয়।
… ধইরা নিছে সকাল ১১টার দিকে। আনছে একেবারে মাগরিবের পরে হয়তো। আমি কইতে পারি না কহন আনছে। আমার একটা ননদ আছিল,ঐ ননদের মেয়ে দেইখ্যা বাড়িতে কইলে অন্যরা যাইয়া নিয়ে আসে, কোনো কোনো সময় জ্ঞান ছিল। আবার কোনো কোনো সময় অজ্ঞান ছিলাম। অনেক পাকবাহিনী ছিল।আর দুইজন রাজাকার।”

গাজীপুরের বীরাঙ্গনা মমতার বর্ণনা থেকে উপরের অংশ তুলে ধরা হয়েছে
ফরিদপুরের আন্না সেনকে যখন ধর্ষণ করা হয় তখন অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। স্বাধীনতার পর যদিও বিয়ে হয় আন্নার, ততদিনে তিনি নির্যাতনের তীব্রতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না এমন মানসিক জটিলতায় আচ্ছন্ন। বিয়ের পরপরই আত্মহত্যা করেন আন্না।
যুদ্ধের পর লজ্জায় অনেক নারীই পাকিস্তানি সৈনিকদের অনুগামী হয়েছেন। চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনেও তারা এপথে পা বাড়িয়েছেন পরিচিত সমাজে মুখ দেখানোর লজ্জায়।

কাপাসিয়ার মনোয়ারা বেগমের স্বামীকে হত্যা করার পর এক সিপাহী তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পে ক্যাম্পে রাখতো, আর গণহারে ধর্ষণ করতো। যুদ্ধ শেষে ঐ সৈনিক মনোয়ারাকে নিয়ে যায় পাকিস্তানের করাচি। করাচির আয়েশা কলোনীতে রেখে সেই সিপাহী মনোয়ারাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর প্রতি রাতেই বড় বড় অফিসারদের কাছে নিয়ে যেত। আস্তে আস্তে আরো বড় বড় জায়গায় নিয়ে যেত আর সারাদিন থাকতো বন্দী। এক সময় তাকে বিক্রি করে দুবাই, দুবাই থেকে ফ্রান্স, তারপর সৌদি আরবে, তারপর আবার ফ্রান্স, এভাবেই চলেছে তার উপর নির্যাতন ধর্ষণ। এক সময় যখন সে অচল হয়ে পড়ে, তাকে দিয়ে আর এই সব কাজ চলে না, তখন ফেলে দেয় রাস্তায়। সেই মনোয়ারা এক সময় অর্ধ পাগল অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে আসে। যখন সে পাকিস্তানের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কাঁদছে, তখন এক বাঙালির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার কাছে মনোয়ারা চেয়েছিল তার জীবনের একটা ইচ্ছের কথা। সে মরার আগে যেন তার দেশ, প্রিয়জনদের দেখতে পায়। তার এই আকুল আবদারটুকু সেই বাঙালি রেখেছিলো। বহু চেষ্টা করে তার জীবনের এই একটা ইচ্ছা পূরণ করলেন সেই মনোয়ারাকে উদ্ধারকারী সাইফুল ইসলাম, দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করে। ১৯৯১ অথবা ১৯৯২ সালের দিকে মনোয়ারা দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে এখন তিনি ভিক্ষা করে খান।

উপরের ঘটনাগুলো কেবল নির্বাচিত কয়েকটি। এছাড়াও এধরণের অজস্র ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে। সম্ভবত এখন সময় এসছে এই ঘটনা গুলোকে সামনে নিয়ে আসার। তা না হলে এই রক্তের ঋণ কোনদিন শোধ হবার নয়।

তথ্যসূত্র:
১) বীরাঙ্গনাদের কথা – সুরমা জাহিদ
২) ‘৭১ এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ – ডা. এম এ হাসান
৩) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান – শাহনাজ পারভিন
৪) A Tale of Millions – Rafiqul Islam BU
৫) Against Our Will : Men,Women and Rape – Susan Brownmiller
৬) Rape as a Weapon of War and it’s Long-term Effects on Victims and Society – Cassandra Clifford
৭) East Pakistan The Endgame – Brigadier A. R. Siddiqi
৮) মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ – মুনতাসীর মামুন
৯) icsforum.org
১০) ৭১-এর নারী নির্যাতন,কাজী হারুনুর রশীদ সম্পাদিত
১১) বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র,অষ্টম খন্ড,হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত
১২) ভোরের কাগজ, ১৮ মে ২০০২
১৩) আমি বীরাঙ্গনা বলছি – নীলিমা ইব্রাহীম

[851 বার পঠিত]