ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) বর্তমানে কেবলমাত্র ইসলামিক স্টেট (আইএস) তাদের দখলকৃত ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের আল-নুরি মসজিদে রমজানের প্রথম শুক্রবার মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর আল-বাগদাদী। জুমার নামাজের খুতবায় নিজেকে স্বঘোষিত ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা এবং ইসলাম ধর্মের শেষ নবীর বংশধর দাবী করে সকল মুসলমানকে তাকে অনুসরণ করার আহবান জানান। খুতবার ভিডিও চিত্র প্রকাশের আগ পর্যন্ত বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে অর্থ সম্পদের মালিক এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে তথ্য ছিলো খুব সামান্য। ইসলামী ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী আবু বকর আল-কায়েদার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ২০০৫-২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনাধীন কারাগারে বন্দি ছিলেন [১]। ২০০৯ সালে মুক্তি পাবার সময়ে তিনি বিচারকদের নিউইয়র্কে আবার আবার দেখা হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরে আবু-বকরের দেখা না মিললেও তার প্রতিষ্ঠিত জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের অকল্পনীয় সন্ত্রাস, আত্মঘাতি হামলা, সাধারণ জনগন হত্যা, নারী-শিশু হত্যা, নির্যাতন, অগুনতি গাড়ি বোমা হামলার জন্য শিরোনাম হয়েছে বারবার। ২০১০ সালের অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবু বকরকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং তার সন্ধান কিংবা তথ্যদাতার জন্য ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে [২]। দীর্ঘদিন নেতার দেখা না মেলায় এবং জঙ্গি দমনে নিয়োজিত সরকারী বাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মনোবল চাঙ্গা করতে অল্প কিছুদিন আগেই ইরাক সরকার ঘোষণা করে, আনবার প্রদেশে সরকারী বাহিনীর হামলায় আবু বকর মারাত্মক আহত হয়ে সিরিয়ায় পালিয়ে গেছেন। আত্মবিশ্বাসে ছাই দিতেই হয়তো স্বশরীরে ইরাকের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে হাজির হয়ে আবু বকর বললেন- ‘দীর্ঘদিনের ধর্মযুদ্ধ এবং প্রতিক্ষার পর আল্লাহ মুজাহিদিনদের জয়ী করেছেন… যোদ্ধারা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছে এবং খলিফার হাতে রাষ্ট্রকে সমর্পণ করেছে’। আইএসআইএস কর্তৃক রমজানের প্রথমদিন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণার ঠিক পাঁচ দিন পর নিজেকে সেই প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের খলিফা দাবী করে আবু বকর বিশ্বব্যাপী জিহাদের আহবান জানিয়ে বলেন [৩] –

এই মহান রমজান মাসের ডাক শোনো, হে আল্লাহর বান্দারা! যুদ্ধ শুধু করো। এই সেই মাস যে মাসে রাসুল (সঃ) তার সেনাবাহিনীকে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে বলেছিলেন, যে মাসে তিনি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন বহুশ্বেরবাদীদের বিরুদ্ধে। আল্লাহকে ভয় করো, হে আল্লাহর বান্দারা!

ছবি: শুক্রুবার মসজিদে নিজেকে খলিফা ইব্রাহিম দাবী করে জিহাদের আহবান জানাচ্ছেন আবু বকর আল বাগদাদী। ভিডিও লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=Fxawa6VnSTM

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউইয়র্কে আত্মঘাতি বিমান হামলা চালায় ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠী। স্মরণ কালের অন্যতম ভয়াবহ সেই হামলায় নিহত হয় তিন হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ, ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রায় দশ বিলিয়ন ডলার সম্পদের। হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে, ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে এবং সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ এনে তার মিত্রদের নিয়ে তেলসমৃদ্ধ ইরাক আক্রমণ করে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকের জনসংখ্যার বিশ শতাংশ সুন্নী মুসলমান। সাদ্দাম হোসেন ছিলেন এই সুন্নী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং তার উপর ভর করেই ইরাকের ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলো সুন্নীরা। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রবাহিনী কর্তৃক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর শিয়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন পর ইরাকের রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিজেদের অধিকার লাভ করে। আমেরিকা এবং এর মিত্র বাহিনীর ইরাক আক্রমণের সময় বলেছিলো, তারা ইরাকের জনগনকে তাদের দেশ ফিরিয়ে দিতে এসেছে। দেশ ফিরিয়ে দেওয়া শেষে তারা যখন ইরাক ছাড়লো তখন ইরাক বিশ্বের সবচেয়ে বড় জঙ্গি প্রজননক্ষেত্র।

২০০৩ সালে আমেরিকা এবং তার মিত্রবাহিনী যখন ইরাক আক্রমণ করে সেই সময়টায় বাগদাদের দক্ষিণে এক মসজিদের ইমাম ছিলেন আবু বকর। তখন থেকেই সুন্নী মতালম্বী বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের সাথে জড়িত আবু বকর তৎকালীন ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক’ এর মজলিসে সুরার সদস্য মনোনীত হন। এরপর প্রায় পাঁচ বছর বন্দীত্ব শেষে ২০১০ সালে আবার আত্মপ্রকাশ করেন আবু-বকর, এবার আল-কায়েদার ইরাকের প্রধান হিসেবে [৪]। ২০১০ সালের ষোলই মে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরাকের সরকারী বাহিনীর সম্মিলিত হামলায় তৎকালীন ইরাকের আল-কায়েদা প্রধান আবু ওমর আল বাগবাদী নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন আবু-বকর। এই ভয়ংকর মানুষটির যোগদানে ইরাকে আল-কায়েদা স্মরণকালের ভয়াবহ সব হামলা চালানো শুরু করে। আবু বকরের নেতৃত্বে ২০১১ সালের মার্চ-এপ্রিল এই দুই মাসেই ২৩ বার হামলা চালানো হয় ইরাকের বিভিন্ন স্থানে। একই বছরের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন কমান্ডোদের হামলায় ওসামা বিন লাদেন নিহত হলে আবু-বকর আল বাগদাদী প্রতিবাদ স্বরুপ ইরাকের হিলা সিটিতে হামলা চালিয়ে ২৪ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। পরের মাসে তার সংগঠন আইএসআইএস লাদেনকে হত্যার জন্য ইরাকে কমপক্ষে একশটি হামলা চালানোর জন্য তাদের ওয়েবসাইটে ডাক দেয় [৫]। ১৫ ই আগষ্ট আইএসআইএস জঙ্গিদের আত্মঘাতি বোমা হামলায় মসুলে নিহত হয় সত্তর জন সাধারণ মানুষ। ডিসেম্বরে মার্কিন বাহিনী ইরাক ত্যাগ করলে আইএসআইএস গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে তেষট্টিজনকে হত্যা করে।

আরব বসন্তের পর থেকে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের নেতৃত্বে যে গৃহযুদ্ধ চলছে সে যুদ্ধে সংগঠনকে নিয়ে জড়িয়ে পড়েন আবু বকর আল বাগদাদী। ২০১৩ এর এপ্রিলে আবু বকর ঘোষণা করেন সিরিয়ায় আল-কায়েদার শাখা জাবাত-আল-নুসরা তার সংগঠন আইএসআইএসের সাথে একীভূত হয়েছে এবং এখন থেকে তারাই এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিবে। যদিও আল-নুসরার সংশ্লিষ্টরা এই দাবীকে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু থেমে থাকেন নি আবু বকর। সিরিয়ায় আইএসআইস দখল করে নিতে থাকে একের পর এক উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর। এমনই এক শহর রাক্কা। প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসলামী রাষ্ট্রের জঙ্গিদের দখলে থাকা রাক্কার সংখ্যালঘু শিয়া এবং খ্রিস্টান বাসিন্দাদের নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের জিহাদিরা তিনটি সুযোগ দেয়।

এক. তাদের জঙ্গিদের মতো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে।
দুই. যদি তা না হয় তাহলে জিজিয়া কর প্রদান করতে হবে। নগদ অর্থে এই কর দেওয়া যাবে না, দেওয়া যাবে কেবলমাত্র সোনায়।
তিন. উপরের দুইটি কোনোটি পছন্দ না হলে তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে।

যেকোনো শহর দখল করেই ইসলামী রাষ্ট্রের জঙ্গিরা সেখানে কালবিলম্ব না করে শরিয়া আইন চালু করে। একই সাথে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করে নিজেদের দপ্তর, শরিয়া আদালত স্থাপন করে। অন্ধকারের সেপাইরা সবখানেই উড়িয়ে দেয় তাদের কালো পতাকা। সিরিয়ার সরকার বিরোধী যুদ্ধ জড়িত আল-কায়েদা থেকে শুরু করে সবাই খুব দ্রুত বুঝতে পারে, আইএসআইএস এর সিরিয়ায় আগমন প্রেসিডেন্ট আসাদকে উৎক্ষেপনে বিরোধী শিবিরকে সহায়তা করার জন্য নয় বরঞ্চ তারা সিরিয়ায় এসেছে সিরিয়া দখল করার জন্য। দখলকৃত শহরগুলোর বাসিন্দাদের জনসমুক্ষে হত্যা, ক্রুসিফাই করে ঝুলিয়ে রাখা থেকে শুরু করে হেনো কোনো মনবতা বিরোধী অপরাধ নেই যা দখলদাররা করছে না। শহরগুলোতে আইএসআইএসের মর্মান্তিক নৃশংসতা দেখে আল-কায়েদা সংগঠনটিকে অতিরিক্ত সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে!!

চিত্র: মার্কিন কমব্যাট পোশাকে সিরিয়ায় আইএসআইএস জঙ্গি

সিরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলের বেশকিছু শহর নিজেদের দখলে নিয়ে সেই শহরগুলোতে কেন্দ্র করে আবার সুসংগঠিত হয় আইএসআইএস। জুন নাগাদ অস্ত্রসস্ত্রে সুসজ্জিত তিন থেকে চার হাজার জিহাদি সিরিয়া থেকে ইরাকে আক্রমণ চালানো শুরু করে তাদের ভৌগলিক সীমা আরও বিস্তৃত করার উদ্দেশ্য। প্রধান লক্ষ রাজধানী বাগদাদ হলেও জঙ্গিরা প্রথমে সিরিয়া এবং বাগদাদের মধ্যবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর মসুল নিজেদের দখলে নেবার জন্য ধীরে ধীরে আগাতে থাকে। ৫ই জুন সামারা এবং ৬ই জুন পূর্ণ শক্তি নিয়ে তারা মসুল আক্রমণ করে। ইরাকের সরকারী বাহিনীকে দাজ্জালের সেনাবাহিনী আখ্যা দিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্রের জিহাদিরা ঘোষণা করে যারা তাদের বিরুদ্ধে যাবে তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। ৭ তারিখ তারা রামাদির আনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে ১৩০০ শিক্ষার্থীকে বন্দী করে। ইরাকি সেনাবাহিনীর তৎপরতায় যাদের পরবর্তীতে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আইএসআইএস এর ভয়ে ভীত হয়ে ইরাকি বাহিনী মসুলকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় এবং শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। দুই দিন পরে অর্থাৎ ৯ই জুন, মসুল জিহাদিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে [৬]। শহরের সকল সরকারী প্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর থেকে শুরু গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থাপনায় টানিয়ে দেওয়া হয় আইএসআইএস এর কালো পতাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে হামলা চালিয়ে প্রায় ৪২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ লুট করে নেওয়া হয় [৭]। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সেখানেও শরিয়া আইন জারি করে বাসিন্দাদের হত্যা, নির্যাতন শুরু করে দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ তাদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে ভিন্ন জায়গায় আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়। তেলসমৃদ্ধ মসুল দখলের ফলে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বলে যাওয়া জঙ্গি দল খুব দ্রুতই ইরাকের বাকি তেল খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে এমনটাই সম্ভাবনা। মূল লক্ষ্য বাগদাদের কথা ভুলে না গিয়ে জঙ্গিরা তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে। ১৫ তারিখ জঙ্গিরা নিনেভা প্রদেশের তাল আফার শহরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে আটক হয় ১৭০০ জন ইরাকি সেনা যাদের প্রত্যেককে জিহাদিরা হত্যা করে তার ভিডিও ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে। সিরিয়া এবং ইরাক মিলিয়ে দখল নেওয়া বিশাল অঞ্চলকে নিয়ে নতুন ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয় একই মাসের ২৯ তারিখ। অর্থাৎ এক মাসেরও কম সময়ে, তেমন কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই আইএসআইএস ইরাকের আটত্রিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার অংশ দখল করে নিতে সমর্থ হয়।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আইএসআইএসকে লড়তে হচ্ছে ইরাকি সেনাবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, শহর-গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সহ অনেক ধরণের ফ্রন্টের বিরুদ্ধে। আধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত এই বাহিনী প্রথম থেকেই ইসলাম রক্ষার জিহাদের প্রপাগান্ডা চালিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনকি ইউরোপ, আমেরিকা থেকে বিভিন্ন জিহাদি মানসিকতার মানুষকে আকৃষ্ট করা শুরু করে। কয়েকদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক নাগরিক আইএসআইএসের হয়ে আত্মঘাতি বোমা হামলায় অংশ নেয়। আপাত সুসজ্জিত এই ভয়ংকর সেনাবাহিনীর অর্থায়ন কোথা থেকে হচ্ছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৪ সালে তাদের অর্থের উৎস খোঁজার নিমিত্তে প্রায় দুইশ’র অধিক দলিল দস্তাবেজের উপর গবেষণা চালায় একটি বেসরকারি সংস্থা (RAND Corporation)। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জঙ্গি সংস্থার বাজেটের পাঁচ ভাগ অর্থ এসেছে আশেপাশের দেশগুলোয় অবস্থিত বিভিন্ন ধনী ব্যক্তির ব্যক্তিগত সহায়তা থেকে। বাকি সব অর্থ জোগানো হয়েছে ইরাক থেকেই। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরাকের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরণের অপরহণ, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার মাধ্যমে যে অর্থ সংগ্রহ করা হতো, তার ২০ ভাগ দিয়ে দেওয়া হতো জিহাদি বাহিনীর মূল সমন্বয় সেলকে। সেখান থেকে এই অর্থ আবার বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের দেওয়া হতো যাতে করে হামলা, অপরহণ আরও বৃদ্ধি করে আয় বাড়ানো যায়। ২০১৪ সালের মধ্যভাগে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএসের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের জিহাদিদের তথ্য পর্যালোচনা করে ঘোষণা করে যে, জঙ্গিদের হাতে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রয়েছে [৮]- পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী রাতারাতি এতো বিপুল সম্পদ অর্জন করতে পারে নি। ব্যাংক লুট, সোনার দোকান লুট, অপহরণ, চাঁদাবাজি ছাড়াও গালফ অঞ্চলের বিভিন্ন নাগরিকের কাছ থেকে জঙ্গিরা আর্থিক অনুদান গ্রহণ করে তাদের সম্পদ ক্রমান্বয়ে আরও বৃদ্ধি করছে। ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মালিকি কাতার এবং সৌদি আরবকে জিহাদিদের অর্থায়ন করার অভিযোগ করেছেন। এছাড়াও সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলের দখলে রাখা শহরগুলো থেকেও তারা বিভিন্ন উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করেছে। দখলে থাকা তেল পরিশোধনকেন্দ্রগুলোর তেল সিরিয়া সরকারকেও বিক্রি করেছে আইএসআইএস। ২০১২ সাল থেকেই এই জঙ্গি গোষ্ঠী বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন হামলা, হত্যায় তাদের বার্ষিক খরচের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে অর্থদাতাদের আকৃষ্ট করার জন্য [৯]। আইএসআইএস এখানেই থেমে থাকবে না সেটা তাদের খুব অল্প সময়ের কর্মকান্ড বিবেচনা করলেই বোঝা যায়। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে তারা রোম পর্যন্ত তাদের খেলাফত বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে তারা পারঙ্গম। উচ্চমানের ভিডিও, অডিওর মাধ্যমে তারা বিশ্বব্যপি জিহাদের জন্য আহবান জানিয়ে যাচ্ছে, আহবান জানাচ্ছে তাদের ইসলামি রাষ্ট্রকে পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।

চিত্র: প্রপাগান্ডার শক্তি। আইএসআইএস শিবিরে এক সিরিয়া যুদ্ধফেরত বিট্রিশ জিহাদি। সারা পৃথিবী থেকেই অশুভ শক্তিদের জড়ো করছে আইএসআইএস

গণমাধ্যমের খবর অনুসরণ করলে অনেকেরই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ইরাক এবং সিরিয়ায় আইএসআইএস কে কেন্দ্র করে যা হচ্ছে তা কেবলমাত্র জাতিগত সংঘাত। মোটেও কিন্তু তা নয়। যদিও ইসলামি রাষ্ট্রের জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে তাদের ভয়াবহ সকল অপকর্ম হালাল করতে কিন্তু তাদের হাতে কেবল খ্রিষ্টান নয়, মারা যাচ্ছে অসংখ্য মুসলমানও। ইরাকে সুন্নী বিভিন্ন আলেমরাও সমগ্র ইরাককে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুরোধ জানাচ্ছেন, অনুরোধ জানাচ্ছেন বৈদেশিক ভাইরাস হতে ইরাককে রক্ষা করার। একই সাথে এই সংঘাতে পশ্চিমা বিশ্বের অবদানও কম নয়। সিরিয়ায় বাশার বিরোধী বিদ্রোহীদের মধ্যে সবচেয়ে সুসংগত শক্তি আল-কায়েদা। সারা পৃথিবীতে আল-কায়েদা নিষিদ্ধ হলেও তারা সিরিয়ায় নিষিদ্ধ নয়, কারণ সেখানে তারা প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। পশ্চিমা বিশ্ব সিরিয়ায় আসাদকে তাড়াতে তাই আল-কায়েদাকেই প্রকারন্তরে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে আসছে। আইএসআইএস এর দখলে থাকা সিরিয়া এবং ইরাকের সীমান্ত দিয়ে সেসব অস্ত্র সাহায্য চলে আসছে আইএসএসএর হাতে যেগুলো আবার ব্যবহৃত হচ্ছে ইরাকি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যাদের সহায়তা করছে আবার সেই পশ্চিমা বাহিনী। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের যেমন মার্কিনীরা সহায়তা দিচ্ছে ঠিক তেমনি বাশারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে সহায়তা করছে ইরান, রাশিয়া। অপরদিকে ইরাকে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এক সাথে কাজ করার কথা বলছে ইরান। আইএসআইএস তাই ধর্ম যুদ্ধের কথা বললেও এখানে ধর্মকে পুঁজি করে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তি তাদের খেলা খেলছে, প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। পৃথিবী তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। এমন একটা কঠিন সময়ে হঠাৎ মনে পড়ে যায় মেঘদলের গানের কথা- বল হরি হরি বল, যুদ্ধে যাবো; বিভেদের মন্ত্র স্বর্গ পাবো।

বিভেদের মন্ত্রে স্বর্গ লাভ হয় না। সুন্নীরা যদি শিয়াদের হত্যা করেন, শিয়ারা যদি হত্যা করেন আলোয়াইটসদের, মুসলমানরা যদি হত্যা করে খ্রিষ্টানদের তাহলে কখনই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না। কিন্তু পৃথিবীর পরিচালকদের ব্যাংক ব্যালেন্সে ঠিকই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, ইরাক কিংবা সিরিয়া, আইএসআইএস কিংবা আল-কায়েদা সবাই তাদের মানুষ মারার খেলনা দিয়ে শেষ করে দিক সবকিছু। এভাবেই হয়তো একদিন সত্যি সত্যি মানবতার মুক্তি ঘটে যাবে।

তথ্যসূত্র
[১] “Fox’s Pirro: Obama set ISIS leader free in 2009”. PolitiFact.com. Tampa Bay Times. 14 June 2014. Retrieved 20 June 2014. http://www.politifact.com/punditfact/statements/2014/jun/19/jeanine-pirro/foxs-pirro-obama-set-isis-leader-free-2009/
[২] “Terrorist Designation of Ibrahim Awwad Ibrahim Ali al-Badri”. United States Department of State. 4 October 2011. Retrieved 8 October 2011. http://www.webcitation.org/62HxbVjBF
[৩] “BBC News – Profile: Abu Bakr al-Baghdadi”. BBC News. 11 June 2014. http://www.bbc.co.uk/news/world-middle-east-27801676
[৪] “Iraqi Insurgent Group Names New Leaders”. Los Angeles Times. 16 May 2010.
http://atwar.blogs.nytimes.com/2010/05/16/iraqi-insurgent-group-names-new-leaders/?_php=true&_type=blogs&_r=0
[৫] “Terrorist Designation of Ibrahim Awwad Ibrahim Ali al-Badri”. United States Department of State. 4 October 2011.
http://www.webcitation.org/62HxbVjBF
[৬] “Sunni Militants Drive Iraqi Army Out of Mosul”. The New York Times. 10 June 2014. http://www.nytimes.com/2014/06/11/world/middleeast/militants-in-mosul.html?_r=0
[৭] “Mosul Bank Robbery Isn’t The Only Thing Funding ISIS”. IBT. 13 June 2014. http://www.ibtimes.com/mosul-bank-robbery-isnt-only-thing-funding-isis-1601124
[৮] “How an arrest in Iraq revealed Isis’s $2bn jihadist network”. The Guardian. 15 June 2014.
http://www.theguardian.com/world/2014/jun/15/iraq-isis-arrest-jihadists-wealth-power
[৯] “Records show how Iraqi extremists withstood U.S. anti-terror efforts”. McClatchy News Service. 23 June 2014.
http://www.mcclatchydc.com/2014/06/23/231223/records-show-how-iraqi-extremists.html

[959 বার পঠিত]