বাংলাদেশের সমসাময়িক অবস্থাকে আসলে কিসের মধ্য ফেলা যায়… বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাধীনতার মূল চেতনার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পতনের সূতিকাগার অত্যন্ত দুঃখজনক ভাবেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামীলীগের তথা বাকশাল শাসনামলের ১৯৭৫ সাল। স্বীকার করেন কিংবা না করেন- ২৫ শে জানুয়ারি ১৯৭৫ যা হয়েছে তার সাথে স্বাধীনতা পরবর্তী “ক্লাসিক” আফ্রিকান/এশিয়ান সিভিলিয়ান ডিক্টেটরশিপেরই তুলনা চলে। মালাওয়ি, গানা, ইরিত্রিয়া, কোঁত দ্যা ভোয়া, জিবুতি, নিরক্ষীয় গিনি, গ্যাবন, গায়না কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ সহ আরও কিছু দেশের ন্যায় – প্রেসিডেন্ট ফর লাইফ। এরপর পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে আমরা সম্মুখীন হই উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের দক্ষিণ আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোর মত “ক্লাসিক” মিলিটারি জান্তার ডিক্টেটরশিপ। মিয়ানমার, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, মিশর, লিবিয়া কিংবা সিরিয়া সহ আরও কিছু দেশের ন্যায় । এমন এক ডিক্টেটর টার্ন্ড পলিটিশিয়ান জিয়া উর রহমানের (কু/বি-খ্যাত?) উক্তি “আমি রাজনীতিবিদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে দেব”…… উক্ত সাবেক জেনারেলের এটা জানা ছিল কিনা জানিনা যে একটি উক্তি আছে যে এমনকি “যুদ্ধ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যা কেবল সামরিক বাহিনীর হাতে (তথা কেবল জেনারেলদের হাতে) ছেড়ে দেওয়া যায়না”।

৯১ এর পরবর্তী সময়ে আমরা কাগজে কলমে সামরিক ডিক্টেটর তথা স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদ থেকে মুক্ত হই। তবে দলীয় একনায়কতন্ত্রের কবলে পরে বাংলাদেশের রাজনীতি। আক্ষরিক ভাবেই – বাংলাদেশে গত বিশ বছর ধরে নির্বাচিত একনায়ক দিয়ে দেশ চলছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পার্টির অভ্যন্তরে কোন ধরণের গণতন্ত্রের চর্চা নেই। যা আছে তা হল এক প্রকার ব্যক্তি এবং পরিবার কেন্দ্রিক কাল্টের মচ্ছব – যার একদিকে আছে শেখ হাসিনা এবং অন্যদিকে খালেদা জিয়া । শুধু বড় দলগুলোর দোষ দিয়েও লাভ নেই ছোট দলগুলো আরও স্বৈরতন্ত্রের আখড়া – যেন ওয়ান ম্যান শো – গণফোরাম, এলডিপি ইত্যাদি ইত্যাদি – কম্যুনিস্ট দলগুলোর কথা না বলাই ভালো ওদের তো ঠিকানাই নাই কতগুলোর। বাংলাদেশের পার্টি গুলোর চেয়ে সমসাময়িক কালের গণচীনের কম্যুনিস্ট পার্টি অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। কতগুলো মৌলিক প্রশ্নে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এক যেমন অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধা এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য তৈরি আইন বজায় রাখার ইত্যাদিতে।

গত ৫ই জানুয়ারি ২০১৪ তে সঙ্ঘটিত, আওয়ামীলীগ দ্বারা মঞ্চায়িত ইলেক্টোরাল অথরিটারিয়ানিজম এর ফলে বাংলাদেশ আর এক নতুন যুগে প্রবেশ করল। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ একটি ওয়ান পার্টি সিভিলিয়ান ডিক্টেটরশিপের দিকে এগুচ্ছে। আওয়ামীলীগের হয়ত নানা যুক্তি আছে – তবে যুক্তি পাকিস্তানের ডিক্টেটর জেনারেল আইয়ুব খানেরও ছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও আওয়ামীলীগ স্বাধীনতা যুদ্ধকে নিজ দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিল – যেমন গেরিলা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণার্থী বাছাই, মুজিব বাহিনী গঠন কিংবা কম্যুনিস্টদের কাস্ট আউট করণ ইত্যাদি। এখনও তারা স্বাধীনতা যুদ্ধকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের সচেষ্ট। সবচাইতে বড় প্রমাণ কোন রাজাকার এখন বিভিন্ন স্বার্থে আওয়ামীলীগ করলে সে ধোয়া তুলসী হিসেবে দেখা এবং মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের যারা আওয়ামীলীগ করেননা তাদের নব্য রাজাকার ট্যাগ লাগানো – যা আওয়ামীলীগ করে থাকে।

জনসমর্থনের কথা যদি বলতে হয় – তাহলে হিটলার, স্ট্যালিন, কিংবা মাওয়ের কিংবা বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার নতুন প্যারানয়েড ডিকেটর কিম জং উনের, মিসরের জেনারেল সিসি, এমনকি সিরিয়ার বাশারেরও হাজার হাজার সমর্থক আছে। আওয়ামীলীগের আঁচলের ভেতর ঢোকার আগে, যেকোন নির্বাচনে নিয়মিত জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া (অতি কম ভোট পাওয়ার জন্য) বড়ুয়া, মেনন কিংবা ইনুও কয়েকশ ভোট পেত- অর্থাৎ তাদেরও কিছু জনসমর্থন। তেমন আওয়ামীলীগেরও নিঃসন্দেহে কোটির উপর জনসমর্থন আছে। কিন্তু বাকি আট-নয় কোটি মানুষ আওয়ামীলীগকে যে অন্ধ সমর্থন করেনা – তাতো হিসেবে নিতে হবে। এভাবে চিন্তা করলে – স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতো কম ছিলনা দেশে – এখনো জামাতের সমর্থক অনেক আছে – তবে তা অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়।

ইতিমধ্যে আমরা এমন এক সরকার দেখেছি – যেখানে সরকারের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা ছিলেন – প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কিছুদিন পর স্পিকার নির্বাচিত করা হল কেবল এবং প্রধানত নারী হবার যুক্তিতে। শীর্ষ পদে নারী অধিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকৃত-ভাবে সামগ্রিক ভাবে কতটুকু নারী অধিকার বাস্তবায়িত হয় তাও প্রশ্নবিদ্ধ।

এখন কি আমরা আধুনিক যুগের প্রথম নারী একনায়ক/ডিক্টেটর দেখতে যাচ্ছি???

পরিশেষে বলতে ইচ্ছে করছে –

একনায়কতন্ত্র সর্বাবস্থায় বর্জনীয় – সামরিক কিংবা বেসামরিক যেমনি হোক। ক্যুদেতা যেমন সেনাবাহিনী কর্তৃক কৃত সবচাইতে বড় ভীরুতা এবং অনৈতিকতা তেমন ইলেক্টোরাল অথরিটারিয়ানিজম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কর্তৃক কৃত সবচাইতে বড় ভীরুতা এবং অনৈতিকতা।

—————-X—————-

[35 বার পঠিত]