তুলির বয়েস ১০ বছর। এই বয়েসী ওর চারপাশের ছেলেমেয়েদের জীবন থেকে ওর জীবনটা বিপরীত। অন্য রকম ছাঁচে ও ধাঁচে ওর জীবনের এক দশক কাল পার হয়ে গেছে। ওর আশপাশের ছেলেমেয়েরা খেলতে যায় মাঠে, বিলে; ওরা নাকি ঘুড়ি ওড়ায় আকাশের গায়ে, ওদের ঘুড়ি নাকি মেঘের দেশে হারিয়ে যায়, ঘুড়ির সাথে সাথে নাকি ওরাও আকাশে উড়তে থাকে। ওরা নাকি ছাগলের ছানার পিছু পিছু বিলের পর বিল ছুটতে থাকে ঊর্ধ্বশ্বাসে। ওরা দল বেঁধে তাল পুকুরে নাইতে যায়। পুকুরের পারের আমগাছ জামগাছের নুইয়ে পড়া ডাল থেকে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পুকুরের জলের বুকে। সাঁতার কাটে এপার ওপার, জলকেলি ক’রে পুকুরের শান্ত জলের উপর ওরা নাকি জলকম্প তোলে। ঝুম বরষার দিনে ওরা নাকি বিলে চলে যায় মাছ ধরতে। ওরা মাছ ধরে আনে, অজস্র শামুক ধরে আনে পোষা হাঁসের বাচ্চার জন্য। শাপলা শালুক তুলে আনে। চাঁদনী রাতে ওরা নাকি উঠোনে লুকোচুরি খেলে, অমবশ্যার আঁধার রাতে আকাশের তারা গোনার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। আঘ্রান মাসে সবার বাড়িতে দূরের চরের জমি থেকে গরুর গাড়ি বোঝাই করে ধান আসে। ধানের বোঝা উঠোনে ঢেলে দিয়ে গরুর গাড়িগুলি খালি ফিরে যাবার সময় ছোট ছোট দস্যু ছেলেমেয়ের দল বোঝাই হয়ে গাড়িতে ওঠে। গাড়ি গাঁয়ের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ ধরে হেলেদুলে প্রান্তর পেরিয়ে বহু দূরের দেশে নাকি চলে যায়। গাড়িয়াল গাইতে থেকে কোনো ভাটিয়ালি বা ভাওয়াইয়া গান। ওরাও নাকি গাড়িয়ালের সাথে গলা মেলায়। তারপর অনেক দূরের দেশ থেকে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ি ফিরে আসে এক দৌড়ে বিশ্ব জয় করে। গাছের কচি আমগুলো ওরা মগডালে উঠে লবণ দিয়ে বা লবণ ছাড়াই সাবাড় করে দেয়। কাঁঠালের কচি ফুলগুলো ওরা ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। সবার গাছের পেয়ারা ও জামরুলগুলো ওরা কচি থাকতে খেয়ে গাছগুলো শূন্য করে রেখে দেয়।

এসব রোমাঞ্চকর বিশ্বজয়ের কাহিনি তুলি স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় শুনতে পায় ওর সমবয়সী বিজেতা বন্ধুদের কাছে। ও রোমাঞ্চিত হয় শুনে শুনে। ওর কাছে এই কাহিনিগুলো চন্দ্র-সূর্য জয়ের মতো মনে হয়। সে মনে মনে স্বপ্ন চয়ন করে, কাহিনির একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আহা, আমিও যদি পারতাম! এ রকম জীবন তার স্বপ্নাতীত। সে স্কুল যায়, স্কুল থেকে ফিরে আসে। তারপর অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে কুটিরের অন্ধকারতম কোণে তার শ্বাসরুদ্ধকর সময় অচল হয়ে থাকে। ওর বন্ধুরা যখন খেলতে যায় তখন সে হয়ত স্কুলের বাংলা অংক ইংরেজি মুখস্থ করে, নয়ত মাছ কোটে, তরকারি কোটে, মাটির উনুনে খড় দিয়ে, শুকনো পাতা দিয়ে জ্বাল দেয়। টেংরামাছ, কৈমাছ, শিংমাছের কাঁটা ওর ছোট ছোট আঙুলে বিঁধে যায়। প্রচণ্ড ব্যথা হয়, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। তুলি ব্যথায় কাঁদে, ছাইয়ের মধ্যে আঙ্গুল চেপে ধরে। আঙ্গুলের ভেতরে ছাই ঢুকে যায়। এক দুই দিন পরে আঙ্গুল পেকে ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। তুলি তরকারি কোটে। কখনো কখনো ওর আঙ্গুল কেটে যায় বটিতে। ও মাটিতে আঙ্গুল চেপে ধরে। তুলি উনুনে জ্বাল দেয়। আগুন নিবে যায় কখনো। ও উনুনের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে প্রাণান্তকর ফুঁ দিয়ে দিয়ে আবার আগুন জ্বেলে তোলে। ওর চোখেমুখে ছাই ও ধোঁয়া ঢুকে একাকার হয়ে যায়। ও কিছুক্ষণের জন্য চোখ মেলতে পারে না। ছাই মাখানো হাতে চোখ কচলে নেয়। কলসী ভরে দূরের চাপকল চেপে জল আনে। থালাবাসন ও হাঁড়িপাতিলগুলো পুকুর থেকে ছাই দিয়ে মেজে ধুয়ে চকচকে করে আনে। হাঁসমুরগিগুলিকে আদার দেয়। উঠোনে ধান ডাল ইত্যাদি শুকোতে দেওয়া হয়। তুলি খা খা রোদে উঠোনের এক কোণায় বসে হাঁসমুরগি তাড়ায়, ধানগুলো কিছুক্ষণ পর পর তার ছোট ছোট পা দিয়ে নেড়ে দেয় উল্টেপাল্টে দেয়, যাতে সবগুলো ধানে সমানভাবে রোদ লাগে। ধানের হুল গেঁথে যায় তুলির ছোট ছোট পাগুলোর তলায়। পায়ে ব্যথা লাগে। তুলি মাটিতে বসে পড়ে। উঠোন থেকে একটু মাটি চিমটি কেটে নিয়ে পায়ের মধ্যে চেপে ধরে। আবার উঠে ধান উল্টাতে শুরু করে। সবাই দল বেঁধে পুকুরে নাইতে যায়। ওকে যেতে হয় একলা। মেয়েমানুষের অন্যদের সাথে মেশার দরকার নেই, খেলাধুলো তো দূরের কথা। দুই তিন ডুব দিয়ে তাকে পুকুর থেকে উঠে আসতে হয়। চার ডুব দিলে কঠিন মার। কাজকর্ম একটু এদিক ওদিক হলেই কঠিন মার। তুলির তিনটি ভাই খেয়ে দেয়ে খেলতে চলে যায়। ফিরে আসলে তাদেরকে দুধ ডিম কলা, পাকা আম, পিঠে পায়েস ইত্যাদি ভালো ভালো খাবার অতি আদরযত্নে খাওয়ানো হয়। ওকে এসব খাবার দেওয়া হয় না। ও দূর থেকে চুপি চুপি তাকিয়ে দেখে। কেউ দেখে ফেললে, তার চুল টেনে ধরে অগ্নিকণ্ঠে বলে, ছেলেদের খাওয়ায় নজর দিচ্ছিস কেন রে, রাক্ষসী?

রাতে ঘুমুতে যায় তুলি। অনেক রাত পর্যন্ত ওর ঘুম আসে না। সারাদিনের মার, অভিসম্পাত, অর্ধাহার, তার মনে পুনঃপুনঃ বাজতে থাকে। বুকের ভেতর সমুদ্রের ঢেউ বইতে থাকে। সেই ঢেউ এক সময় চোখ ফেটে বড় বড় ফোঁটায় বেরিয়ে আসে। কপোল বেয়ে বইতে থাকে লোনাজলের ধারা। অনেক রাতে ঘুম নেমে আসে তার চোখে। ঘুমের মধ্যেই সে শুনতে পায়, এখনো ছড়িয়ে ছড়িয়ে ঘুমচ্ছিস, এত বড় ধাড়ি মেয়ে? এ জন্য তো সংসারে কোনো উন্নতি নেই। তুলি আড়মোড়া দিয়ে ওঠে, চোখ কচলায়, উঠি উঠি করে। তখনই একজগ ঠাণ্ডা জল এসে তুলির গায়ে পড়ে। তুলি ধড়ফড় করে উঠে বসে। এখনো কেউ ওঠেনি। ভাইগুলো এখনো ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে। উঠবে অনেক বেলায়। তাদের গায়ের কাঁথা কম্বল টেনে দেওয়া হয়। তুলি ঢুলু ঢুলু চোখে ঘর ঝাঁট দেয়, পুকুর থেকে জল ভরে আনে, হাতমুখ ধুয়ে আসে, আরবি পড়তে বসে। আরবি লেখার দিকে তাকালে তার কেন যে অমন কান্না পায়।

তুলির দম বন্ধ হয়ে আসে। ওর একটু প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছা করে, একটু খেলতে ইচ্ছা করে, মুক্তবিহঙ্গের মত উড়তে ইচ্ছে করে। কয়েকদিন ধরে সে মনে মনে সাহস সঞ্চয় করছে একটু একটু করে। একদিন সে উড়াল দেবে, বেরিয়ে পড়বে মাঠে, খেলতে যাবে। মাঘমাসের একটি বিকেলে সে বেরিয়ে পড়লো। পাখির মত উড়ে চলে গেল মাঠে। বন্ধুরা সবাই খেলছে। সে কিছুক্ষণ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলো, তারপর নিজেও খেলতে লেগে গেল। দৌড়ঝাঁপ, ছুটোছুটি, মাঠে গড়াগড়ি, আকাশে ঘুড়ি ওড়ানো। আহা, কী আনন্দ! এমন আনন্দও পৃথিবীতে আছে, এর আগে তুলি জানেনি কোনোদিন। তুলি বন্ধুদের সঙ্গে খেলছে, হাসছে দৌড়চ্ছে। বিপুল পৃথিবীতে এ অতি অকিঞ্চিৎকর ব্যাপার। কিন্তু কী অপার আনন্দ যে তার হচ্ছে তাতে। খেলা শেষ করে সন্ধ্যায় সবাই যার যার ঘরে ফিরে গেল। তুলিও ফিরে গেল ঘরে। শুরু হলো মার। পিতামাতা দু’জনেই বেদমভাবে মারছে। শ্রাবণের বৃষ্টির মত তার পুরো শরীরে মার পড়ছে। তার চেয়ে লক্ষগুণে বর্ষিত হচ্ছে গালি ও অভিশাপ। নষ্টা, কুলটা, পাপী, জাহান্নামী, দুশ্চরিত্র, আরো আরো কতো কী! তুলির শরীরের বিভিন্ন জায়গা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। তুলি চিৎকার করে বলছে, আর যাবো না কোনোদিন, মাফ করে দাও। দাঁড়া জাহান্নামে পাঠাচ্ছি তোকে, নষ্টামি করতে যাবি আর কিভাবে।

বাড়ির পেছনে ঘন বনজঙ্গল ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা পুকুর আছে। কেউ যায় না ওদিকে। সবাই বলে, ওই পুকুরে ভূত আছে, পানিতে আছে অজস্র সাপ। সারাক্ষণ ছায়া পড়ে থাকে। কোনো লোকজনের চলাচল নেই। কখনো রোদ পড়ে না ওই পুকুরের জলে। শীতকালে জল থাকে বরফের মত ঠাণ্ডা। তুলির পিতা তুলিকে মেরে আধমরা করে সেই ভূতের পুকুরের পারে নিয়ে গিয়ে বললো, পানিতে নাম পাপী। গলা পর্যন্ত পানিতে গিয়ে আমৃত্যু দাঁড়িয়ে থাক। তাড়াতাড়ি নাম। জবাই দেবো নইলে। তার হাতে রামদা। তুলি সুড়সুড় করে পুকুরে নেমে গেল। তুলি এক’পা দু’পা করে এগিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরতা ও শীতলতার দিকে। পায়ের তলে পড়ছে সব পাতাপচা, কাঁটা। ওর পায়ে কাঁটা বিঁধে যাচ্ছে। ভয়ে শিউড়ে শিউড়ে উঠছে তুলি। একটু থমকে দাঁড়াচ্ছে। বলছে, আব্বা, ভয় লাগছে, সাপ আছে। আর করব না, আর যাবো কোনোদিন খেলতে। পেছন থেকে পিতা রামদা উঁচিয়ে হুংকার ছেড়ে বলছে, জবাই করে ফেলবো হারামজাদী, তাড়াতাড়ি গলাপানিতে যা। তুলি এগিয়ে যায় গভীর জলের দিকে। গলাপানিতে গিয়ে দাঁড়ায়। পিতা দা উঁচিয়ে বলে, ওইখানে আমরণ দাঁড়িয়ে থাকবি। উঠবি না খবরদার, নড়াচড়া করবি না। নড়লে জবাই। আমি ঘুমুতে গেলাম। সকালে উঠে যেন পানিতে তোর লাশ পাই। এই সময় তুলির ভাইগুলি খেলা শেষ করে বাইরে থেকে ফিরেছে ঘরে। তাদের কাপড় পালটে দেওয়া হয়েছে। হাতমুখ ধুয়ে দেওয়া হয়েছে যত্ন করে। মাছ মাংস দুধ কলা খাইয়ে তাদের ঘুম পাড়ানো হচ্ছে।

কৃষ্ণপক্ষের ঘোর তিমির রাত। রবফশীতল জল। কুয়াশায় ঘনঘোর হয়ে আছে চারিধার। তুলির খুব ভয় লাগছে। এই পুকুরে সাপ আছে। তার খুব সাপের ভয়। একটা সাপ এসে যদি তাকে কামড় দেয়। উফ, সে ভয়ে পাথর হয়ে যায়। বাদুড়েরা উড়ে গিয়ে বসছে কোনো গাছের ডালে। ঝুপঝুপ শব্দ হচ্ছে, গাছগাছালিরা শিরশিরিয়ে কেঁপে উঠছে। সাথে সাথে কেঁপে উঠছে তুলি। কী বিষম ঠাণ্ডা। তুলির শরীরের চারদিকে যেন বরফের ছুঁচ বিঁধে দিচ্ছে কেউ। ওর হাড়ে গিয়ে লাগছে সেই ছুঁচ। ওর রক্ত হিম হয়ে আসছে। কেউ নেই কোথাও, চারিদিকে জঙ্গল, অন্ধকার। আকাশের দিকে তাকায় তুলি। তারারা কি মিটিমিটি হাসছে তার এই করুণ অবস্থা দেখে? একটা দুইটা উল্কা ছিঁড়ে পড়ছে আকাশের বুক থেকে, ছুটে আসছে পৃথিবীর দিকে। আহা, একটা উল্কা যদি তুলির বুকে এসে পড়ত। তার অভিশপ্ত জীবন যদি এখনই এখানে শেষ হয়ে যেত। কখন ভোর হবে? ভোর কি হবে কভু আর? সময় যে বইছে না মোটেই। অনেক কান্না পাচ্ছে। ভয়ে আওয়াজ করছে না। পিতা শুনতে পেলে এসে জবাই করে দেবে। কত কত যুগযুগান্তর পেরিয়ে গেছে তুলি জানে না। হঠাৎ দেখতে পায় সে, ছোট্ট একটি প্রদীপ হাতে কেউ একজন চুপি চুপি পায়ে এগিয়ে আসছে পুকুরের পারের দিকে। ভূত নাকি! নাকি পিতা আসছে জবাই করতে? তুলি হাউমাউ করে ওঠে। তুলি শুনতে একটি নারীকণ্ঠ। চুপ কর পোড়াকপালি। কেউ শুনতে পাবে। উঠে আয়। তুলিদের প্রতিবেশী, জ্যাঠিমা হয় তুলির। রিপন ভাইয়ের মা। তুলিকে সলীল সমাধি থেকে তুলতে এসেছে। এক হাতে প্রদীপ তার, অন্য হাতটি তুলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জলের পারে দাঁড়িয়ে আছে জ্যাঠিমা। তুলি বলছে, জ্যাঠিমা, আব্বা মেরে ফেলবে, জবাই করে দেবে। জ্যাঠিমা বলছে, এই বরফের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলে এমনিতেই মরে যাবি। তুলি উঠে আসে। জ্যাঠিমা তার ঘরে নিয়ে যায় তুলিকে। ভেজা কাপড় পালটিয়ে শুকনো কাপড় পরিয়ে দেয়। গা মুছে দেয়, চুল মুছে দেয়। লাকড়ির উনুনে আগুন জ্বেলে তুলিকে উনুনের কাছে বসায়। তুলির পায়ের অনেক জায়গায় কেটে ছিঁড়ে গেছে, কাঁটা বিঁধে গেছে। তুলির হাত পা শরীরে গনগনে আগুনের আঁচ লাগছে। তার শরীরে কোনো অনুভূতি নেই। হাত-পাগুলো কাঠ হয়ে গেছে, মুখ হয়ে গেছে পাথর। কেন কোনো অনুভূতি নেই? গরম কিংবা ঠাণ্ডার? সে কি বেঁচে আছে? নাকি মরে গেছে?

[230 বার পঠিত]