বৌদ্ধশাস্ত্র পাঠ করার সময় বোধিসত্ত্ব কথাটা বারবার চলে আসে। বোধিসত্ত্ব কথাটা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন মনে করছি। বোধিসত্ত্ব শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে, বুদ্ধত্ব (শাশ্বত জ্ঞান) প্রাপ্তিই যাঁর ভবিতব্য অর্থাৎ যিনি বোধিলাভ করার জন্যই জগতে আবির্ভূত হয়েছেন। বৌদ্ধ ধর্মের বিভিন্ন শাখায় বোধিসত্ত্বের বহুবিধ ব্যাখ্যা থাকলেও মহাযান বৌদ্ধধর্ম মতে বোধিসত্ত্ব হলেন তিনিই যিনি জগতের কল্যাণের জন্য স্বয়ং নির্বাণলাভ থেকে বিরত থাকেন এবং বিশ্বের সকল জীবের মুক্তিলাভের উপায় করেন।

ত্রিপিটকে পালি ভাষায় বোধিসত্ত্ব শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেছিলেন শাক্যমুনি বুদ্ধ। বোধিসত্ত্ব শব্দটি দ্বারা তিনি তাঁর পূর্বজন্মের অবস্থা থেকে বোধিলাভ করার পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত জীবনকে বুঝিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাঁর পূর্বজন্মের কাহিনি ব্যক্ত করতে গিয়ে গৌতম বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব শব্দটির প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ এখান থেকে অনুধাবন করা যায় যে বোধিসত্ত্ব হলেন তিনিই যাঁর জীবনের একমাত্র ব্রতই হল বোধিলাভ।

বুদ্ধের বোধিসত্ত্বাবস্থার এই সকল কাহিনি বর্ণিত হয়েছে জাতকে। মহাযান বৌদ্ধধর্মানুসারে একজন বোধিসত্ত্ব হলেন তিনিই যিনি বুদ্ধত্বলাভের প্রায় প্রতিটি স্তরই উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি স্বয়ং পরম জ্ঞান লাভ করেছেন এবং সেই শাশ্বত বোধের আলোকে প্রতিটি জীবকে আলোকিত করছেন ও তাদের রক্ষার্থ জীবন উৎসর্গ করেছেন।

গত পর্বের অশাতমন্ত্র জাতকে আমরা দেখেছি যে বৌদ্ধ ধর্ম নারীর সর্বাপেক্ষা আদর্শ চরিত্র মাতাকেও কলঙ্কিত করতে কুণ্ঠিত হয়নি। এখন আমরা আলোচনা করবো বৌদ্ধ শাস্ত্রের ৬৪ নম্বর জাতক যার নাম দুরাজান জাতক। এই জাতকে আচার্য রুপী শাস্তা জানালেনঃ

“রমণীগণ যেদিন দুষ্কার্য করে সেদিন স্বামীর অনুবর্তন করে, দাসীর ন্যায় বিনীত হইয়া চলে, কিন্তু যেদিন দুষ্কার্য করে না সেদিন তাহারা মদোদ্ধতা হইয়া স্বামীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। দুঃশীলা ও পাপপরায়ণা রমণীদের এইরূপই স্বভাব।”

এরপর তিনি ছাত্রের উদ্দেশ্যে একটি গাথা উচ্চারণ করেনঃ

“ভাল যদি বাসে নারী
হইও না হৃষ্ট তায়,
যদি ভালো নাহি বাসে,
তাতেই কি আসা যায়?
নারীর চরিত্র বুঝি
হেন সাধ্য আছে কার?
বারি মাঝে চরে মাছ
কে দেখিবে পথ তার?”

এর ঠিক পরের জাতকটি অর্থাৎ ৬৫ নম্বর জাতক হল অনাভিরতি জাতক। এখানে বৌদ্ধরূপী শাস্তা বলেন, স্ত্রীজাতির চরিত্রহীন হইবে এ আর এমন কি? এটা দেখে বুদ্ধিমানের রাগ করতে নেই। গাঁথাটি হল এরকম-

“নদী, রাজপথ, পানের আগার
উৎসব, সভাস্থল আর,
এই পঞ্চস্থানে অবাধে সকলে
ভুঞ্জে সম অধিকার।
তেমতি রমণী ভোগ্যা সকলের,
কুপথে তাহার মন,
চরিত্রস্খলন দেখিলে তাহার
রোষে না পণ্ডিত জন।”

আমাদের এখন আলোচনার বিষয় ১০২ নম্বর জাতক, পর্ণিক জাতক নামে এই জাতকের বর্তমানবস্তুতে আমরা দেখতে পাই নিজের মেয়ের যৌন শুদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন পিতা। তাই গোত্রান্তরিত করার পূর্বে মেয়ে প্রকৃত কুমারী কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায় পিতা। কন্যাকে নিয়ে বনপ্রান্তে গিয়ে হাত চেপে ধরে পিতা, এতে কন্যা আতঙ্কিত হয়। প্রশ্ন উত্তরে পিতা জানতে পারে কন্যা এখনো কুমারী ধর্ম রক্ষা করেছে। এরপর কন্যাকে নিশ্চিতভাবে গোত্রান্তরিত করার ভরসা পায় পিতা।

পিতা দ্বারা কন্যার সতীত্ব পরীক্ষার আরও উদাহরণ পাওয়া যায় জাতক গুলোতে। ১০২ নম্বর জাতকের মতো প্রায় একই ধরণের কাহিনী আমরা দেখতে পাই ২১৭ নম্বর জাতকে। এই জাতকের নাম সেগগু জাতক। জাতকটির অতীতবস্তুতে পিতা তার কন্যার চরিত্র পরীক্ষাকালে জানায়ঃ

“সর্বত্র দেখিতে পাই নরনারীগণ
ইচ্ছামতো হয় ভোগবিলাসে মগন।
তুমি কিলো সেগগু একা এতবড় সতী
না জান বৃষলীধর্ম হইয়া যুবতী?
বনে ধরিয়াছি হাত, কান্দো সে কারণ,
রয়েছে কুমারী যেন সারাটা জীবন।”

আতঙ্কিত কন্যা তার পিতাকে বলেন এই ভাবেঃ

“যে জন রক্ষার কর্তা সেই পিতা মম
বনমাঝে দুঃখ কেন দেন অতীব বিষম।
বনমাঝে কেবা মোর পরিত্রাতা হবে?
রক্ষক ভক্ষক হয় কে শুনেছে কবে?”

এইবার আমরা আলোচনা করবো ১২০ নম্বর জাতক যার নাম বন্ধনমোক্ষ জাতক। এই জাতকের অতীতবস্তুতে বারানসীরাজ তার অন্তঃপুরে ষোড়শ সহস্র নর্তকী থাকলেও শুদ্ধভাবে জীবনযাপন করতো কিন্তু তার মহিষী ছিল ব্যভিচারিণী। রাজা রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে গেলে রানী ৬৪ জন দূতের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় কিন্তু সর্বশেষ রাজপুরোহিতরূপী বোধিসত্ত্ব রানীর আহ্বানে সারা দেয়না। কিন্তু রানীই বোধিসত্ত্বের কাম প্রস্তাবের অভিযোগ আনে, তবে শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় বোধিসত্ত্ব নির্দোষ। তখন রাজা বোধিসত্ত্ব বাদে বাকি ৬৪ জনকে প্রাণদণ্ডাদেশ দিলে বোধিসত্ত্ব মহারাজ কে বলেনঃ

“মহারাজ ইহাদের বা দোষ কী? ইহারা দেবীর আদেশ মতো তার অভিলাষ পূরণ করিয়াছে। স্ত্রী জাতি স্বভাবতই দুস্প্রবিত্তি ও দুর্দমনীয়া, তাদের প্রয়োজনেই এরা সাড়া দিয়েছে সুতরং এদের আর দোষ কি?”

(চলবে)

বৌদ্ধশাস্ত্রে পুরুষতন্ত্র (পর্ব ০৩)

বৌদ্ধশাস্ত্রে পুরুষতন্ত্র (পর্ব ০২)

বৌদ্ধশাস্ত্রে পুরুষতন্ত্র (পর্ব ০১)

[282 বার পঠিত]