কার্যকারণ ও প্রয়োজনীয়তা

By |2014-03-06T18:52:35+00:00মার্চ 6, 2014|Categories: দর্শন|7 Comments

গভীর ভাবে কার্যকরণ ভেবে ভেবে বের করার একটা উপকার হচ্ছে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে আপনার একটা স্বচ্ছ দৃষ্টি আসবে যা আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করবে এবং বিভিন্ন আলোচনায় বাকপটু করে তুলবে। ‘কারণ’ বলতে আমি বুঝিঃ দুটি ঘটনা যদি পরম্পরায় ঘটে তাহলে প্রথম ঘটনাটিকে আমরা দ্বিতীয় ঘটনার কারণ বলি। ‘কারণ’ আমার বিচারে নিজে একটা ঘটনামাত্র। এজন্যে কারণেরও কারণ থাকে এবং আমরা একটা ঘটনার পুংখানুপুংখভাবে বিশ্লেষণ করলে একটু একটু করে পেছনে যেতে থাকি এবং বের করতে থাকি এর পেছনের পরম্পরায় ঘটা ঘটনাগুলো। দুটি ঘটনা যদি আমরা সবসময় দেখি যে পরম্পরায় ঘটছে এবং আমাদের পর্যবেক্ষণে এর যদি কোন ব্যতিক্রম না ঘটে তাহলে আমরা তাদের কার্যকারণ সম্পর্ক তুলে রাখি এবং সূত্রবদ্ধ করি। যদি একটি ঘটনা ‘ক’ ঘটে এবং সাথে সাথে এর পরই ঘটে আরেকটি ঘটনা ‘খ’, আমাদের পর্যবেক্ষণে যদি এটি বারবার এই নিয়মে ঘটে তাহলে আমরা বলি যে ‘খ’-এর কারণটি হচ্ছে ‘ক’ অথবা ‘ক’-এর ফলাফল ‘খ’। অন্ধকারে বাতি জ্বালালে ঘর আলোকিত হবে। প্রথম ঘটোনাটি বাতি জ্বলা এবং দ্বিতীয় ঘটনাটি আলোকিত হওয়া। কেউ যদি আমাদের ঘটনা দুটি ঘটার পর জিজ্ঞাসা করে ঘর আলোকিত হবার কারণ কি আমরা কোনরকম দ্বিধা ছাড়াই বলবঃ- আলো জ্বালিয়েছি। কোন ঘটনা ঘটে গেলে আমরা যখন এর পেছনে যুক্তিগুলো খুঁজি এর মানে আমরা এর পেছনের কারণগুলো খুঁজি; এবং এর আরেকটি মানে আমরা এর পেছনের ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কযুক্তভাবে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা খুঁজি। যুক্তি আমার কাছে একক ঘটনার সমাবেশ ছাড়া কিছুই নয়।

একটি ঘটনা যখন ঘটে এবং এর প্রভাব যদি অন্য কোন ঘটনার ওপর ক্রিয়া করে তাহলে দুটি মিলিতভাবে আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয় । শেষের যে ঘটনা ঘটে তার জন্যে আমি দায়ী করি পূর্বের ঘটনাটিকে (যদি জানা থাকে)। এটা পৃথিবীর সমস্ত ঘটনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর উদাহরণের জন্যে বেছে নিবো কয়েকটি মোটা দাগের উদাহরণ। আমি ঠিক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি হঠাত কিছু ময়লা পানি পড়লো আমার গায়ে। প্রথমে আমি বিরক্ত হলাম ময়লা পানির উপর (ঠিক যখন জানলাম না এর পেছনের কারণটি কি)। যখন উপরে তাকিয়ে দেখলাম এর পেছনের ঘটনাটি একটি লোকের বালতিতে ময়লা পানির নিক্ষেপণ সাথে সাথে আমি দায়ী করে ফেলি সে লোকটির কর্মকে; এবং আমরা আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে দোষারোপ করি ঐ লোকটিকেই কারণ ওনার কর্মের কারণ উনি নিজে। যদি এরকম ঘটনা ঘটে, লোকটি আন্তরিকভাবে আমাকে দুঃখিত বলে এবং ক্ষমা চায় এই বলে যে উনি একদমই দেখতে পান নি কারণ অন্যমনস্ক ছিলেন, তাহলে আমি দোষারোপ করি সেই লোকের অন্যমনস্কতাকে। আমি যদি বদরাগী হই তাহলে এই অন্যমনস্কতাকে দোষারোপ করি, আর যদি প্রতিশোধপরায়ন হই তাহলে দায়ী করি ঐ লোকটিকেই কারণ অন্যমনস্কতা কর্মটি করা হয়েছে লোকটি দ্বারাই। তবে আমি যদি একটু সহমর্মী এবং সহানুভূতিপরায়ন হই তাহলে সাথে সাথে ক্ষমা করে দেই লোকটিকে এবং দায়ী করি অন্যমনস্কতাকে এবং একটু উদার হয়ে ভাবি, অন্যমনস্কতা ঘটতেই পারে। এবার আমি দায় চাপিয়ে দেই স্বাভাবিকতার উপর। স্বাভাবিকতার ওপর দায় চাপালে আমাদের রাগ কেনো যেনো নেমে যায়। তাই আমরা আমাদের বিভিন্ন অপরাধ এবং নিন্দামূলক কাজকর্মকে স্বাভাবিকতার দোহাই দিয়ে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করি। আমাকে যদি কেউ অহংকার লালন করার জন্যে সমালোচনা করে তাহলে সাথে সাথে আমি দেরী না করে বলে ফেলি, এখন কে না করে? কোন ড্রাগ এডিক্টেড ব্যাক্তি যদি এরকম একটা সার্কেল গড়ে নেয় যে সেখানে সবাই ড্রাগ এডিক্টেড তাহলে সেই সার্কেলের সামনে সে নিজেকে কখনো অপরাধী মনে করবে না কারণ সেখানে সেটাই স্বাভাবিক। ‘স্বাভাবিক’ বলতে আমি বুঝাচ্ছি যেটা ঘটার ঘনত্ব বেশি অথবা যেটা অহরহ ঘটে। আবার সেই ড্রাগ এডিক্টেড লোকটি পরিবারের সামনে নিজেকে অপরাধী ভাববে। একটা গাঁজা সেবনকারীর গ্রুপে তর্কের লড়াই চলে কার চেয়ে কে বেশি গাজা টানতে সক্ষম এটা প্রমাণ করার জন্যে। আবার সে ব্যক্তিই তার পরবারকে বিভিন্নভাবে প্রমাণের চেষ্টায় থাকে যে সে গাঁজা খায় না। এ উদাহরণের মাধ্যমে আমি এটা বুঝাতে চাচ্ছি যে কোন ঘটনার দায় মানুষ মানসিকভাবে বহন করে সে ঘটনার স্বাভাবিকত্ব দ্বারা। আমার খালাত বোনের বাসার গৃহ পরিচারিকা হলিউডের সিনেমায় খোলামেলা ড্রেস পরিহিত মেয়েদের দেখে ছিঃ ছিঃ করে উঠে কারণ তার কাছে মনে হয়েছে বাস্তব জীবনে এ-চলাফেরা অস্বাভাবিক সুতরাং ব্যাক্তির এখানে দায় আছে। আমার খালাত বোন তাকে যুক্তি দেখায়, তাদের সমাজে এটাই স্বাভাবিক। এখানে আমার খালাতবোন মানসিকভাবে মেয়েটিকে কোনভাবে দায়ী করে না। তাছাড়া আমাদের দেশে ঘুষখোর পুলিশকে সামান্য মুখ ভেংচানো ছাড়া কেউ খুব নেতিবাচকভাবে তাকে নেন না। কারণ আমরা এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি। আমরা তখনই একটা জিনিসকে স্বাভাবিক বলি যখন কোন ঘটনা ঘটার সম্ভাব্যতা বেড়ে যায়।

পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আমি প্রথমে সরাসরি দোষারোপ করলাম ময়লা পানিকে। যখন জানলাম এর পেছনে রয়েছে আরেকটি কারণ সাথে সাথে দায়ী করলাম সেই কারণটিকে। আমার উদাহরণের সাথে সংগতিপূর্ণ সেই কারণটি হচ্ছে একটা লোকের পানি ফেলা। যখন একটা লোককে দায়ী করবার পর আমি জানতে পারলাম এই লোকটির ঠিক এভাবে কাজটি করার মূলে রয়েছে অন্য একটি কারণ যা লোকটিকে প্রভাবিত করেছে সাথে সাথে আমরা দায় তুলে নিই সে লোকটি থেকে এবং দোষারোপ করি আমার বুদ্ধি দিয়ে বের করা সবচেয়ে পূর্বের কারণটিকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে লোকটির উপর থেকে দায় সরানোর দুটি উপায়ঃ ১- এমন একটি কারণ খুঁজে বের করা যেটি লোকটি নিয়ন্ত্রণ করছে না; করছে অন্যকিছু। ২- ঘটনাটির দায় স্বাভাবিকত্বের ঘাড়ে ফেলে দেয়া।

এবার আমি সামান্য অন্যদিকে সরে যাব। আমরা নিয়মিত নানারকম ভালো-খারাপ কাজ করি। আমার সমস্ত ভালো এবং খারাপ কাজের সার্টিফিকেট দিচ্ছে অপর মানুষরা যারা আমার কাজটি সম্পর্কে জানতে পেরেছে। এই ভালো-খারাপ নামকরণ মূলত দুভাবে হচ্ছেঃ কাজটি যদি অপরের চাহিদা পূরণ করে তাহলে এটি ভালো এবং যদি অপরের চাহিদা পূরণের বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে খারাপ। আমি নিজেও ভালো খারাপের সংজ্ঞা এভাবেই নির্ধারিত করি। আমি ঠিক এটা বলতে চাচ্ছি না একজন ব্যক্তি মানুষ খুব সচেতনভাবে এই কাজটি করে, আমি যেটা ইংগিত করতে চাচ্ছি ভালো খারাপ শব্দদ্বয়ের উৎপত্তি এভাবেই সমাজে বিস্তার লাভ করেছে। আমি আর এটিতে বিশ্লেষণে যাব না তবে একটি উদাহরণ দিবো। আমার যখন সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে তখন আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হই আমাকে সিগারেট খেতে দিলেই। যে সিগারেট সরবারহ করে সে আমার দৃষ্টিতে তখন খুবই ভালো মানুষ। সমাজে একারণেই উদারতা ভালো এবং স্বার্থপরতা খারাপ। আপনি উদার হলে আপনার দ্বারা আমার উপকৃত হবার সম্ভাবনা অনেক তাই আমি আপনাকে ভালো বলে আখ্যায়িত করেছি। একজন উদার মানুষ সর্বদাই অপরের চাহিদা পূরণ করতে সাহায্য করে।
আমরা দৈনন্দিন জীবনে এরকম অনেক ভালো মন্দ কাজ করি। কেউ আমাদের দোষারোপ করলে প্রথমেই আমরা যা করার চেষ্টা করিঃ আত্মপক্ষ সমর্থন করি। যে ব্যক্তি আমাকে দোষারোপ করেছিলো সে সেটা করেছিলো একমাত্র আমার কর্মের প্রভাবের জন্যেই। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে আমি নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করলাম। এটা আমি ঠিক সেই দুভাবেই করিঃ প্রথমত, এর এমন একটা কারণ দেখানো যা আমার নিয়ন্ত্রনে ছিলো না কিন্তু আমার কর্মের ওপর প্রভাব ফেলেছে। দ্বিতীয়তঃ কোনভাবে প্রমাণ করা এটা ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

আমি এতক্ষণ সম্ভবত এটা বলতে চেষ্টা করছি মনস্তাস্তিকভাবে আমরা কেউকে দোষী অথবা নির্দোষী করি সেটা খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। ইদানিং এটি আমাকে খুব ভাবাচ্ছে এ জন্যে যে এটির ফলাফল একই সাথে ভয়ংকর এবং বেশ কিছু হতাশা তৈরী করতে পারে। আমরা যখন তর্ক করি আমরা নিজের অবচেতনে খুবই সূক্ষ্মভাবে এই দুটো টেটনিক ব্যাবহার করি এবং অপর পক্ষকে পরাজিত করি। দ্বিতীয় কৌশলটির একটি নাম দেয়া হয়ে গেছে ফ্যালাসি হিসেবে। কিন্তু প্রথমটির দেয়া হয় নি। এবং প্রথমটি কোন ফ্যালাসি নয় এটিই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির নীতি এবং আমরা সর্বক্ষেত্রে এভাবেই চিন্তা করি। এটি আমাদের মনোজাগতিক ত্রুটি নয়। প্রথম কৌশলটি কিভাবে তর্কে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যাবহার করা হয় এটা ব্যখ্যার আগে আমি ছোট করে আরেকটা বিষয় বলতে আগ্রহী যাতে আমরা এভাবে ভাবতে পারি এটি আমাদের মনোজাগতিক ত্রুটি নয়।

আমরা প্রকৃতিতে দেখি প্রত্যেকটা ঘটনার পেছনে অবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত থাকে আরেকটা ঘটনা বা তার প্রভাব যেটিকে আমরা বলি সে ঘটনার কারণ। কোন ঘটনা আমাকে প্রভাবিত করলে আমি প্রথমে দায়ী করি সে ঘটনাকেই যতক্ষণ-না-পর্যন্ত আমরা সেই ঘটনার কারণ না জানি। কারণ জানার পর আমরা সাথে সাথে দায় চাপাই সেই কারণটিকে। আমরা সূত্রবদ্ধ করি সম্পর্কযুক্ত ঘটনাকে। একটি ফুটবলকে ছুটতে দেখলে আমরা বুঝে ফেলি এটিকে কেউ চালিত করেছে। কোন জিনিস এমনি এমনি চলে না এর একটি কার্যকারণ থাকবেই। সুতরাং যে কাজটি ঘটিয়েছে এ-ঘটনার দায় তারই। এখানে যা আমরা বলতে পারি কোন ঘটনা তখনই পরিবর্তন হয় যখন সেটা অন্য কোন ঘটনা দ্বারা সম্পর্কিত হয়। তার মানে কোন ঘটনা ঘটার জন্যে কখনো সে ঘটনাটি নিজে দায়ী নয়; দায়ী আরেকটি ঘটনার ঘটন। আবার সে আরেকটি ঘটনার ঘটনের জন্যে দায়ী সম্পর্যুক্ত আরেকটি ঘটনার ঘটন। এভাবে আমরা আরো পেছনে যেতে পারি। যতটুকু সম্ভব এরকম ঘটনার ঘটন খুঁজে বের করার চেষ্টা করি; অথবা যে পর্যন্ত আমরা সমর্থ্য হই আমরা সে শেষ ঘটনাটিকে দায় দেই।
অবশেষে আমরা যে তত্ত্বটি খুঁজে বের করতে সমর্থ্য হলাম, আমরা ধরে নিতে পারি,- কোন ঘটনার ঘটার জন্য সে ঘটনা নিজে দায়ী নয়।

মানবমন সম্ভবত অবচেতনে এটা গেঁথে নিয়েছে তাই কোন ঘটনার কারণ খুঁজে পেলেই সে সাথে সাথে দায়ী করে এর ঠিক আগের ঘটনাটি যেটিকে সে মনে করে ঠিক এটার কারণেই ঘটনাটি ঘটেছে। আমি এটিকে শাশ্বত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি মানবমন এভাবেই ঘটনাগুলোকে সূত্রবদ্ধ করে এবং তাদের ভেতর সম্পর্কের ভিত্তিতে নিয়ম সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। পরবর্তিতে সে প্রথম ঘটনাটি জেনেই দ্বিতীয় ঘটনাটি সম্পর্কে আগাম বলে দিতে পারে। এর উপকার আমরা পেয়েছি। আমরা রাস্তা থেকে একটা ভারী বস্তু ঢেলে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য সফল করারা ভবিষ্যৎবাণী করতে পারি কারণ আমরা জানি বল প্রয়োগের সাথে বস্তুর অবস্থান পরিবর্তনের এক পারস্পারিক সম্পর্ক আছে। আমরা রাতে নিশ্চিত হয়ে ঘুমোতে পারি আগামীকাল সূর্য পূর্ব দিকে উঠবে বলে। আমাদের সারা জনমে দেখা যতগুলো ঘটনা আছে সবগুলোর পেছনে একটা কারণ খুঁজে পাই এজন্যেই আমাদের মানব মন এমন একটা ধারণা তৈরী করে নিয়েছে যে প্রত্যেকটা ঘটনার কারণ থাকতেই হবে। যদিও কোয়ান্টাম মেকানিক্স এখন বলছে অনেক ঘটনার পেছনেই কারণ থাকে না যেমন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এজন্যেই যে আমাদের মস্তিস্ক সিদ্ধান্ত নেয়ার নিয়ম লিপিবদ্ধ করে অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। কোয়ান্টাম পর্যায়ের কোন ঘটনা এখনো আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি নি তাই মানবমন প্রস্তুত নয় সরাসরি এমন কল্পনা করা যে, কার্যকারণ ছাড়া কিছু ঘটা সম্ভব।

উপরের কথাগুলোর মাধ্যমে আমরা ইন্ডিরিক্টলি সিদ্ধান্তে আসতে পারি, মানুষ কোন ঘটনার কারণকে দায়ী করার প্রবনতা কোন মানোজাগতিক ত্রুটি নয়; এটিই প্রক্রিয়া। (একটু সচেতনভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে আমি স্বাভাবিকত্বের দোহাই দিয়ে সমস্ত দায় চালিয়ে দিলাম মস্তিস্কের প্রক্রিয়ার উপর; মস্তিস্কের উপর নয়)

তর্কের ভেতর যেটা হয়ঃ

দু’জনের উপর একটা বিষয়, ধরা যাক, সমাজ নিয়ে কথা হচ্ছে। একজন সমাজের এই পরিণতির জন্যে দায়ী করছে দেশের মৌলবাদীদের। আরেকজন যুক্তি দেখিয়ে বলল, মৌলবাদীদের তো দোষারোপ করা যাচ্ছে না কারণ এর পেছনে দায়ী দেশের শিক্ষাব্যাবস্থা। সাথে সাথে মৌলবাদীদের দোষ লাঘব হয়ে গেলো। এখানে জিতে গেলো দ্বিতীয় ব্যাক্তি কারণ প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় জনের যুক্তি স্বীকার করে নিয়েছে যেহেতু সে দেখেছে কার্যকারণ সম্পর্ক; এবং প্রথম ব্যাক্তি হেরেছে এজন্যে যে, সে যে বলেছিলো মৌলবাদীরাই দায়ী সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়েছে। তবে প্রথম ব্যাক্তি তখনই একটা জেতার সুযোগ পাবে যখন সে দেখাতে পারবে যে কার্যকারণ সম্পর্কের প্রথম ঘটনাটি শিক্ষ্যাব্যাবস্থা না; একান্তই মৌলবাদীদের। যদি তার ধারণা সত্যি হয় ব্যপারটা এরকম দাঁড়াবে যে মৌলবাদীরা অন্যের দ্বারা চালিত অন্য কোন ঘটনার শিকার হয়ে মৌলবাদী হয় নি। আমরা এ-ধারণার সাথে পরিচিত নই। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ঘটনা নিজে চালিত হতে পারে না। এখানে সবসমইয়েই দ্বিতীয় লোকটি তার যুক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে কারণ সে দেখিয়েছে ‘কারণ’। আরেকজন যদি তৃতীয় ব্যক্তি থাকে যে দেখালো শিক্ষ্যা ব্যবস্থা এরকম হওয়ার কারণটা আবার অন্য জায়গায় তাহলে দ্বিতীয় ব্যক্তি বিশ্লেষক হিসেবে পিছিয়ে পড়বে। বিশ্লেষক হিসেবে সেই এগিয়ে থাকে যে যতদূরের কারণগুলো একে একে খুঁড়ে বের করে আনতে পারে।
আপাতত এটুকু পর্যন্ত পুরো ব্যপারটিকে নির্দোষ মনে হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তিতে এটি আর নির্দোষ থাকে না যখন কোন ঘটনাকে কিভাবে না ঘটতে দেয়া যায় সে বিষয়ে ভেবে পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করলে। আমরা গভীরে যেতে যেতে সমস্ত কিছুকে নির্দোষ ভেবে বসে থাকি এবং অবশেষে হতাশ হয়ে বসে থাকি এই ভেবে যে ঘটনাগুলো থামাতে হলে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এভাবে একজন খুনীকেও নির্দোষ করা যায়। এ-ব্যপারে আরো বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ আছে এবং সেটা আমি পরবর্তিতে করার চেষ্টা করবো।

আমি তর্ক ঘৃণা করি এই কারণে যে তর্ক থেকে আসা সিদ্ধান্তগুলো শেষ সিদ্ধান্ত নয়। আরেকটা নতুন ‘কারণ’ খুঁজে পেলেই নতুন আরেকটি সিদ্ধান্তের সূচনা হবে। এজন্য আমি সমস্যা সৃষ্টিকারী শেষ ঘটনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পক্ষে। উদাহরণস্বরুপ, বর্তমানে মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে ঠিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ‘কারণ’-এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সমস্যা এই যে বাস্তব জীবনে ঘটা ঘটনাগুলোর কারণ বিভিন্ন দিকে থেকে অসংখ্য জালের মত বিস্তার করে আছে। দাঁড়ালে সবগুলোর বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে। সমস্যার ইমিডিয়েট প্রতিবাদের জন্যে আমাদের পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকে না। সময়ের সাথে সাথে এজন্যেই আন্দোলনের দাবী দাওয়া বাড়তে থাকে। কারণ সময় বারবার সাথে সাথে সময় সাহায্য করে একাধিক কারণগুলো খুঁজে খুঁজে বের করবার। আমি খেলাচ্ছলে প্রতিবাদ কিরকম হবে এর একটা গণিত করার চেষ্টা করেছি। এটি পরবর্তিতে পোস্ট করা হবে। বিষয়টি বাস্তবিকই খেলাচ্ছলে করা হয়েছে। [কারণ খুঁজে খুঁজে প্রতিবাদ করা হারাম এমনটি আমি বলি না; বলতে চাইছি এটা মাঝে মাঝে সমস্যারও তৈরী করার একটা সুযোগ রাখে। দেখা যায় সমস্যা মোকাবেলা হচ্ছে না। কোন কিছুর বিরুদ্ধে সামান্য রিস্ক নিয়ে না দাঁড়ালে সমস্যা অনেক সময় সমস্যাই থাকে]

কিছুদিন আগে আমরা জানি ঐশী নামের একটা মেয়ে তার পিতা মাতাকে খুন করেছে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে। ঘটনাটি খুবই নাজুক যখন দেখা যায় ঐশী তার পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে কফিতে ঘুমের ঔষুধ মিশিয়ে। আমি এর পরবর্তি প্রতিক্রিয়াগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছি। ঔশীর প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের দুটি কারণঃ ১- পিতা-মাতার হত্যাকারী, ২- ড্রাগ এডিক্টেড। মানুষ এ-দুটো কারণের সমন্বয় করে প্রতিক্রিয়ার কারণ হিসেবে দেখালো ‘কিলার বিং ড্রাগ এডিক্টেড’। প্রতিক্রিয়া জনপ্রিয় হবার দুটি কারণ (আমার দৃষ্টিতে)ঃ ১- মানুষ এখানে একধরণের বিশ্বাসঘাতকতা খুঁজে পেয়েছে। ২- ঘটনাটি রোমঞ্চকর ছিলো কারণ এটি ঘটিয়েছিলো এক কিশোরী যা সাধারণের প্রত্যাশার বাইরে ছিলো। সম্ভবত কোন যুবক নেশা করে এসে রাগের মাথায় তার বাবা-মাকে মেরে ফেললে এত প্রতিক্রিয়া হতো না। আমি ব্যাক্তিগতভাবে বলতে গেলে এরকম ঘটনার খবর প্রায়ই শুনি।

প্রথমদিকে এ-খুনের ঘটনার জন্য পুরোপুরি দায়ী করা হলো মেয়েটিকে; যেভাবে আট দশটা প্রতিক্রিয়া ঘটে, আমার গায়ে ময়লা পানি পড়ার মত। অনেকে খুব উতসাহী হলে ঐশ্বীকে গালি গালাজ করলো; অবশ্য কেউ কেউ ফাঁসির দাবি জানিয়েছিলো। ফাঁসির দাবি অস্বাভাবিক হলেও ঐশ্বীর ওপর দায় চাপানো অস্বাভাবিক ছিলো না কারণ ঘটনাটি ঘটিয়েছিলো ঐশ্বীই। অনেকে পরবর্তিতে মিশ্র অনুভূতিতে ভুগেছেন; তবে আমি আমার মতামত থেকে কখনোই খুব বেশি দূরে সরে যাই নিঃ কর্মের দায় কেবল ব্যাক্তিরই। ঘটনাটির পরের দিনের পরের দিন প্রতিক্রিয়া একটু ঠাণ্ডা হলো এবং সাধারণভাবেই মানুষজন বিশ্লেষণে যেতে চাইলো ঘটনার। ঐশ্বীর কৃত কর্মের একটি কারণ বের করা হলো। ফলস্বরুপ যারা ঐশ্বীকে গালিগালাজ করেছিলো তারা সমস্ত গালিগালাজ সরিয়ে নিলো ঐশ্বীর বাবা-মায়ের ঘাড়ের ওপর। ঐশ্বীর এরকম বখে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো তার বাবা-মায়ের ট্রিটমেন্টকে। অনেকে এও বলেছে তার বাবা-মা তাদের নিজস্ব কৃত অপরাধের শাস্তি পেয়েছে। শেষের বাক্যটি শুনতে আমার খারাপ লেগেছিলো এবং আহত হয়েছি। এরপর আমি কিছুক্ষণ ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি, ঐশ্বীর বাবা-মায়ের এরুপ ট্রিটমেন্টকে একটি ঘটনা ধরে এর আরেকটি কারণ খুঁজে বের করা যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একটি কারণ খুঁজতে চাইছিলাম যেখানে বাবা-মায়ের এরকম ট্রিটমেন্টের জন্য দায়ী থাকবে ঐশ্বী নিজে। এরকম প্রমাণ করা কষ্টকর না। তর্কে জিততে চাইলে এটা এখুনি করে দেয়া যেতে পারে। তবে ফ্যাক্ট কোনটি ছিলো সেটি বের করা খুবই কষ্টকর। ফ্রেডরিক নীতশের এক্সপ্লোটেশন অফ মেটালেপসিসের মূল কথা এই যে, ‘কারণ’ আর ‘ফলাফল’ নিয়ে আমাদের উল্টো দেখার ভ্রান্তি আছে। ‘কারণ’ আর ‘ফলাফল’কে একটার জায়গায় আরেকটা বসিয়েও বেমালুম একটা ঘটনা ব্যখ্যা করা যায়। ‘আমি ভাবছি’ বাক্যটিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। নীতশে এখানে আপত্তি তুলে বুঝাতে চেয়েছেন, ‘ভাবনার ফলে আমি আসছি’। আমি’র উপস্থিতির কারণে ভাবনা আসছে না, বরং উল্টোটা, ভাবনার উপস্থিতির কারণে ‘আমি’ চরিত্রটি আসছে। ‘মুরগী আগে না ডীম আগে’ এর তর্কের মীমাংসা তখনই শেষ হবে যখন যেকোন একটিকে ‘কারণ’ হিসেবে দেখানো হয়। এমনভাবে ভাবা যেতে পারে, সকাল হলে সূর্য উঠে। যদিও উল্টোটা ঘটে। যুগপৎ ঘটনাগুলোর ‘কারণ’ এবং ‘ফলাফল’কে আমরা এভাবেই গুলিয়ে ফেলি।
বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসনের ফলে ছেলে বখাটে হয়েছে এটা একটা জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত। বখাটে ছেলেটি নিজেও এই যুক্তিটি দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। অনেক বাবা-মাকে দেখেছি অনেক আদর আবদারের পর ছেলে বখাটে হবার পরপরই শাসনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ছেলে আরো বখাটে হয়, শাসন আরো বাড়ে। ‘শাসন’ এবং ‘বখাটেপনা’ পরস্পরকে হারানোর জন্যে এক প্রতিযোগীতা গড়ে উঠে। বাবা-মা শাসনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে ছেলের অবাধ্যতা। ছেলে নিজের অবাধ্যতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে বাবা-মায়ের মাত্রাতিরিক্ত শাসন। এখন অনেক কথা উঠতে পারে কিভাবে সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়া যায়। আমি সে ব্যাপারের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি না। আমার অবস্থান স্পষ্টঃ ভাবাবেগকে প্রাধান্য দিয়ে ‘কারণ’ আর ‘ফলাফল’ আলাদা করা যায় না; এবং অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তে আসার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমার বক্তব্যটি নিশ্চয়তার বিরুদ্ধে; সম্ভাব্যতার পক্ষে। আমাদের তর্ক ঘটে প্রত্যেকটি সম্ভাব্যতার পক্ষ নিয়েই।
ফিরে আসি ঐশ্বীর প্রসংগে। ঐশ্বী নিজে সহমর্মিতা পাওয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাপার ঘটিয়েছিলো। ঐশ্বীর একটি চিঠি অথবা ডায়েরীর অংশবিশেষ পাওয়া গিয়েছিলো যেখানে সে খুব আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলো এটি ভেবে যে, তার উপর নানা-রকম শৃংখলা এবং নিয়ন্ত্রন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছিলো। নিঃসন্দেহে শৃংখলা এবং নিয়ন্ত্রণ একজন স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর ব্যাপক পরিমাণ শোষণ-অত্যাচারের ভেতর পড়ে। ঐশ্বী সেটা সেভাবেই নিয়েছে। ঐশ্বী তার ডায়েরীর অংশে তার সৎ উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছে নিশ্চিত; তবে আমি নিশ্চিত না ঐশ্বী সেখানে যেটিকে ‘কারণ’ হিসেবে দেখিয়েছিলো সেটি সত্যিই ‘কারণ’ নাকি ‘ফলাফল’ ছিলো। ‘ফলাফল’ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। মানুষ যখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে সে নিজেকে নিজের কারণ হিসেবে কখনোই বর্ণণা করে না যদি সে মানসিকভাবে নিজেকে অপরাধী মনে করে। নিজেকে গুনী মনে করলে ঘটনা উল্টোটা ঘটে। সে নিজেকে নিজের পরিণতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। আমি একটি ভালো কাজ করলে সেটি আমিই করি; খারাপ কাজ করলে সেটি করি অন্যকিছুর প্রভাবে। মানুষ নিজেকে নির্দোষ দেখিয়ে সুবিধা আদায় করতে চায়। এটি থেকে আমি, আপনি, কেউ-ই মুক্ত নন।
ঐশ্বী পরবর্তিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে সবার সহানুভূতি অর্জন করলো,- পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে। যারা চাইছিলোই ঐশ্বী কিছু সহানুভূতি পেতে পারে তাঁরা সেটাকে ঐশ্বীর মহতী গুণ হিসেবে প্রকাশ করলো। বিপরীতে যারা ঐশ্বীর অপরাধের দায় ঐশ্বীকেই দিতে চেয়েছিলো তাঁরা একটা কারণ বের করলো যেঃ ঐশ্বীর কিছু করার ছিলো না ধরা না দিয়ে, এটা তার কোন সদগুণ নয়। আমার ঠিক সে সময়ে কোন প্রতিক্রিয়া আসছিলো না এজন্যে যে, আমি বুঝে গিয়েছিলাম জগত এরকমই যান্ত্রিকভাবে চলছে। মানুষ খুব দ্রুতই নিরপরাধ এবং খুব দ্রুতই ঘৃণ্য খুনীতে পরিণত হয় সামান্য একটি ‘কারণ’-এর কারণে। ‘বাস্তবতা’র মূল্যায়ন অনেক বেশি আপেক্ষিক এবং ‘কারণ’নির্ভর।

দেশে ধর্ষন বেড়ে চলছে। ফার্মেসীতে ঔষুধ আনতে গিয়ে এক শিশু ধর্ষিতা হলো কিছুদিন আগে। এর আগে ঘটলো টানা অনেকগুলো ধর্ষন। ধর্ষণের পর কিশোরী, যুবতীর লাশ ক্ষেতে পড়ে থাকে। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করে ধর্ষণের বিরুদ্ধে। অনেকে ব্যাপারটা ইন্টেলেকচুয়ালি সমাধান করতে চায়। সেসব ইন্টেলেকচুয়ালরা একটু ইন্টেলেকচুয়ালি চিন্তা করলেই বুঝতে পারতো, চিন্তা করে ধর্ষন থামানো যায় না। তাঁরা ধর্ষণের নানা কারণ চিহ্নিত করে এবং সেসব কারণের সমাধান চায় আগে। আমি মনে করি তাদের জন্য এ-অন্যায় রোধ করা বিলম্বিত হবে। তাঁরা মনে করে একটা শেকড়ের কারণটি উৎপাটন করে ফেললেই ধর্ষন আর হবে না। এখন আমাকে তাদের বিভ্রান্ত মনে হয় এ-কারণে যে ঘটনা ঘটার কারণ একটা নয়, অনেকগুলো এবং কারণগুলো সরলরৈখিক নয়, এবং কয়েকটা কারণ স্পষ্ট নয়, এবং মাঝে মাঝে নিশ্চিত হওয়া যায় না কোনটি কারণ আর কোনটি অকারণ। ইভ টিজিঙের একটি কারণ ছেলে মেয়ের সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা; কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরে ইভটিজিং পূর্বের তুলনায় অনেক কমেছে কারণ কিছু বছর আগে ঠিক ইভ টিজিং-এর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ হচ্ছিলো ঢালাওভাবে। এর কারণ অনুসন্ধান করে সমাধান করতে গেলে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটত। একদফা প্রতিবাদ হয়ে গেলে তারপর কারণ অনুসন্ধান করা যেতে পারে। মৌলবাদের কারণ আমেরিকা না পাকিস্তান না সামাজিক অবস্থা না ব্যাক্তির মনমানসিকতা এসব কারণ নিয়ে বড়সড় একটা প্রবন্ধ লিখা যাবে কিন্তু মৌলবাদ কমবে না। মৌলবাদকে সমস্যা মনে করলে মৌলবাদই শত্রু।

বাংলাদেশে কম্যুনিস্টরা কোন প্রগতিশীল আন্দোলনে অংশগ্রহন করতে পারছে না, আমার মতে, তাদের এই কুসংস্কারের জন্যে। তাঁরা কারণ আলাদা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চলে যায় রাস্ট্রযন্ত্রে, যখন দেখে আপাতত রাস্ট্রযন্ত্র দখল করা সভব না, তাঁরা মনে করে যখন দখল করা হবে এর সমাধান তখনই হবে। এ-কারণে তাদের অনেকেই এখন নারীবাদীও হোন না কারণ তাঁরা মনে করেন ব্যাবস্থা পরবর্তন হলেই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঠিক হয়ে যাবে; এখন শুধু অপেক্ষা। তাঁরা সমকামীদের অধিকারও চান রাস্ট্রযন্ত্র দখলের পর। শতভাগ কম্যুনিস্ট এবং পার্টিরা হয়তো এমন নয়; আমি বলছি সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে। তবে এটা নিশ্চিত যে, যে যত কট্টর বাম সে তত বেশি আন্দোলনের সার্বিকতায় বিশ্বাসী। এখনকার সামাজিক সমস্যাগুলোর কারণ একাধিক এবং জটিল। অনেকক্ষেত্রে সার্বিকতা খুঁজে আশানুরুপ ফল নাও দিতে পারে; আনাচে কানাচে বেড়ে যায় অন্যায়। আর এখন আমি মনে করি, আপনার কাছে যেটাকে অন্যায় মনে হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে পোস্ট লিখতে গেলে আপনাকে খুব বেশি প্রজ্ঞাবান হবার দরকার নেই। আপনার কাছে বিষয়টা কেনো অন্যায় তা আপনি প্রজ্ঞা দিয়ে ঠিক করেন নি; বিষয়টা ন্যায়-অন্যায় নির্ধারিত হয়েছে আপনার চাহিদা এবং আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে। পরশেষে বাস্তবতা এটাই থাকবে আমরা আমাদের চাহিদা পূরণ করতে চাই এবং আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটাতে যাই।

পরিশেষেঃ

‘কারণ’ ও ‘দায়’ নিয়ে এতগুলো কথা বলার কোন কারণ নেই। এগুলো আমার অবসরের কিছু বিশ্লেষনাত্বক দর্শন। প্রত্যেকটি ঘটনা এর আগে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার ফলাফল। বাস্তব জীবনে এমন কোন ঘটনা নেই, যা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি খালি চোখে, কোন ঘটনার ফলাফল নয়। প্রত্যেকটি ঘটনাই হয়ে যায় আরেকটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ামাত্র। এভাবে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে নিলে হয়ে যাওয়া যায় উদার, কিন্তু দোষারোপ করার কেউ থাকে না। একইভাবে মানুষের কাজকর্মও রিফ্লেক্স একশন ব্যাতীত কিছু না; হয়তো ল্যাপ্লাসের ডিটারমিনিজমের মত দেখানো যায় মানুষের কর্মের কোন দায়ই নেই। কিন্তু সে আলোচনা বৃথা। অন্তত দর্শন থেকে সরে গিয়ে আমার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বলা লাগছে, ব্যাক্তির কর্মের দায় একমাত্র ব্যাক্তিকেই নিতে হবে। এবং আমি মনে করি কোন ঘটনার ঘটন বন্ধ করার জন্যে শুরু করতে হবে একদম সে ঘটনাটি থেকেই; কার্যকারণ সম্পর্ক ধরে শুরুর ঘটনা অনুসন্ধানের মাধ্যমে।

জাঁ পল সার্ত্রে বেশ কিছু দার্শনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলেই বারবার বলেছেন, মানুষ স্বাধীন। এবং আমার মত বলেছেন, ব্যাক্তির কাজের দায় একক ব্যাক্তিরই। সার্ত্রের এ-দুটি কথার লাইন ধরেই যদি আমি তাকে এবং আমাকে প্রশ্ন করতে চাই, ‘মানুষ কেন স্বাধীন’, এর উত্তরটা কি হবে? কোন জিনিস কি নিজের পূর্বের অবস্থাকে অতিক্রম করতে পারে অন্য কোন কিছুর সাহায্য ছাড়া?

[আমার এ লিখাটি কোন সিদ্ধান্তে আসার জন্যে নয়; বরং সিদ্ধান্তহীনতায় আসার জন্যে। এই লিখাটি নিজেই নিজের স্ববিরোধী যেমনটি কয়েকটি বড় বড় দার্শনিক তত্ত্বগুলো। আমার ইদানিং মনে হচ্ছে তত্ত্ব নিজেই নিজের বিরোধিতা করে বলে এর অস্তিত্ব টের পাই, যেমন, সার্ত্রে বলেছিলেন নির্বাচন না করাও এক ধরণের নির্বাচন। ফুকো যুক্তির বিরোধিতা করেছেন যুক্তি দিয়ে।]

মুক্তমনা ব্লগার।

মন্তব্যসমূহ

  1. অরিন্দম মার্চ 9, 2014 at 1:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    ভাই, লেখার শেষে সিদ্ধান্তহীনতার কথা বলেছেন। আমার কেন জানিনা মনে হল আপনার মানসিক অবস্থার একটা কারণ হল শুধু মাত্র দর্শনের সাহায্য নিয়ে বিষয় গুলোকে বোঝার চেস্টা করা। সমস্যা হল Causality, responsibility বা morality ঠিক বিজ্ঞানের term নয়। এখন বিশেষ করে নৈতিকতার বিষয় নিয়ে বিবর্তনের আলোয় অনেক গবেষণা চলছে। অভিজিতদার এই বিষয়ে লেখাগুলো দেখতে পারেন। এছাড়া Steven Pinker এর লেখা দেখতে পারেন। এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি তবে যে ব্যাখাগুলো পাওয়া গেছে তা অন্তত বেশিরভাগ দর্শনের ব্যাখার থেকে পরিস্কার। তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল হয়ত যে সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবছেন তা নিয়ে ভাবার একটা নতুন দৃস্টিকোণ পাবেন।

    • গাজী ফাতিহুন নূর মে 3, 2014 at 12:14 অপরাহ্ন - Reply

      @অরিন্দম, আপনার কমেন্টের রিপ্লাই দিতে দেরী হলো বলে খুবই দুঃখিত। আমি খুব ভালো করেই সেগুলো পড়েছি। এখানে নীতি নৈতিকতা উদঘাটনের কোন চেষ্টা চালানো হয় নি। নীতি নৈতিকতার একটা সাধারণ সংগা তৈরী করা হয়েছে অস্তিত্ববাদের দৃষ্টিকোন থেকে। চাইলেই বিবর্তনীয় মনোবিদ্যার আন্ডারে সেটা দেয়া যেতে পারতো। দিই নি এ-কারণে যে কোন জীবন দর্শনই বিবর্তনের তত্ত্বকে অতিক্রম করতে পারবে না। রিসপনসিবিলিটি, মোরালিটি বিজ্ঞানের টার্ম না হলেও বিজ্ঞান সেটা নিয়ে আলোচনা করতে তো পারে। ধন্যবাদ আপনাকে।

  2. সংবাদিকা মার্চ 8, 2014 at 12:17 পূর্বাহ্ন - Reply

    ব্যক্তি স্বার্থ, সর্বজন স্বীকৃত নৈতিকতা কিংবা প্রতিষ্ঠিত আদর্শের মাঝে পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে, নৈমিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে আপার্তবৈপরীতার মাঝে পরা মানব সমাজে একটি সহজাত প্রবৃত্তি।

  3. বিপ্লব রহমান মার্চ 7, 2014 at 7:53 অপরাহ্ন - Reply

    এই ভালো-খারাপ নামকরণ মূলত দুভাবে হচ্ছেঃ কাজটি যদি অপরের চাহিদা পূরণ করে তাহলে এটি ভালো এবং যদি অপরের চাহিদা পূরণের বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে খারাপ।

    মাফ করবেন। নোটটি খুব বেশী সরলীকরণ-দুষ্ট বলে মনে হয়েছে। যেমন, ধরা যাক, গণপিটুনিতে চোরের মৃত্যু হয়েছে। গণপিটুনিটিই এখানে গণমানুষের চাহিদা ছিলো। তাহলে গণপিটুনিকে ‘ভালো’ বলবো? 😛

    আসলে সাধারণের ভালোত্ব-মন্দত্ব জ্ঞান সৃষ্টি করে নৈতিকতা; যেটি পরিবতর্নশীল।

  4. ইমরান ওয়াহিদ মার্চ 6, 2014 at 11:54 অপরাহ্ন - Reply

    কি লিখেছেন রে ভাই! মাথা মনের মধ্যে প্যাঁচ লেগে তব্দা খেয়ে গেলুম

  5. বাকীদুল ইসলাম মার্চ 6, 2014 at 11:07 অপরাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ লেখককে, তাঁর এই বিশ্লেষণধমী লেখাটির জন্য। মানুষ উদার হবার একটি সুন্দর পন্থা বেশ সুচারুভাবে বর্ণিত হয়েছে। আমার বিশ্লেষণ যদি সঠিক হয়, তবে বলতে পারি,নজরুল ঘটনার কারণ খুঁজতে বেশী দূরে যাননি, ইংরেজ পর্যন্ত যেয়েই থেমে গেছেন, তাই তিনি ইংরেজ বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ কারণের পেছনের কারণ খুঁজতে খুঁজতে সকল ঘটনা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বলে বুঝেছিলেন। তাই তিনি বিদ্রোহী হননি। সমাজের সকল ঘটনাগুলোকেই তিনি স্বাভাবিক বলে ভেবেছিলেন।
    কথাটি এমন- কেউ যদি জীবনের কষ্টের মুহুর্তগুলোকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারেন, তবে তার সমগ্র জীবনটাই সুখময় হয়ে ওঠে। লেখকের কথামতো- কেউ যদি উদারতার চরম পর্যায়ে উপনীত হতে চায়, তবে সে অনুভূতিহীন, বিচারবুদ্ধিহীন জীবে পরিনত হবে নিশ্চয়।

  6. ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা মার্চ 6, 2014 at 7:44 অপরাহ্ন - Reply

    আমি নিজেও লেখাটা কনফিউজড পুলক। আমিও দার্শনিক তত্ত্বগুলোর দিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি।মাঝে মাঝে কোন যুক্তিকেই যুক্তি মনে হয় না। 🙁 😕

মন্তব্য করুন