একঃ

সুদূর আফ্রিকার ইথিওপিয়ার দরিদ্র, নিরক্ষর চাষা জুমরা নুরু (Zumra Nuru) বাঙলার কবি কামিনী রায়ের নাম শোনার কোন কারণ নেই। কিন্তু জুমরা নুরুর চমক লাগানো সফলতার কাহিনী পড়লে কামিনী রায়ের ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ লাইন ক’টি অনেক বাঙ্গালী পাঠকের মনে পড়বে।

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে বিশ্বের মোট ১৮৭টি দেশের মধ্যে অতি দরিদ্র ইথিওপিয়ার স্থান ১৭৩। দেশের অভ্যন্তরে ইথিওপিয়ার উত্তরভাগের পরিচিতি সবচেয়ে বেশি দরিদ্র, অনুর্বর ও রক্ষণশীল অঞ্চল হিসেবে। এ অঞ্চলের মানুষদের জীবনযাত্রা ও মান উন্নয়নে সরকারি এবং আন্তর্জাতিক এজেন্সি বহু রকমের প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়েছে।

সেখানকার দুর্গম অঞ্চলের কিছু দরিদ্র, নিরক্ষর চাষি কোন বিদেশী এজেন্সির সাহায্য বা পরামর্শ ব্যতীত কেবলমাত্র নিজ জীবন থেকে শেখা অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি আর বিশ্বাসকে ভর করে কি করে এতদূর এগিয়ে গেল, তা নিয়ে স্বয়ং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও গবেষণা করছে।
সমবায় নীতির ভিত্তিতে চাষিদের স্থাপিত গ্রামটির নাম আওরা আম্বা (Awra Amba)। জুমরা নুরু হচ্ছেন ব্যতিক্রমী, স্ব-নির্ভরশীল এ গ্রামটির স্থপতি এবং নেতা।

দুইঃ

চল্লিশ বছর আগের কথা।

উত্তর ইথিওপিয়ার রক্ষণশীল আমহারা (Amhara) অঞ্চলে এক দরিদ্র ও নিরক্ষর মুসলমান চাষি পরিবারে ১৯৪৭ সালে জন্ম হয় জুমরা নুরুর। সেসময় আমহারার অনেক শিশুকে কাজে নামতে হত বয়স ছয় পাড়ি দেয়ার আগে। অনেকে লেখাপড়া ছেড়ে দেয় বয়স এগারো পৌঁছানোর আগে। পনেরো বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায় কারো কারো।

অতি অল্প বয়সে শিশু নুরুকে ও স্কুলের বদলে খেতখামারের কাজে নেমে পড়তে হয়। চিন্তাশীল মনের অধিকারী নুরু আশপাশের মানুষজনের দুর্দশা দেখে কারণ বোঝার চেষ্টা করতেন। বংশ পরস্পরায় অভাব অনটন আর দুরবস্থা কেন আমাদের নিত্যসঙ্গী, নুরুর মনে এ প্রশ্ন ভিড় করতো। কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যেত অনায়াসে। যেমন, ঘরেবাইরে পুরুষদের চাইতে বেশি কাজ করা সত্ত্বে ও নারীরা পুরুষদের হাতে অহরহ হচ্ছেন নির্যাতিত, জুমরা নুরু তা ঘটতে দেখছেন স্বয়ং নিজের বাড়িতে।

বাবার মত মা ও মাঠে কাজ করেন। হাড়ভাংগা খাটুনি শেষে বাড়ি ফিরে সন্তান সামলানো এবং সংসারের সকল কাজ ও করতে হয় মাকে। তা সত্ত্বে ও বাব প্রায়ই হাত তোলেন মার গায়ে। বাবার মত মা ও সংসারের আয়-উন্নতি চান, সেজন্য পরিশ্রম ও করছেন। অথচ মাকে দমিয়ে রাখতে চান বাবা কেবল ধর্মীয় ও প্রচলিত সংস্কারের দোহাই তোলে। এটি অনুচিত এবং সংসারের জন্য মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে না, বালক নুরু তা বুঝতে পারতেন।

বড়দের মুখে জুমরা নুরু শুনেন মুসলমান আর খ্রিস্টান আলাদা, কিন্তু কেন কেউ তা বুঝিয়ে বলে না। পেটের ভাত যোগাতে গতর খাটাতে হয় যেমন একজন মুসলমানকে, তেমনি একজন খ্রিস্টানকে ও। মসজিদ আর চার্চের পরিচয় কাউকে রেহাই দেয় না রোগ-বালাই থেকে। টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করতে হবে, এটাই সোজা এবং কঠিন সত্য। এর বাইরে আমহারার বেশির ভাগ রীতিনীতি বালক নুরুর কাছে অনর্থক, অযৌক্তিক মনে হয়।

এভাবে বড় হচ্ছিলেন জুমরা নুরু। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন পরিবর্তন আসবে, এ অঞ্চলের মানুষেরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। বৈষম্য থাকবে না মানুষে মানুষে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ করবে না মানুষের জীবন। নারীদের অধিকার সবক্ষেত্রে থাকবে পুরুষদের সমপরিমাণে।

জুমরার এসব স্বপ্নের কথা শুনে আমহারার লোকজন তাকে ‘পাগল’ ভাবত। এক সময় জুমরা নুরু আমহারাতে আর ও কিছু ‘পাগল’ যুবকের সন্ধান পান যারা আমহারা নিয়ে তাঁর মতই স্বপ্ন দেখেন, বিশ্বাস করেন পরিবর্তনে। ১৯৭২ সালে আমহারা অঞ্চলে এরকম উনিশ জন সমমনা মানুষ মিলিত হয়ে শুরু করেন আওরা আম্বা নামে নতুন একটি গ্রাম। শুরু থেকেই আওরা আম্বার রীতিনীতি আশপাশের গ্রামগুলি থেকে একেবারে স্বতন্ত্র। নব্বই শতকের শুরুতে গ্রামটিতে সমবায় নীতির আনুষ্ঠানিক প্রয়োগ শুরু হয়।

নারী-পুরুষ সকলে গলায় গলা লাগিয়ে কাজ করেন আওরা আম্বা গ্রামের উন্নতির জন্য। গ্রামবাসীর প্রত্যেকে সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করেন। পাঁচ দিন কম্যুনিটির জন্য আর একদিন বয়স্ক, অসুস্থ আর অনাথদের কল্যাণে। সপ্তাহের সপ্তম দিন যার যার ইচ্ছামাফিক। বাড়তি আয়ের জন্য কেউ ঐদিন কাজ করেন, কেউ বা ছুটি কাটান। কম্যুনিটির সদস্য প্রতিটি নারী-পুরুষ সমান বেতন পান। গ্রামে আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, বস্ত্র উৎপাদন, পর্যটন এবং আশপাশ গ্রাম ও শহরগুলিতে গ্রামে উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ।

স্বতন্ত্র গ্রামটির অন্যতম একটি দিক হচ্ছে ধর্ম নিয়ে গ্রামবাসীর একদম মাথাব্যথা নেই। এখানে নেই কোন মসজিদ বা চার্চ।ফলে নেই কোন ফতোয়াবাজি বা বাইবেল-কোরান-হদিসের দোহাই দিয়ে মোল্লা-যাজকদের মোড়লিপনা।

আওরা আম্বার একটি লাইব্রেরী (ছবি উৎস: Wikipidia)

শুরুতে আশপাশ গ্রামের লোকজন সে জন্য আওরা আম্বার মানুষদের অপছন্দ করত। অনেকে বলত, চৌদ্দ পুরুষের রীতিনীতি মানে না, আল্লা-খোদা-যীশু খৃষ্টে বিশ্বাস করে না—এরা সমাজের ধ্বংস ছাড়া আর কি মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে? জুমরা নুরু এবং আওরা আম্বার লোকজনকে আশপাশ গ্রামের মুসলমান, খ্রিস্টানরা ভাবতো নাস্তিক, মুরতাদ এবং ‘পাপী’। জুমরা নুরু ও তাঁর লোকজনের ওপর কয়েকবার সহিংস হামলা হয়েছে। গ্রেনেড হামলা ও হয়েছে একবার।

টেনশন হাল্কা করতে মাসে এক সময় নিয়মিত মাসিক বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয় আওরা আম্বার গ্রামবাসীদের সাথে আশপাশের মুসলমান-খ্রিস্টান গ্রামবাসীদের। ‘ধর্মের মানেটা কি’? আওরা আম্বার এক মহিলা সদস্য প্রশ্ন তোলেন তেমনি এক বৈঠকে। ‘সবাই দেখছে আমরা কি করি। আমরা একে অপরকে সাহায্য করি, বয়স্ক আর বাচ্চাদের যত্ন নেই। তারা অকারণে আমাদের অপছন্দ করে’।

অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আশপাশের মুসলমান, খ্রিস্টানরা ও এখন বুঝতে শিখেছেন, আওরা আম্বাকে অপছন্দ করা চলে কিন্তু একেবারে এড়িয়ে চলা সুবুদ্ধির পরিচয় হবে না। অনেকে ছেলেমেয়েকে আওরা আম্বার স্কুলে পাঠাচ্ছেন।আওরা আম্বার মাড়াই কলে শস্য নিয়ে যাচ্ছেন।

তিন:
সাফল্যের কারণ:

রাতারাতি আওরা আম্বা কম্যুনিটির সাফল্য আসেনি। চার যুগের অধিক সময় ধরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আওরা আম্বা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে আওরা আম্বার স্থায়ী সদস্য সংখ্যা প্রায় পাঁচশ’। ইথিওপিয়া ও এর বাইরে ছড়িয়ে রয়েছে এদের হাজার হাজার শুভাকাঙ্ক্ষী।

স্বাক্ষরতা, স্বনির্ভরতা অর্জন, লিঙ্গ বৈষ্যম্যহীনতা, দারিদ্র হ্রাসের ক্ষেত্রে আওরা আম্বার সাফল্যে ইথিওপিয়া সরকারের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এখন আওরা আম্বা নিয়ে উৎসাহী। আওরা আম্বার সাফল্যের বিস্তারিত কারণ অনুসন্ধান এবং কি ভাবে তা ইথিওপিয়া এবং এর বাইরে আওরা আম্বার মডেল ছড়িয়ে দেয়া যায় – সে প্রচেষ্টা চলছে।

আওরা আম্বার সাফল্যের বিস্তারিত কারণ হয়তো গবেষণাতে বের হয়ে আসবে। তবে কিছু কারণ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই।
আওরা আম্বার প্রতিষ্ঠাতা জুমরা নুরুর কথায়, ‘আমাদের গ্রামে প্রত্যেকে একে অন্যের জন্য কাজ করি বিধায় আমরা এ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি। মিলেমিশে কাজ করছি সবাই একটি সম্মিলিত লক্ষকে সামনে রেখে, আর সেটি হল – আওরা আম্বার সামগ্রিক উন্নয়ন’।


আওরা আম্বার প্রতিষ্ঠাতা জুমরা নুরু (ছবি উৎস: www.PRI.org)

সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ:

নারীর কাজ আর পুরুষের কাজের শ্রেণী বিভাজন নেই এখানে। লাঙ্গল টানা পুরুষের কাজ হিসেবে ধরা হয় অনেক জায়গায়। আওরা আম্বার নারীরা সেটি করছেন অনায়াসে।

নারীর আর পুরুষের সমান অধিকার আওরা আম্বাতে। গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলিতে সিদ্ধান্ত নেয় গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত নারী-পুরুষ নিয়ে গঠিত কমিটি।

বাচ্চাদের লেখাপড়া শেখানোর কাজটিকে অতি গুরুত্বের সাথে পালন করা হয় আওরা আম্বাতে। ভবিষ্যৎ আওরা আম্বার কারিগর আজকের আওরা আম্বার শিশুরা, এ কথাটি গ্রামের প্রতিটি মা-বাবারা বুঝতে শিখেছেন।

স্থানীয় অর্থনীতিতে কি ভাবে বহুমুখী শক্তি সঞ্চারিত করা যায়, আওরা আম্বার লোকজন সে বিষয়ে ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ-তরুণীর জন্য চাকুরীর ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।

তবে আওরা আম্বা গ্রামবাসীরা যেহেতু কোন প্রচলিত ধর্ম পালন করেন না, এদের বাড়তি কিছু সুবিধা রয়েছে। আশপাশের গ্রামগুলির খ্রিস্টান এবং মুসলমান চাষিরা ধর্মীয় ছুটির দিন গুলিতে কাজ করে না। আওরা আম্বার সদস্যরা সে সব দিনগুলিতে ও মাঠে কাজ করে।

চার:

শেষ কথা:

আওরা আম্বার গ্রামবাসীদের সকল স্বপ্ন এখন ও পূরণ হয়নি। তবে তাতে তাঁরা উদ্যম হারিয়ে ফেলছেন না, কেননা ইতিমধ্যে তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, জ্ঞান-বুদ্ধি আর নিষ্ঠার সাথে পরিশ্রম চালিয়ে গেলে সংসারে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব। অলৌকিকত্বে ভর করে জীবনে সফল হওয়ার চেষ্টা যে বৃথা, এ সাদামাটা কিন্তু প্রয়োজনীয় সত্যটি তাঁদের কাছে দিবালোকের মত পরিষ্কার।

আওরা আম্বার কারিগর জুমরা নুরু স্বশিক্ষিত এবং আলোকিত একজন মানুষ। স্কুল বা কলেজের কোন ডিগ্রী নেই তাঁর (সম্প্রতি জিম্মা বিশ্ববিদ্যালয় জুমরা নুরুকে সম্মান সূচক পিএইচডি ডিগ্রী প্রদান করেছে)। নিজ জীবন থেকে শিখে নেয়া অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস আর সাহসে ভর করে তিনি পুরো একটি গ্রামকে স্বনির্ভর করার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দিয়ে যাচ্ছেন।

আওরা আম্বার কথা জেনে ও পড়ে আমাদের বাংলাদেশের আরজ আলী মাতুব্বরের কথা মনে পড়ে গেল। জুমরা নুরু যেন আফ্রিকার ইথিওপিয়াতে জন্ম নেয়া আমাদের আরজ আলী মাতুব্বর। জুমরা নুরু আর আওরা আম্বার সাফল্য এক অর্থে লৌকিক জ্ঞান-বুদ্ধি, সমৃদ্ধ চেতনা এবং মানবতাবাদের সাফল্য।

ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জুমরা নুরুদের সাফল্যের গল্প সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া খুব জরুরী।
জয়তু জুমরা নুরু।

পুনশ্চঃ সবাইকে অনুরোধ করছি, ফেইস বুকে Awra Amba, Zumra Nuru সার্চ করে লাইক দিন।

তথ্যসূত্র:
http://www.awraamba.com/
http://www.voanews.com/content/ethiopian-village-awra-amba-tries-cooperative-life/1782899.html
https://en.wikipedia.org/wiki/Awra_Amba
http://www.pri.org/stories/2013-12-12/ethiopian-village-has-gained-wealth-has-bred-hostility
http://www.theguardian.com/global-development/video/2014/apr/15/awra-amba-ethiopian-utopia-video

[132 বার পঠিত]