‘সত্যজিৎ রায়’ এর অসাধারণ চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’-এ তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একজন অত্যাচারী আধিপত্য বিস্তারকারী শাসক, একজন স্বৈরাচার তার শাসন ক্ষমতা বলবত রাখার জন্য, মানুষের মগজ ধোলাই করবার জন্য একটি যন্ত্র বানিয়েছিল- যেখানে সারাক্ষণ রাজার প্রশংসাবাক্য শোনানো হয়। এইভাবে সে অঞ্চলের সব মানুষের মগজ সে ধোলাই করে ফেলেছিল- একই কথা বারবার বলে, বারবার মাথার ভেতরে ঢুকিয়ে তাদের মাথায় কথাগুলো এমনভাবে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল, যেন সেগুলো বিশ্বাস করা ছাড়া তাদের আর কোন উপায় না থাকে। এক কথা বারবার শুনতে শুনতে অবচেতনভাবে একসময় মানুষ তা সত্য ও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়, সে সম্পর্কে তাদের প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-কৌতূহল-প্রতিবাদ ক্রমশই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। শাসন ক্ষমতা বলবত এবং পাকাপোক্ত রাখবার জন্য জনগণকে এটা বোঝানো জরুরী যে, এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা, এটাই সর্বোৎকৃষ্ট এবং এটাই স্বাভাবিক। বারবার একই বাক্য শুনতে শুনতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, মনস্তাত্ত্বিক ভাবেই সে নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে, শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে থাকে। যার কারণে “হীরক রাজার দেশে” চলচ্চিত্রে সবাই ছড়ায় কথা বলতো, একমাত্র একজন মুক্তমনা শিক্ষক ছাড়া। সেখানে কারো মনে কোন প্রশ্ন ছিল না, জিজ্ঞাসা ছিল না, প্রতিবাদ ছিল না। তারা শুধু রোবটের মত, আমাদের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যেভাবে আজান দেয়, মুখস্থ সুরা কালাম পড়ে ঠিক সেইভাবে গড়গড় করে আবৃত্তি করতো, বুঝে না বুঝে মুখস্থ করতো শেখানো সব বুলি। কিন্তু সেই শিক্ষক ছিলেন মুক্তমনের মানুষ, তাকে আলাদা ভাবে বোঝাবার জন্যেই সত্যজিৎ তাকে ছড়ায় কথা বলান নি। তিনি জানতেন এই তোষামোদি মিথ্যে, আজগুবি নির্বুদ্ধিতায় পরিপূর্ণ এই রাজার শাসন। একটি কথা বারবার প্রতিদিন ‘পাঁচবার’ ‘সাতবার’ চিৎকার করে মাইকে বাঁজিয়ে শোনালেই তা সত্য হয়ে যায় না, স্বাভাবিক হয়ে যায় না। আমাদের শেখানো প্রতিটি বিষয় প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারা, তার যথার্থতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা, তার সত্যতা বিশ্লেষণ করতে শেখার নামই প্রগতি। মানবসভ্যতার আজকের এই অর্জন নির্ভর করেছে মানুষের নানা তত্ত্বকে গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমে বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে গোটা বিশ্ব এককেন্দ্রিক হয়ে পরেছে, ক্ষমতার ভারসাম্য অনেকখানি চলে গেছে পশ্চিমা বিশ্বের হাতে। গ্লোবালাইজেশনের যেই মতবাদ জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশে যোগাযোগের যেই সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সাথে অন্য মানুষের, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একে অবহেলা বা তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই, যারা অবহেলা করবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এখন এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদীরা নিয়ন্ত্রণ করবে, আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এবং জাতীয়তাবাদের নামে- ধর্ম বর্ণ গোত্র বিভেদের নামে নিজেদের মধ্যে কোন্দল করে সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবাকে টেনে নিয়ে আসবো আমাদের শেকড় পর্যন্ত নাকি আমরাই নিয়ন্ত্রণ নেবো এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার, তা এই সময়ে নির্ধারণ করা জরুরী। আর এর জন্য প্রয়োজন সমস্ত বিশ্বের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ তৈরি করা, যোগাযোগ রক্ষা করা, মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা এবং একই সাথে নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা এবং ঐতিহ্য, সর্বোপরি নিজেদের স্বাতন্ত্র্যও রক্ষা করা।

বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ন্যাশনালিজম’ (ইংরেজি, ১৯১৭) গ্রন্থে ন্যাশনালিজম ও ন্যাশন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, উগ্র জাতীয়তাবাদের বিশ্লেষণ করে তার বিরোধিতা করেছেন। ন্যাশনালিজম গ্রন্থে তিনটি প্রবন্ধ রয়েছে, ন্যাশনালিজম ইন ওয়েস্ট, ন্যাশনালিজম ইন জাপান এবং ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া। ‘ন্যাশনালিজম’ গ্রন্থটি ছাড়াও ‘পার্সোনালিটি’ গ্রন্থে যথাক্রমে ব্যক্তি ও সমষ্টির পরস্পরের সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। Individual বা ব্যক্তির সাথে সমষ্টির বিরোধ চিরন্তন, রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এই দুটি পরস্পরবিরোধী। আবার একইসাথে রবীন্দ্রনাথ Personality এবং Individuality সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। Individuality’র ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, তার স্বার্থবোধ, তার বৃহত্তরবোধ উৎকটভাবে প্রকাশিত হয়, আর Personality’তে তার মহত্তর প্রকৃতি, তার আত্মবোধ এবং বিশ্ববোধ চমৎকারভাবে প্রকাশিত হয়। প্রথমক্ষেত্রে সে বস্তুজগতের প্রভু হবার জন্য ব্যস্ত থাকে, অন্যখানে সে ইহজগতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাকে ভালবাসার জন্য আগ্রহী হয়। আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দানা বেধেই নেশনতত্ত্ব বা জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হয়েছে। ন্যাশনালিজম বা জাতিগত চেতনা থেকে সৃষ্টি হয় জাতীয়তার চেতনা বা জাতীয়তাবাদ। এই সম্পর্কে Arthur Schopenhauer বলেছেন, “Individuality is a far more important thing than nationality, and in any given man deserves a thousand-fold more consideration. And since you cannot speak of national character without referring to large numbers of people, it is impossible to be both loud in your praises and honest. National character is only another name for the particular form which the littleness, perversity and baseness of mankind take in every country. If we become disgusted with one, we praise another, until we get disgusted with this one too. Every nation mocks at other nations, and they are all right.”
[“The Wisdom of Life-IV;Position:Section 2- Pride”. (1851).Translated by T. Bailey Saunders. (pg.35 in “The Wisdom of Life and Counsels and Maxims”, Digireads.com Publishing, 2008)].

পৃথিবীর প্রায় সব দেশের শিশুদের ভেতরে একদম ছোটবেলা থেকেই নানা ধরণের ধারণা চাপিয়ে দেয়া হয় যেই সকল ধারণা তারা আসলে নিজেরা পছন্দ করে বেছে নেয় না। আমাদের স্কুলগুলোতে ছোটবেলা থেকেই জাতীয় সংগীত সহ পাঠ্যপুস্তকে নানান জাতীয়তাবাদী প্রচার প্রচারণা শুরু হয়ে যায় এবং নানা ধরণের ধর্মীয় কল্পকাহিনী প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় শিশু মস্তিষ্কে। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রের প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য যাকে দেশপ্রেম বলে অভিহিত করা হয়, ধর্মীয় কল্পকাহিনীর প্রতি বিশ্বাস যাকে ধর্মবিশ্বাস বলা হয় এবং সেভাবেই তৈরি হয় তার নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ। তাকে বোঝানো হয়, রাষ্ট্র তাকে লালন পালন করছে, তাই তার রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে, অথচ সত্য হচ্ছে নাগরিকই রাষ্ট্রের স্রষ্টা এবং লালনকারী। তার রাষ্ট্রই সেরা রাষ্ট্র তার দেশই সেরা দেশ, যার দেশের রাজনীতিবিদগণ যেই সিদ্ধান্ত নেন সেটাই সেরা সিদ্ধান্ত; প্রয়োজনে যুদ্ধে গিয়ে ভিনদেশের নাগরিককে হত্যা করতে হবে, অন্য দেশের উপরে আধিপত্য বিস্তার করতে হবে, এগুলো তাকে গেলানো হয় শিশু বয়স থেকেই। রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়ে ওঠে তার কর্তৃপক্ষ, সেই জাতীয়তাবাদী চেতনায় রাষ্ট্রের পক্ষ নেয় দ্বিধাহীনভাবে। তার ন্যায় অন্যায়ের ধারণা সৃষ্টি হয় রাষ্ট্রের ন্যায় অন্যায় বোধের উপর ভিত্তি করে। সেই সাথে তাকে শেখানো হয় তাকে সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর নামক এক সত্ত্বা, যে চায় সারা পৃথিবীতে তার সাম্রাজ্য কায়েম হোক, সকল মানুষ তার তোষামোদি করুক, এবং সেই কারণে তার উচিত তার ধর্মের ঈশ্বরের গুণগান করা, বিধর্মীদের তার ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা আর তাতে রাজি না হলে বিধর্মীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা তাদের কতল করা।

বাল্যকাল থেকেই মানুষের কিছু দিকনির্দেশনা অবশ্যই প্রয়োজন। একজন শিশু ছোটবেলাতে যা শেখে তার উপরেই নির্ভর করে তার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড। কিন্তু আফগানিস্তান বা ইরানের একজন শিশুকে যখন আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ছোটবেলা থেকেই, ধর্মের নামে-দেশের নামে অন্য মানুষকে হত্যা করতে অনুপ্রেরণা দেয়া হয় যখন, তখন ছোটবেলাতে দেয়া সেই সব শিক্ষা কতটা যৌক্তিক এবং আধুনিক সময়ের উপযোগী তা পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। একজন ভারতীয় সেনাসদস্য যখন একজন পাকিস্তানী সেনাসদস্যের বুকে গুলি চালায়, সেই ভারতীয় সেনাসদস্যের জীবনাচরণ একজন পাকিস্তানী সেনাসদস্যের জীবনাচরণ থেকে মোটেও ভিন্ন কিছু নয়। তাদের খাদ্যাভ্যাস এক রকম, তারা একই ভাবে স্নেহময় পিতা বা হৃদয়বান প্রেমিক, এই মানুষ দুজনার মধ্যে কোন ব্যক্তিগত শত্রুতাও নেই। অথচ কি নৃশংসতার সাথে, কি ভয়ংকর উন্মাদনার সাথে তারা যুদ্ধের ময়দানে একে অপরকে খুন করছে, সেই খুন করার শিক্ষাটা তারা কোথায় পাচ্ছে, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা বোধটুকু কোথায় তৈরি হচ্ছে তা বিবেচনার দাবী রাখে।
ঠিক একই কথা প্রযোজ্য ধর্মের ক্ষেত্রেও। একজন মুসলিম ধার্মিক একজন ইহুদি বা হিন্দু ধার্মিকের উপরে একই কায়দায় হামলে পরে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় একজন আরেকজনের কন্যাকে ধর্ষণ করছে, অথচ তারা সকলেই ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বরে বিশ্বাসী, তাদের জীবনধারণে খুব বেশি পার্থক্য নেই, হয়তো কয়েকবছর আগেও তারা ভাল বন্ধু ছিল, তাদের মধ্যে কোন ব্যক্তিগত শত্রুতাও নেই। অথচ ধর্মের ভিত্তিতে তাদেরকে ছোটবেলা থেকেই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, ওরা একদলের, তারা আরেকদলের। এরা মুসলমান ওরা কাফের।

মানুষের চিন্তার উপরে এই নিয়ন্ত্রণ আরোপের শুরুটা হয় ছোটবেলাতেই, এবং বড় হবার পরে অধিকাংশ মানুষই এর বাইরে বের হতে পারে না। একজন সেনাবাহিনীর সদস্যকে যেভাবে মানুষ খুন করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, এবং সেই প্রশিক্ষণ পেয়ে সে যখন আরেক দেশের বা আরেক ধর্মের মানুষের উপরে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে, তখন তাকে দোষ দেবার আগে সেই ব্যবস্থার ত্রুটি নির্ণয় জরুরী হয়ে পরে, যেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, নিজের বিবেচনাবোধের ক্ষমতা হ্রাস পায়। আমাদের শিশুদের এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, পরিণত বয়সে তার আসলে শত্রুদেশের মানুষকে বা বিধর্মীদের ঘৃণা করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। এই পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে, সেই সব যুদ্ধে সবসময়ই মারা গেছে সাধারণ মানুষ, অথচ ক্ষমতা এবং রক্তের হোলি খেলার সুফল সর্বদাই যায় কিছু ক্ষমতাবান মানুষের কাছে, যারা যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে দূরে বসে মজা দেখেছে। যারা যুদ্ধের ময়দানে একে অপরের রক্ত ঝরিয়েছে, তারা দিনশেষে সেই দাসই থেকে গেছে।

ভলতেয়ার বলেছিলেন, “So it is the human condition that to wish for the greatness of one’s fatherland is to wish evil to one’s neighbours. The citizen of the universe would the man who wishes his country never to be either greater or smaller, richer or poorer.” [“Fatherland” in “Miracles and Idolatry” (Selections from the Dictionnaire Philosophique (1764),(pg. 56), Penguin Books, 2005.] এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ দুটোই মানুষের অর্জিত বিষয় নয়, এই বিষয়দু’টো মানুষের চিন্তাচেতনাকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায় যেখানে সে অন্য জনগোষ্ঠীকে নিজের চাইতে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে। সাধারণত পারিবারিকভাবেই তারা এই দু’টো বিষয়ে ধারণা পেয়ে থাকে, তাই এই দুই বিষয় নিয়ে গর্ব করার কোন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। আজ যে মুসলিম হিসেবে গর্ববোধ করছে, সে ভারতের কোন হিন্দু পরিবারে জন্মালে একই ভাবে হিন্দু হবার জন্য গর্ববোধ করতো, মুসলিম না হবার জন্য একটুও আক্ষেপ করতো না। আবার আজ যে বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করছে, সে আমেরিকায় জন্মালে এরচাইতে অনেক বেশি গর্ববোধ করতো, বাঙালি না হবার কারণে একটুও মনঃকষ্টে ভুগতো না। তাই পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে আস্ফালন এবং “Proud to be a Muslim” অথবা “Proud to be a Bangladeshi” এই ধরণের কথাগুলো হাস্যকর রকমের আহাম্মকি ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ শুধু গর্ব করতে পারে তার অর্জিত জ্ঞান-প্রজ্ঞা-বিশ্ববিক্ষা দিয়ে, চিন্তা ও চেতনাগত শ্রেয়োবোধ দিয়ে, তার নিজ যোগ্যতায় অর্জন করা বিষয় দিয়ে, আর কিছু দিয়ে নয়। জিদ্দু কৃষ্ণমূর্তি বলেছেন,
Why is there, one must ask, this division—the Russian, the American, the British, the French, the German, and so on—why is there this division between man and man, between race and race, culture against culture, one series of ideologies against another? Why? Where is there this separation? Man has divided the earth as yours and mine—why? Is it that we try to find security, self-protection, in a particular group, or in a particular belief, faith? For religions also have divided man, put man against man—the Hindus, the Muslims, the Christians, the Jews and so on. Nationalism, with its unfortunate patriotism, is really a glorified form, an ennobled form, of tribalism. In a small tribe or in a very large tribe there is a sense of being together, having the same language, the same superstitions, the same kind of political, religious system. And one feels safe, protected, happy, comforted. And for that safety, comfort, we are willing to kill others who have the same kind of desire to be safe, to feel protected, to belong to something. This terrible desire to identify oneself with a group, with a flag, with a religious ritual and so on gives us the feeling that we have roots, that we are not homeless wanderers.
Krishnamurti to Himself, pp 59-60

জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিজে নিজে ভাষা এবং সংস্কৃতির বিকাশ ও মিশ্রণ, নিজ নিজ কৃষ্টি লালন পালন করা আর জাতীয়তাবাদী হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।সত্যিকার অর্থে অনুন্নত এবং অপেক্ষাকৃত শিক্ষাবঞ্চিত দেশসমূহ এবং জাতিসত্তার মধ্যে প্রধানত যেই দুইটি বিষয় নিয়ে নিরন্তর ব্যবসা চলে, জনগণের ভেতরে এক ধরণের আদিম উত্তেজনার সৃষ্টি করে, উন্মাদনা সৃষ্টি করে ফায়দা হাসিল করা হয়, সেই দুইটি বিষয়ের একটি ধর্ম এবং অন্যটি জাতীয়তাবাদ বা জাতীয়তাবাদী চেতনা। এই দুই ধরণের চেতনা সৃষ্টি একেবারেই রাজনৈতিক, শোষক শ্রেণীর শোষণ জায়েজ এবং বলবত রাখার বৈশ্বিক পরিকল্পনার অংশ এবং শোষিত নিপীড়িত মানুষের সাথে এক ধরণের ঠাট্টা, তাদেরকে আফিমে বুদ করে রেখে তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়ার এক চিরকালীন পৌনঃপুনিক পদ্ধতি।
মানব সভ্যতার এই অসম্ভব উন্নত সময়ে অধিকাংশ প্রজ্ঞাবান মানুষ ধর্মের বুজরুকি এবং ছেলেভুলানো কল্পকাহিনী বুঝতে সমর্থ হলেও জাতীয়তাবাদ এখনও অনেক দেশে জনগণকে একত্র অথবা বিভক্ত করে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। মানুষের রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ অসংখ্যবার প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রতিপাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক একই কথা ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, প্রাচীন ও মধ্যযুগের একটি বড় সময় ধর্ম বড় বড় সাম্রাজ্য ও অর্থনৈতিক বলয় সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে, পুঁজির বিকাশ ঘটিয়েছে এবং শক্তিশালী হয়েছে। তবে একই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, ধর্মের মতই জাতীয়তাবাদের উগ্র রূপ অসংখ্যবার মানুষের বিরুদ্ধে, বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীলতার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। রক্তের শুদ্ধতা, জাত্যভিমান, উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ। উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় সংগ্রামে প্রগতিশীল রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ধর্ম বা জাতীয়তাবাদকে অপরাপর জাতির বিরুদ্ধে উগ্র সাম্প্রদায়িকতায় নামিয়ে নিয়ে আসতে পারে। ধর্ম যেমন নিজের ধর্মের মানুষকে স্বজন ভাবাতে শেখায়, একই সাথে পরোক্ষভাবে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সূক্ষ্মভাবে ঘৃণা তৈরি করে, জাতীয়তাবাদও নিজ জাতির মানুষকে স্বজন ভাবতে শেখায়, নিজের জাতিসত্তার প্রতি এক ধরণের অন্ধ মমত্ববোধ সৃষ্টি করে, উন্মাদনার বিকাশ ঘটায় এবং অন্য জাতিসত্তার মানুষে উপরে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাতে চেষ্টা করে।
প্রার্থনাসভা- মসজিদ মন্দির গির্জায় যখন মানুষ যায়, পৃথিবীর সব কিছু থেকে কিছুটা সময়ের জন্য নিষ্কৃতি পেতেই যায়। একটু শান্তি, একটু ধ্যান; একটু গভীর মনোনিবেশ করে তারা প্রার্থনাসভায়, নিজের ভেতরে আত্মস্থ হবার,নিজেকে একটু সময় দেবার চিন্তা নিয়েই যায়। সকল ধর্মের লোকই একই কাজ করে, এমনকি ধর্মের ছোট ছোট গ্রুপ উপগ্রুপের ভেতরেও, পীরবাবাদের আখড়া বা মাজারেও একই ঘটনা ঘটে। এখানে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টানদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। এই সময়টা মানুষের মানসিকতা একটি ঘোরের ভেতরে থাকে, এবং এই সময়টুকু কোন বক্তব্য মাথার একদম ভেতরে প্রবেশ করানোর জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত সময়। এই সময়ে, বা ধ্যানমগ্ন সময়ে মানুষের যুক্তিশীলতা ক্রমশই কমতে থাকে, কিন্তু ইন্দ্রিয়গুলো বাইরের পৃথিবী থেকে সংকেত নিতেই থাকে। যার ফলে এই সময়টা অনেক অযৌক্তিক, অনেক নোংরা বিষয় মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দেবার সবচাইতে উপযুক্ত সময়।
একজন মানুষকে প্রচুর পরিমাণে নেশা জাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হলে, এবং তার কানে একই কথা বারবার বলতে থাকলে, নেশা কেটে যাবার পরেও তার মাথায় কথাগুলো থেকে যাবে, এবং নেশা জাতীয় দ্রব্যের প্রভাবে বিচার বিবেচনা লোপ পাবার কারণে সেগুলো তার মস্তিষ্কে ঢুকে যাবে, তবে নেশা জাতীয় দ্রব্যের প্রভাব কেটে যাবার পরেও তার প্রভাব থেকে যাবে। তাই এই সময়টা মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই সময়টাকে যেমন ভাল কাজে লাগানো যায়,তেমনি খারাপ কাজে। মসজিদ মন্দির গির্জায় তাই খুতবা, ওয়াজ ইত্যাদি প্রার্থনা আলোচনায় রাজনৈতিক বয়ান বা জাগতিক বিষয়ে আলোচনা বেশিরভাগ সময়ই বিপদজনক।
প্রার্থনার সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভক্তি রসে গদগদ থাকে, একটি বড় জনগোষ্ঠীর উপরে প্রভাব বিস্তারের জন্য এটি দুর্বলতম সময়। সাধারণ ধর্মভীরু জনগণ সেই সময় যা শোনে তাই ভক্তিভরে গ্রহণ করে, অন্য সময় হয়তো একই কথা সে প্রত্যাখ্যান করতো। এই সময়টা মানুষের যুক্তিবোধ লোপ পায়, মানুষের ভক্তিরস সব ভাল মন্দের বিচার বিশ্লেষণ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
হয়তো কিছু মানুষকে যদি বলা হয়, হুমায়ুন আজাদ একজন নাস্তিক, তাতে সাধারণ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় সাধারণ জনগোষ্ঠী তেমন কিছু মনে করবে না; কিন্তু মসজিদে খুতবার সময় যদি ইমামসাহেব ঠিক একই কথাই বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ব্যাপক এবং ভয়াবহভাবে প্রভাববিস্তার করবে। সেই খুতবা শুনে কেউ চাপাতি নিয়ে হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করতে ছুটতেই পারে, এতে খুব বেশি অবাক হবার কিছু নেই। আপাতভাবে খুব নির্বিবাদী ভাল মানুষ মনে হলেও ঐ চাপাতিবাজের চেয়ে ঐ খুতবা প্রদানকারী লোকটি অনেক বেশি ভয়ংকর।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন অপরিণত মস্তিষ্কের শিশুদের ক্রমাগত মগজ ধোলাইয়ের মাধ্যমে শাসক শ্রেণীর নিয়ন্ত্রিত প্রজন্ম তৈরি করা যায়, ঠিক তেমনি মসজিদ, মন্দির, গির্জাগুলোকে আয়ত্ত করতে পারলে আরেক ধরণের প্রজন্ম সৃষ্টি করে তাদের শোষণ করা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহে যেমন ছোটবেলা থেকেই জাতি ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে বিশ্বমানবতাবাদের শিক্ষা দেয়া জরুরী, তেমনি মসজিদ মন্দির গির্জাতেও জাগতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ হওয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। ধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে জাগতিক বিষয়াদি থেকে মুক্ত হতে হবে, ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। রাষ্ট্র এবং সংবিধান হতে হবে ধর্ম মুক্ত, ঈশ্বর মুক্ত। ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাখলেই সেটা সুন্দর, যখনই ধর্ম রাষ্ট্র, বিচার ব্যবস্থা বা অর্থনীতির উপরে কর্তৃত্ব আরোপ করবে, তখনই আমাদের মধ্যযুগের দিকে যাত্রা শুরু করতে হবে।

ঠিক একই কথা প্রযোজ্য জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রেও। দেশ কাকে বলে? দেশপ্রেম আসলে কী? পুরনো দিনের রাজনৈতিক নেতৃবর্গের দ্বারা নির্ধারিত কোনও একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখাকে দেশ ধরে নিয়ে তার মধ্যে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর পক্ষাবলম্বন যদি দেশপ্রেম হয়, তবে তা নিতান্তই যুক্তিহীন আবেগমাত্র। দেশ হচ্ছে ঐ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। ভূমি বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড কখনও দেশ গঠন করতে পারে না, গঠন করতে পারে শুধু মানুষই। তাই মানুষ বাদ দিয়ে দেশপ্রেমের কোন যথার্থতাই থাকে না। আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই নানান জাত ধর্ম বর্ণের মানুষ বসবাস করে। বাঙলাদেশ বাঙালি জাতির দেশ হয়ে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা তবে কে? বাঙলাদেশ মুসলমানের হলে বাঙলাদেশে বসবাসকারী হিন্দু বৌদ্ধরা তবে কে? রাজনৈতিক শক্তিগুলো দেশপ্রেমের উপরে ভিত্তি করে গড়ে তোলে নানা ধরণের উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা। ধরা যাক, প্রথমে আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে প্রচুর আবেগময় বক্তব্য দিলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এবং বীরাঙ্গনাদের আবেগময়ী ভাষায় শ্রদ্ধা জানালেন। সাধারণ জনগণ স্বাভাবিকভাবেই ভক্তির ভেতরে প্রবেশ করবে, নত হবে, শ্রদ্ধা এবং দেশের প্রতি মমতায় নুয়ে পরবে। তাদের যুক্তিবোধ সেখানেই থমকে যাবে, এরপরে আপনি কি বলবেন সেটা গ্রহণের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। মুক্তিযুদ্ধের কথা অনেকক্ষণ বলার পরে আপনি শুরু করলেন আপনার দলীয় প্রচার এবং প্রোপাগান্ডা। আপনার দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের পক্ষে সাফাই গাওয়া, আপনার ছাত্র সংগঠনের গুণ্ডামির পক্ষে সাফাই, আপনাদের বিশাল বিশাল অপকর্মের পক্ষে কথা বলা। জনগণ তখন মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশ নিয়ে আবেগ এবং একধরণের ঘোরের ভেতরে রয়েছে। তাই তারা তখন খুব সহজেই আপনার বক্তব্য গ্রহণ করবে, কারণ আপনার বক্তব্য যাচাই করবার মত মানসিক অবস্থা তার ভেতরে তখন আর নেই।

মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙলাদেশের স্বাধীনতাকেও দলীয় রাজনীতির উপরে রাখতে না পারলে এটাকেও সমানভাবেই ব্যবহার করা হবে, এবং আরেকটি জাতীয়তাবাদী ধর্মের সূচনা হবে। সেই ধর্মের একজন পয়গম্বর থাকবে, একজন খলিফা থাকবে, আর ছোট ছোট অনেক সাহাবী থাকবে। দেশজুড়ে সেই পয়গম্বরের সমালোচনা নিষিদ্ধ হবে, দশ টাকা থেকে শুরু করে সমস্ত টাকায় সেই পয়গম্বরের ছবি শোভা পাবে, দিকে দিকে পয়গম্বরের নামে মসজিদ থেকে শুরু করে মুত্রাগার পর্যন্ত হবে। এবং সেই রাজনৈতিক দলটির বা খলিফার বা সাহাবীদের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচিত হবে। সেই সাহাবী এবং খলিফারা হয়তো সরাসরি কিছুই করবে না, কিন্তু পয়গম্বর, খলিফা এবং সাহাবীদের সম্মান রক্ষার জন্য কিছু জাতীয়তাবাদী মৌলবাদীদের জন্ম হবে, তারা যেভাবেই হোক তাদের সম্মান রক্ষার জন্য নাঙ্গা তলোয়ার হাতে সমালোচক বা বিরোধী পক্ষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাদের কোনও পাপ বোধ হবে না, তারা ভাববে তারা দেশের কাজ করছে, দেশকে রক্ষা করছে,স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করছে। ঠিক যেমনটা ধর্মীয় মৌলবাদীরা ভাবে, যে তারা চাপাতি হাতে মানুষ জবাই দিয়ে নিজ নিজ ধর্মকে বিধর্মী বা নাস্তিকদের হাত থেকে রক্ষা করছে। ধর্মীয় মৌলবাদী এবং জাতীয়তাবাদী মৌলবাদী উভয় প্রকারের মৌলবাদীই বিপক্ষের উপরে অস্ত্র হাতে হামলে পরতে চায়, প্রতিবাদী-সমালোচনামুখর-যুক্তিবাদী-মুক্তচিন্তার অধিকারীর মুখ বন্ধ করে দিতে চায়। তাই উভয়ের চরিত্র একই। তারা কেউই আলোচনার উপযুক্ত নন, যুক্তি তর্কের মাধ্যমে, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা তাদের জন্য নয়। এর কারণ লুকিয়ে আছে এদেশের মানুষের ইতিহাসে।

প্রফেসর লাস্কি বলেছেন, “As power extends, nationalism transform into imperiallism”। জাতীয়তাবাদ পরিপুষ্ট হবার পরে অন্যের ভূমি দখল করা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদীদের অন্যতম প্রধান ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের কোন্দলে আজ পর্যন্ত শত শত কোটি কোটি মানুষের রক্ত ঝরেছে, এখনও ঝড়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর সমাপ্তি হয় নি। পাকিস্তান নামক কিম্ভুত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাঙালি একসময় আন্দোলন করেছিল, সেটা একটি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছিল। সেই সময়ে পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতাগণ একক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আরোপের জন্য আমাদের উপরে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এবং একক মুসলিম জাতিসত্তা নির্মাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। এবং সেটা তারা করছিল পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের আবাদ করবার জন্যে। ইতিহাস সবসময় দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে বিজয়ী রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ওপর কতগুলা নৈতিক দায়িত্ব আরোপ করে, তার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছেঃ
-“যেসব নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সে নিজে লড়াই করে জয়লাভ করেছে, সে যেন ক্ষমতালাভের পরে অন্য কোনও জনগোষ্ঠীর ওপর একই ধরণের নিপীড়ন না চালায়।”
১) ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তানঃ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং হিন্দু বর্ণবাদ-উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে মুসলিমদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা হয়। বিজয়ী বাহিনী ছিল মুসলিম লীগ, উস্কে দেয়া হয় মুসলিম জাতীয়তাবাদকে। জনগণের আশা ছিল এবারে স্বাধীন পাকিস্তানে সব মানুষ নিজেদের অধিকার ফিরে পাবে। মুল আন্দোলনটা কিন্তু করেছিল এই অঞ্চলের সাধারণ খেটে খাওয়া নির্যাতিত মানুষই।
ফলাফলঃ মুসলিম জাতীয়তাবাদ উন্মেষের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সাথে একই আচরণ শুরু করলো যা আগে করতো ব্রিটিশরা এবং উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা। পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিমরা বলতে শুরু করলো, বাঙালি ঠিক প্রকৃত মুসলিম নয়, এবং বাঙালির শারীরিক গড়ন, এই অঞ্চলের ভাষা ও আবহমান সংস্কৃতির কারণেও এক ধরণের জাত্যভিমান সৃষ্টি হলো। বাঙালি মুসলমান মুসলিম হবার পরেও নিজেদের অধিকার পেল না, এই অঞ্চলের হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অধিকার অর্জন তো অনেক দুরের ব্যাপার। মুসলিম লীগ ক্রমশই জনগণের বিরুদ্ধে, পশ্চিমা শাসকদের পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করলো। মুসলিম জাতীয়তাবাদ নামক আরোপিত ধারণা যে ব্যবহারিকভাবে অকার্যকর, তা নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ হতে লাগলো।
২) এরপরে বাঙলাদেশ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধঃ পূর্ব পাকিস্তান বা বাঙলাদেশের মানুষ এরপরে আন্দোলন শুরু করলো, বিকাশ হতে লাগলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। মুক্তিযুদ্ধে দলমত ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই যোগ দিলো, নেতৃত্ব দিলো মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ এবং কিছু বামপন্থী দলসমূহ। বাঙলাদেশের মানুষের দাবী ছিল, তাদের উপরে হয়ে আসা শোষণ ও বঞ্চনার অবসান হতে হবে, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে সকল নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার তারা চাইলো। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হলো, যুদ্ধে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হলো এই অঞ্চলের সাধারণ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান আদিবাসী বাঙালি অবাঙালি সকল মানুষ। তারা ক্ষতি স্বীকার করে নিলো এই আশায় যে, স্বাধীন বাঙলাদেশে তারা নিজেদের অধিকার ফিরে পাবে।
ফলাফলঃ যুদ্ধের পরে আওয়ামী লীগ সরকার বিজয়ের সুফল শুধুমাত্র নিজেদের ঘরে তুললো। তারাও পশ্চিম পাকিস্তানের মতই একই কায়দায় শোষক বনে গেল, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হলো। বাক-স্বাধীনতা হরণ করে জনগণের প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেয়া হলো। রক্ষীবাহিণী গঠন, গুপ্ত হত্যা, গণতন্ত্র হত্যা, নতুন আইনের মাধ্যমে হিন্দুদের জায়গা জমি দখল, আদিবাসীদের বাঙালি হয়ে যাবার পরামর্শ প্রদান, অর্থনীতি ধ্বংস, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং ইসলামি মৌলবাদী দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠতা, ভুট্টোর মত চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের ঢাকায় লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া, শাহ আজিজের মত চিহ্নিত রাজাকারকে ওআইসির প্রতিনিধি করা, তাজউদ্দীনের মত একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সরিয়ে ক্রমশ মার্কিন বলয়ের আওয়ামী নেতাদের ক্ষমতাশালী করা ইত্যাদি শুরু হয়। “আওয়ামী লীগ ছাড়া সকলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে”-এই প্রোপাগান্ডা সৃষ্টির মাধ্যমে তারাও নির্যাতক বনে যায়। যার ফলশ্রুতিতে জিয়া এরশাদের জন্ম হয় এবং তারাও একই কায়দায় শাসন চালাতে থাকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় আদিবাসীদের গণ্য করা হয় নি, আওয়ামী লীগ সহ এরপরের দলগুলো ঠিক একই কায়দায় জনগণের উপরে নির্যাতন চালাতে থাকে।
৩) পচাত্তর পরবর্তী বাঙলাদেশি জাতীয়তাবাদঃ পচাত্তরের পরে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নতুন পোষাকে ফিরিয়ে আনা হলো। জনগণকে বোঝানো হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ ব্যর্থ, প্রমাণ হিসেবে উচ্চকিত করে তুলল আওয়ামী লীগের সীমাহীন ব্যর্থতাকে। জনগণ আওয়ামী লীগের ব্যর্থতাকে ধর্মনিরপেক্ষতা-গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতা ধরে নিয়ে আবারো উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলো। যে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে পায়ে মাড়িয়ে এসেছিল এই অঞ্চলের মানুষ, আবার সেই একই পাকিস্তানের পথেই উল্টোপায়ে ভুতের মত পিছনের দিকে হাটতে শুরু করলো। সেনাবাহিনী থেকে একে একে বের হতে শুরু করলো, জলপাই রঙের কালপ্রিটরা, বের হয়েই তারা ক্ষমতা দখল করতে লাগলো। মুসলিম লীগ-আওয়ামী লীগের তবুও সমালোচনা সম্ভব, কিন্তু পচাত্তর পরবর্তী সেনাকুঞ্জে বন্দুকের ঔরসে জন্ম নেয়া দলগুলো এতটাই হাস্যকর রকমের নির্বোধ যে, এদের সমালোচনাও সম্ভব না।
ফলাফল দাঁড়ালো এইযে, রাজনীতির ময়দান ক্রমশ নষ্টদের অধিকারে চলে গেল। যা নিয়ে আক্ষেপ করার অবকাশও আমাদের রইলো না।
৪) (কাল্পনিক) পার্বত্য চট্টগ্রামে চাপা অসন্তোষঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। তাদের উপরে হয়ে আসা বিভিন্ন সরকারি নির্যাতন এবং সেনাবাহিনীর নিপীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানাতেই হবে। তবে সেই সাথে এটাও সত্য, শান্তিবাহিনী নামক বাহিনীটি আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষার সংগঠন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করলে তারাও একটি আওয়ামী লীগ বনে যাবে এবং অন্যান্য আদিবাসীদের উপরে নির্যাতন চালাবে। চাকমারা সেখানে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাশালী, তাই চাকমাদের একটি ধনী অংশই সব লুটপাট করবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করেছে এই গর্বে তারা পুরো অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে। তারাও ঠিক একই কাজ করবে যা এতদিন বাঙালিরা আদিবাসীদের সাথে করেছে।
ফলাফলঃ শূন্য। সাধারণ জনগণের আন্দোলন, জনগণের স্বপ্ন সর্বদাই ধনীক শ্রেণীর পকেটস্থ ও উদরস্থ হবে। শোষকের চেহারা ও দালাল পাল্টাবে, কখনও বিদেশী, কখনও দেশী, কিন্তু শোষণ চলতেই থাকবে। বিদেশী শোষকের চাইতে বরঞ্চ দেশী শোষকশ্রেণীর দালালেরা বেশি ভয়ংকর, কারণ দেশী শোষক মানুষের মনস্তত্ব বোঝে বলেই জানে কীভাবে আন্দোলন দমন করতে হয়।
অর্থাৎ এত বছরের বিপ্লব বিদ্রোহ আন্দোলন ও সংগ্রামে জনগণের ভাগ্যে কিছুই জুটলো না। যেকোন জাতীয়তাবাদ নিয়ে উস্কানি দেবার আগে জাতীয়তাবাদের আদর্শিক ভিত্তি মজবুত না হলে সেটা টেকে না। অন্ধ আবেগ দিয়ে জাতীয়তাবাদ টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফলাফল শূন্যই থেকে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের পরে বিজয়ী বাঙালি শাসক শ্রেণীর দায়িত্ব এবং কর্তব্য ছিল বাঙলাদেশের সীমানার ভেতরে শত শত বছর ধরে বসবাসরত সংখ্যালঘু জাতিসত্তাভুক্ত নানান জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের যথাযথ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা, তাদের উপরে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিলোপ সাধন করা, নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং বাঙলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো ঠিক রেখে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। একই সাথে, সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপরে নিপীড়ন ও বৈষম্যমূলক আইন প্রত্যাহার করা, কিন্তু সেগুলোকে নতুন নতুন চেহারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে বারবার।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে অবাঙালি পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের একসময় আমাদের দেশেরই বড় মাপের জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা রাজাকার খেতাব দিয়ে, স্বাধীনতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের শত্রু চিহ্নিত করে যুগের পর যুগ ধরে নির্যাতন করেছে। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো তাদের বলেই বসেছিলেন “তোরা বাঙালি হয়া যা”!!! আদিবাসীদের সাথে কি নির্মম পরিহাস!
এর পিছনে প্রভাব অবশ্যই সেই নির্দিষ্ট(বাঙালি) জাতীয়তাবাদী চিন্তা এবং পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের প্রেতাত্মা। বাঙালিদের সাথে যেই আচরণ করেছিল পাকিস্তানীরা, ঠিক একই কাজ ক্ষমতা পাবার পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ আদিবাসীদের সাথে করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র যেমন বাঙালিকে হিন্দুয়ানী বানিয়ে, ভারতের দালাল বানিয়ে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে বঞ্চিত করেছিল, একইভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ সামান্য সংখ্যক আদিবাসী রাজাকারদের দোহাই দিয়ে কয়েকটি নৃগোষ্ঠীকে মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতার শত্রু বানিয়ে, পাকিস্তানের দালাল বানিয়ে শত্রুতে পরিণত করেছিল, বঞ্চিত করেছিল, পীড়ন করেছিল, অধিকার হরণ করেছিল।

এখানে বিশেষভাবে একটি ভুল ধারণা প্রচার করা হয়ে থাকে যে, আমাদের পাহাড়ে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসকারীরা আসলে এদেশের আদিবাসী নয়, বাঙালিই এই অঞ্চলের আদিবাসী। কিন্তু আদিবাসী বলতে কারা আগে থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে তা বোঝায় না। কোন এলাকার সবচেয়ে প্রাচীন জনবসতি ও তাদের সংস্কৃতিকে বোঝাতে আদিবাসী পদটি ব্যবহৃত হয়। কোন জনগোষ্ঠী কোন ধরণের সাংস্কৃতিক, সামাজিক প্রভাবজাত নয় এমন জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়, যারা দীর্ঘসময় ধরে নিজ সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনাচরণ অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বাঙালির সংস্কৃতি এবং জীবনাচরণ কখনই এক রকম ছিল না, নানা ধরণের প্রভাবে তা পাল্টে গেছে, তাই বাঙালি এই অঞ্চলের আদিবাসী নয়, আদিবাসী তারাই যারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি এবং জীবনাচরণ ধরে রেখেছে।

একটি সভ্য রাষ্ট্র যখন তার নৈতিক অবস্থান হারাতে শুরু করে, সেই সুযোগ সর্বদাই গ্রহণ করে প্রতিক্রিয়াশীলরা।এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীগনের প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ৭৫ এ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে মৌলবাদী শক্তিগুলো, বাঙলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিগুলো। তখন আবার এক ভিন্ন জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করা হলো,যেটা আগের জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকেই নিকৃষ্ট। এর দায় যতটা মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতার, বাঙালি জাতীয়তাবাদীগনের দায়ও কম নয়।
ধর্ম বা জাতীয়তাবাদ সর্বদাই খারাপ বিষয় নয়, প্রাচীনকালে ধর্মের গুরুত্ব ছিল, এখনও কোন কোন ভাবে জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব রয়েছে। তবে ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের উপরে বিশ্বমানবতাবাদকে স্থান না দিলেই সমস্যা সৃষ্টি হয়, মানুষে মানুষে সংঘাত দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়। ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ দ্বারা দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে ফেললেই বিপদ, বস্তুতপক্ষে এই দুই দেয়াল চারিদিকে তুলে দিলে অনেক কিছুই আর দৃষ্টিগোচর হয় না। আর রাজনীতির সাথে এই ধরণের যুক্তিহীন ভক্তিবাদী অনুভূতির মিশেল সবচাইতে ভয়াবহ জিনিস।

প্রাচীনকালে ধর্মের নামে জনগণের ভেতরে বিভেদ তৈরি করে এবং জিইয়ে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছিল, সাম্রাজ্য ও অর্থনৈতিক শ্রেণী সৃষ্টি করা হয়েছিল। ধর্ম যখন আর মানুষকে আটকে রাখতে পারছে না,তখন জাতীয়তাবাদী চেতনা দিয়ে জনগণকে আবারো বিভক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলো। একটি দেশের মানুষ যখন হিন্দু-মুসলিম-খ্রীষ্টান-বৌদ্ধ অথবা বাঙালি, চাকমা, সাওতাল, এইসব বিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদেরকে মানুষ ভাবতে না পারবে, সেই দেশের নৈতিক এবং আদর্শিক বুনিয়াদ শক্তিশালী হবে না।ধর্মবাদীরা অনবরত ধর্মীয় বিভক্তি সৃষ্টি করে শোষণ করবে, জাতীয়তাবাদীরা অনবরত ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করে জনগণকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করবে। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান বা নারী পুরুষ বা বাঙালি চাকমা মারমা হওয়ার চাইতে মানুষ হওয়া অনেক বেশি জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ভাষাকে মূল্যায়ন করা, তাদের স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়াও মানুষ হিসেবে প্রয়োজনীয়।

যেমন ইউরোপীয় ইতিহাসে বর্ণিত “মানুষের আমেরিকা আবিষ্কার” – শব্দটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের বর্ণবাদী ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদী চিন্তা, তার মানে হচ্ছে আমেরিকার আদিবাসীদের ইউরোপীয়রা আদৌ মানুষ হিসেবে গণ্য করতেই নারাজ। আধুনিক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জনক সাম্রাজ্যবাদী কলম্বাসের নাম এখনও পৃথিবীর নানা দেশে বীরের মত করে নেয়া হয়। অথচ সত্য হচ্ছে, কলম্বাস নিজ দেশে কখনই কিছু করতে পারেন নি, আমেরিকায় যাবার পরে কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জ নামের এক ধরনের বিনিময়প্রথা চালু করেছিলেন তিনি। যেই বিনিময় প্রথা দিয়ে সেখানকার আদিবাসীদের ঠকিয়ে তাদের সম্পদ, জমিজমা লুটে নিতেন কলম্বাস। এমনও হয়েছে, জাহাজে ফেলে দেয়া তুচ্ছ ময়লা খেলনার বিনিময়ে তারা আদীবাসীদের বিপুল জায়গা জমি লুটে নিতেন, সেই অঞ্চলের আদিবাসীদের কাছে ঐ ধরণের খেলনা নতুন, তাদের কলম্বাস বোঝাতেন এই খেলনা বিশেষ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপুর্ণ এবং তাৎপর্যবহ। ঠিক যেমন আজকের দিনে জাতীয়তাবাদী উত্তেজনায় আমাদের সরকার গুলো পশ্চিম থেকে পুরনো রদ্দি আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেয়া অস্ত্র বিপুল অর্থ ব্যয় করে কিনে আনেন। আধুনিক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে কি অদ্ভুত মিল! আর মিল থাকবে না-ই বা কেন? আজকে যারা আমরা আমেরিকাকে চিনি, আমেরিকার মানুষ বলতে যা বুঝি, তারা আদৌ আমেরিকার আদিবাসী নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে উড়ে আসা এই সব মানুষ আমেরিকায় একটি মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, আদিবাসীদের জায়গা জমি ক্রমশ দখল করে তাদেরকেই সেই দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে, তাদেরকে রীতিমত উচ্ছেদ করা হয়েছে। আর এরপরে তারাই আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভিনদেশ থেকে আগত মানুষদের অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে নির্যাতন করছে, নিপীড়ন করছে। কলম্বাস আদিবাসীদের বোঝাতেন, আদিবাসীদের সভ্য ভদ্র হতে হবে, খ্রিষ্টান হওয়া ছাড়া কিছুতেই সভ্য হওয়া সম্ভব নয়। কলম্বাস এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা সেই অঞ্চলের আদিবাসীদের ইউরোপে এমন অসভ্য রূপে উপস্থাপন করেছেন যে, তা শুনলে মনে হবে আমেরিকান আদিবাসীরা এক একজন নরখাদক বিশেষ। কলম্বাস বলতেন তাদের কোন ধর্ম বিশ্বাস নেই, অথচ সেই সময়ে আমেরিকার আদিবাসীরা লোকজ ধর্ম পালন করতো, যা হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এবং সে অঞ্চলের মানুষের মৌলিক সংস্কৃতি, প্রকৃতিপূজার ফলাফল। একহাতে ক্রুশ আরেক হাতে ইউরোপের পতাকা নিয়ে আমেরিকায় ঢুকে পরা কলম্বাস যেন এই সময়ের জর্জ বুশের মূর্ত প্রতিচ্ছবি, আমেরিকার আদিবাসীদের সভ্যতা সংস্কৃতি কৃষ্টি সব কিছু ধ্বংস করে দিয়ে ইউরোপে সম্পদের পাহাড় জমানোর যেই অশুভ কৌশল, যেই বাণিজ্যিক কৌশল তখন ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রচলিত হয়, তার দ্বারা আমরা আরও ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। লক্ষ লক্ষ আদিবাসীকে কলম্বাসের আগমনের পর থেকে জীবন দিতে হয়েছে, নিজেদেরই মাটিতে তাদেরকে দাস করে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তাই আমেরিকার আদিবাদীরা আমাদের থেকে দুরের কেউ নয়, তারা আমাদেরই স্বজন, আমাদেরই আত্মীয়। একইভাবে পৃথিবীর প্রতিটি শোষিত নির্যাতিত মানুষের তাই এখন এক হবার সময় হয়েছে, রুখে দাড়াবার সময় হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে। কারণ এছাড়া আমাদের আর কোন পথ খোলা নেই। আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতীওয়তাবাদী চেতনা এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ করে একে অপরকে হত্যা করা সাম্রাজ্যবাদের এক অশুভ কৌশল, সেই ডিভাইড এন্ড রুল পদ্ধতি। এই অশুভ কৌশলের বিরুদ্ধে সমস্ত বিশ্বের মানুষের এক হতেই হবে। আজ আমেরিকায় গেলে কোন আমেরিকান আদিবাসী চোখে পরে না। একটা সময় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, সৃষ্টি করা জাতীয়তাবাদ এবং আব্রাহামিক ধর্মের আধিপত্যবাদ আমাদের সবাইকেই গ্রাস করবে, আমরা এখনই রুখে না দাড়ালে আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস সব বিলীন হয়ে যাবে।

বাঙলাদেশি, ভারতীয়, রাশিয়ান, আমেরিকান, আফ্রিকান, সকলেই একই মানব পরিবারের সদস্য, তারা সকলেই আনন্দ পেলে হাসে, দুঃখ পেলে তাদের অশ্রু ঝরে। ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী চেতনা ধারণ করে নিজের ধর্মের বা জাতির শ্রেষ্ঠত্বের দাবী বিজ্ঞাপনের রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের মিথ্যাচারের মতই অনর্থক এবং হাস্যকর। মানুষ শ্রেষ্ঠ হয় তার জ্ঞানে, তার মেধায়, তার চিন্তা চেতনায়, তার শিক্ষায়; জাতীয়তা বা ধর্ম পরিচয়ে নয়। কারণ জাতীয়তা বা জন্মসূত্রে পাওয়া ধর্ম পরিচয় মানুষের অর্জিত নয়। তাই কোন বিশেষ ধর্মের বা জাতীয়তাবাদের সমর্থক হওয়া বা তা নিয়ে গর্বিত হওয়ার মধ্যে কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আর কোন ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে রুখতে আরেক জাতীয়তাবাদের দ্বারস্থ হওয়াটাও বিপদজনক, কারণ মানুষের যুক্তিবোধ ও মননশীলতার বিকাশ না ঘটলে সেটাও আরেক মৌলবাদের সৃষ্টি করতে পারে।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে ছোটবেলা থেকেই কোন বিশেষ ধর্মের বা রাজনৈতিক চেতনার জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটানোর নিরন্তর চেষ্টার চাইতে মানুষের ভেতরের যুক্তিবোধ ও মননশীলতার বিকাশ ঘটানো ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবই বেশি জরুরী। তারপরেও যে তা একেবারে নিষ্কলুষ হবে সে কথা বলা যায় না, কারণ সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যেও ব্রাহ্মণ এবং নমঃশূদ্রের মত বর্ণপ্রথা এখনও বিদ্যমান। সেই সাথে ছোটবেলা থেকেই তাদের ভেতরে জাতি কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা ধর্মের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। পরবর্তীতে সে যদি কোন দেখে শুনে বুঝে যাচাই করে বিশেষ কোন ধর্মের অনুসারী হতে চায়, অথবা কোনটাই না চায়, তবে তাকে সেই স্বাধীনতা দিতে হবে। এবং সে যদি জাতি বা রাষ্ট্রের কোন প্রথা, সংস্কৃতি কিংবা নিয়ম নীতি বা আদর্শকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর মনে করে, সেই সমালোচনাও তাকে করতে দেয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের স্বাধীন মতামত এবং চিন্তাশীলতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। আর গণতন্ত্রের ভিত্তিই যদি দুর্বল থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের সম্পদ হয় সাম্রাজ্যবাদীদের পকেটে যাবে, নতুবা নব্য ধনিক লুটেরা শ্রেণী জনগণের সম্পদ লুটে খাবে। মার্ক্স বলেছিলেন, working men have no country, সেভাবে যায়, একজন মুক্ত মানুষের কোন দেশ নেই। পুরো পৃথিবীটাই তার দেশ, পুরো পৃথিবীর মানুষই তার স্বজন। মানুষ তাদের ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধ দেয়াল ভেঙ্গে বেড়িয়ে আসুক। মানুষের মেধা এবং মননশীলতা অসীম, ক্ষুদ্র জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় সীমাবদ্ধ বৃত্ত মানুষের সম্ভাবনার তুলনায় অনেক ক্ষুদ্র।

বিঃদ্রঃ বেশ পুরনো লেখা, খণ্ড খণ্ড ভাবে পূর্বে সামহোয়্যার ইন ব্লগ এবং ফেসবুকে প্রকাশিত।

[742 বার পঠিত]